এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হেদুয়ার ধারে ( তৃতীয় খন্ড ) - ১৪ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৫ এপ্রিল ২০২৫ | ২১ বার পঠিত
  •                             ( ১৪ ) 

    আজ রবিবার  সন্ধে সাড়ে পাঁচটা থেকে টি ভি তে  'শেষ পর্যন্ত ' দেখানো হবে । রমাদেবী পরিপাটি করে শতরঞ্চি পেতে রাখলেন উৎসাহী দর্শকদের জন্য ।
    তাদের পুত্রবধু অবশ্য ঠারে ঠোরে বিরক্তি প্রকাশ করতে লাগল ---- রোজ রোজ  এরকম হুজ্জুতি চললেই হয়েছে ... বাড়ি ছেড়ে পালাতে হবে ।
    রমাদেবী বললেন, ' ওমা ...  রোজ রোজ কোথায় !
    সপ্তাহে তো দুদিন মোটে ... সবাই  মিলে আনন্দ করে দেখব ... এটাই  তো ... আর কি ? তাছাড়া কাউকে কিছু তো করতে হচ্ছে না ... চা টা যা করার আমিই  তো করছি ... '
    তার ছেলের বউ আর কথা না বাড়িয়ে ঘরে ঢুকে গেল । আসল কথা হল শনি রবিবারে এই  যে একটা উৎসব উৎসব মেজাজ এটা কিন্তু আসলে তারও ভালোই লাগে । ও ভদ্রমহিলার স্বভাবই হল যে কোন ব্যাপারে একটা মৃদু আপত্তি তুলে  তারপর সেখান থেকে সরে যাওয়া । রমাদেবী বিলক্ষণ জানেন সে কথা ।
    একতলার ওই সুভাষ দুর্বাররাও রবিবার দিন  গুটি গুটি এসে হাজির হতে লাগল যথা সময়ে । এসে স্বাভাবিক সংকোচবশত দরজার বাইরে একটু দাঁড়িয়ে থাকে মুখে লাজুক হাসি ঝুলিয়ে ।
    বিভূতিবাবুর চোখে পড়তে তিনি বলে ওঠেন , ' আরে এস এস ... ওখানে দাঁড়িয়ে কেন ? এক্ষুণি হাউস ফুল হয়ে যাবে ... তখন বসার জায়গা পাবে না ... হাঃ হাঃ ... আর দুজন কোথায় ? '
    দুর্বার আর বিনয় ঘরের ভিতর পা রেখে বলল, ' এসে যাবে ... আপনাদের বিরক্ত করা ...খারাপ লাগে ... '
    ----- ' ওমা ... সে কি কথা গো ... বিরক্তির কি আছে এতে ... টিভি টা আনা হয়েছে তো সবাই  দেখার জন্যই  ... '
    সে যাই হোক প্রতি সপ্তাহের মতো ফিল্ম তো শুরু হল , কিন্তু যখন এই বিশ্বজিতের রোমান্সবিহ্বল ঠোঁটে হেমন্তকন্ঠ যখন 'এই বালুকাবেলায় আমি লিখেছিনু ... একটি সে নাম আমি লিখেছিনু ...' ঘর সুরে ভরিয়ে দিচ্ছে এবং প্রথম অন্তরা পেরিয়ে   সঞ্চারী অংশে পৌঁছেছে...  এই  সাগরের কত রূপ দেখেছি , কখনও শান্ত  রূপে কখনও অশান্ত সে ... ব্যস , পাশের বাড়ির  একটা বেআক্কিলে মান্ধাতার আমলের  ডি সি  ফ্যান চালু হয়ে গেল এবং বিকট ঘটাং ঘট  ঘটাং ঘট শব্দের ধাক্কায় এবং টিভির পর্দায় বিচিত্র সব আঁকি বুঁকি তরঙ্গের ওঠাপড়ায় 'বালুকাবেলা' এবং 'শেষ পর্যন্তর' দফা রফা হয়ে গেল । এ ক'দিনের অভিজ্ঞতায় এ বিপত্তির উৎস সম্বন্ধে এখানে উপস্থিত দর্শকদের জানা হয়ে গেছে।
    অতিষ্ঠ দর্শকবৃন্দের মধ্যে জনা কয়েক , তাদের মধ্যে সুভাষ এবং বিনয়ও ছিল , তাড়াতাড়ি  বারান্দায় বেরিয়ে গিয়ে পাশের বাড়ির মুখোমুখি ঘর লক্ষ্য করে , 'ও দাদা ... পাখাটা বন্ধ করুন .... ফ্যানটা বন্ধ করুন ... ও দাদা ... ও ও ও ... দাদা ...
    ফ্যানটা বন্ধ করুন ... ' বলে তারস্বরে চেঁচাতে লাগল ।
    এই  সমস্বর দাবী মেনে নেওয়া হল নিশ্চয়ই।  কারণ , 'শেষ পর্যন্ত ' আবার যথাযথভাবে দৃশ্যমান হল । পাশের বাড়ির কাউকে দেখা গেল না অবশ্য । তিনি অন্তরালে থেকে এ বাড়ির টিভি সিনেমা পিপাসুদের এই বিশ্রী যন্ত্রনা থেকে মুক্তি দিলেন আপাতত । পাখাবিহীন ঘরে এই  প্রবল গরমে তার গলদঘর্ম হওয়ার ব্যাপারটা কারও মাথায় আসল না মোটেই । ওই প্রতিবেশীর মহান আত্মত্যাগের  কথা চিন্তা করার মতো মানসিক অবস্থায় এই  মুহুর্তে সিনেমা মশগুল জনগণের মধ্যে কেউ নেই বিভূতিবাবুর ঘরে । বিভূতিবাবু অবশ্য একটা  অস্বস্তিবোধ করতে লাগলেন । তিনি উসখুস করতে লাগলেন । ভাবলেন ইন্টারভ্যালের সময় পাশের বাড়ির সুধীরবাবুকে বারান্দা থেকে ডেকে ব্যাপারটা  বুঝিয়ে বলবেন । বালুকাবেলার গানটা  ততক্ষণে শেষ হয়ে গেছে । বিশ্বজিত আর সমুদ্রের বালুকাবেলায় উদাস মুখে দাঁড়িয়ে নেই  । ছবি বিশ্বাস মুরগির ঠ্যাং চিবোচ্ছে ।
    এই সময়ে পাড়ার দুই বৌদি  নিজেদের কি একটা
    সাংসারিক সমস্যা নিয়ে  গুজগুজ করতে লাগল, খুবই  নিম্নস্বরে । কিন্তু কোন বিশেষ সমস্যাজনিত কারণে উত্তেজনাবশত এক বৌদি বলে উঠলেন, ' সেটাই তো বলছি ... না ঘরকা না ঘাটকা... গলায় দড়ি জোটে না ... '
    ওপারের পুরুষদের বিভাগ থেকে নায়িকা সুলতা চৌধুরীর একটা গুরুত্বপূর্ণ ডায়লগ শোনার   ব্যাঘাত ঘটায় ননীগোপালবাবু ভীষণ বিরক্ত হয়ে বললেন, ' একটু আস্তে কথা বলা হোক ... '
    ধমক খেয়ে অপ্রস্তুত হয়ে ওদিকের ভদ্রমহিলারা নিজেদের আলোচনা আপাতত চাপা রেখে বাধ্য ছাত্রীর মতো আবার টিভির পর্দায় মনোনিবেশ করলেন । 

        অভয়শঙ্কর মিত্র লেনে একটা বাড়িতে  একতলার একটা ঘরে টিভি বসেছে । ঘরে একটা মৃদু আলো জ্বলছে । মনে হচ্ছে একজন শুয়ে আছেন , অসুস্থ হয়ত । শুয়ে শুয়ে টিভি তে গীতমালা দেখছেন । জানলার বাইরে জনা দশেক লোক দাঁড়িয়ে গেল ।
    আম্রপালি ছবিতে বৈজন্তীমালা তুমুল নাচ নাচছে। 
    বাইরে এ ওকে ঠেলে ঠিকমতো জায়গা করে নেবার চেষ্টা করছে । একজনের পা পড়ে গেল আর একজনের পায়ে । সে মহা খাপ্পা হয়ে বলে উঠল , ' আরে ... কে রে শালা ... অন্ধ নাকি ! আমার পায়ে বলে কড়া আছে ... '
    সে লোকটা বলে উঠল, ' দাঁড়াতে জানে না ঠিকমতো ... আবার ডায়লগ মারছে ... '
    ---- ' তোমার কাছে শিখতে হবে নাকি ... ফালতু লোক ... '
    এদের খেয়ালই রইল না যে ঘরের ভিতরে খুব সম্ভবত একজন রুগী শুয়ে আছে ।
    জানলার বাইরে শোরগোল শুরু হওয়ায় একজন যুবক এসে এদের মুখের ওপর জানলা বন্ধ করে দিল । যে পা মাড়িয়েছিল সে মুখ ভেংচে তার প্রতিপক্ষকে বলল, ' হল তো এবার ... '
    দ্রুত জবাব আসল, ' কোথা থেকে যে আসে এসব ... ফালতু পাবলিক সব ... '
    ঝাঁকটা মুহুর্তের মধ্যে ভেঙে গিয়ে এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে পড়ল ।

         বেলা দুটো বাজে । বিডন স্ট্রিটে মিনার্ভার ওদিকে আর একটা একতলার ঘরের বাইরে ফুটপাথে এক ঝাঁক লোক  উঁকি ঝুঁকি মারার চেষ্টা করছে ঘরের ভিতরের টিভিতে । ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে টেস্টম্যাচ চলছে  ব্যাঙ্গালোরে । এইমাত্র বিশ্বনাথ আউট হয়ে গেল । ফুটপাথের ঝাঁকে সম্মিলিত হাহুতাশের একটা অস্ফূট শব্দ উঠল ।
         নেকটাই বাঁধা, টেরিলিনের সাদা জামা পরা, চোখে কালো চশমা লাগানো  স্মার্ট গোছের এক  ভদ্রলোক হাতে একটা অ্যাটাচি নিয়ে ওখান দিয়ে যাচ্ছিলেন । ওখানে ভিড় দেখে এক মিনিট দাঁড়িয়ে গেলেন । বাঙালীসুলভ অভ্যাসবশত একজনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ' স্কোর কত ? '
    যাকে জিজ্ঞাসা করা হল সে টিভি থেকে চোখ না সরিয়েই কোন কথা না বলে শুধু দুটো আঙুল তুলে দেখাল।  তাতে দু উইকেটও বোঝাতে পারে , আবার দুশো রানও বোঝাতে পারে । 
    স্মার্ট ভদ্রলোক কি বুঝলেন কে জানে । বললেন, ' অ ... ফাইন ... '  বলে সেন্ট্রাল এভিনিউয়ের দিকে এগিয়ে গেলেন ।
    ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বলল, ' মাঁকড়া শালা ... ব্যাটের কোনদিকে ল্যাজা , কোনদিকে মুড়ো জানে কিনা সন্দেহ ... বলে স্কোর কত ... '

         টি ভি অবশ্য আর একটা বাড়িতেও এল মাস দুই বাদে, অঘ্রাণ মাসে । মাণিকলাল চ্যাটার্জির বাড়ি । না মাণিকবাবু নিজে কেনেন নি । তার শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেছে এটা । তার দূর সম্পর্কের
    ভাই  করিতকর্মা লোক বলতে হবে । করে তো দেখাল । একজন ষাটোর্ধ্ব মানুষকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো তো সোজা কথা না । এ নিয়ে একটু বলতেই হবে ।

         ( চলবে )
    ********************************************
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু প্রতিক্রিয়া দিন