ছবি: রমিত
লন্ডনে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন
আমাদের বাড়িতে গানের আসর
অনু গান ভালবাসে। নিজেও সুগায়িকা। সুযোগ পেলেই বাড়িতে গানের আসরের ব্যবস্থা করত। বছরে গড়ে প্রায় সাত/আটটা বড় আসর বসত। তাছাড়া ছোট মাঝারি অজস্র সন্ধ্যা ও মধ্য রাত্রি কেটেছে গানের সুরে ও বাদ্য যন্ত্রের ঝঙ্কারে। এ সবের কিছু কথা আমি পরে আরও বলেছি।
তবে প্রথম আসরটা আমাদের গর্বের এবং চিরস্মরণীয়।
১৯৮০ সালে আমরা হ্যারোতে ৯ নর্থউইক এভেন্যুর বাড়িতে উঠে আসি। এ বাড়িতে আসার পর থেকেই প্রধানত অনুর উদ্যোগেই আমাদের বাড়িতে গান বাজনার আসর শুরু হয়। তারপর প্রায় ২০১২ সাল পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে নিয়মিত গানের আসর বসত। ভারতবর্ষের ও লন্ডনের বহু শিল্পী সেই আসর অলংকৃত করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আসর যেদিন কিংবদন্তি রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের বাড়িতে গান গেয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন গোরা সর্বাধিকারী। সেদিনের আসরে অনেক অতিথি ছিল আমাদের বাড়িতে। প্রায় পঞ্চাশ-ষাট জন শ্রোতা হয়েছিল। বাড়িতে কোথাও এতটুকু শূন্যস্থান ছিল না– লাউঞ্জ ভরে গিয়ে শ্রোতারা করিডোর, সিঁড়ি, রান্নাঘরে বসে বা দাঁড়িয়ে কণিকার গান উপভোগ করেছিল। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বা মোহরদি, অনেকক্ষণ গাইলেন- নিজের মনোমত গান, শ্রোতাদের অনুরোধের গান। বেশ কিছু গান গাওয়ার পর থামলেন, হারমোনিয়ামটা বন্ধ করলেন। আমার বহু প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীতের মধ্যে একটি হল,
“লক্ষ্মী যখন আসবে তখন কোথায় তারে দিবি রে ঠাঁই।
দেখ রে চেয়ে আপন পানে পদ্মটি নাই, পদ্মটি নাই।।”
আমার অনেক দিনের ইচ্ছা যদি কখন সুযোগ হয় তবে এই গানটা সামনে বসে মোহরদির কণ্ঠে শুনব। এই সেই সুযোগ। আমি খুব মৃদু স্বরে বললাম, “লক্ষ্মী যখন আসবে ... ।” মোহরদি আমার কথা শুনতে পেলেন। বললেন, “অমলেন্দু যখন বলছে তখন তো গাইতে হবেই।” বলে হারমোনিয়ামটা খুললেন, শুরু করলেন- “লক্ষ্মী যখন আসবে ...।” আমি ধন্য হলাম। আমার মন ভরে গেল।
অমলেন্দু, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরুন্ধতী– লন্ডন, ৯ নর্থইউক আভেন্যু, হ্যারো। ৭ জুন ১৯৮০
গোরা সর্বাধিকারী ও কণিকা বন্দ্যোপাধায়। সামনে অরুন্ধতী বিশ্বাস ও অন্যান্যরা
মোহরদি ও গোরা সর্বাধিকারীকে আপ্যায়ন, অনু পরিবেশন করছে।
মোহরদি, গানের আসরের পর। হ্যারোর বাড়িতে আড্ডা। ৭ জুন ১৯৮০।
গোরা সর্বাধিকারী, জয়তী বানার্জি, নিশীথ গাঙ্গুলী, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুন্ধতী বিশ্বাস
৯ নর্থউইক আভেন্যু, হ্যারো। ৭ জুন ১৯৮০
খ্যাতনামা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সুবিনয় রায় আমাদের বাড়িতে গান গাইতে এসেছিলেন দুবার। প্রথমবার সস্ত্রীক ১৯৮১ সালে। দ্বিতীয়বার সপুত্রক ১৯৮৪ সালে। তিনি বলেছিলেন আমাদের বাড়িতে গান গেয়ে তিনি আনন্দ পান সেজন্যই তিনি লন্ডনে যখনই আসেন তখনই তিনি আমাদের বাড়িতে গান করেন। তাঁর সৌজন্যে আমরাও আনন্দিত।
অমলেন্দু, সুবিনয় রায়, অরুন্ধতী, সুবিনয় জায়া।
সুবিনয় রায় গাইছেন, ৯ নর্থইউক এভেন্যুর বাড়িতে, ১৯৮১
সুবিনয় রায়কে আপ্যায়ন। অরুন্ধতী, সুবিনয় রায়, প্রতিমা গুহ ( অনুর বন্ধু )
আমাদের বাড়ির সঙ্গীত আসরে আরও একজনের নাম মনে পড়ছে যার গান আমার খুব ভালো লাগত। তিনি স্বপন গুপ্ত।
স্বপন গুপ্ত গাইছেন, ৯ নর্থউইক এভেন্যুর বাড়িতে
দীর্ঘ ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছরে আমাদের বাড়িতে অনেক খ্যাত ও গুণী, ভারতবর্ষ থেকে আগত ও স্থানীয় বহু শিল্পী এসেছেন এবং গান গেয়েছেন। এঁদের তালিকা দীর্ঘ। সকলের নাম নেই এই লেখায়। নিয়মিত গানের আসর বন্ধ হয়ে গেলেও মাঝে মাঝে হঠাৎই কোন শিল্পী আমদের বাড়ি এসেছেন এবং হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে বসেছেন। এর মধ্যে একজনের নাম উল্লেখ করি যিনি আমদের জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে দেখা দিয়েছিলেন এবং অল্প দিনের মধ্যেই আমাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে পড়েছিলেন। তিনি শিল্পী সৌম্যেন অধিকারী। ইনি অনু গত হওয়ার পর অনুর গানের রেকর্ড করে ইউটিউবে প্রকাশ করেছেন। ইনি আমার রচিত কিছু গানেও সুরারোপ করে ইউটিউবে প্রকাশ করেছেন।
একবার এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিল। লক্ষ হাজার বছরেও এমন ঘটনা ঘটে না বা ভবিষ্যতেও ঘটবে কিনা সন্দেহ আছে। আমার ভাই নির্মলেন্দু (হাঁদি) আর ওর স্ত্রী স্বপ্না তখন লন্ডনে এসেছে বেড়াতে। হাঁদি-স্বপ্না লন্ডনে, আমরা একসঙ্গে আছি --- ভাবতেও পারছি না। একদা ভারতবর্ষে আমাদের নিজস্ব থাকার জায়গা ছিল না। সেই আমি, আমরা দুই ভাই সস্ত্রীক লন্ডনে নিজের বাড়িতে। দিনগুলো যে কি আনন্দে কেটেছিল! একদিন সকালে সকলে মিলে প্রাতঃরাশ করছি। আমি সাধারণতঃ সকালে এবং রাত্রে খাওয়ার সময় একটা গান বা বাজনা চালিয়ে দিই আমার হাই-ফাই শব্দযন্ত্রে, বিশেষ করে বাড়িতে অতিথি থাকলে। সেদিনও তার ব্যাতিক্রম হয় নি। আমি একটা সরোদের রেকর্ড বাজাচ্ছিলাম। আমরা বাজনা শুনতে শুনতে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে গল্প করছিলাম। হঠাৎ দরজার ঘণ্টিটা বেজে উঠল। আমি গিয়ে দরজা খুলে দিলাম। সামনে এক অপরিচিত ভদ্রলোক। আমি কিছু জিগ্যেস করার আগেই তিনি বললেন, “আমি বাইরে থেকে শুনলাম এই বাড়ি থেকে আমার বাজনার আওয়াজ ভেসে আসছে। কৌতুহল হল, আমার বাজনার সমঝদারের সঙ্গে আলাপ করার লোভ সামলাতে পারলাম না। কিছু মনে করলেন না তো?”
আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম! এমন ঘটনা ঘটতে পারে? আমি তখন ওয়াজাহাত খানের সরোদ বাজাচ্ছিলাম।
খান সাহেব স্বয়ং আমার দরজায় আমার সামনে দাঁড়িয়ে। অকল্পনীয়! আমি তো অন্য কোন রেকর্ড বাজাতে পারতাম। খান সাহেবই বা ঠিক ঐ সময়ে আমার বাড়ির সামনে গাড়ী পার্ক করবেন কেন? কাকতালীয়? কিন্তু আশ্চর্য কাকতালীয়! আমি অভিভূত হয়ে খান সাহেবকে আমাদের সঙ্গে চায়ে যোগ দিতে আমন্ত্রণ করলাম। খান সাহেব বললেন গাড়ীতে ওঁর স্ত্রী বসে আছেন। আমি বললাম “দয়া করে ওঁকে নিয়ে আসুন।” খান সাহেব ওঁর স্ত্রীকে নিয়ে এলেন। আমাদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। অতি ভদ্র সুন্দরী মহিলা। সকলে মিলে চায়ের সঙ্গে আড্ডা জমে উঠল। তবে ওঁরা বেশিক্ষণ বসতে পারেন নি, সময় ছিল না। সেদিনের মত অত মনোরম চা আমি জীবনে কখনো পান করিনি। অবিস্মরণীয় সকাল।
ওয়াজাহাত খান
যাবার আগে উনি বললেন, “আপনার রেকর্ডটা দিন।” আমি সিডিটা এগিয়ে দিলাম। সিডিটা নিয়ে তাতে আমাদের নাম লিখে সই করে দিলেন।
লিখলেন, To dear Mr Amalendu & Mrs Arundhati
For a very happy musical life ----
(signature) Wajahat Khan
লন্ডনে কলকাতার বইমেলা
বন্ধু ভাস্কর দত্ত আনন্দবাজার পত্রিকার বাদল বোসের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। একদিন এক আড্ডায় বাদল বোস আমাকে বলল কলকাতার পাব্লিশার্স গিল্ড লন্ডনে বই মেলার আয়োজন করছে। আমি যদি ওদের বইগুলো আমার বাড়িতে রাখতে দিই তাহলে ওদের খুব উপকার হয়। আমি সানন্দে রাজী হলাম। যথাসময়ে বেশ কয়েক বাক্স বই আমার বাড়িতে এসে হাজির। এর কিছুদিন বাদে কলকাতা থেকে গিল্ডদের পক্ষ থেকে অনিল আচার্য্য ও শ্রীবিন্দু এলো লন্ডনে। ক্যামডেন টাউন হলে পূজা মণ্ডপে বই সাজানো হল। আমি ও অনু প্রতিদিন সব বইয়ের বাক্স আর অনিল ও শ্রীবিন্দুকে নিয়ে গাড়ী করে ক্যামডেন টাউন হলে যেতাম। গাড়ী থেকে বাক্স বাক্স বই নিয়ে টেবিলে সাজানো সবই আমাদের নিজে হাতে করতে হত। লন্ডনে কুলি মজুর বা কোন সাহায্যের লোক পাওয়া যেত না। তারপর টেবিলে বসতাম ও বই বিক্রি করতাম।
পুজোর সব দিন আমরা বই নিয়ে বসতাম এবং অনু ও আমি যথাসাধ্য সাহায্য করতাম। কদিন প্রায় সবসময় একসঙ্গে থাকার জন্য আমাদের মধ্যে একটা ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এখনও কলকাতা বই মেলাতে গেলে অনুষ্টুপের স্টলে গিয়ে অনিলের সঙ্গে দেখা করতে ভুলি না। এক কাপ চায়ের সঙ্গে পুরানো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করি।
ক্যামডেন টাউন হলে বই মেলা। (বসে) অনিল আচার্য্য, অরুন্ধতী, শ্রীবিন্দু।
(বসে) গোলাম মুরশিদ, শ্রীবিন্দু, বাদল বোস, ভাস্কর দত্ত। (দাঁড়িয়ে) অনিল আচার্য্য, অমলেন্দু বিশ্বাস।
৯ নর্থউইক এভেন্যুর বাড়িতে।
পরিবেশ
আমাদের বাড়ির পরিবেশ কেমন ছিল তার একটা আভাষ পাওয়া যাবে আমাদের এক অতিথি স্বাতী সান্যালের চিঠি থেকে। অনুরাধা পাল চৌধুরী আমাদের বন্ধু। অনুরাধা ও ডঃ বিষ্ণুপদ পাল চৌধুরী অতি বিদগ্ধ পরিবার– অরিন্দম এঁদের বন্ধু ও গুণগ্রাহী। অরিন্দম সূত্রে ওঁদের সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়েছিল। কার্ডিফ ইউনিভার্সিটিতে আমার পুত্র গৌতম যখন পড়ত তখন আমরা কার্ডিফে ওদের বাড়ি প্রায়ই যেতাম। কিন্তু যেমন হয়, যথারীতি অনুর সঙ্গেই অনুরাধার বন্ধুত্ব বেশী। ওর সঙ্গেই অনুরাধার যোগাযোগ, কথাবার্তা। একদিন অনুরাধা অনুকে ফোন করে বলল, “আমার এক বন্ধু এসেছে কলকাতা থেকে, নাম স্বাতী সান্যাল। স্বাতী খুব ভাল দ্বিজেন্দ্রগীতি গায়, কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের শিষ্যা। তুমিও দ্বিজেন্দ্রগীতি গাও। তাই ও তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়।” অনু তো প্রস্তাবটা শুনে লুফে নিল। স্বাতী আমাদের বাড়ি এলো। সারাদিন ধরে স্বাতী আর অনু একের পর এক ডি এল রায়ের গান গাইল। স্বাতী, কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের হাতে গড়া। খুবই ভাল দ্বিজেন্দ্রগীতি গায়। আমি শুধুই শ্রোতা। মাঝে মাঝে দু-চারটে কথাবার্তা হচ্ছিল। অনুর গান শুনে স্বাতী বলল, অনু কৃষ্ণার কাছে গান শিখেছে কিনা। অনু ‘না’ বলাতে স্বাতী একটু অবাক হল। মনে আছে স্বাতী বলেছিল, “তুমি একেবারে কৃষ্ণাদির মত গাও।” সেদিনটা আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। কলকাতায় ফিরে গিয়ে স্বাতী একটা চিঠি লিখেছিল অনুকে। সেই চিঠির কিছু অংশ নীচে দিলাম। সম্পূর্ণ চিঠিটা এর পর আছে।
“ তুমি তো সব কথাই অতিশয়োক্তি বলে মনে কর, কিন্তু বিশ্বাস কর হৃদয়ের অন্তঃস্থলের অনুভূতি থেকেই কথাগুলি লিখছি। সত্যিই, তোমার ও দাদার উষ্ণ ও আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহার ও আতিথিয়তা! তোমার কন্ঠে আমার মনের মতো গান! তোমার হাতের অপূর্ব রান্না! আর দাদার বৈদগ্ধ্য, মননশীলতা আর সুরুচিসম্পন্ন মনের যে পরিচয় পেয়েছি! সত্যিই বিশ্বাস করো সবকিছুই মনের গভীরে বিশেষভাবে গেঁথে আছে।...
ভাবতে অবাক লাগে যে, আমি ঠিক যে ধরনের গান গাই তুমিও ঠিক সেই ধরনের গান গাও বা ভালোবাস, আমরা যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বড় হয়েছি তোমাদের বাড়িতেও দেখলাম ঠিক সেই রকমই পরিবেশ।“
আমাদের বাড়িতে প্রথম-আসা এক অতিথি, পরে অনুর বন্ধু, স্বাতী সান্যালের চিঠি :
প্রিয়,
অরুন্ধতী দি (বয়োজ্যেষ্ঠ হলেও প্রিয় ছাড়া আর কোন সম্বোধনই প্রযোজ্য নয় বলে মনে হলো) অবশেষে তোমার জন্য লেখনী ধরতে পারলাম। দেখো, তোমাদের ওখানে দেখে এলাম যে প্রত্যেকের জীবনের ‘গতি’ আছে কিন্তু আমাদের মত জীবন এত সমস্যাবহুল নয়, তাই চিঠি দিতে এত বিলম্ব। অবশ্য এত বিলম্ব বললে কিছুটা Lame Excuse দেওয়ার মতো মনে হবে। কিন্তু বিশ্বাস করো আমার স্কুল বাসস্থান থেকে এত দূরে আর প্রতিদিন যানবাহনের ও রাস্তাঘাটের সমস্যা ছাড়াও তুমি তো আমার পারিবারিক কিছু অসুবিধার কথাও জানো যা তোমাকে মন উজাড় করে বলেছি, যা শুধু ‘আপনজনকেই’ বলা যায়। তাই এত চিঠি দিতে দেরি হল। অন্য কিছু ভেবনা, সত্যই অরুন্ধতীদি! বিদেশে গিয়ে তোমাদের এত আপনজন বলে মনে হয়েছে, বুঝাতে পারব না। তুমি তো সব কথাই অতিশয়োক্তি বলে মনে কর, কিন্তু বিশ্বাস কর হৃদয়ের অন্তস্তলের অনুভূতি থেকেই কথাগুলি লিখছি। সত্যিই, তোমার ও দাদার উষ্ণ ও আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহার ও আতিথিয়তা! তোমার কন্ঠে আমার মনের মতো গান! তোমার হাতের অপূর্ব রান্না! আর দাদার বৈদগ্ধ্য, মননশীলতা আর সুরুচিসম্পন্ন মনের যে পরিচয় পেয়েছি! সত্যিই বিশ্বাস করো সবকিছুই মনের গভীরে বিশেষভাবে গেঁথে আছে। বিদেশে যে তোমাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম মনে হল যেন নিজের দিদির বাড়িতেই এসেছি। দেখো অনুরাধাদির কথা আলাদা, ছোটবেলা থেকে আমাদের সম্পর্ক। কিন্তু এই ‘অদৃষ্টপূর্ব দিদি’ যে এত ভালোবাসার ডালি সাজিয়ে আমার জন্য বসে ছিলেন, এটা জীবনের একটা পরম প্রাপ্তি। রক্তের সম্পর্কে বলে যে একটা কথা প্রচলিত আছে সেটা কিন্তু সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বিশেষ করে আমার জীবনে এরকম দুর্লভ দু একজনের ভালোবাসা যা পেয়েছি তা তোমাদের মত মানুষের কাছ থেকেই। বিশ্বাস কর যেদিন তুমি আমাকে তুলে দিতে এসেছিলে, সেদিন তো তোমার খুব পায়ে ব্যথা ছিল তা সত্ত্বেও তুমি যে বাস না ছাড়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিলে এবং যখন বাস ছাড়ল তুমি এমন ব্যাকুল ভাবে হাত নাড়াচ্ছিলে যে একান্ত আপন ছাড়া আর কারো কাছে পাওয়া যায় না। মনটা কানায় কানায় ভরে উঠেছিল, চোখে জল এসে গিয়েছিল। এ কথা অনুরাধাদিকেও বলিনি, এই অনুভূতি আমারই তোলা থাক।
দাদাকে বল ওঁনার কবিতাগুলি এখানে এসে মনোযোগ দিয়ে পড়লাম-- সহজবোধ্য এবং মনের গভীরে ছুঁয়ে যায়। আমার পরিচিত মহলেও বিশেষ করে আমার ভাইকে যে কবিতা পড়তে ভালোবাসে এবং বোঝে তাদেরকেও পড়িয়েছি। সবারই প্রায় একই রকম অভিমত। ভাবতে অবাক লাগে যে, আমি ঠিক যে ধরনের গান গাই তুমিও ঠিক সেই ধরনের গান গাও বা ভালোবাস, আমরা যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বড় হয়েছি তোমাদের বাড়িতেও দেখলাম ঠিক সেই রকমই পরিবেশ। এটা যেন ঈশ্বরের আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। প্রথম যখন তোমাদের বাড়িতে যাওয়ার কথা হলো তখন একটু সংকোচ লাগছিল যে, একেবারেই চিনি না জানি না, ওঁনারা আমাকে কিভাবে গ্রহণ করবেন। কিন্তু গিয়ে মনে হল ---
‘যেন পেরিয়ে এলেম অন্তবিহীন পথ, আসিতে তোমার দ্বারে ...
মরুতীর হ’তে সুধা শ্যামলিম পারে।‘
অনুরাধাদাদির আরো সব বন্ধুর বাড়িতেও তো গিয়েছি -- ওঁনারাও অত্যন্ত আদর যত্ন করেছিলেন কিন্তু তোমার আর দাদার হৃদয়ের যে উষ্ণতা পেয়েছি সেটি আর কোথাও পায়নি।
যাইহোক, তুমি নিশ্চয়ই দারুন দারুন রান্না করে ভালো ভালো বই পড়ে আর ভালো ভালো গান শুনে দিন কাটাচ্ছো? তোমার হাতের ধনেপাতা দেওয়া চিকেন মুখে লেগে আছে।
তোমাদের সাথে কবে দেখা হবে তাই ভাবছি। আর তোমাকে শুধু একটা অনুরোধ করছি যে আমি যে কথাগুলি লিখলাম সেগুলোকে ‘অতিশয়োক্তি’ বা ‘অতিকথন’ ভেবে আমার ভালোলাগার অনুভূতিকে ছোট করে দিও না। তোমার মনে হয়েছে কিনা জানিনা তবে আমি উপলব্ধি করেছি যে তোমার ও আমার মনের সাথে একটা বিনি সুতোর মালা গাঁথা হয়ে গেছে। যদি আর কোনদিনও দেখা না হয় তবুও সে বন্ধন থাকবে অটুট।
যাকগে, অনেক হয়তো অপ্রয়োজনীয় কথা লিখলাম, ছোট বোনের কথা ভেবে একটু সময় খরচ করে পড়ে নিও। এই বলে শেষ করি যে আমি তোমাদের গান শুনিয়ে কতটা আনন্দ দিতে পেরেছি জানিনা তবে এ কথা বলতে পারি—‘দিয়েছি যত পেয়েছি তার বেশী’। তোমরা আমার প্রণাম, ভালবাসা ও শুভেচ্ছা নিও। ছোটদের জন্য রইল স্নেহ ও ভালোবাসা।
স্বাতী (সান্যাল)
* এলেই যেন খবর পাই।
ক্রমশঃ