এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • নদী ও নক্ষত্রের মধ্যকার ছায়া

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৪৭ বার পঠিত
  • জলের কথা বলছে। না, কথা নয়, গুঞ্জন। একটানা, অনাদি গুঞ্জন, যার মধ্যে সব শব্দ ডুবে যায়, সমস্ত মানে ভেসে যায়। আমি শুনছি, কিন্তু আমার কানে পৌঁছায় অন্য কিছু: রথচক্রের শব্দ, ধনুকের ছিলার টান, সেই উচ্চ সভার হাসি। তারা মিশে যায় জলের গানে, বিকৃত করে তাকে, এক কর্কশ সুরে পরিণত করে। আমি আমার হাত ডুবাই জলে। ঠাণ্ডা। কিন্তু ঠাণ্ডাই বা কেমন? নদীর জলের এই ঠাণ্ডা, নাকি সেই সভার পাথরের ঠাণ্ডা? তারা একই, ভিন্ন নামে।

    সে আসে যখন আমি আমার হাত তুলে নিচ্ছি। জল ফোঁটা ফোঁটা ঝরে, প্রতিটি ফোঁটায় একটি সূর্য, ক্ষণস্থায়ী, তারপর ফেটে যায়, মিশে যায় ধূলিতে। তার পায়ের শব্দ নেই। সে কেবল উপস্থিত হয়, একটি ছায়ার মতো, যে সূর্যের কোণ থেকে বেরিয়ে আসে। সে দাঁড়ায় আমার পাশে, জলের দিকে তাকিয়ে, আমার প্রতিবিম্বের দিকে না, তার নিজের প্রতিবিম্বের দিকেও না, যেন সে জানে তার কোনো প্রতিবিম্ব নেই, কেবল একটি শূন্যতা, একটি আকৃতি যা আলো গ্রাস করে।

    “জল সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না,” সে বলে, তার কণ্ঠস্বর জলের গুঞ্জনের সাথে মিশে যায়, প্রায় একাকার। “জল শুধু দেখায়, যা তুমি দেখতে চাও। এখন তুমি কী দেখছ?”

    আমি জলের দিকে তাকাই। আমি দেখি আমার মুখ, কিন্তু তা আমার মুখের মতো নয়, তা বিকৃত, জল-তরঙ্গে কাঁপছে, যেন আমি কাঁদছি, কিন্তু আমার চোখ শুষ্ক। আমি দেখি আমার কান, তারা জলের নিচে উজ্জ্বল, দুটি স্বর্ণ-মাছ যারা স্থির থাকে স্রোতের মধ্যেও। আমি দেখি আমার বুকে, কবচের স্থান, সেখানে কেবল অন্ধকার, একটি ফাঁকা জায়গা, যেন কবচ সরে গেছে, যদিও আমি জানি এটি সেখানে আছে, আমার চামড়ার নিচে, আমার পাঁজরের ভিতরে, আমার হৃদয়ের খুব কাছাকাছি।

    “আমি দেখছি যা নেই,” আমি বলি।

    “সবচেয়ে সত্য বস্তু তা-ই, যা নেই,” সে বলে, তার মুখে একটি সূক্ষ্ম হাসির আভাস, যে হাসি ঠোঁটে পৌঁছায় না, কেবল চোখের কোণায় খেলা করে। “ভবিষ্যৎ নেই, কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণ করে। অতীত নেই, কিন্তু তা বোঝায়। জন্ম নেই, কিন্তু তা সংজ্ঞায়িত করে। তুমি কীভাবে লড়বে যা-নাই তার বিরুদ্ধে?”

    আমি কোনো উত্তর দিই না। আমি একটি পাথর তুলি, নদীতে ছুঁড়ি। এটি ডুবে যায়, একটি বৃত্ত তৈরি করে, যা বিস্তৃত হয়, আমার প্রতিবিম্বকে গ্রাস করে, তাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে। “এই যে,” আমি বলি। “এভাবেই। বিঘ্ন তৈরি করে। প্রশ্নকে ডুবিয়ে দিয়ে।”

    সারথি মাথা নড়ে। “বিঘ্ন শান্ত হয়। জল আবার স্থির হয়। প্রতিবিম্ব আবার ফিরে আসে, আগের চেয়েও দৃঢ়, কারণ এখন তা জানডুব খেয়েছে। তুমি যা এড়াতে চাও, তা ফিরে আসবে, বারবার, যতক্ষণ না তুমি তার মুখোমুখি হও।”

    “তার মানে?” আমি জিজ্ঞাসা করি, আমার কণ্ঠস্বর কর্কশ, রাগে, হতাশায়।

    “তোমার জন্ম,” সে সরলভাবে বলে। “তুমি তা এড়িয়ে চলেছ। তুমি নিজেকে বলেছ তুমি নদীর পুত্র, গুরু-শিষ্য, যোদ্ধা, মিত্র। কিন্তু তুমি কখনো বলনি: আমি রাজপুত্র। আমি রাজা হওয়ার অধিকারী। কেন? কারণ তুমি ভয় পাও। কারণ তুমি মনে করো, যদি তা স্বীকার করো, তবে তোমার শপথ ভঙ্গ হবে। তোমার বন্ধুত্ব নষ্ট হবে। কিন্তু কীসের বন্ধুত্ব? যে বন্ধুত্ব তোমাকে নাম দেয় না? যে বন্ধুত্ব তোমাকে লুকিয়ে রাখে?”

    আমি উঠে দাঁড়াই। আমার হাত কাঁপছে। “তুমি জানো না! তুমি জানো না সে কী দিয়েছে! যখন সবাই আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, সে আমাকে গ্রহণ করেছিল। সে আমাকে বলেছিল: তুমি মহান হতে পারো, নাম ছাড়াই, বংশ ছাড়াই। সে আমাকে বিশ্বাস করেছিল।”

    “বিশ্বাস?” সারথির কণ্ঠস্বরতে একটি নতুন সুর, করুণা, না, করুণা নয়, একটি গভীর ব্যঙ্গ। “বিশ্বাস একটি মুদ্রা, যা আমরা বিনিময় করি যখন আমাদের কিছু দেওয়ার থাকে না। সে তোমাকে বিশ্বাস দিয়েছে, কারণ সে জানত তুমি তোমার জন্মের দাবি করবে না। সে তোমাকে একটি পরিচয় দিয়েছে, কারণ সে চাইত না তুমি তোমার আসল পরিচয় জানতে পারো। এখন বলো, কার বিশ্বাস ঘাতকতা হচ্ছে? যে তোমাকে সত্য গোপন রেখেছে, নাকি যে সত্য জানতে চায়?”

    আমার মাথা ঘোরে। কথাগুলো বিষের মতো, তারা আমার কানে প্রবেশ করে, মস্তিষ্কে পৌঁছে, সেখানে বিস্ফোরণ ঘটায়। আমি আমার চোখ বন্ধ করি। আমি দেখি তার মুখ, আমার মিত্রের, যে আমাকে প্রথম সম্মান দিয়েছিল, যে আমার পিঠ চাপড়েছিল, যে বলেছিল, “তুমি আমার ডান হাত।” সেই মুখ কি মিথ্যা ছিল? সেই চোখ কি ছলনা লুকিয়ে রাখত?

    “না,” আমি বলি, কিন্তু আমার কণ্ঠ দুর্বল। “এটা সত্য হতে পারে না।”

    “সত্য কী?” সারথি জিজ্ঞাসা করে, সে এখন আমার খুব কাছাকাছি, তার নিঃশ্বাস আমার গালে লাগে, তা গরম, ধাতব গন্ধযুক্ত। “সত্য কি যা আমরা দেখি? নাকি যা আমরা দেখতে চাই? তুমি দেখতে চেয়েছিলে একজন বন্ধু, একজন পথপ্রদর্শক। তাই তুমি দেখেছ। কিন্তু আমি তোমাকে দেখাব যা তুমি দেখতে চাওনি। আসো।”

    সে তার হাত বাড়ায়। আমি পিছিয়ে যাই। “কোথায়?”

    “অতীতে। ভবিষ্যতে। যেখানে সত্য থাকে।” তার হাত স্থির থাকে, উন্মুক্ত, একটি প্রস্তাব, একটি চ্যালেঞ্জ।

    আমি দ্বিধা করি। কিন্তু আমার ভিতরে জ্বালা, সেই অপমানের জ্বালা, যা কখনো নেভেনি, তা আমাকে ঠেলে দেয়। আমি তার হাত স্পর্শ করি। তা গরম, জীবন্ত, কিন্তু সেই উষ্ণতার নিচে একটি শীতলতা, গভীর, শূন্যের মতো শীতল।

    এবং আমরা চলে যাই।

    স্থান বদলে যায় না, সময় বদলে যায়। আমরা এখনও নদীর ধারে, কিন্তু নদী এখন ভিন্ন। জল পরিষ্কার, নীল, আকাশে মেঘ নেই। দূরেও যুদ্ধ নেই, ধোঁয়া নেই। শান্তি। কিন্তু এই শান্তি অস্থির, একটি গভীর শ্বাস নেওয়ার আগের মুহূর্তের মতো।

    আমি দেখি একজন নারী, নদীর ধারে দাঁড়িয়ে, একটি ঝুড়ি তার হাতে। তিনি কাঁদছেন, কিন্তু তার কান্না নিঃশব্দ, কেবল কাঁপুনি, তার কাঁধ কাঁপে। তিনি ঝুড়িটিকে জলের দিকে বাড়ান, এটি ছেড়ে দেন। এটি ভাসে, ঘুরতে ঘুরতে যায়। তিনি দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকেন, তারপর ঘুরে যান, ধীরে ধীরে হাঁটেন, তার পা মাটিতে দাগ রাখে, যা বাতাসে মিশে যায়।

    “তোমার মা,” সারথি বলে। “তিনি ভয় পেয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন তোমার জন্ম রাজনৈতিক হবে, বিপজ্জনক হবে। তিনি চেয়েছিলেন তুমি বেঁচে থাকো, তাই তিনি তোমাকে পাঠিয়েছেন মৃত্যুর হাত থেকে। কিন্তু তিনি কি জানতেন, তিনি তোমাকে পাঠাচ্ছেন এক ভিন্ন ধরনের মৃত্যুর দিকে? অপমানের মৃত্যু, পরিচয়হীনতার মৃত্যু?”

    আমি কিছু বলি না। আমি সেই নারীর দিকে তাকিয়ে থাকি, যে এখন দূরে চলে যাচ্ছে, একটি ছায়ার মতো, যা সূর্যের মধ্যে মিলিয়ে যায়। আমার হৃদয়ে কোনো স্পন্দন নেই, কেবল একটি ফাঁকা ব্যাথা, একটি শূন্যতা যা পূর্ণ হতে চায় কিন্তু পারে না।

    দৃশ্য বদলে যায়। এখন আমরা একটি প্রাসাদের ভিতরে, উচ্চ স্তম্ভ, মার্বেলের মেঝে। একজন রাজা সিংহাসনে বসে, তার চারপাশে মন্ত্রী, ঋষি। তিনি বলছেন, “সে বেঁচে আছে? সে কোথায়?” একজন বৃদ্ধ, একটি সাদা দাড়িওয়ালা, মাথা নত করে, বলেন, “হ্যাঁ, মহারাজ। সে বেঁচে আছে। সে বড় হচ্ছে, শক্তিশালী হচ্ছে। সে একজন যোদ্ধা হবে।” রাজার চোখে আশা আছে, ভয় আছে, একটি জটিল আবেগ যা আমি বুঝতে পারি না। তিনি বলেন, “তাকে খুঁজে আনো। তাকে ফিরিয়ে আনো।” কিন্তু তখনই আরেকজন প্রবেশ করে, একজন রানি, তার চোখে আগুন। তিনি বলেন, “না। সে ফিরে আসতে পারে না। সে বিপদ।” একটি তর্ক শুরু হয়, কণ্ঠস্বর উঁচু হয়, কিন্তু শব্দগুলো বিকৃত, দূর থেকে আসা গুঞ্জনের মতো। আমি শুধু দেখি মুখগুলো, চোখগুলো, হাতের ইশারাগুলো। তারা আমার জন্য তর্ক করছে, কিন্তু আমি সেখানে নেই, আমি একটি বস্তু, একটি সমস্যা, একটি হুমকি।

    “দেখ,” সারথি বলে। “তোমার জন্মই একটি যুদ্ধক্ষেত্র। তারা তোমার জন্য লড়ছে, কিন্তু তুমি সেখানে অনুপস্থিত। তুমি সবসময়ই অনুপস্থিত থেকেছো তোমার নিজের গল্প থেকে।”

    আমি আমার মুখ ঘুরিয়ে নেই। আমি আর দেখতে চাই না। কিন্তু দৃশ্য বদলায়, এবার আমি দেখি আমার গুরুকে, তিনি তার আশ্রমে বসে, তার সামনে আগুন। তিনি গান গাইছেন, সেই একই মহাকাব্য, সেই দানবীরের গান, যে স্বর্গীয় কবচ দান করে। কিন্তু এবার আমি শুনতে পাই, গানের মধ্যে একটি নতুন চরণ, যা আগে কখনো শুনিনি: “... এবং সে যা দান করল, তা কেবল বস্তু নয়, সে দান করল তার অধিকার, তার নাম, তার জন্ম। এবং দানের মাধ্যমে, সে মুক্ত হল, কিন্তু শূন্যতায়, যা কখনো পূর্ণ হয় না...”

    আমি আমার গুরুকে জিজ্ঞাসা করতে চাই: আপনি কি জানতেন? আপনি কি জানতেন আমি কে? আপনি কি আমাকে শিখিয়েছিলেন দান করতে, কারণ আপনি জানতেন একদিন আমার সবকিছু দান করতে হবে? কিন্তু আমার কণ্ঠস্বর বের হয় না। আমি শুধু একজন দর্শক, একটি প্রেত, যে তার নিজের অতীত দেখছে, কিন্তু তা পরিবর্তন করতে পারে না।

    দৃশ্য আবার বদলায়। এবার আমরা একটি রথে, দ্রুত গতিতে চলেছি, মাঠের উপর দিয়ে, যুদ্ধের মাঠের উপর দিয়ে। আমি আমার মিত্রকে দেখি, সে তার রথে, তার মুখ উজ্জ্বল, তার চোখে বিজয়ের স্বপ্ন। সে চিৎকার করে, “জয় আমাদের হবে!” এবং সে আমার দিকে তাকায়, হাসে, বলে, “তোমার সাথে, কিছুতেই হারব না!” কিন্তু তার চোখের গভীরে, আমি কি দেখি? একটি সংশয়? একটি ভয়? যে আমি হয়তো একদিন তার চেয়ে বেশি হয়ে যাব? যে আমার আলো তার আলোকে ম্লান করে দেবে?

    আমি আমার চোখ বন্ধ করি। “যথেষ্ট,” আমি বলি। “আমি আর দেখতে চাই না।”

    সবকিছু থেমে যায়। আমরা আছি আবার নদীর ধারে, একই স্থানে, একই সময়ে, যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু সবকিছু বদলে গেছে। আমার ভিতরের জগৎ উলটেপালটে গেছে। আমার নিশ্চয়তাগুলো ধসে পড়েছে।

    সারথি আমার পাশে দাঁড়িয়ে, শান্ত। সে বলে, “এখন বুঝতে পারছ? তোমার জীবন একটি পথ যা অন্যরা বেছে দিয়েছে। তুমি কেবল হেঁটেছ, মনে করেছ তুমি নিয়ন্ত্রণ করছ। কিন্তু প্রতিটি মোড়, প্রতিটি পথচিহ্ন, তারা আগেই বসিয়েছে। তোমার মা তোমাকে পাঠিয়েছে এই নদীতে। গুরু তোমাকে শিখিয়েছে দান করতে। তোমার মিত্র তোমাকে দিয়েছে একটি পরিচয়। কিন্তু তারা কেউই দেয়নি তোমার নিজের পরিচয়। তারা কেউই বলেনি: তুমি রাজপুত্র। তুমি রাজা হওয়ার যোগ্য।”

    আমি নদীর জলের দিকে তাকাই। আমার প্রতিবিম্ব এখন স্থির, স্পষ্ট। আমি দেখি আমার মুখ, যা এখন বিভ্রান্ত, যন্ত্রণায় কুঞ্চিত। কিন্তু আমি আরও গভীরে দেখি। আমি দেখি সেই শিশুটিকে, যে ঝুড়িতে ভাসছিল, যে জানত না সে কে। আমি দেখি সেই যুবককে, যে অপমানে পুড়ছিল, যে সম্মান চেয়েছিল। আমি দেখি সেই যোদ্ধাকে, যে শপথে আবদ্ধ, যে বিশ্বাসে আটকা পড়েছে।

    “তাহলে আমার কী করা উচিত?” আমি জিজ্ঞাসা করি, আমার কণ্ঠস্বর ভঙ্গুর, একটি শিশুর কণ্ঠস্বরের মতো।

    “বেছে নাও,” সারথি বলে। “তোমার জন্ম বেছে নাও। তোমার রক্তের দাবি বেছে নাও। ফিরে যাও তোমার ভাইদের কাছে। তারা এখনও জানতে চায় না তুমি কে, কিন্তু যখন জানবে, তারা গ্রহণ করবে। কারণ রক্তের বন্ধন সবচেয়ে শক্ত। বন্ধুত্ব? বন্ধুত্ব সময়ের সাথে ম্লান হয়। শপথ? শপথ পরিস্থিতির সাথে ভাঙ্গে। কিন্তু রক্ত? রক্ত চিরকাল থাকে।”

    “তোমার মা তোমাকে চায়,” সে অব্যাহত রাখে, তার কণ্ঠস্বর এখন মৃদু, প্রলোভনময়। “তোমার ভাইয়েরা তোমাকে চায়। তারা একটি পরিবার। তুমি কখনো পরিবার পাইনি। তুমি শুধু পেয়েছ অন্নদাতা, গুরু, মিত্র। কিন্তু পরিবার? একটি মা যে তোমাকে ভালোবাসে? ভাইয়েরা যে তোমাকে রক্ষা করে? এটা কি তুমি চাওনি, নদীর ধারে বসে, যখন সূর্য অস্ত যেত? এটা কি তুমি স্বপ্ন দেখনি, রাতের অন্ধকারে, যখন তুমি একা থাকতে?”

    সে আমার সবচেয়ে গভীর আকাঙ্ক্ষাকে স্পর্শ করে, যে আকাঙ্ক্ষা আমি নিজেকে স্বীকার করতেও ভয় পেতাম: একটি ঘর। একটি স্থান। একটি  আমি সর্বদা বাইরের ব্যক্তি, দর্শক, অতিথি। আমি কখনো ঘরের সদস্য হইনি।

    কিন্তু তার বিপরীতে, আমার শপথ। আমার প্রতিজ্ঞা। আমার মিত্র, যে আমাকে তার ভাই বলেছে, যে আমাকে তার রথের পাশে স্থান দিয়েছে। সে কি পরিবার না? সে কি আমার ভাই না?

    আমি বলি, “সে আমাকে তার ভাই বলেছে।”

    “শব্দ,” সারথি বলে, তাচ্ছিল্যের সাথে। “শব্দ সস্তা। যখন যুদ্ধ আসবে, যখন তোমার জন্মের  প্রকাশ পাবে, তখন সে কি তোমাকে তার ভাই বলবে? না, সে বলবে: তুমি শত্রুর পুত্র। তুমি প্রতিপক্ষ। এবং সে তোমাকে মুখোমুখি যুদ্ধে ডাকবে, তোমার জীবন নেবে, অথবা তোমার হাতে জীবন দেবে। এটাই কি তুমি চাও? একটি পরিবার, নাকি একটি সমাধি?”

    আমি উত্তেজিত হই। “তুমি জানো না! তুমি জানো না সে কী!”

    “আমি জানি,” সারথি শান্তভাবে বলে। “আমি সব জানি। আমি দেখেছি ভবিষ্যৎ। আমি দেখেছি সেই যুদ্ধ, যেখানে তোমাকে তার মুখোমুখি হতে হবে। এবং আমি জানি, তুমি হারবে। কারণ তুমি দ্বিধা করবে। কারণ তোমার হৃদয় বিভক্ত থাকবে। তুমি তোমার জন্মকে অস্বীকার করেছো, তাই তুমি তোমার শক্তির সঠিক ব্যবহার জানো না। তুমি তোমার কবচ দান করেছো, কারণ তোমাকে শিখানো হয়েছে দান করতে, কিন্তু কখনো শিখানো হয়নি কী কখন দান করতে, কখন রাখতে। তুমি অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক শপথ, অর্ধেক জন্ম। এবং যুদ্ধে, অর্ধেক মানুষ মারা যায়।”

    আমার শ্বাস আটকে আসে। সে কথা বলে যেন সে তা দেখেছে, যেন সে সেখানে ছিল, আমার মৃত্যু দেখেছে। আমি আমার কবচ স্পর্শ করি, যে কবচ আমি এখনও ধরে রেখেছি, যদিও গুরু আমাকে দান করতে বলেছিলেন। আমি তা দেইনি। আমি তা রাখব। এটা আমার। এটা আমার শেষ সুরক্ষা।

    “আমি যদি ফিরে যাই,” আমি বলি, ধীরে ধীরে, শব্দগুলো পরীক্ষা করি। “আমি যদি আমার জন্ম স্বীকার করি, তাহলে কি আমি জিতব?”

    “জয় নয়,” সারথি বলে। “সম্মান। তুমি সম্মানের সাথে যুদ্ধ করবে। তুমি তোমার পতাকাতলে যুদ্ধ করবে, তোমার নিজের নামে, তোমার নিজের জন্মের অধিকারে। এবং যদি মরতে হয়, তুমি রাজার মতো মরবে, যোদ্ধার মতো না, ভাড়াটে সৈনিকের মতো না। তুমি ইতিহাসে থাকবে, একটি নামে, একটি পরিচয়ে।”

    ইতিহাস। নাম। পরিচয়। এগুলো কীসের জন্য? আমি কি চাই ইতিহাস আমাকে মনে রাখুক? আমি তো বরং চাই বেঁচে থাকতে, এখনে, এখন, নদীর ধারে, সূর্যের নিচে। কিন্তু আমি বেঁচে থাকব কি? অপমানের গ্লানি নিয়ে? বিশ্বাসঘাতকতার সন্দেহ নিয়ে?

    আমি হতাশ হয়ে পড়ি। আমি বুঝতে পারি, কোনও পথই সম্পূর্ণ নয়। কোনও নির্বাচনই আমাকে মুক্তি দেবে না। জন্মের পথে যাওয়া মানে শপথ ভঙ্গ করা, একজন মানুষের বিশ্বাস ভঙ্গ করা, যে আমাকে বিশ্বাস করেছিল। আর শপথের পথে থাকা মানে জন্মের দাবি অস্বীকার করা, আমার নিজের রক্তের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা।

    “আমি যদি না বেছে নেই?” আমি জিজ্ঞাসা করি, শেষ আশায়।

    “তাহলে জীবন তোমার জন্য বেছে নেবে,” সারথি বলে। “এবং জীবন নিষ্ঠুর। এটি তোমাকে সবচেয়ে ব্যথাদায়ক পথে নিয়ে যাবে। এটি তোমাকে ধাক্কা দেবে সেই যুদ্ধে, যেখানে তোমার কোনো পতাকা থাকবে না, কোনো নাম থাকবে না, শুধু একটি ধনুক এবং একটি কবচ, যা একদিন তুমি দান করবে, এবং তখন তুমি সম্পূর্ণ নগ্ন হবে, শত্রুর সামনে, এবং সে সময়, যখন তীর তোমার দিকে আসবে, তুমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করবে: আমি কে? এবং উত্তর আসবে না। কারণ তুমি কখনো বেছে নাওনি।”

    আমি কাঁপতে শুরু করি। সন্ধ্যা নেমে আসছে। আকাশে প্রথম তারা জ্বলজ্বল করছে। তারা শীতল, দূর, উদাসীন। তারা মানুষের দ্বিধা দেখে না, মানুষের যন্ত্রণা শুনে না। তারা শুধু জ্বলে, একটি অনাদি নিয়মে।

    “চিন্তা করো,” সারথি বলে, পিছনে হাঁটতে শুরু করে, তার ছায়া দীর্ঘ হয়ে পড়ে, যেন সে নিজেই অন্ধকারের অংশ। “সময় আছে। কিন্তু বেশি নেই। যখন যুদ্ধের ডাক আসবে, তখন তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। জন্ম, না শপথ। রক্ত, না বন্ধুত্ব। অতীত, না ভবিষ্যৎ।”

    সে মিলিয়ে যায়, ধীরে ধীরে, আলো থেকে অন্ধকারে, যেন সে কখনো ছিলই না, কেবল আমার কল্পনা, আমার নিজের চিন্তার একটি কণ্ঠস্বর।

    আমি একা থাকি। নদী এখন কালো, তার জলের গুঞ্জন গভীর, একটি অন্ত্যেষ্টির গানের মতো। আমি আকাশের দিকে তাকাই। তারা এখন আরও অনেক, তারা একটি প্যাটার্ন তৈরি করে, কিন্তু আমি তা পড়তে পারি না। আমি কোনও জ্যোতিষী নই। আমি শুধু একজন মানুষ, যে জানে না সে কে।

    আমি আমার কবচে হাত রাখি। এটি উষ্ণ, প্রায় গরম, যেন এটি জীবন্ত। এটি আমাকে বলে: তুমি আমার। তুমি সূর্যের। তুমি রাজপুত্র। কিন্তু আমার শপথ আমাকে বলে: তুমি আমার। তুমি বন্ধুর। তুমি বিশ্বস্ত।

    দুটি কণ্ঠস্বর, দুটি আকাঙ্ক্ষা, দুটি জীবন। আমি তাদের মধ্যে দাঁড়িয়ে, বিচ্ছিন্ন, একটি সেতু যা দুই তীরকে যুক্ত করে না, বরং তাদের মধ্যে ঝুলে থাকে, নিচে প্রবাহিত জলকে দেখে, যে জল কখনো থামে না, কখনো পিছনে যায় না, শুধু এগিয়ে যায়, সমুদ্রের দিকে, যে সমুদ্র সবকিছু গ্রাস করে, নাম, জন্ম, শপথ, সবকিছু।

    আমি উঠে দাঁড়াই। আমি আমার রথের দিকে হাঁটি। আমাকে ফিরে যেতে হবে। আমাকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে। কিন্তু কোন্ যুদ্ধের? বাহিরের, না ভিতরের?

    রাতের বাতাস ঠাণ্ডা। তা আমার গালে লাগে, আমার চোখ শুকিয়ে দেয়। আমি চোখে পানি অনুভব করি না। আমি অনেক আগেই কাঁদা শেষ করেছি। এখন কেবল আছে একটি শুষ্কতা, একটি কাঠিন্য, যা হয়তো যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয়।

    আমি চলে যাই, কিন্তু সারথির কথাগুলো আমার সাথে যায়, আমার পিছনে লাগা একটি ছায়ার মতো, একটি স্বর যা কানে ফিসফিস করে: “বেছে নাও... বেছে নাও... বেছে নাও...।”
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট প্রতিক্রিয়া দিন