এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ভোটঁ নিয়ে ঘোটবাজি

    soma Dutta লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ২১ বার পঠিত
  • ছোটবেলায় ভোট দেওয়ার দিনটাকে ছুটির দিন মনে করে মজা পেতাম। এমন একটা ছুটির দিন যখন মা-বাবা দু'জনেই খানিক ব্যস্ত থাকবে আর বাড়ি থেকে বেরিয়ে অনেকটা সময় পরে ফিরবে। একা থাকতে বড় ভালো লাগত আমার। মনে হতো সময়ের দখল পেয়েছি। আমার মতো বেবাক গোবর পোরা মাথায় (আমার বাবার সংলাপ অনুযায়ী) এবং স্বপ্নে ভেসে থাকা মনে ভোট বা রাজনীতি বিষয়টা কোনো প্রভাবই ফেলতে পারত না। ধর্মঘট হলেও ছুটি, ভোট হলেও ছুটি। শেষপর্যন্ত যেটা উল্লেখযোগ্য সেটা হল ছুটি। এক ছুটি থেকে অন্য ছুটির মধ্যে মাত্র কিছু দেওয়াল লিখন হয়। দেখতাম 'অমুক ব্যক্তিকে এই চিহ্নে ভোট দিয়ে জয়ী করুন' বাক্যের উপর নিপুণ তুলির টান দিচ্ছে ময়লা শার্ট পরা কোনো রোগা তরুণ। পুজোর পর যেমন অনেক মূর্তি হতচ্ছেদ্দ দশায় ঘাটের পাশে পড়ে থাকে, ভোটের পরে দেওয়াল লিখনগুলোর ঠিক সেই অবস্থা হয়-
    শৈশব অত দেশের কথা, দশের কথা বোঝে না। সে শুধু চেনে নির্মল আনন্দ- আমার এক বন্ধু বলত সবথেকে স্বার্থপর হয় বাচ্চারা। দেখবি ওদের নিজেদের দরকারটুকুর বাইরে ওরা কিস্যু বোঝে না। খেলনা দাও, না দিলে খ্যান খ্যান খ্যান, খেলতে দাও, না দিলে খ্যান খ্যান খ্যান, এটা খাব না খ্যান খ্যান খ্যান, ওটা এখনই আমার চাই খ্যান খ্যান খ্যান... কী সহজ সবকিছু ওই শৈশবের কাছে। শৈশব দুঃখ চেনে না। আমরা বড় হয়ে যাওয়া দুঃখী মানুষরা পিছন ফিরে শৈশবের দিকে তাকিয়ে থাকি-
    নতুন প্রজন্মের শিশুরা মুখ ভ্যাংচায়।
    বাবা বামপন্থার সমর্থক ছিলেন। রাজনীতি সম্পর্কে স্বতন্ত্র বক্তব্য ছিল। অতএব বাড়িতে যে আড্ডা বসত, সে আড্ডার প্রায় সকলেই বাম শিবিরের লোক ছিলেন। কিন্তু মায়ের সমর্থন ছিল ভীষণভাবে পরিবারকেন্দ্রিক। আমার দিদিমা বামেদের ছাপ দেয়, স্বামী দেয় তাই তিনিও সেটাই অনুসরণ করবেন। এ বিষয়ে তাঁর জেদ অটুট ছিল। যুক্তির ধারকাছ দিয়ে তিনি যেতেন না। আজও সেই ধারাই বজায় রেখে চলেছেন।
    আমার মা বাবার ভোটাভুটি নিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না। কিন্তু আমি ভাবতাম মানুষ এই একটা দিনে এত ইম্পরট্যান্ট হয়ে ওঠে কেন? এই প্রশ্নটা আমার মনে বারবার আসত। বাবা এক্সিট পোলের খবর চালিয়ে রাখত। তাঁর ফাঁকে ফাঁকে দেখানো ভোট বুথের দৃশ্যে দেখতাম বৃদ্ধা অশীতিপর মহিলাকে কাঁধে তুলে তরুণরা নিয়ে আসছে ভোট দেওয়ানোর জন্য। প্রার্থীরা হাত জোর করছে রাস্তার ধারে ঘর বেঁধে থাকা মানুষের কাছে। গরীব, ব্লাউজ-সায়া বিহীন শাড়ি গায়ে জড়ানো ঠাকুমা একহাতে লাঠি ধরে অন্য হাতে আশীর্বাদ করছে সভ্য, সুশীল, নম্র প্রার্থীকে।
    এটা কেন হয় আমি ছোটবেলায় বুঝতে পারতাম না। দশ বছরের শৈশব বুঝত না যে গত পাঁচ বছরে অন্য কোনো সময় কেন এই দৃশ্য দেখা যায় না-
    আমাদের দু'ক্লাস উঁচুতে পড়ত অপরাজিতাদি, সাগরিকাদিরা। মাঝে মাঝে স্টুডেন্ট স্ট্রাইক হলে ওরা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিত। এই মেয়েদের দেখে একমাত্র মনে হত রাজনীতি বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বেশ দিদিগিরি ফলানো যায়। চোখ বড় করে বলা যায় এই কেউ ক্লাসে ঢুকবি না আজকে, সবাই বাড়ি চলে যা। আমি মুগ্ধ হয়ে ওই দিদিগিরি দেখতে দেখতে আমার চোখ ছানাবড়ার মত গোল হয়েছে। আমি আজও ছানাবড়া-চোখে দিদিগিরি দেখে চলেছি-
    ছোটবেলায় আমাদের ইতিহাস পড়ানো হতো কিন্তু রাজনীতি পড়ানো হতো না। অঙ্ক শেখানো হতো কিন্তু সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে কিছুই ধারণা দেওয়া হতো না। আমাদের শৈশব ভাবত রাজনীতি পড়াশোনা বহির্ভূত বিষয়। আমাদের ইতিহাস ভাবত সব পৃষ্ঠাই মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ আর স্বাধীনতার জন্য শহীদদের মৃত্যুবরণ- মাঝখানে মুখস্থ হতো কিছু সাল তারিখ আর নাম-
    অনেক পরে বড় হয়ে মনে হয়েছে, আমাদের এখানে রাজনীতি আসলে শিক্ষার সঙ্গে অশিক্ষার লড়াই। এই লড়াই যেহেতু জীবনের প্রতিটি ধাপে প্রভাব ফেলে, তাই রাজনীতিতে প্রত্যেক সাধারণ মানুষের জীবনও প্রভাবিত হয়।
    শৈশব যখন কৈশোরের দিকে এগিয়ে গেল তখন ধারণা হয়েছিল রাজনীতি মানে ভয়, রাজনীতি মানে মার্ডার, রাজনীতি মানে লাঠিচার্জ, রাজনীতি মানে ক্ষমতাবানের কাছে ক্ষমতাহীনের পরাজয়।
    অনেক পরে গিয়ে মনে হল, রাজনীতির মধ্যে সাধারণ মানুষের অবস্থান দাবার সৈন্যের মতো, যাকে শুধুমাত্র ব্যবহার করা হয়-
    একমাত্র ধর্মেন্দ্র আর মোহম্মদ রফি ছাড়া বাবা আর কারো কট্টর সমর্থক ছিলেন না। বামমনস্ক ছিলেন কিন্তু বামেদের ভুল ত্রুটি নিয়ে কথা বলবেন না এতটাও ছিলেন না।
    আমি বাবাকে অনুসরণ করিনি, পর্যবেক্ষণ করেছি। একজন সাধারণ মানুষকে অন্য একজন সাধারণ মানুষ হয়ে চেনার চেষ্টা করেছি। সেই ধারণা অনুযায়ী ভোটের দিনকে আজও তেমন একটা আশ্চর্য দিন হিসেবেই দেখি যেদিন আমাদের মতো হদ্য সাধারণেরাও অসাধারণদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠি। এটাই বোধহয় রাজনীতির কাছ থেকে জনতার একমাত্র প্রাপ্তি। বাকি সবটুকুই মায়া-জটাজালে পরিপূর্ণ-
    অনেকে আমাকে বলেছেন আমি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করিনা। খানিকটা ঠিক। শুধু মানুষ হয়ে জন্মালে নিজের অবস্থান ঠিক রাখা খুব কষ্টকর। ব্যক্তিস্বার্থ এবং জনস্বার্থকে আলাদা করে দেখা খুব কষ্টের। সমর্থন ব্যাপারটা ভীষণই আপেক্ষিক। দলকে সমর্থন করলেও অনেক সময় ব্যক্তিকে সমর্থন করা যায় না। আবার ব্যক্তিকে সমর্থন করলেও অনেক ক্ষেত্রে দলকে কোনোমতেই সমর্থন করা যায় না- সবই একটু ভালোর মধ্যে অনেকটা খারাপ ঢেলে ঘোলা করে দেওয়া জলের মতো-
    লেসার এভিলকে চিহ্নিত করা বড় দুষ্কর আজকের দিনে দাঁড়িয়ে- এক যদি ভারত পাকিস্তানের ম্যাচের মতো করে ভাবা যায় তবে একটা পথ পাওয়া যায়। অথবা মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল হিসেবেও ভাবা যেতে পারে। কিন্তু খেলাটা আমেরিকা বনাম ইজরায়েলের হয়ে গেলে বড় মুশকিলের হয়ে যায়-
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন