এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  সমোস্কিতি

  • মাকড়সার বাসা (স্পাই থ্রিলার)

    c
    সমোস্কিতি | ১৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১০৭৮ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • খবরের কাগজের লোকেরা কায়দা করে যে জায়গাটাকে লুটিয়েন্স ডেলহি বলে, সেটা মোটামুটি দিল্লি শহরের চতুষ্কোণ হৃৎপিণ্ড। পুবে ইন্ডিয়া গেট, পশ্চিমে রাষ্ট্রপতির বাসভবন, দক্ষিণে লোদি গার্ডেন আর উত্তরে কনোট প্লেস -- এই চারটি বিন্দু দিয়ে ঘেরা হাজার খানেক সরকারি বাংলো সমেত আঠাশ বর্গ কিলোমিটার এলাকা থেকে বত্রিশ লক্ষ সাতাশি হাজার দুশো তেষট্টি বর্গ কিলোমিটার আয়তনের দেশটির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়, একথা ভাবলে কল্পেশের পেট গুরগুর করে। অথচ সে বড় হয়েছে এই শহরেই, এই চতুষ্কোণের ভিতরে ঘটে যাওয়া অজস্র রোমাঞ্চকর গল্প শুনে তার ছোটবেলা কেটেছে। এখনও তার প্রতি রোববার সন্ধ্যে কাটে চিত্তরঞ্জন পার্কে দাদুর কাছে জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে পর্যুদস্ত করার কাহিনী শুনে। তার দাদু অর্থাৎ মায়ের বাবা অবনীমোহন বসু ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্সের জগতে এক বৃদ্ধ শকুন। অবনীমোহন অনেকদিন আগেই অবসর নিলেও জনান্তিকে লোকে বলাবলি করে ইন্ডিয়ান গভমেন্ট বুড়োকে দিল্লিতে রেখে দিয়েছে কেননা বুড়োর মগজ থেকে সব তথ্য এখনও আইবির ডেটাবেসে তোলা সম্ভব হয়নি। এ হেন অবনীমোহনের নাতি ইয়ং অ্যান্ড হ্যান্ডসাম কল্পেশ বসুকে যখন ডিপার্টমেন্ট থারটিনে পাঠানো হল, অনেকেই ভুরু কুঁচকেছিল। কল্পেশ নিজে নাক দিয়ে ফোঁসফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে মেট্রো থেকে নেবে এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে হাজির হয়েছিল ডিপার্টমেন্ট থার্টিনের বাড়ীটার সামনে। কনোট প্লেস জায়গাটা তিনটে কনসেন্ট্রিক সার্কেল দিয়ে ঘেরা। সাতটা রেডিয়াল রোড তিনটে সার্কেলকে সমানভাগে ভাগ করেছে। এর মধ্যে তিন নম্বর ও চারনম্বর রেডিয়াল রোডের মাঝামাঝি মিডল সার্কেলে আইবির ডিপার্টমেন্ট থার্টিন অবস্থিত। বাড়িটা বাইরে থেকে দেখলে একটা আদ্যিকালের সরকারি অফিস ছাড়া কিছুই মনে হয়না, যেখানে ফাইলের ওপর ফাইল আর মাকড়সার জাল জমে আছে। বস্তুতপক্ষে, আইবির অন্দরে ডিপার্টমেন্ট থার্টিনের নিকনেম হল মাকড়ি কা ঘোসলা। অর্থাৎ মাকড়সার বাসা। একতলাটা একটা বিমার অফিস যেখানে, কল্পেশ দেখেছিল, তালা ঝুলছে। সে তালা জন্মে খোলা হবে বলে মনে হয়নি। পাশ দিয়ে একটা রোগা সিঁড়ী উঠে গেছে দোতলায়। সিঁড়ীতে পুরু ধুলো আর অজস্র হাবিজাবি জঞ্জাল। ওপরে উঠে কল্পেশ দেখেছিল গোটা বাড়িটাই আবর্জনার সমুদ্র। কোল্গেটের খাপ, প্লাস্টিকের বাক্স, ফেলে দেওয়া পলিথিন, ভাঙা চিরুনি, মদের বোতল, খাবারের প্যাকেট গোটা বাড়ির অভ্যন্তরে বিন্যস্ত। দোতলা আর তিনতলা জুড়ে ডিপার্টমেন্ট থার্টিন। মাকড়ি কা ঘোসলা। ব্যাস।

    দোতলায় কাউকে না পেয়ে চোরের মতন সিঁড়ী বেয়ে তিনতলায় উঠে সামনের অফিসটায় উঁকি মেরে কল্পেশ মাকড়সার বাসার মাকড়সাটিকে দেখেছিল। টেবিলের ওপর মুখ রেখে ঘুমোচ্ছে অকাতরে। একটা লোক এরকম লোমশ হতে পারে কল্পেশ জীবনেও কল্পনা করেনি, তার ওপর হাট করে দরজা খুলে ডিউটি আওয়ার্সে ঘুম দিচ্ছে, এই কিনা সিক্রেট এজেন্ট বন্ড জেমস বন্ড? সবমিলিয়ে তার মনটা দমে গেল। দরজায় টোকা শুনে মাকড়সার মত চোখেই তাকিয়েছিল সতীশ পট্টনায়েক, তারপর ব্যাঙের মত গলায় জিজ্ঞেস করেছিল কল্পেশ বসু? রাজধানীর ভুয়ো বোম্ব থ্রেট মিশনে সাসপেন্ডেড? দেখি তোমার কাগজ। রাগে গা পিত্তি জ্বলে গেছিল কল্পেশের। এইভাবে কেউ অচেনা লোকের সঙ্গে কথা শুরু করে? কাগজ বাড়িয়ে দিতে দিতে গুমগুমে গলায় বলেছিল, সাসপেন্ড তো হইনি। আমাকে এই ডিপার্টমেন্টে ট্রান্সফার করা হয়েছে। একই ব্যাপার, একই ব্যাপার, মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নেড়ে জবাব দিয়েছিল পট্টনায়েক। তারপর ড্রয়ার টেনে কাগজগুলো গুঁজে দিয়ে বলেছিল, পাশের ঘরে গিয়ে টোকা দাও। একজন সরুমতন ভদ্রমহিলাকে পাবে। উনিই এখানে হেড অফ অপারেশনস। উনি তোমাকে নেক্সট মিশনের জন্য ব্রিফিং দিয়ে দেবেন। যাও ইয়ংম্যান, বলেই টেবিলে পা তুলে চেয়ারে এলিয়ে চোখ বুজে ফেলেছিল সতীশ পট্টনায়েক। কল্পেশ আর কি করে? লোকটার নাকডাকার ক্ষমতায় যুগপৎ অবাক ও বিরক্ত হয়ে ছিটকে বেরিয়ে এসেছিল ঘরটা থেকে। পাশের ঘরের দরজা ঠুকতেই এক পঞ্চাশোর্ধ মহিলা উঁকি দিয়েছিলেন। কল্পেশ সংক্ষেপে জানিয়েছিল ঘটনামালা। মহিলা ফিক করে হেসে ঘরের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেলেন। পরক্ষণেই আবির্ভূত হয়ে কল্পেশের হাতে দুখানা জিনিস ধরিয়ে দিলেন -- একটা ঝাঁটা আর একটা ফাঁকা বালতি। দোতলায় রান্নাঘরটা সাফ করতে হবে। সিঁড়ী দিয়ে নেমে বাঁদিকে। আমি আসছি একটু পরে। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। কল্পেশ বোকার মত হাতে বালতি আর ঝাঁটা ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • kk | ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ০২:৫৬747250
  • বটে? ইন্টারেস্টিং! চলুক।
  • c | ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৫:৩৫747251
  • রান্নাঘরের মেঝে থেকে জঞ্জাল জড়ো করছিল কল্পেশ। সিঙ্কের পাশে একজোড়া রাবারের দস্তানা পেয়েছিল, সেগুলো পরে। মেঝেতে উবু হয়ে বসে নিবিষ্ট মনে সে ময়লা ঘাঁটছিল। মেঝের ওপর এতরকম হাবিজাবি জিনিস জমা হয়েছে, একদিনে পরিষ্কার করা সম্ভব হবেনা। তবুও যতটা পারা যায়। বাঃ, তুমি তো বেশ সাফসুতরো করে ফেলেছ দেখছি, ছেলেরা সাধারণত এসব পারেনা। বাঙালি ছেলেরা পারে এরকম? চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলেন সেই কেরালাইট মহিলা, আঞ্জু ভারগিজ। বলে ভেতরে ঢুকে এসে নিজেও হাত লাগান। কখন তিনি তেতলা থেকে নেমে এসেছেন কল্পেশ টের পায়নি। সে জানায় যে, সব বাঙালি ছেলেরা মোটেই এসব পারে না, কিন্তু সে তো দেরাদুনে বোর্ডিং স্কুলে বড় হয়েছে। সেখানে নিজের ঘর নিজেকেই পরিষ্কার রাখতে হত। তার মা তো সেখানে থাকত না। দেরাদুন আর মায়ের কথা ভাবতেই কল্পেশের মনে পড়ে যায় মায়ের সাথে তার দেখা হত বছরে একবার। সরিতা থাকত লন্ডনে, এখনও সেখানেই থাকে, পড়ায় লন্ডন স্কুল অফ ইকনোমিক্সে। কল্পেশ যখন বোর্ডিং স্কুলে পড়ত, সরিতা বছরে একবার দেশে আসত অন্য কোন কাজের ছুতোয়, তারপর দেরাদুনে গিয়ে ছেলের সঙ্গে একবার দেখা করত। দিল্লিতে চিত্তরঞ্জন পার্কের বাড়িতে কল্পেশ কোনদিন মাকে দেখেনি। দাদুর সঙ্গে তার মা কোন যোগাযোগ রাখত না। মায়ের এরকম অদ্ভুত আচরণের কারণ তার দাদুকে জিজ্ঞেস করলে অবনীমোহন বলতেন, শি ইজ আ মাইগ্রেটরি বার্ড। পরিযায়ী পাখিরা রহস্যময়ভাবে পথ ঠিক করে, শি ফ্লাইজ ইন হার মিস্টিরিয়াস ওয়েজ। কল্পেশ ঠিক বোঝেনি এসব কথা, কেবল সে জানত তার পরিবার অন্য ছেলেদের মত নয়। যেমন তার স্কুলের ফর্মে তার বাবার নামের জায়গাটা সে বিলকুল ফাঁকা রেখে দিত। মা কবে একবার বলে দিয়েছিল, পেরেন্ট হিসেবে আমার নাম লিখবে তুমি, দ্যাটস এনাফ। ব্যাস। কল্পেশ আর কোনোদিন কিছু জিজ্ঞেস করেনি। সে কি হিন্দি সিরিয়ালের ন্যাকা বাচ্চা নাকি যে দশবার সিঙ্গল মমকে গিয়ে খোঁচাবে বাপি কোথায়? বাপি কোথায়? ভাবলেই হাসি পেয়ে যেত কল্পেশের, সেই স্কুলে পড়ার বয়েসেই। ধুস! সে তো বরাবরই একা বাঁচবে, অলরেডি ঠিক করে নিয়েছিল সে। স্পাইদের কোনো বন্ধু-বাবা-মা থাকে নাকি? তাকে তো বার্লিনের হোটেলে রাশিয়ান এজেন্টরা খুন করতে আসবে। পালাতে হবে তৎক্ষণাৎ। হুঁহুঁবাবা, স্পাই হওয়া চাট্টিখানি কথা না। নো ফ্রেন্ডস ফরএভার, নো পার্মানেন্ট পার্টনার। সে বুঝে গেছিল। সেই বয়েসেই। অবশ্য তাকে হেল্প করেছিল ইস্কুল লাইব্রেরির বইগুলো। প্রত্যেকবার দেরাদুন থেকে দিল্লি যাতায়াতের সময় ট্রেনে সে গোগ্রাসে গিলত ফ্রেদেরিক ফরসাইথ, রবার্ট লুডলাম আর টম ক্ল্যান্সির বইগুলো। আর একটু বড় হয়ে জর্জ স্মাইলি। একবার সে দিল্লিগামী ট্রেনে সারারাত গোগ্রাসে গিলেছিল স্মাইলিজ পিপল। আর দেরাদুন ফেরার পথে পড়েছিল দা রুম অন দা রুফ। হ্যাঁ, স্পাই ফিকশনগুলোর মাঝে একমাত্র রাস্কিন বন্ড পড়তেই তার ভালো লাগত আর সেটা দেরাদুনের জন্য। স্পাইদের কোনো বন্ধু-বাবা-মা থাকে না, কিন্তু কিছু বিশেষ শহরের স্মৃতি থাকে। ওটুকু এলাউড।

    আঞ্জুর প্রশ্নের উত্তরে মায়ের উল্লেখ করে ফেলে লজ্জায় পড়ে যায় কল্পেশ। আঞ্জু হেসে বলে, বুঝেছি, বুঝেছি, তুমি এএম বাসুর নাতি। তুমি তো আলাদা হবেই। তারপর আঞ্জু বলে, এএম বাসুর আমলে ইন্টেলিজেন্স ছিল অন্যরকম। তাঁরা কত দক্ষতার সঙ্গে পুরো সিস্টেমটা চালিয়েছেন। আঞ্জুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে পুরনো দিনের স্মৃতিচারণা করতে করতে। সে বলে তখনকার দিনে আমরা ছিলাম গুড ভার্সেস ইভিলের লড়াইয়ে গুডের পক্ষে। পূর্ব পাকিস্তানে যখন ম্যাসাকার চলছিল, আমরা বাংলাদেশের ফ্রিডম ফাইটারদের হেল্প করেছি। শ্রীলংকায় শান্তি ফেরাতে আমরা পিসকিপিং ফোর্স পাঠিয়েছি। কিন্তু এখন? এখন সব দুর্নীতি আর অপদার্থতায় ভরে গেছে। আমরা গুড ভার্সেস ইভিলের লড়াইতে কোনদিকে আছি নিজেরাই জানিনা। এই ইন্টেলিজেন্সের জগত আমার ভালো লাগে না। কল্পেশ টের পায় আঞ্জুর ভেতর থেকে সিরিয়ান ক্রিশ্চিয়ান সত্তাটা বেড়িয়ে এসেছে। সে প্রসঙ্গ পাল্টাতে জিজ্ঞেস করে, আপনি এই ডিপার্টমেন্টে কিভাবে এলেন? আমি তো টাইপিস্ট ছিলাম, আঞ্জু একগাল হেসে বলে, তারপর কম্পিউটার-টম্পিউটার এসে গেল। তো ওরা বলল, কম্পিউটার না শিখলে চলবে না। তখন সতীশ বলল ওর একজন সেক্রেটারি লাগবে। আমি চলে এলাম। কল্পেশ জিজ্ঞেস করে, এই ডিপার্টমেন্টে এখন কতজন রয়েছে? ওহো, ওরা আজকে সব সিনেমা দেখতে গেছে, আঞ্জু উত্তর দেয়, কাজ নেই তো কিছু। এইসময় সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ পেয়ে দুজনেই ঘুরে তাকায়। সতীশ পট্টনায়েক রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়। ঘরের ভেতর চোখ বুলিয়ে বলে, বাঃ, প্রথম মিশন বেশ সাকসেসফুলি কমপ্লিট করেছ দেখছি। আচ্ছা, তোমাকে আমি দ্বিতীয় মিশনে পাঠাচ্ছি। বেশ বিপজ্জনক কিন্তু এটা। একেবারে শত্রুপক্ষের ডেরায় ঢুকতে হবে। কল্পেশ উৎসুক মুখে তাকায়। পট্টনায়েক বলে, তুমি হেডকোয়ার্টারে গিয়ে প্রিয়দর্শিনী ভার্মার সঙ্গে দেখা করবে। ম্যাডাম ভার্মা তোমাকে একটা ফাইল দেবে। ফাইলটা নিয়ে খুব সাবধানে ফিরে আসবে। কল্পেশ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, সাবধানে কেন? পট্টনায়েক বলে, আমার ধারণা আমাকে যদি কেউ পার্সেল বোমা পাঠায় বা আন্থ্রাক্স পাঠায়, সেটা পাঠাবে প্রিয়দর্শিনী ভার্মা। কল্পেশ ইতস্তত করে ফের জিজ্ঞেস করে, একটা ফাইল আনতে আইবি হেডকোয়ার্টারে যেতে হবে? ওরা পিয়নকে দিয়ে পাঠিয়ে দিতে পারেনা? সতীশ পট্টনায়েক অবাক মুখে কল্পেশের দিকে তাকায়। তারপর বলে, এএম বাসুর নাতিকে স্পাইগিরির এবিসি শেখাতে হবে নাকি? আইবি হল ঘুঘুর বাসা। ফাইল কোন ঘুঘুর হাতে পড়বে কোনো ঠিক আছে? যাও যাও, বাস ধরে চলে যাও। আঞ্জু ওভেনে সসপ্যান বসিয়ে চায়ের সরঞ্জাম রেডি করছিল। তুম চায়ে পিয়োগে? সে জিজ্ঞেস করে পট্টনায়েককে। পট্টনায়েক ঘর থেকে তেতলার সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে জবাব দেয়, নাহ, সন্ধ্যে হয়ে এল। রাম টেনে শুয়ে পড়ব।
  • c | ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৪747252
  • আইবি হেডকোয়ার্টারে ডেপুটি ডিরেক্টর প্রিয়দর্শিনী ভার্মা নিজের অফিসে বসে পেপারওয়েটাকে হাতে ধরে ভাবছিল টেবিলের উল্টোদিকে বসা কল্পেশকে ছুঁড়ে মারলে কেমন হয়। তারপর ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করা উচিত হবে না বিবেচনা করে প্রিয়দর্শিনী পেপারওয়েটটা নামিয়ে রাখল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমার গোটা কেরিয়ারে তোমার মত অপদার্থ এজেন্ট আমি দেখিনি, কল্পেশ। তোমাকে আমি পাঠিয়েছিলাম একটা বোম্ব স্কোয়াড ইনস্পেকশনে ট্রেনি হিসেবে। তোমার ওপর কোনো দায়িত্ব ছিল না। তা সত্ত্বেও তুমি যেভাবে ছড়িয়েছ, সেটা প্রকাশ করার জন্য হিন্দিতে যথেষ্ট গালাগাল নেই। দেখুন ম্যাম, কল্পেশ গলা খাকরে বিনীতসুরে বলে, আমি সত্যি ভেবেছিলাম লোকটা টেররিস্ট। আমরা ক্যুপ বাই ক্যুপ চেক করতে করতে এগোচ্ছিলাম। লোকটাকে দেখেই আমার সন্দেহ হয়। তারপর কুকুর-টুকুর এনে বোম্ব স্কোয়াডের লোকেরা যখন থরোলি ইনভেস্টিগেট করছে, লোকটা ঘাবড়ে গিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে পালাতে যায়। ওই মুহূর্তে আমার মাথায় আর কিছু কাজ করেনি, জাস্ট এদিকের দরজাটা দিয়ে প্ল্যাটফর্মে ঝাঁপিয়ে লোকটাকে চেজ করি। নাগালে পেতেই লোকটার শার্ট টেনে ধরে প্ল্যাটফর্মে আছড়ে ফেলি। লোকটা আমাকে ওই অবস্থায় কামড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। অন গড বলছি ম্যাডাম, আপনি লুইস সুয়ারেজকে চেনেন তো? আমি বাধ্য হয়ে লোকটার চোয়ালে ঘুষি মেরে অজ্ঞান করে দিই। হি ইজ অ্যান অনারেবল এমএলএ ফ্রম ইউপি, কল্পেশ, ম্যাডাম ভার্মা ধমকে ওঠেন। হ্যাঁ, কিন্তু সোনার বিস্কুট পাওয়া গেল তো, কল্পেশ বলল, তাই তো নার্ভাস হয়ে পালানোর চেষ্টা করছিল। বাট হি ইজ নো টেরোরিস্ট, ম্যাডাম ভার্মা ফের ধমকে ওঠেন, এমএলএকে ঘুষি মারার দায়ে তোমাকে সাসপেন্ড করাই উচিত ছিল। নেহাত তোমার দাদু ফোন-টোন করে রিকোয়েস্ট করলেন। কেরিয়ারের শুরুতেই তুমি চমৎকার রেকর্ড তৈরি করে ফেলেছ। যাও, পট্টনায়েকের পিঁজরাপোলে দিন কাটাও। ফাইলটা নিয়ে দয়া করে বিদেয় হও। তোমার থোবড়া আর দেখতে চাইনা। ইয়েস ম্যাম, বলে কল্পেশ মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁপ ছাড়ে। ধূসর মুখে কল্পেশ এলিভেটরের দিকে এগিয়ে যায়। আইডি? লিফটম্যান আইডি দেখতে চায়। কল্পেশ মিনমিনে মুখে বলে, আইডি তো নেই ভাই। ওঠার সময় অন্য লিফটম্যান আমার পাসটা নিয়ে নিয়েছে। তুমি একটু কনসিডার কর না। লিফটম্যান একটা টেম্পোরারি পাস বাড়িয়ে দ্যায়, সাইন করাকে আইয়ে। কল্পেশ লিফটম্যানের নিষ্ঠুর মুখের দিকে তাকায়। তারপর পায়ে পায়ে ম্যাডাম ভার্মার অফিসের দিকে এগোয়। দরজা ঠকঠক। কাম ইন। ম্যাম, কল্পেশ ঢুকে পাসটা এগিয়ে দেয়। প্রিয়দর্শিনী ভার্মা রোষকষায়িত চোখে কল্পেশের দিকে তাকিয়ে বিনা বাক্যব্যয়ে কাগজটায় খসখস করে সই করে দেয়। কল্পেশ সেকেন্ড টাইম ঘাড় নিচু করে বিদায় নেয়। আইবি হেডকোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে কল্পেশ উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে থাকে। ব্যাটারা ডিপার্টমেন্ট থার্টিনের এজেন্টদের সঙ্গে ক্রিমিন্যালের চাইতেও খারাপ ব্যবহার করে। এর কারণ আর কিছুই না। চরম ইনসিকিয়োরিটি থেকে ঘৃণা, যদি ওদেরকেও একদিন বদলি করে দেয়, যদি ওরাও একদিন ফেকলু, বাতিল হয়ে যায়। কল্পেশের মাথাটা গরম হয়ে যায়। কিছুক্ষণ এদিকওদিক হাওয়া খেয়ে সে কনোট প্লেসে ফিরে আসে।

    দোতলায় একটা ঘরে আলো জ্বেলে ডেস্কে বসে সে ম্যাডাম ভার্মার দেওয়া ফাইলটা পড়তে থাকে। ফাইলটা একটুকরো প্রেডিক্টিভ ইন্টেলিজেন্সের সামারি ও তার সঙ্গে ইন্টার্নাল রিপোর্ট। আইবি কোনো সূত্রে খবর পেয়েছে দিল্লি শহরের তিন জায়গায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটতে যাচ্ছে। ব্যাস এটুকুই। কারা ঘটাবে, কেন, কীভাবে -- সে সম্পর্কে সোর্স নিরুত্তর। এবার ইন্টার্নাল রিপোর্টটা পড়ে কল্পেশ। সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট। দেশের ভেতরে পর্যবেক্ষণে রাখা বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনগুলোর একটা তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। তারপর বলা হয়েছে দেশের বাইরের কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনেরও এ ব্যাপারে হাত থাকতে পারে। ফাইলটা ভাঁজ করে কল্পেশ তিনতলায় গিয়ে পট্টনায়েকের ঘরে উঁকি দেয়। পট্টনায়েক যথারীতি উপুড় হয়ে সোফায় নাক ডাকছিল। কল্পেশ ফাইলটা টেবিলে রেখে নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে। তারপর বাড়ি চলে যায়।
  • অমিতাভ চক্রবর্ত্তী | ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৫747254
  • yes
    ফরসাইথ - সে কোন অন্য জনমের গল্প। আমি অবশ্য বাংলা অনুবাদে পড়ছি। আঠা-কাগজের গায়ে মাছির মত এঁটে থাকতাম।
  • c | ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ২২:৪০747265
  • পট্টনায়েকের ঘুমের ভেতর উজ্জ্বল মাছেরা খেলা করছিল। সারাজীবন ধরে পট্টনায়েক মাছ ধরতে চেয়েছে। দিল্লি শহরটা তার কোনোদিন পছন্দ হয়নি। সে মনে মনে ভাবে, রিটায়ার করে সে ফিরে যাবে ওড়িশায়, বালাসোর জেলায় তাদের একটা বংশগত বাড়ি আছে। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বুড়োবালাং নদী। নদীতে ছিপ ডুবিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকবে পট্টনায়েক আর ভুলে যাবে যত নোংরা কাজ তাকে করতে হয়েছে ইন্টেলিজেন্স অফিসার হিসাবে। তখন কি তার মনে হবে দিল্লির জীবন যেন গতজন্মের কথা? ঠিক করে রেখেছে পট্টনায়েক, বুড়ো বালাংয়ের তীরেই সে মারা যাবে। এই তার ঊনচল্লিশ বছরের গুপ্তচর জীবনের সবচেয়ে গোপন কথা।

    বোমা ফাটার মত নিজের পাদের আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় পট্টনায়েকের। মাশরুম ক্লাউড ধীরে ধীরে গোটা ঘরটাকে ঢেকে দেয় পচা গন্ধে। মুখে বাসি মদের কষ আর অম্বুলে বমির স্বাদ নিয়ে চোখ খুলে পট্টনায়েক প্রথমেই দরজার দিকে তাকায়। হাতটা অভ্যেসবশত বালিশের তলায় চলে যায়। সেখানে কোনো পিস্তল নেই যদিও। নীচে থেকে কোনো আওয়াজ আসছে না তো? আপদগুলো তাহলে এখনও এসে জোটেনি। ঘড়ি দ্যাখে পট্টনায়েক। নটা সতেরো। তারপর জলের বোতল খুঁজতে গিয়ে চোখে পড়ে ফাইলটা টেবিলের ওপর। হুম, ফাইলটা হাতে নিয়ে ওল্টায় পট্টনায়েক। শালা বলে কি? তিনজায়গায় বিস্ফোরণ? পট্টনায়েক ফাইলটা টেবিলে রেখে ফের শুয়ে পড়ে, গায়ে একটা চাদর টেনে নেয়। ফাইনালি বেলার দিকে উঠে যখন সে দোতলায় নাবে, সিঁড়ি থেকেই টের পায় দিব্যি গুলতানি চলছে। গার্গী, অনন্ত আর যোগেনপ্রসাদের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে ফেলেছে কল্পেশ। আঞ্জু অনন্ত আর যোগেনপ্রসাদকে লাগিয়েছে ঘর ঝাঁট দেবার কাজে। গার্গী কম্পিউটারে কিছু চেক করছিল। এইসময় সতীশ পট্টনায়েক ঘরে এসে ঢোকে। আঞ্জু ছাড়া বাকি চারজন উৎসুক মুখে তাকায়। পট্টনায়েক বলে, আমি বেরচ্ছি। তোমাদের কাজ হচ্ছে ফোর্ট আগলে রাখা। বলা যায়না, যদি কোন উগ্রপন্থী-টুগ্রপন্থী এখানে ঠিকানা ভুল করে হাগতে আসে। কালকের ফাইলটা? কল্পেশ উদগ্রীব ভাবে জানতে চায়। কি ফাইল? অনন্ত প্রশ্ন করে। কল্পেশ জানায়, কালকে সে ম্যাডাম ভার্মার কাছ থেকে যে ফাইলটা নিয়ে এসেছে, তাতে দিল্লিতে টেরোরিস্ট এটাকের অনুমান করা হয়েছে। আমাদের প্ল্যানটা কি? গার্গী জিজ্ঞেস করে, হোয়াট শুড উই ডু? পট্টনায়েক এদের এনথু দেখে খচে গিয়ে মেঘের মত গর্জন করে, উই ডু নাথিং। তোমাদের মত গোটাচারেক অপোগণ্ড যদি কোন জঙ্গি সংগঠনের প্ল্যান ভেস্তে দিতে পারে, তাহলে সেরকম জঙ্গিদের থুতু ফেলে ডুবে মরা উচিত। আইবির ম্যাও আইবি সামলাবে। ম্যাডাম ভার্মা একটা টাইমবোমা এই ডিপার্টমেন্টে চালান করতে চাইছে। বলতে বলতে স্বপ্নাচ্ছন্ন হয়ে বিড়বিড় করতে থাকে পট্টনায়েক, বাট আই ডু হোপ ... বাট আই ডু হোপ ... ওই তিনটে বোমার অন্তত একটা যদি এই বাড়িটাকে উড়িয়ে দেয়, আমাকে তোমাদের শ্রীমুখগুলো দেখতে হয়না। পিছু হটতে হটতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় পট্টনায়েক। ওরা চারজন ঘরে স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে থাকে। হি ইজ ইন আ ব্যাড মুড, আঞ্জু পিছন থেকে স্বগতোক্তি করে।

    এরপর কয়েকঘন্টা সতীশ পট্টনায়েকের কোন খোঁজ পাওয়া যায়না। সে শহরের আনাচেকানাচে কোথায় ঘুরছিল কেউ তা বলতে পারে না। কিন্তু বিকেল পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটা নাগাদ তাকে দেখা যায় দিল্লি শহরের প্রান্তে যমুনার ঘাটে। রোদ তখন পড়ে এসছে, বেঞ্চিতে বসে যমুনার ওপর পুরনো লোহার ব্রিজটার দিকে তাকিয়ে একটা লালসুতো বিড়ি ধরায় পট্টনায়েক। যমুনার কাদাটে বিষাক্ত জল আর পচাগলা কারকাসের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে পট্টনায়েক লক্ষ্য করে পিছনে কংক্রিটের বেজন্মা দেয়ালটার ওদিকে একটা সাদা এসইউভি এসে দাঁড়িয়েছে। গাড়িটার দরজা খুলে নেমে আসে প্রিয়দর্শিনী ভার্মা। সাবধানে হিলতোলা জুতো পায়ে হেঁটে এসে পট্টনায়েকের পাশের বেঞ্চিতে বসে। তোমার ড্রাইভার কতটা বিশ্বাসযোগ্য বলত? পট্টনায়েক তেরছা মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়, এইভাবে যমুনার ধারে দেখা করলে যদি আইবির অন্দরে রটে যায় ম্যাডাম ভার্মা প্রেম করছেন? হাজার হোক, এ জায়গাটার একটা দুর্নাম আছে তো। প্রিয়দর্শিনী কেজো গলায় জবাব দেয়, এইখানেই শ্রীকৃষ্ণ দেখা করতেন রাধার সঙ্গে? চান না করে? দাঁত ব্রাশ না করে? গায়ে গন্ধগোকুলের মত গন্ধ নিয়ে? আর হলুদ কারির ছোপ লাগা শার্ট পরে? যা মাইনে পাই, তাতে ভালো জামা কিনব কি করে? তোমাদের মত এসইউভিতে চড়ার পয়সা পাই নাকি? কাঁচুমাচু মুখে জানায় পট্টনায়েক। ম্যাডাম ভার্মা কথাটায় কান না দিয়ে বলে, যে ফাইলটা কল্পেশ কাল নিয়ে গেছে, ওটা দেখেছ আশা করি? তোমার ইন্টুইশন কি বলছে? সতীশ পট্টনায়েক ছোট হয়ে আসা বিড়িটায় দুটো টান মেরে ফেলে দেয়। তারপর আরেকটা ধরায়, ধরিয়ে বলে, আমার ডিপার্টমেন্টের পিছনে লেগেছ কেন, প্রিয়দর্শিনী? তোমার হাতে একগাদা এজেন্ট। আইবির অফুরান রিসোর্স। তুমি একটা মামুলি টেররিস্ট থ্রেটের তদন্ত করতে আমার ডিপার্টমেন্টকে জড়াচ্ছ কেন? ম্যাডাম ভার্মা নিরুত্তর মুখে যমুনার জল আর সূর্যাস্ত দেখতে থাকে। সতীশ পট্টনায়েক নিজেই আপনমনে বলে, কেননা ইউ ওয়ান্ট টু চেক সামথিং অফ দা বুক। সেইটে কি? প্রিয়দর্শিনী উত্তর দেয়, অ্যান্টি-টেরোরিজম স্কোয়াড এখন অনেক এফিশিয়েন্ট হয়েছে। টেররিস্ট এটাক প্রেডিক্ট করা বা আটকানোর ব্যাপারে আগের তুলনায় আমরা অনেক স্কিলড। কেউ চট করে আমাদের ধোঁকা দিয়ে যেতে পারবে না। কিন্তু দেয়ার ইজ অলওয়েজ ইডিওসিঙ্ক্র্যাটিক রিস্ক। ধরো একটা নতুন গ্রুপ, যাদের সম্বন্ধে আমরা কিচ্ছু জানিনা, তারা ফার্স্ট মুভ করছে। আমাদের ছড়ানো জাল এই মুভমেন্ট ডিটেক্ট করতে পারবে না। সাধারণত বড় জঙ্গি সংগঠন থেকে আমরা খবর পাবই। কিন্তু এক্ষেত্রে পাচ্ছি না। সোর্স কেবল একটা কানাঘুষো রিপিট করছে, থ্রি প্লেসেস ইন ডেলহি। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, এটা একটা নতুন গ্রুপ। প্রিয়দর্শিনী চুপ করে যায়। সতীশ পট্টনায়েক হঠাত ক্যাজুয়ালি বলে, আজকে এক বন্ধুর সঙ্গে অনেকদিন পর দেখা হল। সে বলল, মন্ত্রীমশাইয়ের দপ্তর থেকে নাকি আইবির ওপর চাপ আসছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রিয়দর্শিনী বলে, সবাই তো তোমার মত মরা ডিপার্টমেন্টের হেড নয়। আমাদের কেরিয়ারে বসের কাছে নিয়মিত জবাব দিতে হয়। খুব সংগত কারণেই ওপরতলা মনে করছে ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো উচিত। তবেই এই এটাক আটকানো যাবে। তাহলে আর অসুবিধে কোথায়? সতীশ পট্টনায়েক হালকা গলায় বলে। সেটাই করছি, আমি বসে নেই, প্রিয়দর্শিনী ভার্মা খেঁকিয়ে ওঠে। তারপর গলা নামিয়ে বলে, আই গট আ টিপ। অ্যাঁ? উড়োফোন? পট্টনায়েক চোখ গোলগোল করে বলে। সামবডি কলড মাই অফিস, প্রিয়দর্শিনী বলে, আর্যসংগ্রাম নামে একটা গ্রুপের কয়েকজন সদস্য নাকি রিসেন্টলি শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘর ভাড়া নিয়েছে। আর্যসংগ্রাম? পট্টনায়েক কিছুক্ষণ ভেবে মাথা নাড়ে, উঁহু আগে শুনিনি নামটা। কিন্তু এ তো ইসলামিক জঙ্গি বলে মনে হচ্ছে না। দ্যাটস দা কোনানড্রাম, প্রিয়দর্শিনী উত্তর দেয়, আমি যদি এখন বুনো হাঁসের পিছনে রিসোর্স লাগাই, তারপর সেটা ব্যাকফায়ার করে, আমার কেরিয়ারের কি হবে? তাই বল, পট্টনায়েক ব্যাঙ্গের সুরে মন্তব্য করে, একমুহূর্তের জন্য মনে হল তুমি পাব্লিকের জন্য ভাবছ। পাব্লিকের কথা ভাবার জন্য পলিটিশিয়ানরা আছে, প্রিয়দর্শিনী উঠে পড়তে পড়তে বলে, আই হ্যাভ টু থিংক অফ মাই কেরিয়ার সো দ্যাট আই ডোন্ট এন্ড আপ লাইক য়ু। দয়া করে তোমার অপদার্থ টিমটাকে কাজে লাগাও, টিপটা ভেরিফাই করো। প্রিয়দর্শিনী গাড়িতে গিয়ে ওঠে। তারপর গাড়িটা হুস করে বেরিয়ে যায়। থ্রি প্লেসেস? হুঁ! পট্টনায়েক তিননম্বর বিড়িটা মাটিতে ফেলে পিষে দেয়। ধুর শালা!
  • c | ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৫:৪৮747271
  • অবনীমোহন জালের ওপর ঝুঁকে মৌমাছিগুলোকে দেখছিলেন। সাচ্ অ্যান অর্গানাইজড সোসাইটি, তিনি আপন মনেই বলে ওঠেন। খানিকটা দূরে বসে গ্রিলের ওপর বিফ কাবাবের টুকরোগুলোকে উল্টে দিচ্ছিল কল্পেশ। রোববার বিকেলে চিত্তরঞ্জন পার্কের বাড়িতে একচিলতে বাগানে বসে গল্প করছিল দুজনে। মৌমাছির পরিচর্যা করতে করতে অবনীমোহন বলেন, পট্টনায়েক ইজ আ গুড গাঈ। ও আমার ডানহাত ছিল। তুমি ওর কাছ থেকে মন দিয়ে কাজ শিখবে আর তোমাকে একটা ডেডএন্ড ডিপার্টমেন্টে পাঠানো হয়েছে বলে নিজের কাজকে কখনো অবহেলা কোরোনা যেন। কল্পেশ বলে, আমাকে কোনো কাজই তো দিচ্ছে না। যাহোক, তুমি নিজের চোখকান খোলা রাখবে, অবনীমোহন হাত ধুয়ে এসে আরামকেদারায় বসেন, যে স্পাই সে সারাক্ষণই স্পাই। এমনকি ঘুমের মধ্যেও। তোমাকে পেশোয়ারের ঘটনাটা বলেছি তো? কল্পেশ ঘাড় নাড়ে। তারপর দুজনে কাবাব খেতে থাকে। সে জানে, দাদুকে খোঁচালে চমৎকার সব গল্প পাওয়া যাবে। কখনও কখনও সে বেশ লোভী হয়ে পড়েছে। অবনীমোহনকে জিজ্ঞেস করে বসেছে, আচ্ছা, লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট তুমি দেখেছ? আচ্ছা, ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্স কখনও সুভাষ বোসের ব্যাপারে তদন্ত করেনি? অবনীমোহন মৃদু হেসে প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গেছেন। বলেছেন, ক্লাসিফায়েড ইনফরমেশন তো আমি তোমাকে দেবোনা। তবে এটুকু বলতে পারি, এসব ঘটনার সত্যিকারের বিবরণ পড়লে তোমার ভারী বোরিং লাগবে। অবনীমোহনের গল্প মূলত তাঁর নিজের অভিজ্ঞতাপ্রসূত আর তামাদি হয়ে যাওয়া ঘটনাপঞ্জির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। অন্যদিন হলে কল্পেশ দাদুকে উসকে দিত নতুন গল্পের লোভে, সেইসব সময়ের গল্প যখন ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্স মিত্রশক্তি আর সোভিয়েত ব্লকের পাওয়ার স্ট্রাগলের মধ্যে সাবধানে জাগলিং করছিল। কিন্তু আজকে কল্পেশ একটু চঞ্চল হয়ে আছে। প্রিয়দর্শিনী ভার্মা আইবির একটা রিপোর্ট পাঠিয়েছে আমাদের, কথায় কথায় বলে বসে কল্পেশ। অবনীমোহন মুখে কিছু না বলে কালো মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে ধারালো চোখদুটো কল্পেশের ওপর গেঁথে শুনতে থাকেন। মাঝে মাঝে হাত বুলিয়ে নেন নিজের মসৃণ পলিতকেশে। কল্পেশ গোটা ব্যাপারটাই খুলে বলে, যা যা সে জানে। সব শুনে অবনীমোহন প্রথম প্রশ্ন করেন, আইবির অ্যান্টি-টেরর স্কোয়াড থাকতে ফাইলটা ডিপার্টমেন্ট থার্টিনে পাঠানো হল কেন? কল্পেশ বলে, সেটাই তো ব্যাপার। মনে হচ্ছে কিছু একটা প্যাঁচ আছে এর মধ্যে, যার জন্য আইবি সরাসরি তদন্ত করতে পারছে না। শেডি বিজনেস! রিপোর্টে যে জঙ্গি সংস্থাগুলোর উল্লেখ দেখেছ, সেগুলো সব পাকিস্তান বেসড? কিছু পাকিস্তান, কিছু জে&কে, কল্পেশ উত্তর দেয়। অর ইট ক্যান বি সাম হোমগ্রোন লুনি, অবনীমোহন বিড়বিড় করেন। তারপর বলেন, ভেরি ওয়েল, এই হচ্ছে আমার সাজেশন। তুমি পট্টনায়েকের লিডারশীপ ফলো করবে। নিজে কিছু করতে যাবে না। আর তুমি কি রাতে ডিনার করে যাবে? গেটিং কোল্ড, ঘরে যাওয়া যাক? কল্পেশ বিষয়টা নিয়ে দাদু আরেকটু চিন্তা করবে ভেবেছিল। পেনাল্টিমেট প্রশ্নে হকচকিয়ে যায়। তারপর আস্তে বলে, শিয়োর। অবনীমোহন আরামকেদারা ছেড়ে উঠে ঘরের দিকে পা বাড়ান। কল্পেশ ইলেকট্রিকের আলোর নীচে পাজামা-পাঞ্জাবিপরা দাদুর দীর্ঘ অবয়বের দিকে তাকিয়ে থাকে।
  • c | ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২৭747272
  • ঘাঘু পাঠক নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছেন যে প্রিয়দর্শিনী ভার্মার অফিসে উড়োফোনটা পট্টনায়েকেরই কীর্তি। ঘটনা হচ্ছে, পট্টনায়েক পঞ্চাশ শতাংশ সত্যি বলেছিল। খোচরদের ওল্ড স্কুল নেটওয়ার্ক সূত্রে পট্টনায়েক খবর পেয়েছিল ঠিকই যে দুজন আর্যসেনা লাজপত নগর মার্কেটের কাছে একটা রদ্দিমার্কা হোটেলের দোতলায় উঠেছে, কিন্তু এই দুই মক্কেল ছাড়া আর কেউ শহরে ঢুকেছে কিনা বা ঘর ভাড়া নিয়েছে কিনা পট্টনায়েক জানেনা। যদিও ডেপুটি ডিরেক্টরকে গুলপট্টি দিতে পট্টনায়েক দুবার ভাবেনি কারণ দুয়ে দুয়ে চার হয়ে ফাইলটা নইলে আইবির হেডকোয়ার্টার থেকে কনোট প্লেসে আসত না আর ম্যাডাম ভার্মাও পট্টনায়েকের টিমকে জড়াত না। হ্যাঁ, ফাইলটা অবিশ্যি ফালতু, ওই ফাইলের রিপোর্টে যা লেখা ছিল, সে পট্টনায়েক এনিমি ক্যাম্প থেকে আগেই খবর পেয়ে গেছিল। এনিমি ক্যাম্প অর্থাৎ আইবির হেডকোয়ার্টার, সেখানে রাজধানীর বুকে টেরর থ্রেট নিয়ে ভূমিকম্পন শুরু হবে আর পট্টনায়েক খবর পাবে না, সে কি হয়? পট্টনায়েক তো কালকে মায়ের পেট থেকে পড়েনি। অতএব কল্পেশকে বেগার খাটিয়ে ও ম্যাডাম ভার্মার সামনে ন্যাকা সাজার অভিনয় করে এই পঞ্চম মাত্রার দাবায় প্রথম কিস্তি দিয়ে পট্টনায়েক ডিপার্টমেন্ট থারটিনের তেতলায় বসে অন্ধকারে শার্লক হোমসের মত বিড়ি টানছিল।

    ওরা সব বাড়ি চলে গেল, আঞ্জু ভারগিজ দরজায় এসে জানায়, আমিও চলে যাচ্ছি। ঠিক আছে, সাড়া দেয় পট্টনায়েক। আঞ্জু চলে যেতে গিয়েও ইতস্তত করে, আর উই গোয়িং টু কভার ফর দেম এগেইন? কী? পট্টনায়েক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। আঞ্জু বিষণ্ণমুখে বলে, হেডকোয়ার্টার থেকে যখনই ওরা আমাদের ফাইল পাঠায়, তার পিছনে একটা খারাপ উদ্দেশ্য থাকে। ওরা এই ডিপার্টমেন্টটাকে যতরকম শেন্যানিগ্যানসের জন্য ব্যবহার করে। কারণ এই ডিপার্টমেন্টটা তো অফিসিয়ালি এক্সিটই করেনা, ফলে ওদের ক্যাবিনেটের কাছে কোন জবাবদিহি করতে হয়না। আমি প্রিয়দর্শিনী ভার্মাকে পছন্দ করিনা। শি ইজ আ উইকেড লেডি। আঞ্জু দুদিকে মাথা নাড়ে। পট্টনায়েক স্তম্ভিত হয়ে পুরোটা শোনে, তারপর বলে, তোমার সারমন ঝাড়া শেষ হয়েছে? নাকি বাইবেল থেকে দুচারটে প্রভুর নির্দেশ পড়ে শোনাতে চাও? আঞ্জু আপনমনে বলে, আমি এএম বাসুর আমলের আইবি দেখেছি। সেকাল আর একালের মধ্যে কত তফাত! পট্টনায়েক তেতো গলায় বলে, এএম বাসুর আমলে তুমি তো ডাবল-ও-এজেন্ট ছিলে, তাইনা? ওহো, না, তুমি টাইপিস্ট ছিলে। চিঠিপত্তর টাইপ করতে তো খুটখুট করে? তারপর কম্পিউটার আসতেই তোমাকে তাড়িয়ে দিল? বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে বলে পট্টনায়েক। আঞ্জুর মুখটা কালো হয়ে যায় কিনা অন্ধকারে ঠাহর হয়না তার। আঞ্জু হিসহিসিয়ে ওঠে, ঘেন্না করি তোমার মত পুরুষদের, সতীশ। তারপর দুপদাপ করে পা ফেলে সিঁড়ি দিয়ে নেবে যায়, শুনতে পায় পট্টনায়েক।

    পট্টনায়েকের নিজের ভেতরে ব্যাঙ্গের কশাঘাত আছড়ে আছড়ে পড়তে থাকে। তার মনে পড়ে অনেকবছর আগে শ্রীনগরের একটা রাত। একটা অন্ধকার পর্দাটানা ঘরে মাঝরাতে অপেক্ষা করছে সে আর তার বস, অবনীমোহন বসু। তুমি ওটা কী টানছ হে? বিড়ি? ঠোঁটের ফাঁকে ডানহিলটা রেখে ঠোঁট না নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করেন অবনীমোহন। কোলকাতা গেলে নিয়ে আসি স্যার, পট্টনায়েক উত্তর দেয়, আমার লালসুতো ছাড়া চলেনা। ওয়ার্কিং ক্লাস স্পাই। অবনীমোহনের ঠোঁটের কোণে হাসিটা ফুটতে গিয়েও মিলিয়ে যায়। অন্যমনস্কভাবে বলেন, জীবনে এরকম চাপা উদ্বেগে কোনোদিন ভুগিনি, পট্টনায়েক। অবনীমোহন তখন কাশ্মীরে ফিদায়েন-ই-হিন্দ নামে একটা জঙ্গি সংগঠনে ইনফিল্ট্রেট করতে মরিয়া। কিন্তু যতরকম ছক কষেন, যত এজেন্ট পাঠান, একের পর এক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। সেদিন রাতে তাঁর ফিল্ড এজেন্টের খবর নিয়ে আসার কথা ছিল। সেরাতে শ্রীনগরের ওই পর্দাটানা হোটেলের খুপরি ঘরে ভোর চারটে অব্দি অপেক্ষা করেছিলেন বাসু ও পট্টনায়েক। ঘরটা তামাকের ধোঁয়ায় আবছা ধূসর হয়ে গিয়েছিল। ভোরবেলা খবর আসে লালচকে সাইকেলসমেত ঘাড় গুঁজড়ে পড়ে আছে অবনীমোহনের কনট্যাক্ট। ছ'বার গুলি করে ফেলে দিয়ে গেছিল লাশটাকে। ব্যর্থতা ও চূড়ান্ত পরাজয়। কিন্তু অবনীমোহন বসু কি জিনিস তখনও পট্টনায়েক বুঝতে পারেনি। শ্রীনগরের জামিয়া মসজিদের কাছে একটা রেস্তোরাঁ চালাতেন জাভেদ মাসুদ নামে এক ভদ্রলোক। অবনীমোহন তখন ঘনঘন শ্রীনগর যেতেন কাজে আর যখনি যেতেন, জাভেদ মাসুদের রেস্তোরাঁয় গিয়ে ব্রেকফাস্ট সারতেন। কাশ্মীরের বিখ্যাত রুটি তাঁর খুব পছন্দের ছিল। তো দোকানের মালিকের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত বন্ধুত্ব হয়ে যায়। কথায় কথায় তিনি জানতে পারেন নব্বইয়ের গোড়ায় যখন শ্রীনগর দারুণ অশান্ত, সেই গন্ডগোলের মধ্যে জাভেদ মাসুদের বড়ছেলে সমশের খুন হয়। কে খুন করে, কোন পক্ষের টার্গেট ছিল সে, কেনই বা -- এসব উত্তর মেলেনা, কিন্তু ঘটনাটা সত্যি, অবনীমোহন ভেরিফাই করেছিলেন। তখনো ঘটনাটা তাঁর কাছে ছিল শুধুই একটা দুঃখজনক ঘটনা, কিন্তু ফিদায়েনের সংগঠনে যখন তিনি এতটুকু ফুটো খুঁজে পাচ্ছেন না, সেইসময় একদিন জাভেদ মাসুদের দোকানে তাঁর নজরে পড়ে মালিকের ছোট ছেলেটি। কাউন্টারে বাপের পাশে দাঁড়িয়ে চোখ রগড়াচ্ছে। ফুটফুটে ফর্সা, রোগা ও লাজুক। উমর মাসুদ, ছেলেটির নাম, স্মৃতি ঘেঁটে বের করে পট্টনায়েক। অবনীমোহন হোটেলে ফিরে বলেছিলেন তাকে, একে আমরা রিক্রুট করব। একটা বাচ্চা ছেলেকে রিক্রুট করবার মানে পট্টনায়েক কিছুই বুঝতে পারেনি। ভেবেছিল বসের মাথাফাথা বিগড়ে গেল নাকি। কিন্তু অবনীমোহনের ততক্ষণে সমস্ত পরিকল্পনা ছকা হয়ে গিয়েছে। জাভেদভাইকে গিয়ে তিনি কনভিন্স করলেন ছেলেকে শ্রীনগরের ডামাডোলের মধ্যে না রাখতে। দূরে কোথাও পড়তে পাঠিয়ে দিতে। আগের ছেলেটিকে হারিয়ে জাভেদ মাসুদ রাজী হতে খুব একটা সময় নেননি। অবনীমোহনই সাজেস্ট করেছিলেন সিমলার একটি বোর্ডিং স্কুল। পট্টনায়েক তখনও চিনতে পারেনি তার বস কি জিনিস।

    অতএব হুঁ, তার কাছে কেউ যেন বলতে না আসে এএম বাসুর আমলে সব শান্তিকল্যাণ ছিল। বিড়িটা ঘষে নিভিয়ে পট্টনায়েক সোফায় লম্বা হয়ে পড়ে। তারপর একটা পাদ ছাড়ে এন্টি-এয়ারক্র্যাফট গানের মত। ট্যাররররররররর।
  • পাঠক  | ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:৪৮747275
  • দারুণ।
  • c | ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ২৩:২১747277
  • আরে বাঁয়ে নয়, ডাইনে ডাইনে, কল্পেশ হেঁকে ওঠে, রোকো রোকো। তারপর গার্গীকে বলে, এই জায়গাটা চিনি আমি, দাদুর লাইফ সার্টিফিকেট জমা দিতে এসেছিলাম একবার, ভাড়াটা দিয়ে দে। গার্গী অটো থেকে নেবে ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে থাকে। কল্পেশ জিনসের পকেটে হাত গুঁজে বলে, আরে অফিস থেকে রিইমবার্স করে দেবে তো তোকে। তুই আর আমি এখন এজেন্টস অন আ মিশন। গার্গী সাংমা অটোওলার হাতে নোট গুঁজে দিতে দিতে বলে, আমরা তাহলে টাকমাথাকে ফলো করব। অফিসে ব্রিফ করার সময় সতীশ পট্টনায়েক ওদের মাথায় পেরেক ঠুকে বুঝিয়েছে, দুজন টেররিস্ট। দুটো টিম। অনন্ত আর যোগেনপ্রসাদ ঢ্যাঙাটাকে ফলো করবে, কল্পেশ আর গার্গী টাকমাথাকে। যোগেনপ্রসাদ ঘাড় চুলকে বলে, ইয়ে অনন্ত থাকলে আমার এফিশিয়েন্সি কমে যাবে। আই প্রেফার টু হান্ট এলোন লাইক আ টাইগার, লাইক ডাবল-ও-সেভেন। অনন্ত আইয়ার পিছন থেকে ওকে খোঁচা মারে, গুলিটুলি চললে তোকে একাই সামলাতে দেব ভাই। চাপ নিস না। পট্টনায়েক দাবড়ে ওঠে, আমি এই ডিপার্টমেন্টের বস। যা বললাম, ফাইনাল। থেমে বলে, সারাদিন ওদের পিছনে চিপকে থাকবে। যদি ওরা পানওলার কাছে সিগ্রেট কেনে, পানওলার সঙ্গে কি কথা হল ফিরে এসে রিপোর্ট করবে। যদি পাবলিক টয়লেটে ঢুকে পায়খানা করে, পিছন পিছন গিয়ে হাগুর রঙ দেখে আসবে। এই দুজন আমাদের মার্কার। এদের ফলো করে বাকিগুলোকে ক্যাচ-কট-কট। গার্গী হাত তোলে। এটা কি কোচিং সেন্টার? পট্টনায়েক ধমক দেয়। গার্গী বলে, না, এই যে আর্যসংগ্রাম দলটি, এদের মোটিভ সম্বন্ধে আমরা কিছু খোঁজ পেয়েছি? খামোকা দিল্লিতে তিন জায়গায় বিস্ফোরণ ঘটাবে কেন? এনি আইডিওলজিক্যাল ডিস্ক্লেমার? পট্টনায়েক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, তোমাদের মাথায় সত্যি গোবর পোড়া আছে। তোমাদের মত গাম্বাটদের ফিল্ডে পাঠিয়ে আমাকে পস্তাতে হবে। কেউ লক্ষ্য করেনি আঞ্জু ভারগিজ কখন দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। সে হঠাত বলে, ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং। সবাই তার দিকে ঘুরে তাকায়। সে বেশ দৃপ্ত ভঙ্গীতে ব্যাখ্যা করে, কোন কোম্পানি যখন ফার্স্ট টাইম শেয়ার মার্কেটে শেয়ার বেচে, সেটাকে বলে আইপিও। সেরকম একটা নতুন টেররিস্ট অর্গানাইজেশন যখন প্রথম মুভ করে, আন্ডারওয়ার্ল্ডে আগেভাগে একটা কানাঘুষো রটিয়ে দেয় তারা কি করতে যাচ্ছে। এটা পোটেনশিয়াল ইনভেস্টরদের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য। এরপর ধামাকাটি ঘটলে তাদের ক্যাপাবিলিটির প্রমাণ পাওয়া যায় ও সেই অনুযায়ী ফান্ডিং ঢোকে। ইট রিয়েলি ডাজন্ট ম্যাটার হোয়াট দে সে এবাউট দেয়ার আইডিওলজি। ওগুলো রিক্রুট করার জন্য। এই আমি শিখেছি আইবির দপ্তরে এতদিন টাইপিস্ট হিসেবে কাজ করে। শেষ বাক্যটা আঞ্জু অর্থপূর্ণভাবে ছুঁড়ে দেয় পট্টনায়েকের উদ্দেশ্যে। কেবল কম্পিউটারটা যদি শিখে নিতে পারতে, বিড়বিড় করে পট্টনায়েক, তারপর হাসিমুখে বলে, ওয়েল দেবিয়ো অউর সজ্জনো, জবাব পেয়ে গেছ। এবার বেরিয়ে পড়ো। কাম ব্যাক ইন ফোর পিসেস।
  • c | ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:৫৭747279
  • পরপর দুদিন লোকদুটোর পেছনে ঘুরে ঘুরে সারা দিল্লি চষে ফেলে ওরা। লোকদুটো কারোর সঙ্গে মোলাকাত করেনা, এমনকি ফোনে পর্যন্ত কথা বলেনা। কেবল শপিং মলে ঘুরে বেড়ায়, আইসক্রিম খায়, চাঁদনি চকে গিয়ে রেস্তোরাঁয় তন্দুরি চিকেন সাঁটায়, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পানিপুরি সাঁটায়। কল্পেশ আর গার্গী টাকমাথার পিছনে ঘুরে ঘুরে হয়রান হয়ে ফেরে। অনন্ত ও যোগেনপ্রসাদের অবস্থাও তথৈবচ। যোগেনপ্রসাদ সন্ধেবেলা এসে রিপোর্ট দেয় এরকমঃ
    > তারপর ঢ্যাঙা কি করল?
    > মোড়ের মাথায় খবরের কাগজ কিনল। টাইমস অফ ইন্ডিয়া।
    > তারপর?
    > সেলুনে ঢুকে চুল ছাঁটাল।
    > তারপর?
    > ফার্মাসিতে গিয়ে ওষুধ কিনল।
    যোগেনপ্রসাদ পকেট থেকে একটুকরো কাগজ বের করে পড়ে। গ্যাস-ও-ফাস্ট, ওমি জি স্যাচে, জেলুসিল এমপিএস, ইউনিএঞ্জাইম, প্যান ৪০। ভালো টেররিস্ট হতে গেলে পেট ঠিক রাখা খুব জরুরি, পট্টনায়েক শুনতে শুনতে মন্তব্য করে। তাহলে আমরা এখন কি করব? কল্পেশ হতাশ হয়ে জানতে চায়। পট্টনায়েক হাই তুলে বলে, কি আর করব? আমি তিনতলায় বিশ্রাম নেব আর তোমরা দোতলায় বসে পেপারওয়ার্ক করবে। চেয়ার থেকে উঠে পড়ে পট্টনায়েক। দেয়ার মাস্ট বি সাম মুভমেন্ট, অনন্ত আইয়ার অধৈর্যভাবে বলে, সামহাও ওরা দলের বাকিদের সঙ্গে কমিউনিকেট করছে। পট্টনায়েক তাকায় ওর দিকে। তারপর তেতলার সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলে, তোমাদের মাথাগুলো নিরেট বলে বুঝতে পারনি প্রথম এটাকটা আর আটকানো যাবে না। পট্টনায়েকের পায়ের আওয়াজ মিলিয়ে গেলে গার্গী ফিসফিস করে বলে, এটা না বোঝার কি আছে? লোকদুটো আইসোলেটেড নোড হলে আমরা কি করতে পারি? এখন আইবি যদি রিসোর্স এপ্লাই করে ব্রুট ফোর্স মেথডে আটকাতে পারে।

    সেদিনই সন্ধেবেলা পট্টনায়েকের কথা মিলে যায়। জামা মসজিদের সামনে একটা গাড়িতে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে। চারজন লোক মারা যায়, পনেরোজন আহত। টিভিতে দেখতে দেখতে আঞ্জু ওদের বলে, কাল থেকে তোমাদের আবার ফলো করতে হবে ওই দুজনকে। ওরা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। আঞ্জু স্ক্রিনের দিকে আঙুল তুলে বলে, এই যে ওদের কাছে কমিউনিকেশন গেল।
  • c | ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৩:৫০747281
  • সিমলার স্কুলটা উমর মাসুদের ভালো লেগে যায়। ছেলেদের হস্টেলে তাকে যে ঘরটা দেওয়া হয়েছে, তার একফালি জানলা থেকে চোখে পড়ে সবুজ পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে আবছায়া নীলচে কুয়াশা। হাতির দাঁতের মত সাদা ছোটো ছোটো বাড়ি। সে ঘরটা গুছিয়ে রাখে নিখুঁত করে। সকালবেলা উঠে নমাজ পড়ে সে নীচের হলে ব্রেকফাস্ট করতে যায়। তারপর ব্যাগটা পিঠে বেঁধে বেরিয়ে পড়ে ক্লাসের উদ্দেশ্যে। হস্টেল থেকে ক্লাসরুমগুলো মিনিটদুয়েকের হাঁটাপথ। ক্লাসে বসে নোট নিতে নিতে মাঝেমাঝে সে হারিয়ে যায়। নোটবুকে পেনসিল দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটে, তারপর ফের মন দেয় ক্লাসের পড়ানোতে। ম্যাথ ক্লাসে একটি মেয়ে এসে তাকে বলে, হাই, মে আই সিট উইথ ইউ? উমর চোখ তুলে তাকায়। সরিতার সঙ্গে তার আলাপ হয়ে গেছে প্রথম দিন থেকেই। এই নতুন জায়গায় একমাত্র সরিতাকেই সে চেনে, তাই তার ভালো লাগে সরিতার সঙ্গে কথা বলতে। সরিতা তার মত লাজুক নয়, বয়সের তুলনায় সে বেশ স্মার্ট। শ্রীনগর আর দিল্লির গল্প চালাচালি করতে করতে তাদের বন্ধুত্বটা গাঢ় হয়ে যায়। কথায় কথায় একদিন সরিতা জানতে পারে, উমরের এক দাদা ছিল আর তাকে কারা যেন খুন করেছিল শ্রীনগরে। এই কথাটা সরিতার মনে খুব নাড়া দেয়। উমরের সঙ্গে কথা বলে সে টের পায়, খুব হালকা হলেও উমরের মনে কীরকম যেন ধারণা গেঁথে আছে আর্মির হাতে খুন হয়েছিল তার দাদা। জলপাই পোশাকের লোকেদের প্রতি তার ভয়মেশানো বিতৃষ্ণা আছে বুঝতে পারে সরিতা। ছুটিতে দিল্লি ফিরে সে অবনীমোহনকে বলে কথাটা। এমনিতেই তার অভ্যেস বাবার কাছে পুঙ্খানুপুঙ্খ সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করা। কিন্তু উমরের দাদার হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে মেয়ে যেন তাঁর কাছে ব্যাখ্যা চাইছে, বুঝতে পারেন অবনীমোহন। যতটা সম্ভব সহজ বোধগম্য করে তিনি মেয়েকে কাশ্মীরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলেন। এও বলে দেন যে, তিনি নিশ্চিত উমরের দাদা আসলে আর্মির হাতে খুন হয়নি, হয়েছিল জঙ্গিদের হাতে। এইখানে বলে রাখা ভাল, অবনীমোহন কোনদিনই জানতে পারেননি আসলে সমশেরকে কারা মেরেছিল। খুব সম্ভবত গণ্ডগোলের মধ্যে পড়ে ক্রসফায়ারে মারা গেছিল সে, এই ধারণা হয়েছিল তাঁর। কিন্তু বাবার কথায় সরিতার মনের মেঘ কেটে যায়। ছুটির শেষে সিমলা ফিরে স্কুল কম্পাউন্ডের নির্জনে সরিতা বাবার কাছে শোনা যুক্তিপরম্পরাগুলো রিপিট করে। সে প্রশ্ন করে, উমরের দাদা কি খারাপ লোকেদের দলে যোগ দিয়েছিল? উমর দুদিকে মাথা নাড়ে। সরিতা তখন বলে, তাহলে কেন সে মারা যাবে? পুলিশ বা আর্মি তো খারাপ লোকদের বিরুদ্ধে লড়ে। উমর ঘাসের ওপর সরিতার পাশে বসে শুনতে শুনতে পাথরের গায়ে আঁকিবুঁকি কাটে। সে যুক্তি সাজাতে চায়, কিন্তু ঠিক কথা খুঁজে পায়না। শ্রীনগরে বড় হওয়ার সময় পারিপার্শ্বিকের ক্ষোভের স্মৃতি তার মধ্যেও জড়ো হয়েছিল, কিন্তু সেসব ক্ষোভের পিছনে যুক্তিপরম্পরা তার অপরিণত মস্তিষ্কে জমা পড়েনি। ফলে সরিতার যুক্তির বিরুদ্ধে সে এনেকডোট এনে হাজির করে। অমুক ঘটনা কেন ঘটেছিল আমাদের শহরে? সে জানতে চায়। এবার সরিতা থমকে দাঁড়ায়। তাকে অপেক্ষা করতে হয় পরেরবার বাবার সঙ্গে দেখা হওয়া পর্যন্ত, যখন সে উমরের তোলা প্রশ্নের একটা যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা বাবার কাছ থেকে সংগ্রহ করে আনে। এইভাবে উমর, সরিতা ও অবনীমোহনের মধ্যে একটি টেলিফোন খেলা আরম্ভ হয়। খেলাটা দীর্ঘ সময় চলতে থাকে, কিন্তু অবনীমোহনের কোন তাড়া নেই। কেজিবির মাথারা কিভাবে ব্রিটিশদের টাইট দিত তিনি জানতেন। ব্রিটিশদের রিসোর্স এবং দক্ষতা সন্দেহাতীতভাবে বেশি হওয়া সত্ত্বেও মস্কোর গুপ্তচরদের কাছে তারা নাকানিচোবানি খেত শুধু ধৈর্যের খেলায়। ফিদায়েন-ই-হিন্দকে পরাস্ত করার একমাত্র উপায় লং গেম খেলা, পট্টনায়েককে বলেছিলেন তিনি, এমন ছাগলকে টোপ দিতে হবে যাকে ওরা গন্ধ শুঁকে পরীক্ষা করে নিজেদের খাঁচায় ঢুকিয়ে নেয়। সে ছাগল খেলনা ছাগল হলে চলবে না।

    ক্রমশ তিনজনের টেলিফোন খেলায় অবনীমোহন জিততে থাকেন। তার সহজবোধ্য কারণ এই যে, তিনি মনস্তত্ত্বের ট্রেনিং পাওয়া একজন তুখোড় স্পাই মাষ্টার আর যাদের সঙ্গে তিনি খেলছেন, তারা নেহাতই নাবালক। কিন্তু তাঁকে বিশেষ কিছু করতে হয়না। তিনি বুঝতে পারেন যুক্তির ওপর যুক্তি সাজানোয় সরিতা যেন জিনগত ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছে। স্কুলের ইলোকুশন ক্লাবে সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়। ইন্টার-স্কুল ডিবেটে তাকে ক্যাপ্টেন ছাড়া চলে না। সরিতার রোল মডেল তখন একজন স্বপ্নের মানুষ, যে মানুষটি দেশের হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর মগজে স্বপ্নের বীজ বুনে দিচ্ছেন। কোন এক শীতের সন্ধ্যেয় বক্তৃতা দিতে সিমলা আসেন ডক্টর এপিজে আব্দুল কালাম, যিনি তখন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য বিজ্ঞান উপদেষ্টা এবং ডিআরডিওর অধিকর্তা। তাদের ক্লাস থেকে ক্লাস টিচার সরিতাকে বেছে নেন কালামের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। স্কুলের উপচে-পড়া অডিটোরিয়ামে কার্পেটে-মোড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠে তার স্বপ্নের মানুষটির সঙ্গে হাত মেলায় সরিতা। কোঁকড়ানো চুলের মানুষটির স্মিত হাস্যে তার রোমাঞ্চ জাগে। স্কুল কম্পাউন্ডের বাইরে পাকদণ্ডী বেয়ে বান্ধবীর পাশে হাঁটতে হাঁটতে সরিতার স্বপ্নের ছোঁয়া লাগে উমরের। তার মনে দেশ, রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের স্ট্রাকচার, রাষ্ট্রের যুক্তি ইত্যাদি বিষয়গুলি ক্রমশ নিয়তাকার হতে থাকে, শ্রীনগরের ছোটবেলাটা খুব দ্রুত মিলিয়ে যেতে থাকে রিয়ার-ভিউ মিররে। একসময় তার আর কোন সন্দেহ থাকে না ফিদায়েনের জঙ্গিরাই তার দাদাকে খুন করেছিল। এই প্রথম দাদার মৃত্যুর কথা ভেবে রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়। সরিতার সঙ্গে একমত হয়ে তার ভালো লাগে, একটা পরিষ্কার ধারণায় এসে দাঁড়ায় দুজনে -- একটি উজ্জ্বল দেশ ও তাকে ঘিরে অস্পষ্ট কুহক, যেখানে সন্ত্রাসীরা কাঁধে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দাঁতনখ শানাচ্ছে। ততদিনে সে সরিতার প্রেমে পড়েছে। সিমলার কবলস্টোন-ঢাকা রাস্তার পাশে কারুকার্যময় ভিক্টোরিয়ান স্ট্রীটল্যাম্পের নীচে বেঞ্চিতে বসে সরিতাকে কথাটা বলে দেয় একদিন। সরিতা চোখ তুলে তাকায়। পাহাড়ি অরণ্যে টুপটাপ শিশির ঝরে পড়ে।
     
    এরকমটা হবে অবনীমোহন জানতেন। এই স্ক্রিপ্ট তাঁর নিজের লেখা। দিল্লিতে উমর কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তিনি পট্টনায়েককে ডেকে নেন। এইবার পরের ধাপে পৌঁছানোর সময় হয়েছে। ঠিক যেন থিয়েটারের রোল অফার করছেন, এইভাবে বাসু ও পট্টনায়েক উমরকে খুলে বলেন। মিথ্যে বলেন না। ফিদায়েন-ই-হিন্দ সত্যিই তখন অবনীমোহনের মনে একটা নীহারিকার চেহারা ধারণ করেছে। সেখানে তিনি বারবার স্পেস শাটল পাঠাচ্ছেন কিন্তু কিছুতেই সেই প্রহেলিকার মানচিত্র ধরতে পারছেন না। কোন জোর করতে হয়না অবনীমোহনকে, কেবল সরিতার প্রসঙ্গটা থাকে পশ্চাৎপটে, উমর মাসুদ থিয়েটারে অংশ নিতে রাজী হয়ে যায়। তার রিহার্সালের ভার অবনীমোহন সঁপে দেন পট্টনায়েকের ওপর। উমর মাসুদকে প্রস্তুত করে তাঁরা পাঠান ফিদায়েনের চক্রবূহ্যে। একটু একটু করে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে থাকে উমর মাসুদ, ঢুকতে থাকে সে জঙ্গি সংগঠনটির গভীরে।
  • c | ২৮ আগস্ট ২০২৬ ১২:৩৭748259
  • অন্ধকার ঘরে আরামকেদারায় গা এলিয়ে বসেছিলেন অবনীমোহন। জলের মতন ঘুরে ঘুরে গওহর জানের রেকর্ড বাজছিল। একটু আগে কল্পেশ চলে গেছে। এই সময়টা অবনীমোহনের একা থাকতে ভাল লাগে। কিন্তু এখন তাঁর মন অস্থির হয়ে আছে। আর্যসংগ্রাম নামটা বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল তাঁর মনের ভেতর। আর অনেকদিন পর তিনি টের পাচ্ছিলেন তাঁর স্নায়ুগুলো টানটান হয়ে উঠেছে। কার জন্য যেন প্রতীক্ষা করে বসেছিলেন তিনি এতদিন। কার যেন ফিরে আসবার কথা। দরজার দিকে কানখাড়া করে বসেছিলেন তিনি। হঠাত রাস্তায় একটা গাড়ি থামার শব্দে তিনি সচকিত হয়ে উঠলেন। কেউ এল? কল্পেশ চলে যাবার পর তিনি দরজাটা লক করেছিলেন তো? অন্ধকারে উদ্বিগ্নমুখে তাকিয়ে থাকেন অবনীমোহন আর তাঁর ডানহাতটা মুঠো হয়ে আসে যেন সেখানে একটা অদৃশ্য রিভলভারের বাঁট শক্ত করে ধরা। দুই মুহূর্ত পরে বাইরে গাড়িটার ইঞ্জিন চালু হয়, অবনীমোহন কান পেতে শোনেন। আস্তে আস্তে সেটা মিলিয়ে যায় দূরে। তাৎক্ষণিক উৎকণ্ঠায় ক্লান্ত লাগে অবনীমোহনের। পেশিগুলো শিথিল হয়ে আসে। জলের মত ঘুরে ঘুরে গওহর জানের রেকর্ড বাজতে থাকে। সেরাতে বিছানায় শুয়ে পড়ার পরেও অবনীমোহনের চোখে ঘুম আসে না। কল্পেশের বলা খবরগুলো মাথার মধ্যে রিলে হতে থাকে। পট্টনায়েকের নির্দেশে তারা আর্যসংগ্রাম গ্রুপের দুজন সদস্যকে ফলো করছে, কল্পেশ দাদুকে জানিয়েছিল। তারপর বিষণ্ণ হেসে শুনিয়েছিল প্রথম বিস্ফোরণটা রুখতে না পারার ব্যর্থতার কথা। কিন্তু অবনীমোহন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলেন। কল্পেশ হয়তো তাঁকে আনমনা দেখেই আজ আর বেশি ঘাঁটায়নি, একটু আগেভাগেই চলে গেল। তিনি যা অনুমান করছেন সেটাই কি ঠিক? অন্ধকারে বালিশে মাথা পেতে অবনীমোহন যেন বিস্ময়ে বোবা হয়ে যাচ্ছিলেন, তাহলে তো সে ফিরে এসেছে।

    খুট শব্দে বেডরুমের দরজাটা খুলে যায়। অবনীমোহন ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসেন। সরিতা বিছানার পাশে এসে দাঁড়ায়।
    > তুই? তুই এলি এখন? সামার ভেকেশন?
    সরিতা কিছু না বলে হাসে। তার পরনে স্কার্ট। অবনীমোহনের মাথাটা হঠাত ঘুরে যায়। সরিতা, স্কুলে-পড়া সরিতা কী করে আসবে? সে তো লন্ডনে থাকে, অর্থনীতি পড়ায়। বাবার সঙ্গে সে তো কোন যোগাযোগ রাখেনা। চোখ খুলে অবনীমোহন টের পান, তিনি বালিশে মাথা রেখেই শুয়ে আছেন। মোটেই বিছানায় উঠে বসেননি। আর ঘরে কেউ নেই। তন্দ্রার ঘোরে যে সরিতা এসেছিল, সে তন্দ্রা ভাঙতেই মিলিয়ে গেছে। আরও রাত বাড়লে অবনীমোহনের শরীর ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

    পরদিন সকাল থেকে অবনীমোহন চিন্তায় ডুবে থাকেন। ঘরের ভেতরে, বাইরে তিনি পায়চারি করতে থাকেন। পুরনো ডায়েরি, নোটস ঘেঁটে ঘেঁটে কি যেন তথ্য খোঁজেন। অবশেষে দুপুরের দিকে তিনি মনস্থির করে ফেলেন। হ্যাঁ, প্রিয়দর্শিনী ভার্মার সঙ্গে কথা বলার সময় হয়েছে। তিনি যা জানেন, তাই দিয়ে আইবিকে সাহায্য করতে হবে। এখন তাঁর শহর আক্রান্ত।

    প্রিয়দর্শিনী ভার্মার অফিসের নাম্বারটা তাঁর ফোনেই পেয়ে যান তিনি। কল করে অপেক্ষা করতেই ওদিক থেকে রিসেপশনিস্ট গোছের কেউ সাড়া দেয়। অবনীমোহন তাঁর পরিচয় দিয়ে জানান প্রিয়দর্শিনী ভার্মার সঙ্গে ইমিডিয়েটলি কথা বলতে চান। জরুরী ব্যাপার। এবাউট হোয়াট? উল্টোদিক থেকে ভাবলেশহীন প্রশ্ন আসে। অবনীমোহন কড়া সুরে বলেন, সেটা আমি প্রিয়দর্শিনীকেই বলব। কিন্তু উনি এখন মিটিঙয়ে ব্যস্ত, মেয়েটি জানায়, কথা বলতে পারবেন না। প্লিজ টেল হার টু কল মি ব্যাক আফটার দা মিটিং, বলে অবনীমোহন ফোন রেখে দেন। মুখে একটা তিতকুটে ভাব লেগে থাকে। দু' ঘণ্টা পেরিয়ে যায়। কোন ফোন আসেনা। ঘন্টাতিনেক পরে অবনীমোহন থাকতে না পেরে ফের ফোন করেন। প্রিয়দর্শিনী ভার্মার অফিস, উল্টোদিকে মেয়েটি ফোন তুলে বলে। অবনীমোহন তাকে পূর্বের কথোপকপথন স্মরণ করিয়ে প্রিয়দর্শিনী ভার্মার সঙ্গে কথা বলতে চান। ম্যাডাম তো অফিস থেকে বেরিয়ে গেছেন, মেয়েটি নির্লিপ্ত গলায় বলে। অবনীমোহন জিভ দিয়ে বিরক্তিসূচক একটা শব্দ করেন -- ছিক! তারপর বলেন, ক্যান আই স্পিক টু ইয়োর সিনিয়র? ওদিকে খানিকক্ষণ চুপচাপ। তারপর মেয়েটি বলে, আপনি একটু হোল্ড করুন। আবার ফিসফাস, সহকর্মীদের সঙ্গে কথোপকথন, হালকা হাসি। অবনীমোহন ফোনের এপারে অপেক্ষা করেন। তারপর একজন মধ্যবয়েসী মহিলার কণ্ঠ শুনতে পান -- আরে অবনীদা, কেমন আছেন? শরীর ভাল তো? ম্যাডাম ভার্মা তো বেরিয়ে গেলেন একটু আগে। হ্যাঁ, উনি খুব ব্যস্ত, বুঝতেই পারছেন। তা আপনি কালকে ফোন করুন না। ভদ্রমহিলার গলার স্বর কমে আসে। অবনীমোহন বুঝতে পারেন মহিলা রিসিভার থেকে মুখ সরিয়ে অন্য কারোর সঙ্গে কথা বলছেন। আরে এএম বাসু ম্যাডামকে চাইছেন, ওই যে সেই ভদ্রলোক নাতির জন্য সুপারিশ করেছিলেন, কে জানে আবার কী দরকার। প্রতিটি কথা অবনীমোহন শুনতে পান। শেষে যেন একটা চাপা হাসিও তাঁর কান আসে। ফোনটা তৎক্ষণাৎ কেটে দিয়ে টেবিলে রেখে দেন। তাঁর গোটা শরীর রাগে-অপমানে কাঁপতে থাকে।
  • c | ২৮ আগস্ট ২০২৬ ২১:০৮748261
  • একঘেয়েমি কাটাতে পট্টনায়েক ওদের টিম অদলবদল করার অনুমতি দিয়েছিল। আজকে অনন্ত ও গার্গী ফলো করছিল ঢ্যাঙা লোকটাকে। লোকটার হাতে একটা সুটকেস, দেখে গার্গী ফিসফিস করে অনন্তকে বলে, মনে হচ্ছে কারোর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে। ঘন্টাদেড়েক এদিকওদিক চক্কর কেটে একটা মাল্টিপ্লেক্সের ভেতর গার্গীর কথাটা মিলে যায়। ঢ্যাঙা লোকটা একটা নীল শার্টপরা লোকের সঙ্গে মোলাকাত করে। নীল শার্টের হাতেও একটা বাদামী সুটকেস। তবে সাইজে ছোট। দুজনে কীযেন কথা বলে সুটকেস বিনিময় করে দুদিকে হাঁটতে থাকে। অনন্ত স্লাইট থমকে যায়। তুই ঢ্যাঙাটার পিছু নে, আমি নীলশার্টকে ধরছি, গার্গী দ্রুত নির্দেশ ছুঁড়ে এগিয়ে যায়। একটা শিহরণ ছড়িয়ে যায় অনন্তর শরীরে। দিস ইজ দা ডে! বিড়াল-পায়ে সে ঢ্যাঙার পিছু নেয়। লোকটা কারোর সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। মাল্টিপ্লেক্সের ঘুরপাক খাওয়া দরজা দিয়ে বেরিয়ে লোকটা রাস্তা ক্রস করে। তারপর একটা পার্কে ঢোকে। অনন্ত পিছু পিছু নিঃশব্দে ফলো করতে থাকে। পার্ক থেকে বেরিয়ে আবার ফুটপাত ধরে লোকটা এগোয়। তারপর আবার রাস্তা পেরিয়ে মেট্রো স্টেশনে গিয়ে ঢোকে। লোকটার মতলব কি? অনন্ত বুকের ধুকপুকানি টের পায়। স্টেশনে ঢুকে লোকটা টিকিট কাটে। অনন্ত অপেক্ষা করে সিকিউরিটি লোকটার সুটকেস চেক করে কিনা। সে গুড়ে বালি। সিকিউরিটি একটু গরীব-গরীব দেখতে একটা লোকের ব্যাগ নিয়ে টানাহেঁচড়ায় ব্যস্ত। ঢ্যাঙা দিব্যি অম্লানবদনে গটগট করে টার্নস্টিল পেরিয়ে প্ল্যাটফর্মের দিকে এগোয়। অনন্ত প্রায় 'আরেঃ' বলে চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিল। কোনোরকমে নিজেকে সামলে ঢ্যাঙার পিছু পিছু প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দাঁড়ায়। ঠিক তখনি ব্যাপারটা ঘটে।

    প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চিতে বসে থাকা একটা ছেলের পাশে নিজের সুটকেসটা রেখে ঢ্যাঙা ছেলেটার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে। তারপর যেন আনমনে টুক করে ছেলেটার সুটকেসটা তুলে নেয়। অনন্ত লক্ষ্য করে সেটা মাঝারি সাইজের। ঢ্যাঙা সুটকেসটা নিয়ে ছেলেটার থেকে খানিকটা দূরে গিয়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এইসময় অনন্তর পকেটে ফোনটা ভাইব্রেট করে। অনন্ত ঢ্যাঙার দিকে তেরচাচোখে তাকিয়ে গার্গীর কলটা রিসিভ করে। গার্গী অনন্তকে কোন কথা বলতে না দিয়ে উত্তেজিতভাবে বলে, ব্যাপারটা কি হচ্ছে বুঝতে পারছিস? আমি একটা কফিশপে বসে আছি আর এইমাত্র নীলশার্ট সুটকেস বদল করল। অর্থাৎ ধর আটজন লোক আটটা লোকেশনে যাবে। এর মধ্যে আল্টিমেটলি একটা জায়গায় বিস্ফোরণ ঘটবে। কিন্তু এরা অনবরত নিজেদের মধ্যে সুটকেস বিনিময় করছে যাতে এদের ফলো করা ক্রমশ একটা ইম্পসিবল ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কে যে আসল প্যাকেজটা ক্যারি করছে বোঝার উপায় নেই। অনন্ত প্ল্যাটফর্মের বৈদ্যুতিন বোর্ডের দিকে তাকিয়ে বলে, পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ডের মধ্যে নেক্সট ট্রেনটা ঢুকবে। এরা দুজনে, যা বুঝছি, উলটো ডিরেকশনের ট্রেনে উঠবে। কাকে ফলো করব? তুই-ই বা কাকে ফলো করবি? আমাদের একটা ডিসিশন নিতে হবে, গার্গী বলে, আমার মন বলছে ঢ্যাঙাকেই ফলো করা উচিত। কেন? অনন্ত জিজ্ঞেস করে। গার্গী ফের বলে, আমার সিক্সথ সেন্স বলছে। সেটা তোর কনফার্মেশন বায়াস, অনন্ত অধৈর্যভাবে বলে, তুই যুক্তি দে। দাঁড়া, দাঁড়া, গার্গী যেন হঠাৎ অন্ধকারে আলো দেখতে পায়, হ্যাঁ, ঢ্যাঙাকেই ফলো কর। আমি শিয়োর। হাও? অনন্ত তখনো অন্ধকারে। গার্গী ধীরে ধীরে বলে, কারণ পট্টনায়েকের খোচর নেটওয়ার্ক কেবল ঢ্যাঙা আর টাকমাথার সন্ধান পেয়েছিল। এখন আমরা দেখছি আর্যসমাজের অনেক সদস্যই দিল্লিতে ঢুকেছে। তাহলে এদের সন্ধান পট্টনায়েকের নেটওয়ার্ক পায়নি কেন? দ্যাট মিনস ঢ্যাঙা আর টাকমাথা মাস্ট বি সামহোয়াট ইম্পর্টেন্ট এবং সেজন্যই ডিস্টিঙ্গুইশেবল। বাকিরা রেডারে ধরা পড়েনি। অন্যপ্রান্তে অনন্ত কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। তারপর বলে, ওকে। আমি ঢ্যাঙার পিছু নিচ্ছি। তোকে জানাব। গার্গী বলে, আমি তোর সঙ্গে ডেস্টিনেশনে মিট করব। বাকিদের ফলো করে লাভ নেই। শুধু শুধু সময় নষ্ট।

    ঢ্যাঙা লোকটা মেট্রো থেকে নেবে আরও তিনজায়গায় সুটকেস বদল করে। ইতিমধ্যে গার্গী এসে অনন্তর সঙ্গে যোগ দিয়েছে। ঢ্যাঙা একটা শপিংমলে গিয়ে ঢোকে। যেন উইন্ডোশপিং করছে এইরকম ভাবালু মুখে লোকটা জামাকাপড়ের চকচকে দোকানগুলোর পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকে। একজায়গায় এস্কালেটরের মাথায় পৌঁছে চলন্ত সিঁড়িতে পা রাখে। গার্গী আর অনন্ত ওপরের ফ্লোরের কিনারা থেকে লক্ষ্য করে নীচের ফ্লোরের কেন্দ্রে একটা ফোয়ারা। ফোয়ারা থেকে জল উছলে উছলে পড়ছে আর সেটাকে ঘিরে চারপাশে লোকজন ক্রিসক্রস করে হেঁটে যাচ্ছে। লোকটা এস্কালেটর থেকে নেমে ফোয়ারার বেদীটার দিকে এগিয়ে যায়। তারপর বেদীটার কিনারায় কোমর ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়। ইজ হি ওয়েটিং ফর সামবডি? গার্গী কৌতূহলীগলায় জিজ্ঞেস করে। না, লোকটার হাতে প্যাকেজটা নেই, অনন্ত সজাগ হয়ে আঙুল দেখায়। গার্গী অবাক হয়ে দেখে লোকটা ফোয়ারার নীচে সুটকেসটা রেখে গুটিগুটি সরে পড়ছে। ভিড়ে মিশে যাওয়ার আগেই আটকাতে হবে, অনন্ত হিসহিসিয়ে ওঠে। তারপর তীরবেগে ছুটে যায় এস্কালেটর লক্ষ্য করে। এস্কালেটর বেয়ে ঝাঁপিয়ে নেমে অনন্ত লোকটার দিকে দৌড়তে থাকে। গার্গী লক্ষ্য করে লোকটা টের পেয়েছে কিছু একটা গোলমাল শুরু হয়েছে। লোকটা অন্যদিকের একটা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকে। এই দেখে গার্গী ছুটতে শুরু করে যাতে লোকটা ওপরের ফ্লোরে উঠে এলে গার্গীর সাথে মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়। কিন্তু ওপরের ফ্লোরেও বেশ ভিড়। ভিড় সরিয়ে এগোতে গার্গীর বেশ সমস্যা হয়। ওদিকে ততক্ষণে অনন্ত অন্যদিকের সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছে গেছে। রুখ যা, বরনা গোলি মার দুঙ্গা, কোমরে গোঁজা রিভলভারটা বের করে অনন্ত লোকটার উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে ওঠে। লোকটা তাতে কান না দিয়ে দুটো-তিনটে সিঁড়ি টপকে ওপরে উঠছে দেখে অনন্ত দড়াম করে গুলিটা চালিয়ে দেয়। পায়ে গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গে লোকটা একটা সিঁড়িতে বসে পড়ে। তারপর রক্তচোখে অনন্তর দিকে ঘুরে তাকায়। অনন্ত সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে উঠতে উঠতে থমকে যায়। আহত লোকটার হাতে উঠে এসেছে একটা কালো পিস্তল। বসা অবস্থাতেও ঢ্যাঙা লোকটাকে কী বিশ্রী লম্বা দেখাচ্ছে! অনন্ত লক্ষ্য করে। ঠিক সেই মুহূর্তেই পিস্তলের গুলিটা সোজা তার পাঁজরে এসে বেঁধে। প্রচন্ড অভিঘাতে পিছনে উল্টে যেতে যেতে শূন্যে ভাসমান অনন্ত আইয়ার টের পায় গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসছে তার বুকের গর্তটা থেকে। তার চেতনা যন্ত্রণায় বিস্ময়ে ফাঁকা হয়ে যায়। গার্গী ততক্ষণে সিঁড়ির মাথায় এসে দাঁড়িয়েছে। তার চোখের সামনে কয়েকটা সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে অনন্তর লাশটা ঘাড় গুঁজে পড়ে থাকে।
  • র২হ | ২৯ আগস্ট ২০২৬ ০৪:২৪748265
  • অপেক্ষা করে ছিলাম!
  • c | ৩০ আগস্ট ২০২৬ ০২:১৩748270
  • একইদিনে টাকমাথাকে ফলো করার দায়িত্ব ছিল কল্পেশ ও যোগেনপ্রসাদের ওপর। কিন্তু তারা লাজপত নগরে রাস্তার ধারে একটা দোকানে বসে পাওভাজি খাচ্ছিল। ভাজির প্রায় সেভেন্টিফাইভ পার্সেন্ট যোগেনপ্রসাদ মেরে এনেছে, এমনসময় কল্পেশের ফোনটা বাজল। যোগেনের উদ্দেশ্যে বস শব্দটা আলতোভাবে ছুঁড়ে দিয়ে কল্পেশ ফোনটা রিসিভ করল। অন্যদিক থেকে পট্টনায়েকের ব্যাঙের মতো গলা শোনা গেল, কি খবর? পাখি উড়ে যায়নি তো? কল্পেশ ঢোঁক গিলে বলে, না মানে পাখি তো এখনো খাঁচাতেই। টাকমাথা হোটেল ছেড়ে বেরোয়নি বলছ? বেলা এগারোটা বাজছে! হোয়াট এবাউট ঢ্যাঙা? পট্টনায়েক জানতে চায়। সে তো সাতসকালে বেরিয়ে গেছে, গার্গী আর অনন্ত তার পিছু পিছু, কল্পেশ বলে। ওরা কী করছে কে জানে, পট্টনায়েক বিড়বিড় করে, যাকগে যাক, যেটা জানার জন্য ফোন করেছিলাম, তোমার দাদু মাসের কত তারিখে পেনশন তোলেন? এরকম একটা বেমক্কা প্রশ্নে কল্পেশ হকচকিয়ে যায়। তারপর নিজেকে সামলে বলে, পয়লা, নাকি দোসরা? উল্টোদিক থেকে পট্টনায়েক ব্যাঙ্গের সুরে বলে, তোমার দাদুকে তুমি চেনোনা? এএম বাসু তো ডিসিপ্লিনের জন্য সার্ভিসে ফেমাস। সে লোক বিভিন্ন মাসে বিভিন্ন তারিখে পেনশন তুলবে, এটা কি হতে পারে? দাঁড়ান, দাঁড়ান, কল্পেশ একটু ভেবে বলে, দাদু প্রতিমাসে নাসের আলীর এম্বাসেডরে চড়ে পেনশন তুলতে যায়। নাসের আলীকে দাদু ফোন করে পয়লা তারিখে। দোসরা তারিখে নাসের আলী তার গদিআঁটা পুরোনো এম্বাসেডর নিয়ে আসে চিত্তরঞ্জন পার্কের বাড়িতে। অর্থাৎ পয়লা নয়, দোসরা, প্রতিমাসের দুই তারিখে দাদু পেনশন তোলে। ফোনের ওপার থেকে পট্টনায়েক বলে, গুড ইনফরমেশন। টাকমাথার মুভমেন্ট, ইফ এনি, ফলো করো। আচ্ছা ছাড়লাম।

    ফোনটা রেখে দিয়ে কল্পেশ ব্যোমকেশ হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে। দাদুর পেনশনের খবর পট্টনায়েক কেন জানতে চাইল ভেবে কূল পায়না। তবে ওকে বেশি ভাববার সুযোগ দেয়না যোগেনপ্রসাদ। লুক ব্রো, লোকটা বেরিয়েছে, চাপা গলায় বলে যোগেনপ্রসাদ। কল্পেশ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে টাকমাথা রাস্তার উল্টোদিকে রদ্দিমার্কা হোটেলটার গেট খুলে বেরোচ্ছে। টিপিক্যাল অফিসযাত্রীর পোশাক পরনে, কাঁধে একটা ব্যাগ। কল্পেশ আর যোগেনপ্রসাদ পাওভাজির দাম চুকিয়ে টাকমাথার পিছু নেয়। লোকটা কোনো অটোতে না উঠে রাস্তার ধারে অপেক্ষা করতে থাকে। রোদের তেজ বেড়েছে রীতিমত। মিনিটপনেরো বাদে একটা কালো সেডান এসে লোকটাকে তুলে নেয়। কল্পেশ আর যোগেনপ্রসাদ হাঁইমাই করে রাস্তায় নেমে একটা চলন্ত অটোকে পাকড়ে ধরে। নেহি যায়গা, নেহি যায়গা, হাম টিপিন করনে যা রাহে হ্যায়, ক্ষুধার্ত অটোওয়ালা আপত্তি জানায়। ততক্ষণে কল্পেশ ও যোগেনপ্রসাদ উঠে পড়েছে। উয়ো সেডান কা পিছে চলিয়ে, এক্সট্রা চার্জ দেগা, কল্পেশ বলে। হাম পোলিস হ্যায়, আতংবাদী পাকড়না হ্যায়, যোগেনপ্রসাদ আলটপকা বলে সব মাটি করে দেয়। আতংবাদী শুনে অটোওয়ালা ইঞ্জিন থামিয়ে দেয় আর কি। আরে আতংবাদী বোলা ক্যায়া, এক ছোটাসা ডাকু হ্যায় সির্ফ, যোগেনপ্রসাদ হড়বড়িয়ে ম্যানেজ দেয়। গাঁইগুই করে অটো চলতে শুরু করে। কল্পেশ আর যোগেনপ্রসাদ ঝুঁকে সেডানের গতিবিধি দূর থেকে লক্ষ্য করে। এনি গেস কোথায় যাচ্ছে? যোগেনপ্রসাদ ইতিমধ্যে চোখে সানগ্লাস চাপিয়ে নিয়েছে। কল্পেশ ঠোঁট উল্টে মাথা নাড়ে। অটোওয়ালা একটা ঠেলাওয়ালার বেমক্কা ঘাড়ে এসে পড়া ডজ করতে করতে বিড়বিড় করে, ক্যায়া মুসিব্বত! কল্পেশ কী যেন ভাবছিল। সেডান নেক্সট টার্নটা নিতেই ওরা দেখতে পেল রাস্তাটা মার্কেট রোডে গিয়ে মিশেছে। হঠাৎ করে ওরা লাজপত নগরের সবচেয়ে ব্যস্ত এলাকাটায় গিয়ে পড়ল। অজস্র গাড়ি-রিকশা-অটো-লোকের সঙ্গমে খেই হারিয়ে ফেলতে ফেলতে সেডানের পিছু পিছু ওদের বাহন এগোতে লাগল। তারপর মাতা নয়না দেবী মার্গে এসে পড়তেই কল্পেশ অস্ফুটে বলল, আমি বোধহয় জানি লোকটা কোথায় যাচ্ছে। যোগেনপ্রসাদ অবাক হয়ে কিছু বলার আগেই কল্পেশ আঙুল তুলে দেখাল কালো সেডান নয়না দেবী মার্গে টার্ন নিচ্ছে। কল্পেশ অটোওয়ালাকে নির্দেশ দিল, ও গাড়ি সামনে থামবে। তুমি সোজা পেরিয়ে গিয়ে ওই গুমটিটার পাশে দাঁড়াও। কল্পেশের কথামতই যোগেনপ্রসাদ দেখল সেডান সত্যিই গতি কমিয়ে রাস্তার ডানদিকে থামল। তাদের অটো যখন সেডানকে টপকে যাচ্ছে, যোগেনপ্রসাদ দেখল রাস্তার বাঁদিকে স্টেট ব্যাংকের লাজপত নগর মার্কেট ব্রাঞ্চ। পট্টনায়েক ঠিক ধরেছে আজকে দু'তারিখ, কল্পেশ যেন স্বগতোক্তি করল।

    অটো থেকে নেমে যোগেনপ্রসাদ তখনও যেন ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না। কল্পেশকে জিজ্ঞেস করে, কিন্তু ওদের প্ল্যানটা কী? বুড়ো এএম বাসুকে কিডন্যাপ করতে চায়? নাকি মার্ডার? কেন? কল্পেশ ঘাড় নেড়ে বলে, পুরোটা আমিও বুঝতে পারছি না। যোগেনপ্রসাদ বলে, যাহোক, তোমার দাদুকে ফোন করে সতর্ক করে দাও। করছি আমি, রিং হয়ে কেটে যাচ্ছে, কল্পেশ বলে, হি ডাজন্ট ক্যারি হিজ সেল। আর নাসের আলীর ফোননম্বর আমি জানি না। হাতে বেশি টাইম নেই, যোগেনপ্রসাদ অধৈর্য হয়ে বলে, হোয়াট ক্যান উই ডু? কল্পেশ উত্তর দেয়, তোমার অস্ত্রটা রেডি রাখো। যাই ঘটুক, আমাদের আটকাতে হবে। ঠিক সাত মিনিট বাদে একটা এম্বাসেডরের আবির্ভাব ঘটে রাস্তার উলটোমুখে। গুমটির আড়াল থেকে দেখে কল্পেশ চিনতে পারে নাসের আলীর গাড়িটাকে। চোখের কোণ দিয়ে সে লক্ষ্য করে শিকারী বেড়ালের মত ভঙ্গিমায় যোগেনপ্রসাদ তার রিভলভার হাতে প্রস্তুত। কিন্তু তৈরি থাকা সত্ত্বেও এত দ্রুত ঘটনাটা ঘটে যায় যে ওদের রিয়াক্ট করতে দেরী হয়ে যায়। নাসের আলীর গাড়িটা স্টেট ব্যাংকের সামনে থামামাত্র কালো সেডান থেকে টাকমাথা ও ড্রাইভার নেমে গুলি চালাতে শুরু করে। প্রথম কয়েকটা গুলিতেই এম্বাসেডরের ডানদিকের জানলার কাঁচ ঝনঝন করে ভেঙে যায়। কল্পেশ লক্ষ্য করে নাসের আলী স্টিয়ারিং ছেড়ে পাশের দিকে গড়িয়ে পড়েছে। পিছনের সীটে দাদুর কি অবস্থা সে দেখতে পায়না। এইবার যোগেনপ্রসাদ গুলি চালায়। টাকমাথা ও ড্রাইভার অন্যদিক থেকে আক্রমণ আশা করেনি। ফলে কাভারের তোয়াক্কা না করে রাস্তার মাঝখানে চলে এসেছিল। যোগেনপ্রসাদের গুলিতে ড্রাইভারটা রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। টাকমাথা সেডানের পিছনে গিয়ে লুকায়। যোগেনপ্রসাদ ওদিকে এগোয়। কল্পেশের কাছে কোন আগ্নেয়াস্ত্র নেই। সেডানের কাছাকাছি যেতেই পিছনের চাকার কাভার নিয়ে টাকমাথা গুলি চালায়। আঃ, একটা গুলি যোগেনপ্রসাদের হাতের চামড়া ঘেঁষে বেরিয়ে যেতেই সে যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে ওঠে। পরমুহূর্তেই দ্রুত গুলি চালিয়ে টাকমাথাকে নিকেশ করে দেয়। গুলির শব্দ থামতেই অল ক্লিয়ারের অপেক্ষা না করে কল্পেশ দৌড়ে যায় নাসের আলীর এম্বাসেডরের কাছে। মাটিতে কাঁচ ছড়িয়ে আছে। ঘুরে বাঁদিকে যেতেই কল্পেশ দেখতে পায় দরজাটা অর্ধেক খোলা আর তার দাদু মুখ থুবড়ে গাড়ির মেঝেতে পড়ে আছেন। শরীরের এক-চতুর্থাংশ গাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসেছে। মোটা রক্তের ধারা গড়িয়ে নেবেছে মাটিতে।

    নাসের আলীর ভাগ্যক্রমে কিছু হয়নি। এএম বাসুকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে ডাক্তাররা জানায় অবস্থা সংকটজনক। এখন কিছু বলা যাচ্ছে না। যোগেনপ্রসাদের হাতে একটা ব্যান্ডেজ করে দেয়। হাসপাতালের করিডরে বসে কল্পেশ আর যোগেনপ্রসাদ দেখছিল বাইরে বিকেল হয়ে এসেছে। কয়েকটা বাচ্চা হুড়োহুড়ি করে দরজার কাছে খেলা করছে। একটু আগে কল্পেশ গার্গীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছে। অনন্তর খবরটা গার্গী ওকে দেয়। তারপর দুজনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর গার্গী কল্পেশের দাদুর খবর জানতে চায়। এরা সফদরজঙ্গে ট্রান্সফার করে দেবে বলছে আজ রাতে, কল্পেশ বলে। পট্টনায়েক ওকে তাই বলেছে। ফিল বেটার, তোমরা সেকেন্ড এট্যাকটা আটকে দিয়েছ, পট্টনায়েক গার্গীকে বলেছে, ঢ্যাঙার সুটকেসে তিনকেজি ওজনের ইম্প্রভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস পাওয়া গেছে আর ঢ্যাঙার পকেটে রিমোট কনট্রোল। পট্টনায়েক আরও বলেছে, গার্গী শেষমুহুর্তে সিঁড়ির মাথা থেকে লাফিয়ে ঢ্যাঙাকে ডিসআর্ম না করলে লোকটাকে ধরা যেত না। গার্গী সব শুনেছে। তারপর ফোনটা কান থেকে নামিয়ে রেখেছে। পট্টনায়েককে সে বলতে চায়নি যে সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়া অনন্তর লাশটা এখনও তার চোখে ভাসছে।
  • c | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:৫৩748350
  • দুহাজার সালের পর থেকে ফিদায়েনের স্ট্র্যাটেজি পরিবর্তন আইবির নজরে আসে। ওই সময় থেকেই উমর জঙ্গি সংগঠনটিতে ইনফিলট্রেট করতে শুরু করে। একজন বিজ্ঞানী যেভাবে ভিনগ্রহে পাঠানো স্পেসশাটলের সংগ্রহ করা তথ্য বিশ্লেষণ করে গ্রহটির ভূতাত্ত্বিক গঠন সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছান, অবনীমোহন ঠিক সেইভাবে উমরের পাঠানো ইনফরমেশন থেকে ফিদায়েনের অবয়বটি নির্মাণ করছিলেন। ভিনগ্রহের আবহাওয়া অন্যরকম, সেখানের বায়ুমণ্ডলে তাপ ও চাপের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তাকে ঢেকে দেয়, আবার অনেকসময় সিগন্যালের পুরোটাই ভরে যায় অবান্তর নয়েজে। ফলে অসম্পূর্ন তথ্যের ওপর নির্ভর করে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি হয়ে পড়ে অনিশ্চিত। তবুও বিভিন্ন বাধার মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও অবনীমোহন একটু একটু করে ফিদায়েনের অন্তর্জগতটা দেখতে পাচ্ছিলেন। কাশ্মীরে ফিদায়েনের পক্ষে সংগঠিত আর্মির বিরুদ্ধে একটিমাত্র ফ্রন্টে বেশিদিন সংঘর্ষ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হচ্ছিল। ক্রমশ জঙ্গি সংগঠনটি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে উত্তর ভারতের হিন্টারল্যান্ড জুড়ে। অবনীমোহন এই নতুন যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্রটা জানবার জন্য ছটফট করছিলেন। কিন্তু ফিদায়েনের প্রহেলিকা দুরূহ, অনেকসময় একেবারেই দুর্বোধ্য মনে হয় তাদের কার্যকলাপ। নানারকম ছোটোখাটো সেটব্যাক উমরের অগ্রগতিকে পিছিয়ে দেয়। কখনো কখনো অবনীমোহন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন যে হয়তো বা উমর ধরা পড়ে যাবে। একটা একটা করে বছর কাটতে থাকে। একসময় পট্টনায়েক পর্যন্ত অবনীমোহনের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দেয়, যথেষ্ট হয়েছে, ওকে বের করে আনুন। রাতে, গভীর রাতে, নিজের অফিসে বসে অবনীমোহন সিগারেট টানতে টানতে ডেস্কল্যাম্পের আলোয় বারবার খুঁটিয়ে-পড়া ফিল্ড এজেন্টের নথিগুলি আবার উল্টেপাল্টে দেখেন। নানারকম সম্ভাবনার কথা মনের ভেতর নাড়াচাড়া করতে থাকেন। আরও বছর দুয়েক কেটে যায়। উমর ফিদায়েনের অক্টপাসের মত ছড়িয়ে থাকা শুঁড়গুলোর হদিশ পেতে শুরু করে। যত সে ভেতরে ঢোকে, তত যেন তার দক্ষতা বাড়তে থাকে। আর আইবির দপ্তরে বসে অবনীমোহনের চোখের সামনে একটু একটু করে গোটা প্যাটার্নটা ফুটে ওঠে। একদিন পট্টনায়েককে ডেকে পাঠান নিজের কামরায়। টেবিলে পট্টনায়েকের সামনে পাশাপাশি দুটো ম্যাপ রাখেন তিনি। বাঁদিকে, ফিদায়েনের পরিবর্ধিত যুদ্ধক্ষেত্র উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও মধ্যপ্রদেশের হিন্টারল্যান্ড জুড়ে। ডানদিকে, ওই একই এলাকায় বিরানব্বইয়ে বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়ার পর থেকে যেখানে যেখানে দাঙ্গা হয়েছে। পট্টনায়েক দুটো ম্যাপের মিল দেখে ঘাড় নাড়ে। যদি আমি একটা ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের স্ট্র্যাটেজিক এডভাইসর হতাম, আমিও ঠিক এই জায়গাগুলোতেই রিক্রুটমেন্ট ইনিশিয়েটিভ নিতাম, এএম বাসু ফ্লাস্ক থেকে কফি ঢেলে চুমুক দেন।

    ততদিনে উমর ফিদায়েনের ভেতরে এতটা বিশ্বাস অর্জন করেছে যে, তাকে বিহার ও ইউপির সীমান্তে মিরানপুর নামে একটা না-গ্রাম না-শহর জায়গায় সংগঠনের কাজে পাঠানো হয়। বাবরি ধ্বংসের পর থেকে উত্তর ভারতে যে অজস্র ফল্ট লাইন তৈরী হয়েছিল, মিরানপুর তার মধ্যে পড়ে। বিন্ধ্যর পাদদেশে অবস্থিত এই ছোট্ট এলাকায় কয়েকটা ফ্যাক্টরি ছাড়া কিছুই নেই। হিন্দু ও মুসলমান মহল্লার লোকেরা এই ফ্যাক্টরিগুলোতেই কাজ করে। ফলে সেগ্রেগেশনের সুযোগ জীবিকার প্রয়োজনেই কম, তার বদলে আছে কাছাকাছি থেকে পরস্পরকে সহ্য করতে না পারার তীব্র জ্বালা। উমর যখন মিরানপুরে গিয়ে পৌঁছায়, জায়গাটা বারুদের স্তুপ হয়ে আছে। মিরানপুরে জলের অভাব বারোমাসের, সব মরশুমে। মাসদেড়েক আগে সরকারের পক্ষ থেকে একটা জলের ট্যাংক বসানো হয়েছে মিরানপুরের পশ্চিমে পাহাড়ের গায়ে। মুসলমান মহল্লাগুলোয় জলের লাইন পাতা হয়ে গেছে। কিন্তু বাকি এলাকাগুলোয় কাজ কবে হবে ঠিক নেই। ফলে হিন্দু মহল্লাগুলোয় চাপানউতোর বাড়ছে। উমরের কাছে খবর আছে, এবার দাঙ্গা হলে সেটা হবে মিরানপুরের সবচেয়ে ভয়ানক দাঙ্গা। মিরানপুরের বাজারে এক পন্ডিতজীর মুদিখানার দোকানে গিয়ে উপস্থিত হয় উমর। দোকানের ওপরে এককামরার ঘর ভাড়া দেন পন্ডিতজী মিরানপুরে বাইরের লোক কেউ এলে। চানপায়খানার বন্দোবস্ত দোকানের পিছনে খোলা জায়গায়। সাধারণত মিরানপুরে বাইরের লোক কেউ আসেনা, কালেভদ্রে সরকারী কর্মচারী ছাড়া। উমরের কাগজপত্রেও লেখা আছে, সে সরকারী সার্ভের কাজে এসেছে। আসলে তাকে পাঠানো হয়েছে সুকেশ তিওয়ারি নামে একটা লোককে খুন করতে।

    সুকেশ তিওয়ারির যখন বারো বছর বয়েস, তখন একদিন ভোররাতের কথা তার খুব মনে পড়ে। সেদিন জমিয়ে শীত পড়েছিল মিরানপুরে। সারারাত ধরে পাহাড়ী নেকড়ের মতো ঝুঝকো ঝুঝকো কুয়াশা গড়িয়ে নেবেছে গোটা এলাকাটায়। ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করে না, লেপ জড়িয়ে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে বারো বছরের সুকেশের। তবুও সে চটপট উঠে পড়ে। উঠোনের কোণে হিমের সর-পড়া বালতির কনকনে জলে মুখ আঁচিয়ে নেয়। তারপর মায়ের বোনা চটের মতো কারুকার্যহীন একটা সোয়েটার চাপিয়ে নেয় গায়ে। তার বাবা ততক্ষণে তাকে তাড়া লাগাচ্ছে চা খেতে খেতে। অনেকদূর যেতে হবে তাদের বাপবেটাকে অযোধ্যায় মসজিদ ভাঙতে। ওই ভোরটার কথা সুকেশের মনে পড়ে। ওই যে তার বারোবছরের মাথার ভেতরে অবোধ্য অনুভূতি, সবটা সে বুঝতে পারছে না, তবুও দূরে, ঘর ছেড়ে অনেকদূরে বাবার সঙ্গে সে যাচ্ছে ট্রেনে চড়ে দেশ দেখতে দেখতে, একটা বড় কাজে যোগ দেবার লোভে, ওই তার জীবনের প্রথম থ্রিল। তারপর তো সুকেশ দল পাকিয়ে মিরানপুরে একটার পর একটা দাঙ্গায় শিখল কিভাবে সহজে মুসলমানদের ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া যায়, কোথায় আগুন ধরালে এমনকি পাকা ইঁটের বাড়ি অনায়াসে ধ্বসে পড়ে। একুশ বছর বয়েসে সে নিজের হাতে একজন সমবয়সী মুসলিম তরুণকে খুন করে। যখন ছেলেটিকে সে মেরে ফেলছে একটু একটু করে, বুঝতে পারছে ছেলেটির দারুণ বেঁচে থাকবার প্রবৃত্তিকে রাবারের মত টেনে লম্বা করতে করতে পীড়নের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে সে ছিঁড়ে ফেলছে, ওই বারো বছর বয়েসের ভোরটার স্মৃতি তার ফিরে আসে। সেই ট্রেনের হুইসেল, করসেবকদের সঙ্গে অচেনা প্ল্যাটফর্মে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দেওয়া, দূরে আরও দূরে কী যেন হচ্ছে, সেখানে পৌঁছানোর সেই উত্তেজনা। ঘোরের মধ্যে ঢুকে পড়ে সুকেশ, মিরানপুর ছেড়ে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোয় যোগ দিতে যায়। কিন্তু কোথাও টিকতে পারে না। ততদিনে নব্বইয়ের উত্তেজনা থিতিয়ে গেছে, বাবরির ঘটনা আর পাঁচটা কোর্ট কেসের মতন বৈশিষ্ট্যহীন হয়ে পড়েছে। ইস দেশমে হিন্দুয়ো কা ইজ্জত রেন্ডি কা চুচী জ্যায়সা হ্যায়, এক সংগঠক তাকে বলে, যো আয়েগা দাবাকে চলা যায়েগা। কিন্তু সুকেশ তিওয়ারি তার কিশোর বয়সের সেই আশ্চৰ্য ভোরটাকে খুঁজে ফেরে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে আলোঅন্ধকারে-চলাফেরা-করা অনেক কিসিমের লোকের সঙ্গে তার চেনাজানা হয়। গোপনে গোপনে সারা দেশ জুড়ে কাজ এগিয়ে চলেছে দেখে সুকেশ তিওয়ারি বিস্মিত হয়ে যায়। একসময় মিরানপুরে ফিরে আসে সে। পুরনো সাকরেদরা তাকে দেখে খুশি হয়। সুকেশ দলবল জুটিয়ে রাজনীতিতে নামে। কিন্তু পরপর দুবার ভোটে দাঁড়িয়ে হেরে যায় সে। দ্বিতীয়বার তো তার জামানত জব্দ হয়। এইবার সুকেশ মিরানপুরের হিন্দুদের ভেতর সলতে পাকাচ্ছে। তার মুখ দেখে বোঝা যায়না মনে মনে সে কি পরিকল্পনা আঁটছে।

    সন্ধ্যের পর মিরানপুর জায়গাটা শুনশান হয়ে যায়। উমর তার ঘরে চৌকিতে শুয়ে বই পড়বার চেষ্টা করে। কিন্তু এখানে ইলেক্ট্রিকের অবস্থা তথৈবচ। ঘরের বাতিটা এতই মিটমিট করে জ্বলে যে তাতে বই পড়া কঠিন। তবুও উমর তার ব্যাগ হাতড়ে হলদে খবরের কাগজে মোড়া একটা বই বের করে আনে। বইটা খুলে সে প্রথম পাতাটার দিকে চেয়ে থাকে। পাতার মাথায় বড় হরফে WINGS OF FIRE লেখা, তার ঠিক নীচে খুদি খুদি হরফে ছাপা An Autobiography। তারপর অনেকখানি অংশ ফাঁকা। পাতার মাঝামাঝি ইংরেজিতে একটা সই: সরিতা বাসু, সিমলা। সরিতার কোন ফটোগ্রাফ উমরের কাছে নেই, কেবল এই বইটা রয়ে গেছে যেটা সরিতা তাকে ধার দিয়েছিল পড়তে। বইটা হাতে নিয়ে উমর চৌকিতে শুয়ে থাকে। মাঝেমাঝে এই অস্থায়ী পরিচয়ে গুপ্তচরের জীবন কাটাতে কাটাতে তার সাংঘাতিক একা লাগে আর তখন সরিতার কথা তার খুব মনে পড়ে। সে জানেনা সরিতার সাথে তার আর কোনোদিন দেখা হবে কিনা। সিলিংয়ে ঝুলন্ত ফিলামেন্ট-আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে সমস্ত জীবনটা খতিয়ে দেখে। এই র‍্যান্ডম অক্ষাংশ-দ্রাঘিমায় শুয়ে শ্রীনগরে তার বাবার রেস্তোরাঁটা, এমনকি সিমলার বোর্ডিং স্কুল যেন মস্তিষ্কের ধোঁয়াটে বিভ্রম মনে হয়। তারপর তার মনটা ভারতবর্ষের মানচিত্র বরাবর ঘুরতে ঘুরতে আরও দূরে চলে যায় দক্ষিণে সমুদ্রের দিকে, সে কল্পনার চোখে দেখতে পায় রামেশ্বরমে একটা মুসলিম ছেলে বড় হচ্ছে, তার বাবা স্থানীয় মসজিদের ইমাম, সেই ছেলেটা ইস্কুলে বিজ্ঞানের তত্ত্বগুলো শিখছে, ইস্কুল থেকে বেরিয়ে ঠিক করছে পদার্থবিদ্যা নিয়ে এগোবে, কিন্তু তাকে টানছে এয়ারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, একসময় সে ভর্তি হচ্ছে মাদ্রাজের কলেজে তেমন সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও, কেননা ততদিনে তার স্বপ্নে অন্ধকারের বুক চিরে ছুটে যাচ্ছে অগ্নিউদ্গীরণকারী আকাশযান আর সেই ছেলেটাই চল্লিশ বছর পরে হয়ে উঠছে দেশের শ্রেষ্ঠ ক্ষেপণাস্ত্রবিদ। এরকম ঘটনা এদেশে ঘটে? তাহলে এখন সে কোথায় রয়েছে? হাজার হাজার মাইল পেরিয়ে উমরের মনটা রামেশ্বরম থেকে মিরানপুরে ফিরে আসে, যেখানে নিঝুম রাত নেমে এসেছে, সে শুয়ে আছে চৌকির ওপর আর দূরে কালো পাহাড়ের গায়ে ভিনগ্রহ থেকে আসা অজানা উড়ন্ত বস্তুর মতো দাঁড়িয়ে আছে চারপেয়ে জলের ট্যাংকটা, যেন অপেক্ষা করছে আরেকটা দাঙ্গার। সমস্ত জীবনটা হঠাৎ উমরের এবসার্ড মনে হয়। এবসার্ড, এবসার্ড, সে মনে মনে মাথা নেড়ে বলে।

    ক'দিন যেতেই উমর বুঝতে পারে পন্ডিতজীর ঘরে যারা তার থাকবার ব্যবস্থা করেছে, তারা খোঁজখবর নিয়েই করেছে। সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত যখন বেশ গভীর হয়, নীচের তলা থেকে আসা আওয়াজে উমর টের পায় জনাকয়েক লোক এসে হাজির হয়েছে পন্ডিতজীর দোকানে। হাতের বইটা রেখে চৌকি ছেড়ে উমর উঠে দাঁড়ায়। তারপর আস্তে আস্তে কোন আওয়াজ না করে দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসতেই সে যে জায়গাটায় দাঁড়ায়, সেটা পন্ডিতজীর দোকানের পিছনদিক। এদিকে কলতলা রয়েছে, খাটা পায়খানা আর ড্রেন। উমর সেদিকে না গিয়ে দোকানের পিছনে আধখোলা জানলাটার কাছে সেঁটে দাঁড়ায়। দোকানের ভেতরে লোকগুলো জড়ো হয়েছে জুয়োর আড্ডায়। পন্ডিতজীর গলাও কানে আসে। উমর উঁকি মেরে দ্যাখে পন্ডিতজী দোকানের এককোণে বসে তুলসীদাসী রামায়ণ পড়ছেন। লোকগুলো জুয়ো খেলতে খেলতে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করতে থাকে। উমর আন্দাজ করে, এরা সুকেশ তিওয়ারির সাঙ্গোপাঙ্গ। একসময় দোকানের সামনের দিক থেকে একটা মোটরসাইকেলের আওয়াজ ভেসে আসে। সেটা দোকানের সামনে থামে। কিছুক্ষন পরে ঘরে মাঝারি উচ্চতার কিন্তু পেটানো চেহারার একজন নতুন লোক এসে ঢোকে। জুয়োর আড্ডার সদস্যরা হৈহৈ করে ওঠে। উমর বুঝতে পারে, এই লোকটাই সুকেশ তিওয়ারি। সার্ভে করার অজুহাতে দিনেরবেলা উমর মিরানপুরের আনাচেকানাচে ঘুরে বেড়ায়। দিনকয়েক যেতেই উমর টের পায় তার পিছনে সুকেশ তিওয়ারির ফেউ লেগে গেছে। তাতে উমর অবাক হয়না, মিরানপুরে পন্ডিতজীর নতুন গেস্ট এসে হাজির হবে আর সুকেশ তিওয়ারি কোন কৌতূহল দেখাবে না, এটা কি হতে পারে? সুকেশ তিওয়ারির ফেউ যেন তার পদক্ষেপ অনুসরণ করতে পারে সেইটেই উমর চায়। একদিন রাতে পন্ডিতজীর দোকানে জুয়োর আড্ডা শেষ হয়ে গেছে, এমনসময় সুকেশের এক শাকরেদ দোতলায় উঠে এসে উমরের দরজায় টোকা দেয়। উমর যেন ঘুমোচ্ছে ভান করে প্রথমে দরজা খোলেনা। তিনবার টোকা পড়তে দরজা খুললে, সুকেশের শাকরেদ জানায় তিওয়ারিজী তাকে নীচে ডাকছে। উমর লোকটির পিছন পিছন সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে। দোকানের সামনে সুকেশ মোটরসাইকেলের সীটে বসেছিল। উমরের সঙ্গে সে বেশ ভাল ব্যবহার করে। তাকে জিজ্ঞেস করে সে কোথা থেকে এসেছে, মিরানপুরে কী করছে। উমর সুকেশের জানা কথাগুলোই সুকেশকে জানায়, সার্ভে ইত্যাদি। সুকেশ সহাস্যে বলে যে, উমর তাকে ঠিক কতটা গর্দভ ঠাউরেছে। তারপর হাসি থামিয়ে উমরের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে, আপনি কে? উমর একটুও না ঘাবড়ে সুকেশের চারপাশে দাঁড়ানো সাঙ্গপাঙ্গদের দিকে চোখ বুলিয়ে একটা হাই চাপতে চাপতে বলে, সুকেশজী, আজ রাত হয়ে গেছে। কাল বিকেলে আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করব। আপনি একা আসবেন। তখন কথা হবে। সুকেশ নির্নিমেষ উমরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর কি ভেবে বলে, ঠিক আছে। কাল বিকেল চারটায় রেডি থাকবেন। পরেরদিন বিকেলে সুকেশ মোটরসাইকেল চালিয়ে আসে, সঙ্গে একজন শাকরেদ। দোতলায় উমরের ঘরে উমর সুকেশের জন্য একখানা চেয়ার পেতে দেয়। নিজে চৌকিতে বসে। দরজা ভেজিয়ে সুকেশের লোকটি সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকে। মেঘলা বিকেল, ঘরের ভেতর ছায়া-ছায়া হয়ে এসেছে আরও। সুকেশ ঠোঁটে সিগারেট রেখে ফস করে দেশলাই জ্বালায়। উমর কথা শুরু করে: সুকেশজী, আমাকে যারা পাঠিয়েছে, তারা আপনাকে একটা প্রস্তাব দিতে চায়। আপনি যে যুদ্ধে নামতে চলেছেন, আমরা আপনাকে সাহায্য করতে চাই। ভেতরে ভেতরে চমকে ওঠে সুকেশ, কিন্তু মুখের একটা রেখাও না কাঁপিয়ে বলে, কিভাবে সাহায্য করবেন আপনারা? উমর দেয়ালের দিকে তাকায়, আনমনে বলে, আমরা আপনার হয়ে লড়ব। ধকধক করে সুকেশের সিগারেটের আগুন জ্বলতে থাকে। মার্সিনারী? সে বলে। উমর আলতো ঘাড় হেলায়, শুধু লোক নয়, টাকা অস্ত্র দিয়ে আপনাকে সবরকমভাবে সাহায্য করতে চাই। কেন? এতে আপনাদের কি স্বার্থ? সুকেশ বাঁকা চোখে তাকায়। উমর বলে, ধরে নিন আপনার যা উদ্দেশ্য, আমাদেরও একই, শুধু স্কেলটা বড়ো। এরপর দুজনে কিছুক্ষন কথা না বলে পরস্পরকে মাপতে থাকে। ইতস্তত করে সুকেশ বলে, বিনিময়ে লেভারেজ চান এই তো? উমর চুপ করে থাকে। সে লক্ষ্য করে সুকেশের দৃষ্টি জানলা দিয়ে বাইরে চলে গেছে। যেন বহুদূরের দৃশ্য দেখতে দেখতে সুকেশ বলে, অস্ত্র আমি পাচ্ছি অন্য জায়গা থেকে। কিন্তু আরও অস্ত্র, আরও লোক আর অনেক টাকা আমার দরকার। ফলে আপনার প্রস্তাব আমি ফেলতে পারব না। উমর কানখাড়া করে শুনতে থাকে। এটা তার কাছে নতুন ইনফরমেশন যে সুকেশের পিছনে কোন অদৃশ্য তৃতীয়পক্ষ আছে। সুকেশের কথা শেষ হলে উমর ইচ্ছে করে সময় নেয়। তারপর শান্তভাবে বলে, শুনুন সুকেশজী, আপনার ব্যাপারে আমাদের বিশেষ আগ্রহ জন্মেছে।আর আমরা আপনার পক্ষে থাকলে আপনাকে হারাজেতা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, কিন্তু আমরা কোনো এমেচার থার্ড পার্টির সাথে হাত মেলাই না। ঘরের ভেতরে ততক্ষনে প্রায় পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে এসেছে। সেই ম্লান আঁধারে সুকেশ ক্রূর ভঙ্গিতে হাসে। তারপর বলে, কাল আপনাকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চাই। আমি আসতে পারব না, তবে আমার একটা ছেলেকে পাঠিয়ে দোবো। আপনার জন্য আমি গন্তব্যস্থলে অপেক্ষা করব। উমর নির্বিকারমুখে বলে, গিয়ে কি কিছু লাভ হবে? যেন তার কথা শেষ হয়ে গেছে, এই ভঙ্গিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়তে পড়তে সুকেশ বলে, দেখাই যাক না। আচ্ছা আসি। বলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন।