এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ফাজি লজিক: রাজার নতুন শিক্ষানীতি  অধ্যায় ৭: নিউরো-ফাজি সিস্টেম —

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৪৩ বার পঠিত
  • 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 9 | 10
     লিলির শেখা মেশিন

    আগের অধ্যায়গুলোতে আমরা শিখেছিলাম ফাজি লজিক, ফাজি সেট, ফাজি রিলেশন, ফাজি নিয়ম, ফাজি ইনফারেন্স সিস্টেম আর ফাজি কন্ট্রোলার। লিলি আর মিমি এখন ফাজি লজিকের ওস্তাদ হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের মনে একটা প্রশ্ন — ফাজি সিস্টেম নিজে থেকে শিখতে পারে না, নিয়ম আগে থেকে ঠিক করে দিতে হয়। অন্যদিকে নিউরাল নেটওয়ার্ক শিখতে পারে, কিন্তু তার সিদ্ধান্ত বোঝা কঠিন। যদি এই দুইয়ের মিশ্রণ ঘটানো যায়? আজকের অধ্যায়ে আমরা শিখব নিউরো-ফাজি সিস্টেম — যেখানে নিউরাল নেটওয়ার্কের শেখার ক্ষমতা আর ফাজি লজিকের বোধগম্যতা একসাথে কাজ করে।

    গল্প শুরু করি সেখান থেকে, যেখানে আগের অধ্যায় শেষ হয়েছিল।

     সকালবেলার ঘটনা

    পরদিন সকালে লিলি তার মায়ের কাছে গিয়ে বলল, "মা, আমরা ফাজি লজিক শিখেছি। কিন্তু একটা সমস্যা আছে — ফাজি সিস্টেম নিজে থেকে শিখতে পারে না। নিয়ম আগে থেকে ঠিক করে দিতে হয়। কিন্তু বাস্তব জগতে তো সবসময় আমরা নিয়ম জানি না। তখন কী করব?"

    মা বললেন, "ভালো প্রশ্ন। এই সমস্যার সমাধান হলো নিউরো-ফাজি সিস্টেম। এটা নিউরাল নেটওয়ার্ক আর ফাজি লজিকের মিশ্রণ।"

    মিমি বলল, "নিউরাল নেটওয়ার্ক আবার কী?"

    মা বললেন, "নিউরাল নেটওয়ার্ক হলো মানুষের মস্তিষ্কের মতো একটা সিস্টেম, যা ডেটা থেকে শিখতে পারে। কিন্তু তার সিদ্ধান্ত বোঝা কঠিন — একে ব্ল্যাক বক্স বলে। ফাজি লজিক বোঝা সহজ — হোয়াইট বক্স। নিউরো-ফাজি সিস্টেম দুইয়ের সুবিধা একসাথে নিয়ে আসে।"

    লিলি বলল, "তাহলে শুরু করি?"

     নিউরাল নেটওয়ার্ক কী — খুব সংক্ষেপে

    মা তাদের নিউরাল নেটওয়ার্ক সম্পর্কে খুব সহজ করে বুঝালেন। তিনি বললেন, "নিউরাল নেটওয়ার্ক হলো অনেকগুলো ছোট ছোট ইউনিটের সমষ্টি — এদের বলে নিউরন। প্রতিটি নিউরন ইনপুট নেয়, কিছু হিসাব করে, আউটপুট দেয়। আর এই নিউরনগুলো বিভিন্ন স্তরে সাজানো থাকে।"

    লিলি বলল, "এটা কীভাবে শেখে?"

    মা বললেন, "শেখে ডেটা থেকে। অনেক উদাহরণ দিয়ে তাকে শেখানো হয়। যেমন — হাজার হাজার ছবি দেখিয়ে তাকে শেখানো হয়, কোনটা বিড়াল, কোনটা কুকুর। ধীরে ধীরে সে শিখে যায়।"

    মিমি বলল, "কিন্তু ফাজি লজিকের সাথে এর সম্পর্ক কী?"

    মা বললেন, "নিউরো-ফাজি সিস্টেমে, নিউরাল নেটওয়ার্ক ডেটা থেকে শিখে ফাজি নিয়ম তৈরি করে। তখন আর বিশেষজ্ঞের দরকার হয় না — সিস্টেম নিজেই নিয়ম বের করে ফেলে।"

     নিউরো-ফাজি সিস্টেমের মূল ধারণা

    মা নিউরো-ফাজি সিস্টেমের মূল ধারণা বুঝাতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, "নিউরো-ফাজি সিস্টেমে আমরা ফাজি সিস্টেমকে নিউরাল নেটওয়ার্কের মতো ডিজাইন করি। প্রতিটি ফাজি নিয়ম, প্রতিটি মেম্বারশিপ ফাংশন — সবকিছুকে নিউরনের মতো দেখানো হয়। তারপর ব্যাকপ্রোপাগেশন অ্যালগরিদম ব্যবহার করে সিস্টেমকে শেখানো হয়।"

    লিলি বলল, "ব্যাকপ্রোপা... কী?"

    মা হাসলেন। তিনি বললেন, "ব্যাকপ্রোপাগেশন হলো একটা অ্যালগরিদম যা নিউরাল নেটওয়ার্ককে শেখায়। এটা আউটপুট থেকে শুরু করে পিছনের দিকে গিয়ে প্রতিটি প্যারামিটার ঠিক করে।"

    মিমি বলল, "তাহলে ফাজি সিস্টেমও শিখতে পারে!"

    মা বললেন, "ঠিক। নিউরো-ফাজি সিস্টেমে ফাজি সিস্টেম শেখে।"

     অ্যাডাপটিভ নিউরো-ফাজি ইনফারেন্স সিস্টেম (ANFIS)

    মা তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় নিউরো-ফাজি সিস্টেম দেখালেন — ANFIS (Adaptive Neuro-Fuzzy Inference System)। তিনি বললেন, "ANFIS হলো সুগেনো-টাইপ ফাজি সিস্টেমের একটা নিউরাল নেটওয়ার্ক ভার্সন। এখানে পাঁচটা স্তর থাকে।"

    লিলি বলল, "পাঁচটা স্তর? কী কী?"

    মা স্তরগুলো দেখালেন:

    স্তর ১ (ইনপুট মেম্বারশিপ ফাংশন): এখানে ইনপুটগুলোকে ফাজি সেটে রূপান্তর করা হয়। প্রতিটি নোড একটা মেম্বারশিপ ফাংশন — যেমন ত্রিভুজ, বেল আকৃতির ইত্যাদি।

    স্তর ২ (নিয়মের সক্রিয়তা): এখানে প্রতিটি নিয়মের জন্য AND অপারেশন করা হয় — সাধারণত প্রোডাক্ট (গুণ) ব্যবহার করা হয়।

    স্তর ৩ (নরমালাইজেশন): এখানে প্রতিটি নিয়মের সক্রিয়তাকে সব নিয়মের সক্রিয়তার যোগফল দিয়ে ভাগ করা হয় — যাতে সবগুলো মিলে ১ হয়।

    স্তর ৪ (আউটপুট ফাংশন): এখানে প্রতিটি নিয়মের আউটপুট বের করা হয়। সুগেনো পদ্ধতিতে আউটপুট হয় ইনপুটের লিনিয়ার ফাংশন।

    স্তর ৫ (সমষ্টি): এখানে সব নিয়মের আউটপুট যোগ করে চূড়ান্ত আউটপুট বের করা হয়।

    মিমি বলল, "এটা একটু জটিল মনে হচ্ছে।"

    মা বললেন, "হ্যাঁ, কিন্তু ধারণাটা সহজ — প্রথমে ফাজিফিকেশন, তারপর নিয়ম মূল্যায়ন, তারপর ডিফাজিফিকেশন — সবকিছু নিউরাল নেটওয়ার্কের স্তরে স্তরে সাজানো।"

     ANFIS-এর আর্কিটেকচার — সহজ ভাষায়

    লিলি ANFIS-এর আর্কিটেকচার সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করল। সে একটা ছবি আঁকল:

    ইনপুট x এবং y

    স্তর ১: x এর জন্য মেম্বারশিপ ফাংশন A1, A2; y এর জন্য B1, B2
    স্তর ২: প্রতিটি নিয়মের জন্য w = μA(x) × μB(y)
    স্তর ৩: w̄ = w / (w1 + w2 + ...)
    স্তর ৪: প্রতিটি নিয়মের জন্য f = p×x + q×y + r (যেখানে p,q,r শেখা প্যারামিটার)
    স্তর ৫: আউটপুট = Σ w̄ × f

    মিমি বলল, "এখন বুঝতে পারছি। প্রথম স্তর মেম্বারশিপ ফাংশন, দ্বিতীয় স্তর গুণ করে নিয়মের সক্রিয়তা, তৃতীয় স্তর নরমালাইজ, চতুর্থ স্তর আউটপুট ফাংশন, পঞ্চম স্তর যোগ করে চূড়ান্ত আউটপুট।"

    মা বললেন, "ঠিক। আর এই পুরো নেটওয়ার্ককে ব্যাকপ্রোপাগেশন দিয়ে শেখানো যায়। প্রথম স্তরের মেম্বারশিপ ফাংশনের প্যারামিটারগুলো আর চতুর্থ স্তরের p,q,r-গুলো শেখা যায়।"

     ANFIS-এর শেখার পদ্ধতি

    মা তাদের ANFIS-এর শেখার পদ্ধতি বুঝালেন। তিনি বললেন, "ANFIS-এ দুই ধরনের প্যারামিটার থাকে — প্রিমাইস প্যারামিটার আর কনসিকোয়েন্ট প্যারামিটার।"

    প্রিমাইস প্যারামিটার: প্রথম স্তরের মেম্বারশিপ ফাংশনের প্যারামিটার — যেমন ত্রিভুজের তিনটি কোণ, বা বেল আকৃতির সেন্টার আর ওয়াইডথ।

    কনসিকোয়েন্ট প্যারামিটার: চতুর্থ স্তরের p, q, r — যেগুলো ইনপুটের লিনিয়ার ফাংশন তৈরি করে।

    শেখার সময় দুইভাবে প্যারামিটার আপডেট করা হয়:
    - ফরওয়ার্ড পাসে: প্রিমাইস প্যারামিটার ধ্রুবক রেখে কনসিকোয়েন্ট প্যারামিটার আপডেট করা হয় (লিনিয়ার রিগ্রেশন দিয়ে)
    - ব্যাকওয়ার্ড পাসে: কনসিকোয়েন্ট প্যারামিটার ধ্রুবক রেখে প্রিমাইস প্যারামিটার আপডেট করা হয় (গ্রেডিয়েন্ট ডিসেন্ট দিয়ে)

    লিলি বলল, "এটা দুই ধাপে শেখে — প্রথমে এক ধরণের প্যারামিটার, তারপর আরেক ধরণের।"

    মা বললেন, "ঠিক। একে বলে হাইব্রিড লার্নিং।"

     নিউরো-ফাজি সিস্টেমের উদাহরণ — তাপমাত্রা কন্ট্রোল

    লিলি একটা বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বুঝতে চাইল। সে বানাল তাপমাত্রা কন্ট্রোলের জন্য নিউরো-ফাজি সিস্টেম।

    ইনপুট: কাঙ্ক্ষিত তাপমাত্রা (Desired Temp), বর্তমান তাপমাত্রা (Current Temp)
    আউটপুট: হিটারের শক্তি (Heater Power)

    প্রথমে কিছু ডেটা সংগ্রহ করা হল — বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কী কী ইনপুটে কত হিটার পাওয়ার দরকার, সেটা রেকর্ড করা হল।

    তারপর এই ডেটা দিয়ে ANFIS-কে ট্রেনিং দেওয়া হল। সিস্টেম নিজেই শিখে গেল:
    - কখন 'ঠাণ্ডা', 'গরম' বলতে কী বোঝায়
    - কী কী নিয়ম দরকার
    - প্রতিটি নিয়মের জন্য আউটপুট কেমন হবে

    মিমি বলল, "বাহ! সিস্টেম নিজেই শিখে গেল!"

    মা বললেন, "হ্যাঁ। এটাই নিউরো-ফাজি সিস্টেমের সবচেয়ে বড় সুবিধা — বিশেষজ্ঞের দরকার হয় না।"

     আরেকটা উদাহরণ — গাড়ির গতি কন্ট্রোল

    মিমি আরেকটা উদাহরণ দিতে চাইল — গাড়ির গতি কন্ট্রোল।

    ইনপুট: বর্তমান গতি, কাঙ্ক্ষিত গতি, রাস্তার ঢাল
    আউটপুট: এক্সিলারেটরের অবস্থান

    ডেটা কালেকশন: বিভিন্ন গতিতে, বিভিন্ন ঢালে ড্রাইভার কীভাবে এক্সিলারেটর নিয়ন্ত্রণ করে, সেই ডেটা রেকর্ড করা হল।

    ANFIS ট্রেনিং: এই ডেটা দিয়ে সিস্টেমকে শেখানো হল।

    ফলাফল: সিস্টেম নিজেই শিখে গেল — কখন বেশি এক্সিলারেশন দরকার, কখন কম। এমনকি ড্রাইভারের স্টাইলও শিখতে পারল — কোন ড্রাইভার ধীরে চালায়, কোনটা দ্রুত।

    লিলি বলল, "এটা তো পার্সোনালাইজড গাড়ি!"

    মা বললেন, "হ্যাঁ। নিউরো-ফাজি সিস্টেম দিয়ে পার্সোনালাইজড কন্ট্রোল সিস্টেম বানানো যায়।"

     নিউরো-ফাজি সিস্টেমের সুবিধা

    মা তাদের নিউরো-ফাজি সিস্টেমের সুবিধাগুলো বললেন:

    ১. শেখার ক্ষমতা — ডেটা থেকে শিখতে পারে, বিশেষজ্ঞের দরকার হয় না।

    ২. বোধগম্যতা — ফাজি নিয়ম থাকায় সিদ্ধান্ত বোঝা যায়।

    ৩. অ্যাডাপ্টিভ — নতুন ডেটা এলে নিজেকে আপডেট করতে পারে।

    ৪. নন-লিনিয়ার সিস্টেম — জটিল, নন-লিনিয়ার সম্পর্ক মডেল করতে পারে।

    ৫. রোবাস্ট — নোইজি ডেটা সহ্য করতে পারে।

    ৬. জেনারালাইজেশন — ট্রেনিং ডেটার বাইরেও ভালো কাজ করে।

    মিমি বলল, "সুবিধা তো অনেক! অসুবিধা কী?"

    মা বললেন, "অসুবিধাও আছে।"

     নিউরো-ফাজি সিস্টেমের অসুবিধা

    মা তাদের নিউরো-ফাজি সিস্টেমের অসুবিধাগুলোও বললেন:

    ১. ডেটা দরকার — শেখার জন্য অনেক ডেটা দরকার হয়।

    ২. ওভারফিটিং — খুব বেশি ট্রেনিং করলে ট্রেনিং ডেটার জন্য খুব ভালো হয়ে যায়, কিন্তু নতুন ডেটার জন্য খারাপ কাজ করে।

    ৩. কম্পিউটেশনাল খরচ — ট্রেনিং করতে সময় লাগে, কম্পিউটার পাওয়ার দরকার।

    ৪. স্থানীয় মিনিমা — সবসময় সবচেয়ে ভালো সমাধানে পৌঁছায় না।

    ৫. নিয়ম সংখ্যা — ইনপুট বাড়লে নিয়ম সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায় (এক্সপ্লোশন)।

    ৬. ইন্টারপ্রিটেশন কিছুটা কমে — ফাজি সিস্টেমের চেয়ে বোঝা একটু কঠিন।

    লিলি বলল, "কিন্তু সুবিধা বেশি, তাই না?"

    মা বললেন, "হ্যাঁ। তাই নিউরো-ফাজি সিস্টেম অনেক জায়গায় ব্যবহার হয়।"

     নিউরো-ফাজি সিস্টেমের বাস্তব ব্যবহার

    মা তাদের নিউরো-ফাজি সিস্টেমের কিছু বাস্তব ব্যবহার দেখালেন:

    ১. প্যাটার্ন রিকগনিশন — হাতের লেখা চেনা, মুখ শনাক্তকরণ।

    ২. প্রেডিক্টিভ মেইনটেন্যান্স — মেশিন কখন নষ্ট হবে, তা আগেই বলা।

    ৩. ফাইন্যান্সিয়াল ফোরকাস্টিং — শেয়ার বাজারের দাম । [১৯৮৪ বইটা বড়ো হলে পড়ে নেবে AI দিয়ে এখানে মানুষকে বিভ্রান্ত করা খুব সোজা  ]

    ৪. মেডিকেল ডায়াগনোসিস — রোগীর লক্ষণ দেখে রোগ শনাক্ত।

    ৫. কন্ট্রোল সিস্টেম — জটিল ইন্ডাস্ট্রিয়াল কন্ট্রোল।

    ৬. রোবোটিক্স — রোবটকে পাথ ফলো করা শেখানো।

    ৭. এনার্জি ম্যানেজমেন্ট — কখন কত বিদ্যুৎ দরকার, ।

    মিমি বলল, "এত জায়গায় ব্যবহার হয়!"

    মা বললেন, "হ্যাঁ। নিউরো-ফাজি সিস্টেম এখন খুব জনপ্রিয়।"

     নিউরো-ফাজি বনাম ফাজি বনাম নিউরাল

    মা তাদের তিনটা সিস্টেমের তুলনা দেখালেন:

    | বিষয় | ফাজি লজিক | নিউরাল নেটওয়ার্ক | নিউরো-ফাজি |
    |------|-----------|-------------------|-------------|
    | জ্ঞান | বিশেষজ্ঞ থেকে | ডেটা থেকে | ডেটা থেকে |
    | শেখা | পারে না | পারে | পারে |
    | বোধগম্যতা | অনেক ভালো | খারাপ (ব্ল্যাক বক্স) | ভালো |
    | ডেটা দরকার | কম | অনেক | অনেক |
    | গাণিতিক মডেল | দরকার নেই | দরকার নেই | দরকার নেই |
    | ট্রেনিং টাইম | নেই | বেশি | মাঝারি |
    | ইন্টারপ্রিটেবিলিটি | সর্বোচ্চ | সর্বনিম্ন | উচ্চ |

    লিলি বলল, "নিউরো-ফাজি দুইয়ের ভালো দিকগুলো নিয়ে এসেছে!"

    মা বললেন, "ঠিক। এটাই এর মূল উদ্দেশ্য।"

     লিলির নিজের নিউরো-ফাজি প্রজেক্ট — স্মার্ট হোম

    লিলি তার নিজের জন্য একটা নিউরো-ফাজি প্রজেক্ট বানাতে চাইল — স্মার্ট হোম কন্ট্রোল সিস্টেম।

    ইনপুট:
    - ঘরের তাপমাত্রা
    - বাইরের তাপমাত্রা
    - সময় (সকাল, দুপুর, বিকেল, রাত)
    - ঘরে কতজন লোক আছে

    আউটপুট:
    - এসির শক্তি
    - লাইটের উজ্জ্বলতা
    - ফ্যানের গতি

    প্রথমে এক মাস ধরে ডেটা কালেকশন — প্রতিদিন বিভিন্ন সময়ে কী কী সেটিংস ব্যবহার করা হয়, তা রেকর্ড করা।

    তারপর ANFIS ট্রেনিং — এই ডেটা দিয়ে সিস্টেমকে শেখানো।

    ফলাফল — একটা স্মার্ট হোম সিস্টেম, যা নিজে থেকেই শিখে যায় বাসিন্দাদের পছন্দ — কখন এসি চালাতে হবে, কখন লাইট কমাতে হবে, ইত্যাদি।

    মিমি বলল, "বাহ! আমাদের বাসায় এমন থাকলে ভালো হয়!"

    মা বললেন, "এমন সিস্টেম এখন বাজারে আসছে। গুগল নেস্ট, অ্যামাজন অ্যালেক্সা — এগুলো আসলে নিউরো-ফাজি সিস্টেমের মতো কিছু ব্যবহার করে।"

     আরেকটা প্রজেক্ট — ট্রাফিক সিগন্যাল কন্ট্রোল

    মিমি আরেকটা প্রজেক্টের আইডিয়া দিল — ট্রাফিক সিগন্যাল কন্ট্রোল।

    ইনপুট:
    - উত্তর দিকে গাড়ির সংখ্যা
    - দক্ষিণ দিকে গাড়ির সংখ্যা
    - পূর্ব দিকে গাড়ির সংখ্যা
    - পশ্চিম দিকে গাড়ির সংখ্যা
    - সময় (পিক আওয়ার, অফ-পিক আওয়ার)

    আউটপুট:
    - প্রতিটি দিকের জন্য সবুজ সিগন্যালের সময়

    ডেটা কালেকশন: বিভিন্ন সময়ে ট্রাফিক কেমন থাকে, ট্রাফিক পুলিশ কীভাবে সিগন্যাল কন্ট্রোল করে — সেই ডেটা রেকর্ড।

    ANFIS ট্রেনিং: এই ডেটা দিয়ে সিস্টেম শেখে।

    ফলাফল: একটা অ্যাডাপটিভ ট্রাফিক সিগন্যাল সিস্টেম, যা নিজে থেকেই ট্রাফিকের চাপ বুঝে সময় ঠিক করে।

    লিলি বলল, "এতে জ্যাম কমবে!"

    মা বললেন, "হ্যাঁ। অনেক বড় শহরে এমন সিস্টেম ব্যবহার হয়।"

     নিউরো-ফাজি সিস্টেমের ভবিষ্যৎ

    মা তাদের নিউরো-ফাজি সিস্টেমের ভবিষ্যৎ নিয়ে বললেন:

    ১. ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) — স্মার্ট ডিভাইসগুলো নিজে থেকে শিখবে, নিজে থেকে অ্যাডাপ্ট করবে।

    ২. এজ কম্পিউটিং — ডিভাইসের ভিতরেই ছোট নিউরো-ফাজি সিস্টেম চলবে, ক্লাউডের দরকার হবে না।

    ৩. ডিপ লার্নিং — ডিপ নিউরাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে ফাজি লজিকের মিশ্রণ।

    ৪. এক্সপ্লেইনেবল এআই — কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন এমন সিদ্ধান্ত নিল, তা বোঝানোর জন্য ফাজি লজিক খুব দরকারি।

    ৫. হিউম্যান-রোবট ইন্টারঅ্যাকশন — রোবট মানুষের মতো চিন্তা করবে, মানুষের ভাষা বুঝবে।

    মিমি বলল, "ভবিষ্যৎ তো অনেক মজার!"

    মা বললেন, "হ্যাঁ। আর এই ভবিষ্যৎ গড়তে নিউরো-ফাজি সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।"

     লিলির উপলব্ধি

    লিলি খানিকক্ষণ চুপ করে ভাবল। তারপর বলল, "মা, আমি এখন বুঝতে পারছি, ফাজি লজিক শুধু একটা তত্ত্ব না — এটা বাস্তব জগতের সমস্যা সমাধানের একটা শক্তিশালী হাতিয়ার। আর নিউরো-ফাজি সিস্টেম তো একে আরও শক্তিশালী করেছে।"

    মিমি বলল, "হ্যাঁ। প্রথমে ভেবেছিলাম, ফাজি লজিক খুব জটিল হবে। কিন্তু গল্প শুনে শুনে এখন সব পরিষ্কার।"

    মা বললেন, "তোরা খুব ভালো শিখেছিস। এখন তোরা চাইলে নিজেরা ছোট ছোট নিউরো-ফাজি প্রজেক্ট করতে পারিস। পাইথনে অনেক লাইব্রেরি আছে — যেমন scikit-fuzzy, ANFIS লাইব্রেরি।"

    লিলি বলল, "আমরা চেষ্টা করব!"

     রাতের খাবারের মজা

    রাতে খাবার টেবিলে লিলি আর মিমি তাদের বাবাকে নিউরো-ফাজি সিস্টেম শেখাতে লাগল।

    লিলি বলল, "বাবা, আমরা আজ নিউরো-ফাজি সিস্টেম শিখেছি। এটা নিউরাল নেটওয়ার্ক আর ফাজি লজিকের মিশ্রণ — শেখে আর তার সিদ্ধান্ত বোঝাও যায়।"

    বাবা বললেন, "বাহ! তাহলে তো খুব ভালো! আমার অফিসে একটা সিস্টেম আছে, যার সিদ্ধান্ত কেউ বুঝতে পারে না — ব্ল্যাক বক্স। এটা থাকলে ভালো হত।"

    মিমি বলল, "তোমরা কি নিউরো-ফাজি সিস্টেম ব্যবহার করতে পারো?"

    বাবা বললেন, "হয়তো ভবিষ্যতে করব। এখন তোরা আমাকে শিখিয়ে দিলে, আমি অফিসে বলতে পারব।"

    সবাই খুব হাসল।

    মা বললেন, "ওরা এখন নিউরো-ফাজি সিস্টেমের ওস্তাদ হয়ে যাচ্ছে।"

     শোওয়ার আগে

    রাতে শোওয়ার আগে লিলি আর মিমি তাদের আজকের পড়া রিভাইজ করল।

    লিলি লিখল:
    - নিউরো-ফাজি সিস্টেম = নিউরাল নেটওয়ার্ক + ফাজি লজিক
    - ANFIS = Adaptive Neuro-Fuzzy Inference System
    - ANFIS-এর পাঁচটা স্তর:
      ১. মেম্বারশিপ ফাংশন (ফাজিফিকেশন)
      ২. নিয়মের সক্রিয়তা (গুণ)
      ৩. নরমালাইজেশন
      ৪. আউটপুট ফাংশন (লিনিয়ার)
      ৫. সমষ্টি (ডিফাজিফিকেশন)

    মিমি লিখল:
    - প্যারামিটার দুই ধরনের: প্রিমাইস (মেম্বারশিপ ফাংশনের) আর কনসিকোয়েন্ট (p,q,r)
    - হাইব্রিড লার্নিং: ফরওয়ার্ড পাসে কনসিকোয়েন্ট আপডেট, ব্যাকওয়ার্ড পাসে প্রিমাইস আপডেট
    - সুবিধা: শেখে, বোধগম্য, অ্যাডাপ্টিভ, রোবাস্ট
    - অসুবিধা: ডেটা দরকার, ওভারফিটিং, কম্পিউটেশনাল খরচ
    - বাস্তব ব্যবহার: প্যাটার্ন রিকগনিশন, প্রেডিকশন, কন্ট্রোল, মেডিকেল, রোবোটিক্স

    লিলি বলল, "কাল আমরা ফাজি লজিকের কিছু বিখ্যাত ধাঁধা সমাধান করব। সেটা আরও মজা হবে।"

    মিমি বলল, "মানে ফাজি লজিক ব্যবহার করে ধাঁধা?"

    লিলি বলল, "হ্যাঁ।"

    তারা ঘুমিয়ে পড়ল।

    টিপস

    তোমরাও লিলি আর মিমির মতো নিউরো-ফাজি সিস্টেম শিখে ফেললে। এখন তুমি জানো, নিউরাল নেটওয়ার্ক আর ফাজি লজিকের মিশ্রণ কীভাবে কাজ করে।

    তোমার চারপাশ থেকে নিউরো-ফাজি সিস্টেমের উদাহরণ বের করতে পারো। যেমন:

    - স্মার্ট থার্মোস্ট্যাট (নেস্ট) — তাপমাত্রা দেখে শেখে, নিজে অ্যাডাপ্ট করে
    - স্মার্ট ফোনের ক্যামেরা — ছবি তোলার সময় সেটিংস নিজে ঠিক করে
    - গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট — তোমার কথা বুঝে, তোমার পছন্দ শিখে
    - নেটফ্লিক্স — তুমি কী দেখো, তা শিখে রিকমেন্ড করে
    - অ্যামাজন — তুমি কী কিনো, তা শিখে প্রডাক্ট সুপারিশ করে

    এভাবে প্রতিদিন ৫টা করে নিউরো-ফাজি সিস্টেমের উদাহরণ বের করার অভ্যাস করো।

    মনে রাখার মূল কথা:
    - নিউরো-ফাজি = শেখে + বোঝা যায়
    - ANFIS পাঁচ স্তরের নেটওয়ার্ক
    - হাইব্রিড লার্নিং — দুই ধরনের প্যারামিটার একসাথে শেখে
    - বাস্তব জগতে অনেক ব্যবহার

     শেষ কথা

    এই অধ্যায়ে আমরা শিখলাম নিউরো-ফাজি সিস্টেম। আমরা দেখলাম, কীভাবে নিউরাল নেটওয়ার্কের শেখার ক্ষমতা আর ফাজি লজিকের বোধগম্যতা একসাথে কাজ করে। আমরা শিখলাম ANFIS — সবচেয়ে জনপ্রিয় নিউরো-ফাজি সিস্টেম — এর পাঁচটা স্তর, শেখার পদ্ধতি, প্যারামিটার দুই ধরনের। দেখলাম নিউরো-ফাজি সিস্টেমের সুবিধা, অসুবিধা আর বাস্তব ব্যবহার।

    লিলি আর মিমি তাদের নিজের জীবন থেকে অসংখ্য উদাহরণ দিয়েছে — স্মার্ট হোম, ট্রাফিক কন্ট্রোল, গাড়ির গতি কন্ট্রোল — সবকিছুর জন্য। তারা দেখিয়েছে, কীভাবে নিউরো-ফাজি সিস্টেম বাস্তব সমস্যা সমাধান করে।

    পরের অধ্যায়ে আমরা ফাজি লজিকের কিছু বিখ্যাত ধাঁধা সমাধান করব। সেখানে আমরা দেখব, কীভাবে ফাজি লজিক দিয়ে মজার মজার সমস্যার সমাধান করা যায়।

    ততক্ষণে, তোমরা নিজেরা নিজেদের জীবন থেকে নিউরো-ফাজি সিস্টেমের উদাহরণ বের করতে থাকো। 
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 9 | 10
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন