এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বয়ে চলা স্রোত ও নোনা জলের আখ্যান 

    Somnath mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • বয়ে চলা স্রোত ও নোনা জলের আখ্যান 
     
    সমুদ্রের জলমাত্র‌ই নোনতা ; অবশ্য এই লবণতার পরিমাণে রকমফের আছে। পৃথিবীর দুই মেরুর দিকে গেলে এই লবণের মাত্রা অনেকটাই কম, আবার ক্রান্তীয় অঞ্চলের নিম্ন আক্ষাংশিক পরিসরে সমুদ্রের জল অনেক বেশি লবণাক্ত। উষ্ণতার সঙ্গে এই লবণতার একটা ধনাত্মক সম্পর্ক আছে – উষ্ণতা বাড়লে জলের লবণতার পরিমাণ বাড়ে, উষ্ণতা কমলে জলের লবণাক্ততা কমে যায়। এই নিয়মের ব্যতিক্রম‌ও আছে। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা গেছে যে,সমুদ্রের জলে প্রায় ৪০ রকমের লবণ মিশে আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে মেলে NaCl বা সোডিয়াম ক্লোরাইড। এই লবণ‌ই আমাদের খাবার পাতে, রান্নাঘরে ব্যবহার করা হয়। পৃথিবীর চারভাগের তিন ভাগ জুড়ে থাকা সমুদ্রের জলরাশির মধ্যে দ্রবীভূত হয়ে আছে এইসব লবণের বিরাট ভাণ্ডার যা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
     
    সূচনার এইসব মিঠে কথার আড়ালেই অবশ্য লুকিয়ে আছে আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু। আমাদের দেশ ভারতবর্ষকে তিন দিক জুড়ে ঘিরে রয়েছে ইন্ডিয়ান ওশান বা ভারত মহাসাগরের বিস্তির্ণ জলরাশি। বহুদিন ধরেই একথা আমরা জানি যে ভারত মহাসাগরের জল অত্যন্ত লবণাক্ত। তবে খুব সম্প্রতি এই ধারণার পরিবর্তন ঘটছে এক নিবিড় সমীক্ষার সূত্রে। গবেষকদের মতে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের বেশ কিছু এলাকায় বিগত ৬০ বছর ধরে জলের লবণতার পরিমাণ ক্রমশ কমছে। 
     
    প্রশ্ন হলো কতটা কমলো? এই প্রশ্নের উত্তরে গবেষকরা জানিয়েছেন যে আগের তুলনায় গড়পড়তা প্রায় ৩০% কমে গেছে জলের লবণতার মাত্রা। আপাতদৃষ্টিতে খুব বড়ো রকমের পরিবর্তন বলে মনে না হলেও , একথা আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে এই কমে যাওয়ার বিষয়টি সংলগ্ন এলাকায় সামুদ্রিক প্রভাবের ক্ষেত্রে বড়ো রকমের হেরফের ঘটাতে পারে। 
     
     একথা হয়তো জানা আছে যে সমুদ্র জলের এই লবণতার তারতম্য স্রোতের আকারে সমুদ্রের জলরাশির সঞ্চালন, বৃষ্টিপাত, জলবায়ুর প্রকৃতি তথা সমুদ্রে বসবাসকারী অসংখ্য প্রাণিদের জীবনকে প্রভাবিত করে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছেন যে সাগরজলের লবণতার মাত্রায় এই পরিবর্তন সংলগ্ন দেশগুলোর ওপর বিশেষভাবে ভারতবর্ষের জলবায়ু তথা জনজীবনের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। লবণতার মাত্রায় এমন পরিবর্তনের কারণে প্রভাব পড়তে পারে ভারতের মৌসুমী বায়ুর আসা যাওয়ার ওপর, উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ুর ওপর,এমনকি মাছের জোগানেও টান পড়তে পারে।
     
    এমন সব সম্ভাব্য প্রভাবের কথা জানিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। “One of the saltiest parts of the ocean is getting fresher”-- শীর্ষক গবেষণাপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম প্রান্ত সীমায় অবস্থিত দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের জল অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তার লবণতার মাত্রা হারিয়ে ফেলছে। পরিবর্তন সম্পর্কে নিশ্চিত হবার জন্য বিজ্ঞানীরা লাগাতার বিষয়টির ওপর নজর রাখছেন। পূর্ববর্তী তথ্য অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাংশের জল অন্যান্য এলাকার তুলনায় অনেকটাই বেশি লবণাক্ত। লবণের মাত্রা বেশি হ‌ওয়ায় এই অংশে জলের ঘনত্ব তুলনায় বেশি। এই বিষয়টি জাহাজ চলাচলের সময় নাবিকদের নজরে আসে। তবে এখন বিস্তারিত ভাবে পরীক্ষার পর বিষয়টিকে নিশ্চিত করেছেন তাঁরা। তাঁদের মতে এই অঞ্চলের সমুদ্র জলের সঙ্গে টাটকা জল এসে মিশছে যা দ্রবীভূত লবণের মাত্রায় হেরফের ঘটাচ্ছে। এই জল আসছে কোথা থেকে? এর‌ও সম্ভাব্য উত্তর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের অনুমান, নিকটবর্তী Lake Tahoe থেকে প্রতিবছর হ্রদের ৬০% জল এসে মিশছে সমুদ্রের জলে।
     
    নাছোড়বান্দা গবেষকরা কখনো বয়ার ওপরে যন্ত্রপাতি বসিয়ে, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অথবা জাহাজের ওপর সেন্সর লাগিয়ে এই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। সংগৃহীত তথ্য ভান্ডারকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা যে মডেল প্রস্তুত করেছেন তার ভিত্তিতে তাঁরা এই বিষয়ে নিশ্চিত যে নতুন করে সমুদ্র জলের জোগান বেড়েছে। এরফলে পরিবর্তন ঘটেছে সমুদ্রের ওপর দিয়ে প্রবহমান বায়ু এবং জলরাশির সঞ্চালনায়।এ সবই বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে ঘটছে। এই কারণে এই অঞ্চলের জলরাশি নতুন পথে প্রবাহিত হচ্ছে যা আমাদের পূর্ববর্তী ধারণাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে।
     
    তাঁরা আরও জানিয়েছেন যে, ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলের জল আরও দক্ষিণে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের দিকে সঞ্চালিত হচ্ছে নিয়মিত ভাবে। এই কারণে ওই অংশের জলের লবণতার পরিমাণ ক্রমশ কমছে যদিও এই জল ঘন এবং ভারী। অধিক লবণযুক্ত জল ভারী হবার দরুন ডুবে যায়, অন্য দিকে টাটকা জল ওপরের অংশে ভাসতে থাকে। কোনো কারণে এই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলে তা সমুদ্র জলের প্রবাহকে প্রভাবিত করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে এর প্রভাব পড়বে পৃথিবীর জলবায়ুর চলতি শৃঙ্খলার ওপর। এমন ঘটনা যেহেতু সমুদ্রের জলে ঘটছে সেহেতু তার প্রতিক্রিয়া কেবল স্থানীয়ভাবে ঘটবে এমনটা নয়, প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক স্তরে। এই কারণেই কপালে ভাঁজ পড়েছে আবহবিজ্ঞানীদের।
     
    একথা ভুললে চলবে না যে ভারত মহাসাগর হলো মৌসুমী বায়ুর আঁতুরঘর। এখানেই জন্ম হয় বিপুল বৃষ্টিবাহী মৌসুমী বায়ুর যা ভারতবর্ষ সহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বর্ষা নিয়ে আসে। আজ যদি স্রোত চলাচলে কোনো রকম পরিবর্তন ঘটে তাহলে তা মৌসুমী বৃষ্টিপাতের চরিত্রে বড়ো রকমের বদল আনবে। এরফলে অতিবৃষ্টি, স্বল্প বৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। 
     
    স্রোতের গতিপথের পরিবর্তন এই অঞ্চলের সম্ভাবনাময় মৎস্য আহরণ শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জলের রাসায়নিক ধর্মের পরিবর্তন এই অঞ্চলের সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করে ফেললে প্লাঙ্কটনের জোগানে প্রভাব ফেলবে,ফলে কমবে মাছের সরবরাহ। উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী মৎস্যজীবী মানুষদের জীবনে এর গভীর প্রভাব পড়বে।
     
    লবণতার মাত্রায় পরিবর্তন হলে তার প্রভাব হবে গভীর এবং সুদূরপ্রসারী। শুধুমাত্র ভারতেই এর প্রভাব সীমিত থাকবে না, ইউরোপ ও আফ্রিকার জলবায়ুর ওপর‌ও এই বদলের স্পষ্ট ছাপ পড়বে। মাথায় রাখতে হবে যে পৃথিবীর জলরাশির কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। এর দরুণ জলভাগের যে কোনো একটি অংশের পরিবর্তন অন্যান্য এলাকার ওপরে‌ও ছাপ ফেলবে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে পৃথিবীর সুবিশাল জলভাগের ওপর যে কোনো ধরনের পরিবর্তনের প্রভাব হবে মারাত্মক। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য।
     
    জলের সমস্যা বাড়ছে দ্রুত গতিতে। বাড়ছে জলের উষ্ণতা, জলের জোগান, লবণের পরিমাণ, দূষণের কারণে জলের অম্লত্ব – এসবের পেছনে মনুষ্য জাতির ভূমিকা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক রয়েছেন, সতর্ক থাকতে হবে আমাদের‌ও। মনে রাখতে হবে জল ও স্থলের পরিবেশের সমতার ওপর নির্ভর করছে পৃথিবীর তথা প্রাণিজগতের অস্তিত্ব।
     
    তথ্যসূত্র 
    Times of India 
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক প্রতিক্রিয়া দিন