এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ন্যাংটা ভূতের আক্ষেপ অথবা - ১

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১০৮ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • |
    (প্রথম পর্ব: ন্যাংটা ভূতের আক্ষেপ)

    ১.

    আরে বাবা! এ কী কাণ্ড! আমি যেন জ্যান্ত আছি, না মরেছি তা-ও বুঝি না! কতকাল ধরে এ ভাবনাই ভুগছি। ১৬০০ সাল নাগাদ মরেছি বৈকি! কিন্তু মরণটা যে কেমন! এক বাবুর্চি রাঁধুনির সাথে ন্যাংটা পোজ দিতে গিয়ে, সেই রাঁধুনি হাঁড়ি থেকে এক কষ্কে তেল আমার গায়ে ঢেলে দিল! বলল, "উহু! মাছের কাটা ফুটেছে নাকি গায়ে? তেল মালিশ করলে সেরে যাবে!" আমি তো তেলে ভিজে পা পিছলিয়ে, মাথা খুঁড়ে মরলাম! লজ্জায় আটখানা! মরার সময়েও ন্যাংটা অবস্থায় মরলাম! যা হবার তাই হলো।

    তারপর থেকে ভূত হয়ে বেড়াই। কিন্তু ভূত হলেই কি নেশা ছাড়ে? আমার ন্যাংটা পোজ দেওয়ার নেশা! চারশো বছর ধরে এ নেশা! ভূত হওয়ার বাড়তি সুবিধা — কাপড় চোপড়ের ঝঞ্ঝাট নাই। সারাক্ষণ ন্যাংটা থাকি, কেউ টুঁশবাস করে না! শীতকালে ঠাণ্ডা লাগে না, গরমকালে গরম লাগে না। ভূত হওয়া একটা স্বর্গের ব্যাপার, যদি না আমার এই নেশা থাকত।

    ২.

    আমার জীবিতকালের কথা বলি শুনুন। তখন ১৫৯৮ সাল হবে। আমি জন্মেছিলাম এক সম্ভ্রান্ত জমিদার বাড়িতে। বাবা ছিলেন ঢাকুরদাস চক্রবর্তী, মা ছিলেন বিপিনাসুন্দরী। ছেলেবেলা থেকেই আমার একটা ঝোঁক ছিল নিজের শরীর নিয়ে। গঙ্গাস্নান করতে গিয়ে যখন জলে নামতাম, তখন শরীরে জল পড়ার অনুভূতি আমাকে উল্লসিত করত। কৈশোরে যখন দেহ গঠন হতে শুরু করল, তখন আয়নায় নিজেকে দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে যেতাম। আমার বাহু, আমার বক্ষ, আমার উরু— সবকিছুই যেন একজন স্বর্গীয় শিল্পীর নির্মাণ।

    তখনকার দিনে চিত্রকলার প্রচলন ছিল। আমাদের বাড়িতে আসতেন রামপ্রসাদ চিত্রকর। তিনি আমার বাবার পোট্রেট আঁকতেন। একদিন আমি লুকিয়ে দেখলাম, তিনি একজন কৃষকের ন্যাংটা ছবি আঁকছেন। মডেল হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল এক বলিষ্ঠ যুবক। আমার মনে হল, আহা! এ কী সুন্দর! দেহের এই প্রকাশ! এই শিল্প!

    সেদিনই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমিও মডেল হব। কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের সমাজে তখন ন্যাংটা হওয়া পাপ। বিশেষ করে একজন জমিদারকন্যার পক্ষে তো নয়ই। তাই আমি গোপনে গোপনে এ কাজ শুরু করলাম।

    ৩.

    প্রথম মডেলিং করলাম আমাদের বাড়িরই এক মুচির কাছে। সে জানত না আমি জমিদারকন্যা। আমি বললাম আমি এক ভিখারি, পয়সার জন্য মডেলিং করতে রাজি আছি। মুচি ছিল প্রকৃত শিল্পীপ্রাণ। সে আমাকে নিয়ে এক সিরিজ স্কেচ করল। তারপর একদিন বলল, "তোমার শরীরে দেবদূতের ছাপ আছে। আমি তোমার একটা রঙিন পোট্রেট আঁকব।"

    সে পোট্রেট আঁকল। তাতে আমি ছিলাম সম্পূর্ণ ন্যাংটা, হাতে একটি ফুল নিয়ে। ছবিটি এতই সুন্দর হয়েছিল যে আমি নিজেই নিজেকে চিনতে পারিনি। সেই মুচিই ছিল আমার প্রথম প্রশংসক।

    কিন্তু দুর্ভাগ্য! একদিন আমার বাবা সেই মুচির কুটিরে গিয়েছিলেন দান দিতে। সেখানে তিনি সেই ছবিটি দেখে ফেললেন! প্রথমে চিনতেই পারলেন না। বললেন, "কী সুন্দর মূর্তি!" তারপর হঠাৎ চোখে পড়ল আমার মুখ! আরেকবার তাকালেন! তারপর রাগে তাঁর গোঁফ পর্যন্ত কাঁপতে লাগল!

    সেদিন যা হইয়া গেল! বাবা আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেন। বললেন, "যাও! কলঙ্ক হয়ে আর আমার বাড়িতে থাকবে না!" আমি রাতারাতি হয়ে গেলাম গৃহহীন।

    ৪.

    গৃহহীন হলেও আমার নেশা ঘুচল না। আমি ঘুরে বেড়াতে লাগলাম বিভিন্ন গ্রামে, শহরে, যেখানে চিত্রকর আছে। আমার শর্ত একটাই — আমি ন্যাংটা পোজ দেব, আর বিনিময়ে আমাকে খাওয়াতে হবে। অনেক চিত্রকর আমাকে নিল। কেউ কেউ আবার বলল, "তোমার শরীর খুব সুন্দর, কিন্তু তুমি ন্যাংটা হয়ে পোজ দিলে আমাদের পাপ হবে।"

    একদিন আমি পৌঁছালাম ঢাকায়। সেখানে এক পারস্য চিত্রকর হাসান। সে আমাকে দেখেই বলল, "তুমি দেবীর মতো! আমি ছবি আঁকব!" সত্যিকারের শিল্পী। সে আমাকে নিয়ে মাসের পর মাস কাজ করল। তার আঁকা ছবিগুলো এখনও কোথায় যেন আছে হয়তো।

    হাসানের কাছেই আমি শিখলাম শিল্পের ভাষা। শিখলাম কীভাবে আলো-ছায়া শরীরে পড়ে, কীভাবে ভঙ্গি দিতে হয়, কীভাবে শিল্পের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে হয়। হাসান বলত, "তোমার শরীরই তোমার শিল্প।"

    ৫.

    এভাবে কেটে গেল বছর পাঁচেক। আমি হয়ে উঠলাম একজন নামকরা মডেল। যদিও নাম প্রকাশ হতো না, কারণ তখনকার সমাজে এটা গ্রহণযোগ্য ছিল না। চিত্রকররা আমাকে ডাকত "অদৃশ্য শিল্পী" নামে।

    তারপর একদিন বিপদে পড়লাম। এক রাজকীয় চিত্রকর আমাকে ডেকে নিয়ে গেল রাজদরবারে। তিনি রাজার জন্য একটি দেয়ালচিত্র আঁকছিলেন, তাতে দেবতা-দেবীদের ন্যাংটা ছবি থাকবে। আমাকে বললেন দেবী ভঙ্গিতে পোজ দিতে।

    আমি রাজি হলাম। কিন্তু সমস্যা হলো, রাজদরবারের অনেক লোকজন আসত। তারা আমাকে দেখত। যদিও আমি তখন পর্দার আড়ালে থাকতাম, তবু কৌতূহলী লোকেরা উঁকি মেরে দেখত।

    একদিন রাজার এক মন্ত্রীর স্ত্রী উঁকি দিয়ে দেখে ফেললেন আমাকে! তিনি চিৎকার করে উঠলেন, "ওই যে ন্যাংটা মাগী!" তারপর সেই চিৎকার শুনে সবাই ছুটে এল।

    রাজার কানে খবর গেল। তিনি রেগে আগুন! বললেন, "এই অধার্মিক কাজ বন্ধ কর!" আমাকে ধরিয়ে দেওয়ার হুকুম দিলেন।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    |
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • asim nondon | ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৯:১৩738230
  • এক নাগাড়ে পড়ে ফেললাম
  • albert banerjee | ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৮738247
  • অনেক ধণ্যবাদ আপনাকে 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন