আমার অর্ন্তদ্বন্দটা আরো দুঃসহ হয়ে উঠেছে আমার Profession-র সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পেরে। নির্মম ভাবে বুঝতে পারছি যে মেশিনের সঙ্গে আমার মনের কোনো যোগ নেই, তাই চেষ্টা করেও তার সঙ্গে মিতালি করতে পারছি না কোনমতেই। আমার শিক্ষা, আমার রুচি, আমার মানসিক গঠন বা চর্চিত মনের সঙ্গে আমার সহকর্মীদের এতটুকু মিল নেই। এত অমিল সত্ত্বেও আমি কি করে এদের সঙ্গে মানিয়ে নেব। তবু সুনীল হালদারের মত ব্যতিক্রমও আছে। মেশিনে কাজ করতে করতে গুনগুন করে মালতী ঘোষালের রবীন্দ্র সংগীত গাইতো---" যদি এ আমার হৃদয়-দুয়ার বন্ধ রহে গো কভু / দ্বার ভেঙ্গে তুমি এসো মোর প্রাণে, ফিরিয়া যেও না প্রভু।“
এই মরুভূমিতে হালদার আমার মরুদ্যান। সময় পেলে ওর সঙ্গে বসে রবীন্দ্র সঙ্গীত ও রবীন্দ্রচর্চা করতাম। … কোনো মানুষকে আমি অশ্রদ্ধা করিনা। বরং আমি জানি তথাকথিত উপরতলার মানুষগুলোর থেকে এদের মধ্যে মনুষ্যত্বের অংশ বেশী। এই মানুষগুলো স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রত্যেকেই কৃতি ও দক্ষ। এরা মুখ্যতঃ টাকা আর মেশিন ছাড়া আর কিছু জানে না। এদের কাছে পৃথিবীর অন্য কিছুর অস্তিত্ব সপ্রমাণ করতে গেলে এরা বাঁকা হাসি হেসে এমন ভাবে তাকায় যেন মনে হয় আমি একটা নির্বোধ, এখনো সার বস্তু জানতে পারিনি বলে কৃপার যোগ্য। বুঝি পৃথিবী জুড়ে এই দারুন অর্থনৈতিক বৈষম্যের যুগে শিক্ষা, রুচি,সংস্কৃতি --- এগুলো শুধু কথার কথা, প্রহসনের নামান্তর। কিন্তু তবুও আমি বুঝতে পারছি না। প্রতি মুহূর্তে আমি চেষ্টা করছি এই অমিলটাকে মানিয়ে নিতে আর প্রতি মুহূর্তেই হারছি। ভয় হচ্ছে ক্রমশঃ এই হারটা আমার চরিত্রের উপর একটা কুৎসিত স্ফোটক হয়ে দেখা দেবে। হয়ত সিনিক হয়ে যাব, মানুষের উপর শ্রদ্ধা ভালবাসা হারাব, নির্লজ্জ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে সুরুচি সবকিছু বর্জন করব। হয়ত এমন কিছু হব যা এখন অকল্পনীয় তখন অনিবার্য।
তবে কি মেনেই নেব এই আমার পরিনতি। এমনি অলস বিলাপ ছাড়া আমার কোনো শক্তি নেই। আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছি !
অনেকদিন লিখিনি, বলা ভাল লেখা হয়ে ওঠেনি আর, কেননা সময় পাই না। প্রায় এক বছর কলম ধরিনি, আমার বন্ধু গৌতমের পত্রিকার জন্য একটা গল্প লেখা ছাড়া। এই এক বছরে অনেক কিছু ঘটেছে এবং স্বাভাবিকভাবেই আমার জীবনে কতগুলো পরিবর্তন হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো যে বসিরহাটের বাড়িটা হারানো। এই বাড়ি থেকে উদচ্ছেদ হয়ে যাওয়া । একমাত্র স্থায়ী ঠিকানা; সত্যিই ভাবতে আশ্চর্য লাগছে যেখানে আবাল্য জীবনের এতগুলো বছর কাটালাম, লুপ্ত কৌলিন্যের শেষ পরিচয় এবং একমাত্র স্থায়ী ঠিকানা সেটাও হারালাম । টাকা নেই যেহেতু টাকা দিতে পারা গেল না বাড়িটা দিতে হল তাই।
বাবার জন্য দুঃখ হয়। এক আদর্শ স্বামী কর্তব্যপরায়ণ পিতা এবং সৎ সামাজিক ভদ্রলোক চোখের সামনে দেখছে তার সাধের সংসার আস্তে আস্তে অভাব ও চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে শক্তিহীন হচ্ছে। কোনক্রমে বেঁচে আছে, এতোটুকু অতিরঞ্জিত না করে বলা যায় বাবার জন্য দুঃখ হয়, সহানুভূতি জাগে, অন্যভাবে বলতে গেলে করুণা করার দুর্বলতা আসে। যুদ্ধ করতে করতে বাবা যেন মাঝ পথে হাল ছেড়ে দিয়ে আত্মসমর্পণ করলেন, যেটা আমার কাছে কেমন যেন অপৌরষেয় লাগে যা বাবার চরিত্রের সঙ্গে মেলেনা। অসুখ ও দ্রুত পটপরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া ছাপ ফেলেছিল তাঁর মস্তিস্কে ও চিন্তায়। বাবা যেন সর্বশক্তিরহিত। বাবা যেন অসহায়; চিন্তা করার সব শক্তি হারিয়েছেন। নইলে অমন ব্যাক্তিত্ব, অমন আত্মবিশ্বাসী পুরুষ কেমন করে এই বিপর্যয়কে মেনে নিলো, যা যে কোন সুস্থ মস্তিকের মানুষ অল্প আয়াসে রোধ করতে পারত। সংসারে যেহেতু আমি একমাত্র আয়ক্ষম পুরুষ সুতরাং বহন করার দায়িত্ব কর্তব্য হিসেবে আমারই। কিন্তু আমার কোন সামর্থ্য ছিল না। তখন আমি নিতান্তই ছাত্র।
এখন সামান্য উপার্জন শুরু করেছি। কর্তব্যের খাতিরে কর্তব্য করছি। খুশি হয়ে কর্তব্য করার মত মানসিক বোধ ক্রমেই লোপ পাচ্ছে। সাংসারিক ক্ষুদ্রতা প্রায়ই পেয়ে বসে। নিজেকে আলাদা করে, এককভাবে ভাবতে ইচ্ছে করে।
মাঝে মাঝে মনে হয় যেন আমার সঙ্গে কারো কোন সম্বন্ধ নেই। শুধু অল্প চেনা দুস্থ একটা পরিবারকে সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করি, না ভুল হল শুধু যদি সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করলেই রেহাই পাওয়া যেত তাহলে হয়তো ক্ষোভের কারণ থাকত না। কেননা তেমন অবস্থার জন্য আমার মানসিক প্রস্তুতি আছে কিন্তু ইদানিং যে পরিমাণ অর্থ সাহায্যের তাগিদ আসছে তার জন্য সম্ভাব্য সকল রকম ব্যয় সংকোচ করেও তার চাহিদা মিটছে না। ঋণ নিতে বাধ্য হতে হচ্ছে। নিজের উপার্জিত অর্থে পড়াশোনা করার স্বাধীনতা নেই। ভাবছি আরো পড়বো। কিন্তু তার জন্য কমপক্ষেও যে টাকা প্রয়োজন সেটা খরচ করতে পারবো না। আমার ভবিষ্যতের চেয়েও আমার কর্তব্য বড়। উপায় কি, এটাই আমার সান্ত্বনা।
একটা নতুন চাকরি পেলাম; আমেরিকান রেফ্রিজারেটর ছেড়ে ইন্ডিয়া ফয়েলস । এছাড়াও একটা টিউশনি করছি। সপ্তাহে তিন দিন, দক্ষিণা ২৫ টাকা। কিন্তু এইসব টাকাতে অভাব মটে নি। যতদিন বাবা মা ভাই বোনের সমস্ত দায়িত্ব আমারই থাকবে ততদিন ৫০০ টাকাতেও ঘুজবে না জানি। নিজের খুশি মত একটা টাকাও খরচ করতে পারবো না।
উফ, গত চার বছর যেন দুঃস্বপ্নের মত দিয়েছে। কি দারুণ হতাশার মধ্যে দিন কাটিয়েছি। কোথাও কোনো রকম আশা ছিল না। কখনো কখনো মনে হতো আমাকে এই বোঝাই সারা জীবন টানতে হবে। এমনি ভাবেই কাটাতে হবে, এমনি দারিদ্র্য, এমনি হতাশার মধ্যে । এখন যে খুব একটা আর্থিক স্বাচ্ছ্যলে আছি তা নয় । তবে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছি অনেকখানি।
যেহেতু জীবনকে আমি মেনে নিয়েছি তার সমস্ত হাসি কান্না প্রেম পরাজয় সমেত; সেহেতু জীবন যুদ্ধকেও আমি মেনে নিয়েছি তার হার জিতের সমস্ত সম্ভাবনা নিয়েই। কোন কোন দুর্বল মুহূর্তে আমি যে হতাশ হয়েছি এ কথা হয়তো সত্যি কিন্তু আমার কাজে কথায় বা চিন্তায় কখনো কোথাও এমন কোনো নজির নেই যে আমি সেই যুদ্ধে ভয় পেয়েছি। আমি জানি আমি বীরের মতো যুদ্ধ করব এবং আমার সেই বীরত্বে আমার বিশ্বাস ও ধারণামত কণামাত্র মিথ্যা নেই। আমার জীবনে যেমন Repentance is a sin তেমনি কর্মে আমার একমাত্র ইষ্ট মন্ত্র – ‘ভালো মন্দ যাহাই আসুক সত্যরে লহ সহজে’।
আমি কর্মে ও চিন্তায় মনেপ্রাণে সৎ হতে চাই । যাকে বুদ্ধি দিয়ে যুক্তি দিয়ে মানতে পারিনা তাকে কর্ম দিয়ে স্বীকার করতে চাই না। নিজের কাছে নিজে স্পষ্ট থাকতে চাই। আমাদের সংসারে তখন ঘোরতর বিপর্যয়। বাবা জীবন যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত, রোগে শয্যাশায়ী । শুধু পাশে এক নারী, সে আমার মা, যে এই দারুণ দুর্যোগে দিশাহারা হয়নি। দক্ষ নাবিকের মত স্থির বুদ্ধিতে এই দুরন্ত আবহাওয়াতে প্রায় ভেঙ্গে যাওয়া নৌকাটাকে আস্তে আস্তে কুশলী হাতে ভাসিয়ে রেখেছে। একটুও ভয় পায়নি, ভেঙে পড়েনি একেবারে। গভীর বিশ্বাসে দৃঢ়। যতবার কাছে গেছি সুন্দর প্রশান্তিতে মন ভরে গিয়েছে। নির্ভয় হয়ে আশার আলো দেখিয়েছে ঃ ওরে মন ভরসা রাখিস হবেই হবে। মাকে আমি মনেপ্রাণে শ্রদ্ধা করি ।
বাবা-মার দাম্পত্য জীবনের সব কথা আমি জানিনা। নিজেদের সংসারের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে তাঁদের মধ্যে কি ধরনের বোঝা বুঝি ছিল তাও আমি জানিনা। আজকের এই অবস্থার জন্য ওঁদের মধ্যে কেউ একজন দায়ী কিনা, কিংবা এটা অবসম্ভাবী তা তাঁরা জানতেন কিনা বা এটা নিতান্তই একটা আকস্মিক ঘটনা যার জন্য তাঁরা সচেতন ছিলেন কি না, বা এমন অবস্থার জন্য প্রস্তুতির যথেষ্ট অভাব ছিল কি না, তা আমার জানা নেই। জানার কৌতুহলও নেই। তবে আমি এটুকু জানি এ সময় মায়ের পাশে দাঁড়ানো আমার একান্তই কর্তব্য এবং মা জানে এ কর্তব্যে আমি অবহেলা করি নি। সাধ্যমত সাহায্য করছি। আমাকে মানতেই হবে যে আমাদের শ্রদ্ধা ভক্তি ভালোবাসার দড়ি নিয়ে মা-বাবার টাগ-অব-ওয়ারে মা-ই জিতেছে শেষ পর্যন্ত। মা-ও যদি হেরে যেত, ভেঙে পড়ত বাবার সঙ্গে সঙ্গে, তাহলে আজকে আমাদের যে কি অবস্থা হতো সে কথা ভাবতেও ভয় লাগে। মাকে কখনো রাগতে দেখিনি, অধৈর্য হতে দেখিনি। সদাই হাসি মুখ, নির্ভয় প্রাণ। কখনো যদি অত্যন্ত ভয় পেয়ে প্রশ্ন করেছি, ‘কি হবে মা ?’ সহজ সুরে দ্বিধাহীন উত্তর পেয়েছি, “তুই কিছু ভাবিস না, ঠিক চলে যাবে।“ কি অচল বিশ্বাস। মা আমার শান্তি । মা-ই আমার অন্যতম প্রেরণা।
২০ তারিখে, ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩ সাল, মা-র চিঠি পেলাম। বাবার অসুখ আবার বেড়েছে এবং অবস্থা এবার ভালো নয়।
(অনেক কাল পরে অনুর যত্ন-করে-রাখা চিঠিপত্রের স্তূপের থেকে আমার একটা অসমাপ্ত চিঠি পেলাম। সেটা তুলে দিলাম নীচে।)
হাওড়া ২১-২-৬৩
“ সু,
তোমার কথাই সত্যি হল। আসছে মঙ্গলবার তোমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে না।
কাল মা’র কাছ থেকে একটা চিঠি পেলাম। বাবার আবার stroke হয়েছে। প্রায় ৮ ঘন্টা অজ্ঞান হয়েছিলেন এবং এখনো অবস্থা খুব সুস্থ নয়। তাই মঙ্গলবার বাবাকে দেখতে যাব সুতরাং তোমার আশায় পূরণ হল --- তোমাকে আর কষ্ট করে আসতে হবে না।
সু, মা’র চিঠি পাওয়ার পর থেকেই পুরোনো কথাটা আবার আমার মনে হচ্ছে। বিয়ে করাটা সত্যিই আমার নিতান্তই বিলাসিতা। সংসারের সমস্ত দায়িত্বটা একান্তভাবে আমার এবং আমারই। তোমার কথা মনে হলেই বিশ্রীভাবে স্বার্থপর হতে ইচ্ছে করে --- মনে হয় দায়িত্ব কর্তব্য সমস্ত কিছু অস্বীকার করে তোমাকে নিয়ে ঘর বাঁধি। কিন্তু এটা তো আত্মসুখ ? আমি কি মনে প্রাণে অত্যন্ত সাধারণ সংসারী মানুষের মত শুধুই আত্মসুখ চাই ? সেই আত্মসুখ কি আমার কর্তব্যের চেয়েও বড় ? ছোট ছোট ভাই বোনদের মানুষ করতে হবে --- বাবা-মাকে দেখতে হবে। হয়ত প্রশ্ন উঠবে বিয়ে করেও কি এসব করা যায় না ? যায়; নিশ্চয়ই যায়, কিন্তু তার জন্য যে সঙ্গতি থাকা দরকার সে সঙ্গতি নেই আমার। আমার সামর্থ্য নিতান্তই সীমিত। আর সীমিত যেহেতু সেহেতু দুয়ের মধ্যে যে কোনো একটাকে আমাকে বেছে নিতে হবে --- হয় কর্তব্য নয় আত্মসুখ। আরো প্রশ্ন আছে: গগনচুম্বি তোমার উচ্চাশা --- নিতান্তই সাধারণ আমাকে দিয়ে সে-উচ্চাশার কণামাত্রও যে বাস্তবে রূপ নেবে না সেটা প্রায় স্বতঃসিদ্ধের মতই ধরে নেওয়া যায়। নিজের ভাগ্যের জন্য কষ্ট নিয়ে নিজে কষ্ট করব তাতে কোন খেদ নেই, কিন্তু সে কষ্টের বোঝা অন্যের মাথায় স্বেচ্ছায় চাপিয়ে দেবো এটা আমি মানতে পারি না কিছুতেই, এর মধ্যে কোন যুক্তি নেই ।
সু, মাঝে মাঝে মনে হয় সত্যই বোধহয় তোমাকে আমি ঠকাচ্ছি --- মিথ্যে আশ্বাস দিচ্ছি। হয়তো কোনদিনই আমার কল্পনাকে সত্যি করতে পারব না। তুমি হয়তো এ কথা শুনে রেগে গিয়ে প্রশ্ন করবে ঃ তবে কেন আমি আবার শেষ-হয়ে-যাওয়া নাটকের যবনিকা তুললাম ! অনেক ভেবেছি, এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর পাইনি। একমাত্র উত্তর যা প্রায়ই মনে হয় তা হল --- আমি লোভী। তোমাকে ঘরে তোলার সামর্থ্য নেই অথচ ফিরিয়ে দেওয়ার সাহসও নেই। এটা অন্যায় ! অথচ আশ্চর্য, এই অন্যায়টাকেই আমি পুষে রেখেছি। উদাহরণ দিয়ে এখনই বলবে জানি আমার পৌরুষ নেই, stamina নেই --- তোমার অভিযোগ মেনে নিচ্ছি যেহেতু কর্ম দিয়ে প্রমাণ করতে পারছি না আপাততঃ কিছুই।
আমার নির্লজ্জ স্বীকারোক্তিতে চমকে উঠলে নাকি ? এর পরেও কি আবার আমার সঙ্গে দেখা করবে?
... ... ... ...
সু, তুমি ঠিকই বলেছ --- তোমার কাছ থেকে আমি অনেক কিছুই চেয়েছি, তেমনভেবে চাওয়ার মত কোনো যোগ্যতাই আমার নেই। তোমাকে আমি চাকরি করাতে চেয়েছি আমার সংসারের জন্য (সংসার কি শুধু আমার ?), তোমার “
(অসমাপ্ত)
২৪ তারিখে বসিরহাটে গেলাম। এবং পরদিন দুপুরে বাবাকে নিয়ে হাওড়ায় চলে এলাম। বুধবার সকালে মেডিকেল কলেজে বাবাকে ভর্তি করে দিলাম। আমার দুই বন্ধু শুভেন্দু ও কাশী খুব সাহায্য করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য। বাবাকে বাঁচানো গেল না। বুধবার রাত্রে ১১টা (?) মিনিটে মেডিকেল কলেজ হসপিটালে বাবা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন । ২৭ এ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩।
নির্বিঘ্নে না হলেও শেষ পর্যন্ত মোটামুটি ভালোভাবেই বাবার শ্রাদ্ধ শান্তি চুকল। টাকার জন্য খুব অসুবিধা হয়নি। দেশের বাড়ী থেকে টাকা পাওয়ার আশা ছিল কিন্তু দুদিন আগেও টাকা না পাওয়ায় কলকাতায় গেলাম টাকা জোগাড়ের জন্য। বন্ধু কেশবের কাছ থেকে ৬০ টাকা এবং সু-র কাছ থেকে ৫০ টাকা পাওয়া গেল। মেজ মামা শ্রাদ্ধের জিনিসপত্র কিনে দিলেন । মেজ মামার কাছে ঋণ ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। সত্যি মেজ মামার মনটা অদ্ভুত সংবেদনশীল। অন্যের বিপদে এমন ভাবে সাহায্য করতে আজকের দিনে প্রায় দেখা যায় না। মেজমামার ঋণ কোনদিন শোধ করতে পারব না। আমার দুর্দিনে মেজমামা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন, শুধু অর্থ দিয়ে নয়, আশ্বাস ও সহানুভূতি দিয়ে। এমন মানুষ মেজো মামার বিপদের দিনে যেন আমি ওঁর পাশে দাঁড়াতে পারি। এমন মানসিক ও আর্থিক অবস্থা যেন আমার সবসময় থাকে। দেশের বাড়ি থেকে শেষ পর্যন্ত টাকা পাওয়া গিয়েছিল। কেশব ও সু-র টাকাটা ফেরত দিয়ে এসেছি। মেজমামার টাকাটা দেয়া হয়নি। খোকনকে ৫০ টাকা দেয়া হলো। বাবার শ্রাদ্ধের পর দিনই হাম্মা দেহ রাখলেন।
আবহাওয়াটা এখনো গুমোট। অবস্থাটা আয়ত্তে আসছে না কিছুতেই। স্বচ্ছন্দ জীবন বোধহয় আর আসবে না। আমি এখনো মামার বাড়িতে, যেহেতু ২২৫ টাকা সম্বল করে সকলকে নিয়ে কলকাতায় বাসা করা যায় না। হাঁদি চিমু এবার হায়ার সেকেন্ডারি পাস করল। হাঁদি সেকেন্ড ডিভিসনে ও চিমু থার্ড ডিভিসনে। দুজনেই সিটি কমার্সে ভর্তি হল। হাঁদি অনার্স পেল, চিমু পেল না। উত্তরোত্তর যে পরিমাণে খরচ বাড়ছে সে পরিমাণে আয় বাড়ছে না। অগত্যা মেজমামার উপরেই ভরসা করতে হলো। আপাতত মামার বাড়িতে আছে ওরা। আমিও নিরুপায়, ওদের প্রতিদিনের খরচ ছাড়া আমিও কিছু দিতে পারি না। একটা Day Students Home-এ দিনের বেলা ওরা পড়াশোনা করে । ভর্তি হওয়ার পর এখনো ওদের কলেজের মাইনে দেয়া হয়নি। বইও কেনা হয়নি একটাও। উপায় নেই, আমারও ধার করার সব রাস্তা গুলো বন্ধ । বন্ধুদের কাছে প্রায় ২০০ টাকার মতো এখনো ধার। ইন্সুরেন্সের দুটো প্রিমিয়াম দেয়া হয়নি। সেটাও প্রায় ১০০ টাকা। এদিকে সম্মান রেখে অফিস যাওয়ার মত প্যান্ট শার্ট নেই একটাও। দুমাস পরেই শীত, শীতের পোশাকও কিছু নেই। আমার অবস্থা যেমন ভাইদের অবস্থাও তেমন। বরং ওদের অবস্থা আরো শোচনীয়, চারিদিকে দৈন্য।
এমন পারিপার্শ্বিকের মধ্যেই আমার সেই স্বার্থপর মনটা আপন ভবিষ্যতের চিন্তার হুল ফোটায়। দিনরাত মনকে বোঝাই আমার বর্তমানই আমার ভবিষ্যৎ। এটাই আমার সবচেয়ে সুসময়। তবু হ্যাংলা স্বার্থপর মনটা আরো স্বচ্ছন্দ ও উন্নত জীবন চায়। সামনের জানুয়ারিতে খোকন ফাইনাল পরীক্ষা দেবে। অন্ধকারে ওই একমাত্র আলো। ও যদি পাস করে একটা ভালো চাকরি পায় এবং সংসারের দায়িত্ব নেয়। তাহলে মাভৈঃ বলে একবার ভাগ্যান্বেষণে বের হব। হয় আমেরিকা নয় জার্মানি। কিছুই যদি না হয় তবে মনে প্রাণে আবার পড়াশোনা। এ সাড়ে তিনশ টাকার একঘেয়েমি বিরক্তিজনক অসহ্য। অবশ্য যথেষ্ট ভয় আছে অতীতের একাধিক আশার মত এটাও হয়তো শুধুমাত্র আশা হয়েই থাকবে।
এখনো এই একঘেয়েমি উত্তরণের সংকল্প আমাকে চিন্তাশীল ও উদ্যমী করে রেখেছে।
সম্প্রতি দুটো বস্তুর অভাব আমাকে কাহিল করেছে দারুণভাবে। একটি অর্থের, অন্যটি উদ্যমের। সমস্যাগুলো যতই জটিল ও সাধ্যাতীত হচ্ছে ততই মানসিক ভারসাম্যের হ্রাস বৃদ্ধি হচ্ছে। চিন্তা তাই ক্রমবর্ধমান। মাথার উপর কঠিন দায়িত্ব। এতগুলো জীবনকে বাঁচতে হবে। খুকু নিমু এখনো স্কুলে। ওদের মানুষ করতে হবে। সকলেরই ভালো করি এমন ইচ্ছা মনে মনে। অথচ সামর্থ্য সীমিত। ইচ্ছে তাই অপূর্ণ। অন্যদিকে একটা দারুন চাপা ক্ষোভ আছে, নিজের জন্য কিছুই করতে পারছি না। আগামী দিনগুলো কি এমনি ভাবেই কাটবে ! আমাকে কি সারা জীবন এমনই ভারবাহী হয়েই থাকতে হবে। ( স্বগতঃ, ওহে আদর্শবাদী যুবক, ভাইবোনদের মানুষ করাকে কি ভার বলে মনে হচ্ছে নাকি ? বাহ বা বেশ ! ) হয়তো হবে না, ভার হয়তো একদিন নামবে। কিন্তু ততদিনে হয়তো আমি স্থবির হয়ে যাব। মানসিক স্বাস্থ্য হারাবো।
বলা বাহুল্য প্রথমটির অভাবের জন্য মুখ্যতঃ আমি দায়ী নই। এমন অবস্থায় সামগ্রিক প্রয়োজনে যদি আমার জীবন শুরুর প্রাথমিক রোজগার যথেষ্ট না হয়ে থাকে তাহলে আমি নিরুপায়। … ঘড়িটা কিনে বিপদ বেড়েছে। তোমায় যখন বলেছিলাম, প্রায় গর্বের সঙ্গে যে ঋণের পরিমাণ ২৫শে দাঁড়িয়েছে তখনও জানতাম না যে দশ দিনের মধ্যেই সেই অংকটা দেড় শ-য় গিয়ে ঠেকবে। অতর্কিতভাবে টাকা পাঠানোর তাগিদ এলো। খোকন হঠাৎ টাকা চেয়ে পাঠাল। ওকে ৬০ টাকা দিলাম ধার করে। আমার কাছে এক কপর্দকও নেই। আমার প্রতিদিনের খরচের জন্য কিছু ধার করতে হলো। হাত পেতে তোমার কাছ থেকেও কিছু নিলাম। নইলে অন্যত্র ধারের অংকটা আরো বাড়ত।
তবুও অর্থের অভাবটা যে গেলেও কেটে যেতে পারে একদিন এমন ভাবাটা দুরাশা নয়, তাই মারাত্মক নয় ততটা যতটা মারাত্মক উদ্যমের অভাব। কিছুই করতে ভালো লাগে না। উদ্যোগী হয়ে কিছু করার কথা তো প্রায় ভাবতেই পারি না। গড্ডালিকায় গা ভাসিয়েছি, যা হয় হোক। জোর করে ভাগ্যের চাকা ঘোরাবার মতো মানসিক স্বাস্থ্যের অভাব অনুভূত হচ্ছে।
অধ্যাত্মবাদে আস্থা ছিল না কোন কালে তবু অবস্থাকে ভাগ্য নামে শূন্য বস্তুর দোহাই দিয়ে মহানন্দে আছি এবং ভবিষ্যৎকে সঁপেছি কালের হাতে। কালে সব ঠিক হয়ে যাবে এবং সময়ই সহজ করে দেবে সব সমস্যাগুলো -- এমন একটা ভাব নিয়ে বসে থাকা ছাড়া আমার কোন গত্যন্তর নেই। তুমিও তেমনি বসে আছ এ কথা না মেনে উপায় নেই যেহেতু উপযোগী কোন ফললাভ অদ্যাপি হয়নি; অবশ্য চাঞ্চল্য ও অস্থিরতাই যদি না কর্মের একমাত্র সংজ্ঞা হয়। তুমি যে যথেষ্ট অস্থির হয়ে উঠেছ একথা স্বীকার করছি।
অধুনা বন্ধু বিচ্ছেদের পালা চলছে। কোনো না কোনো কারণে প্রায়শই মতদ্বৈততা দেখা দিচ্ছে এবং সেটা মাঝে মাঝে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও এমন এক দুর্ঘট আকার নিচ্ছে যে সেখান থেকে আপোষের প্রশ্নটা প্রায় অচিন্ত্য হয়ে যাচ্ছে । এর একটা কারণ কিছুটা স্পষ্ট। সেটা বোধহয় ইদানিং আমি অল্পেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছি এবং বাহ্যিক ব্যবহারে কিঞ্চিত রূঢ় হয়ে উঠেছি ।
এ হেন অবস্থায় বন্ধু-বান্ধবের সাহচর্য ভয়ে ভয়ে এড়িয়ে চলছি এবং সেই শাশ্বত নোংরা ঘাম গন্ধযুক্ত বিছানাটাকেই বিশ্বস্ত আশ্রয় ও পরম বন্ধুজ্ঞানে আঁকড়ে ধরেছি। কিন্তু এখানেও জ্বালা আছে। লাল লাল ছোট ছোট প্রাণী সদলে শান্তি ভঙ্গ করে। তবু অনেক জ্বালা উৎপাতের মত এটাও প্রায় সয়ে গিয়েছে। তাই নিতান্ত পেটের ধান্দায় যেটুকু সময় বাইরে কাটাতে হয় সেটুকু সময় ছাড়া প্রায় সর্বক্ষণেই বাড়িতে থাকি। বাড়ি মানে বিছানা এবং বলা বাহুল্য যেটুকু সময় পাই তার এক মুহূর্ত নষ্ট করি না। তবু কিছুতে উৎসাহ নেই-- আলস্য আমায় অধিকার করেছে।
অবশ্য চাকরিতে উন্নতি করার জন্য পড়াশোনা করার মত ছোট কাজ করতে মনটাকে বশ মানিয়েছিলাম কিন্তু সেখানেও সেই পুরানো বস্তা পচা সমস্যাটা জিজ্ঞাসা চিহ্নের মত ঝুলে রইল। অর্থাৎ অর্থাভাব।
অন্য সকলের চাহিদা মিটিয়ে তলানি এমন কিছু থাকে না যা দিয়ে পরীক্ষার ফীজ বা ইত্যাদি আনুষঙ্গিক উপসর্গগুলো বজায় রাখা চলে। তাছাড়া নিজের ভবিষ্যতের জন্য অর্থ নষ্ট ! ছি ছি ও কথা ভাবাও পাপ । আমি না আদর্শ !
অতএব মনের চাষ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে গলা ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়েছি । সার করেছি অর্থচিন্তা ও ঘুম। কথাগুলো খুব সাধারণ লাগছে তাই না। বেশ আছি, সাধারণ এবং নিতান্তই সাধারণের মতো চিন্তা করতে পেরে স্বস্তিতে আছি। শান্তিতে আছি । এখন আর সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার পোকাটা কুরে কুরে খায় না । যন্ত্রণার হাত থেকে রেহাই পেয়েছি।
সুখে আছি, স্বস্তিতে আছি। জড়ের সুখ, জড়ের শান্তি !!
( অনুকে লেখা চিঠির অংশ : হাওড়া, ১৪/ ৯/ ১৯৬৩ )
হায়, কোথায় গেল আমার কবিতা, আমার সাহিত্য, আমার সুন্দরের সাধনা। আমার একান্ত নিজস্ব উচ্চতর পৃথিবী। সারাদিন যে অর্থ চিন্তার সময় যাচ্ছে। আমার সামান্যতম উদ্যম ও ক্ষমতা যে খাওয়া পরার দায় সামলাতেই কেটে যাচ্ছে। কোথায় আমার পরমার্থ --- নাকি এটাই আমার পরমার্থ।
পারে যে সে আপনি পারে, পারে সে ফুল ফোটাতে । বোধহয় তাই, আমি হয়তো কিছুই পারবো না। তাই এগুলো আমার বাধা মনে হচ্ছে। অথবা হয়তো এটাই আমার একমাত্র অনুকূল আবহাওয়া যখন সত্যই ফুল ফোটে। কিন্তু আমি যে পারছি না, কিছুই পারছি না। শুধুই নিতান্ত সাধারণের মতো শারীরিক বাঁচাতেই দিন কেটে যাচ্ছে।
নিশ্চয়ই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছি। আমি বোধহয় আত্মসুখ চাই মনে প্রাণে এবং সে আত্মসুখ নিতান্তই সাধারণ অর্থে। আত্মসুখী লোককে আমি শ্রদ্ধা করি না। সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করে যে জীবন পেয়েছে তাকে আমি শ্রদ্ধা করি। আমি যদি কখনো লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছই তবে এটুকু গর্ব থাকবে যে প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়েছি। অথবা লক্ষ্যলগ্ন হওয়ার জন্য বোধহয় এই অমসৃণ পথের প্রয়োজন ছিল একান্তই। যন্ত্রণা না থাকলে উদ্ভাবন আসবে কেমন করে ?
এতদিনে মামার বাড়ির আস্তানাটা ছাড়লাম। সিঁড়ির উপর একটা কুঠুরি, একটা ছোট্ট তক্তাপোষ পাতা। শতচিহ্ন ময়লা বিছানা ও মশারি। মাথার কাছে খোলা লেখা-কাগজ-বই-পত্রিকার এলোমেলো স্তুপ। প্রত্যেকদিনই অল্পস্বল্প নাড়াচাড়া করতে হয়। নইলে ভয়ে আছে একদিনের অব্যবহারেই এগুলো উঁই পোকার খাদ্য হবে। বড় হয়ে সেই একবার কেঁদে ফেলেছিলাম ( কোন অবস্থাতেই আমি কখনো কাঁদিনি ) আমার গোটা দুই কবিতা আর একটা প্রবন্ধ উঁইপোকাতে কেটে দিয়েছিল। বিছানার পাশেই ছিল কাগজগুলো। মাথার ঠিক পিছনে একটা ছোট্ট কাঠের আলমারি ছিল। সেটাকে আর ওর সঙ্গে কিছু বই উঁই পোকায় নষ্ট করায় একটা লোহার র্যাক বসিয়েছিলাম আলমারিটাকে ফেলে দিয়ে। মাথার কাছে একটা ছোট্ট জানালা ছিল। সেটা দিয়ে হাওয়া আসত মাঝেমাঝে কিন্তু যেকালে হাওয়া আসত, সেকালে জানলাটা বন্ধ করে রাখতে হতো। দিকটা উত্তর। উঁই পোকার থেকেও অস্বস্তি ও বিরক্তিকর ছিল ধোঁয়া। ঠিক সিঁড়ির নিচেই রান্না হতো। যত ধোঁয়া গরম হাওয়া সিঁড়ির দরজা দিয়েই বের হতো অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে আমার বিছানা বা ডেরাটা ছিল একটা ধোঁয়াঘর বা চিমনি। বিছানা ও কাগজপত্রের উপর মোটা আস্তরণ পড়তো প্রতিদিন। আস্তানাটা ছাড়লাম এতদিনে।
কোয়ার্টারে এসেছি। ফ্রি ফারনিস্ট কোয়ার্টার, ইন্ডিয়া ফয়েলসে একটা কাজ পেয়েছি, সেই কোম্পানির কোয়ার্টারে। খাট বিছানা টেবিল চেয়ার আলনা আলমারি, সমস্ত শরীর দেখতে পাওয়ার মত মস্ত আয়না, পাখা আলো রেডিও। ঘরের সঙ্গে লাগানো বাথরুম, কিচেন। এরই নাম কি স্বাছন্দ্য ! তাহলে আমি স্বাচ্ছন্দ্যে আছি, স্বস্তিতে আছি কিন্তু বড় একা একা। কখনো কখনো নিশ্ছিদ্র অবসর। ভাবার পর্যাপ্ত সময়। আমি এবং মুখোমুখি আমি।
আমি প্রায় দুই সপ্তাহ হল শিফট ডিউটি করছি। অগত্যা এখানে থাকা ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই। খাওয়ার জন্য ব্যয়বৃদ্ধির বিনিময়ে আরামে আছি। বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্ক কমেছে অনেক। কাজ করি আর ঘরে ঢুকি। ঘর থেকে বেরিয়ে আবার কাজ। সময়টার ইন্টিলেকচুয়াল ইউটিলাইজেশন হলে ভালো হতো। কিন্তু কেন যেন সক্রিয় তাগিদ পাচ্ছি না ভেতর থেকে। তাছাড়া একটা মানসিক আলস্য আসছে আস্তে আস্তে। কি যে করব ঠিক করে উঠতে পারছি না। কুঁড়ে হয়ে পড়েছি। এত আরাম, হাত বাড়ালেই প্রয়োজনীয় সব কিছু।
নিজের কিন্তু ঠিক যেন নিজের নয়। ইচ্ছেমতো সাজাতে পারছি না। আমার সমস্ত জঞ্জাল, গুটিগত বইও ঢোকাতে পারছি না। ঠিক যেন বাসা নয়, মনে হচ্ছে হোটেল বা সরাইখানা। যেন পথ চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে এখানে উঠেছি। কপাল জোরে একটা ভালো আস্তানা মিলেছে এই পর্যন্ত।
সময় কাটানো একটা সমস্যা। আমার আশেপাশের ঘরগুলো যারা দখল করে আছে তারা প্রায় স্বরচিত কক্ষের চারিদিকে পাক খায়। ফ্যাক্টরিতে যায় আর ফিরে এসে ঘুমায়। সময় পেলে অবশ্য আড্ডা দেয় কিন্তু সেগুলো প্রায়ই উৎকট আদিরসাত্মক। কাউকে কাউকে দেখছি ঘন্টার পর ঘন্টা জুয়া খেলছে। বলা বাহুল্য এবম্বিধ কোন ব্যাপারে আমার রুচিগত ঘোরতর বৈষম্য থাকলেও সময় কাটানো যখন নিতান্তই দুরূহ হয়ে উঠে তখন ওদের সঙ্গে যুক্ত হই। জুয়া খেলেছি একদিন, পরচর্চা রূপ ভোঁতা বুদ্ধির আড্ডাতেও বসেছি কয়েকদিন। কি বা করা!
ক্রমেই পুরোপুরি সংসারী হয়ে উঠেছি, নিতান্তই অর্থ চিন্তাতেই সময় যাচ্ছে। মাঝে মাঝে যদিও বা লিখতে ভালো লাগে কিন্তু সিরিয়াস কিছু পড়াতে মন বসাতে পারি না। মার কাছে যাওয়া হয়নি অনেকদিন। মা কি মনে করছে কে জানে, প্রায় দুই মাস যাইনি। দুবারই টাকা পাঠিয়েছি হাঁদি চিমুর হাত দিয়ে। আমার যে কি হয়েছে ! মাকে এত ভালোবাসি অথচ মার কাছ থেকে দূরে থাকছি। সু-কে এত ভালবাসি অথচ সু-কে কাছে টানতে ভয় লাগছে।
মা যে কি করে সংসার চালায় আমি ভাবতে পারি না। ওই সামান্য টাকায় কি করে যে বেঁচে থাকা যায় সেটা আমার কাছে একটা মিরাকল। অথচ বেঁচে আছে সবাই। মা একজন মস্ত বড় ইকোনোমিস্ট, ইচ্ছে করলে অনায়াসে ভারতবর্ষের অর্থবিভাগ চালাতে পারে। অথবা বাংলাদেশের সব ঘরণীই বোধ হয় এমনই।
কি যে করব কিছু ঠিক করতে পারছি না। অথচ এমনি করে বেশিদিন চালানো যাবে না অর্থাৎ মা এক জায়গায়, খোকন এক জায়গায, হাঁদি চিমু এক জায়গায়, আর আমি আর এক জায়গায়। এতে খরচ বাড়ছে। মায়ের কষ্টও বাড়ছে,ঘনিষ্ঠতাও কমছে। একটা কিছু করতে হবে এবং তাড়াতাড়ি করতে হবে। আমার কর্মস্থানের কাছাকাছি একটা বাসা নিতে হবে। অথচ এমন জায়গায় থাকার আদৌ ইচ্ছা নেই। কিন্তু কলকাতায় কোন ভালো জায়গায় থাকার সামর্থ্যও নেই। অবশ্য এখানে চাকরি করতে হলে কাছাকাছি থাকাটাই বুদ্ধিমানের। যাহোক জানুয়ারির মধ্যেই কিছু একটা করতে হবে। নইলে খুকু নিমুকে স্কুলে ভর্তি করানো কঠিন হবে। একটা বছর নষ্ট হবে ওদের।
তবুও আগে থেকে কিছু ঠিক করে লাভ নেই। কেননা অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি আজ পর্যন্ত আমার জীবনে প্ল্যান করে কিছু হয়নি। আগে থেকে যা যা ভেবে রেখেছি, সমস্ত কিছু, অসম্ভব কিছু নয়, আমার সামর্থ্য অনুযায়ী যা যা করা যেতে পারে এমন কিছু, সময় মতো দেখেছি সেগুলো ঠিক উলটপালট হয়ে গেছে। হঠাৎ কোনো কোনো ঘটনা ঘটে গিয়ে আমার জীবনের পথ পাল্টে গিয়েছে, প্রায় অবিশ্বাস্যভাবে, অতর্কিতে। কখনো ভালো কখনো মন্দ। কিন্তু সবগুলো পরিবর্তনই আগের মুহূর্তে অকল্পনীয় ছিল। দুটো অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করেছি এত দিনের জীবনে । যখনি কোন নিটোল সুখের প্রত্যাশা করেছি, প্রায় কানায় কানায় ভরে উঠেছে মাধুরী, যা প্রায় স্থির নিশ্চিত যে সে সুখ (সুখ অর্থে যা আমার কাম্য ছিল সে সময় ) আমি পাবই । ঠিক সেই মুহূর্তেই অবাক হয়ে দেখেছি সব আলো নিভে গিয়েছে। গভীর অন্ধকারে শুধুমাত্র হাতড়ে ফিরেছি আশ্রয়, সব সুখের সব আশার জলাঞ্জলি দিয়ে। আবার অন্য অভিজ্ঞতাও আছে। বোধ হয় সব ভীষণাকার কালো মেঘেরই চারিদিকে থাকে রূপোর ঝালর। তাই দুঃসহ দুঃখের দিনেও যখন নিজের উপর সমস্ত আস্থা হারিয়েছি, পৃথিবীর মানুষে বিশ্বাস হারিয়েছি, বাস্তবে বীতশ্রদ্ধ হয়ে – অতঃ কিম – বলে হাল ছেড়েছি, তখনই অপ্রত্যাশিতভাবে কোন আশা পেয়েছি। নতুন আলো, নতুন ঘটনা, নতুন উদ্যম আমাকে উৎসাহী করেছে। জীবনকে আবার পেতে ইচ্ছা হয়েছে।
এমন ঘটনা কয়েকবার ঘটেছে আমার জীবনে।
এত দ্রুত পট পরিবর্তন হচ্ছে যে তাল সামলাতে রীতিমতো হিমসিম খেতে হচ্ছে । মহত্তর বৃহত্তর কোন প্রয়োজনে নয়, নিতান্তই বাঁচার তাগিদে। এবং মুখ্যত দেহগত টিঁকে থাকার স্বার্থেই ছোটাছুটি করতে হচ্ছে । সন্ধান আস্তানার, উদ্দেশ্য চাকরির সুবিধা। এই কোয়ার্টারে আর ভালো লাগছে না। এইখানে আর থাকা যাবে না। অতএব আবার ঘর খোঁজা শুরু। এবং জুটেও গেল খুব তাড়াতাড়ি। আমারই এক সহকর্মীর চেষ্টায়। ওরই বাসার সংলগ্ন একটা ঘর পেলাম। মাসিক ৩০ টাকার বিনিময়ে। পেলাম এবং উঠে এলাম দোসরা ডিসেম্বর ১৯৬৩। একখানা ঘর, থাকব আমি একা। তবু খাওয়া-দাওয়ার একটা সমস্যা রয়ে গেল। কিন্তু এবারও সাহায্য এলো অযাচিতভাবে। ওই সহকর্মিই, ইতিমধ্যে বন্ধু, সনত বোস, আমাকে ওদের পরিবারভুক্ত করে নিল। এবারও গ্রহণ করলাম কৃতজ্ঞতা সহ। এক আশ্রয় যখন ভাঙলো অন্য আশ্রয় তখন আপনি জুটে গেল। এর জন্য আমার কোন কৃতিত্ব নেই। যেন পরপর সাজানো ছিল--- দৃশ্যগুলো একে একে সরে যাচ্ছে।
একি আমি ঈশ্বর বিশ্বাসী হয়ে যাচ্ছি নাকি ? অথবা এমন ঘটনা পরম্পরাই ঈশ্বর চেতনার প্রথম ধাপ ! কার্যকারণ সম্বন্ধহীন বুদ্ধি-অগম্য ঘটনাই কি ঈশ্বর নামক সর্বশক্তিমান অস্তিত্বের প্রমাণ করে? তবে কি সমস্ত কিছু সেই শক্তি অনুযায়ী প্রস্তুত হয়ে আছে ? দাবার চাল গুলো কি সবার আগে থেকে দেওয়া আছে । এরপর মন্ত্রী কোথায়,ঘোড়া কোন ঘরে, গজ কত দূরে, কে কখন মাৎ হবে। অথবা আমরা সব এক একজন নৌকো ঘোড়া গজ। সেই শক্তির ইচ্ছায় চালিত হচ্ছি। আমার পুরস্কার, আমার উদ্যম, আমার কর্ম,কোথায় গেল সব ?
অনেকদিন পরে সু-র চিঠি পেলাম। খুব ছোট্ট। ও কলকাতায় আসছে। ৪ জানুয়ারি ১৯৬৪। তৃতীয় অধ্যায় শুরু হবে মনে হচ্ছে।
নতুন ঘরে উঠে আসতে খরচ হলো কিছু। প্রায় ৮০ টাকার মত। টাকার জন্য খোকন বড় কষ্ট পাচ্ছিল। টাকার জন্য বোধহয় পড়াশোনায় ওর খুব ক্ষতি হচ্ছে। ওকে যথেষ্ট সাহায্য করতে পারি না বলে সংকোচ আছে। নিয়মিত প্রয়োজনীয় আর্থিক সাহায্য পেলে বোধহয় ও আরো ভালো ফল করতে পারত। হাঁদি চিমুর পড়ার জন্যও ঠিকমত টাকা দিতে পারছি না। অবশ্য এ মাসে ওদের বই কিনে দিলাম ৩০ টাকার। খোকনকেও দিলাম ৫০ টাকা। বললাম পরের মাসে শ-খানেক টাকা দেব। কিন্তু মাকে দেবার মত টাকা নেই আর। ঠিক করেছি গোটা চল্লিশেক টাকা মা-কে দিয়ে বলব কিছুদিন দেশে থাকতে, যতদিন না এখানে একটা বাসা করছি।
সোমবারে মায়ের কাছে যাব।
সেদিন মায়ের কাছে যাওয়া হয়নি। একটা ভালো চাকরির ইন্টারভিউ ছিল। যথারীতি আগের অনেক অভিজ্ঞতার মতই জানি এটাও হবে না। তথাপি মন মানে না এবং এ বিষয়ে আমি শ্রীকৃষ্ণের নিষ্ঠাবান ভক্ত। মা ফলেসু কদাচন -- ইন্টারভিউ দিয়ে যাও চাকরি হোক আর না হোক। ইন্টারভিউ পাওয়ার পরেই একটা মজার কাজ করেছি আমি। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাই এই ভেবে যে আমি কি করে এসব কাজ করি। জ্যোতিষীর কাছে গিয়েছিলাম ভাগ্য গণনা করতে, অবশ্য এবারই প্রথম নয়। এর আগে বার দুই গিয়েছিলাম । শুরু হয়েছিল মাস দশেক আগে থেকে। দুজনের কাছে গিয়েছিলাম একজনের বাস সোদপুর, দ্বিতীয় জন থাকেন বরানগর। দুজনের গণনাতেই কম বেশি মিল আছে। দুজনের মতেই আমার সুসময়ের শুরু ২৭ বছর বয়সের পর থেকে। বাড়ি গাড়ী অর্থ থেকে আরম্ভ করে অন্য অনেক রকমের স্বাচ্ছন্দ্য ও বিলাসের সম্ভাবনা আছে। মার্চ ১৯৬৪ থেকে আমার লক্ষণীয় পরিবর্তন হবে। চাকুরী আর্থিক ও পারিবারিক ক্ষেত্রে। দেখা যাক।
হাস্যকর, অমলেন্দু বিশ্বাস এসবও তুমি বিশ্বাস করো !
আমি কি মনের দিক থেকে দুর্বল হয়ে যাচ্ছি ? যত বর্তমান দুঃসহ হচ্ছে আর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হচ্ছে ততই আমি এইসব অবাস্তবে আস্থা রাখছি ? বিশ্বাস করতে ভালো লাগছে যে হঠাৎই কোনদিন উন্নতির (অবশ্যই জাগতিক উন্নতির) সেই ঈপ্সিত সিঁড়িটা পেয়ে যাব।
চিমুর হাতে মায়ের চিঠি পেলাম। বসিরহাটের বাসা তুলে দিয়ে মা দেশে চলে গিয়েছে।
ক্রমশঃ