কবিতা সিরিজ: কর্কশ রাতের নোটবই
অয়ন মুখোপাধ্যায়
১. দু’কানে বালিশ
আজকের রাতটা যেন কোনো মানুষের নয়,
বরং একটা ভাঙা মাইকের গলায় আটকে থাকা জ্বর।
চোখ বুজলেই কানের ভিতর উঠে আসে রামনবমীর কর্কশ স্লোগান,
যেন অন্ধকার নিজেই আজ লাঠিচার্জের ভাষা শিখেছে।
আমি দু’কানের ভেতর বালিশ চেপে ধরি—
তবু শব্দ ঢুকে পড়ে হাড়ের ফাঁক দিয়ে।
রামনবমীর মিছিলের ডিজের আওয়াজ,
কিংবা ড্রামের চিৎকার,
আর মিছিলের নিঃশ্বাসগুলো—
মিলেমিশে এক অদ্ভুত পশুর মতো
আমার বিছানার চারদিকে ঘুরে বেড়ায়।
আমি ভাবি,
মানুষ কি কেবল তার ঘুমকে হারিয়ে ফেললেই
প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে?
২. আত্মপক্ষ
সারারাত আমি নিজেই নিজের বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দিয়েছি।
বলেছি— তুমি কি ভয় পাচ্ছ?
তোমার মন কি তবে পিছিয়ে পড়া মন?
তুমি কি এই সব শোরগোলের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে,
নিজেরই আদালতে নিজেকেই অভিযুক্ত করেছ?
তার উত্তরে বলি, আমি আয়নার সামনে নিজেকে দাঁড় করাইনি কতকাল।
কারণ আমি আয়নাকে ভয় পাই।
সে আজকাল খুব সহজেই রায় দিয়ে দেয়।
আমি শুধু দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে থেকেছি,
যেখানে কোনো পোস্টার নেই,
কোনো পতাকা নেই,
শুধু নুন আর স্যাঁতসেঁতে দাগ—
যেখানে দেশ কোনো মানচিত্র নয়,
একজন ক্লান্ত মানুষের ভিতরকার অবক্ষয়।
সেখানে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছে—
সব আপত্তিগুলোই আজ নৈরাজ্য,
এবং কখনও কখনও তা শুধু আহত স্নায়ুর ভাষা।
৩. লাশহীন প্রার্থনা
আমি মৃত্যুকে ডাকিনি,
শুধু চেয়েছি,
যদি কোনোদিন তোমাদের থেকে চলে যাই,
তবে আমাকে যেন অন্য কারুর স্লোগান দিয়ে মেপো না।
কমরেডদের বলছি, এটা আপনাদের দায়িত্ব—
আমার শরীরের পাশে
আমার মতাদর্শের খুঁটিটা যেন পোঁতা থাকে।
কেউ যেন না বলে—
এই মৃতদেহটা ডানদিকে,
হ্যাঁ, এই মৃতদেহটা বামদিকে।
তবে জানবেন, আমার মৃতদেহ সব সময় প্রতিক্রিয়াশীল।
আমি অজাতশত্রু, কিন্তু আমি রাজনৈতিক।
আমি জানি,
শেষ পর্যন্ত আপনারা আমাকে মানুষ হিসেবেই মনে রাখবেন।
তবু আপনাদের কাছ থেকে মুছে যেতে যেতে,
যাওয়ার আগে বলে যাচ্ছি—
যেমন বৃষ্টির পর উঠোনের জল চকচক করে ওঠে,
রোদ উঠলে নিঃশব্দে উবে যায়,
এইভাবেই আচমকা শুনবেন, আমি নেই।
আর মনে রাখবেন—
আমি কোনোদিন কোনো শব্দকে ভয় পাইনি,
বরং শব্দকে নিয়ে খেলতেই আমার ভালো লাগে।
তবে আমি জানিয়ে যাচ্ছি,
শব্দের ভেতর লুকিয়ে থাকা সাপেদের মতন গোপন
হিস হিস শব্দ গুলোকে, চিরকাল এড়িয়ে গেছি,
জাস্ট পাত্তা দিইনি।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।