১৯৪৫ সালে, একজন ডাচ চিত্রকরকে হিটলারের সেকেন্ড ইন কমান্ড হেরম্যান গোয়েরিং এর কাছে একটি শিল্পকর্ম বিক্রি করার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড।
তবে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে তিনি বলেন যে, চিত্রকর্মটি নকল। চিত্রকরের নাম ছিল হান ভ্যান মিগেরেন।
তিনি ছিলেন এমন একজন চিত্রকর যিনি বিখ্যাত হতে চেয়েছিলেন কিন্তু সুযোগ পাচ্ছিলেন না। ছবি সমালোচকরা তার কাজকে ঘৃণা করত। আর্ট গ্যালারিগুলো তাকে উপেক্ষা করত।
এমনকি আর্ট সংগ্রাহকরাও তাকে এড়িয়ে যেত। তাই তিনি এমন কিছু আঁকার সিদ্ধান্ত নিলেন যা দেখে তারা মুগ্ধ হতে বাধ্য হবে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আরেক বিখ্যাত ডাচ মাস্টার ইয়োহানেস ভার্মিয়ার (Johannes Vermeer) এর জাল ছবি আঁকবেন।
কাজেটি করার জন্য তিনি ছয় বছর ধরে প্রস্তুতি নিলেন। এরপর ৩০০ বছরের পুরনো ক্যানভাস খুঁজে বের করলেন। ভার্মিয়ার যে রং ব্যবহার করতেন, তা তিনি নিজের ল্যাবে তৈরি করলেন। ব্যাজারের লোম দিয়ে সূক্ষ্ম তুলি বানালেন।
তিন শতাব্দীর পুরোনো ভাব ফুটিয়ে তোলার জন্য তিনি তার চিত্রকর্মগুলোকে একটি ওভেনে হালকা সেঁকে নিতেন। ১৯৩৭ সালে, তিনি তার প্রথম জালিয়াতিটি উন্মোচন করেন।
তার ব্রাশ স্ট্রোক এতই নিখুঁত ছিল যে, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ভার্মিয়ার বিশেষজ্ঞরা এটিকে একযোগে একটি অথেনটিক ভার্মিয়ার মাস্টারপিস বলে অভিহিত করলেন।
চিত্রকর্মটি আট বছর ধরে জাদুঘরে টাঙানো ছিল। কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। তিনি গোপনে ছবি আঁকা চালিয়ে গেলেন। ছয়টি নকল ভার্মিয়ার। দুটি নকল ডি হোক। আর্ট গ্যালারি সবগুলো কিনে নিল।
সংগ্রাহকরা সেগুলো নিয়ে মারামারি শুরু করল। তিনি অত্যন্ত ধনী হয়ে উঠলেন। তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো। তিনি তার একটি নকল ভার্মিয়ার হেরমান গোয়েরিং এর কাছে বিক্রি করে দিলেন।
গোয়েরিং ১৩৭টি লুট করা ডাচ ছবির বিনিময়ে এমন একটি ছবি নিলেন যেটি ছিল নকল। যুদ্ধের পরে ডাচ সরকার যখন হারিয়ে যাওয়া শিল্পকর্মের হিসাব মেলাতে বসলো, তখন তারা নকল ভার্মিয়ারটির সূত্র ধরে ভ্যান মিগেরেনকে সনাক্ত করলো।
নাৎসিদের কাছে জাতীয় সম্পদ বিক্রি করার জন্য তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। কেউই বিশ্বাস করেনি যে এটি নকল ছিল। নিজের জীবন বাঁচাতে তাকে প্রমাণ করতে হলো যে, সে একজন প্রতারক।
তাই পুলিশের চোখের সামনেই সে তার জেল সেলে বসে ভার্মিয়ারের আরেকটি ছবি আঁকে। তখন তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ পরিবর্তন করে জালিয়াতি করা হয়। তাকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
দুই মাস পর সে মারা যায়। যে লোকটি বিখ্যাত হতে চেয়েছিল, সে ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত জালিয়াত হয়ে ওঠে। তার জাল করা ছবিগুলোর মূল্য এখন তার আসল ছবিগুলোর চেয়েও অনেক বেশি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই চমৎকার ঘটনা নিয়ে ২০১৯ সালে হলিউডে "The Last Vermeer" নামে একটি চমৎকার ছবি তৈরি হয়। ভ্যান মিগেরেন চরিত্রে গাই পিয়ার্স অনবদ্য অভিনয় করেন।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।