এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হেদুয়ার ধারে ( দ্বিতীয় খন্ড ) - ২২ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ৩০ নভেম্বর ২০২৪ | ৪৩২ বার পঠিত
  • ( ২২ )

    সুমনা নীচে নেমে এল। এসে দেখে চশমা পরা এক ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে আছে। কিছু না বলে একগাল হেসে সুমনার দিকে তাকিয়ে রইল।  
    সুমনা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলে উঠল, ' আরে, শর্মিষ্ঠা না ? কতদিন পর ... আয় আয় ... '
    শর্মিষ্ঠা উপরে উঠে এল। সুমনা তাকে নিয়ে  নিজের ঘরে গেল।
    ---- ' তারপর বল ... কেমন আছিস ? আমি এ বাড়িতে আছি জানলি কি করে ? ' 
    ----- ' জানতাম না ... এখানে এসেছিলাম তোর শ্বশুরবাড়ির ঠিকানাটা জানবার জন্য। তা, ঠিকানা জানতে এসে তোকেই পেয়ে গেলাম। বেথুনে পড়ার সময় একবার এসেছিলাম, মনে আছে তোর ? '
    ----- ' হ্যাঁ হ্যাঁ ... ভালরকম মনে আছে। একবার তোর বাড়িতে নোটস নিতে যাবার নাম করে আমি আর প্রতিবিম্ব সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম ... তারপর সে কি কান্ড ... হি হি হি ... '  
    দুজনেই  হাসতে লাগল।  
    ----' এই  ... মাসীমা ভাল আছেন তো ? ' 
    ------ ' হ্যাঁ হ্যাঁ, মা আগের মতোই আছে। এই,   তোরা তো দর্পণার পাশের গলিতে থাকতিস... '
    ----- ' হ্যাঁ, মোহনবাগান লেনে ... এখনও ওখানেই ... আমার শ্বশুরবাড়ি এন্টালিতে ... ' শর্মিষ্ঠা বলল।
    ----- ' ও আচ্ছা আচ্ছা ... ক' বছর বিয়ে হয়েছে রে তোর ? ' 
    ----- ' প্রায় ছ বছরের একটু বেশি ... '  
    ----- ' ও ... আমারও প্রায় তাই। বাচ্চা আছে ? '
    ----- ' হ্যাঁ ... দুটো বাচ্চা। মেয়ের বয়স পাঁচবছর। ছেলেটা তিন বছরে পড়ল ... '
    ----- ' ও ... আমারটা ওই  যে বারান্দায় সাইকেল চালাচ্ছে ... ' 
    ----- ' হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি ... ইশশ্ কিছু একটু আনতে পারলাম না ... জানতাম না তো ... ' 
    ----- ' আরে ছাড় তো ... ও ঠিক আছে ... '
    সুমনা লক্ষ করল শর্মিষ্ঠার মুখে যেন একটা মলিন আস্তরণ পড়েছে। মাথার সামনের দিককার চুল বেশ পাতলা লাগছে। আগে চোখে চশমা ছিল না। মোটা ফ্রেমের চশমা পরে শর্মিষ্ঠার মুখটা কেমন বদলে গেছে। শর্মিষ্ঠার বয়স যেন বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে এ ক' বছরেই  । 
    সুমনা খুব আন্তরিকভাবে বলল, ' তারপর বল ... কেমন আছিস ? ' 
    ----- ' ওই  আছি আর কি ... '
    বলে, চুপ করে গেল শর্মিষ্ঠা। হাতের তেলোয় হাত বোলাতে লাগল মাথা নীচু করে। মুখে একটা ম্লান ছায়া পড়েছে ... বেশিক্ষণ থাকব না ... বাচ্চা  দুটোকে জায়ের কাছে রেখে এসেছি ... '
    ----- ' ও ... তোদের কি জয়েন্ট ফ্যামিলি ? ' সুমনা জিজ্ঞাসা করল।  
    ---- ' হ্যাঁ ওই রকমই ... '
    ----- ' তুই কি কোন কাজে এসেছিলি এদিকে ? ' 
    ----- ' কাজ বলতে ... তোর সঙ্গে দেখা করতেই এসেছি ... মানে কাকুর সঙ্গে যদি একটু কথা বলা যায় ... কেমন আছেন কাকু ? '
    সুমনা শর্মিষ্ঠার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল।  
    ----- ' বাবার সঙ্গে নিশ্চয়ই কথা বলবি। আগে বলতো, তোর কি হয়েছে ? ' 
    ----- ' না ... মানে, কি বলব ... '
    ----- ' কি হয়েছে কি ? পার্সোনাল কিছু হলে অবশ্য ... '
    ----- ' পার্সোনাল হলেও তোকে বলতে অসুবিধে নেই।  আমার বরকে নিয়ে একটা সমস্যা ... '
    ----- ' ও আচ্ছা ... ', সুমনা তাকিয়ে আছে শর্মিষ্ঠার মুখের দিকে।  
    ----- ' ওই নেশা টেশার ব্যাপার কিছু ... তাই  তো ? '  ---- ' তার চেয়ে একটু বেশি কিছু ... এটাও অবশ্য একটা কড়া নেশা ... ' 
    ----- ' কিরকম ? '
    ----- কি আর বলব ... বলতেও খারাপ লাগে ... অনেক বাজে মেয়ের ওপর টান আছে ওর  ... মনে হয় বিয়ের আগে থেকেই ওর এই স্বভাব ছিল। আমার বুঝতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। বছর দুই হল ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি। কিভাবে বুঝলাম অত ডিটেলে এখন যেতে ইচ্ছে করছে না ... বিশ্রী লাগে বলতে ... ' 
    ----- ' না না ... ঠিক আছে। তারপর ... ' 
    ----- ' আগে ব্যাপারটা লুকিয়ে চুরিয়ে করত ... ধরা পড়ে যাবার পর একেবারে বেপরোয়া বেলাগাম হয়ে গেছে। অদ্ভুত লাগে, ওর আচার ব্যবহার দেখে। এ যেন এক সম্পূর্ণ নতুন মানুষ, যাকে আমি চিনিই না। শুধু তাই  না ... আমাকে যখন তখন থ্রেট করছে। মুখের ভাষাই পাল্টে গেছে ... আমার বাচ্চা দুটোর ওপর তার প্রচন্ড খারাপ প্রভাব পড়ছে। ওরা পরিষ্কার কিছু বুঝতে পারে না কিন্তু সবসময়ে যেন ভয়ে কুঁকড়ে থাকে। আমার শুধু কান্না পায়। কি যে করি ... আমার তো যাবার 
    জায়গাও তেমন নেই  ... এভাবে তো ছেলে মেয়ে সুদ্ধু বাপের বাড়ি গিয়ে ওঠা যায় না, তা'লে তো ঢি ঢি পড়ে যাবে ... বিশ্বজিত,  আমি শিয়োর সেটাই চাইছে। ওর নাম বিশ্বজিত। আমি না গেলে হয়ত শেষ পর্যন্ত আমাকে সরিয়েই দেবে দুনিয়া থেকে।  একেবারে মরিয়া ভাব ...  সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকি ... আমার বাচ্চাগুলোর কি হবে ? ' 
    এই পর্যন্ত বলে শর্মিষ্ঠা বোধহয় দম নেবার জন্য একটু থামল। সে মানসিক চাপে হাঁফিয়ে গেছে ভীষণভাবে।  । 
    সুমনা বুকে একটা চাপা ব্যথা নিয়ে চুপচাপ তাকিয়ে ছিল শর্মিষ্ঠার মুখের দিকে।  
    এবার বলল, ' ঠিক আছে ঠিক আছে ... আর বলতে হবে না ... বুঝতে পেরেছি ... ' 
    বলে আবার কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকল সুমনা।  
    তারপর ধীর স্বরে বলল, ' তুই এখন কি করতে চাইছিস ? '  
    ---- ' অ্যাকচুয়ালি আমার কি করা উচিত সেটাই আমি বুঝতে পারছি না ... যদি কোন লিগ্যাল অ্যাডভাইস পাওয়া যায় এ ব্যাপারে ... ' 
    ---- ' দেখ ... লিগ্যাল অ্যাডভাইস তুই  পেতেই  পারিস, অসুবিধা হবে না। বাপি তোকে কি অ্যাডভাইস দেবে জানি না। কিন্তু অপোনেন্টও তো অত সহজে জায়গা ছেড়ে দেবে না। তারাও লড়তে থাকবে নানান ফলস মেটিরিয়াল প্রেজেন্ট করে, খোরপোশ এড়াবার জন্য। কাজেই  মামলা চলবে দীর্ঘ কাল ধরে। তাতে তোর শরীর ও মন আরও বিধ্বস্ত হবে। তাছাড়া তোর বাচ্চারা আছে ... তারাও তো কষ্টের শিকার হবে ... মানে, আমি যেটুকু বুঝি তাই বললাম আর কি ... এতে কারও কিছু করার নেই, সে যত কম্পিটেন্ট লইয়ারই হোক। আমাদের জুডিশিয়াল সিস্টেমই এরকম। '
    শর্মিষ্ঠা মন দিয়ে শুনছিল সুমনার কথা।  
    সে বলল, ' তুই  তা'লে কি সাজেস্ট করিস ? ' 
    ----- ' না... আমি বলছি যে, এ ব্যাপারটার একটা চট জলদি সমাধান দরকার ... প্রোলঙ্গড প্রসেসের মধ্যে দিয়ে গেলেও এর সমাধান হতে পারে কিন্তু তখন হয়ত আমরা বেঁচে নাও থাকতে পারি। দুঃখের ব্যাপার হলেও এটাই ফ্যাক্ট ... ' 
    ---- ' কিন্তু তাড়াতাড়ি সমাধানের রাস্তাটা কি সুমনা ? ' 
    ----- ' একজনের সঙ্গে তোকে মিট করিয়ে দেব। তুই  বাপির অ্যাডভাইস নে, অসুবিধে নেই। কিন্তু এনার হেল্প নিলে তুই  কুইক সলিউশান পাবি বলে আমার বিশ্বাস। আমার মনে হয় আসল ব্যবস্থাটা উনিই নিতে পারবেন, আমাদের কনভেনশনাল বিচার ব্যবস্থা নয় ... '
    শর্মিষ্ঠা একটু অধৈর্য হয়ে পড়ল।    
    ----- ' সে তো বুঝলাম ... কিন্তু কে তিনি ... কিভাবেই বা তার সঙ্গে দেখা হবে ? আর কবেই  বা দেখা হবে ? খুব বেশি ফিস হলে তো ... '
    ----- ' হ্যাঁ, ফি টা একটু বেশি। সবাই দিতে পারে না ... সম্মান আর শ্রদ্ধা ... '
    ----- ' সে আবার কি ! '
    ----- ' সেটা জানার জন্য তাড়াহুড়োর কিছু নেই। জেনে যাবি। কিন্তু তার আগে তাকে খুঁজে বার করতে হবে ... '
    শুনে শর্মিষ্ঠা বেশ হতাশ হল।
    বলল, ' ওঃ ... তার হদিশ জানা নেই  ... এ তো খুব মুশ্কিল দেখছি ... '
    ------ ' না না মুশ্কিলের কিছু নেই  । পটলের দোকানে গেলেই হদিশ পাওয়া যাবে ... ' 

    ( চলবে ) 
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে প্রতিক্রিয়া দিন