এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  •  প্রথম রেখা

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ৬২ বার পঠিত
  • শব্দ দিয়ে শুরু। না, শব্দ আগে। আগে আসে কম্পন। মাটির নিচে থেকে আসা এক গুঞ্জরণ, যা পায়ের তলার মাটিকে কাঁপিয়ে তোলে, উরুর হাড়ে পৌঁছে দেয় একধরনের ঝনঝনি, হৃৎপিণ্ডের গতির সাথে মিলেমিশে একাকার। তারপর শব্দ: ধ্বংসপ্রাপ্ত পাহাড়ের গর্জন, ভাঙা কাঠের চিৎকার, ধাতুর উপর ধাতুর আঘাতের তীক্ষ্ণ কান্না। এসব আসে দূর থেকে, কিন্তু দূরত্ব একটা ছলনা মাত্র। এটি আসলে কাছ থেকেই আসে, আমার নিজের ভেতর থেকে, রক্তস্রোতের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা এক যুদ্ধের স্মৃতি যা আমি কখনো দেখিনি অথচ যেন দেখেছি।

    আমি দাঁড়িয়ে আছি। কোথায়? একটি প্রশস্ত প্রান্তর, ঘাসগুলো মাথা উঁচু করে ধরেছে, হলুদাভ, শুকনো। আকাশ সাদা, একটুও নীল নয়, যেন চুনকাম করা। সামনে: মানুষ। অনেক মানুষ। কিন্তু তারা মানুষ না, তারা আকৃতি। তারা নড়ছে, কিন্তু তাদের নড়াচড়া যন্ত্রচালিত, রশি দিয়ে টানা পুতুলের মতো। তাদের হাতে উজ্জ্বল জিনিস: বর্শা, তলোয়ার, ধনুক। সূর্য এসবের উপর পড়ে ফিরে আসে, আমার চোখে আঘাত করে। আমি চোখ সরাই। দেখি আমার নিজের হাত। খোলা, শূন্য। তালুতে রেখার জাল, সেখানে কি লেখা আছে কিছু? ভবিষ্যৎ? অতীত? আমি পড়তে পারি না।

    একটি কণ্ঠস্বর: “নাও।” একটি হাত বাড়িয়ে দেয় একটি বস্তু। এটি কাঠের, বাঁকানো, শক্ত, তার উপর দড়ি পেঁচানো। এটি ভারী। এটি জীবন্ত মনে হয়, একটি প্রাণী যা ঘুমিয়ে আছে। আমি ধরি। আমার আঙ্গুলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে জায়গা পেয়ে যায়, খাঁজে খাঁজে। এটি আমার জন্য তৈরি। না, আমি এর জন্য তৈরি।

    “টান,” বলে কণ্ঠস্বর।

    আমি টান দিই। দড়িটি শক্ত, প্রতিরোধী। আমার পেশী জ্বলে ওঠে, একটি নতুন ধরনের জ্বালা, সুখকর। আমি আরও টান দিই। আমার কাঁধের হাড় জোড়া লাগানোর শব্দ করে। দড়িটি আমার দিকে আসে, একটু। একটি গুঞ্জন ওঠে, একটি গান, যা কেবল আমি শুনতে পাই। এটি বলে: আমি আসছি, আমি আসছি, লক্ষ্যে পৌঁছাব।

    “থাম,” বলে কণ্ঠস্বর। “এখন ছাড়।”

    আমি ছাড়ি। দড়িটি সশব্দে ফিরে যায়, বাতাসকে কেটে একটি শব্দ তোলে: ছ্যাড়ররং! এটি আমার কানে মধুর সঙ্গীতের মতো শোনায়। আমার হাত কাঁপছে, উত্তেজনায়, আনন্দে। আমি আবার টানতে চাই। আমি আরও শুনতে চাই সেই শব্দ।

    “বেশ,” বলে কণ্ঠস্বর। “এবার লক্ষ্য।”

    লক্ষ্য। সামনে, দূরে, একটি গাছের গুঁড়িতে একটি সাদা বৃত্ত আঁকা। বৃত্তটি আমার দিকে তাকিয়ে আছে, একটি চোখের মতো। এটি আমাকে চ্যালেঞ্জ করছে। আমার ভেতর কিছু সংকুচিত হয়, তারপর প্রসারিত হয়, একটি শিকারের মতো আগুয়ান হয়। আমি ধনুক তুলি, আমার দৃষ্টি সেই একটি বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত হয়। সবকিছু ঝাপসা হয়ে যায়: আকাশ, মাঠ, মানুষ, শব্দ। শুধু থাকে সেই বৃত্ত, সাদা, বিশুদ্ধ, অপেক্ষমাণ।

    আমার নিঃশ্বাস নিজে থেকেই থেমে যায়। আমার আঙ্গুলগুলি শিথিল হয়। আমি ছাড়ি।

    তীর যায়। এটি বাতাসে শিস দেয় না, নিঃশব্দে যায়, সময়কে ভেদ করে। আমি দেখি এর গতিপথ, একটি সূক্ষ্ম রেখা যা বায়ুতে আঁকা। এটি বৃত্তের ঠিক মাঝখানে বিঁধে। ঠিক করি। নিখুঁত।

    কোনো সাধুবাদ নেই। কণ্ঠস্বর বলে, “ভাল। কিন্তু এটা স্থির লক্ষ্য। শত্রু স্থির থাকবে না।”

    শত্রু। শব্দটি প্রথমবারের মতো শুনি। এটি ভারী, তিক্ত, আমার জিহ্বায় লেগে থাকে। শত্রু কে? যে ব্যক্তি সাদা বৃত্ত এঁকেছে? যে আমাকে চ্যালেঞ্জ করে? যে আমার এই আনন্দকে হরণ করতে চায়?

    “চলো,” বলে কণ্ঠস্বর।

    আমি ঘুরে দাঁড়াই। কণ্ঠস্বরের মালিক এখনো একটি মুখহীন সত্তা, একটি ছায়া, একটি উপস্থিতি। সে লম্বা, শীর্ণ, তার পোশাক সরল, একটি ধূসর বস্ত্র। তার মুখ দেখা যায় না, কারণ আলো তার পেছনে থেকে আসে। কিন্তু আমি তার চোখ অনুভব করতে পারি, আমার উপর, নিরীক্ষণকারী, মূল্যায়নকারী।

    “তুমি শিখবে,” সে বলে। “কারণ তোমাকে শিখতে হবে। তোমার জন্মই তোমার শিক্ষার আদেশ।”

    আমি কিছু বলি না। আমি ধনুকটি শক্ত করে ধরি।

    আমরা চলি। মাঠ পেরিয়ে, একটি বনাঞ্চলে প্রবেশ করি। গাছগুলো উঁচু, তাদের ডালপালা আকাশকে আড়াল করে। এখানে আলো সবুজ, ভাঙা, জলের নিচের মতো। শব্দ বদলে যায়: পাখির ডাক, পাতার মর্মর, দূরের এক জলপ্রপাতের গর্জন। আমার গাইডের পা ফেলার শব্দও নিঃশব্দ, সে যেন মাটি স্পর্শ করে না।

    আমাদের থামতে বলে একটি জায়গায়, যেখানে একটি ঝরনা একটি পাথরের অববাহিকায় পড়ছে, স্ফটিক স্বচ্ছ জল। সে বলে, “তৃণা। তৃষ্ণা দূর করো।”

    আমি ঝরনার কাছে যাই, হাঁটু গেড়ে বসি। জল দেখি। আমার প্রতিবিম্ব দেখি: একটি ছেলের মুখ, কিন্তু চোখগুলো বয়স্ক, ক্লান্ত। আমার কান জ্বলজ্বল করছে। আমি জল স্পর্শ করি, পান করি। এটি মিষ্টি, ঠাণ্ডা। এটি আমার ভেতরের আগুনকে সাময়িকভাবে নিভিয়ে দেয়।

    “তোমার যা আছে, তা দান করো,” বলে গাইড।

    আমি তাকাই। আমার কাছে কি আছে? আমার পোশাক, আমার ধনুক, তীর, একটি ক্ষুদ্র খনিজ যা আমি পথে পেয়েছিলাম। আমি খনিজটি বের করি, একটি স্বচ্ছ পাথর যা আলো ধরে রাখে। আমি তাকে দিই।

    সে তা নেয়, তার হাতের তালুতে রাখে। সে বলে, “এটা যথেষ্ট নয়।”

    “আমার কাছে আর কিছু নেই,” আমি বলি।

    “তোমার আছে,” সে বলে। “তোমার বর্ম। তোমার কান। তোমার জন্মের রহস্য। দান করো।”

    আমি পিছিয়ে যাই। “সেসব আমি দিতে পারি না। সেসব আমি।”

    “তুমি কি?” সে জিজ্ঞেস করে, তার শির উন্নত করে। “তুমি কি এই দেহ? এই চর্ম? এই স্মৃতি? তুমি যা দান করো না, তা তোমাকে শৃঙ্খলিত করে। শত্রু তা দেখবে, লক্ষ্য করবে, ব্যবহার করবে। দান করো, এবং তুমি হালকা হবে, বায়ুর মতো, লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবে।”

    আমি বুঝি না। কিন্তু তার কথায় একটি সত্যি আছে, একটি কর্কশ মাধুর্য যা আমার হৃদয়ে অনুরণিত হয়। আমি আমার বুক স্পর্শ করি। সেখানে, ত্বকের নিচে, কিছু আছে, একটি গরম বিদেশী বস্তু। আমি কি এটি দান করতে পারি? এটি দান করলে কি আমি শূন্য হয়ে যাব? না, আমি আরও বেশি হব। সে যেন তা বলে।

    “বিরত,” বলে আরেকটি কণ্ঠস্বর, গভীর, বয়স্ক।

    একজন বৃদ্ধ প্রবেশ করেন ঝোপঝাড় থেকে। তার দাড়ি সাদা, লম্বা, তার চোখ গভীর খাদের মতো। তিনি আমার গাইডের দিকে তাকান। “তাকে প্রলোভন দেখিও না,” তিনি বলেন। “সে এখনো প্রস্তুত নয়।”

    গাইড মাথা নত করে। “গুরু,” সে বলে।

    গুরু। শব্দটি বাতাসে ঝুলে থাকে, একটি পবিত্র শব্দ।

    গুরু আমার দিকে তাকান। তার দৃষ্টি একটি স্পর্শের মতো, যা আমার মাথার খুলি ভেদ করে, আমার মস্তিষ্কের ভেতর প্রবেশ করে, আমার চিন্তাগুলো উলটেপালটে দেয়। তিনি বলেন, “তুমি এসেছো। আমরা অপেক্ষা করছিলাম।”

    “কে আমরা?” আমি জিজ্ঞেস করি।

    “যারা জানে,” তিনি বলেন। “যারা দেখে। তুমি একা নও। তোমার মতো আরও আছে, যারা বিশেষ, যাদের জন্মে চিহ্ন আছে, যাদের উদ্দেশ্য আছে।”

    আমি আমার ধনুকটি শক্ত করে ধরি। “আমার উদ্দেশ্য কি?”

    “যুদ্ধ,” তিনি বলেন সরলভাবে। “মহান যুদ্ধ। যা সবকিছু পরিবর্তন করবে। তুমি তার কেন্দ্রে থাকবে। কিন্তু তোমাকে প্রস্তুত হতে হবে। শুধু অস্ত্র চালনা নয়। দান করতে শেখো। নিঃস্বার্থ হতে শেখো।”

    “কেন?” আমি জিজ্ঞেস করি, আমার কণ্ঠস্বর কর্কশ হয়ে ওঠে। “কেন আমি নিঃস্বার্থ হব? কেউ কি আমার জন্য কিছু করে? কেউ কি আমাকে রেখে যায়নি? আমাকে গ্রহণ করে নেয়নি?”

    গুরুর চোখে করুণা ঝিলিক দেয়, কিন্তু তা দ্রুত মিলিয়ে যায়। “বেদনা তোমার জ্বালানি,” তিনি বলেন। “কিন্তু তা তোমাকে পুড়িয়ে ফেলবে যদি তুমি সতর্ক না হও। দান করো, এবং বেদনা হালকা হবে। তুমি মুক্ত হবে।”

    আমি মাথা নাড়ি। আমি বিশ্বাস করি না। আমার বেদনা আমার। আমার রাগ আমার। আমার প্রশ্ন আমার। আমি এগুলো দান করব না।

    গুরু দেখেন তিনি আমাকে এখনো পটাতে  করতে পারছেন না। তিনি বলেন, “চলো। আমি তোমাকে দেখাবো।”

    আমরা বনের গভীরে চলি। গাছগুলো ঘন হয়ে আসে, আলো সবুজ থেকে নীলাভ হয়ে যায়। শব্দগুলো স্তব্ধ হয়ে আসে। আমরা একটি গুহার মুখে পৌঁছাই, কালো, একটি খোলা মুখের মতো। গুরু ভিতরে প্রবেশ করেন, আমি অনুসরণ করি। গাইড বাইরে রয়ে যায়, প্রহরীর মতো।

    ভিতরে অন্ধকার, কিন্তু শীঘ্রই আলো জ্বলে, দেয়ালে আটকানো মশাল থেকে। গুহাটি বিশাল, ছাদ উঁচু, সেখানে স্তালাকটাইট ঝুলছে, ফোঁটায় ফোঁটায় জল পড়ছে। কেন্দ্রে একটি অগ্নিকুণ্ড জ্বলছে, তার শিখাগুলো নাচছে, ছায়াগুলোকে প্রাণবন্ত করে তুলছে। দেয়ালে চিত্র আঁকা: মানুষ, দেবতা, যুদ্ধ, নৃত্য, প্রণয়।

    গুরু অগ্নিকুণ্ডের কাছে যান, বসেন। তিনি আমাকে  বসতে বলেন। আমি বসি। আগুনের তাপ আমার মুখে লাগে, আমার ত্বক টানটান করে।

    “শোনো,” তিনি বলেন, এবং তিনি গান শুরু করেন।

    এটি গান নয়, এটি একটি বর্ণনা। তিনি গান করেন সৃষ্টির, দেবতাদের যুদ্ধের, মানবজাতির উত্থানের। গানের ভাষা প্রাচীন, আমার অজানা, কিন্তু আমি বুঝতে পারি, প্রতিটি শব্দ আমার অস্থিতে প্রবেশ করে।

    আমি জিজ্ঞেস করি, “সে কে? সেই যোদ্ধা?”

    গুরু আমার দিকে তাকান, তার চোখে আগুনের প্রতিফলন। “সে অনেক। সে এক। সে হয়তো তুমি। সে হয়তো অন্য কেউ। সময় একটি চক্র, ঘটনাগুলো পুনরাবৃত্তি হয়। চিহ্নগুলো একই থাকে।”

    “আমার বুকের চিহ্ন?” আমি জিজ্ঞেস করি, আমার বক্ষবন্ধনী খুলে।

    গুরু ঝুঁকে পড়েন, দেখেন। তিনি একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেন। “হ্যাঁ,” তিনি বলেন। “এটা সেই চিহ্ন।  বর্ম। এটা তোমাকে অপরাজেয় করবে। কিন্তু শুধু যদি তুমি তা ধরে রাখো।”

    “আমি কি দান করব?” আমি জিজ্ঞেস করি, আমার হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হয়।

    “তোমাকে করতে হবে,” তিনি বলেন। “কারণ দানই তোমার মহানত্ব। কিন্তু সঠিক সময়ে, সঠিক ব্যক্তিকে। এখন নয়।”

    আমি চুপ করে থাকি। আগুনের শিখাগুলো নাচতে থাকে, তাদের ছায়াগুলো দেয়ালের গল্পগুলোকে জীবন্ত করে তোলে। আমি দেখি একজন যোদ্ধাকে একটি রথে, একটি ধনুক ধরেছে, তার মুখদুঃখে ভরা। আমি দেখি একজন বৃদ্ধকে, একটি নদীর তীরে, একটি শিশুকে একটি ঝুড়িতে রেখে যাচ্ছেন। আমি দেখি একজন সারথিকে, একটি রথ চালাচ্ছেন, তার মুখ শান্ত, কিন্তু চোখে অনন্ত পরিকল্পনা।

    “কে সারথি?” আমি জিজ্ঞেস করি।

    গুরু চুপ করে থাকেন দীর্ঘক্ষণ। শেষে তিনি বলেন, “সে সময়ের চালক। সে সব দৃশ্যের পিছনে থাকে। সে তোমাকে পরীক্ষা করবে। সে তোমাকে পছন্দ করবে। সাবধান থাকো।”

    “কেন?” আমি জিজ্ঞেস করি। “সে কি শত্রু?”

    “শত্রু? মিত্র? এই শব্দগুলো অর্থহীন তার কাছে,” গুরু বলেন। “সে শুধু নিশ্চিত করে যে খেলাটি চলতে থাকে। তুমি খেলোয়াড়। একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।”

    আমি ক্লান্ত বোধ করি। আমার মাথা ঘোরে। এত কিছু, এত তথ্য। আমি শুধু একটি শিশু ছিলাম, একটি গ্রামে। এখন আমি এসব শিখছি: যুদ্ধ, দান, চিহ্ন, সারথি, খেলা।

    “আমি কি করতে চাই?” আমি জিজ্ঞেস করি, আমার নিজের কাছে।

    গুরু হাসেন, একটি মৃদু, দুঃখময় হাসি। “তোমার ইচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ নয়। জন্ম তোমার জন্য যা নির্ধারণ করেছে, তা তুমি করবে। কিন্তু মনে রেখো: একটি মুহূর্ত আসবে যখন তোমাকে পছন্দ করতে হবে। একটি অস্ত্র উঠাতে হবে, একটি দিকে যেতে হবে। সে মুহূর্তেই তোমার স্বাধীন ইচ্ছা থাকবে। সেটিই তোমার পরীক্ষা।”

    আমি উঠে দাঁড়াই। আমার পায়ে শক্তি নেই। আমি গুহা থেকে বেরিয়ে আসি, তাজা বাতাসের দিকে। বাইরে এখন সন্ধ্যা, আকাশ কমলা এবং বেগুনি। আমার গাইড অপেক্ষা করছে, এখন একটি রূপালী আলোয় দেখা যাচ্ছে।

    “আমি এখন কি করব?” আমি জিজ্ঞেস করি।

    “তুমি শিখবে,” গুরু বলেন, তারপরে পিছনে আসেন। “অস্ত্র চালনা, রথ চালনা, যুদ্ধের কৌশল। তুমি মহান হবে। কিন্তু প্রতিদিন, তুমি দান করবে। কিছু না কিছু। তোমার খাবার, তোমার পোশাক, তোমার অস্ত্র। যতক্ষণ না দান তোমার স্বভাবে পরিণত হয়।”

    আমি মাথা নাড়ি। আমি ফিরে যাই সেই প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে, যেখানে অন্যান্য ছাত্ররা অনুশীলন করছে। তারা আমাকে দেখে, তাদের চোখে ঈর্ষা, ভয়, শ্রদ্ধা। তারা জানে আমি আলাদা। আমার কান, আমার চিহ্ন। আমি তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন।

    দিনের পর দিন কাটে। সূর্য ওঠে এবং অস্ত যায়, কিন্তু আমার জন্য সময়ের অর্থ ভিন্ন। প্রতিটি দিন একই রুটিন: ভোরবেলা উঠা, ধ্যান, অস্ত্র চালনার অনুশীলন, দান। আমি দান করি: ফল, ফুল, কখনো আমার নিজের রক্ত। আমি একটি ক্ষত তৈরি করি, রক্ত ঝরাই, এটি মাটিতে দিই। এটি মাটি শুষে নেয়, লাল হয়ে যায়, তারপরে শুষ্ক হয়ে যায়। এটি একটি বলি।

    আমার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। আমার তীর কখনো লক্ষ্য হারায় না। আমার তলোয়ার বাতাসকে কাটে, একটি শিস তোলে। আমার রথ চালনা মসৃণ, আমি যেন রথের অংশ। কিন্তু আমার মন সর্বদা অন্যত্র। আমি সেই গানের কথা মনে করি, সেই যোদ্ধার কথা, যে দান করে এবং মারা যায়। আমি সেই সারথির কথা মনে করি, যে খেলা চালায়।

    একদিন, গুরু আমাকে ডাকেন। তিনি একটি বাক্স নিয়ে আসেন, কাঠের, খোদাই করা। “খোল,” তিনি বলেন।

    আমি খুলি। ভিতরে আছে একটি কবচ, স্বর্ণের, জ্বলজ্বলে, সূর্যের মতো উজ্জ্বল। এটি আমার বুকের চিহ্নের সাথে মেলে, ঠিক সেই আকৃতির।

    “এটি তোমার,” গুরু বলেন। “তোমার জন্মগত অধিকার। এটি পরো। এটি তোমাকে রক্ষা করবে, যে কোনো অস্ত্র থেকে, যে কোনো শত্রু থেকে।”

    আমি কবচটি তুলি। এটি ভারী, উষ্ণ। আমি এটি পরি। এটি আমার বুকের সাথে মিশে যায়, একটি দ্বিতীয় চামড়ার মতো। আমি পূর্ণ বোধ করি, সম্পূর্ণ। আমি অপরাজেয় বোধ করি।

    “কিন্তু মনে রেখো,” গুরু বলেন, তার কণ্ঠস্বর কঠিন। “এটি একটি পরীক্ষা। এটি একটি প্রলোভন। তুমি এটি দান করতে পারবে ?”

    আমি কবচটি স্পর্শ করি। এটি আমার। আমি এটি দান করব না। আমি মাথা নাড়ি। “না।”

    গুরু দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। “তাহলে এখনই নয়। হয়তো কখনো না। কিন্তু যদি কখনো দান করো, তাহলে জেনো: তোমার মহানত্ব সেই মুহূর্তে শুরু হবে। এবং তোমার পতনও।”

    আমি বুঝি না। মহানত্ব এবং পতন একসাথে? এটি যুক্তিহীন।

    আরেকদিন, একটি দল আসে, রাজকীয় পোশাক পরিহিত লোক। তারা গুরুর সাথে কথা বলে, গোপনে। আমি দূর থেকে দেখি। তাদের নেতা একজন যুবরাজ, সুন্দর, গর্বিত, তার চোখে উচ্চাভিলাষের আগুন। সে আমার দিকে তাকায়, তার দৃষ্টি মূল্যায়নকারী। সে আমার কবচে তার চোখ রাখে। সে কিছু বলে গুরুকে। গুরু মাথা নাড়েন, না বলেন।

    যুবরাজ চলে যায়, কিন্তু তার দৃষ্টি আমার উপর থেকে সরে যায় না, একটি ছায়ার মতো।

    আমি প্রশ্ন করি গুরুকে। “সে কে?”

    “ভবিষ্যতের রাজা,” গুরু বলেন। “একজন যে সবকিছু চায়। সে তোমাকে চায়। তোমার সেবা, তোমার আনুগত্য।”

    “আমি কি করব?” আমি জিজ্ঞেস করি।

    “তোমার সিদ্ধান্ত,” গুরু বলেন। “কিন্তু সতর্ক থাকো। সে তোমাকে ব্যবহার করবে। এবং যখন তোমার প্রয়োজন হবে, সে তোমাকে ত্যাগ করবে।”

    “কিন্তু সে একজন রাজা,” আমি বলি। “আমি একজন সাধারণ মানুষ।”

    “তুমি সাধারণ নও,” গুরু তীব্রভাবে বলেন। “কখনোই নও। তোমার রক্তে রাজা আছে। তুমি তার সমান, এমনকি তার চেয়ে বেশি। কিন্তু সে কখনো তা স্বীকার করবে না। কারণ সে চায় তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে।”

    আমি বিভ্রান্ত বোধ করি। রাজকীয় রক্ত? আমি? নদীর শিশু? এটি অসম্ভব।

    কিন্তু কবচটি আমার বুকের উপর জ্বলজ্বল করে, একটি নীরব সাক্ষ্য।

    সময় কাটে।  গুরু আমাকে ডেকে বলেন, “এখন তুমি যেতে প্রস্তুত। মহান যুদ্ধ আসছে। তুমি থাকবে। তোমার পথ তোমার নিজের। কিন্তু মনে রেখো দান। মনে রেখো সারথিকে। মনে রেখো, তোমার জন্ম তোমার নিয়তি নয়। তোমার পছন্দই হবে।”

    আমি প্রণাম করি, আমার চোখে অশ্রু। সে আমার গুরু, আমার পথপ্রদর্শক। কিন্তু সে আমাকে ছেড়ে দেয়, একটি নৌকাকে পানিতে ভাসানোর মতো।

    আমি আশ্রম ত্যাগ করি, আমার কবচ, আমার ধনুক, আমার তলোয়ার নিয়ে। আমি পেছনে ফিরে তাকাই না। আমি সামনে তাকাই, যেখানে পাহাড়ের ওপারে ধোঁয়া উঠছে, যুদ্ধের ডাক শোনা যাচ্ছে।

    আমি যাই। একা। কিন্তু আমার ছায়াকে দীর্ঘ করে, একটি স্বর্ণালী শৃঙ্খল, যা আমাকে পৃথিবীর সাথে বেঁধে রাখে, এবং আমাকে আকাশের দিকে টানে।

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • kk | 2607:fb91:4c8e:d999:a966:5760:ae92:***:*** | ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:৪৮738143
  • ভালো লাগলো। আপনি কর্ণকে নিয়ে আরো একটা লেখা লিখেছিলেন, তার কথাও মনে পড়লো।
  • albert banerjee | ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:০৮738145
  • হ্যা মহাভারত বেশ জমকালো গন্ডগোল . ব্যাসদেব আমরা তোমায় ভুলছি না ভুলবোনা , কালী সিংহী অমর রহে . রাজশেখর জিন্দাবাদ। উপেন্দ্র কিশোর পায়ে হাত দিয়ে পেন্নাম করি 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন