এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ন্যাংটা ভূতের আক্ষেপ অথবা - ২ 

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৭৯ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • |
    ৬.

    আমি পালালাম। সারারাত দৌড়ে পালালাম। শেষে এসে পৌঁছালাম এক নদীর ধারে। সেখানে একটি ছোট্ট কুটিরে এক বাবুর্চি রাঁধুনি বাস করত। তার নাম ছিল মঙ্গলা। আমি তাকে বললাম, "দিদি, একটু আশ্রয় দাও। আমি খুব ক্লান্ত।"

    মঙ্গলা ছিল দয়ালু। সে আমাকে জায়গা দিল। বলল, "তুমি এখানে থাকতে পার, কিন্তু সাহায্য করতে হবে রান্নায়।"

    আমি রাজি হলাম। মঙ্গলা প্রতিদিন বাজারে গিয়ে মাছ কিনে আনত। আমি সেগুলো পরিষ্কার করতাম। একদিন সে বলল, "তোমার হাত খুব নরম। তুমি কি কখনো মাছ কাটনি?"

    আমি বললাম, "না। আমি তো মডেল ছিলাম।"

    মঙ্গলা কিছু বুঝল না। বলল, "যাই হোক, আজ একটা বড় কাজ আছে। রাজবাড়িতে ভোজ। অনেক রান্না করতে হবে।"

    ৭.

    সেইদিনই আমার মৃত্যুদিন। রাজবাড়ির জন্য বিরিয়ানি রান্না হচ্ছিল। মঙ্গলা বলল, "তেল শেষ হয়ে গেছে। নতুন তেল আনতে হবে।"

    আমি বললাম, "আমি আনব।" কিন্তু মঙ্গলা বলল, "না, তুমি জান না কোন তেল ভালো। আমি নিজেই যাব।"

    সে চলে গেল। আমি একা কুটিরে বসে আছি। হঠাৎ আমার মাথায় খেল গেল — এতো সুযোগ! এই রান্নাঘরের মধ্যে, এই চুলোর আলোয় — কী চমৎকার একটা পোজ হতে পারে! ন্যাংটা হয়ে চুলোর পাশে দাঁড়ালে আলো-ছায়ার কী খেলা!

    আমি আর থাকতে পারলাম না। তখনই সব কাপড় খুলে ফেললাম। চুলোর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। একটি হাত উপরে তুললাম, যেন আগুনের দেবী। অন্যটি কোমরে। পা একটু বাঁকা। আহা! কী ভঙ্গি!

    ঠিক সেই সময় মঙ্গলা ফিরে এল। হাতে এক বড় হাঁড়ি ভর্তি তেল নিয়ে। সে দরজা দিয়ে ঢুকেই আমাকে দেখে ফেলল! ন্যাংটা আমাকে দেখে তার প্রথম— "আরে! তোমার গায়ে মাছের কাটা ফুটেছে নাকি?"

    আমি অবাক! কী বলছে এই মেয়েটা?

    মঙ্গলা বলল, "গায়ে এত লাল লাল দাগ! নিশ্চয় মাছ কাটতে গিয়ে কাটা ফুটেছে! দাঁড়াও, তেল মালিশ করি। সেরে যাবে।"

    বলেই সে হাঁড়ি থেকে এক কষ্কে গরম তেল আমার গায়ে ঢেলে দিল!

    ৮.

    আহা! কী যন্ত্রণা! গরম তেল! আমি চিৎকার করে লাফ দিলাম! কিন্তু দুর্ভাগ্য! তেলের উপর পা পিছলিয়ে গেল! সামনের দিকে পড়ে গেলাম! মাথা কুটিরের একটি শিলাখণ্ডে আঘাত করল!

    তারপর কিছুই মনে নেই। যখন চোখ --দেখলাম আমি আমার নিজের দেহের উপর ভাসছি! মঙ্গলা কাঁদছে! "ওগো, আমি তো তেল দিয়েছিলাম সেরে যাবার জন্য, মেরে ফেললাম না তো!"

    আমি বলতে গেলাম, "দিদি, আমি মরে গেছি।" কিন্তু কথা বের হল না। মঙ্গলা আমাকে দেখতেও পেল না।

    এইভাবে আমি মরলাম। মৃত্যুর কারণ: ন্যাংটা পোজ দিতে গিয়ে তেলে পা পিছলানো। পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি যার এমন মৃত্যু হলো।

    ৯.

    মরার পর প্রথম কয়েকদিন আমি বুঝতেই পারলাম না যে মরেছি। আমি ভাবলাম, হয়তো ঘুমাচ্ছি। কিন্তু যখন দেখলাম মঙ্গলা আর কুটিরের অন্যরা আমাকে স্পর্শ করছে না, যখন দেখলাম তারা আমার দেহ নদীর ধরে সমাধি দিল, তখন বুঝলাম — আহা! আমি তো ভূত হয়ে গেছি!

    ভূত হওয়ার প্রথম কয়েকদিন খুব অস্বস্তি লাগছিল। সবাই আমাকে দেখতে পায় না। আমি কথা বললে কেউ শোনে না। আমি কারো শরীর ভেদ করে যেতে পারি। প্রথম প্রথম এটা মজা লাগত। যেমন: একজন ব্রাহ্মণ প্রার্থনা করছেন, আমি গিয়ে তার শরীর ভেদ করে চলে গেলাম! তিনি কিছুই বুঝলেন না!

    কিন্তু তারপরই আমার পুরোনো নেশা ফিরে এল। আমি ভাবলাম, এখন তো আমি ভূত! এখন তো কেউ আমাকে দেখতে পাবে না! তাহলে আমি চিরকাল ন্যাংটা থাকতে পারব! আর কেউ বলবে না, "ওই ন্যাংটা মাগী!"

    সেই থেকে আমি চিরকালের জন্য ন্যাংটা রইলাম।

    ১০.

    কিন্তু সমস্যা হলো, ন্যাংটা থাকাটা তখন মজা হয় যখন কেউ দেখে। আর কেউ যদি দেখেই না, তাহলে কি মজা? আমি ভূত, কেউ আমাকে দেখে না। তাহলে আমার এই ন্যাংটা থাকার কী অর্থ?

    আমি ভাবলাম, আমাকে এমন কাউকে খুঁজতে হবে যে আমাকে দেখতে পায়। কিন্তু কে ভূত দেখতে পায়? সাধু-সন্ন্যাসী, ওঝা-গুনিনরা দেখতে পায়। আমি একদিন একজন সন্ন্যাসীর কাছে গেলাম। তিনি ধ্যান করছেন। আমি ন্যাংটা হয়ে তাঁর সামনে দাঁড়ালাম। তিনি চোখ খুলেই আমাকে দেখে ফেললেন!

    তিনি ভয় পেয়ে গেলেন! বললেন, "হরে রাম! কী পাপিষ্ঠ ভূত!"

    আমি বললাম, "মহাশয়, আমি পাপিষ্ঠ নই। আমি শিল্পী। ন্যাংটা পোজ দিতে চাই।"

    সন্ন্যাসী আরও ভয় পেলেন! বললেন, "যাও! চলে যাও! আমি তোমার সাথে কথা বলব না!"

    আমি বললাম, "কিন্তু আমি তো শিল্প..."

    তিনি তারপর এমন মন্ত্র পড়তে শুরু করলেন যে আমার কানে তালা লেগে গেল! আমি পালাতে বাধ্য হলাম।

    ১১.

    এরপর আমি অনেক ওঝার কাছে গেলাম। তাদের উদ্দেশ্য একটাই — ভূত তাড়ানো। আমি গিয়ে বলতাম, "ওঝা মশাই, আমাকে তাড়াবেন না। আমি শুধু ন্যাংটা পোজ দিতে চাই।"

    ওঝারা প্রথমে আমাকে দেখে ভয় পেত। তারপর তারা তাড়ানোর চেষ্টা করত। নানা মন্ত্র, নানা তান্ত্রিক ক্রিয়া। কিন্তু কিছুই কাজ করত না। কারণ আমার কোনো দুষ্ট উদ্দেশ্য ছিল না। আমি ছিলাম শান্ত ভূত, শুধু ন্যাংটা পোজ দেওয়ার ইচ্ছা!

    একজন ওঝা তো আমার উপর এত রেগে গেল যে সে আমাকে শাপ দিল, "তুমি চিরকাল ন্যাংটা হয়ে থাকবে, কিন্তু কেউ তোমাকে দেখতে পাবে না!"

    আমি বললাম, "ওঝা মশাই, এটা তো শাপ না, বরং বর!"

    ওঝা আরও রেগে গেল। শেষে সে নিজেই পালাল।

    ১২.

    এভাবে কেটে গেল বছর দুশো। ১৮০০ সাল নাগাদ আমি কলকাতায় এলাম। তখন ইংরেজরা এসেছে। শহর জমজমাট। নতুন নতুন চিত্রশিল্পী এসেছে। আমি ভাবলাম, এইবার আমার সুযোগ।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    |
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • asim nondon | ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:৫৬738257
  • কলকাতার ঘটনা মনে হয় আরো একটু রসালো হবে। চলুক। ন্যাংটা সুলেমানী
  • albert banerjee | ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:১৯738260
  • ভুত রা কত অবলা বেচারা দের কথা ভাবলেও দুঃখ হয়। "The incomprehensibly lengthy Pneumonoultramicroscopicsilicovolcanoconiosis understandably overshadowed the patient's concomitant floccinaucinihilipilification." এই টা বলতে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। ভুতপ্রেমী দের কাছে অনুরোধ Ai দিয়ে কিছু করা গেলে ভালো হয় . ইংলিশ ভূতেদের , বাঙালি ভূতরা খোনা কথা বলে, চলে যাবে 
  • asim nondon | ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:৫২738264
  • বাঙালী ভুতেরা নাকি সুরে কথা বলে। এসব ইংলিশ ফিংলিশ বাঙালির পোষায় না। অট্টহাসি হবে! নাকি সুরে হাওমাও করবে। এই না হলো ভুত! 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত প্রতিক্রিয়া দিন