হরমুজের জাঁতাকলে হ য ব র ল: বিবর্তনের এক ‘স্মার্ট’ প্রহসন
বিবর্তনের চকমকি পাথর ঘষা সেই আদিম গুহামানব আজ বেঁচে থাকলে আমাদের এই ‘গ্যাস-সংকট’ দেখে নির্ঘাত শিউরে উঠতেন। চার্লস ডারউইন হয়তো তাঁর লম্বা দাড়ি চুলকে যোগ করতেন, "বিবর্তন মানে তো খাপ খাইয়ে নেওয়া! কিন্তু এই 'হোমো সেপিয়েন্স'রা তো বিবর্তিত হতে হতে উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করেছে।" যে প্রজাতি একসময় বনের শুকনো ডাল দিয়ে আগুন জ্বেলে টিকে ছিল, তারা আজ পঁচিশ দিনের গ্যাস ডিলারের দোকানের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে বিলুপ্ত হওয়ার ভয়ে কাঁপছে। একে 'সার্ভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট' না বলে 'সার্ভাইভাল অফ দ্য বুকড' বলাই ভালো।
এই চরম সংকটে সেন্টিনেলিজরাই আসলে বিবর্তনের আসল চ্যাম্পিয়ন। তাদের জীবন কোনো সুলতানের সুলতানি খামখেয়ালির ওপর টিকে নেই। তারা আজও সার্বভৌম স্বনির্ভরতায় মাছ পুড়িয়ে খাচ্ছে, আর আরচোখে তাকিয়ে তাকিয়ে উপভোগ করছে আর মনে মনে বলছে যে তোদের মহাকাশ জয়ের যে অতো দম্ভ দেখাস! সেসব কোথায় গেল? ওদিকে রান্নাঘরের আগুনটুকুও রক্ষা করবার মুরোদ নেই দেখছি তোদের , আবার আমাদেরকে অসভ্য বলিস! অ্যারিস্টটলের ‘সামাজিক জীব’ আজ সিলিন্ডারের লাইনে দাঁড়িয়ে আসলে নিজের পঙ্গুত্বই মাপছে। দার্শনিক হয়তো এক চিলতে হাসি নিয়ে লিখতেন, "সিলিন্ডারহীন মানুষ কেবল এক 'স্মার্ট' উপোস করা প্রাণী। যে আগুন আদিম গুহায় মানুষকে অন্ধকার থেকে টেনে এনেছিল, সেই আগুন আজ হরমুজ প্রণালীর সংকীর্ণ খাড়িতে বন্দি।" আধুনিক মানুষের কাছে 'সুখ' মানে এখন ৫-জি স্মার্টফোনে ভার্চুয়াল বিরিয়ানির ছবি দেখে লালা ঝরানো—এক 'পলিটিক্যাল অ্যানিম্যাল'-এর ট্র্যাজিক কমেডি।
কার্ল মার্কস বেঁচে থাকলে বজ্রনির্ঘোষে বলতেন, “এ তো পুঁজিবাদের চরম সার্কাস! উৎপাদনের উপকরণ (আগুন) আজ শ্রমিকের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সুলতানি খামখেয়ালিতে বন্দি করা হয়েছে।” একেই তিনি বলতেন চরম বিচ্ছিন্নতা। একদিকে বুর্জোয়ারা বলছে তেলেভাজা না খেলে স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে (যা আসলে এক নতুন আফিম!), আর অন্যদিকে পরিবেশবিদরা ওজোন স্তরের দোহাই দিয়ে আমাদের আদিম কয়লা বা কাঠের উনুনে ফেরার পথটিও নৈতিকতার কাঁটাতারে আটকে দিচ্ছেন। পকেটে ৫-জি স্মার্টফোন আর হেঁশেলে ২-জি (২-বেলার রান্নার গ্যাস) খালি সিলিন্ডার—এর চেয়ে বড় শ্রেণি সংগ্রাম আর কী হতে পারে?
এই স্মার্ট অনাহার-কে মহাপ্রভু হয়তো মায়ার এক চরম খেলা হিসেবে দেখতেন। তিনি বলতেন, "রে মূঢ় আধুনিক জীব! তোরা বাইরের আগুনের জন্য হাহাকার করিস, অথচ তোদের ভেতরের ভক্তি-অগ্নি তো কবেই নিভে গিয়েছে! তোরা আসলে মায়াগ্রস্ত।"
রবীন্দ্রনাথ হয়তো ব্যথিত শ্লেষে লিখতেন—
“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির / কিন্তু হাঁড়ির তলায় আগুন নেই, শুধুই চোখের নীর!”
তিনি দেখতেন, ‘সভ্যতার সংকট’ আজ আর দর্শনে নেই, মিশে গেছে খালি সিলিন্ডারের ধাতব হাহাকারে। ওদিকে সুকুমার রায় থাকলে নির্ঘাত ‘খিড়কি দিয়ে উঁকি’ মেরে ছড়া কাটতেন—
“গ্যাস গিয়েছে হরমুজেতে, সুলতান দিয়েছে তালা / ডিজিটাল ইন্ডিয়ায় এখন শুধু উপোস থাকার পালা! / চাল আছে তো ডাল নেই, উনুন গেছে ফেটে— / স্মার্টফোনের স্ক্রিন চিবিয়ে কি আর পেটটি ভরে মোটে ?”
আসল ট্র্যাজেডি হলো আমাদের এই তথাকথিত আধুনিকতা। রাষ্ট্রনায়কদের উন্নয়নের যে ‘রাজপোশাক’ নিয়ে এত দেমাক, হরমুজের এক ঝটকায় তা আজ আদুল গায়ে—অথচ তাঁরা আমাদের বোঝাচ্ছেন যে, ‘নগ্নতাই’ হলো আধুনিক ফ্যাশন! ৫-জি ইন্টারনেটে রান্নার ভিডিও দেখে দিনাতিপাত করা এই ভব্য সভ্যতার চেয়ে কি সেই আদিম আগুনটাই অনেক বেশি মানমর্যাদার ছিল না ?
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।