এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • জেনারেশন গ্যাপ (ছোট্টগল্প)  

    Anindya Rakshit লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৯ বার পঠিত

  •  
    শোভনলাল তাহার জ্ঞান হইবার পর হইতে তাহাদিগের বনহুগলির বসতবাটীর বসিবার ঘরে রাখা একখানি ঢাউস রেডিওর সহিত পরিচিত ছিল। এবং বাপ খুড়াদিগকে প্রত্যহ একাধিকবার উহাকে চালাইতে দেখিয়া দেখিয়া সেও একটু বড় হইয়া উঠিতে উঠিতে ঐ রেডিও চালাইবার সমস্ত কৌশল রপ্ত করিয়া ফেলিয়াছিল।   
     
    তাহার যখন চার বৎসর বয়স তখন সে একবার তাহার মায়ের সহিত শ্রীরামপুরের মাহেশে, তাহার মাতুলালয়ে বেড়াইতে গিয়া তথায় অনুরূপ একখানি রেডিও দেখিয়া, উহাকে চালাইয়া, মাতামহীর বলিয়া দেওয়া একখানি স্টেশন ধরিয়া দেওয়ায় শোভনলালের মাতামহী সরলাবালা যাহার পর নাই বিস্মিত হইয়াছিলেন, এবং স্বামী আপিস হইতে ফিরিবামাত্র তাঁহাকে সেই বিস্ময়কর সংবাদ, প্রভূত উত্তেজনার সহিত সবিস্তারে কীর্তন করিয়াছিলেন।   
     
    ইহার পর, দ্বিতীয়বার মাতামহীর নির্দেশে শোভনলাল যখন পুনরায় সেই রেডিওখানি চালাইয়া, মাতামহের আদিষ্ট অপর একখানি স্টেশন অনায়াসে ধরিয়া দিল তখন তাহার মাতামহ , ডানকান কোম্পানির লেজার কিপার বিনোদবিহারী, চমৎকৃত হইয়া ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন যে শোভনলাল বড় হইয়া ডাক্তার কিম্বা ইঞ্জিনিয়ার, এই দুইয়ের কোনও একটি না হইয়াই রহিবে না। সেইকালে,  অকুস্থলে উপস্থিত থাকা শোভনলালের সাতজন মামা-মাসিদিগের সকলেই তাহাদিগের পিতা কর্তৃক উচ্চারিত শোভনলাল সম্পর্কিত ঐ ভবিষ্যদ্বাণীটিকে একবাক্যে সমর্থন করিয়াছিলেন।
     

     
    শোভনলালের বাড়িতে মেয়ে জামাই এসেছে I সঙ্গে তাদের একমাত্র সন্তান আইশারিয়া। সেই কন্যার চার বছর পুরতে এখনও মাস দুই বাকি। শোভনলালের মেয়ে দেবযানী প্রায় তিন বছর পরে বাপের বাড়িতে এল। জামাই সুকল্যাণ পুণেতে বদলি হয়ে যাওয়ার পর ওদের আর এদিকে আসা হয়ে ওঠেনি। শোভনলাল শেষবার মেয়ের কাছে গেছেন দু বছর আগে।    
     
    অনেকদিন পরে কাছে পাওয়া নাতনিকে পরম আনন্দে কোলে তুলে নিলেন শোভনলাল। নাতনি দাদুর কোলে উঠেই শুধালো – ল্যাপটপ নেই তোমার ? শোভনলাল সোফায় বসে, নাতনিকে পাশে বসিয়ে তার মাথায় আলগোছে চুমু খেয়ে বললেন – না গো দিদিভাই ; আমার তো ও’সব নেই , তবে এইটে আছে। পাঞ্জাবির পাশ-পকেট থেকে একটা স্মার্ট ফোন বের করে নাতনিকে দেখালেন তিনি।
     
    এই ফোনটা শোভনলাল চার মাস হলো হাতে পেয়েছেন I সহকর্মীরা তাঁর বিদায়-সম্বর্ধনা উপলক্ষে ফুল,মিষ্টি ইত্যাদির সঙ্গে এই ফোনটাও উপহার দিয়েছিলেন। গত চার মাসের চেষ্টায় তিনি এই যন্ত্রটার ব্যবহার কিছুটা রপ্ত করতে পেরেছেন। নির্দিষ্ট নাম খুঁজে বের করে ফোন করা ইত্যাদি প্রাথমিক কাজগুলো ছাড়াও, হোয়াটস্য়াপে আর ফেসবুকে দু’ দুটো একাউন্ট খুলেছেন। গত মাসে, জীবনে প্রথমবার নিজের ছবি ফেসবুকে আপলোড করলেন। বেশ গর্ব বোধ করেছিলেন তখন।
     
    আইশারিয়া তার দাদুর হাত থেকে ফোনটা নিয়েই দাদুর কোলে উঠে বসে, ঠোঁটে চুম্বনের ভঙ্গি এনে, খচ্ করে দু’জনের একটা সেলফি তুলে ফেলল শোভনলাল কিছু বুঝে উঠবার আগেই। এবং সেই কন্যা সেখানেই থামল না। তার দাদুর ফেসবুক আর হোয়াটস্যাপ একাউন্টে সেই ছবি পোস্টও করে দিল। চমৎকৃত শোভনলাল দেখলেন, কয়েক সেকেন্ডের ভিতরে লাইক, লভ ইত্যাদি পড়তে লেগেছে আর কমেন্ট আসাও শুরু হয়ে গেছে।    
     
    স্ত্রী আর মেয়ে-জামাইকে সবিস্তারে নাতনির বিস্ময়কর কীর্তির কথা বর্ণনা করে, রাজ্য সরকারের ত্রাণ দপ্তরের হেড অফিসের অবসরপ্রাপ্ত বড়বাবু শোভনলাল, তাঁর নাতনির উদ্দেশ্যে ভবিষ্যদ্বাণী করলেন যে এই কন্যা বড় হয়ে রকেট-সাইন্টিস্ট বা মাইক্রোবায়োলজিস্ট, এই দু’টোর কোনও একটা না হয়ে থামবে না।
     
    কক্ষস্থ সক্রিয় দূরদর্শন যন্ত্রটিতে সেইকালে, কোনও এক দৃশ্যপটের আবহ সঙ্গীতস্বরূপ সরোদে, বেথোফেন রচিত নবম সিম্ফনির একটি খন্ডাংশ ধ্বনিত হইতেছিল।
    ______________________ 
     
    ঠোঁটকাটা ফুটনোট : প্রকাশ থাকে যে অধুনা বাঙালী সাহিত্য-পাঠকদের অনেকেরই, বাঙলা ভাষার সাধু ভাষারীতি বুঝতে অসুবিধা হয় কিন্তু  it’s a great disgrace কথাটির মানে বুঝতে অসুবিধা হয় না। আবার, হয়ও বোধহয় … এটাও জেনারেশন গ্যাপ।।                                                                                                                                                                                                                                                                                      

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন