এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • স্পিকটি নট! 

    কালের নৌকা লেখকের গ্রাহক হোন
    ২১ মে ২০২৬ | ১৪৩ বার পঠিত | রেটিং ৩ (১ জন)
  • খবরে প্রকাশ, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিং তাঁর মেয়াদের দশ বছরে মোট ১১৭ বার সরাসরি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন বিভিন্ন সাংবাদিক সম্মেলনে। যেখানে বেশির ভাগ সময়েই তিনি সাংবাদিকদের করা তাৎক্ষণিক প্রশ্নগুলির সরাসরি উত্তর দিয়েছিলেন। আগে থেকে স্ক্রিপটেড উত্তর নয়। এর বিপ্রতীপে গত বারো বছরে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একটিও সাংবাদিক সম্মেলনের মুখোমুখি হননি। দেশের হেভিওয়েট সাংবাদিকরা একাধিকবার তাঁকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়ার চ্যালেঞ্জ জানালেও তিনি সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেননি। বস্তুত টেলিপ্রম্পটার ছাড়া যিনি ভাষণই দিতে সক্ষম নন, তাঁর পক্ষে কি করে সরাসরি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়া সম্ভব। হ্যাঁ, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি একবার বিশিষ্ট সাংবাদিক করণ থাপারের মুখোমুখি বসেছিলেন। সাংবাদিকের প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে গিয়ে ভয়ে উৎকন্ঠায় সেদিন তাঁর গলা শুকিয়ে কাঠ। অবশেষে ‘আমি জল খাবো’ বলে তিনি সেই ইন্টারভিউ মাঝপথেই বাতিল করে দিয়ে উঠে যান। সম্ভবত সেই শেষ। বিশ্বগুরুকে তারপর আর কোনদিন কোন বিশিষ্ট সাংবাদিকের মুখোমুখি হতেও দেখা যায়নি। দেখা যায়নি কোন সাংবাদিক সম্মেলনেও। অবশ্য বেশ কিছু ইন্টারভিউয়ের শুটিংয়ে তাঁকে দেখা যায় মাঝেমধ্যে। পেইড সাংবাদিক বা ভক্ত সেলিব্রেটিদের নিয়ে এসে স্ক্রিপটেড প্রশ্নের স্ক্রিপটেড উত্তর দিতে। বিশ্বগুরু বলে কথা।

    কিন্তু দেশের কেচ্ছা কি আর দেশেই আটকিয়ে থাকে। কেচ্ছার ধর্মই হলো তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সুদূর নরওয়েতে গিয়েও শান্তি নেই। এক সাংবাদিকের করা বেমক্কা প্রশ্নে আবিশ্ব মানুষের সামনে দেশের বিশ্বগুরুর ইউনিভার্সাল এক্সপোজার ঘটে গেল। প্রকৃত সাংবাদিক দেখলেই আমাদের স্পিকটি নট বিশ্বগুরু পিছন ফিরে কেটে পড়বেন যে, সে তো বলাই বাহুল্য। নরওয়েতেও তার কোন ব্যতিক্রম হয়নি। বারো বছর ধরে একটাই চিত্রনাট্য। নো সাংবাদিক সম্মেলন। নো প্রশ্ন! দেশের মানুষের কাছে কোন জবাবদিহিতার দায় নেই। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে। শুধু টেলিপ্রম্পটার নিয়ে এয়ারকন্ডিশণ্ড মঞ্চে দাঁড়িয়ে নানবিধ পোশাকে বিচিত্ররকম ভাষণ দেওয়া। আর রেডিওর সেই ভুবনবিখ্যাত ‘মন কি বাৎ’। একেবারে সেফ জোনে খেলে যাওয়া। পুরো ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক। একটাই রাজপথ। একটাই গাড়ি। একজনই যাত্রী।

    তা হোক কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম। বিশেষ করে দেশের ভিতরের সেই ফোর্থ পিলারেই ঘুণ ধরে গিয়েছে যখন পুরোপুরি। মিডিয়া আর কেন্দ্রের শাসকদলকে প্রশ্ন করে না। কোন কৈফিয়তও চায় না। কৈফিয়ত চায় শুধুমাত্র শাসকদল যাঁদের অপছন্দ করে, তাঁদের কাছ থেকে। কৈফিয়ত চায় যাঁরা অন্ধভক্ত হতে রাজি নয়, তাঁদের কাছ থেকে। কৈফিয়ত চায়, যাঁরা এখনো শাসকদলের কাজকর্মের সমালোচনা করে যাচ্ছে, তাঁদের কাছ থেকে। মিডিয়ার বয়ানই বদলিয়ে গিয়েছে। ২০১৪ সালের আগে মিডিয়ার বয়ান ছিল, ‘নেশন ওয়ান্টাস টু নো’। ২০১৪ সালের পর সেই বয়ান আমূল বদলিয়ে গিয়েছে, ‘নেশন প্লীজড ট্যু এনাউন্স’-এ। এখন ভক্ত হওয়াই দেশপ্রেম। না হওয়াই রাষ্ট্রদ্রোহীতা। UAPA আইনে ধরা পড়লেই অপরাধী।

    তবে নরওয়ের সাম্প্রতিক এই ঘটনা, বিশ্বজুড়েই ভারতবর্ষের গণতন্ত্রকে নতুন করে চর্চায় তুলে নিয়ে এসেছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র। অথচ জবাবদিহিতার কোন দায় নেই। এ এক নতুন রাষ্ট্রবিজ্ঞান। সাধারণত স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থায় কোনরকম জবাবদিহিতার দায় থাকে না। গণতন্ত্রের মূল দুটি বিষয়ই হলো, এক নির্বাচন। আর এক নির্বাচিতের জবাবদিহিতার দায়। ভারতবর্ষই সর্ব প্রথম নতুন একটি পথ দেখাতে শুরু করেছে। নির্বাচন আছে। কিন্তু নির্বাচিতের জবাবদিহিতার কোন দায় নেই। মিডিয়া আছে, কিন্তু মিডিয়া গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ নয়। মিডিয়া শাসকদলের মুখপাত্র।

    অবশ্য মিডিয়ার এই ভুমিকা ভারতবর্ষের অবদন নয়। ভারতবর্ষের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী এটি অনুকরণ করেছে মাত্র। মিডিয়ার এই ভুমিকা আগে আমরা দেখেছি সোভিয়েত জামানায়। পরে বর্তমান শতকে দেখে চলেছি ইউনিপোলার সাম্রাজ্যের মালিক ওয়াশিংটন-তেল আবিভ-লণ্ডনের সৌজন্যে। মিডিয়া যেখানে শাসকগোষ্ঠীরই মুখপাত্র। শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার প্রোপাগাণ্ডা মেশিন মাত্র। কিন্তু সেখানেও রাষ্ট্রপ্রধানরা এমন ভাবে সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলে যান না। ইচ্ছে না থাকলেও তাঁদেরকে কম বেশি আনস্ক্রিপটেড উত্তর দিতে হয়। সেটাই দস্তুর। অন্তত নিজেদের একটা নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি বজয়া রাখতে। কিন্তু এবারেই বিশ্ব দেখলো, সেই ন্যূনতম প্রয়োজনটুকুও একজনের ক্ষেত্রে আর প্রাসঙ্গিক নয়। দেশের ভিতরেও নয়। দেশের বাইরেও নয়। এখানেই ভারতবর্ষের অভিনবত্ব! এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না’কো তুমি।

    ©কালেরনৌকা ২১শে মে ২০২৬
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | 103.*.*.* | ২১ মে ২০২৬ ১১:৪৩740748
  • ইটলিতে গিয়ে কী'রম দুষ্টু মিষ্টি হাম আপকে হ্যায় কৌন সাজলেন সে নিয়ে তো কিছু লিখলেন না? নরওয়েতে ভিলেন থেকে ইটলিতে হিরো, এই না হলে Acting PM ?
  • Prabhas Sen | ২১ মে ২০২৬ ১২:২৬740749
  • সাংবাদিক দেখলেই এদের পশ্চাদ্দেশ বিদীর্ণ হয়ে পড়ে। এক জনৈক অবক্ষয কুমার তাঁর ইন্টারভিউ নিচ্ছেন কোনও এক চ্যানেল এ, নাম মনে পড়ছে না। বিশ্ব গরু আম কেটে খান নাকি চুষে খান। আপনি দিনে এত কাজ কি করে করেন। এসব ছিল প্রশ্নের ধরণ। কাজেই, ওরে বাবা! বাড়ি যাবো! জল খাবো! বলতে হয়নি। সাজানো চিত্রনাট্যে সহজেই ঐ "ইন্টারভিউ" পার হয়েছিলেন! 
  • hmm | 2401:*:*:*:*:*:*:* | ২১ মে ২০২৬ ১৩:২১740750
  • মুসোলিনির দেশ বলে কথা। চাড্ডিদের পীঠস্থান।
  • DEBJYOTI MONDAL | ২১ মে ২০২৬ ১৩:৪৭740753
  • আপনাদের লেখা পড়ে দেখলাম ভালো, আরেকটু কড়া লেখা চাই, আরও কুৎসিত সত্য যে ভারতের মিডিয়া কীভাবে কাজ করে?
  • Prabhas Sen | ২১ মে ২০২৬ ১৯:২৬740759
  • "রোধ,অবরোধ আর কোলাহল শুনিবার নাহিক সময়,
    জানিতে চাহিদা আর সম্রাট সময়ের ভাঁড় কোন খানে......."(জীবনানন্দ)
  • Sandipan Majumder | ২২ মে ২০২৬ ১০:৫২740775
  • খুব খারাপ লাগে। উপায়হীন আমরা!
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল প্রতিক্রিয়া দিন