তাঁর প্রিয় আদর্শ ছিলো দেকার্তের সন্দেহবাদ। আজ থেকে একশো বছরের-ও বেশী আগে তিনি শিখিয়েছিলেন, সমাজে ‘নারীর মর্যাদা কতখানি সেইটিই মাপকাঠি সমাজ কতখানি এগিয়েছে তা বোঝার’। এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে তিনি বিশ্বাস করতেন আমাদের সমাজব্যবস্থা এমন-ই ঘুণধরা যাতে একজন লোক স্রেফ আরেকজনকে খাটিয়ে সবটুকু মুনাফা শুষে নিতে পারে, আর সেই চক্রটিকে চালু রাখার জন্য মাঝে মাঝে দরকার হয় যুদ্ধের, দরকার হয় বেকারিত্ব, কর্মহীনতার সঙ্কট। তবুও তার মধ্যে কী করে যেন আশাবাদ ছিলো ধ্বংসস্তূপে চারার মতো, তিনিই ভাবতে পেরেছিলেন, ‘শিশুরাই পারবে তাদের বাপমাকে মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে’।
সভ্যতার যে ইতিহাস পাণ্ডিত্যের চাপে পড়ে হয়ে থেকেছে মানুষের অপরাধ, নির্বুদ্ধিতা, আর দুর্ভাগ্যের তালিকা, অথবা শুধুই কতগুলো সালতারিখ মুখস্থ করে কোনোরকমে খাতায় বমি করে দেওয়ার যন্ত্রণা (“The world is weary of the past, Oh, might it die or rest at last!”), তাকে সেই শেকল থেকেও মুক্ত করেছিলেন তিনি। আমরা সেই পথ ধরেই বুঝতে শিখেছি কীভাবে যুগে যুগে মানুষ কাজ করেছে, কীভাবে সেই কাজের মধ্যে দিয়ে সম্পর্ক তৈরী হয়েছে মানুষের সাথে মানুষের। তাঁর মৃত্যুর পর ফিউনেরালে দাঁড়িয়ে সহকর্মী, সহযোদ্ধা বলেছিলেন যে ইতিহাসের বিবর্তন বোঝার জন্যে ঠিক সেই কাজটাই করেছিলেন তিনি যা প্রকৃতির বিবর্তনের জন্যে করেছিলেন ডারউইন।
তাঁর বৃদ্ধ বয়সে, সূর্য যখন প্রায় অস্তমিত, একদিন তাঁর দেখা হয় ১৮৪৮-এর ব্যারাকের সহযোদ্ধা, পুরোনো বন্ধু হেনরি হাইণ্ডম্যানের সাথে। কথায় কথায় হাইণ্ডম্যান বলে ওঠেন, যত বয়েস বাড়ছে ততো বেশী সহনশীল, ততো বেশী অরাজনৈতিক হয়ে যাচ্ছেন তিনি।
বৃদ্ধ সেই জর্মন ভদ্রলোক চিৎকার করে ওঠেন, "Do you?" "Do you? Well, I do not!"
সত্যিই তো, আজ যখন প্রত্যেকটি মৃত্যুর চুলচেরা রাজনৈতিক হিসেবে মেতে উঠেছি আমরা, প্রাণপণে জাস্টিফাই করে চলেছি অথবা মুখ ঘুরিয়ে থেকেছি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের দৃশ্য থেকে, গণতন্ত্রের অপহরণ দেখেও উল্লাস করছি অথবা সামান্য কান চুলকে বলেছি "অনভিপ্রেত", সত্যিই কি বড্ড বেশী সহনশীল হয়ে গেছি আমরা?
আমরা তার একটা কথাও শুনিনি, এবং কদর্থ করেছি প্রায় প্রত্যেকটি আদর্শের, সহনশীলতার, বহুস্বরের অনুশীলন থেকে দূরে সরে গেছি তার-ই নামের ছায়ায় বসে। আজ তিনি একটি অব্যবহৃত টোটেম বই কিছুই নন।
তবু, দীর্ঘ হতাশ্বাস রাত্রে শোষিত, ক্ষমতাহীন মানুষের প্রব্রজ্যা যে অবুঝ, অন্ধকার পথ ধরে চলেছে আলোর দিকে, সেই পথের শুরুতেই দাঁড়িয়ে থাকা এক দার্শনিক, বিজ্ঞানী এবং কবির আজ, পাঁচ-ই মে, জন্মদিন।
আর ইতিহাসের কী অপরিসীম পরিহাস, আজ-ই বুলডোজার চলছে হগ সায়েবের বাজারে।