এই লেখাটি যাঁরা ভালো লেগেছে বলে জানিয়েছেন, তাঁদের সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।@ অরিনবাবু -
“তবে দেবদূত কি সেলফ রেফারেনশিয়াল?” এটা ঠিক বুঝলাম না। আমি বলতে চেয়েছি - সেদিন সকালে সরল, নির্লোভ রামুর হঠাৎ দেবদূতের মতো উদয় হয়ে মাত্র কুড়ি টাকায় আমায় একা বারো কিমি দূরে জাখলোন ছেড়ে দেওয়ার অভাবনীয় প্রস্তাবটি আমার বরদানের মতো লেগেছিল। সত্যজিতের লেখায় জটায়ুর বইয়ের নামগুলি হোতো ধ্বনি অলংকারময় - সাহারায় শিহরন, দুর্ধর্ষ দুশমন, ভ্যাংকুভারে ভ্যাম্পায়ার, লন্ডনে লন্ডভন্ড, হন্ডুরাসে হাহাকার ইত্যাদি। অবচেতনে জটায়ুর প্রভাবে হয়তো এই শিরোনামটাও অমন হয়ে গেছে
@kk - আপনি একবার ভাটে বা অন্য কোথাও হোমসকে কোট করে লিখেছিলেন -
“দেখেছি কিন্তু খেয়াল করিনি”। আমিও আমার তোলা অনন্তশায়ী বিষ্ণুর ছবিটা গত পাঁচ বছরে অনেকবার দেখেছি, কিন্তু হয়তো আমার মুগ্ধতা এতোটাই মুকুটের নিখুঁত, সুক্ষ্ম জ্যামিতিক প্যাটার্ণে আটকে ছিল যে - আপনার উল্লেখিত “
ঐ কুণ্ডলীকৃত চুল ও কড়ে আঙুলে আংটি”- এযাবৎ চোখেই পড়েনি। অথচ আপনি একবার দেখেই বলে দিলেন। আগেও আপনার কিছু মন্তব্যে মনে হয়েছে - ছবি ও লেখার ওপর আপনার অবজার্ভেশন দারুণ শার্প।
আরো কিছু অনুভব ব্যক্ত করতে ইচ্ছে হচ্ছে:
লেখার প্রেরণা সম্পর্কে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের একটি লেখায় পড়েছিলাম - “আসলে, সবিশেষ কারণ ছাড়াই যে কার্যগুলি সম্পন্ন হয়, তার মধ্যে একটা নিশ্চয়ই সাহিত্য — অন্তত লেখকের দিক থেকে। 'হােয়াই ডাজ ওয়ান রাইট’ নিবন্ধে প্রাইমাে লেভি লেখার যে ১১ টি কারণ দেখিয়েছেন, যথা : বিখ্যাত হবার ইচ্ছা, অন্যকে আনন্দ দেওয়া, অন্যকে শিক্ষিততর করা, ব্যক্তিগত ব্যথা বেদনা থেকে মুক্তি ইত্যাদি - তার সবকটাই মামুলি। বরং বলা যেতে পারে, এগুলি এমন সব কারণ, যার জন্যে লেখকরা লেখেন না। এগুলাে সবই লেখকের দ্বিতীয় চিন্তা। আপনি লেখেন কেন? এর উত্তরে লেখকরা নানা উত্তর দিয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন, যশ বা অর্থের জন্য লিখি না। দেনায় জর্জরিত দস্তয়েভস্কি বলেছেন ‘আমি টাকার জন্যে লিখি’। আনাই নিন বলেছেন, আমি একটা নিজের জগৎ তৈরি করি আমার লেখা দিয়ে, যেখানে ছাড়া আমি নিঃশ্বাস নিতে পারি না।”
আমার পড়াশোনার পরিধি সীমিত। রাজনৈতিক মতবাদ, ইতিহাস, দর্শন, ধর্ম, আধ্যাত্ম্যবাদ, দেশ-বিদেশের ঘটমান সামাজিক পরিস্থিতি, নির্বাচনী রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে অনুধাবন, বিশ্লেষণে আমি চূড়ান্ত অক্ষম। লেখার শৈলীর ক্ষেত্রেও ফর্ম, আঙ্গিক, কল্প-বাস্তবতা, যাদু-বাস্তবতা ইত্যাদি নিয়ে প্রথাভাঙা পরীক্ষা নীরিক্ষায় অপারগতা এবং অনীহা। গুরুতে বিভিন্ন লেখা, তার ওপর পাঠমন্তব্য, ভাটিয়ালিতে চর্চা ইত্যাদি দেখে মনে হয়েছে এই ফোরামের অধিকাংশ সদস্য ঋদ্ধ সম্প্রদায়ের। এই পাঠকগোষ্ঠীর ভাবনার খোরাক যোগানোর মতো লেখার যোগ্যতা আমার নেই। আমার অধিকাংশ লেখার ভঙ্গিমা সহজ, মাটি-বাস্তবতা ঘেঁষা। এটা আমার বিনয় নয় - নৈর্ব্যক্তিক আত্মমূল্যায়ন।
তাই আমার লেখার প্রেরণার ক্ষেত্রেও সন্দীপনের লেখায় উল্লেখিত আনাই নিনের ভাবনার প্রতিফলন খুঁজে পেয়েছি। অর্থাৎ যেসব জায়গায় ঘুরে এসেছি, যেসব সুন্দর কিছু মানুষের সাময়িক সাহচর্যে পেয়েছি অনাবিল আনন্দ - সেসব নিয়ে খেলিয়ে লেখার প্রয়াস আসলে গরুর চোখ বুঁজে জাবর কাটা বা আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে ঝিম মেরে বসে থাকার মতো আনন্দ নেওয়া। আমি এক রোমান্টিক আত্মকেন্দ্রিক পলায়নবাদী। তার জন্য আত্মগ্লানিও অনুভব করি। তার বেশী কিছু করা - মাটিতে নেমে - পারি না। নিত্য খবরে পড়া নানান আবিল ঘূর্ণাবর্তে - বালিতে মুখ গুঁজে পড়ে থাকি। তাতেও শান্তি নেই। অনেক রাতেই বহুক্ষণ ঘুম আসে না।
আমার মামূলী ভ্রমণকাহিনী পড়ে যখন গুরুর কিছু ঋদ্ধ লেখক, পাঠকমণ্ডলী তাঁদের ভালো লাগা ব্যক্ত করেন - তখন মনে হয় - কিছু অনুভবের অভিঘাত, আবেদন হয়তো নানাজনকে নানাভাবে ছুঁয়ে যায়।