বুদাপেস্ট, সোমবার, ৩১শে জানুয়ারি, ১৯৯৪
বুদাপেস্ট, প্রথম সকাল।
প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। তাপমান শূন্যের সাত ডিগ্রি নিচে। শুভ কর্মপথে সেটি কোন বাধা হতে পারে বলে সিটি ব্যাঙ্ক বিবেচনা করে না। কাজের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা কোন বাধা নয়। ব্যবসায়িক রণক্ষেত্রে যথাযথ শল্ল বর্ম কবচ কুণ্ডল, মতান্তরে জুতসই ওভারকোট জুতো মাফলার দস্তানা কেনার বা ইউনিফরম সরবরাহ করার দায়িত্ব ব্যাঙ্কের নয়।
আমাদের অফিসের ঠিকানা পুরনো পেস্টের ৮০ ভাচি উতচা (আক্ষরিক অর্থে খেয়ালি / পাগলামির পথ)। মাইল খানেক দীর্ঘ, কেবলমাত্র পদচারিদের জন্য নির্দিষ্ট। বুদাপেস্ট গেলে এখানে অতি অবশ্য পদচারণা করবেন, আর কিছু না হোক, বেঞ্চে বসে জনতাকে অবলোকন করবেন। বিশ বছরে অনেক নতুন দোকানপাট খুলেছে, রাস্তার উন্নতি হয়েছে। আমার দীর্ঘদিনের সহকর্মী আন্দ্রেয়া আরভাইকে এই হালে বলেছি ভাচি উতচার প্রথম দিনের আমেজটি ভুলি নি। হাবসবুরগ আমলের স্থাপত্য; দু’শো বছর যাবত এটি পেস্টের কেন্দ্রবিন্দু, অকারণে হেঁটে বেড়ানোর এলাকা, পেস্টের মানুষের বৈঠকখানা। ভাচি উতচাকে স্বচ্ছন্দে পেস্টের অক্সফোর্ড স্ট্রিটও বলা যেতে পারে, তবে এ পথে গাড়ি চলা নিষেধ। দু পা হাঁটলে ডানিউব, চেন ব্রিজ, সেন্ট স্টেফানের বাসিলিকা, দশ মিনিটে পেস্টের বড়ো বাজার, অন্যদিকে একটু পা চালিয়ে হাঁটলে পনেরো মিনিটে হাঙ্গেরিয়ান পার্লামেন্ট। সে পথে একটু থেমে এক ছোট্ট সেতুর ওপরে ইমরে নজের স্ট্যাচু দেখে যাবেন। ১৯৫৬ সালে কঠোর কমিউনিস্ট রেজিমের পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন মন্ত্রীসভার প্রধান ইমরে নজ। স্তালিনোত্তর কালে, বিশেষ করে ক্রুশচেভের প্রকাশ্য স্তালিন নিন্দার পরে, কমিনিজমের একটা মানবিক রূপ হয়তো নজ আশা করেছিলেন। তাঁর প্রতিবাদ ও বিপ্লব একমাস টেকে। সাম্যবাদী ভাইচারার বিরুদ্ধে হাঙ্গেরির অভ্যুথানে ক্ষিপ্ত হয়ে মস্কো সহ সোভিয়েত ব্লকের সকল দেশ তাদের ট্যাঙ্ক ও সৈন্য বাহিনী পাঠায় হাঙ্গেরিকে শিক্ষা দিতে। ইমরে নজের ফাঁসি হয়।
এ কাহিনিতে পরে আসবো।
সে আমলে বুদাপেস্টে কোনো মিটিঙে যেতে ট্যাক্সি ধরার প্রশ্ন ছিল না, আজও তেমন নেই। আমাদের বেশিরভাগ টার্গেট কাস্টমারের অফিস পৌঁছুতে চরণবাবুর গাড়িই যথেষ্ট। নিতান্ত প্রয়োজনে, আছে হলুদ রঙের অত্যন্ত সুলভ বুদাপেস্ট মেট্রো। ট্যুরিস্টদের অবগতির জন্য লেটেস্ট দর জানাই-একটি যাত্রার টিকিট দশ টাকা, তিন দিনের আনলিমিটেড ট্রাভেল একশো কুড়ি টাকায়। লন্ডনের পরেই (১৮৬৩ – বেকারলু লাইন) পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রাচীনতম আন্ডারগ্রাউনড পরিবহন ব্যবস্থা; ১৮৯৬ সালে সম্রাট ফ্রান্তস ইওসেফ তার উদঘাটন করেন। দু বছর বাদে ভিয়েনা, দশ বছরের মধ্যে প্যারিস, বার্লিনে ভূগর্ভ রেল চলে।
আগি ও আমি প্রথমে আমাদের অফিসে গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎকার সেরে বুদাপেস্ট ব্যাঙ্কের ট্রেজারি প্রধানের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তাঁর নাম ইস্তভান লেনিয়েল (নামের আক্ষরিক অনুবাদ ইস্তভান = স্টেফান; লেনিয়েল = পোল্যান্ড!)। এক দশক কেটে গেলে তাঁর সঙ্গে আবার দেখা হবে স্লোভাকিয়াতে।
বুদাপেস্ট ব্যাঙ্কের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এবং সাম্প্রতিক অনাদায়ি ঋণ সমস্যার কথা জানালেন ইস্তভান– সেটি ব্যাঙ্কের নিজস্ব কর্মফল নয়, সরকারি পলিসির দরুন এটি তাঁদের ঘাড়ে চড়েছে। তবে সুরাহার সন্ধান খোঁজা হচ্ছে, কোশিশ জারি হ্যায়। শুধু সিটি ব্যাঙ্ক নয়, কিছু পশ্চিমি ব্যাঙ্ক মাঝে সাঝে আসেন, দেখা সাক্ষাৎ করেন। বুদাপেস্ট ব্যাঙ্কের লক্ষ্য আরও বেশি বিদেশি ব্যাঙ্কের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা, বিভিন্ন মুদ্রায় সেই সব ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলে তাদের দু পয়সা রোজগারের সুবিধে করে দেওয়া। তাতে দু পক্ষের আর্থিক লেনদেন বাড়তে পারে, ব্যাঙ্কের নাম ও পরিচিতি বিশ্বময় ব্যপ্ত হবে।
কিন্তু সেটি সাধন করা যায় কি প্রকারে?
দেশের আমদানি রপ্তানি ব্যবসায়ের অর্থায়নের জন্য তাঁর ব্যাঙ্কের প্রয়োজন মাঝারি মেয়াদের ঋণ, বিদেশি মুদ্রায়। বুদাপেস্টের আন্ত-ব্যাঙ্কবাজারে তিনি ২৩-২৪% সুদে ফোরিনট তুলতে পারেন।
ইস্তভান জানেন লন্ডনের বাজারে(যে দরে এক ব্যাঙ্ক অন্য ব্যাঙ্ককে ধার দেয়, লন্ডন ইন্টার ব্যাঙ্ক অফার রেট -লাইবর) ডলারের বার্ষিক সুদের হার ৪%। ডলার/ ফোরিনটের বিনিময় মূল্য অবশ্য নিত্যি ওঠানামা করে, বেশিরভাগ নামে, কিন্তু সুদের হারে এই বিশ শতাংশের ফারাকের সুবিধে নিতে তিনি আগ্রহী।
স্বভাবতই প্রশ্ন তুলতে হলো-ডলারে সুদের হার না হয় বিশ পারসেন্ট কম কিন্তু আপনাদের আয় স্থানীয় মুদ্রায়, ডলারে নয়। ফোরিনট ক্রমশ তার মূল্য হারাচ্ছে। ছ মাস আগে ৮৮ ফোরিনটে এক ডলার পাওয়া যেতো, এখন লাগে ১০১ ফোরিনট। আজকে কম সুদে ডলার তুলে যে ফায়দা ওঠাবেন, ফোরিনটের দাম কমে গেলে সেটি হারাবেন। ফেরত দেবার সময় লাগবে অনেক বেশি ফোরিনট।
ইস্তভানের জবাব আশানুরূপ–উম্মিদ পে জীতি হ্যায় দুনিয়া, তাঁরা আশা করেন হাঙ্গেরির বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রগতির হার অব্যাহত থাকলে ফোরিনটের দাম কমবে না বরং সুদের তারতম্যের দরুন বাণিজ্যিক লাভ বাড়বে, লোকের পকেটে টাকা আসবে (পরে জেনেছি পকেটের হাঙ্গেরিয়ান প্রতিশব্দ জেব)। তাঁরা ট্রেড ফাইনান্স বাণিজ্য বাড়াতে চান, রপ্তানির সূত্রে সেখানে সরাসরি ডলার আসবে।
সাহস করে বলা গেলো না, আপনারা টোকাই এক্সপোর্ট ধরে ফেলুন, লন্ডনে সেই সুমিষ্ট ওয়াইনের কদরদান অগুনতি।
জানালাম বুদাপেস্ট ব্যাঙ্ককে আমরা আন্তর্জাতিক ঋণের বাজারে নিয়ে যেতে আগ্রহী। লাভ বহুবিধ: সিন্ডিকেটের বা গোষ্ঠী ঋণে গ্রহীতা এক, লগ্নিকারক একাধিক (আমার পপুলার স্লোগান ছিল- লিভারপুল ফুটবল টিমের অ্যান্থেম: ইউ উইল নেভার ওয়াক অ্যালোন)। অতএব যে সকল ব্যাঙ্ক আপনাদের ধার দেবেন তাঁদের সঙ্গে এক দিনেই বুদাপেস্ট ব্যাঙ্কের সম্পর্ক স্থাপিত হবে। তারপর আপনারা বসে পারস্পরিক ব্যবসা বাণিজ্যের বিচার-বিমর্ষ করুন, সেটা আপনাদের ব্যাপার। সেখানে সিটি ব্যাঙ্কের কোনো ভূমিকা থাকবে না। এই ঋণের খবর আন্তর্জাতিক পত্র পত্রিকায় ছাপা হবে, যে সব দেশের ব্যাঙ্ক এখন অবধি হাঙ্গেরিতে আসেন নি, আপনাদের নাম অবধি শোনেন নি তাঁরাও খোঁজখবর করবেন।
ইতিমধ্যে ঘণ্টাখানেক কেটে গেছে। আমার হাতে সময় অন্তহীন, অথবা মধ্যাহ্ন ভোজন অবধি।
ভালোয় মন্দয় মিলিয়ে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে অনেক বিচিত্র ঘটনা ঘটেছে, তবে এবার যা হলো তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। আমাদের আরেক প্রস্থ কফির অর্ডার দিয়ে ইস্তভান কিছু লিখলেন একটা কাগজে, তার পর বললেন ব্যাঙ্কের পক্ষ থেকে তিনি সিটি ব্যাঙ্ককে একটি আন্তর্জাতিক ঋণের মৌখিক ম্যানডেট দিতে আগ্রহী। আমরা যদি তাঁদের শর্ত মেনে নিই, ইস্তভান তাঁর বোর্ডের সম্মতি বিধায় আমাদের ফর্মাল চিঠি দেবেন, তাতে কিছু সময় লাগতে পারে।
এবার তিনি তাঁর টেবিলে লেখা চিরকুটে চোখ রেখে উইশ লিস্ট, চাহিদার তালিকা জানালেন-
এক। কাম্য ঋণের পরিমাণ তিরিশ মিলিয়ন ডলার।
দুই। মেয়াদ তিন বছর, আসলটা শোধ দেওয়া হবে ঋণচুক্তি সই করার তিন বছর বাদে, কোনো কিস্তিতে নয়।
তিন। সুদ প্রত্যর্পণ করা হবে প্রতি ছ মাস অন্তর।
চার। সুদের হার লন্ডনের ইন্টার ব্যাঙ্ক অফার রেট বা লাইবরের ওপরে ২%
(সে সময় ৪% প্লাস ২=৬%), ফিক্সড নয়, ফ্লোটিং, ছ মাস অন্তর নির্ধারিত হবে।
পাঁচ। আমাদের পারিশ্রমিক তিরিশ মিলিয়ন ডলারের ওপরে ১% অথবা ৩০০,০০০ ডলার, সেটি
ঋণচুক্তি সই হবার দিনে দেয়, আপ ফ্রন্ট।
সুখবর !
খদ্দেরের আজ্ঞাপত্র বা ম্যানডেট পেতে কত যে ঘোরাঘুরি করতে হয়, জুতোর সুখতলা খোয়াতে হয়! টাটা স্টিলের বর্তমান অধ্যক্ষ কৌশিক চাটুজ্জে তার সাক্ষী। তাঁর কোম্পানির ইংল্যান্ডের কোরাস স্টিল অধিগ্রহণের ডিলের সন্ধানে বম্বে হাউসের লবিতে, প্রয়াত রতন টাটার স্নেহধন্য সতত বিচরণরত কুকুরগুলিকে পাশ কাটিয়ে লিফটে চড়ে তিনতলায় কৌশিকের অফিসে কতদিন যে হত্যে দিয়ে বসে থেকেছি (তাঁর তৎকালীন সুযোগ্য সহকারী সন্দীপ অবশ্য আমাদের আপ্যায়নের কোন ত্রুটি রাখে নি)।
এই বুদাপেস্ট ব্যাঙ্ক পয়লা মিটিঙেই বললেন, চরৈবেতি? মানে আমাদের কপালে ডিল নাচছে,
না আমরা বোকার মতন বীরদর্পে কোন গভীর গাড্ডার দিকে এগুচ্ছি?
চ্যালেঞ্জের তালিকা নিম্নরূপ:
পূর্ব ইউরোপের বাজার খুলেছে সবে কিন্তু এই কয়েক বছরে কোনও দেশের কোনো ব্যাঙ্কই আন্তর্জাতিক ঋণ বাজারে আসে নি।
ব্যাঙ্কের বয়েস সাত বছর, ব্যবসার ফলাফল ভদ্রসমাজে বড়ো গলা করে বলার মতন নয়; লাভের মুখ কখনো দেখেনি, দেখছে লোকসানের মুখ।
মালিকানা সরকারি, জানি। কিন্তু ঋণের অনাদায়ের অপরাধে হাঙ্গেরি সরকারকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না। সরকারের একটি কবচ-কুণ্ডল থাকে, তার নাম সভারেন ইমিউনিটি, সরকার অবধ্য।
ঋণের দর কি হবে ব্যাঙ্ক নিজেই স্থির করে দিয়েছে। সেটা তাদের ইচ্ছে, পাবলিক সেটা মানবে? বেচব কাকে?
কোনো তুলনামূলক বাজারি দর আমাদের অজ্ঞাত, ওয়াল স্ট্রিটের কেতাবি ভাষায় যার নাম মার্কেট রিড। মার্কেট কোনও ডিলই দেখে নি অতএব কোনো কিছু রিড করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব! জিজ্ঞেস করব কাকে? পশ্চিমে ঋণের বাজারে হাঙ্গেরি ও বুদাপেস্ট দুইই অপরিচিত।
বাজারে নতুন আগন্তুকের প্রাথমিক ঋণটি হয় স্বল্পমেয়াদি। আনকোরা গ্রহীতাকে একটু সমঝে বুঝে নিতে চান লগ্নিদাতা। ইশকুলের প্রোগ্রেস রিপোর্টের মতন প্রথম দেনাটি সুদে আসলে ভালোয় ভালোয় শোধ হলে তবেই পরবর্তী ঋণের মেয়াদ ও পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টি খুঁটিয়ে দেখা হবে। এর নাম ট্র্যাক রেকর্ড। শাদির পয়লা রাতে মার্জার মারবেন বুদাপেস্ট ব্যাঙ্ক? বাজারে নেমেই তিন বছরের ঋণ, আবার কিস্তিতে শোধ নয়, ফেরত দেবেন একেবারে শেষের দিনে। গাছে না উঠতেই এক কাঁদি! যদি শেষের সেদিন ভয়ঙ্কর হয়?
ইস্তভান তাঁর সিদ্ধান্তে অটল। কোনো অহেতুক দাবি নয়, ব্যবসায়িক কারণে তাঁরা অন্তত তিন বছরের ঋণ চাইছেন।
অগ্র পশ্চাৎ বিবেচনা করিয়া কর্ম করিবে এইরূপ সদুপদেশ বাল্যকাল হইতে বহুবার কর্ণ পটহে প্রবেশ করিয়াছে, মস্তিষ্ক অবধি পৌঁছায় নাই।
এদিন আমি ব্যাঙ্কের স্বাভাবিক বিচার বিবেচনা, সিটি ব্যাঙ্ক আদৌ ধার দিতে পারে কি না, দিলে কত টা দিতে পারে, বাজারে আমরা কি পরিমাণ টাকা তুলতে পারি, লাইবরের ওপরে ২% সুদের হার মেনে নিয়ে লগ্নি কারক এই অচেনা দেনদারকে ধার দেবেন? এই সব জরুরি প্রশ্নকে পিছনে রেখে(ইংরেজি ব্যাক বার্নার) সিটি ব্যাঙ্কের আভ্যন্তরীণ সম্মতি সাপেক্ষে ইস্তভানের প্রস্তাবে মৌখিক সম্মতি জানিয়ে এবং অচিরে তাঁর পত্রপ্রাপ্তির আশা ব্যক্ত করে বিদায় নিলাম।
আগি কুমের গোটা মিটিঙে বিশেষ বাক্য বিনিময় করে নি। আমাকে ফিল্ডে নামানোটা তার কাজ। ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে ওভারকোটে নিজেকে মুড়ে নিয়ে এবং শাল দিয়ে মাথা ঢেকে আগনেস বললে, হীরেন তুমি এদের অনুমোদন পেয়ে লাফালাফি করো না! তুমি এইমাত্র কি করলে জানো? লোকসানের কারণে বুদাপেস্ট ব্যাঙ্কের জন্য আমাদের কোন ক্রেডিট লাইন(ধার দেবার সীমা) নির্ধারিত হয় নি। শুনেছি যে কোনো সিন্ডিকেটের লোনে তোমরা চাও সিটি ব্যাঙ্ক অন্তত দশ শতাংশ নিজের খাতায় রাখুক। পুরো লোনটা বেচে দিয়ে কেটে পড়তে চাও না। সেটা সঙ্গত বলে আমিও মনে করি। কিন্তু এখানে? আমাদের ক্রেডিট কর্তারা এক দিনের জন্যেও বুদাপেস্ট ব্যাঙ্ককে এক ডলার ধার দিতেও রাজি হবেন না। সবটাই তোমাকে অন্য ব্যাঙ্কের কাছ থেকে জোগাড় করতে হবে! এ কথাটা আমি মিটিঙে তোমাকে ইশারা ইঙ্গিতেও বলতে পারছিলাম না !
ঠাণ্ডা বেশ জমিয়ে পড়েছে, সঙ্গে দানিউবের হাওয়া। আমি বললাম লন্ডনে ফিরে ক্রেডিট কর্তাদের পদ চুম্বন করবো (ধর্না দেওয়ার ইংরেজিটা মাথায় এলো না)। আপাতত চলো ভাচি উতচায় খেতে যাই।
পথে , না বিপথে ?
বিসমার্ক বলেছেন ঈশ্বরের করুণা নির্বোধ মানুষ অবোধ শিশু ও মদ্যপকে সকল বিনষ্টির সম্ভাবনা থেকে রক্ষা করে। নির্ভয়ে নয়, ভয়ে ভয়ে যখন আমার ক্রেডিট গুরুদের আসন্ন সঙ্কটের কাহিনি নিবেদন করলাম, তাঁরা তেমন বিচলিত হলেন না। আমার দুর্মতির দরুন বাজারে সিটি ব্যাঙ্কের সম্ভাব্য বদনাম কিন্তু সেই সঙ্গে মোটা পারিশ্রমিকের আমদানির প্রলোভন ইত্যাদি বিচার করে জানালেন তাঁরা অন্তত তিন মাস বা ৯০ দিনের জন্য ওই তিরিশ মিলিয়ন ডলারের কিছুটা সিটি ব্যাঙ্কের খাতায় রাখবার অনুমতি দেবেন, তবে দশ মিলিয়নের বেশি কোন মতেই নয়। ৯০ দিন অতিক্রান্ত হবার আগেই সেই অংশ টুকু বাজারে বিক্রি করে সিটি ব্যাঙ্ককে সম্পূর্ণ ভারমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি তিনি আমাদের কাছে চান। কেতাবি ভাষায় এর নাম আন্ডার রাইটিং বা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিক্রির প্রতিশ্রুতি। নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে এটি বাজারে বিক্রি করে ঋণশূন্য হতে হবে না হলে বহুবিধ বিধান প্রযোজ্য। সবচেয়ে সহজ কাজ আমাকে ব্যাঙ্ক থেকে নিষ্কাশিত করা। তাতে অবিশ্যি ব্যাঙ্কের সমস্যাটা থেকেই যায়। অতএব সিটি ব্যাঙ্ক চেষ্টা করবে সর্ব প্রকার উদ্যমের সঙ্গে সেটুকু বাজারে বিক্রি করতে (এই উদ্যমের দায়িত্ব আমার ছোটো টিমের ওপরে)। নাহলে সেই অবিক্রীত অংশটুকুর কেতাবি মূল্য (বুক ভ্যালু) কমিয়ে দেয়া হবে। অর্থাৎ যে ঋণ বাজারে কেউ কিনতেই চাইছে না তার প্রকৃত মূল্য লিখিত সংখ্যার চেয়ে কম হবে (এর নাম মার্ক টু মার্কেট, যে সমস্যা পরে সাবপ্রাইম আপদকালে আমরা দেখেছি-অ্যাসেট ভ্যালুয়েশন অসম্ভব হয়ে পড়ে)। আরেক অসুবিধে এই যে ব্যাঙ্কের ব্যাল্যান্সশিটে তার একটা ঋণাত্মক প্রভাব পড়বে, খাতায় কলমে লেখা অ্যাসেটের দাম কমে যাবে।
স্টেট ব্যাঙ্ক জলপাইগুড়ির দুলালদা শুনলে বলতেন, আপনে ক্যাচাল করসেন।
সে পরে হবে। আসিবে সময়, ভাবিব তখন।
বুদাপেস্ট ব্যাঙ্কের কাছ থেকে লিখিত মঞ্জুরি পাওয়া গেল মঙ্গলবার ১৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪। সদ্য উন্মুক্ত পূর্ব ইউরোপের একটি ব্যাঙ্কের প্রথম আন্তর্জাতিক ঋণের বাজারে প্রবেশ সংবাদ ঘোষিত হল অর্থনীতিক বাণিজ্যিক সাপ্তাহিক ইউরোউইকে। তাদের সাংবাদিক নাইজেল পেভির সঙ্গে সেই আমার প্রথম পরিচয়। সে আলাপ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।
এরা তো খবর ছেপেই খালাস এবার আমরা যথার্থ সংগ্রামের মুখোমুখি ।
কোন আন্তর্জাতিক ঋণ বাজারে আনতে গেলে একটি তথ্যভারে পরিপূর্ণ স্মারকলিপি রচনার প্রয়োজন, যাকে বলে ইনফরমেশন মেমোরানডাম। সেখানে শুধুমাত্র ভাবি দেনদারের ব্যাল্যান্স শিট নয়, থাকে আরও গালগল্প-কোম্পানির ইতিহাস, তাদের ভবিষ্যতের ভাবনা যার পোশাকি নাম প্রোজেকশন। দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার পরিসংখ্যানের ওপারে। যা দেখছ তাই কি শুধু সত্য? এ ব্যাঙ্ক আজকের ধুলো ময়লা ঝেড়েঝুড়ে ভবিষ্যতে সভ্য চেহারা নিতে পারে?
আমরা তিনটি বিষয়ের প্রতি ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম –
আজকের সঙ্কট বুদাপেস্ট ব্যাঙ্কের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, ব্যাঙ্কের ইচ্ছাকৃত নয় ।
নতুন ব্যাঙ্কের প্রশাসন অত্যন্ত দক্ষ।
অতীত নয়, ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টিপাত করুন। হাঙ্গেরির অর্থনৈতিক ছবিটি উজ্জ্বল।
আমরা সপনো কা সউদাগর ।
লোকবল অতি সামান্য, সহযোগী অ্যাঞ্জেলা, সেক্রেটারি অ্যালিসন, এক ইন্টার্ন রিয়াদ। ইনফরমেশন মেমোরানডাম বানাতে, তার ছাপা ও বাঁধাই (ইন্টারনেটের যুগ একটু দূরে) হতে সময় লাগল। মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমরা সম্ভাব্য ক্রেতার খোঁজে পথে নামলাম। আমাদের ইস্তাহারের প্রথম পাতায় লেখা হলো-
ঋণগ্রহীতা :বুদাপেস্ট ব্যাঙ্ক, বুদাপেস্ট, হাঙ্গেরি
পরিমাণ :তিরিশ মিলিয়ন ডলার
একমাত্র আয়োজক :সিটি ব্যাঙ্ক, লন্ডন
উদ্দেশ্য:মধ্যমেয়াদি পরিকাঠামো/আন্তর্জাতিক বাণিজ্য
শোধের মেয়াদ :তিন বছর (এক থোকে)
সুদের হার :লন্ডন ব্যাঙ্কগুলি যে হারে একে অপরকে ঋণ দেয় তার
২% ওপরে
অতিরিক্ত পারিশ্রমিক :পরিমাণের ওপর নির্ধারিত, যারা যত বেশি ঢালবেন তাঁরা
তত বেশি পাবেন
প্রত্যুত্তর :তিন সপ্তাহের মধ্যে কাম্য
আমার বন্ধু ও সহকর্মী, পরে একো ব্যাঙ্কের সি ই ও আর্নল্ড একপে, সম্ভবত গত তিন দশকের শ্রেষ্ঠ আফ্রিকান ব্যাঙ্কার, অনেকবার বলেছে ব্যবসা বাণিজ্যের সঙ্গে সঙ্গে প্রেসকে সামলানোটাও খুব জরুরি কাজ। তাদের ঘাঁটিও না! সঙ্গে রাখো। আর্নল্ড তার আত্মজীবনীতে* অনুগ্রহ করে আমার উল্লেখ করেছে এবং তার সঙ্গে দিয়েছে প্রেসের বিষয়ে চেতাবনি !
নানাবিধ অর্থনৈতিক পত্রিকা আমাদের ওপরে হামলে পড়লে আর্নল্ডের ঋষিবাক্য স্মরণে এলো।
মাইকেল রোটশিল্ড সে আমলের এবং আজও খ্যাতনামা ফাইনান্সিয়াল পত্রিকা আই এফ আরের (ইন্টারন্যাশনাল ফাইনান্সিং রিভিউ) ১৯ /৩/ ১৯৯৪ সংখ্যায় ‘হাঙ্গেরি ব্রেকসআউট‘ শিরোনামে তাঁর কলামে লিখলেন,
সিটি ব্যাঙ্ক গত সপ্তাহে একটি আন্তর্জাতিক ঋণের ঘোষণা করেছে। পরিমাণে সেটি ছোট কিন্তু হাঙ্গেরির পক্ষে সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিন বছরের এই ৩০ মিলিয়ন ডলার হাঙ্গেরির ইতিহাসে প্রথম কর্পোরেট ঋণ ** কিন্তু হাঙ্গেরির কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক এ যাবত ব্যাঙ্কগুলিকে দ্বি-পাক্ষিক ঋণ নেবার অনুমতি দিতেন তবে এবারে এই প্রথম কোনো ঋণগ্রহীতাকে সরাসরি বাজার থেকে টাকা তোলার অনুমতি দিয়েছেন।
এই ঋণটির প্রতি বাজারের প্রতিক্রিয়া আমরা একান্ত কৌতুহলের সঙ্গে লক্ষ করব।
এই পর্যন্ত পড়ে আমার যে টুকু সমর্থন ও উৎসাহের আশ্বাস মিলেছিল, পরের পরিচ্ছেদে তা সমূলে উৎপাটিত হল। মাইক নানান তথ্য পাঠ করে, জেনে, এই বাণ নিক্ষেপ করলেন –
পশ্চিম ইউরোপীয় ব্যাঙ্কের সঙ্গে তুলনা করলে পূর্ব ইউরোপের যে কোন সরকারি মালিকানাধীন ব্যাঙ্কের মত বুদাপেস্ট ব্যাঙ্কও একটি রুগ্ন প্রতিষ্ঠান। তার মূলধন শূন্য। বছর দুয়েক আগেও বুদাপেস্ট ব্যাঙ্কের অবস্থা এতোটা খারাপ ছিল না। হাঙ্গেরি সরকার একসঙ্গে ৩৩টি দেউলিয়া প্রতিষ্ঠানের ঋণ বুদাপেস্ট ব্যাঙ্কের খাতায় ঢুকিয়ে দিয়ে এর প্রায় সর্বনাশ করেছেন। এ ব্যাঙ্কের প্রতিভাবান প্রশাসন নতুন ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা চালু করার জায়গায় পুরনো ঋণের ঠ্যালা সামলাতে ব্যস্ত।
পূর্ব ইউরোপে আমরা সবে একটা ঐতিহাসিক ডিল করতে যাচ্ছি। এর আগে কেউ এ বাজারে হাত বা পা কোনটাই বাড়ায় নি। আমরাই প্রথম। ভালো কিছু না করতে পারুক, এমন ধারা বাগড়া দেবার কি প্রয়োজন ছিল? আর্নল্ডের উপদেশ স্মরণ করলাম। প্রেসের সঙ্গে লড়াই করে কখনো জেতা যায় না। আমাদের জিততে হবে মাইকের নিরাশাজনক ছবির বিরুদ্ধে লড়াই করে। তাকে ভুল প্রমাণিত করে।
পুনশ্চ:
*The Bush BankerArnold Ekpe
Ex – CEO, Ecobank Africa , MD United Bank for Africa
**IFR পরে মান্যতা দিয়েছে এটি হাঙ্গেরি নয়, পূর্ব ইউরোপে কর্পোরেট ভিত্তিতে আয়োজিত প্রথম আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্ক ঋণ।
তথ্যের খাতিরে
Term sheet for Budapest Bank Loan Syndication
Borrower Budapest Bank, Budapest, Hungary
Amount USD 30 million (European)
Sole Arranger, AgentCitibank International plc
MaturityThree years from draw down (bullet)
Drawdown45 days from signing
Margin2% above corresponding 6-month LIBOR
Responses in three weeks.
ক্রমশ...