এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক

  • দিলদার নগর ১৩

    Aditi Dasgupta লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ | ২৪২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • দিলদার নগর ১৩
     
    পুরাতন গালিচাটি ---ফুল লতাপাতা,
    জটিল বিমূর্ত নকশা ---
    না বলা,বা বলে যাওয়া কথা।
    কারা কারা মিলেছিলো, কারা কারা করেছিল আড়ি ---
    কারা কারা ঘরে এলো, কারা কারা ছেড়ে গেল বাড়ি।
    এখানেই শেষ তবে?
    কিছু স্থান রয়ে গেছে ফাঁকা।
    নতুন সুতোর ফোঁড় বলে দেবে
    কার সাথে কার হবে দেখা।
     
    সেবার ফেব্রুয়ারী শেষের এক রোদ ঝলমলে সকালে ওরা পাতাঝরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো । দিলদারের চারপাশে অরণ্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকা গ্রামগুলি ভারি মায়াময়।শীত এখানে এখনো যায়নি, শুধু এতদিনের আসনখানি ছেড়ে উঠে বসন্তকে বসতে দিচ্ছে মাত্র। তাই ভোরে এখনো নীল কুয়াশা, এখনো শীত। বেলা এগোলে রোদের তাত বাড়ে, বাড়ে পাখপাখালীর ঋতু উদ্বেল ডাকাডাকি। আমের মুকুল, শালের ফুল,মহুয়ার ফল , জঙ্গলের শিশির ভেজা বুনো লতাপাতারা একসাথে ষড়যন্ত্র করে কাজ ভোলানে বেইমানি করতে থাকে মানুষের সাথে। অথচ সামনে পড়ে রয়েছে খাটাখাটনির মাসগুলি! ফসলের জমি তৈরী, বীজ বোনা থেকে শুরু করে বৃষ্টি না নামা পর্যন্ত রুঠা মাটির, ফসলের দেখভাল। ভীম একাদশীর পূজা বুঝিবা তারই প্রস্তুতি। ভীমকে নিয়ে নানান গল্প এখানে ছড়িয়ে। কোথায় সে বক রাক্ষসকে মেরেছিল, কোথায় হিড়িম্বকে মেরে হিড়িম্বা কে বিয়ে করেছিল ---সে জায়গাগুলিও সেই মতো নাম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে --- হিড়িম্ব ডাঙ্গা, একচকরা….। কিন্তু যে ভীম তাদের পূজা পায়, সে যত না রাজপুত্র তার চেয়ে অনেক বেশী চাষীবাসির ঘরের খেটে খাওয়া ছেলে, যার হাতে জবরদস্ত লাঙ্গল চলে, চোখের নিমেষে ফসল ওঠে। তাই তাকে তারা ডাকে ভীম হুড়া।একটু গোঁয়ার অথচ যাদের ছাড়া অচল পাথর নাড়িয়ে দেওয়া যায়না তাদের এ অঞ্চলে হুড় বলে। হুড় আদমি কখনওবা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে গদাধারী ভীম, পরনে পশুর ছাল বা খাটো কাপড়, হাতে গদা। গোঁফ আছে কখনো,কখনো না। তবে সে সব জায়গাতেই  তুব্রক । পবনদেব কি দূর প্রাচ্য থেকে বয়ে এসেছিলেন তাঁর ক্ষেত্রজ পুত্রটির পিতা হতে? কে জানে! ভীম ওদের ভারি পছন্দের, কারোর ধার ধারেনা, যেখানে যেটি বলার যেটি করার ---করে ফেলে! হয়তো সেই কারণেই কেউ কেউ তাকে বোকা দেখে। পথের পাশে তাকে দেখে ছেলেদের কেউ কেউ হাতের পেশী ফুলোবার চেষ্টায় অনুপ্রাণিত হলো।
     
    পাতাঝরিয়া গ্রামেই এবার বয়েস স্কাউট ও গার্লস গাইড এর তিন দিনের ক্যাম্প। ইস্কুলগুলিই বন্দোবস্ত করেছে বাসের। মেয়ে ইস্কুল,  ছেলে ইস্কুল আর সহ শিক্ষার ইস্কুলগুলি থেকে স্কাউট আর গাইড এর দল থাকবে প্রাইমারি ইস্কুলে আর ব্যাপটিস্ট মিশনের ছোট্ট চার্চ লাগোয়া অতিথি শালায়। আজকের দিনটি কাটবে কালকের প্রস্তুতিতে।কাল ওরা সকাল সকাল উঠে সারাদিনের জন্য তৈরী হয়ে নেবে স্কউট ডে পালনের জন্য। বেডেন পাওয়েল আর তার স্ত্রী ওলেভ এর ছবিতে মালা দিয়ে দিন শুরু হবে। ২২শে ফেব্রুয়ারী দুজনের ই জন্মদিন। শপথ বাক্য পাঠ করবে, তারপর শিখবে কীভাবে নিজেদের সদা প্রস্তুত রেখে যে কোনো পরিস্থিতিকে কী ভাবে সামাল দিতে হয়। কত রকমের দড়ির গিট দিয়ে কত রকমের কাজ, জঙ্গলে র পথে কীভাবে চিহ্ন রেখে রেখে এগিয়ে যেতে হয়, কেমন করেই বা জুটিয়ে নিতে হয় খাবার, উদ্ধার করতে হয় বিপদে পড়া মানুষকে। সবার উপরে দেশের প্রতি দশের প্রতি দায়িত্ব ও অনুগত্য আর ভাই -ভাই বোন -বোন চেতনা। সারাদিনের ছুটোছুটির মাঝে দুপুরে খাওয়া, একটু বসার ফাঁকে গল্প। দিন ঢললে সন্ধ্যা বেলা জ্বলে উঠবে ক্যাম্প ফায়ার। আগুন ঘিরে যাপন করবে ওরা সোনালী কৈশোর। খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়বে তারপর রাতের খাওয়া সেরে।
     
    শক্তপোক্ত শরীর আর সুস্থ মন তৈরী করে ছেলেদের সুনাগরিক করে তোলার উদ্দেশ্য নিয়েই পাওয়েল সাহেব ১৯০৭এ মাত্র কুড়িটি ছেলে নিয়ে শুরু করেছিলেন স্কাউট ক্যাম্প। মেজর জেনারেল পাওয়েল দক্ষিণ আফ্রিকায় বোয়ার যুদ্ধে কিশোর বালকদের কাজে লাগানোর অভিজ্ঞতা থেকে তাদের নিয়ে কিছু করতে চাইলেন। যুদ্ধটা অবশ্যই সাম্রাজ্যবাদী ছিল, হয়তো তাঁর কাছে সেটা খুব স্বাভাবিকই ছিল। তবে তার মধ্য থেকেই কিছু সদর্থক ভাবনা উঠে এল।
     
     কিন্তু সদর্থক ভাবনা কি কেবল ছেলেদের ঘিরেই ঘুরবে? ইংল্যান্ডে ১৯০৯ সালের স্কাউট ৱ্যালি তে এক ঝাঁক মেয়ে স্কাউট এর পোশাকে অনায়াসে ঢুকে পড়লো আর সটান সাংবাদিকদের বলে দিল পাওয়েল সাহেবের ডাকেই নাকি তারা চলে এসেছে! এ নিয়ে খবরের কাগজে কম জলঘোলা হয়নি! হলোই বা সাহেব কাগজ! মেয়েদের কবে আর দেশের দশের ভালো কাজে ডেকে আনা হয়? শহীদ হতেও ক্ষমতার সমাজের ছাড়পত্র লাগে! কর্মপটু, যুদ্ধজয়ী বা শহীদের থেকে নির্যাতিতা হিসেবেই তাদের দেখতে বেশী আরাম বোধ করে সমাজ। প্রথমটাতে তাদের যোগ্যতাকে স্বীকৃতি দেবার খরচা আছে, দ্বিতীয়টাতে নামটাই মুছে ফেলা যায় তাদের সামাজিক সম্মানের রক্ষাকর্তার ভূমিকায় নেমে পড়ে! যাকগে সেসব কথা। মোটকথা, এসব দেখে শুনে পাওয়েল বোন এগনেসকে অনুরোধ করলেন মেয়েদের স্কাউট ইউনিট খুলতে। 'গাইড' নামটি তাঁর মনে ধরেছিলো। তবে সবার সেটি মনে ধরেনি, তারা গার্লস স্কাউট এই স্বছন্দ বোধ করেছিল। গার্লস গাইড ও রইলো কেবল মেয়েদের জন্য।
     
    ১৯০৯ এ ভারতে প্রথম স্কাউট আন্দোলনের গোড়াপত্তন হলো ব্যাঙ্গালোরে আর গার্লস গাইড এলো ১৯১১তে জব্বলপুরে। কিন্তু এদেশের ছেলে মেয়েদের জন্য তার দ্বার বন্ধ। জাতীয়তাবাদী নেতারা ---পন্ডিত মদন মোহন মালব্য, পন্ডিত হৃদয়নাথ কুনজরু,পন্ডিত শ্রীরাম বাজপেয়ী এ দেশের ছেলেদের জন্য স্কাউটিং এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে গড়ে তুললেন সেবা সমিতি যার মূল কেন্দ্র হলো এলাহাবাদ। এদিকে মাদ্রাজে আনি বেসন্ত আর জর্জ আরুন্ডুলের উদ্যোগও চললো এ বিষয়ে আলাদা ভাবে। তবে অন্যরকম কথাও উঠলো এ নিয়ে। উপনিবেশগুলিতে যখন এই স্কাউট আন্দোলন ছড়ালো তখন তাদের অনুগত্য শাসক এর প্রতি না নিজ ভূমের প্রতি হবে? পাওয়েল সাহেবের মধ্যে আর পাঁচটা ব্রিটিশ সেনা অফিসারের মতো নাক উঁচু ভাব ছিলোনা এমন নয়, তবে সেটা পাগলামোর পর্যায়ে যায়নি বলেই নিজের ভাবনাজাত মূল্যবোধগুলো এদেশের নেটিভ স্কাউটদের মধ্যে সঞ্চারিত করা যাবে সেই আশাবাদ তাঁর ছিল। আফ্রিকানদের তুলনায় ইন্ডিয়ানদের প্রতি তিনি বুঝি একটু বেশী সদয় ছিলেন। সেই মূল্যবোধের সাথে জাতীয়তাবাদের কোনো তত্ত্বগত বিরোধ ছিলোনা।তবে সেই মূল্যবোধ জাতীয়তাবাদ এর পথে কতদূর চলে যেতে পারে ---তা হয়তো তাঁরও আন্দাজে ছিলোনা। ব্রিটিশ সরকারও ভালো চোখে দেখেনি এসব। তবে কিছু সমস্যার সমাধান চট জলদি কোনো সমীকরণে ফেলে যায়না। কারণ তার বীজ লুকিয়ে থাকে ইতিহাসের প্রেক্ষিতে, মানুষের অন্তরমহলের আলোছায়ায়। তাই তর্কে যার নিস্পত্তি নেই তাকে নিজের মত করে শুভ বোধের চেতনায় মানুষ সাজিয়ে নেয়। সুতরাং স্কাউট আর গাইড এর জনপ্রিয়তা বেড়েই চললো। এবার ভারতের বিভিন্ন স্কাউট সংস্থাগুলি এক করার চেষ্টা শুরু হলো বেডেন পাওয়েল এর ১৯২১ আর ১৯৩৭ এ দু দুবার ভারত আগমনের প্রেক্ষিতে। কিন্তু দুবারই তা অসফল হলো ! স্কাউটের শপথ বাক্যের একটি অংশ –রাজার প্রতি কর্তব্য ---জাতীয়তাবাদী নেতারা মেনে নিতে পারলেননা। যাই হোক,স্বাধীনতার পর ভারত স্কাউট ও গাইড এর আর সে সমস্যা রইলোনা। ততদিনে ব্রিটিশ সূর্য অস্তমিত তার উপনিবেশ গুলি থেকে। স্কাউট ও গাইড এগিয়ে চললো খোলামেলা শর্তগুলি আঁকড়ে। আজকের সাম্রাজ্যবাদের বয়েই গেছে রাজনৈতিক অনুগত্য অর্জনের পথটি ধরে ধীরে ধীরে সাম্রাজ্য বাড়াতে। কাজেই  স্কাউট এর বিরুদ্ধে সেই অভিযোগও তামাদি হলো। পুঁজির নজরদারি সাম্রাজ্যবাদ আজ দিবে আর নিবে তে বিশ্বাসী, যে দিবেনা ও নিবেনা তার অন্য দাওয়াই। স্কাউট এসব থেকে দূরে তার মানবিক দায়িত্বটিকেই মূলধন করে চলেছে। তবুও কিছু রইলোতো ---প্রাচীন কৌম চেতনার রসে সিক্ত হয়ে! বিসমিল্লার বিতর্ক ছেড়ে!
     
    ব্যাপটিস্ট মিশন ইস্কুলের দুলারী ওঁরাও আর রাজনারায়ণ ইস্কুলের কৃপাকণা দত্ত এক পাড়ার বন্ধু। রামকৃষ্ণ মিশন বয়েজ বা দিলদার কলিজিয়েট, কিংবা কুন্দরানীর ছেলেরা, পাহাড়পুর এর মেয়েরা সব্বাই ঘরের মানুষ, পাড়ায় টিউশন এ দেখা সাক্ষাৎ। দিলদারের ইস্কুলগুলির সাথে রেল শহরের ইংরেজি মাধ্যম ইস্কুলগুলির একটু বুঝি হাল্কা দূরত্ব। সেখানে মিনি ইন্ডিয়া। নানা ভাষাভাষীর ঢেউটি একটু বেশী দামাল ঠেকে তাদের। আবার তাদের চোখে এরা বুঝিবা নিজ ভূমির ভারে একটু স্থবির! এদিকে দিলদারের লম্বু নিতাই পড়ে রেলসহরের ইস্কুলেই। ঘরের মানুষ পরের উঠোনে দেখলে একটু জ্বলন হয় বৈকি। তাই ছোট্ট ছোট্ট রেষারেষী ।লম্বুর ভূমির ভার এদের তুলনায় কম, আবার রেল শহরের আসি যাই ---আজ এ শহর তো কাল সুদূর ও তার নেই। দিলদারের ব্যস্ত বাজারে তাদের জুতোর দোকান। লম্বু তাই কী করবে ভেবে পায়না। শ্যাম রাখে না কুল রাখে। পাড়া রাখে না ইস্কুল!
     
    প্রথম দিনেই একটু যেন হোঁচট। দুলারি গিয়েছিলো টিউব ওয়েলটি থেকে প্লাস্টিকের জলের জাগটি ভরে নিতে। সেখানে রেল এর দুটি মেয়ের একটি পাম্প করছিলো অন্যটি জল ভরছিল। তার হয়ে গেলে দুলারি একটু পাম্প করতে বলে তাদের কারোকে। তারা উত্তর না দিয়ে চলে যায়। দুলারি জানায় তাদের শিবিরে। পরদিন পাওয়েল সাহেবের ছবিতে মালা দেওয়ার সময় কৃপাকণা ছোট্ট কনুইয়ের গুঁতো মারে রেলের অম্রুথাকে । সে মালা দেওয়ার লাইনে আগে ছিলো! গোষ্ঠী শত্রুতায় ব্যক্তি মানুষ এর গুণাবলী হারিয়ে যায়। আগের রাতে মৃদু ভাষিনী সেই দক্ষিনী মেয়েটিই  যে খাওয়ার ঘরে দায়িত্ব নিয়ে সকলের পরে খেতে বসেছিল শুধু ভাত আর ডাল নিয়ে ---সেটা এদের চোখে পড়েনি তা নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে আনতে চাইলোনা। এভাবেই জঙ্গলের পথে, মাঠের দৌড়ে, শিবির প্রধান হয়ে উঠতে থাকলো সারাদিন ধরে। কেউ প্রত্যক্ষ, কেউ পরোক্ষভাবে জড়ালো, গুটিকয় নির্বিকার থাকলো। উপশিবির ও হয়ে গেল কিছু। লম্বু নিতাইকে প্রধান দুই মেরু থেকেই চোখা কথা শুনতে হলো। ওদের এই কার্যকলাপ চোখ এড়ায়নি ক্যাম্প এর দায়িত্বে থাকা দুজন রেঞ্জারের। বছর কুড়ির মালিনী ভগৎ আর চব্বিশের আশালতা কর শলা করলো রোভার ইন্দু শেখর এর সাথে। সেই সন্ধ্যায় ক্যাম্প ফায়ার এ ওরা একটা যৌথ প্রয়াসের দিকে এগোলো। তার আগে মনে করিয়ে দিতে ভুললোনা শপথ বাক্যের অর্থ গুলি। কৃপাকণার গানের সাথে অম্রুথা নাচলো। পরদিন বিশপ'স ক্যান্ডেল স্টিকস থেকে কিছুটা অভিনয় করার প্রস্তাব উঠলো। উভয় পক্ষের সিলেবাসেই রয়েছে। নিতাই হয়ে গেল বিশপ, দিলদার কলেজিয়েট এর নিরীহ প্রদীপ সামন্ত হয়ে গেল সেই রাগী দাগি অপরাধী, রেলের ফিরোজা হলো বিশপের বোন : একটা লোকনৃত্য ও নামানো হবে ঠিক হলো সব্বার সুবিধা মত। কাজেই সেই রাত্রিটা অন্যরকম হয়ে গেল। ফুরফুরে হাওয়ায় বুক থেকে যেন ভার নামলো সক্কলেরই। অজানাকেইতো ভয়, তাতেই বিরক্তি। পরদিন রুটিন কাজগুলির ফাঁকে ফাঁকে টুকটাক নাচের মহড়া বা নাটকের ডায়ালগও এসে পড়তে থাকলো। স্কাউট গাইড দের তো সদা প্রস্তুত থাকতে হয়, একটা নাটক বা নাচ নামানো কী এমন ব্যাপার ? এমনই মনে হতে লাগলো ওদের। রাতে দারুণ জমলো ক্যাম্প ফায়ার ---নাটক ---নাচ, শেষে গালা ডিনার। মনে পড়লো সবার ---আজই শেষ রাত। আজ ওরা একটু দেরিতে ঘুমোবে আবদার ধরলো। শুক্ল পক্ষের এখনো অপূর্ণ কিন্তু অপূর্ব উজ্জ্বল চাঁদের নিচে। দূর থেকে আসা ট্রেনের হুইসল শুনে অনেকেই এক অজানা মন খারাপে আক্রান্ত হলো। পরদিন বিদায়ের আগে গ্ৰুপ ছবিতে ইস্কুলগুলি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। বুকে রয়ে গেল সে ছবি। সব্বাই একটি করে কপি পাবে ঘোষণা হলো। আহা, এ কৈশোর কত দ্রুত সামনে এগিয়ে যায়, অথচ যে ছাপ তার উপরে আঁকা হয়ে যায় তাকে বয়ে নিয়ে চলে সারা জীবন!
     
    এ পথ বড্ড সরু। এ পথ বড্ড ঘিঞ্জি। এ পথ মধু গন্ধে ভরা! কোথায় তার শুরু? কেন আবাস গড়ের সেই গীর্জে? তারপর দক্ষিনে সে চলতে থাকে পুকুর, দীঘি , ঝোপঝাড় নিয়ে। ক্রমে দেখা যায় পাকা বাড়িঘর, উঁচু বারান্দা, মোটা মোটা কড়ি বরগাওয়ালা, আসে সিদ্ধা কালী মন্দির, ক্ষুদিরাম ব্যায়াম সমিতি, আসে নগেন রায়ের পরী আর বাগান ওয়ালা বাড়িটি, আরো এগোতে এগোতে কর্নেল গোলার চৌমাথা যার ডান দিক যায় চার কুঁয়া , বাঁ দিক বের করে দেয় শহর থেকে হোসেনা বাদের পথ ধরে। আমরা এগোবো সোজা। পুরোনো পুরোনো ইতিহাস মাখা, ধূপ ধুনো পুজোআচ্চা মাখা বাড়ি গুলি, আসে হনূমানজী মন্দির, স্বদেশী আখড়া, কাকাতুয়া বাড়ি, আসে পার্টি অফিস, তারপর আবার একটা ছোট্ট চৌমাথা ছুঁয়ে শুরু হয়ে যায় দোকানপাট।তিনু ময়রার দোকান, চপ কাটলেট ছাড়িয়ে কেক বিস্কুটের দোকান ---বোয়াম ভর্তি লজেন্স,তারপর বস্ত্রালয়গুলি আসে একে একে,আসে কাটা কাপড়ের দোকান,আসে মল্লিকদের পর পর তিনটে বইয়ের দোকান--- ডাইনে বামে, আসে বই দোকানের আড্ডাখানি , বাজারের পাথর গাঁথা পথ চলে যায় ডানদিকে। সামনে এগোলে  হাজী ব্রাদার্স এর আতরের খুশবু। সেলাই মেশিনগুলি চলে দাশবাবুর দোকানে ঘর ঘড় করে। চায়ের দোকানে জমেছে আড্ডা, পড়েছে উনুনের আঁচ, সূর্য ডোবার মুখে। কলরব করে ঘরে ফিরছে ইস্কুল কলেজের ছেলে মেয়েগুলি সাইকেলের ঘন্টি বাজিয়ে, হেঁটে গল্পে হেসে হেসে। লোহার কড়াই, হাতা,বেড়ি, ইঁদুর ধরা কল, পাখির খাঁচা নিয়ে রামরাম বসে আছে ঠিক সুধীরবাবুর মনোহারী দোকানের সামনে। বিরহীলালের দোকানটির একদিকে জামাকাপড়, অন্য দিকে মনোহারী, উল, বাসন। তার উল্টো দিকে আলোর পথটি ছেড়ে  একটু সরে গিয়ে নির্জন মাজারটি, হৈ চৈ রাস্তার পাশে চুপচাপ,প্রদীপটি কেউ জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে, আগরবাতিও। বেল ফুল বেচছে কেউ, ফুচকার সামনে তিন কিশোরী। ফটো তোলার দোকানটি, রোদ চশমার সুন্দরীর ছবি আলো মাখা,অনাথ বন্ধুর ওস্তাগরটি পেরিয়ে বাজির দোকান বাম দিকে, ডান দিকে ধুনুরি, আরো এগোলে সোনা রুপো, আরেকটু এগোলে লাহাদের রং এর দোকান ডান দিকে, আর বাম দিকে বাংলায় সাইন বোর্ড:
    দিলদার নগর শু কোং 
     প্রোপাইটর :লিন এন্ড সন্স।
    রাস্তা চলে গেছে আরো এগিয়ে ---সাইকেল,ঘড়ি,কাঁসা পিতলের দোকান, ধূপকাঠি, মশলা, আরো কত কিছুর পসরা নিয়ে সেই উঁচু মাথার জগন্নাথের মন্দির পর্যন্ত ---যার মাথায় টিয়াপাখির মেলা।
     
    দিলদার নগর শু কোং  এমন কিছু সুদৃশ্য দোকান নয়, খোলা মেলা, টিউব লাইট জ্বলা।বাহারি জুতোর পসরা নিয়ে তার শোকেশগুলি লোভ দেখায়না তেমন,খদ্দের ও ডাকেনা। তবু লোকে ভরসা করে মজবুত টেকসই জুতোর জন্য। তবে একটা দুহাত সাইজের মস্ত বড়ো ছেলেদের চটি টুনি দিয়ে সাজানো আছে। এটাই তার দেখার মত। বাচ্চারা হাঁ করে দেখে কল্পিত রাক্ষসের জুতো! আর একটা তাদের দেখার বিষয় আছে, যদিও তা রুচি সম্মত বলা যায়না! দোকানের মালকিন। অমন রং এ শহরে নেই, অমন মোটাসোটা মানুষ ও দেখা যায়না। ভারী চোখ।ছোট্ট মোড়াটিতে সে বসে থাকে মৃদু হাসি নিয়ে। মালিক ছিপছিপে হাসিখুশি ভারী নম্র । আরেকজন আছেন তার বৌ এর দাদা। ব্যাকব্রাশ চুল ছোটোখাটো। কিশোরী মেয়েরা হাই হিল জুতোর বায়না ধরলে তারা হাসতে থাকে।
     
    লম্বু নিতাই এর 'নিতাই' নামটি এ দোকানের আড্ডাবাজ দের কারোর দেওয়া। লম্বু বিশেষণটি বন্ধুদের। সবার মাথা ছাড়িয়ে ওঠা নিতাই এর গায়ের রং চাঁদের আলো। পেশীর আস্ফালন নয় ---লাবণ্যের থির বিজুরি খেলা করে তার নওল কিশোর দীর্ঘ শরীরটি তে। মুখখানিতে শিশুর বিস্ময় , ভ্রু জোড়া তাই বুঝি চিলের দুই ডানার মত উড়ে গেছে দুটি দিকে। রেশম চুল ভারী চোখের নিতাইকে পাড়ার লোক ভালোবাসে, তার সাথে লাগালাগি করতেও ছাড়েনা অং বং চং শব্দ করে। গোলাপী ঠোঁট মেলে সে হাসে, হাসে তার মা বাপ।লম্বুর পোশাকি নাম হেনরি লিন।ইস্কুলের বন্ধুরা লাগে পেছনে :নামটাও তো চ্যাং ব্যাঙ ফ্যাচাং হওয়া উচিত ছিল। আছেতো একটা, কিন্তু সেটা রোমান হরফে লেখা ঝকমারি,ইস্কুলে মুশকিল।তাই এটাই সুবিধের পথ। পাড়ার বন্ধুরা অবশ্য সে  ইস্কুলের নাম মনে রাখেনা। দিলদারি বাংলাতেই কথা বলতে শিখেছিল সে। বাড়িতে বলা ভাষাটি বুঝিবা জগা খিচুড়ি। ক্যান্টনিজ, হিন্দি আর দিলদারি বাংলা। ওদের দোকানের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া গলিটির ভিতরেই ওদের ইঁট বের করা বাড়িটি। গলিটির নাম চীনা গলি।
     
    সেই কত বছর আগে লিনের দাদুর বাবা এসে পৌঁছেছিলো টেরিটি বাজারে দক্ষিণ চীন সাগর পারের গুয়াঙ্গ ডং প্রদেশ থেকে।তখন ইংরেজ আমল। সাগরপারের লোকেরা চিরদিনই এডভেঞ্চাচার ভালোবাসে, ভাগ্যের অনুসন্ধানে চলে যায় কাঁহা কাঁহা! এভাবেই ইতিহাসের রসদ হয়ে যায় নিজেরাই।
     
    দেশ স্বাধীন হলেও তারা এ দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবেনি। নতুন দেশের নতুন প্রধান মন্ত্রীর এশিয়া জোড়া সৌভাতৃত্বের স্বপ্ন, হিন্দি  চীনি ভাই ভাই স্লোগান তাদের নিশ্চিন্ত রেখেছিলো। লিনের দাদু বা বাবা কেউই নিজেদের দেশ দেখেনি।কিন্তু বাদ সাধলো পঁয়ষট্টির যুদ্ধ। দুটি দেশ, সাম্রাজ্যবাদের তেতো স্বাদ দুজনেরই জিভে, এদেশের চাষী আফিং চাষে সর্বশান্ত, গিরমিত হয়ে চলে যাচ্ছে চিরকালের মত দেশ গাঁও ছেড়ে মরিশাস, ফিজি--- আর ওদেশের মানুষ সেই আফিং খেয়ে রসাতলে---- মাঝখানে ভিক্টোরিয়া রাণী মারে দই! দুই দেশের সাথে হাজার বছরের বন্ধুত্ব, দুই দেশেই জাতীয়তাবাদ এল, দুই দেশই শোষক তাড়ালে । তারপর ৪৭সালে এদেশে উড়লো তিন রং এর পতাকা, ওদেশে ৪৯এ মূল ভুখন্ডে ফুটলো লাল তারা। চৈনিক প্রজাতন্ত্রর  সাথে ‘জনগণের’ শব্দটি জুড়লো। এদেশে বহু দল, ওদেশে একটাই। ওদের অপর শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী দলের নেতা চলে গেল মূল ভুখন্ড ছেড়ে সাগর পেরিয়ে ---আদি চৈনিক প্রজাতন্ত্র হয়েই রয়ে যাওয়া অংশটি তে ---ফরমোসায়। সেই যে আসল চৈনিক রাজনীতির প্রতিভূ সেই স্বীকৃতি ও পেয়ে গেল পশ্চিমি দেশ থেকে।
     
    এদিকে লাল তারার সাথে ৬৫তে যে বিশ্বাস ভাঙলো তারপর আর সেই চিড় বুঝি জোড়া লাগেনি। সমাজের সন্দেহ, রাষ্ট্রের সন্দেহ দুশ বছরের সম্পর্ক কে উড়িয়ে দিল। ডিটেনশন ক্যাম্প এ পাঠানো হলো কত মানুষকে! কত মানুষ ভাঙা মন নিয়ে চলে গেল এ দেশ ছেড়ে! লম্বুর বাবা তখন চুপচাপ চলে এল দিলদারে।লম্বুর মা এলো আর এল এক মামা, বয়স্ক সে। রেল শহরের রেস্তোরাঁ তে চাকরি করা স্বজাতির কেউ এই শহরের সন্ধান দিয়েছিলো বুঝি। লোকে দেখত তাদের কৌতূহল নিয়ে। তবু সাধারণ মানুষ পাশাপাশি থাকে, লিনের দোকানের আড্ডায় কতই না প্রসঙ্গ আসে, কিন্তু অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ ওঠার উপক্রম হলে লোকে চাপা দেয় ----হাসি খুশী নিরীহ পড়শীর মনে কষ্ট দিতে ইচ্ছে হয়না খুঁচিয়ে। তাদের ঘরে রেল শহর থেকে, কলকাতা থেকে, কেউ এলে এরাও খুশী হয়---আহা ওরাও আনন্দে থাক!
     
    ওদের দলটার সবাই স্কাউট গাইডএ যুক্ত ছিল তা নয়, সবার সাথে লম্বুর কথা বলার বন্ধুত্ব ছিল তাও না। কিন্তু লম্বুকে নিয়ে ওদের একটা কৌতূহল একটা মায়া ছিল। লম্বুর মা শাড়ি পরেনা লম্বুর মা স্কার্ট আর হাত কাটা জামা পরে সারা বছর। কোনো বন্ধু নেই তার, তাই সারাদিন মোড়াতে বসে থাকে দোকানের। তবে একটা ছোট্ট বাইক চালিয়ে যেত মাঝে মাঝে, ওরা হাসতো আগে, বাইকটা দেখা যেতোনা বলে, পরে নিজেরাই লজ্জা পেত নিজেদের আচরণে । ওরা ভাবতো লম্বুর মা ওকে কী রান্না করে দেয়?  ওরা কি রোজই চাউ চাউ খায়? একদিন ওদের দোকানের সামনে ওরা ফুচকা খাচ্ছিল লম্বুও খাচ্ছিল। কে যেন বললো আলুটা ভিনিগার সোয়া সস দিয়ে মেখে দাও ওকে। লম্বু যথারীতি হাসলো। এটা কাউকে আলাদা করে দেওয়া নাকি তার আলাদা হাওয়াটাকে মজা করে স্বীকৃতি নিয়ে কাছে টেনে নেওয়া ----সেখানেই ঝুলে রইল প্রশ্নটা ওদের মনে।
     
    আবার ওরা মনে করে হুয়েন সাং এর কথা,কতযুগ আগের কত দূরের দেশ থেকে ----তবু, ইতিহাস বইয়ের পাতায় ভর করে ইস্কুলে, বাড়িতে, পরীক্ষার খাতায়! আর নিতাইরা এক পাড়াতেই কেমন দূর দূর!
     
     বাড়িতে বই আসে, চীন দেশের, সোভিয়েত দেশের। ওরা চোখ মেলে দেখতে শেখার আগেই সেসব এসে পড়েছে। সোভিয়েতএর ই বেশী। কত ছবি, কত রং, কত গল্প ছোটদের গুরুত্ব দিয়ে। চীনের সাগর পাড়ের গ্রামের ছেলে মেয়েদের গল্প পড়ে তারা। ছোট্ট লাল ফৌজ তারা, কী ভাবে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ শত্রুদের ‘জনগণের সেনাবাহিনী’ র হাতে তুলে দিয়েছিলো! ভালোই গল্প, তবে মনের মধ্যে বেশী দাগ কাটতো সোভিয়েত বই গুলি। রোজকার মনের ভিতর লুকোনো একান্ত নিজের কথাগুলি, ছোট্ট ছোট্ট সমস্যাগুলি কী ভাবে যেন ওরা ধরে ফেলতো, এমন কি শীতের দিনে চান ফান সংক্রান্ত প্রবল বিপ্লবী ইচ্ছে গুলোও!  তারপর কেমন করে জানি ছবি দেখাতে দেখাতে, গল্প বলতে বলতে একটা সূর্য ওঠা সমাধানের রাস্তায় পৌঁছে দিত--- আর ওরাও কেমন বেমালুম সেটাকেই পছন্দ করে ফেলতো!  আরেকটু বড়ো হয়ে ওরা পড়বে মানুষের মত মানুষ, মা আর ইস্পাত।  ইস্পাতের মত শক্ত হতে হতে আবার ইউক্রেনের গ্রীষ্মের মনোরম সন্ধ্যেগুলিকে গুলিয়ে ফেলবে ওদের দিলদারি সন্ধ্যে গুলোর সাথে। একর্ডিয়ান নেই তো কি? দূর থেকে সন্ধ্যের বাতাসে ভেসে আসা  সুর কি এখানেও কম পড়িয়াছে? 

    দু দেশের ছবিগুলিতেই ওদের মতোই ছেলেমেয়েরা কত গুরুত্ব পূর্ণ! ওদের ও ইচ্ছে হত বড়ো বড়ো কাজ করতে,খুব বীরের মত কোনো কাজ, খুব ত্যাগের। খুব ভালো কিছু --নীল পাতা বই এর সেই রুশী ছেলের মত ভালো কাজের নেশা পেয়ে বসতো! তাই স্কাউট, গাইড, কেউ আবার ঢাউস খাঁকি প্যান্ট পরে ছুটতো ‘শাখার’ মাঠে, মনিমেলা তখন অবশ্য দিলদারে ছিলোনা, কিশোর বাহিনীতেও যোগ দিত কেউ। কিন্তু যাঁরা যাঁরা এই ভালো ভালো  স্বপ্ন দেখাতেন তাঁদের মধ্যে মিলমিশ না দেখে ওরা একটু আশ্চর্য হত। কেউ বলতো: বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক, কেউ বলতো: ভারত স্বাধীন হয়েই গেছে যখন আর নাকি বিপ্লবের প্রয়োজন ই নেই!  মিছিলেও পরিচিত মুখগুলি ভাগ হয়ে যায় আবার অনেক সময় একসাথে আড্ডাও মারে। এদের মধ্যে অনেককেই ওদের ভালো লাগে, আবার কাউকে দেখলে পালাতে ইচ্ছে জাগে। কেউ কেউ চাঁদা নিতে আসে ঠিক মন্টির মা যখন ইস্কুলে বেরোন। মা পরে আসতে বললে তারা লেনিন, মার্কস এর উদ্ধৃতি দেয়। মেয়ে ইস্কুলের দিদিমনির এতো তাড়া কিসের? সেই তো গিয়ে উল বোনা আর গুলতানি!

    মোটমাট তিনটি ভাগের কমিউনিস্ট দের মধ্যে দুটিকে দেখতে পেত, যারা রাস্তায় দেখা হলে পরস্পরের প্রতি এমন ভাব করতো যেন এক পাঁচিলের এদিক ওদিক দুটি বাচ্ছা ছেলে, বাড়িতে কথা বলা বারণ করে দিয়েছে নেহাত তাই, নয়তো দুজনেরই মনে আগের দিনের মার্বেল খেলার স্মৃতি। এ ওর নামের পরে রাশান ঢং এ কভ, মভ যোগ করে ডাকে, তো ও চৈনিক ঢং এ ভেঙে দেয় এর নামটি। তৃতীয় যারা তাদের গল্প শোনে তারা, সে বড়ো সুখের সময় নয়, সে হয়তো প্রতিশ্রুতির ও সময়---পাষাণ -মূর্তি আর রক্ত মাংসের মানুষের দাম এক হয়ে গিয়েছিল বিপ্লবের এবং তা দমনের হাতিয়ার হিসেবে! কত কথাই ফিস ফিস করে ঘুরে ঘুরে বেড়াতো। জেলের মধ্যে গুলি চালিয়ে মুখে আলকাতরা ঢেলে নাকি মাঝ দরিয়ায় ফেলে দিয়ে আসা হয়েছিল ‘তাদের’!

    শেষ দিকে কে কার শত্রু তা নাকি গুলিয়ে গিয়েছিলে। সেই নাটুকে অবিনাশ বৈরাগীর মা জরুরী অবস্থার সময় ছেলের সাথে দেখা করতে গিয়ে  আলাপ করলে বন্দুকের নল ক্ষমতার উৎস করে নেওয়া আঠেরো বছরের ছেলের মার সাথে। অল্প বয়সী মেয়েটি এসেছে দূরের গাঁ থেকে। রাতে থাকবে কোথা জিগ্যেস করায় সে মা যার নাম করলো বৈরাগীর মা তার কাছে সে মা-টিকে যেতে দিলেননা। নিজের বাড়ি নিয়ে এলেন। চেনেনতো সে লোকটিকে! হালের ভুঁই ফোঁড় বর্গী ---বড্ড লম্বা চওড়া কথা! কয়েক বছর আগের কথা মনে পড়ে তাঁর। সেই বোমা বারুদ কালে কোথা থেকে একটা পিস্তল জুটিয়ে একদিন বড়ো ছেলের সামনে এসে নাচাতে লাগলো, কটা বডি নামিয়েছে, এবার কটা হবে হিসেব দিল। অবিনাশ বৈরাগীর ঠান্ডা মাথার জন্য নাম আছে ।  দাড়ি কামাচ্ছিল তখন। এক গাল কামানো হয়েছে, বললো :একটু অপেক্ষা কর, আরেকটা গাল কামানো হোক! তারপর যা হয় আরকি। চা বিস্কুট খেয়ে, বৈরাগীর দিদির দাবড়ানি খেয়ে চলে গেল। তখন বৈরাগী ভাইদের ডাইনে বামে বিপদ , বামে বিপ্লবের বোমা বন্দুক তো ডাইনে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা। তাদের নিজেদের মধ্যেও নানা দ্বন্দ্ব বিভাজন আর অবিশ্বাস। দিলদারের পশ্চিমা মালভূমি আর পুবের শস্যভরা সমতল দুটি দিকই তখন রক্ত বারুদ মাখা।

     তবে প্রতিক্রিয়াশীল আর শ্রেণীশত্রু শব্দ দুটো ওদের মধ্যে বেশ চলতে লাগলো গালাগালি হিসেবে। কিঙ্কর বলে একটা চিমড়ে লোক ঘুরে ঘুরে বেড়াতো আর চেয়ে চিন্তে বিড়ি খেত। যেকোনো গুলতানির ই পাশে গিয়ে দাঁড়াতো সে। বাচ্চাদের আড়ালে পেলেই বিচ্ছিরি ভাবে গালে মুচড়ে দিত, চিমটি কাটতো। ওকে ওরা শ্রেণীশত্রু হিসেবে খতম করার শপথ নেওয়া হলো। তবে তারপরেই সে উধাও হলো । পরে শোনা গেল সে নাকি খতম হয়েই গেছে! রেল লাইনের ধারে গলা কাটা লাশ পাওয়া গেছে।ইনফরমার শব্দটি শুনলো তারা। হাত ফসকে যাওয়ার হতাশায় বাজপড়া তাল গাছটাকে একদিন সবাই মিলে বেদম পেটালো ! প্রতিক্রিয়াশীলটা অবশ্য পরস্পর কে গালাগালি দিতে ব্যবহার করতো। 

     মন্টি গল্প শুনেছে সত্যি সত্যিই শ্রেণীশত্রু ক্ষতমে যোগ দেওয়া একজন  ---মন্টির বাবার কলেজে যোগ দেন,পেটে আলসার নিয়ে। মন্টির মা তাঁকে ভালো করে খাইয়ে দাইয়ে সুস্থ করার চেষ্টাতে সফল হন।তখন নাকি তারা থাকতো আরো পশ্চিমের পাহাড় ঘেরা এক গঞ্জে। বন্ধু বৎসল মন্টি যখন শুনলো তিনি বৌ ছেলে নিয়ে বেড়াতে আসছেন দিলদারে ওদের বাড়ি, খুবই উত্তেজিত হয়ে বন্ধুর দলকে ডেকেছিল। লম্বা, রোগা চেহারার মানুষটি,একটু সামনে ঝুঁকে চলেন ,চেহারায় একটু ভাঙ্গন। চোখের তলায় কালি, বলি রেখা। না, তেমন কোনো গল্প মন্টিরা পায়নি।। তবে কাকিমাটি খুবই উচ্ছল।সব কিছু আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা সাংঘাতিক। বাড়িতে পৌঁছে কিছু মুখে দিয়েই ওদের এলেবেলে আসো যাও বাড়িটিকে টিপটপ , টান টান করার নেশায় মাতোয়ারা হয়ে উঠলেন। মন্টি আর ওর মা আজ্ঞা পালন করতে লাগলো। মন্টিকে আবার সাইকেল নিয়ে ছুটতেও হলো চপ সিঙ্গাড়া মিষ্টির আবদার নিয়ে। কত কিছুই না গেরস্থালির শেখাতে লাগলেন তিনি মন্টি আর তার মাকে। মন্টির বাবা তারিফ করতে লাগলেন, কাকুটি মৃদু মন্দ হাসতে থাকেন । তিনি এ কদিন নাওয়া খাওয়ার সময় ছাড়া চেয়ারটি ছেড়ে ওঠেননি, বোধ হয় তখনো আশা ছিল চীনের চেয়ারম্যান এসে বসলেও বসতে পারেন, তাই ধরে রেখেছিলেন সেটি। মন্টি  একটু গাঁইগুই করেছিল বুঝি ---ছুটির বেলা চলে যাচ্ছিল তার! বাবার  ধাঁতানি খেল। কাকুটি ও বেশ কিছু চোখা কথা বললেন ---শিষ্টাচার, পিতৃআজ্ঞা পালন বিষয়ে। মন্টির দাদা অবশ্য  সবের উর্দ্ধে ছিল, কারণ তাকে বেরিয়ে যেতে হত দুবেলা---ঠেকের উদ্দেশ্যে । মেয়েদের যেহেতু হাতে পায়ে কাজ না দেখালে নিন্দে হয়, তাই কথা বলতে বলতেই কাজ করার ক্ষমতা তাদের বেশ আয়ত্বে। কথায় কথায় কাকী জানিয়ে দিলেন প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষায় কাকুর বিশ্বাস নেই, তাই তিনি নিজে বিয়ের পরে আর হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষাতে বসেননি।  চার পাঁচদিন পরে ওরা চলে গেলে মন্টিদের ঘর আবার আগের মতোই সকলের নাগালে চলে এল। মন্টি বাপের থেকে মায়ের উপরে বেশী আস্থা রাখতে লাগলো। সে সাহস করে মাকে বলে ফেললে : তাজা খবরের কাগজ দেখি কাকী ছোঁননা ! ওর পিঠে হাতপাখার বাঁট এসে পড়লো! মন্টি সাইকেল নিয়ে ফুরফুরে আনন্দে বেরিয়ে পড়লো। দিলদারে আবার ঘুরে বেড়ানোর জায়গার অভাব?

    নিতাই এর পুজো প্যান্ডেলে ঘোরার নেশা ছিল, ভোগের খিচুড়ি ভারি পছন্দের তার। দিলদারের রামকৃষ্ণ মিশনে সে চলে যেত খিচুড়ির টানে, আর আরোরা টকিস এ বাংলা সিনেমার টানে। গুন গুন করে গাইতো :
    চরণ ধরিতে দিওগো আমারে….কার চরণ ও ধরতে চায় তাই নিয়ে বাজি ধরতো ওরা। পরে জেলখানার মাঠের আড্ডায় যখন ও আসতে শুরু করলো, ওরা জিগ্যেস করেছিল। নিতাই বলেনি। 

    ওরা যখন সব কলেজে ভর্তি হলো, নিতাই ও ভর্তি হয়েছিল দিলদার নগর কলেজে পাশ কোর্সে। কিন্তু পরে যাওয়া বন্ধ করেছিল। আড্ডাও তার কমে আসছিলো। রেল শহরের রেস্তোরাঁ য় কাজ নিয়েছিল সে। মাঝে মাঝে বাবার জুতোর কারখানাতেও বসতো। ওর বাবা নিজেই কাজে নেমে পড়তেন , সঙ্গে জনা তিন চার কর্মচারী মাত্র। নিতাই এর জুতোর কাজ পছন্দ ছিলোনা। মাঝে মাঝে গলির ভিতর ওদের বাড়ি থেকে ওর মায়ের চিৎকার ভেসে আসতো। 

    কোনো শহরই একজায়গায় থেমে থাকেনা। দিলদারই বা থাকবে কেন? ততদিনে বিদেশী জিনিস এদেশে সুলভে আসতে শুরু করেছে। জামা জুতোর ই শুধু নয়, রোজকার যে বেঁচে থাকা--- তারও বাহার বেড়েছে। বাহারি জিনিস সস্তা হয়েছে। টেকসই হতেই হবে--- এমন পুরোনো ধারণা ছেড়ে লোকে বেরিয়ে এসেছে। বেশ ঝলমলে এই উন্নতিতে কিন্তু চীনা দোকানের উজ্জ্বলতা ব্যাস্তানুপাতিক হারে কমতে শুরু করেছে। জুতোর সংখ্যা কমেছে, কমেছে উজ্জ্বলতা , চামড়ার নাকি সাপ্লাই নেই তেমন, পরিবেশ সচেতনতা র প্রভাবে মহানগরের চর্ম শিল্পে ভাটার টান, তাদের চামড়া দুরস্ত করার পদ্ধতি পরিবেশ বান্ধব নয়। ওদিকে বিকল্প উপাদানের ব্যবহার বাড়ছে, সেখানেই আলো গিয়ে পড়ছে।

     কারখানার মধ্যেও আর সেই পরিবেশ নেই। অর্থনৈতিক সামাজিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক সমীকরণ দেখিয়ে অনেক সময় বাস্তবকে নিজের সুবিধের ছাঁচে ঢেলে ফেলা যায়। সেই ফর্মুলা নিতাই এর খেটে খাওয়া বাবাকে উদ্যোগপতির ফ্রেমে বন্দী করে ফেলেছে ততদিনে ---অপর পক্ষ হিসেবে দেগে দিয়েছে। কর্মচারীদের ঠিক পথে চালনা করার দায়িত্ব নিয়ে কিছু বাইরের লোকের আনাগোনা বেড়েছে। 
     
    সেই দিনটা ছিল বিশ্বকর্মা পুজোর পরের দিন। আগের দিন লম্বুর বাবার কারখানাতে পুজো হয়েছিল। সেখানে সেই দায়িত্বশীল লোকেদের সাথে কি একটা বিষয় নিয়ে তাঁর মতের অমিল হয়। তারপর হটাৎ তাঁর জামা খামচে কেউ ঝাঁকাতে  থাকে চিৎকার করে। সবাই দৌড়ে যায়। সেদিনের মত ঘটনার ইতি ওখানেই। পরেরদিন হটাৎ ই দেখা যায় নিতাই এর মা দোকানের ভিতর থেকে জুতো গুলো ছুঁড়ে ছুঁড়ে এনে ফেলছে আর নিতাইকে গাল দিচ্ছে কোনো কাম কাজের নয় বলে! সে কাম কাজের হলেও তাদের ব্যবসার দিন শেষ সেটা মেনে নিতে বুঝি খুব কষ্ট হচ্ছিলো তাঁর । তারপর নিতাইকে আর তেমন দেখতে পেতোনা ওরা। কখনো শুনতো চন্ডিগড়, কখনো মাদ্রাজ ---হোটেলের কাজে। তারপর বাজারে শোনা গেল ওরা চলে যাবে।  ৯৯বছরের লিজের অবসানে হং কং চীনের জামার তলায় নাকি ঢুকবে ক বছর পরেই ----এ নিয়ে আলোচনা গরম। কি ভাবে রটে গেল ওরা হং কং চলে যাবে। লম্বু নিতাই সেই চীনের নাগরিক হয়ে যাবে যার চেয়ারম্যান খুব শক্তিশালী। ওদের আর কেউ অপমান করবেনা নিশ্চই!

    ওদের দলটা আসতে আসতে পেটের দায়ে এদিক সেদিক হয়ে গেল। কেউ চলেই গেল দিলদার ছেড়ে ভিন শহরে, ভিন রাজ্যে। লম্বু না থাকলেও দেখা যেত তখনো ওর বাবার দোকান টি টিমটিম করে চলছে। হং কং যাওয়ার বিষয়টার ও খোঁজ পাত্তি নেওয়ার সময় হয়নি। কবে যে সে দোকানে তালা পড়লো, কবে ওরা মোটঘাট বেঁধে দিলদার ছেড়ে চলেই গেল স্বার্থপর, অসহায় যৌবন আর খোঁজ করেনি। আসে পাশের লোকের কাছে হয়তো খবর ছিল। আসলে জীবন গুলিই আলাদা আলাদা হয়ে যাচ্ছিল। মেয়েগুলি কেউ কেউ বিয়ের পিঁড়িতেও বসে পড়লো।

    দিলদার নগর শু কোং এর জায়গায় এখন এখন ঝকঝকে দোতলা ইমারত। নিচে  উনিসেক্স পার্লার, উপরে জিম।চীনা টুনির আলোয়, নকল গাছের সাজ পোশাকে সে এখন সুখের মূর্তিমান বিজ্ঞাপন। বেশ লাগে এখানে দাঁড়ালে। কাঁচের দরজাটা খুললেই কেমন ভুর ভুর করে সুগন্ধ ছড়ায় ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা ঠান্ডা বাতাস। তবে পিছনের গলির ভিতরের দিকে দাঁড়ানো যায়না, সে বাতাস ভারি গরম। জিমের মালিকের গলায় মোটা সোনার চেন। একদা শৃঙ্খল ছাড়া তার কিছুই হারাবার ছিলোনা!

    ফরমোসাকে লোকে এখন তাইওয়ান বলে । প্রতি বছর ভারতবর্ষ থেকে বেশ কিছু ছেলেমেয়ে পাড়ি দেয় সেখানে । ইলেকট্রনিক্স সহ বহুবিধ শিল্প তালুক গড়ে ওঠায় চাকরির লোভনীয় সুযোগ। দিলদার থেকেও গুটি তিনেক আগু পিছু চলে এসেছে এখানে। পালিয়ে আসা জাতীয়তাবাদী নেতা চিয়াঙ কাই সেক ও তাঁর কুয়ো মিন তাং  দল এখানেও একদলীয় নিয়ন্ত্রনের শাসন জারি রেখেছিল, অভাবনীয় অর্থনৈতিক উন্নতিও এসেছিলো ষাটের দশকে। কিন্তু যে কোনো জোর করে ঢাকা চাপা জিনিসই ভিতর থেকে গেঁজে ওঠে ---বিপরীতমুখী চাপ তৈরী হয়, দেওয়ালের ও ক্লান্তি আসে। কাজেই একটা সময় অন্য মত, অন্য ভাবনাকে স্বীকৃতি না দিলে নিজের অস্তিত্বই উড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হয়। সেখানে গণতন্ত্র এল । এই স্বীকৃতির হাত ধরেই এল আরো খোলা হাওয়া। ব্যাঙ্ক বাড়লো, বাড়লো একদা নিষিদ্ধ কেবল চ্যানেল, ব্যক্তি স্বাধীনতা। নানা চিন্তা ও পরিকল্পনা উন্নতির দিকেই গেল যদিও অধিক উৎপাদনের সমস্যা ও প্রকৃতি কে নিয়ে বিপ্রতীপ ভাবনাও উঠতে লাগলো। তবে গণতান্ত্রিক তাইওয়ান তাড়াতাড়িই নবীন প্রজন্মের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ালো। তাই মন্টির ছেলে বুবকাও একদিন সেই তীরে তরী ভেড়ালো দিলদার ছেড়ে। সে বছর পুজোর আগে আগে।
     
    সাগর পারের কাওহসিয়াঙ শহরে দিলদারের ঘরকাতর ছেলেটি ভিড়ে গেল একটু বড়োদের সাথে দুর্গাপুজোর  উদ্যোগে। দু বছর হলো সেটি চালু করেছে তারা। তাদের ভরসা এক নিতুদা। বুবকা নিতুদা কে দেখে একটু অবাক হয়। দাদার মাথায় টাক, উঁচু ভুরু ভারি চোখ।স্থানীয় আর পাঁচটা লোকের মতোই। ভোগের যাবতীয় বাসন সেই যোগান দেয়। বুবকা তার সাথে কিছু বাসন আনতে যায় তার ঘর থেকে আর সেখানে রামকৃষ্ণ, সারদা মা আর লোকনাথ বাবাকে দেখে  আরেকবার অবাক হয়। মুখ চোরা সে তখনকার মত দরজার দিকে এগোয় বাসনগুলি নিয়ে। নিতু পিছু পিছু একটা চাঁদমালা নিয়ে এসে গজ গজ করে: লাও, ইটাও লিয়ে যাওযে দিকটি দেখবোনি সি দিকটিই গোলমাল করে বোস থাকবে সব! 
     বুবকার গায়ে কাঁটা দেয়, মনে হয় দিলদার বাজারেই সে দাঁড়িয়ে আছে!

    এদিকে দিলদারে ষষ্ঠীর দুপুরে  ফেস প্যাক নিতে নিতে বছর একুশের এক তরুণী শুনছিল পুরোনো কিছু গল্প। রেল শহরের গুটি কয় গুরখা ও ইঙ্গ চৈনিক মেয়ের সাথে দিলদারের কিছু মেয়েরও কাজ জুটেছে এখানে। নাপিতের সেলুন আর হালের বিউটি পার্লার দুটিই নানান গল্পের আখড়া ---নানান মানুষ নানান গল্পের সুতো এনে রেখে যায় আর তা দিয়ে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে  গল্পের নকশি কাঁথা। বাস্তবকে কতটা তা ছোঁয়, কতটাই বা পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে অন্য নকশা তোলে তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ভারী মৌতাত আসে একটা এই বুনোটের মধ্যে! ও শুনছিলো চীনে দোকানের গল্প, লিন দের গল্প। তারা চলে গেছে। ওর মনে পড়ে মা আর তাদের বন্ধুদের গপ্পের আড্ডায় স্মৃতি চারণ। দুলারী ওঁরাও দিলদার ছাড়েনি। নিতাই কোথায় আছে কেউ বলতে পারেনা। ইস্কুলের পোশাকি নাম টা নিয়ে তর্ক ওঠে কারণ ওরা রেলের ইস্কুলে তো পড়েনি ওর সাথে। মনে করতে থাকে। ফেসবুক এ আন্দাজে ঢিল মেরে দেখতে থাকে কেউ কেউ।

    মানুষ কোনোকালেই এক জায়গায় আটকে থাকেনি। আরো সবুজ, আরো সমৃদ্ধ উপত্যকার সন্ধানে সে  বার বার পাড়ি দিয়েছে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। সভ্যতা তা না হলে এগোতোই না! তবু, কোনো একটি বিশেষ জায়গা তার হৃদয়ের আবাস হয়ে রয়েই যায় –যাকে সে স্বপ্নে দেখে।

    রেস্তোরাঁ র এ কদিনের ভার কর্মচারীদের হাতে দিয়ে এসেছে সে, পুজোয় ব্যস্ত থাকবে বলে। কালকের সব মোটামুটি গুছিয়ে দিয়ে আজ বিকেলে একলা নিতাই এসে দাঁড়ায় সাগর পারে। একটু পশ্চিমে মুখ ফিরিয়ে। বাতিগুলি জলে উঠছে একে একে। তার মন পবনের নাও চলতে থাকে সাগর পেরিয়ে আরো পশ্চিমে ---এসে পৌঁছয় কপিশা ধারের দিলদারের সেই বাজারটিতে। সেখানে একটু আলো আছে তখনো, চায়ের দোকানে আঁচটি সবে পড়েছে। পুজোর আগের শেষ রবিবারের সওদাপাতিতে সে সরগরম । নিতাই গিয়ে বসে তাদের জুতোর দোকানের টুলটি তে। তার ফেসবুক প্রোফাইলে বৌ ছেলে পুলে নিয়ে তার ছবি। পিছনের পটভূমিকায় দিলদার নগর শু কোং   এর ছবি আর  বাংলায় লেখা সাইন বোর্ডের নিচে দাঁড়িয়ে কিশোর নিতাই আর তার বাবা। স্টেটাস এ সে লিখে রেখেছে :
    Henry Lean
    Lives in Kaohsiung, Taiwan.
    From :Dildarnagar, India
    .

     
     
     
     
     
     
     
     
     
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ | ২৪২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • অমিতাভ চক্রবর্ত্তী | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১০:২৫541227
  • সময়ের বিশাল বিস্তার এই পর্বে। যেন একটি উপন্যাস বৃক্ষর বনসাই সে। লেখা এবং পড়া - দুইই কঠিন, খেই রাখতে। পাঠকের ভরসা এই যে, এই লেখক পারেন। পেরেছেনও। smiley
     
    অনেক টাইপো আছে এই পর্বে। মার্ক করে রাখা দরকার, পরে বই করে বের করার সময় কাজে লাগবে।
  • Kakali Bandyopadhyay | 223.223.***.*** | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১১:৩১541229
  • দিলদারের মনিহারী  দোকানের  নাম  ' টুকিটাকি '.
    রাজনারায়ণের মেয়েগুলিই  সেই  দোকানের  প্রধান  খদ্দের .
    স্কাউট  গাইড  ক্যাম্প  থেকে  ফিরে  আসার  পর  টিফিন  বেলার  খেলা  মানেই  নুড়ি  সাজিয়ে  চিন্হ রেখে  যাওয়া  একদলের  পিছনে  আর  একদলের  ধাওয়া ।..যদিও  সে  রোজকার  চেনা  পথ ,  তবুও  কি  তার  টানটান  উত্তেজনা .
    রবিবার  ছুটির  দিনে  ওই  স্কুলেই  ভোরে  উঠে  গান  শিখতে  যেত  যে মেয়েটা ,  'টুকিটাকি'  থেকে  দুটো  'সন্দেশ  বিস্কুট'  কিনে  খেয়ে  আগের  দিনের  চিহ্ন  গুলো  খুঁজে  দেখতো  সে  যতক্ষন  না  গানের  মাস্টারমশাই , দিদিমণিরা  আসেন .
    সেদিন  স্কুলবাড়িটা  একটু  একটু  অচেনা  লাগতো ... ওই  চিহ্ন  গুলো  ভরসা  দিত ...ওটা  আমাদেরই  স্কুল .
  • SUSANTA GUPTA | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১১:৫৯541230
  • আহা কী অপূর্ব জীবনের জলছবি ! দুরন্ত দিলদার ১৩ ! 
  • Aditi Dasgupta | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৯:২৮541239
  • @অমিতাভ চক্রবর্তী
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন