ড্রয়িংরুমের সেই সেকেলে কাঠের আলমারিটা যেন একটা জীবন্ত ইতিহাস। সেখানে কালিদাসের মেঘদূত থেকে শুরু করে আধুনিক জীবনানন্দ - সবাই এক নিঃশব্দ সখ্যতায় বাস করে। জানলার বাইরে শ্রাবণের মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। আকাশটা ঠিক যেন কোনো পুরনো কালির দোয়াতের মতো নীলচে-কালো। অবিনাশবাবু জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
সপ্তাহখানেক আগে খবরের কাগজে তিনি এক বিচিত্র বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। পাত্রী চাই - কিন্তু কোনো গোত্র নেই, কোনো জাত নেই, কোনো কোষ্ঠীর বালাই নেই। সেখানে শুধু দাবি ছিল এক মানবিক হৃদয়ের, আর বাংলা অভিধানের শব্দের মতো ঋজু এক সুস্থ মনের। পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকানে বসে শিবেনবাবু টিপ্পনী কেটেছিলেন, "অবিনাশের ভীমরতি ধরেছে হে! বিয়ে করতে চায় নাকি সমাজসেবা করতে চায়?"
অবিনাশবাবু সেসব কথায় কর্ণপাত করেননি। তিনি অপেক্ষা করছিলেন। তিনি খুঁজছিলেন এমন একজনকে, যার মনের আয়নায় কোনো প্রথার ধুলো জমেনি।
সপ্তাহখানেক পর একটা চিঠি এলো। খামটা নীল রঙের, কোনো সুগন্ধি নেই, কিন্তু হাতের লেখাটা মুক্তোর মতো পরিষ্কার। প্রেরকের নাম - মৃন্ময়ী। কোনো বাড়তি অলঙ্কার নেই চিঠিতে, শুধু কয়েকটা লাইন:
"আপনার বিজ্ঞাপনটি পড়লাম। আমি কোনো রাজকন্যা নই, অতি সাধারণ এক মফস্বল শহরের মেয়ে। বাংলা অভিধানের শব্দগুলো আমার বড় প্রিয়, কারণ ওগুলো দিয়েই তো আমরা মনের অনুভূতিগুলোকে প্রকাশ করি। তবে আমার কাছে শব্দের চেয়েও বড় হলো সেই স্তব্ধতা, যা দুজন মানুষের মধ্যে সেতু তৈরি করে। আপনি যদি চান, তবে আগামী রবিবার আমাদের দেখা হতে পারে।"
রবিবার বিকেলে গঙ্গার ধারের সেই পুরনো লাইব্রেরির ছাদে অবিনাশবাবু গিয়ে দাঁড়ালেন। নদীটা আজ শান্ত। পড়ন্ত রোদের আলোয় গঙ্গার জলটা যেন সোনা-ঝরা আভার মতো জ্বলছে। তিনি ভাবলেন, মৃন্ময়ী - নামটির মধ্যেই যেন এক পার্থিব ও অপার্থিব মিশ্রণ রয়েছে। মৃন্ময়ী এলেন, পরনে সাদা তসরের শাড়ি, কপালে একটা ছোট্ট কালো টিপ। তাঁর চোখের চাহনিতে উপন্যাসের সেই বিষণ্ণ অথচ বুদ্ধিমতী নায়িকাদের মতো এক গূঢ় রহস্য।
অবিনাশবাবু কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই মৃন্ময়ী শান্ত গলায় বলল, "আপনি এসেছেন? আমি ভাবিনি ওই বিজ্ঞাপনের মানুষটা রক্ত-মাংসের কোনো মানুষ হবে। ভেবেছিলাম ওটা বোধহয় কোনো বিবাগী কবির কল্পনা।"
অবিনাশবাবু মৃদু হাসলেন। "কল্পনা তো বাস্তবেরই এক রঙিন প্রতিচ্ছবি। আপনি কেন এলেন মৃন্ময়ী দেবী?"
মৃন্ময়ী গঙ্গার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝোড়ো বাতাসের দিকে তাকিয়ে বললেন, "মানুষ তো আসলে বংশলতার খাঁচায় বন্দি থাকতে চায় না। কিন্তু খাঁচার বাইরে বেরোনোর সাহস কজনের থাকে? আপনার ঐ বিজ্ঞাপনটা যখন পড়লাম, তখন মনে হলো - এই পৃথিবীতে অন্তত একজন মানুষ তো আছেন, যিনি চামড়ার রঙের চেয়ে চরিত্রের ঔজ্জ্বল্যকে বেশি গুরুত্ব দেন। আমার কাছে শব্দের চেয়েও বড় হলো সেই স্তব্ধতা, যা দুজন মানুষের মধ্যে সেতু তৈরি করে।"
সেদিন তাদের মধ্যে কোনো বৈষয়িক কথা হলো না। কথা হলো সাহিত্য নিয়ে, জীবনের ছোট ছোট দর্শন নিয়ে। মৃন্ময়ী যখন তার গহীন ভাবনার অরণ্যের নির্জনতার কথা বলছিলেন, অবিনাশবাবু মুগ্ধ হয়ে শুনছিলেন। এই মেয়েটির বুদ্ধি তীক্ষ্ণ, অথচ তার কথায় এক ধরনের মরমী মাধুর্য আছে। সে যেন শুধু শব্দের মানে জানে না, শব্দের ভেতরের সেই অব্যক্ত বেদনাটুকুও অনুভব করতে পারে।
গোধূলির আলো ফিকে হয়ে আসছিল। অবিনাশবাবু বললেন, "মৃন্ময়ী দেবী, আমার কাছে একটা পুরনো বাংলা অভিধান আছে। পাতাগুলো একটু হলুদ হয়ে গেছে। আপনি কি সেই অভিধানের নতুন পাতাগুলো উল্টে দেখবেন? আমার ঘরটা খুব শান্ত, কিন্তু সেখানে এক জোড়া মানুষের মনের স্বাস্থ্যের বড় অভাব।"
মৃন্ময়ী কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু তার সিক্ত চোখের পাতায় একবিন্দু জল চিকচিক করে উঠল। এক পরম প্রাপ্তির তৃপ্তি নিয়ে অবিনাশবাবু যখন বাড়ির পথে পা বাড়ালেন, তখন আকাশের অন্ধকার আরও ঘন হয়েছে।
কলিং বেলের আওয়াজ শুনে ভেতর থেকে দরজা খুলে দিলেন এক মধ্যবয়স্কা নারী। সুমিত্রা দেবী - অবিনাশবাবুর স্ত্রী।
সুমিত্রা দেবী টেবিলের ওপর চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে একটু বাঁকা হাসলেন। সেই হাসিতে রাগ নেই, আছে দীর্ঘদিনের অভ্যাসের এক শীতল কৌতুক।
সুমিত্রা দেবী বললেন, "কি গো গবেষক মশাই? আজকের অভিযান কেমন হলো? এবারের পাত্রীটি কি তোমার সেই কাল্পনিক মানবিকতার সংজ্ঞা ছুঁতে পারল?"
অবিনাশবাবু জানলার পাশে গিয়ে বসলেন। তাঁর চোখে তখনো মৃন্ময়ীর সেই স্নিগ্ধ মুখটা লেগে আছে। তিনি ধীর গলায় বললেন, "আজকের মেয়েটি অসাধারণ সুমিত্রা। তাঁর মনের গভীরতা মাপা আমার মতো সাধারণ মানুষের সাধ্য নয়।"
সুমিত্রা দেবী ঘর গুছোতে গুছোতে ম্লান হেসে বললেন, "তাহলে এবারও নতুন এক মানসিকতার মানুষের সঙ্গে আলাপ হলো তো! তোমার এই 'মানুষ নিয়ে গবেষণা' আর কবে শেষ হবে বলো তো? প্রতিবার তুমি খবরের কাগজে ওইরকম বিজ্ঞাপন দাও, অদ্ভুত সব দাবি করো, তারপর এক-একজন সরল মানুষকে নিয়ে এসে তাদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাঁটাছেঁড়া করো। কিন্তু ঘরে ফিরলে তো সেই আমিই থাকি - তোমার সেই পুরনো দিনের সাধারণ স্ত্রী। যার মধ্যে কোনো রোমাঞ্চ নেই, কোনো আধুনিক মনস্তত্ত্ব নেই।"
অবিনাশবাবু কথা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। বাইরে শ্রাবণের ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
সুমিত্রা দেবী বলতে থাকলেন, "মানুষ কি ল্যাবরেটরির কোনো গিনিপিগ অবিনাশ? নাকি অভিধানের কোনো শব্দ? যে তুমি যখন তখন তাঁদের টেনে নিয়ে আসবে তোমার এই বুদ্ধিবৃত্তিক খেলায়? তোমার এই মানুষের মন খোঁজার নেশাটা এবার বন্ধ করো।"
অবিনাশবাবু জানলার কাঁচের ওপর জমে থাকা বৃষ্টির বিন্দুগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মনে হলো, তিনি নিজেই এক গোলকধাঁধায় বন্দি। মৃন্ময়ীর চোখের সেই এক ফোঁটা জল কি তাঁর এই গবেষণার এক সার্থক উপাদান, নাকি এক চরম বিদ্রূপ?
অন্ধকার ঘরে বৃষ্টির শব্দটা আরও তীব্র হয়ে উঠল।
অন্ধকার ঘরে বৃষ্টির শব্দটা আরও তীব্র হয়ে উঠল।
সুমিত্রা দেবী ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় শেষবারের মতো বলে গেলেন, "চা-টা খেয়ে নিও। কাল সকালে আবার নতুন বিজ্ঞাপনের খসড়া লিখতে বসো না যেন!"