একদিকে সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েরা সংসার চালানোর জন্য সকালসন্ধ্যা মুখে রক্ত তুলে পরিশ্রম করছে, অন্যদিকে নেতাদের সম্পত্তি ক্রমশ স্ফীততর হয়ে চলেছে!
বছরের পর বছর কোনো পরীক্ষা নেই, কোনো যথাযথ নিয়োগপ্রক্রিয়া নেই!
তৃতীয় বিশ্বের দেশে সাধারণ মানুষের জীবন!
সংবাদপত্রের প্রতিবেদন।
--------------------------------------------------------------------
ইংরেজি, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রী ব্যাগে, হাতে টোটোর হ্যান্ডেল, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজপথ টোটোর সিটে বসে স্বপ্নের মৃত্যু...
কাগজে কলমে ওঁরা শিক্ষিত । স্নাতক, কেউ বা স্নাতকোত্তর । ক্লাস ঘরের বেঞ্চিতে বসে যারা একদিন রাষ্ট্র, সমাজ, সাহিত্য আর মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজ তাদের জীবনের চাকা ঘোরে টোটোর ব্যাটারিতে । রোজ সকালে সেই ব্যাটারি চার্জ দিতে দিতে যেন নিজের বুকের ভেতরের স্বপ্নগুলোকেও চার্জ দিয়ে তোলেন তাঁরা।
প্রদীপ চৌধুরী রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স পাশ করেছিলেন । বইয়ের পাতায় লেখা সংবিধান, অধিকার, ন্যায়, সবই মুখস্থ ছিল তাঁর । কিন্তু বাস্তবের সংবিধানে তাঁর জন্য কোনও চাকরির ধারা ছিল না। ২০১৪ সালের সেই ডিগ্রি আজ আলমারির এক কোণে রাখা । রাস্তায় নামলে কেউ আর তাঁকে ‘রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র’ বলে চেনে না, চেনে শুধু ‘টোটোওয়ালা’ ভাই হিসেবে । তবু প্রদীপ হার মানেননি । বুক চিতিয়ে বলছেন, এই টোটোই আজ তাঁর লড়াইয়ের অস্ত্র । কিন্তু যখন কোনও সওয়ারি তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে, তখন বুকের ভেতর কোথাও একটা শব্দ করে ভেঙে যায় কিছু।
রুমা সাহার গল্প আরও ভারী। বাংলায় অনার্স নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেছিলেন । সংসার হয়েছিল, স্বপ্নও ছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন স্বামী চলে গেলেন চিরতরে। রেখে গেলেন তিন বছরের একটা ছেলে আর অসীম অন্ধকার। সেই অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে রুমা ভাবলেন, কী করে বাঁচাবেন সন্তানকে ? কার কাছে হাত পাতবেন ? শেষমেশ ভাড়ার টোটো নিয়ে রাস্তায় নামলেন । দিনে পাঁচ-ছয়শো টাকা রোজগার । ওই টাকাতেই ছেলের স্কুল, দুধ, ওষুধ।
কিন্তু রাস্তায় নামলেই সব যুদ্ধ শেষ হয় না। মেয়ে হয়ে টোটো চালানোর দাম দিতে হয় প্রতিদিন। কটূক্তি, কুদৃষ্টি, নোংরা প্রস্তাব, সবই সহ্য করতে হয়। রুমা বলেন, “একদিন একজন ইচ্ছে করেই পাশে বসতে চাইছিল । বুঝেছিলাম উদ্দেশ্য ভালো নয়। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে নামতে বললাম। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, আমি কি শুধু চালক, না মানুষও?”
চন্দন চৌধুরী বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলা বিভাগে মাস্টার্স করেছেন। কত পরীক্ষা দিলেন, কত ফর্ম ভরলেন সব ব্যর্থ। আজ তাঁর সংসার চলে টোটোর আয়েই। দিনে সাত-আটশো টাকা। ওই টাকাতেই ভাত, বিদ্যুৎ, বেঁচে থাকা। কিন্তু চন্দন সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান তখনই, যখন অপমান আসে সেই সব মানুষের কাছ থেকে, যাঁদের সঙ্গে শিক্ষার কোনও সম্পর্কই নেই । তিনি বলেন, “চাকরি পাইনি বলে এই পেশা বেছেছি । কিন্তু আত্মসম্মান তো বন্ধক রাখিনি।"
মহেশ্বর দেবনাথ ইংরেজিতে এমএ পাশ করে একদিন কলকাতায় চাকরি করতেন। করোনায় সব শেষ। শহরের চাকরি, সম্মান, সব হারিয়ে আজ টোটোই তাঁর ভরসা। সকালে কয়েকজন পড়ুয়াকে টিউশন, তারপর টোটো চালানো, সন্ধ্যায় আবার টিউশন। এইভাবেই দিন কাটে। ক্লান্ত শরীরে রাতে ঘুমোতে গেলে ভাবেন, এই কি ছিল জীবনের লক্ষ্য ?
তবু ওঁরা কেউ হাল ছাড়েননি। প্রতিদিন রাস্তায় নেমে লড়ছেন । কেউ চোখে চোখ রেখে কথা বললে বুকটা একটু হালকা হয়। কোনও সাহিত্যিক, চিকিৎসক, শিল্পীর সহানুভূতির দুটো কথা পেলে মনে হয়, সব মানুষ এক রকম নয়।
এই টোটোগুলোর শব্দের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক একটা ভাঙা স্বপ্ন, এক একটা অসমাপ্ত গল্প। আমরা যারা সওয়ারি হয়ে বসি, হয়তো তাড়াহুড়োয় বুঝতেই পারি না, আমাদের সামনের সিটে বসে থাকা মানুষটা একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, স্বপ্ন দেখতেন, সমাজ বদলাতে চাইতেন। আজ শুধু বাঁচতে চান।
টোটোর চাকা ঘোরে। সঙ্গে ঘোরে তাঁদের জীবন ।
কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়, এত পড়াশোনা, এত মেধা, এত পরিশ্রম, এর শেষ ঠিকানাই কি টোটোর সিট ? অথচ ফোর পাসও নয়, মূর্খ নেতা-মন্ত্রী এবং তাদের ছেলেমেয়েদের ঘরে টাকার, সম্পদের পাহাড় জমে যাচ্ছে। আমাদের এ অরাজকতার অবস্থা, ব্যবস্থা কবে শেষ হবে, নাকি এর শেষ নেই ? আমরা কী নিরুপায় হয়ে যাচ্ছি? বেকারত্ব না ঘুচিয়ে প্রতিদিন মন্দির মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছি।