বিকেলে একটু হাঁটতে বেরিয়েছিলো হেমন্ত, ফিরে এসে জয়িকে দেখে অবাক। সাধারণত কোন কাজ না থাকলে যে বেতের চেয়ারটায় বসে ও, সেখানে বসে আছে জয়ি, পায়ের নীচে একটা স্যুটকেস আর একটা ব্যাগ।
কখন এলি? আগের থেকে কিছু জানাসনি কেন? যদি আমি না থাকতাম কী হতো তাহলে?
কী আর হতো, তুমি না থাকলে রঘুনাথদা তো থাকতো, আর দিনের মধ্যে একবারের জন্যেও অন্তত অষ্টমী তো আসতোই। কিন্তু বাবা, তোমরা এরকম সবাই মিলে বেরিয়ে যাও একসাথে, কেউ নেই, কিছু হয়ে যায় যদি !
কী আর হবে, কাছাকাছিই ছিলাম তো, রঘুনাথও আছে আশপাশেই। তা ছাড়া এসব জায়গায় অমন হুট করে কিছু হয়ে যায় না; যদি হয় সেটা রক্ষকরাই করে। সেটা আটকানো যাবে না, রক্ষকরা ভক্ষক হলে একা একা করা যায় না কিছুই।
তোমার গলায় তো প্রায় জলধরের সুর বাবা।
অবাক হচ্ছিস কেন ! ও সাঁওতাল আর আমি ওরাওঁ, দুটো আলাদা আলাদা নাম, তফাৎ তো শুধু এইটুকুই। যাকগে, ছাড় সে কথা। তোর কতো দিনের প্ল্যান?
কতো দিনের প্ল্যান জানি না, আপাতত এক মাস থাকবো মনে করে এসেছি, তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে ফিরে যাবো না থেকেই যাবো এখানে বরাবরের জন্যে !
বরাবরের জন্যে ! তোর চাকরিটা তাহলে কী হবে? মা আর ঐ ছোটগুলোর জন্যে কী ব্যবস্থা করবি?
তুমি দেশের খবর রাখো না বাবা। আমাদের দেশটা যারা চালায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে গেছে। বড়ো বড়ো সরকারি ব্যবসা যেগুলো আছে, যেমন ধর আমাদের এই স্টীল প্লান্ট, এগুলো যদি যথেষ্ট লাভ না দিতে পারে, সরকার চালাবে না এগুলো, হয়তো চলে যাবে প্রাইভেট ব্যবসাদারদের হাতে। তাই লোক কমানো শুরু হয়ে গেছে। নতুন একটা কথা অফিস-কাছারিতে খুব চালু হয়েছে আজকাল: স্বেচ্ছা-অবসর, ভলান্টিয়ারি রিটায়ারমেন্ট। আমি যদি চাই, এখনই রিটায়ার করে যেতে পারি। প্লান্টে যে বাড়িটায় আমরা থাকি সেখানে কিন্তু মা থাকতে পারবে ! যদি এখনই রিটায়ার না করতাম তাহলে যতদিন আমাদের ঐ বাড়িতে থাকার কথা, ততদিন পর্যন্ত ! তাড়াতাড়ি রিটায়ার করছি, তাই প্লান্ট আমাকে ক্ষতিপূরণ বাবদ কিছু টাকাও আলাদা কোরে দেবে, সেটাও মাকে দিয়ে দেবো। কাজেই মার আর কী অসুবিধে ! দশ-পনেরো বছর সময় পাবে তো ! তার মধ্যেও যদি ছোটগুলো না মানুষ হয়, কী আর করা যাবে বলো !
তুই কী করবি এখানে? আর তোর বন্ধুবান্ধব, শাম্বর দলবল, তারাই বা রাজি হবে কেন?
তারা তো বেঁচে যায় আমাদের মধ্যে যে কেউ এখানে এসে থাকলে। কাজেই সেটা কথা নয়, আসল প্রশ্ন হচ্ছে ঐ প্রশ্নটা, যেটা তুমি করেছো। আমি কী করবো এখানে !
ঠিক আছে, বললো হেমন্ত, তোর প্ল্যান শোনা যাবে। আপাতত চান-টান করে পরিষ্কার-টরিষ্কার হয়ে বোস। আমি দেখি রঘুনাথ কোথায় গেলো।
জয়ি উঠে দাঁড়িয়ে স্যুটকেসের হ্যাণ্ডেলটায় হাত দিতে-না-দিতে হেমন্ত বলে, তুই কোথায় থাকবি? নতুন যে ঘরগুলো হয়েছে, অ্যাটাচ্ড্ বাথরূম, সেগুলোর একটা খুলে দেবো? একটু আরামে থাকবি তাহলে।
না বাবা, ঐ ঘরগুলো তো আমাদের গেস্ট হাউজ। আমি তো গেস্ট হয়ে থাকতে আসিনি। তোমার পাশের ঘরটা খুলে দাও। ওটাই দিব্যি হবে।
রাতের খাওয়াদাওয়ার পর বাগানে চেয়ার টেনে বসে বাবা আর মেয়ে। জয়ি বলে, ভেবে দেখলাম খুশিঝোরাই এখন আমার কেরিয়ার। কাজেই এখানে থেকে যাওয়াই ভালো।
হেমন্ত জানে ও কেরিয়ার-টেরিয়ার বোঝে না। সারাজীবন ধরে নিজে যখন-যা-পেয়েছে তখন তা-ই করেছে। হেমন্তর পক্ষে অন্য কিছু ভাবা সম্ভবই ছিলো না। বাবার মতামত যদি ওর ব্যাপারে পুরোপুরি চলতো তাহলে আর পাঁচটা কুরুখ ছেলের মতো ধুমকুরিয়াতেই বড়ো হয়ে উঠতো ও, তাদের মতোই যা হোক একটা কিছু, সে জঙ্গলে কাঠ কাটাই হোক বা আশপাশের কোন খনিতে কুলির কাজই হোক, করতো একটা কিছু। কিন্তু ওর মার কীবা সেন হয়ে ওঠার সখটা আর শৈশবে ওর বাবার ওকে খানিকটা লেখাপড়া শেখানোই ওর জীবনটাকে আলাদা রকমের কোরে দিয়েছে। তবুও, যতই আলাদা রকমের হোক, কেরিয়ার বলতে কী বোঝায় এমনকী অস্পষ্টভাবেও সে সম্বন্ধে কোন ধারণা তৈরি হয়নি ওর। যখন যা পেয়েছে, করেছে। ভালোভাবেই করার চেষ্টা করেছে। যার জন্যে যখন যে কাজ করেছে সে সন্তুষ্টই হয়েছে ওর কাজে। শেষ বয়েসে লাক্ষা কারখানায় সুখবিহারী তো ওকে সর্বেসর্বাই করে দিয়েছিলেন।
এমনকি মেয়ের কেরিয়ার নিয়েও কখনো ভাবেনি হেমন্ত। মেয়ের ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সঙ্গীতে আগ্রহ ছিলো এটা লক্ষ্য করেছে ও, যেমনটা ছিলো ওর নিজের, এমনকী ওর বাবারও। এই আগ্রহটা ওর ভালোই লাগতো, তাই উৎসাহই দিয়ে এসেছে মেয়েকে বরাবর। কিন্তু কেরিয়ার? এসব নিয়ে চিন্তাই করেনি কখনো। কপালজোরে একটা ভালো স্কুলে পড়ার চান্স পেয়েছিলো মেয়ে, ও ভাবতো স্কুলের পর মেয়ে যদি কলেজ থেকে একটা সায়েন্সের ডিগ্রী নিয়ে পাশ করতে পারে, হয়তো স্টীল প্লান্টটা, অথবা স্টীল প্লান্টের দৌলতে আরও যে সব কারখানা গজিয়ে উঠেছে আশপাশে, সেগুলোর একটায়, চাকরি পেয়ে যেতে পারে একটা।
ওই কচি বয়েসে স্কুলের পরীক্ষা পাশের পর মেয়ে যেদিন বললো কলেজে পড়বে না ও, ছবি আঁকবে আর ছবিই আঁকবে শুধু, সেদিন মেয়ের কেরিয়ার পরিকল্পনার একটা অস্পষ্ট ইঙ্গিত পেয়েছিলো হেমন্ত। ঠিক ঠিক যে ব্যাপারটা বুঝেছিলো, তা নয়। ততদিনে জয়ির তুলির সাথে বন্ধুত্ব আর তুলির বাবার প্রায়-মেয়ে-হয়ে-ওঠার ব্যাপারটা জেনেছে ও। ওরা অনেক বড়লোক, অনেক লেখাপড়া জানে; ভেবেছে ওদের সংস্পর্শে নিজের সম্বন্ধে যে পরিকল্পনা করেছে জয়ি, সেটাকে বাধা দেওয়া ঠিক হবে না। শক্তি চট্টোপাধ্যায় নামের এক কবির সাথে কথা বলে যেদিন জয়ি পাড়ি দেয় কলকাতায়, ও আপত্তি করার কোন কারণ খুঁজে পায়নি। শুধু নিজের জমানো সামান্য টাকা আর বুকভরা আশীর্বাদ ছাড়া ওর কিছুই দেবার ছিলো না মেয়েকে।
তারপর তো মেয়ে চাকরিও পেলো। পেলো সেই স্টীল প্লান্টেই। এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারতো ! কিন্তু সেই স্টীল প্লান্টের চাকরি করতে করতেও মেয়ে ছবিই এঁকে চললো। হেমন্ত জানে তার মেয়ের ছবির এগজিবিশন হয়েছে কলকাতায়, বোম্বেতে। তার ছবি ছাপা হয়েছে বহু জায়গায়, এমনকী নিলীনের মতো য়্যুনিভার্সিটি প্রফেসরের বইয়ের সাথেও। ছবি আঁকার কেরিয়ারের কথাটা মেয়ের মাথায় থেকেই গেছে এটা বুঝতে পেরেছে হেমন্ত। তারপর খুশিঝোরায় যে এগজিবিশনটা হলো সেটা তো সে কাছের থেকেই দেখলো। কতো জ্ঞানী-গুণী মানুষ এলেন। কতো কাগজে লেখা হলো, কতো প্রশংসা করলো সবাই। হেমন্ত একটু একটু আন্দাজ পেলো কেরিয়ার কাকে বলে। বুঝলো, তার মেয়ে খুব সাধারণ নয়, সে একজন সফল শিল্পী, নামজাদা ছবি আঁকিয়ে।
কিন্তু খুশিঝোরাই কেরিয়ার হওয়াটা কী ব্যাপার? এতদিনে হেমন্ত বুঝে গেছে তার মেয়ে আর পাঁচজনের তুলনায় একটু অন্যরকমের, সে না ভেবে কোন কাজ করে না, না চিন্তা করে কোন কথা বলে না।
হেমন্ত জিজ্ঞেস করে, খুশিঝোরাই কেরিয়ার মানে কী?
তার আগে বলো, এই যে আমার এতগুলো ছবি দেখলে এগজিবিশনে, কেমন লাগলো?
কেন, ভালোই তো।
না বাবা, ভালো নয়, তত ভালো নয়। সত্যি কথা বলো বাবা, ছোটবেলায় আমার যে ছবি তুমি দেখেছো, যে ছবি দেখে তুমিও নাকি নকল করার চেষ্টা করতে বলে একবার বলেছিলে আমাকে ছোটবেলায়, ততটা ভালো?
সেরকম ভাবে কী বলা যায় রে বোকা, সবাই তো দেখে কতো প্রশংসা করলো।
ছবির প্রশংসা করেনি, শোএর প্রশংসা করেছে।
তফাৎটা কী হলো?
অনেক তফাৎ বাবা, অনেক তফাৎ।
আমি বুঝতে পারলাম না। তোর ছবির শো, সেই শোএর প্রশংসা কীভাবে তোর ছবির প্রশংসা না কোরে করা যায়?
তোমাকে বোঝাতে পারবো না আমি, চাও যদি কোন কোন কাগজের আলোচনা আমি তোমাকে পড়তে দিতে পারি, সেগুলো পড়েও বা কতোটা তুমি বুঝবে আমি জানিনা, কিন্তু যা বোঝার আমি বুঝে গেছি। আজ যে আমার এতো নাম দেখছো তুমি, তোমার মনে হচ্ছে এর সবটাই শিল্পী হিসেবে। তা নয় বাবা, এই জয়মালিকা ছবি আঁকে ঠিকই, কিন্তু সে কী ছবি আঁকে? ছবি আঁকে হতদরিদ্র, পাহাড়-জঙ্গলে পড়ে থাকা আদিবাসীদের। সেই ছবি দেখবার জন্যে বড় শহরের মানুষদের সে ডেকে নিয়ে যায় আদিবাসীদের নিজেদের বাসভূমে, সেখানে সে আদিবাসী শিশুদের আঁকা ছবিও দেখায় মানুষকে। তার সমস্ত সামর্থ নিয়োজিত আদিবাসী শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রসারে, তাই সে খুশিঝোরায় নিবেদিত; সে শিল্পী হতে পারে, শিল্পীই হয়তো, কিন্তু সেটা তার পরিচয়ের অতি সামান্য একটা অংশ, আসলে সে দরদী জয়মালিকা, প্রান্তিক মানুষের জন্যে উৎসর্গীকৃত জয়মালিকা, আদিবাসী-উন্নয়নের জন্যে নিবেদিত জয়মালিকা ! এই জয়মালিকার কী পড়ে থাকে বাবা খুশিঝোরাকে বাদ দিলে? শিল্পীসত্ত্বা? কত বড়ো শিল্পী সে?
জয়ির সাথে অনেক দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে তার, বুঝতে পারে হেমন্ত। জয়ির ভাষাটাই অন্যরকমের হয়ে গেছে। তার সব কথা বুঝতে পারে না সে। হেমন্ত বলে, সুদেশের সাথে আলোচনা করেছিস তোর এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে?
একই প্রশ্ন। এই প্রশ্নই করেছিলো তুলি ওদের কলকাতার বাড়িতে, সারারাত যখন জেগেছিলো ওরা। যতই তর্কাতর্কি হোক, তুলিকে ও বোঝাতে পেরেছিলো, সুদেশ আর ও একই পথে পাশাপাশি চলতে পারবে না শেষ পর্যন্ত। জয়ি বলেছিলো সুদেশ ভালোবেসেছিলো ওর মধ্যে ছবি-আঁকিয়ের যে প্রতিভাটা ছিলো সেটাকে, ওকে নয়। তুলি মানেনি সে কথা। সে বলেছে, প্রথমবার কলকাতায় পৌঁছোনোর প্রায় পর থেকেই জয়ির বারবার সুদেশের কাছে দৌড়িয়ে যাওয়া নানা অসুবিধের সময় সাহায্যের জন্যে – নানা ব্যাপারে সুদেশকে পাওয়া যেন ওর অধিকার – সেটা সুদেশের মধ্যে জয়ির সম্বন্ধে একটা স্নেহমিশ্রিত প্রশ্রয়, এক ধরণের প্রায়-বাৎসল্যের রূপ নিয়ে, ক্রমে প্রেমের মতো একটা চেহারা নিয়েছিলো। সুদেশের যখনই মনে হয়েছে জয়ি ওর প্রতিভাকে কাজে লাগাচ্ছে না, ওর প্রতিভার স্ফুরণের সুযোগ ঠিক ঠিক মতো কাজে লাগাচ্ছে না জয়ি, তখনই ক্লেশ হয়েছে তার, কিন্তু ভালোবাসার ইচ্ছা-অন্ধতায় হয়তো সে প্রকাশ করেনি নিজের এই কষ্টের কথা। বোম্বে মেলে ফার্স্ট এ-সি-র নির্জন ভ্রমণের সময় কৃতজ্ঞ জয়ি যখন নিজের শরীর দিতে চেয়েছে তাকে, তখনও বাৎসল্য মিশ্রিত সেই স্নেহই নিবারণ করেছে তাকে। যত্ন করে সে যেন ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে জয়িকে। তুলি কিছুতেই মানেনি সুদেশ ভালোবেসেছিলো জয়ির প্রতিভাকে, সে মানুষ জয়িকেই ভালোবেসেছিলো, এতই ভালোবেসেছিলো যে প্রতিভার অপমৃত্যুতে দুঃখ পায় সে ভালোবাসা, কিন্তু দুঃখই পায় শুধু, তার জন্যে জয়ির ওপর ভালোবাসা তার কমে না। কিন্তু তবুও, তুলি শেষ পর্যন্ত একমত হয়েছিলো জয়ির সাথে, অতি উচ্চাকাঙ্খী জয়ি আর সুদেশ বোধ হয় শেষ পর্যন্ত চলতে পারবে না পাশাপাশি !
কিন্তু এসব কথা কী বাবাকে বোঝানো যাবে? জয়ি বলে, সুদেশ? এর মধ্যে সুদেশ আসছে কোথা থেকে?
সুদেশ কোথা থেকে আসছে তোকে আমার বোঝাবার দরকার আছে সেটা? বয়েস তো কম হয়নি ওর, কিন্তু আজও তোর জন্যে অপেক্ষা করে আছে ছেলেটা।
তুমি ওসব নিয়ে ভেবো না বাবা। সুদেশ আমাকে ভালো মতো চেনে।
হেমন্ত বোঝে এ নিয়ে আর কথা বলার কোন প্রয়োজন নেই। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে সে বলে, তাহলে কী প্ল্যান তোর? খুশিঝোরায় যে থাকবি, করবিটা কী?
জলধরের সাথে একটু পরামর্শ করতে হবে। কাল সকালে তো দুধ নিতে আসবে জীপটা, তুমি ওদের দিয়ে জলধরকে একটু খবর দিয়ে দিতে পারবে?
ঠিক আছে, চল্, অনেক রাত্তির হয়ে গেছে, শুয়ে পড়া যাক।