১.
‘তুমি যুদ্ধার্থ উত্থিত হও; শত্রু জয় করিয়া যশঃ লাভ কর, নিষ্কন্টক রাজ্য ভোগ কর । হে অর্জুন, আমি ইহাদিগকে পূর্বেই নিহত করিয়াছি; তুমি এখন নিমিত্ত-মাত্র হও।'
--- শ্রীমদ্ভাগবতগীতা, একাদশ অধ্যায়
বলুন দেখি, পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা দুটো কী কী? দেখুন, সেই বিরানব্বুই সালে মনমোহন সিংজী লাইসেন্স রাজের অবসান ঘটিয়ে সর্বত্র দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। তারপর ভাগীরথির বুক দিয়ে কত জল বয়ে গেল, দেশী-বিদেশী শিল্পপতিরা কত চেষ্টাই করলেন, কিন্তু এ পোড়া রাজ্যে একটাও বড় মাপের কারখানা বানানো গেল না। বুদ্ধবাবুও পারেননি, মমতা ব্যানার্জীও পারলেন না। প্রতি বছর প্রচুর ঢাক-ঢোল পিটিয়ে শিল্প-সম্মেলন হয়, হাজার-কোটি লক্ষ-কোটি বিনিয়োগের গল্প শোনা যায়, তারপর সময়কালে দেখা যায় সব ঢুঁ ঢুঁ। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের তো বসে থাকলে চলে না। নাই বা হল শিল্প, বিরাট একটা বাজার তো রয়েছে এ রাজ্যে। মোটামুটি সম্পন্ন একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংখ্যা সব সময়ই এ রাজ্যে বিপুল। এরা মূলত চাকুরিজীবী, জেনেটিক্যালি অসম্ভব ভীতু, আর্থিক এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রত্যাশী, কোনোরকম ঝুঁকি নিতে চান না এবং খুব বেশী ভোগবাদী জীবনেও অভ্যস্থ নন। এই বাজারে যদি বিনিয়োগের জন্য সমীক্ষা চালানো হয়, যেকোনো সময় দেখা যাবে দুটি পণ্য এখানে সর্বাধিক পরিমাণ বিক্রির সম্ভাবনা --- – শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য।
যেকোনো ‘প্রোডাক্ট’ বিক্রি করার তিনটে মূল কৌশল হল – কৃত্রিমভাবে চাহিদা তৈরি করা, বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাকে প্রলুব্ধ করা এবং লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট --- বড় কোনো প্রতিযোগী ইতিমধ্যেই বাজারে থাকলে ছলে-বলে-কৌশলে তাকে সরিয়ে দেওয়া। ওহো, বলতে ভুলেছি আরেকটা জরুরি কথা – বড় বা ছোট যেকোনো ব্যবসাই হোক না কেন, শিল্পপতিদের সবার আগে চুক্তি করতে হয় শাসকের সঙ্গে। শাসক -- তা সে লাল, হলুদ, সবুজ যে রঙেরই হোক না কেন --- বণিকের বাণিজ্যে সহায়তা না করলে কোনোদিন গদিতে টিকতে পারেননি। পারেন না। মীরজাফর তো নিমিত্তমাত্র, জেনে রাখুন, ইংরেজরা যদি উমিচাঁদ বা জগৎ শেঠকে সময়মত হাতে না আনতে পারত, বাংলার সিংহাসন থেকে সিরাজকে কোনোদিনই সরানো যেত না। উল্টোদিকে এটাও সত্য যে সিরাজ তাঁদের যথেষ্ট ব্যবসার সুযোগ দিতে পারছিলে না বলেই তাঁরা ‘বিরোধীপক্ষে’ যোগ দিয়েছিলেন।
২.
একটা-দুটো সহজ কথা
বলব ভাবি চোখের আড়ে
জৌলুসে তা ঝলসে ওঠে
বিজ্ঞাপনে রংবাহারে
--- মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে (শঙ্খ ঘোষ)
থিওরি ক্লাস শেষ, এবার প্রাকটিক্যাল শুরু। শেষ কৌশলটা দিয়েই শুরু করি। বলুন দেখি, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যে বিনিয়োগকারীর এ রাজ্যে সবথেকে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী কে বা কারা? খেয়াল করে দেখেছেন কি, মোটামুটি বিগত মোটামুটি দশ বছর ধরে এ রাজ্যে বারবার কোন দুটো ক্ষেত্র খবরের শিরোনামে আসছে? আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য। ধর্মটাও আসে, তবে সেটা গৌণ, স্টপ গ্যাপে ক্লাসে আসা শিক্ষকের মত। পরপর মনে করুন -- শিক্ষামন্ত্রী গ্রেপ্তার ও তার বাড়িতে নোটের বাণ্ডিল উদ্ধার, হাইকোর্টের নির্দেশে ছাব্বিশ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিল, সেটা থিতোতেই আর জি কর কাণ্ড, সেটা একটু সামলাতে না সামলাতেই মেদিনীপুর মেডিক্যালে স্যালাইন কেলেঙ্কারি, আবার তার পরপরই সুপ্রীম কোর্টে রায়। এর ফাঁকে ফাঁকে আসছে দীর্ঘ দুমাস করে গরমের ছুটি, মাধ্যমিকের প্রশ্নপ্ত্র ফাঁস, উৎসশ্রীর কল্যাণে গ্রামের স্কুলগুলোতে শিক্ষকের হাহাকার নিয়ে চর্চা, গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসূতির মৃত্যু, সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু এবং ভাঙচুর, জাল ও মেয়াদ ফুরনো ওষুধের চক্র…শিক্ষা-স্বাস্থ্য-শিক্ষা-স্বাস্থ্য-শিক্ষা-স্বাস্থ্য…।
এ হল সেই প্রতিদ্বন্দ্বীর মাজা ভেঙে দেবার নীতি। এ রাজ্যে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের বাজার ধরার সবচেয়ে বড় দুই বাধা হল সরকারী স্কুল এবং সরকারী হাসপাতাল। এখনও এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাত্রছাত্রী পড়তে যায় সরকারী স্কুলে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ চিকিৎসা পাবার জন্য নির্ভর করে সরকারী হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর। ভাল ব্যাটসম্যান যেমন পরপর চার-ছয় মেরে বোলারের কাঁধ ঝুলিয়ে দেয়, তার আত্মবিশ্বাসের ভিত ধ্বসিয়ে দেয়, ঠিক তেমনিভাবে এই দুটি ক্ষেত্রে একেবারে চালিয়ে খেলার নীতি নিয়েছে এই লাইনের ‘বেওসাদার’রা। আর দোসর সুগ্রীব, থুড়ি শাসক তো আছেই। তাদের লাভ দ্বিবিধ --- এক. শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের বোঝাটা মাথার ওপর থেকে যতটা সম্ভব হালকা করা এবং দুই. ব্যবসাদারদের লাভের বখরা।
খেয়াল করে দেখেছেন কি, এই ডামাডোলের বাজারে, সুপ্রীম কোর্টের রায় নিয়ে এরকম একটা চরম উত্তপ্ত পরিস্থিতে সাংবাদিক সম্মেলন করতে বসেও মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী টুক করে গরমের ছুটি বাড়িয়ে দেবার ঘোষণাটি করে দিতে ভোলেন না। এখনও সেরকম গরম আদৌ পড়েনি এবং দুদিন আগেই মধ্যশিক্ষা পর্ষদের চেয়ারম্যান এ বছর অতিরিক্ত গরমের ছুটি দেবার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তাতে কী? শাসককে ব্যবহার করেই শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে অন্তর্ঘাতটা চালিয়ে যেতেই হবে। ঠিক যেমন কোভিড পর্বে সবচেয়ে বেশিদিন স্কুল বন্ধ ছিল আমাদের রাজ্যে, ঠিক যেমন স্বাস্থ্যসাথী বিমার ব্যবস্থা করে অন্তত এক তৃতীয়াংশ রুগীকে বেসরকারী হাসপাতালে ঠেলে দেওয়া গেছে। কমে গেছে পরিকাঠামো ও আনুষাঙ্গিক অনেক খরচ। লাভ বেড়েছে বেসরকারী হাসপাতালের।
খাস কলকাতার শিক্ষার বাজারটা মোটামুটি বাম আমলেই চলে গিয়েছিল এই সব বিনিয়োগকারীদের হাতে। তৃণমূল আমলে তা আড়ে-বহরে বেড়েছে অনেক। ধরে নিয়েছে মফস্বলের ছোট-বড় শহরগুলোকেও। দুর্গাপুর, বহরমপুর বা জলপাইগুড়ির মত বড় শহর ছেড়ে এখন তা বারাকপুর, আমতা, উলুবেড়িয়া, মগরা বা আলিপুরদুয়ারের মত ছোট টাউনেও জাল ছড়াচ্ছে। একটু নজর করলেই দেখা যাবে, আজকাল এসব জায়গাতেও অজস্র সেন্ট নামধারী, ওয়ার্ল্ড স্কুল নামধারী, পাবলিক স্কুল নামধারী অজস্র স্কুল গজিয়ে উঠছে। আর তৈরি হচ্ছে অসংখ্য বেসরকারী ইঞ্জিনিয়ারিং আর মেডিকেল কলেজ।
কিন্তু শুধু কারখানা বানালেই তো চলবে না, উৎপন্ন দ্রব্যটিকে তো মানুষের হাতে গছাতে হবে। তার জন্য চাই বিজ্ঞাপন। না, এসব স্কুল-কলেজের বিজ্ঞাপন সেভাবে খবরের কাগজে বা টিভিতে দেওয়া হয় না। এদের বিজ্ঞাপন-কৌশল কিঞ্চিৎ অন্যরকম – আপনার চোখের সামনে দিয়ে এই সবপড়ুয়ারা দামী ও সুদৃশ্য ইউনিফর্ম পরে, গলায় টাই আর আইডেন্টটিটি কার্ড ঝুলিয়ে, ঝাঁ চকচকে হলুদ রঙের বাসের চেপে স্কুলে যায়। দেখে, ক্ষমতাহীনের চোখ টনটন করে ওঠে। তাঁরাও মরিয়া হয়ে ওঠেন নিজের সন্তানকে এরকম কোনো স্কুলে পড়ানোর জন্য। এদের পাশে বিবর্ণ মলিন পোশাক আর জুতোর বদলে হাওয়াই চটি পরা সরকারী স্কুলের বাচ্চাদের রাস্তার ধার দিয়ে হেটে যাবার ছবি সেই সে বাসনাকে আরও উদ্গ্র করে তোলে। এই তো সেই বিজ্ঞাপনের মহিমা, যা আপনাকে লেবুর জল ছেড়ে ঠাণ্ডা-পানীয় কিনতে বাধ্য করে।
এ প্রসঙ্গেই একটা মজার গল্প না বলে পারছি না। লোকাল ট্রেনের সহযাত্রী একদল প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারমশাই আর দিদিমণির মুখে শুনছিলাম, ইদানীং প্রতিবছরই নাকি ছাত্রসংখ্যা মোটামুটি দশ শতাংশ করে কমে যাচ্চে। ওঁরা যেসব স্কুলে পড়ান, সেগুলো প্রায় সবই অনেকটা ভিতরের দিকে, একেবারেই প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানে তো বেসরকারী স্কুলের প্রতাপ নেই বলেই জানতাম। তাহলে? প্রশ্ন শুনে ওঁরা হাসলেন, বড়ই ম্লান, বড়ই বিষন্ন সে হাসি। বললেন, সেদিন আর নেই দাদা। যত প্রত্যন্ত গ্রামই হোক না কেন, সর্বত্রই এখন ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠছে অজস্র নার্সারী আর প্রাইমারি স্কুল। আর এদের ব্যবসার প্রধান ভরসা কী জানেন? ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা আসে সরাসরি মায়েদের হাতে, আরে মেয়েদের সাংসারিক বুদ্ধি যে পুরুষের থেকে অনেক বেশি তা ইতিমধ্যেই একাধিক নোবেলজয়ী গবেষণায় প্রমাণিত। কাজেই এতে আশ্চর্যের কিছুই নেই যে, মহিলারা ওই টাকার একটা অংশ ছেলে বা মেয়ের পড়াশুনার জন্য ব্যয় করতে চাইবেন। এটা তাদের কাছে খুব বড় একটা স্বপ্নকে সফল করার জন্য জীবনপণ লড়াই। সচরাচর এই সব ছোট ছোট স্কুলগুলোর বেতন হয় মাসে তিন-চারশো টাকার মত। বছরের শুরুতে ভর্তি আর বইপত্র বাবদ হাজার দুয়েক টাকা নেওয়া হয়। ব্যস। এটুকু মহিলারা ইদানীং স্বচ্ছন্দেই দিতে পারছেন। খোঁজ নিলে দেখবেন, এসব স্কুলে কিন্তু শিক্ষার পরিকাঠামো বলতে প্রায় কিছুই থাকে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্কুলবাড়িটিও কোনো গৃহস্থবাড়ি ভাড়া নিয়ে তৈরি হয়। পর্যাপ্ত আলো হাওয়া, উপযুক্ত শিখন সামগ্রী বা সঠিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক – কিছুই এদের থাকে না। কিন্তু সেই অভাবগুলো এরা ঢেকে দেয় ঝকঝকে ইউনিফর্ম, ইংরেজি বোলচাল ইত্যাদি বহিরঙ্গের জাঁকজমক দিয়ে। গ্রামগঞ্জের অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত অভিভাবকেরা তাতেই বেজায় খুশি। এটা আলাদা কথা যে আমার সেই সহযাত্রীরা যে সরকারী স্কুলগুলোতে পড়ান, সেখানে ওইরকম চাকচিক্য বা পরিকাঠামো কিছুই থাকে না। এ রাজ্যের সরকারী স্কুলগুলোকে এক অদ্ভুত ‘নেই-রাজ্য’ বানিয়ে রাখা হয়েছে অনেকদিন ধরেই। ইদানীং তো কম্পোজিট গ্রান্টের টাকাটুকুও প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এবার বোঝা যাচ্ছে, কত শাসক-বানিয়ার যৌথ উদ্যোগে বিচিত্র পদ্ধতিতে ধ্বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে সরকারী শিক্ষাব্যবস্থাকে?
পূর্বোক্ত বিভিন্ন শিল্পপতি গোষ্ঠীর সেন্ট বা পাবলিক নামধারী বড় বড় স্কুলগুলো যদি হয় বৃহৎ শিল্প, তবে ওইসব ছোটছোট নার্সারী স্কুলগুলোকে বলা যেতে পারে অনুসারী শিল্প। ঠিক যেমনটা দেখা যায় স্বাস্থ্যেও। আপনার এলাকায় সম্প্রতি তৈরি হওয়া ছোটখাটো নার্সিং হোম আর প্যাথোলজি ল্যাবগুলোর কথা মনে করুন, দিব্য ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন।
৩.
আমি জানি এই ধ্বংসের দায়ভাগে
আমরা দুজনে সমান অংশীদার
অপরে পাওনা আদায় করেছে আগে
আমাদের পরে দেনা শোধবার ভার
---- উটপাখি (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত)
মজার ব্যাপার হল, এই বিরাট বাণিজ্যচক্রে সবার লভ্যাংশ আছে। সব্বার।
যত স্ক্যাম, যত দুর্নীতি, শাসকের তত পকেট ভারি। সেই শাসক কখনো ‘বর্তমানের’, কখনো বা ‘ভবিষ্যতের’’। কারণ ব্যবসাদারদের সবার আগে যুগের হাওয়া বুঝতে হয় এবং সেই মত গদীয়ান সরকারপক্ষকে ছেড়ে সম্ভাবনাময় বিরোধী পক্ষের হাত ধরে নিতে হয়। এটুকু দূরদৃষ্টি ছাড়া ব্যবসা হয় না। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষ সব সময় চায় গরম গরম ইস্যু। একটা আর জি কর কাণ্ড অথবা আদালতের এই রকম একটা ভয়ঙ্কর রায় মানেই সরকার ফেলে দেওয়ার এক-একটা সুবর্ণ সুযোগ। ছাব্বিশ হাজার শিক্ষকের এই পুরো প্যানেলটাই বাতিল হোক – এটা এ রাজ্যের যে দুজন লোক সবচেয়ে আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন এবং সেই মর্মে ক্রমাগত আদালত এবং আদালতের বাইরে সওয়াল করে গেছেন তারা হলেন বিকাশ ভট্টাচার্য এবং শুভেন্দু অধিকারী।
তবে কিনা, ওই দুজনও পলিটিক্যাল ডিভিডেন্টের ছোটখাটো অংশীদার। সবার আড়ালে এ রাজ্যের শাসনক্ষমতা দখলের জন্য সেই ব্যবসাদারদেরই দেওয়া টাকার থলি নিয়ে বসে আছেন কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। তার জন্য – রামমন্দির সাক্ষী -- প্রয়োজনমত একটা-দুটো আদালতের রায় নিজের পক্ষে টেনে নিতে তাদের খুব একটা বিবেকে বাঁধে না। বিচারবিভাগও আমাদের গঙ্গাজলে ধোয়া তুলসীপাতা নেই আর। সুপ্রীম কোর্টের মহামান্য বিচারপতিদের বাড়ি থেকেও আজকাল বান্ডিল বান্ডিল নোট পাওয়া যাচ্ছে, দুমদাম চাকরি ছেড়ে দিয়ে তাঁরা লোকসভার ভোটে দাঁড়িয়ে পড়ছেন, জিতেও যাচ্ছেন পটাপট। অবসরের পর তাদের অনেকেই আবার রাজ্যসভার সদস্যপদও পেয়ে যাচ্চেন। তেমন তেমন একটা-দুটো ‘রায়দানের’ পর তাদের অনেককেই কোটি টাকা দামের বিদেশী গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে। তাই সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে লঙ্ঘন করে এমন রায়-টায়ও আজকাল হামেশাই বেরিয়ে যাচ্ছে তাঁদের কলমের ডগা দিয়ে। অন্যদিকে মিডিয়াও এ খেলার বাইরে নেই। লাভের গুড়ের একটা বড় অংশ যাচ্ছে তাদের ঘরেও। এরকম এক-একটা ‘ব্রেকিং নিউজ’ মানেই টি আর পি-র গ্রাফ উর্ধ্বগামী। মানে ব্যবসাদারদের আরও বিজ্ঞাপন দেবার সুযোগ, আরও লাভ। ওই যে বলে না, প্রবলেম ইজ দ্য সলিউশন, সলিউশন ইজ দ্য প্রবলেম – এ হল সেই কেস।
অলস অকর্মণ্য সারাদিন ঘাড় গুঁজে মোবাইলে আঙুল চালানো নিধিরাম সর্দারদের দলও ভারি খুশি, বেশ কয়েকদিন ধরে রগড়াবার মত ইস্যু তারা পেয়ে গেছেন। তারা ওটুকুতেই খুশি। বড় বড় ন্যারেটিভ নামাবার মত ‘বিতর্কিত বিষয়’ ছাড়া তাদের আর কিছুই চাই না। পরোক্ষভাবে লভ্যাংশ পান সরকারী স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও। মুখে যাই বলুন, তাদের বেশিরভাগই অবচেতনে চান ছাত্রসংখ্যা কমুক, চাপ কমুক কাজের। যত কম খেটে যত বেশি মাইনে পাওয়া যায় ততই মঙ্গল। (দাঁড়ান দাঁড়ান, আগেই চেঁচাবেন না স্যর, একবারটি ফেসবুকে শিক্ষকদের পেজগুলোতে ঘুরে আসুন। দেখবেন ইতিমধ্যেই গরমের ছুটির দাবিতে কী রকম হাউমাউ শুরু করেছেন আমাদের কর্মবীর শিক্ষক সমাজ।) ঠিক এভাবেই ভিতরের লোকগুলোকে ফাঁকিবাজির নাড়ু খাইয়ে কিছুদিন আগেই লাটে তুলে দেওয়া হয়েছিল সরকারী টেলিকম সংস্থাটিকে, মনে পড়ে সেকথা? পশ্চিমবঙ্গের সরকারী শিক্ষকসমাজ হল সেই কালিদাসের দল, যারা নিজেদের জীবিকার গোড়ায় নিজেরাই প্রতিনিয়ত কোপ মেরে চলেছেন। যেকোনো সরকারী স্কুলের টিচার্স রুমে ঢুকে দেখুন, দেখবেন একদল লোক নিজেদের মধ্যে অনেকগুলো দল বানিয়ে সারাদিন কোন্দল চালাচ্ছেন। এই ডামাডোলে লাভবান ছাত্রসমাজও। যত নামছে সরকারী শিক্ষার মান, তত বাড়ছে পাশের হার, বাড়ছে নাম্বারে ভর্তুকি, বাড়ছে বিলকুল পড়াশুনা না করেও ‘শিক্ষিত’ তকমা পেয়ে যাবার সুযোগ। তাদের আর এর থেকে বেশি চাহিদা কী-ই বা ছিল?
গতকাল সান্ধ্য আড্ডায় জনৈক বন্ধু বিষণ্ণ মুখে জানতে চাইলেন, ‘হ্যাঁরে, কী মনে হয়, এই ছাব্বিশ হাজার শিক্ষক চাকরি ফিরে পাবেন?’ ম্লান হেসে বললাম, ‘জানি না রে। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত জানি যে এর ফলে আমাদের সরকারী শিক্ষা-ব্যবস্থা যে মর্যাদা হারাল, তা আর কোনোদিন ফিরে পাবে না’।
অতএব হে কলমচি অর্জুন, সংবরণ করো তোমার কলম। আর কাকেই বা আহত করবে তুমি ওই কলমের ঘায়ে? সবাই যে যার তালে আছে, সবাই যে যার লাভটুকু চুপচাপ পকেটস্থ করছে, এই বিরাট খেলায় তুমিও নিমিত্ত মাত্র, যাকে যার মারবার তাকে তিনি মেরেই রেখেছেন। বিগত পনেরো বছরে উক্ত বেওসারদার এবং এ রাজ্যের বর্তমান সরকার পরস্পরকে চিবিয়ে চুষে একেবারে ছিবড়ে করে ফেলেছে। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের ব্যবসা দুটো প্রায় স্যাচুরেশন লেভেলে পৌঁছে গেছে। এখন অন্য কোনো বড় ব্যবসা বা শিল্প দাঁড় না করালেই নয়। কিন্তু মাননীয়া যতদিন গদিতে আছেন, তা আর হবার নয়, তাও তাঁরা দিব্য্ বুঝে গেছহেন। এ রাজ্যে বিনিয়োগ মানে এখন দাঁড়িয়েছে কিছু হাঁ হয়ে থাকা মুখের গর্তে ক্রমাগত টাকা ঢেলে চলা। শুধু দাও আর দাও। ঘরে ফেরত আসে না প্রায় কিছুই। অতএব এবার গুজরাটি ‘মোটাভাই’-কে একটা সুযোগ দিয়ে দেখা যাক। তাই খেলা ঘুরছে, তাই ফাস্ট ছেড়ে এখন শুরু হয়েছে স্পিন বোলিং। আসন্ন ছাব্বিশে পলাশীর দ্বিতীয় যুদ্ধ।
৪.
আজকে রাতে চামচিকে আর পেঁচারা
আসবে সবাই মরবে ইঁদুর বেচারা।
--- হ-য-ব-র-ল (সুকুমার রায়)
এ রাজ্যের সরকারী স্বাস্থ্য আর শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্জলী যাত্রা শুরু হয়ে গেছে, এখন শুধু মুখে গঙ্গাজলটুকু পড়ার অপেক্ষা