এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ধুলোট //০৬ 

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২২ মে ২০২৬ | ৮৫ বার পঠিত
  • 01 | 02 | 03 | 04 | 05 | 06 | 07
    আমি বসে আছি প্রাসাদের সবচেয়ে উঁচু কক্ষে, যেখানে রাজা বসতেন সিংহাসনে, এখন সিংহাসন খালি, তার গায়ে ধুলো, মাকড়সার জাল, আর আমি মেঝেতে বসে, পা ছড়িয়ে, হাতে একটি একটি শিরার টুকরো, যা আমি কেটে রেখেছিলাম আমার শেষ শিকারের গলা থেকে, এখন তা শুকিয়ে গেছে, কালো, শক্ত, আমি তা ঘোরাই আঙুলে, যেন এটি একটি আংটি, একটি অলংকার, একটি স্মৃতিচিহ্ন।
     
    আমি পৌঁছে যাই পাহাড়ের গোড়ায়। পাহাড় উঁচু, কালো, যেন আগ্নেয়গিরির ছাই জমে জমে তৈরি হয়েছে, যেন কোনো এক প্রাচীন যুদ্ধের দানবের দেহ, যে মরে গেছে, কিন্তু তার দেহ পচে না, শুধু দাঁড়িয়ে আছে, সাক্ষী হয়ে, ইতিহাসের সাক্ষী, যন্ত্রণার সাক্ষী, আমার সাক্ষী। আমি উঠতে শুরু করি। পথ নেই, শুধু পাথর, শুধু ফাটল, শুধু গর্ত, যার ভিতর থেকে বাতাস বেরোয়, গরম, সালফারের গন্ধ, পোড়া মাংসের গন্ধ, চিতার গন্ধ। আমি ওই গন্ধে মাতাল হই, আমি দ্রুত উঠি, আমার হাত পাথর ছেঁড়ে, আমার নখ মাটি কাটে, আমার দাঁত বেরোয়, আমার চোখ জ্বলে, আমি পশু, আমি রাক্ষসী, আমি সেই নারী যে তাকে খুঁজছে, যে তাকে চায়, যে তাকে পেতে হবে -
     
    সে আমাকে বলবেই "তুই এখন কেবল নিজের জন্য ভাবিস না, ভাবিস আমার জন্যও, ভাবিস সেই যুদ্ধের জন্য, যেখানে আমি অস্ত্র ছুঁড়েছিলাম শিশুদের ঘুমের মধ্যে, যেখানে আমি পাপ করেছিলাম, যার শাস্তি এই ক্ষত, এই অমরত্ব, এই অনন্ত যন্ত্রণা। এখন তুই সেই যন্ত্রণার ভাগী, তুই সেই পাপের শরিক, তুই সেই অভিশাপের উত্তরাধিকারী। তুই কী করবি এখন? তুই কীভাবে বাঁচবি? কীভাবে মরবি? কীভাবে খাবি? কীভাবে শূন্য হবি? কীভাবে পূর্ণ হবি? কীভাবে শুরু করবি? কীভাবে শেষ করবি?”
     
    আমি চোখ খুলি। আকাশে এখন তারা দেখা দিচ্ছে, হঠাৎ, যেন তারা লুকিয়ে ছিল, এখন বেরিয়ে এসেছে, আমার বিজয় দেখতে বা আমার পরাজয় দেখতে বা আমার পাগলামি দেখতে। আমি তাদের দিকে হাত বাড়াই, আমি বলি, “দেখো, তোমরা দেবতা, তোমরা অমর, তোমরা যন্ত্রণাহীন, আজ আমি তোমাদের সমকক্ষ হলাম, আমি অমর, আমি চিরন্তন, আমি ক্ষুধার্ত, আমি তৃষ্ণার্ত, আমি যন্ত্রণাময়। আজ থেকে আমি ঘুরব এই পৃথিবীতে, খাব মানুষ, খাব পশু, খাব গাছ, খাব মাটি, খাব নদী, খাব সাগর, খাব সব, যতক্ষণ না পৃথিবী শূন্য হয়, বা আমি শূন্য হই, বা আমি পূর্ণ হই, যতক্ষণ না আমি পাই উত্তর।"
     
    আমি বুঝতে পারি। আমি বুঝি অমরত্ব মানে, নদীর শুকনো তীরে, হাতে একটি ভাঙা কলসির মুখে অমৃতের বিষ, চোখে অশ্রুর রক্ত, হৃদয়ে ক্ষতের স্পন্দন, আর পাগলের নাচ, রাক্ষসীর নাচ, দেবীর নাচ, সেই নাচের তালে তালে ভাঙে পাহাড়, থামে বাতাস, জমে যায় আগুন।
     
    আমি তাকে দেখেছি একবার। যুদ্ধের ময়দানে, সে দাঁড়িয়েছিল এক পাহাড়ের চূড়ায়, তার চুল উড়ছে, তার চোখ থেকে রক্ত ঝরছে না, কিন্তু তার কপালে একটি ক্ষত, গভীর, সবুজ, পচা, যেন সে ক্ষত থেকে বেরোচ্ছে নিঃশ্বাস, বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছে, সেই বাতাসে গন্ধ – মৃত্যুর না, অমরত্বের, যা মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর, মৃত্যু একবার হয়, আর এই অমরত্ব প্রতিদিন, প্রতি রাতে, প্রতি নিঃশ্বাসে, হাজার বার মরার মতো, কিন্তু মরতে না পারার মতো। সে আমার দিকে তাকায়নি, কিন্তু আমি তার দিকে তাকিয়েছিলাম, আমার চোখে তখনও আগুন ছিল, এখনও আছে, কিন্তু সেই আগুন তখন ছিল প্রতিশোধের, এখন শুধু কৌতূহলের, একটি প্রশ্নের: যে অমর, তার রক্ত খেলে কী হয়? যে রক্ত কখনো শুকায় না, যে রক্তের ফোঁটা ফোঁটা ঝরে, কিন্তু কখনো শেষ হয় না, সেই রক্ত চুষলে আমার ক্ষুধা মেটে?
     
    সে বিদ্যা জানে তাই অবিদ্যাও জানে, সে বিদ্যা অবিদ্যা তফাৎ মানেনা। তার কপাল থেকে রক্ত ঝরে, জানার রক্ত, বন্ধুত্বের রক্ত। আমি যাব। আমি তাকে খুঁজব। তাকে, যে অমর, যে অভিশপ্ত, সে ব্রহ্মার শাপে বাঁচে, কৃষ্ণের অভিশাপে ঘোরে, সে কোন যুদ্ধে জেতে না, হারে না, শুধু আছে, যেমন আছে বাতাস, যেমন আছে জল, যেমন আছে আগুন, যেমন আছে আমি, কিন্তু আমি তো তাকে খেয়ে ফেলতে চাই, আমি তো তার রক্ত চুষতে চাই, আমি তো দেখতে চাই সে অমর মরে কি না, সে ক্ষত শুকায় কি না, সে অভিশাপ ভাঙে কি না, নাকি অভিশাপ ভাঙার নামান্তর আরেক অভিশাপ?

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    01 | 02 | 03 | 04 | 05 | 06 | 07
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন