এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অপত্য স্নেহ!

    Sobuj Chatterjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২০ বার পঠিত
  • একান্ন বছর পার হলো তুমি নেই।
    তোমার মুখে ই শোনা তোমার জন্ম কথা -
    রূপকথার মতো লাগতো!

    উনিশশো ন'য়ে জন্ম তোমার 
    ন'বছরে বিয়ে; ব্রাক্ষণ কন্যা  বলে কথা! ঘরে রাখা পাপ!

    সামাজিক পাপের হাত ধরে এক আধবুড়ো খামখেয়ালি 
    চাষার ঘর আলো করতে বাধ্য হলে!
    সুন্দরী ছিলে তুমি।
    ভাসুরের কোলে চড়ে উঠেছিলে শ্বশুরবাড়ি;
    সম্পন্ন চাষী পরিবার।

    তবে দেবর ছিল শিক্ষিত; স্টেশন মাস্টার।
    ভাসুর,দেওরের চোখরাঙানি ছিল না। ছিল  স্নেহ আর ভালোবাসা।
     শুধু তোমার সাতপাকে বাঁধা মেজাজি চাষী ভাইএর সাথে দেখা হতো সেই কেরোসিন বাতির আলোয় রাত গভীর হলে।

    অতঃপর সময় নিজের মতো করে গড়িয়ে চললো কিছুদিন। সংসার বুঝতে চেষ্টা করছিল কি চায় তোমার কাছ থেকে।
    তাই আঁটকুরো বদনামের আগেভাগেই তুমি সন্তান ধারণ করলে। তখন তুমি ত্রয়োদশী।
    তবু গোঁয়ারের  মুখে তে হাসি নেই।
    হলো প্রথমে কন্যা সন্তান।
    গোঁয়ারের মুখ ভার!
    সংসারে সমস্ত কাজ সামলাতে তুমি একা
    বালিকা গ্ৰাম্যবধূ।

    তারপর হ'লে পুত্রসন্তানের মা! সেদিন গোঁয়ার দাড়ি কামিয়ে ছিল।

    লম্বা চওড়া মানুষ টা ছিল বেপরোয়া, ভয়ডরহীন।

    তুমি যখন একুশে  রাখলে পা ,কোলে তোমার ছোট ছেলেটি এলো
    আর তোমার সেই চিরসখা, তোমার ঠাকুরদার মতো সোয়ামি, চিরাচরিত ভাবে তোমার কথা না ভেবে তোমাকে ছেড়ে চলে গেল না-ফেরার দেশে।

    শুনতো না কথা কারও, কখনও। শীতের ভোরে গায়ে কিছু না দিয়ে চলে যেত ক্ষেতের কাজ তদারকি করতে।ছিল এক জন্ম চাষা।
    হলো নিউমোনিয়া! তাতে ও ছিল না বিরাম।

    যা হবার তাই হলো।তখন তোমার সবে মাত্র বাইশ বছর!
    ভাগ্যিস সতীদাহ প্রথা তার অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়েছিল। নাহলে তোমাকে পেতাম কি!

    সেয়ানা ভাই,দিদির সম্পত্তি আর গয়নাগাটির সঙ্গে
    তিন ছানাকে সঙ্গে করে  গলসী থেকে কলকাতায এসে উঠলো।
    যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে গিয়েও ব্যাটন দিয়ে গেছে তোমার হাতে , শেষ দৌড়ের জন্য!
    তোমার যুদ্ধ হল শুরু... সে বড় অসম্ভব আর অসম , তোমার একার যুদ্ধ । কঠিন ছিল সামাল দেওয়া! 
    অসহায় বিধবা মেয়েমানুষের  সম্পত্তি বড় লোভনীয়!
    ধীরে ধীরে সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে সংসার বাড়তে লাগলো। মেয়ের বিয়ে হলো দোজবরের সাথে।
    জামাই আর এক বিষাক্ত মনের মানুষ। হলো  তাদের ও পাঁচটি সন্তান । সবাই তোমার আদরের ধন, কেউ ফেলনা নয়। 
    তোমার বড় পুত্রের  বিয়ে হলো তোমাকে না জানিয়ে। অদ্ভুত ভাবে - বর যাত্রী গিয়ে। অনেকটা ঠিক সিনেমারই মতো।
    তোমার জামাই সঙ্গে করে বিয়ে দিয়ে নিয়ে এলো।
    তুমি মাথা ঠুকলে রক্তপাত করলে, অজ্ঞান হ'লে , জ্ঞান  ফিরে এলে সব মেনে নিলে। 
    তাদের চার সন্তান তোমার বংশধর। তাদের পেয়ে তুমি সব ভুলে গেলে। তোমার প্রান জুড়িয়ে গেল।

    তোমার যাবতীয় স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি এদিকে ধীরে ধীরে উবে গেল!-
    তোমারই ভাই আর জামাইয়ের কল্যাণে। 

    তুমি কোনোদিন কোনো অভিযোগ করোনি তাই নিয়ে । দুহাত উজাড় করে খরচা করে যেতে।
    শুধু চেয়ে ছিলে সবাই ভালো থাক।

    রাস্তার লোক ডেকে করতে আলাপ। - তাকে খাইয়ে দাইয়ে চিরকালের বন্ধু করে নিতে ।

    মানুষকে নিঃস্বার্থ ভালোবেসে তুমি নিঃস্ব হতেও রাজি ছিলে।
    শুধু ছোট ছেলের প্রতি তোমার অপত্য স্নেহ ছিল মহাকাব্যিক । এককথায় তুমি ছিলে ধৃতরাষ্ট্রের মতো 
    তাতে তো কারো ভালো হয়না সরযূবালা; হয়ও নি।

    সারা জীবন তোমার লড়াইয়ে কেউ ছিল না সামিল।সবাই সামিল থাকার ভান করতো শুধু।
    যে সন্তানের জন্য তুমি প্রাণপাত করতে তার উশৃঙ্খল জীবন যাপন তার অকাল মৃত্যু ডেকে নিয়ে  আসে। 
     
    মায়ের সেই বুকফাটা আর্তনাদে হৃদকম্পন শুরু সবার। ঘন ঘন অজ্ঞান হতে থাকলে তুমি! 

    সারা জীবন এক নিঃস্বার্থ বিধবার দু্ঃসাহসিক লড়াই কে বিনম্র চিত্তে শ্রদ্ধা জানিয়েও বলতে ইচ্ছে করে,-
    অপত্য স্নেহ কদাচ নয়; কদাপি নয়।
    একান্ন বছর আগে আজকের দিনে চলে যাওয়ার সময় আমাকে বলেছিলে , 'আমি চললাম'!

    হয়তো আমাকে সেই লোকটা মনে মনে ভেবে বসেছিলেন ,যে তাঁকে লড়াইয়ের ময়দানে নামিয়ে, আসছি বলে আর ফিরে আসেনি; চলে গিয়েছিল চিরতরে !!
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে প্রতিক্রিয়া দিন