@kk - ১১.৬/২০:৩১
২০১৯/২০ তে তিনটে দীর্ঘ একাকী ভ্রমণে খরচ হয়েছিল দিনপ্রতি ৩০০টাকা। ১২/২২এর দুমাসের ভ্রমণে হয়েছিল ৪৮৫/ দিন। অবশ্য এতে বাড়ি থেকে স্টার্ট পয়েন্ট ও এন্ড পয়েন্ট থেকে বাড়ি আসার ট্রেনভাড়া নেই। ২০১৯এ উত্তরাখণ্ড ভ্রমণে হরিদ্বার টু হরিদ্বার খরচ হয়ছিল ২৯৫/দিন। এতো কম খরচে বেড়াই বলে একটা ১.৫ লিটার ইলেকট্রিক কেটল নিয়ে যাই। তাতে চা, ব্রেকফাস্ট ও ডিনার তৈরী করি। রাস্তায় দিনে ড্রাই লাঞ্চ করি খেজুর, কলা, আপেল ইত্যাদি দিয়ে। হোটেলে খাই খুব কম।
সন্ধ্যায় সাময়িক ডেরায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে চা বানিয়ে খেয়ে গাজর, টমেটো, বীনস কাটি, মটরশুঁটি ছাড়াই। ডিনারে মোস্টলি ভেজ ম্যাগী বানাই। মাঝে মাঝে তার সাথে করি ডিম সেদ্ধ। প্রোটিনও তো দরকার। প্রাতরাশে দুধ কর্ণফ্লেক্স, দুধ ওটস বা দুধ পাঁউরুটি। দিনের পর দিন। দুমাস ধরে। কোনো অরুচি নেই।
রমিত লান যে লিখলেন, অনসূয়া দেবী “অভিযান” কাহিনী খুব ভালো লাগলো। সামান্য গুলবাঘের ভয় ছাড়া ঐ যাত্রা নিছক পাহাড়ি পদচারণা। অভিযান না হাতি। তবে অনসূয়া দেবী থেকে একা রূদ্রনাথ যাওয়া একটু এ্যাডভেঞ্চারাস। আমি সাহস করতাম না। আমি যেভাবে ঘুরি, তাতে নিজের কমফোর্ট জোনের অনেকটা বাইরে গিয়ে ওভাবে দুমাস ধরে ঘুরেও আনন্দে মজে থাকতে পারা - ওটাই রোমান্টিসিজম এবং এ্যাডভেঞ্চার। অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। প্রয়োজনীয়ও নয়।
তাছাড়া জামাকাপড় কাচি, মেলি, তুলি। বোতলে জল ভরে ক্লোরিন ট্যাব দিই। একশো দেড়শো টাকার ধর্মশালা, হোটেলে গীজার থাকেনা। দেড় লিটার কেটলিতে দু বার জল গরম করে তাই দিয়ে ঘোর শীতে সন্ধ্যায় ঘরে এসে চান করি। খাওয়ার পর বাসন ধুই। গেরস্থালির কাজ কি কম! তারপর সারাদিনের কিছু রানিং নোট ফ্রেশ করি। কিছু মেন্টালি নেওয়া নোট কাগজে বা মোবাইলে লিখি। সারাদিনের খরচ, কত হাঁটলুম তার রেকর্ড রাখি। যা ছবি তুলেছি সেগুলো দেখে যা ডিলিট করার করি। কিছু এডিট করে রাখি। কিছু ছবি ছোট ক্যাপশন বা মাঝারি নোট সহকারে বৌমণি ও মুষ্টিমেয় কজনকে হোয়াতে পাঠাই।
একাকী ভ্রমণে রোজ অনেকটা হাঁটি। তাতে যে কেবল অটো খরচই বাঁচে তা নয়, হেঁটে ঘুরলে যা সব চোখে পড়ে, সেসবও আমার কাছে একাকী ভ্রমণের দারুণ পাওনা। রাতে আলো নিভিয়ে শোয়ার পর দারুণ তৃপ্তির আবেশে মন ভরে যায় - আর একটা দিন ভারি সুন্দর কাটলো। এতোসব করে খুব ক্লান্ত ও তৃপ্ত থাকি বলে অধিকাংশ দিন শোয়ার পর ঘুমিয়ে পড়তে বেশী সময় লাগেনা। বয়সও তো হয়েছে।
আপনি যেমন বলেছেন, নিজের মনের সামনে অকপটে দাঁড়াবার, নিজের মধ্যেকার অচেনা আমি, অল্পচেনা আমির সাথে আলাপচারিতা - এসবের সময়, সুযোগ হয় না। প্রয়োজনও বিশেষ হয় না। কারণ আমি বেসিক্যালি অকপট - পিঁয়াজের মতো বহু লেয়ার নেই আমার। তাই একাকী দাঁড়িয়ে আয়নার সামনেও আমার নিজের সাথে লুকোচুরির বিশেষ প্রয়োজন হয় না। একদমই যে হয় না, তা নয়। তাহলে তো মহাজন হয়ে যেতাম। খুব কম প্রয়োজন হয়। কিছু ব্যাপার থাকে, যা সীমাবদ্ধতা হিসেবে মেনে নিতে হয়, তা নিয়ে কারুর সাথে আলোচনা করাও যায় না।
তাই শোয়ার পরে আর ঘুমিয়ে পড়ার আগে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় নিজের নানা অল্টার ইগোর সাথে মুখোমুখি হওয়ার তাড়না আমায় তাড়িত করে না। জাগ্ৰত অবস্থায় - ভ্রমণপথে কোনো পছন্দসই জনমানবহীন নির্জন জায়গায় বহুবার, বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকেছি বা প্লাস্টিক পেতে শুয়ে পড়েছি। তখনও অন্তরে নানা দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, কপটতা, সংশয় বসবাস করে না বলে সেই নির্জনতার সুযোগে তারা আমায় আক্রমণ করে ক্ষতবিক্ষত করে না। বরং তখন স্তব্ধতার মিস্টিক চার্ম উপভোগ করে আমি এক তূরীয় অবস্থায় থাকি। আমার কাছে এটাই একাকী ভ্রমণের চূড়ান্ত USP.
আমার মনে হয়, যেসব মানুষ জীবনে অতৃপ্ত, তার কারণ হয়তো - ক্ষমতার তুলনায় পারম্পর্যহীন উচ্চাশা লালনের ফলে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির অসমীকরণ, কিছু গভীর অপরাধবোধ, কিছু অবুঝ অভিমান, কিছু inexplicable confusion, self doubt, existential crisis ইত্যাদি। সৌভাগ্যক্রমে, সম্পূর্ণ না হলেও আমি এসব থেকে অনেকটাই মুক্ত। আমি অত্যন্ত সাধারণ তাই নিজেকে অসাধারণ প্রতিপন্ন করার দায় নেই। বেড়াতে গিয়ে ইন্দ্রিয়গ্ৰ্যাহ্য অনুভবের আনন্দেই মজে থাকি - এবং সেই আনন্দ আহরণের প্রধান ইন্দ্রিয় - চোখ। অতীন্দ্রিয় অনুভবের স্তরে, ভাবের জগতে এখনো পৌঁছতে পারি নি। তার জন্যে কোনো অভাববোধ নেই। কিছু জায়গায় যে চেষ্টা করে পৌঁছনো যায় না তা আমি বুঝি।
দু মাসের একাকী ভ্রমণ বাদে বছরে বাকি দশ মাসের মধ্যে হয়তো নয় মাসই আমি (পরিবারের মধ্যে কিছু কথাবার্তা ছাড়া) বাইরে পরিচিতজনের সাথে যোগাযোগহীন জীবন যাপন করি। টিভি দেখিনা ৮/১২ থেকে। হলে সিনেমা দেখিনি বহুবছর। ফেবুতে নেই। ভাটিয়ালিতে সক্রিয় নই। রাজনৈতিক কচকচিতে আগ্ৰহ নেই। কোনো ক্লাব বা সংস্থার সাথে যুক্ত নেই। অঙ্গুলিমেয় কজন পরিচিতর সাথে বাস্তবে বা ফোনেও আড্ডা দিই না। কেবল হোয়াতে যোগাযোগ থাকে। পড়া, দেখা, লেখা, একটু ব্যায়াম, বাড়ির কিছু কাজ আর ঘুম - এই ভাবেই মাসের পর মাস কেটে যায়। এমন জীবন যাপনে অনেকে হয়তো হাঁফিয়ে উঠবে কিন্তু আমার দিব্যি কেটে যায় কোনো অস্বস্তি, অস্থিরতা বা অতৃপ্তি ছাড়াই।
আনন্দে থাকার জন্য মনুষ্যসঙ্গের আকাঙ্খা চলে গেলেও কখনো কোনো দলে পড়লে লোকজনের সাথে আমার মেশা দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না এই লোকটাই মাসের পর মাস নির্বান্ধব জীবন কাটায়। যেমন গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি রবিবার মধ্যমগ্ৰামের কাছে বাদু অঞ্চলে টিউলিপ গার্ডেনে গেছিলাম পিকনিকে। মনপবন নামক একটি পত্রিকায় আমার একটি লেখা বেরিয়েছিল। সেই সূত্রে সম্পাদক মশাই আমাদের সস্ত্রীক আমন্ত্রণ করেছিলেন। পত্রিকা গোষ্ঠীর কাউকে চিনি না। আমি মেলামেশার ব্যাপারে সিলেকটিভ। তাই যাদের উপস্থিতির ফ্রিকোয়েন্সি আমার মেন্টাল রাডারে কিছু ভালো লাগার অনুরণন তুললো, তাদের সাথে নিজে আলাপ করে কয়েক ঘন্টা হৈহৈ করে আড্ডা দিয়ে এলাম। পরে ঐ গোষ্ঠীর কয়েকজন সম্পাদক মশাইকে বলেছিলেন, সমরেশবাবু আগে কখনো আসেননি কেন?
সম্পাদক মশাই বলেছেন, কী করে আসবেন, উনি থাকেন ব্যাঙ্গালোরে, আমার সাথেও তো ফোনেই আলাপ হয়েছে কয়েকমাস আগে। পরে সম্পাদক মশাই আমায় বলেছেন, আপনাকে আমন্ত্রণ করে আমার একটু সংশয় ছিল, কারণ যার মাধ্যমে আপনার রেফারেন্স পেয়েছি, তিনি বলেছিলেন, আপনি লোকজনের সাথে বেশী মেশেন না। কিন্তু সেদিন পিকনিকে আপনাকে দেখে আমি অবাক, মনেই হয়নি, এই প্রথম তাদের সাথে আলাপ হোলো আপনার।
তো kk লান - আপনার জিজ্ঞাসার প্রেক্ষিতে crafted response নয়। উজার করে উগড়ে দিলাম অনেক কিছু। কারণ আগেই বলেছি, আমার লুকানোর বিশেষ কিছু নেই। দেখুন, যদি এসবের থেকে আপনার জিজ্ঞাসার কোনো জবাব পান।