শোভনলাল তাহার জ্ঞান হইবার পর হইতে তাহাদিগের বনহুগলির বসতবাটীর বসিবার ঘরে রাখা একখানি ঢাউস রেডিওর সহিত পরিচিত ছিল। এবং বাপ খুড়াদিগকে প্রত্যহ একাধিকবার উহাকে চালাইতে দেখিয়া দেখিয়া সেও একটু বড় হইয়া উঠিতে উঠিতে ঐ রেডিও চালাইবার সমস্ত কৌশল রপ্ত করিয়া ফেলিয়াছিল।
তাহার যখন চার বৎসর বয়স তখন সে একবার তাহার মায়ের সহিত শ্রীরামপুরের মাহেশে, তাহার মাতুলালয়ে বেড়াইতে গিয়া তথায় অনুরূপ একখানি রেডিও দেখিয়া, উহাকে চালাইয়া, মাতামহীর বলিয়া দেওয়া একখানি স্টেশন ধরিয়া দেওয়ায় শোভনলালের মাতামহী সরলাবালা যাহার পর নাই বিস্মিত হইয়াছিলেন, এবং স্বামী আপিস হইতে ফিরিবামাত্র তাঁহাকে সেই বিস্ময়কর সংবাদ, প্রভূত উত্তেজনার সহিত সবিস্তারে কীর্তন করিয়াছিলেন।
ইহার পর, দ্বিতীয়বার মাতামহীর নির্দেশে শোভনলাল যখন পুনরায় সেই রেডিওখানি চালাইয়া, মাতামহের আদিষ্ট অপর একখানি স্টেশন অনায়াসে ধরিয়া দিল তখন তাহার মাতামহ , ডানকান কোম্পানির লেজার কিপার বিনোদবিহারী, চমৎকৃত হইয়া ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন যে শোভনলাল বড় হইয়া ডাক্তার কিম্বা ইঞ্জিনিয়ার, এই দুইয়ের কোনও একটি না হইয়াই রহিবে না। সেইকালে, অকুস্থলে উপস্থিত থাকা শোভনলালের সাতজন মামা-মাসিদিগের সকলেই তাহাদিগের পিতা কর্তৃক উচ্চারিত শোভনলাল সম্পর্কিত ঐ ভবিষ্যদ্বাণীটিকে একবাক্যে সমর্থন করিয়াছিলেন।
২
শোভনলালের বাড়িতে মেয়ে জামাই এসেছে I সঙ্গে তাদের একমাত্র সন্তান আইশারিয়া। সেই কন্যার চার বছর পুরতে এখনও মাস দুই বাকি। শোভনলালের মেয়ে দেবযানী প্রায় তিন বছর পরে বাপের বাড়িতে এল। জামাই সুকল্যাণ পুণেতে বদলি হয়ে যাওয়ার পর ওদের আর এদিকে আসা হয়ে ওঠেনি। শোভনলাল শেষবার মেয়ের কাছে গেছেন দু বছর আগে।
অনেকদিন পরে কাছে পাওয়া নাতনিকে পরম আনন্দে কোলে তুলে নিলেন শোভনলাল। নাতনি দাদুর কোলে উঠেই শুধালো – ল্যাপটপ নেই তোমার ? শোভনলাল সোফায় বসে, নাতনিকে পাশে বসিয়ে তার মাথায় আলগোছে চুমু খেয়ে বললেন – না গো দিদিভাই ; আমার তো ও’সব নেই , তবে এইটে আছে। পাঞ্জাবির পাশ-পকেট থেকে একটা স্মার্ট ফোন বের করে নাতনিকে দেখালেন তিনি।
এই ফোনটা শোভনলাল চার মাস হলো হাতে পেয়েছেন I সহকর্মীরা তাঁর বিদায়-সম্বর্ধনা উপলক্ষে ফুল,মিষ্টি ইত্যাদির সঙ্গে এই ফোনটাও উপহার দিয়েছিলেন। গত চার মাসের চেষ্টায় তিনি এই যন্ত্রটার ব্যবহার কিছুটা রপ্ত করতে পেরেছেন। নির্দিষ্ট নাম খুঁজে বের করে ফোন করা ইত্যাদি প্রাথমিক কাজগুলো ছাড়াও, হোয়াটস্য়াপে আর ফেসবুকে দু’ দুটো একাউন্ট খুলেছেন। গত মাসে, জীবনে প্রথমবার নিজের ছবি ফেসবুকে আপলোড করলেন। বেশ গর্ব বোধ করেছিলেন তখন।
আইশারিয়া তার দাদুর হাত থেকে ফোনটা নিয়েই দাদুর কোলে উঠে বসে, ঠোঁটে চুম্বনের ভঙ্গি এনে, খচ্ করে দু’জনের একটা সেলফি তুলে ফেলল শোভনলাল কিছু বুঝে উঠবার আগেই। এবং সেই কন্যা সেখানেই থামল না। তার দাদুর ফেসবুক আর হোয়াটস্যাপ একাউন্টে সেই ছবি পোস্টও করে দিল। চমৎকৃত শোভনলাল দেখলেন, কয়েক সেকেন্ডের ভিতরে লাইক, লভ ইত্যাদি পড়তে লেগেছে আর কমেন্ট আসাও শুরু হয়ে গেছে।
স্ত্রী আর মেয়ে-জামাইকে সবিস্তারে নাতনির বিস্ময়কর কীর্তির কথা বর্ণনা করে, রাজ্য সরকারের ত্রাণ দপ্তরের হেড অফিসের অবসরপ্রাপ্ত বড়বাবু শোভনলাল, তাঁর নাতনির উদ্দেশ্যে ভবিষ্যদ্বাণী করলেন যে এই কন্যা বড় হয়ে রকেট-সাইন্টিস্ট বা মাইক্রোবায়োলজিস্ট, এই দু’টোর কোনও একটা না হয়ে থামবে না।
কক্ষস্থ সক্রিয় দূরদর্শন যন্ত্রটিতে সেইকালে, কোনও এক দৃশ্যপটের আবহ সঙ্গীতস্বরূপ সরোদে, বেথোফেন রচিত নবম সিম্ফনির একটি খন্ডাংশ ধ্বনিত হইতেছিল।
______________________
ঠোঁটকাটা ফুটনোট : প্রকাশ থাকে যে অধুনা বাঙালী সাহিত্য-পাঠকদের অনেকেরই, বাঙলা ভাষার সাধু ভাষারীতি বুঝতে অসুবিধা হয় কিন্তু it’s a great disgrace কথাটির মানে বুঝতে অসুবিধা হয় না। আবার, হয়ও বোধহয় … এটাও জেনারেশন গ্যাপ।।