এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  প্রবন্ধ

  • বাঙালি দেখেও শেখে না, ঠেকেও শেখে না 

    শর্মিষ্ঠা রায় লেখকের গ্রাহক হোন
    প্রবন্ধ | ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২২ বার পঠিত
  • | | | | | | | | | 2
    চন্দ্রধর দাসকে আপনারা চিনবেন না। অবশ্য কেউ কেউ চিনতেও পারেন, যারা অসমের ডিটেনশন ক্যাম্পে ছুঁড়ে ফেলা তথাকথিত 'বিদেশি'দের নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, সম্পূর্ণ নিরপরাধ হওয়া সত্ত্বেও যে ভয়াবহ শাস্তি তাদের ভোগ করতে হয়েছে, তার জন্য যন্ত্রণা অনুভব করেছেন। ২০২০ সালের ১৪ ডিসেম্বর যখন জন্মের যন্ত্রণা থেকে অবশেষে তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন, তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ১০৪ বছর। বাবার নাম, প্রয়াত শিরিষ চন্দ্র দাস। সাকিন - বরাইবস্তি, ধলাই, জিলা কাছাড়।

    ১৯৬৬ সালে বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন ত্রিপুরা। রিফিউজি রেজিষ্ট্রেশন সার্টিফিকেট আছে। ফরেনার্স ট্রাইবুনাল থেকে ১৭/৩/২০১৭, ৫/৬/২০১৭, এবং ৬/৭/২০১৭ সালে নোটিশ দেওয়া সত্ত্বেও ফরেনার্স ট্রাইবুনালে কেস লড়ার চেষ্টা করেন নি। একতরফা রায়ে চন্দ্রধর দাসকে শিলচর ছয় নম্বর ফরেনার্স ট্রাইবুনাল থেকে বিদেশি ঘোষণা করা হয় জানুয়ারি মাসের ২ তারিখ। সাল ২০১৮।

    এবার তো প্রশ্ন জাগবে, নিশ্চিত জেলের হাতছানি সত্ত্বেও কেন চন্দ্রধর কেস লড়লেন না? বাঁচার চেষ্টা যে করে না, তাকে নিয়ে আবার এত কথা কেন? কথা এই কারনেই, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, তিনি জাতিতে হিন্দু এবং ভারত বর্ষ তাঁর দেশ। এ দেশে তাঁর কোনো ক্ষতি হতে পারে না। একদিন প্রমাণ হবেই যে তিনি ভারতীয়। দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তিনি বাবা বলে সম্বোধন করতেন। রেডিওতে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শুনলেই কাঁপা কাঁপা হাত জোড় করে বলতেন, 'মোদি আছেন বলেই আমি খাবার পাচ্ছি'। ডিটেনশন ক্যাম্পের অসহনীয় জীবন যাপন করতে করতেও এই শতবর্ষ পার করা বৃদ্ধ বিশ্বাস করতেন, যে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মত একজন মহাপুরুষ, সে দেশে তিনি ভারতীয় প্রমাণিত হবেন না, এ হতেই পারে না। নিজের মনে বিড়বিড় করে বলতেন, 'আমার কাছে ত্রিশটি ভোট আছে। আমি মোদিকে সব ভোট দেব'। কিন্তু হায়! কোনো মহাপুরুষ তাঁকে বাঁচাতে আসেন নি। অবশেষে, ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ সালে চন্দ্রধর দাস বিদেশি তকমা নিয়েই এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন।

    ৩১ মার্চ ২০১৮ সালে চন্দ্রধর দাসকে ওরা শিলচর ডিটেনশন ক্যাম্পে ঢোকায়। শিলচরের কমল চক্রবর্তী ও তাঁর  সমাজকর্মী বন্ধুরা ২৬ জুন কাছাড়ের জেলাশাসককে তাঁর ছবি দেখিয়ে মানবিকতার কারণে তাঁকে ছাড়ার অনুরোধ করেন। অনুরোধে জামিন মেলে। কিন্তু, এর পরেও এই অসুস্থ বৃদ্ধকে ট্রলিতে শুইয়ে রেখে ফরেনার্স ট্রাইবুনালে হাজির করাতে হত। সারাদিন সেখানে তাঁকে রেখেই চলত কোর্টের কাজ। তাঁর কাছে যে রিফিউজি রেজিষ্ট্রেশন সার্টিফিকেট ছিল, তা ভেরিফিকেশনের জন্য ত্রিপুরায় পাঠানো হয়েছিল। যার উত্তর তাঁর মৃত্যুর পরও আসে নি। 

    অতিবৃদ্ধ চন্দ্রধর ও তাঁর স্ত্রী দু'জনেই ছিলেন পুরোপুরি শয্যাশায়ী। তাঁদের স্বামী পরিত্যক্তা মেয়ে তাঁদের দেখাশোনা করতেন। মনে তীব্র বিশ্বাস থাকলেও 'বিদেশি' বদনাম তাঁর ঘোচে নি। শেষ দিন পর্যন্ত আক্ষেপ করে গেছেন চন্দ্রধর। যে দেশে জন্মেছেন, ঘামে শ্রমে যে মাটিতে অবদান রেখেছেন, সেই দেশ তাঁকে নাগরিকের স্বীকৃতিটুকু দিল না! 

    ওপার বাংলা থেকে সীমান্তে প্রহরা থাকা সত্বেও যারা নানা অবৈধ উপায়ে এদেশে এসে বসবাস করছেন, তারা যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, তাহলে সেই অপরাধের অংশ এই সীমান্তপ্রহরা তথা স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ওপরেও বর্তায়। এই অপরাধে তথাকথিত "অনুপ্রবেশকারী" যদি শাস্তি পায়, তাহলে অপরপক্ষ কী শাস্তি পাচ্ছে, সেটাও জানার অধিকার তথ্যের অধিকার আইনে থাকা উচিত। এই কাঁটাতার পার হয়ে আসা মানুষদের একটা বড়ো অংশ মুসলমানবিরোধী, হয়তো প্রতিবেশী দেশের সংখালঘুনীতির কারণে, ফলে বিজেপির ভোটার। তারা ২০১৯ এর সিএএ অনুযায়ী নাগরিকত্ব পাবেন এই প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে আজ চন্দ্রধর দাসের মত পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। এছাড়াও ওদেশে নানা অপরাধ করে নাম বদলে এদেশে অনেকে পালিয়ে আছেন, (উল্টোটাও সত্যি হতে পারে) যা দু-দেশের পক্ষেই ক্ষতিকর। এই সমস্ত মানুষের অগাধ নিশ্ছিদ্র বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাদের ভুল বুঝিয়ে নাগরিকত্ব দেওয়ার নাম করে শিবির করে তাদের দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া হয়েছে যে তারা বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে এসেছে। এখন বেনাগরিক হওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো পথ নেই। 

    এই যে হিমালয় সম প্রতারণা, তার কি দরকার ছিল? সহজ সরল আইনি সমাধান থাকলে মানুষ অপরাধ কম করে। ভারত সরকারের কি আদৌ কোনো বর্ডার পলিসি আছে?  ভারতের সীমান্তবর্তী দেশগুলির মধ্যে সাতটি স্থল প্রতিবেশী রয়েছে, যেমন পাকিস্তান, চীন, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, মায়ানমার এবং আফগানিস্তান এবং দুটি সমুদ্র প্রতিবেশী, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপ। এই নয়টি দেশ ভারতের আন্তর্জাতিক সীমান্তের অংশ, যা স্থল এবং অন্যান্য সামুদ্রিক সীমানা প্রায় ১৫,১০৬ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। এর মধ্যে ভারত বাংলাদেশ সীমানা হল ৪০৯৬.৭ কিলোমিটার। এত বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সীমানার মধ্যে কেন ভারত বাংলাদেশ সীমানায় এই সংঘাত বন্ধ করা যায় না? অথচ বহু খোলা বর্ডার আছে। সেখানে অপরাধের তো এমন অভিযোগ আসে না। কেন যেখানে কাঁটাতার  সেখানেই গোলমালের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি? আর সবার ওপরে আজও সর্বোচ্চ সত্য হল আমাদের সংবিধানের নাগরিকত্ব আইনের ছয় নম্বর ধারা, যেখানে বলা হয়েছে ১৯৩৫ সালের ভারতবর্ষের মানচিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন অংশের কোনো অধিবাসী নিজে, বা তার বাবা- মা, বা ঠাকুরদা ঠাকুরমা, বা, দাদু দিদা যদি অবিভক্ত ভারতে জন্মগ্রহণ করে থাকেন, তবে তিনি যদি বিভক্ত ভারতে এসে বসবাস করতে চান, তাহলে তিনি ভারতের নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবেন।

    আইন কারো মুখের কথায় পরিবর্তিত হয় না। ভারতের সংবিধান বইয়ের ২০২৫ এডিশনের থেকে এর ছবি দিলাম। এর পরেও ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষায় কথা বলে কাউকে বাংলাদেশী বলা যায় কি? বাঙালিকে ঘুসপেটিয়া বলা কেন অপরাধ বলে গণ্য হবে না? বিদগ্ধ মহলের উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    | | | | | | | | | 2
  • প্রবন্ধ | ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন