এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • পথের বাসিন্দা

    Sukla Bose লেখকের গ্রাহক হোন
    ৩১ মার্চ ২০২৬ | ২৭ বার পঠিত
  • কলকাতা মহানগরীতে রাস্তায় ফুটপাতে দিনরাত নানারকমের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। এইসব কিছুর মধ্যে ন্যাড়া ও নেড়ী কুকুরদের নানা রকম কান্ড চলতেই থাকে। 
     
    ‘সুনন্দর জার্নাল’ বই নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয় লিখেছেন :
     
    “কলকাতার নেড়ী ও ন্যাড়া কুকুরের দল- যাদের জন্য ডগ সোপ ডগ বিস্কুট নেই, যাদের জন্য বিনা নুনে মাংসের স্পেশাল খাবার তৈরি হয় না, শীতকালে যাদের জন্য জামার ব্যবস্থা হয়না, চেনে বাঁধা হয়ে যারা সকাল সন্ধ্যা বেড়াতে বেরোয় না এবং মনিবের মটর চড়ে যারা শহর পরিক্রমা করে না— তাদেরও একেবারে অনাথ আর ভাগ্যাবন্ড মনে করবার দরকার নেই। আমাদের কাছে তারা নুইস্যান্স হতে পারে, অবাঞ্ছিত বোধ হতে পারে, কিন্তু তাদের অপত্য স্নেহে লালন করে থাকে এমন লোকও কলকাতায় দুর্লভ নয়।” (পৃষ্ঠা ২০৫)
     
    কুকুরদের মতন কিছু মানুষ আছে যারা রাস্তায় বসবাস করে জীবন কাটিয়ে দেয়। দারিদ্রতার মধ্যে এদের জীবন কাটে। পথের কুকুরদের সাথে বসবাস করে ও কুকুরদের সাথে মেলামেশা করে। অনেক সময় কুকুরদের সাথে মনের আবেগ প্রকাশ করে। এইসব মানুষরা খাবার সব সময় কুকুরকে দিয়ে খায়। কুকুরদের এই সব মানুষরা নিজেদের সাথী ভাবে। 
     
    আমাদের অঞ্চলে রাস্তার কুকুর দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করে। ভোরবেলা থেকে রাস্তায় কুকুরদের উপস্থিতি দেখা যায়। খাবার দোকান, মাংসের দোকান ইত্যাদি সামনে কুকুররা খাবার পাবার জন্য অপেক্ষা করে। যখন কোন মানুষ ওদের খাবার দেয় তখন ওরা আনন্দে লেজ ও শরীর নাড়তে থাকে। যেকোন মানুষ ওদের দিকে নজর দিলে ওই মানুষের পিছু পিছু চলতে থাকে। কুকুররা এই অঞ্চলে সব মানুষদের চেনে ও ওরা মানুষদের ভাষা বোঝে। যদি কখনও কোন মানুষ বাড়ির দরজা বা বাগানের গেটে শুয়ে আছে এমন কুকুরকে বলে যা !যা! তখনই কুকুররা সরে যায়। 
     
    রাস্তার কুকুররা নিজেদের মধ্যে খাবারও সীমানা দখল নিয়ে ঝগড়া করে আবার কিছুক্ষণ পরে পাশাপাশি শুয়েও থাকে । এইসব কুকুররা এই অঞ্চলের সবরকম উৎসবে অংশগ্রহণ করে। দোলের দিনে কুকুররাও রং মাখে। ক্লাবের দুর্গাপূজা কালী পূজা, ব্যবসায়ীদের লক্ষ্মী পূজা, গণেশ পূজা সব সময় কুকুররা পূজা মন্ডপের আশেপাশে থাকে । মূর্তি ভাসানের সময় প্রসেশনও কুকুররা অংশগ্রহণ করে । এইসব কারণে কুকুররা এই অঞ্চলের বাসিন্দা হয়ে গেছে।। 
     
    কুকুররা অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও শীতে ও বর্ষায় রাস্তায় বসবাস করে। কুকুরদের কাছে পৃথিবী সুন্দর ও আনন্দের জায়গা। 
     
    আমি বেহালা অঞ্চলে বাস করি। আমাদের শৈশবকালে এই স্থান গ্রাম ছিল। রাস্তা ছিল না। কেবল মাঠ ও মাঠের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলার সরু পথ ছিল। ছিল অজস্র রকমের গাছ ছোট বড় । আর ছিল অনেক ছোট বড় পুকুর। এখানে কোন ইলেকট্রিক লাইট ছিল না। এখান থেকে বেহালা ট্রাম ও বাস রাস্তা প্রায় দেড় মাইল মতন দূর ছিল । এখানে শত শত বিভিন্ন রকমের পাখি ছিল। অজস্র টিয়া পাখি উড়ে বেড়াত। বক পাখি পুকুর পাড়ে থাকত। 
     
     দিনের বেলায় শেয়াল বুনো বেড়াল, ভাম শটক সাপ বড় গিরগিটি দেখা যেত । বর্ষাকালে পুকুর সব ভেসে বিশাল জলাশয় তৈরি হত। তখন এই অঞ্চল ছিল রূপকথার দেশের মতন। সেই সময় মাঠে বা লোকের বাড়ির সামনে ন্যাড়া নেড়ী কুকুর ঘুরে বেড়াত। গভীর রাতে নির্জনে কুকুরদের চিৎকার নির্জন অঞ্চলে মানুষদের সাহস দিত। রাত্রে কুকুররা চিৎকার করলে মানুষরা চোর এসেছে ভেবে সাবধান হয়ে যেত। তখনও অনেক মানুষ বাড়ির সামনে ফাঁকা জায়গায় কুকুরদের খাবার দিত। এখন আমাদের এই অঞ্চল শহর হয়ে গেছে। প্রচুর বাড়ি, ফ্ল্যাট দোকান। সারারাত ধরে গাড়ি স্কুটার রিক্সা চলছে। রাতের অন্ধকারে কুকুরদের চিৎকার মানুষদের এখনো সাহস যোগায় । এখনকার কুকুররা শহরের কুকুর। ওরাও মানুষের মত নিজেদের গ্রাম্য সংস্কৃতি পরিবর্তন করে শহুরে হয়েছে। 
     
    আমার বাড়ির সামনে বাড়ি ভেঙ্গে বহু ফ্ল্যাট তৈরি হয়েছে । ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের জানলা দিয়ে দেখি আমার সাথে কোন কথাবার্তা বা যোগাযোগ নেই। তবু জানালা দিয়ে বা দোতালার বারান্দায় বসে অনেক ঘটনাই দেখতে পাই। 
     
    গভীর রাতে রাস্তা ফাঁকা হয়ে আসে, দোকানপাট বন্ধ ও গাড়ি চলা কমে আসে । রিক্সাওয়ালারা ঘরে ফিরতে থাকে । তখন পূর্বে দেখতাম ফ্ল্যাট থেকে দুই জন মহিলা অনেক সময় বেরিয়ে আসত। আয় আয় বলে ডাকতে থাকত কুকুরদের। ওদের রাস্তার ধারে বসে খাবার দিত । কুকুরদের আদর করে ও তাদের সাথে অনেক কথা বলত। মনে হত যেন ওরা কুকুরদের মা । অদ্ভুত লাগত।
     
    এইসব ফ্ল্যাটের মহিলাদের যে এই অঞ্চলের মানুষদের সাথে মেলামেশা খুব আছে তা নয়। কিন্তু গভীর রাতে মনে হয় যে এই মহিলাদের মনের সব স্নেহ ভালোবাসা কুকুরের ওপর বর্ষণ করে। 
     
    । বর্তমানে বহু রকম আইন কানুন হয়েছে শুনি। কুকুরদের রাস্তায় যেখানে সেখানে খাবার দেওয়া যাবে না । আমাদের সমাজে পশু ও পাখিদের মানুষরা সবসময়ই খাবার দেয়। কুকুর বেড়াল কাক চড়াই পায়রা প্রভৃতি পশু ও পাখিদের মানুষরা সব সময় খাওয়ার দেয়। ওরা আমাদের সমাজেরই আমাদের মহানগরীরই বাসিন্দা।
     
    আবার কলকাতা শহরের রাস্তায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্য্যন্ত বহু ঘটনা ঘটে যায় রাস্তার কুকুররা প্রতিটি ঘটনায় উপস্থিত হয়ে যায় । ওরা আমাদের মতনই মহানগরীর বাসিন্দা।
     
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে প্রতিক্রিয়া দিন