মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস নামগন্ধের ব্লার্ব লিখেছেন সদ্য প্রয়াত আরও এক বলিষ্ঠ গদ্যকার অজিত রায়।
তাঁর জবানীতেই লিখি, ‘উপন্যাস শুরু হচ্ছে সন্ত্রাস দিয়ে, মলয়ের এটা অমোঘ টেকনিক, -পাঠকের সামনে সন্ত্রাস ঘটিয়ে, তাকে তার মধ্যে হিঁচড়ে ঢুকিয়ে সন্ত্রস্ত করে, সন্ত্রাসের বিভীষিকা মেলে ধরা। বঙ্গ-কালচারের বর্তমান হাল বোঝাতে মলয় হাওড়া জেলার ভোটবাগানের লোহার কাবাড়িখানা, নদিয়া জেলার কালীগঞ্জের কাঁসা-পেতলের ভাংরি, বিভিন্ন জেলার আলুর কোল্ড-স্টোরেজ মন্তাজ করে ফুটিয়ে বঙ্গভুবন একাকার করে ফেলেছেন…নমঃশূদ্রদের খুন-ধর্ষণ-বাড়িঘর জ্বালিয়ে যখন তাড়ানো হয়েছিল খুলনার মাইড়া গ্রাম থেকে, পঞ্চাশ সনে, যুবক ভবেশকাকা রাতারাতি পালিয়ে এসেছিলেন কচি ফুটফুটে সৎ বোনকে কোলে নিয়ে। পুরনো বাড়ির পাড়ায় ইউনাইটেড রিহ্যাবিলিটেশন কাউনসিলের আগুন-খেকো নেতা ছিল ভবেশকাকা, যিনি বিধান রায় ট্রামের ভাড়া এক পয়সা বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে ট্রামে আগুন ধরিয়ে দেন…দেশভাগের খেলাপে নারাবাজি করেছিলেন,-হাতে পেলে জহোরলাল-জিনহাকে চিবিয়ে পোস্তবাটা করে। সেই ভবেশ মণ্ডল আজ মোকররি আর চাকরান মিলিয়ে বাহান্ন বিঘে জমি আর একলাখ কুইন্টাল ক্ষমতাসম্পন্ন মোজতাজ হিমঘরের অংশীদার। যিশুর মন্তব্য-‘আজকাল গ্রামগুলোর সত্যের স্বামীত্ব ভবেশকাকাদের হাতে। আর চাষির মুখের দিকে তাকালে সর্বস্বান্তের সংজ্ঞা টের পাওয়া যায়’।
প্রথমেই বলে রাখি, এই উপন্যাসের পটভূমি স্বাধীনতা পরবর্তী হুগলি, হাওড়া, ইত্যাদি জেলায় ঘোরাফেরা করেছে। খাদ্য আন্দোলনের বিধ্বস্ত সময়টা এখানে পরিষ্কার ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। চরিত্র বিন্যাস থেকে তাদের ভাষা সবই যুগোপযোগী। এতো গেল উপন্যাসের টেকনিকাল দিকগুলি। যা একজন দক্ষ ঔপন্যাসিকের কাজ, মলয় রায়চৌধুরী তার অন্যথা করেননি। কিন্তু কেন লিখছি এই উপন্যাস নিয়ে আমি? সেই প্রথম পাতা থেকে টানটান, ঋজু গদ্য। যার ঘরানাকে অনায়াসে সন্দীপনীয় বলা যেতে পারে, আবার মলয় রায়চৌধুরীর নিজস্ব স্টাইলকে উপেক্ষা করা যায় না কোনোমতেই। পুরো উপন্যাস জুড়ে চরিত্রগুলি আমাকে আবিষ্ট করে রেখেছে। কারা যেন হারিয়ে গেছে…একেকটি নাম হয়ে দু একলাইন লেখা হয়েছে তাদের, তবুও মনে জাগছে তাদের আলোআঁধারি।
যেমন অজিত রায় লিখেছেন, কাহিনির শুরু হচ্ছে সন্ত্রাস দিয়ে। গণপিটুনির ঘটনা চোখের সামনে দেখে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে ব্যাঙ্ককর্মী অরিন্দম মুখোপাধ্যায়। এক সবুজ টিশার্ট, যার বুকে লেখা, ‘ভ্রূপল্লবে ডাক দিলে দেখা হবে চন্দনের বনে’ যার হাতের চপারের ওপরে ওঠা, বাতাস ভেদ করে নামা, গদ আওয়াজের পরের দৃশ্য লেখা হচ্ছে বইয়ের প্রথম প্যারায়। ‘ময়লা চামড়ার তলা থেকে উথলে ওঠে সাদা গোলাপি নরম মাংস, টুটসি সমর সেনার হাসির ঠোঁটের মতন দু’ফাঁক কাটা জায়গা থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসে গলগলে গরম তাজা রক্তের নিটোল ছররা। বাতাসের ছোঁয়ায় গলে গড়িয়ে পড়ে ছররাগুলো’। হাওড়া জেলার ভোটবাগানের সেই গলির ভুলভুলাইয়ায় অরিন্দমের সঙ্গী হলেন পুলিশ আদিত্য বারিক। এই সেই ভোটবাগান যেখানে ‘এশিয়ার সবচে বড়ো লোহার ছাঁটের স্ক্র্যাপইয়ার্ড। সারসার খুপরি ঘর। অনুজ্বল শ্যামবর্ণ নর-মরদদের পাঁচমিশালি ভিড়। হলদে কমজোর টুনি। জেনারেটারের চাপাকান্না। অশীতিপর পাঁক। মাইকচোঙে পাঁচ-প্রহর লটারি। লোহার কালচে ছাঁট আর ভাঙা-ত্যাবড়ানো লোহার মরচে-পড়া ঠেক। এলাকাটা জুড়ে তেলকালির নড়বড়ে চোগা পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কারখানার সারিসারি ঢাঁচা। পুরো জায়গাটা মনে হয় নারী-বিবর্জিত। ছাঁট আর লোহাটুকরোর সাম্রাজ্যের দখল নিতে শেষ হয় না গান্ধী, গোলওয়লকর, মার্কসের কুলাঙ্গারদের কাজিয়া। ডোম বাগদি দুলে বর্ণাশ্রমের জেল ভেঙে স্বাধীন হবার পর, আধুনিকতার উন্নতি তত্ত্বের সাহায্যে বর্ণাশ্রম গড়ে ফেলেছে গামা রসগুল্লা মুন্না কওসর সীতারাম ড্যানি শেখ হিরার প্রজন্ম। ভেবে, রোঁয়ায় আতঙ্ক খেলে যায় অরিন্দমের। এ-ই তাহলে বঙ্গসংস্কৃতি’। আদিত্য বারিক পুলিশ হয়েও গণ্ডগোল দেখে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে এলেন অনায়াসে। আর রয়েছেন যীশু বিশ্বাস, যিনি খ্রীস্টান, কিন্তু নিজের ধর্ম পরিচয় লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করেন। যাঁর আলুর দোষ সম্বন্ধে নিজেই বলছেন, ‘মেদনিপুর বাঁকড়ো বর্ধমান গিসলুম হিমঘরের স্টাডি করতে। এখুন বারাসাত থেকে ফিরছি। আলু সম্পর্কে আমার সত্যিই দুর্বলতা আছে। মাছ মাংস ডিমের চেয়ে আমার আলু খেতে ভাল্লাগে। কলেজে পড়তুম যখুন, প্রফুল্ল সেন আলুর বদলে কাঁচকলা খেতে বলেছিল। তোরা তো সেসব জানিস না, লিকুইড ছিলিস। পয়লা জুলাই বিধান রায় ট্রামের ভাড়া এক পয়সা বাড়িয়ে বিদেশে হাওয়া হয়ে গিসলো, আর প্রথম ট্র্যামটায় ভবেশকাকা আগুন ধরিয়ে দিলে’।
এই সেই ভবেশকাকা যিনি বিধান রায় ট্রামের ভাড়া এক পয়সা বাড়িয়েছিলেন বলে ট্রামে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন, বর্তমানে যিনি কোল্ড স্টোরেজের মালিক, যাঁর সৎ বোন খুশিরানি মণ্ডল। এই সেই ভবেশকাকা যিনি ‘তিরিশ বছর আগে আরামবাগি প্যাঁচে কংরেসি আলুর দাম হঠাৎ বাড়লে, খাদ্য আন্দোলনের দিনগুলোয়, তুলকালাম করেছিল ভবেশকা। তাঁবাটে পেশিতে দোহারা, ঝাঁকড়া অবিন্যস্ত, একদিনের খোঁচা-খোঁচা, নোংরা ধুতি-শার্ট, থমথমে চোখে-মুখে চেঁচাত, দেশভাগ আমরা চাইনি। হাতে পেলে জহোর্লাল জিনহাকে চিবিয়ে পোস্তবাটা করে। আর আজ হিমঘরের অংশীদার ভবেশকা, সংরক্ষণের ক্ষমতার দ্বিগুণ আলু হিমঘরে ঢুকিয়ে দুলাখ কুইন্টাল আলু পচিয়ে, সেই একই হুগলি জেলার চাষিদের ভয়ংকর বিপদে ফেলেও নির্বিকার। পচেছে আরও অনেক হিমঘরে। চাষির মুখের দিকে তাকালে সর্বস্বান্তের সংজ্ঞা টের পাওয়া যায়’। এখন ভবেশ কাকার পায়ের গোদ ঢাকা পড়ে থাকে আলখাল্লায়, একসময় সেই ভবেশকাই বাসের মাথা থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে গেছিলেন পুলিশের তাড়া খেয়ে।
যীশু ল্যাপটপ নিয়ে হিমঘর স্টাডি করে। আর বিভিন্ন চরিত্রদের সঙ্গে পরিচিত হয়। ‘সরদারদের কাছ থেকে, মাটিঅলার কাছ থেকে, বাছনদারের কাছ থেকে, চাষির কাছ থেকে টাকা খাই। বস্তা পিছু ঘুষ নিই, ইচ অ্যাকর্ডিং টু হিজ এবিলিটি। আরে বিশ্বাসবাবু, এদিকের মাল ওদিকে না করলে কেউই সুস্হ জীবন কাটাতে পারে না। টাকা ছাড়া শান্তি কই। আমার ওসব ঢাক-ঢাক গুড়গুড় নেই। যিশুকে হতচকিত করেছিল নারায়ণ পোড়েল। সত্যবাদীরা আজও আছে পশ্চিমবঙ্গের বঙ্গসমাজে।
ঠিকাছে, তারপর বলুন। ল্যাপটপে টাইপ করতে থাকে যিশু, শুনে-শুনে। পেছন থেকে গ্রামীণ খোকাখুকুরা দেখতে থাকে পদিপিসির মার্কিন বাকসো’।
আর এই সময়েই যীশুর মনে পড়ে অন্য জেলার কথা।
‘যিশুর মনে পড়ে গেল সেই অডিটারদের চেহারা, যাদের কিছুদিন আগে পুরুলিয়া জেলা সমবায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একটা ঘরে তালাবন্ধ করে রেখেছিল। এই লোকগুনো বোধয় অন্যের জীবনকাহিনীতে তালাবন্ধ। বিপুলবপু লোকটা গ্রামের কিংবা ব্লকের কিংবা আরও বড়ো ভূখন্ডের সমসাময়িক রাজনীতিতে ভবেশকার চে উঁচুতে। চিৎকার করে মুণ্ডেশ্বরী নদীতে ঢেউ তোলে। নিজের কথাবার্তাকে বাকচাতুরীর আড়ালে কী উদ্দেশ্য দিতে চাইছে আঁচ করতে না পেরে, যিশুর মনে হল, এরা সবাই পার্টিমণ্ডুক, ছদ্মবেশী বেকার, আর ও এদের একটা ওয়াক-ইন ইনটারভিউ দিচ্ছে’।
সেই যীশু ভবেশকাকার ঘরে শুয়ে তারই সিন্দুক খুলে আবিষ্কার করে, ‘আলুর বণ্ডের বই, পাকিস্তানের পুরোনো একশো টাকার নোটের একটা বাণ্ডিল, উনিশশো পঞ্চাশ সালের হলদে খড়খড়ে পাকিস্তান অবজার্ভার আর দৈনিক আজাদ, দুটো একই মাসের। একটা ছবিসুদ্দু বিজ্ঞাপন লাল কালিতে ঘেরা। লাল শালুর পাক খুলে শতচ্ছিন্ন বইটা, গীতা নয়, লুপ্ত সোভিয়েত দেসে ছাপানো ‘দাস ক্যাপিটাল’, এত বছর পরও মোষের খুরের শিরীষ -আঠার ভকভকে স্তালিনি গন্ধ। সংগ্রাহকের জন্যে গর্বাচভের সৌজন্যে বইটার সোভিয়েত সংস্করণ এখন দুষ্প্রাপ্য’। খুশিকে জিজ্ঞেস করে, তোমার বরের কী হল খুশিদি? উত্তরে জানতে পারে, ‘বর্ধমান জেলার ছুতোর গাঁ’র সহদেব মণ্ডলের বড়ো ছেলে এখানের উপসাসথো কেন্দ্রে কাজ করতো, আমাকে দেখতে পেয়ে বিয়ে করতে চেয়েছিল একাত্তর সালে। দশঘরার পোড়ামাটির পরি বলেছিল আমাকে দেখে। পালটি ঘর ছিল, কাসসপ গোত্তর। খুন হয়ে গেল। ধড় পাওয়া গেসলো, মাথা পাওয়া যায়নি। সবাই বললে, নকশাল ছিল, তা-ই। দাদাও সে কথাই বলেছিল। দাদা কী করে জানবে বল? নকশাল তো ছিল ছোটো ভাইটা। নকশাল করলে বিয়ে করতে চাইবে কেন, বল? গোপের হাটের আড়তদার রামরতন মণ্ডলও বিয়ে করতে চেয়েছিল। পনেরো বছর আগের কতা। দোকানে আগুন লেগে জ্যান্ত পুড়ে মারা গেল সে। আমি খুব অপয়া’। তার যিশকার স্পর্শে ‘ খুশিদি ফিরে যেতে থাকে তিরিশ বছর অতীতে প্রতিবেশী তরুণের শ্রেণি-নিষিদ্ধ সম্পর্কে, অপ্রত্যাবর্তনীয় সময়ে’। আদতে খুলনার বাসিন্দা হলেও সেখানকার ভাষা ভুলে গিয়ে হুগলির গ্রামের ভাষা রপ্ত করেছে ভবেশ আর খুশি। পঞ্চাশ ছোঁয়া গ্রাম্য, মুকখু প্রোঢ়ার সঙ্গে যৌবন ফুরনো বিলেত ফেরত শিক্ষিত যিশুর শরীর-মনের অলিগলি জুড়ে অতীত খেলে বেড়ায়। ভবেশের এত জমিজিরেতের রহস্য জানতে পারে খুশির কথায়। ‘বিনময় করে। জানিস তো, বিনময়? ওখেনে আমাদের খেতখামার ঘরদোরের বদলে এখেনে কে একজন ফরোজন্দো মোমেনিন ছিল, তার সঙ্গে অদল-বদল। তক্কে-তক্কে ছিল দাদা’।
এই যীশুর বাবামায়ের মৃত্যু হয়েছিল অ্যাক্সিডেন্টে। ‘শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে, ল্যাজ-ওড়ানো ঘোড়ায় বসা নেতাজির মতন দেখতে ব্রোঞ্জের মনীষীর চোখের সামনে, হাত উঁচিয়ে ট্যাক্সি ধরতে গেলে, তিন নম্বর রুটের প্যাঙপেঙে জবেদকা বাসের ধাক্কায় হুমড়ি খেয়ে রক্তাক্ত, মায়ের ডান হাত তখুনও বাবার বাঁ হাতের মুঠোয়। রাস্তার লোকেরা প্রথমে বাসটাকে জ্বালিয়ে আর চালককে পিটিয়ে মেরে ফেলে, তারপর একটা পথচলতি প্রাইভেট গাড়িতে বাবা-মাকে চাপিয়ে নিয়ে গিসলো আর জি কর হাসপাতালে। পথেই মৃত্যু’। মর্গ থেকে লাশ উদ্ধারের সূত্রে যীশুর সঙ্গে আদিত্য বারিকের পরিচয়।
লক আপে কয়েদি পেটানো আদিত্যের কাছে গিয়ে অরিন্দমের একদিনের অভিজ্ঞতা এরকম—‘দশ কুড়ি পঞ্চাশ একশো টাকার প্যাকেট এনে দিতে বলেছিল অরিন্দমকে ওর অফিস থেকে। আদিত্যর বোনের বিয়ের যৌতুক। থোক টাকা থাকলে উঁচু জাতের ভালো চাকরে পাত্র পাওয়া সহজ, পাত্রী যে জাতেরই হোক না কেন। এই একগাদা টাকা নিয়ে বাড়ি যেতে চায় না অরিন্দম। মা, ছোটো ভাই বা তার বউ জেনে ফেললে কেলেঙ্কারি। পাটনায় থাকতে হঠাৎই একবার ও মাসকতকের জন্যে পাগল হয়ে গিসলো বলে বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব।
‘গেটের কাছে দাঁড়িয়ে প্রায় ঘন্টাখানেক হয়ে গেল। পা ব্যথা করছিল। এই শহরের চতুর্দিকব্যাপী নিনাদে হারিয়ে যায় আর্তনাদ আর কাতরানির ছোট্টো-ছোট্টো শব্দকণা। আক্রমণ আর আত্মরক্ষার উপস্হিতি সারাটা শহরের চরাচর জুড়ে। পুরুষকর্মীদের চাউনি রুমার দিয়ে মুখের ওপর থেকে পুঁছতে-পুঁছতে বাড়ি ফিরছে আলগা চটকের গৃহবধু কেরানি। সঙ্গিনীর সাথে আলোচনার বিষয়বস্তু গণেশঠাকুরের শুঁড় ডানদিকে শুভ না বাঁদিকে। ক্ষীণস্বাস্হ্য সরকারি বাস চলে গেল, নাগরিক বোঝাই, ফোঁটার মতন মানুষ ফেলতে-ফেলতে, জিরোবে গিয়ে ঘণ্টাখানেকের জ্যামে। বাসে উঠলেই লোকে বসতে চায় এ শহরে, যুবকরাও, যাতে কাঁধে কাঁধ না মেলাতে হয়। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে অভ্যাসমতন পথচারিণীদের ওপর চোখ বোলাচ্ছিল অপ্রস্তুত অরিন্দম। খিনখিনে ট্যাক্সির কাতার। ডিজেলের নাকজ্বালানো ধোঁয়া। ধোঁয়া-ধুলোয় মুখ ভার করে আছে আকাশ।
অফিসে আবার এলেন কেন অরিন্দমদা? পেছন ফিরে আদিত্যর থমথমে চেহারা দেখতে পেল অরিন্দম। মানুষকে নিজে হাতে পেটানোর আহ্লাদ থেকে, মুখের আনন্দময় প্রতিভা থেকেই বেশ বোঝা যাচ্ছে, আর কোনও দিন মুক্তি পাবে না আদিত্য। প্রতিনিয়ত ওর দরকার পড়বে প্রহারযোগ্য দেহ, সারাজীবন। রিটায়ার করলে কী করবে ও?’
অরিন্দম খুচরো কয়েন গুণতে থাকা মেয়েদের দেখেছে। তাদের নিঃস্পৃহতা তাকে জীবন সম্বন্ধে উদাসীন থাকতে শিখিয়েছে। এই অরিন্দমই আদিত্যর মুখে তিলজলার নাম শুনে উচ্ছল হয়ে ওঠে। ‘তিলজলায় একজন থাকে। আমি তাকে কখুনও দেখিনি। তার বিষয়ে জানিও না কিছু। এমনকী নামও জানি না। আমি তাকে বিয়ে করতে চাই। মনের ভেতর প্রেমের ফাঁকা জায়গাটায় বসিয়ে রেখেছি তাকে।
আদিত্য স্তম্ভিত। রেশ কাটলে বলল, আপনাদের এইসব ন্যাকান্যাকা পারভারটেড কথাবাত্রা শুনলে আমার পিত্তি জ্বলে যায়’।
খাদ্য আন্দোলনের সময় এই উপন্যাসের সময়কে যেন বেঁধে রেখেছে। পরবর্তী ত্রিশ বছরেও তার রেশ কাটেনি যেন। বারেবারে ঘুরেফিরে এসেছে সেই সময়ের অনুষঙ্গ। হুগলির আলুচাষিদের, হিমঘরের মালিকদের, সাধারণ চাষী বা খেতমজুর অথবা ব্যবসায়ী ফড়েদের মুখের ভাষায় রয়েছে কথ্য ভাষা। প্রায় পুরো উপন্যাসটি এই ডায়ালেক্ট অনুসরণ করে চলায়, উপন্যাসের গতিপথ যেন কিছুটা হলেও ভারাক্রান্ত লেগেছে আমার। লেখকের জবানীতে বারেবারে ‘গিসলো’ শব্দটির আস্বাদ তেতো লাগে। মূল চরিত্র যারা ওই অঞ্চলের বাসিন্দা নয়, তাদের মুখে ললিত ভাষার ব্যবহার হয়ত পাঠ-সুখকর হত। হয়ত এজন্যই বলা—যতক্ষণ না লিখিত রূপটি পাঠকের কাছে পূর্ণায়বয়ব পায়, সেই রূপটি প্রত্যক্ষ করতে পারে সে, ততক্ষণ সেই স্বাদ, গন্ধের রূপটি তার কাছে অধরা থেকে যায়।
কাহিনির মোড় ঘুরে যায় নদীয়া জেলায়। ‘হাওড়া জেলার ভোটবাগানে যেমন লোহার ছাঁটের বাবরি, তেমনি নদীয়া জেলার কালীগঞ্জে কাঁসা-পেতলের ভাংরি। সুইস ডেভেলাপমেন্ট কোঅপারেশানের আর্থিক সাহায্যে কাঁসা-পেতল কারিগরদের স্টেনলেস স্টিলের শ্বদাঁত থেকে বাঁচানো যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখতে অরিন্দমকে পাঠিয়েছিল অফিস। যাদের পয়সাকড়ি আছে তারা আজকাল স্টেনলেস স্টিলে খায়। যাদের অঢেল পয়সা তারা খায় লা-ওপালা কাঁচে। গরিবরা এনামেল ছেড়ে ধরেছে অ্যালুমিনিয়াম। রুজি-রোজগার বন্ধ হবার পর কাঁসারিরা ভিটে ছেড়ে চলে গেছে, কাঁখে কোলে বাচ্চা-বোঁচকাসুদ্দু, কৃষ্ণনগর শান্তিপুর নকাশিপাড়া কালনা মেমারি পাণ্ডুয়া চুঁচড়ো’।
এই উপন্যাসে ছোট্ট ছোট্ট অবসরে এক একটি চরিত্র আসে, যাদের মুখ দিয়ে সেই অঞ্চলের ঘটনা বলিয়ে দেন কাহিনিকার। সুভাষ খামরুই তেমনই এক চরিত্র।
‘মাটিয়ারি গ্রামের সুভাষ খামরুই অরিন্দমকে শুনিয়েছিল সেনকিট হ্যাজাকের গল্প। ব্রিটিস আমলে কালীগঞ্জ থানার মাটিয়ারির হ্যাজাক কব্জা করে ফেলেছিল কলকাতা ঢাকা কটক লখনো চাটগাঁ। বরযাত্রীরা ফিরতে পারত না সেনকিট হ্যাজাকের জ্যোৎস্না ছাড়া। বিজলিবাতি এসে খেয়ে ফেলল হ্যাজাকসুদ্দু কাঁসারিদের। মোরাদাবাদের কাঁসারিরা বাজার বুঝে মাল পালটে ফেলেছে। সেখানে তো কাঁসারি বাড়ির ছেলে ইন্দিরা গান্ধীর সুন্দরী নাতনিকে বিয়ে করেছে। এখানে দ্যাখেন খামরুইরা বাপ-পিতেমোর কাজ নুকোতে কোর্টে হলফনামা দিয়ে পদবি পালটে ফেলছে’।
কর্মভেদ অনুযায়ী যে জাতিপ্রথার সৃষ্টি, ধীরে ধীরে এই সময় থেকেই হয়ত তা নিতান্ত পেটের দায়েই লোপ পেতে থাকে।
কাহিনি পুনরায় ফিরে যায় ভবেশকার হাতে। ‘নিঃস্ব, সন্ত্রস্ত, অভুক্ত ভবেশকাকা কাঁধে খুশিদিকে চাপিয়ে বর্ডার স্লিপ হাতে বনগাঁ হয়ে শ্যালদা প্ল্যাটফর্মে উঠেছিল। জহোর্লাল ওদের মাটি থেকে উপড়ে ওদের দুরবস্হা দেখতে গিসলো নিজের চোখে শ্যালদা থেকে চটকলের গুদামে। সেখান থেকে বালিগঞ্জের যশোদাভবন ক্যাম্প। তারপর কলকাতার দক্ষিণে ধানখেত আর জলাজমিতে যে যেমন ঠাঁই নিতে পারে। যিশুর দাদুর অনেক ধানিজমি ছিল ওদিকে মুসুলমান ভাগচাষিদের বাস ছিল। এখুন তো সেসব জলাজমির নাম হয়েছে সূর্যনগর, আজাদগড়, নেতাজিনগর, শ্রীকলোনি, গান্ধি কলোনি, বাঁশদ্রোণি, বিজয়গড়, রামগড়, বাঘাযতীন, কত কী। যীশুর দাদুর ইংরেজ বন্ধুরা ডিঙি চেপে পাখি শিকারে যেত সেসব জলাজমিতে’। পড়তে পড়তে মন চলে যায় পুরনো সেই কলকাতার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে। চোখের সামনে ভবেশকা যীশুর দাদুর জমিতে মস্তানি করে বেড়ায়।
‘পোড়-খাওয়া তাঁবাটে পেশি, ড্যাংডেঙে হাত-পা, চওড়া ছাতি, কোঁকড়াচুল ভবেশকা রোজই বেরিয়ে যেত আন্দোলন করতে। খুশিদিকে যিশুর মায়ের কাছে রেখে যেত।
ট্র্র্যামের ভাড়া যখুন এক পয়সা বাড়ল, প্রথম ট্র্যামটায় ভবেশকাই আগুন ধরিয়েছিল, পুলিশ রেকর্ডে আছে। পাকিস্তানি ওপার বাংলা থেকে তখুন সত্তর হাজার লোক এসে কলকাতায় ফ্যা-ফ্যা করছে, অথচ রোজগারপাতির কাজ নেই। তখুনও কলোনিগুনো পশ্চিমবঙ্গে ছিল, কলকাতা হয়নি। নিত্যিদিন কলকাতায় গিয়ে পিকেটিঙ, ট্র্যাম জ্বালানো, বাস পোড়ানো, ব্যারিকেড, বোমা, অ্যাসিড বালব, মিছিল, র্যালি। বোমা বানাতে গিয়ে ভবেশকার কড়ে আঙুল উড়ে গিসলো। খুশিদির কান্নাই থামে না। কাঁদলেই টোল পড়ত থুতনিতে’।
খুব স্বাভাবিক ভাবে অল্প বয়সী যীশুর মনে ভবেশকা হয়ে দাঁড়িয়েছিল হি-ম্যান গোত্রের পুরুষ। আর খুশিদি ছিল ভবেশকার অংশ, তাই হয়ত তার ওপর বাড়তি টান জন্মেছিল সেই কিশোর মনে। হয়ত প্রেম বা ভালবাসা নয়, হয়ত নিত্যদিনের সঙ্গী হওয়ার কারণে খুশিদিকে সে তার অন্তরের কোমল দিকটি উন্মোচিত করে দেখাতে পারেনি। তার ওপর ছিল অশান্ত সময়। রোজ রোজ আন্দোলনের উত্তাপ।
‘ষোলোই জুলাই কলকাতার রাস্তায় সেনা নেবে গেল। তখুনকার দিনে র্যাফ ছিল না। শোভাবাজারে ভিড়ের ওপর গুলি চলেছিল আঠেরো তারিখে। প্রফুল্ল সেন ভয়ে এমন কেলিয়ে গিসলো যে বিদেশে আরাম আদ্দেক বাকি রেখে তিরিশ জুলাই তড়িঘড়ি ফিরতে হয়েছিল বিধান রায়কে। জহোর্লালের তো তখুন কানে-তুলো চোখে-ঠুলির রোগ, ভবেশকা বলেছিল’।
‘বিধান রায়ের আমলে যে খাদ্য রায়ট হয়েছিল, তা আবছা মনে আছে যীশুর। তখুন তো বর্গা আইনও হয়নি, পিএল চারশো আশির ল্যাং খেয়ে সবুজ বিপ্লবও হয়নি। ধানচালের কেনাবেচা সরকারি আওতায় নিয়ে গিয়ে গুবলেট করে ফেললে বিধান রায়। বাজার ধেকে উবে গেল চাল-গম। খাবার খুঁটতে কলকাতার ফুটপাথ ভরিয়ে ফেলেছিল গাঁয়ের লোকে, যে লোকগুনো কানিতে মাটির রং নিয়ে জন্মায়। ভবেশকা বিধান রায়কে মুখের ওপর বললে, সংগ্রহ বিতরণ তদারকির জন্যে গণসমিতি গড়া হোক পাড়ায়-পাড়ায়। বিধান রায় ভাবল, অ, বিরোধী দল পেছনের দরজা দিয়ে সেঁদোতে চাইছে। খাদ্যমন্ত্রী তখুন প্রফুল্ল সেন। তিরিশ হাজার পুলিশকে ধানচাল যোগাড়ের তদারকির কাজে লাগিয়ে দিলে। দাম বাঁধার হুকুম আর লেভি অর্ডার তুলে নেওয়া সত্ত্বেও, চাল গম ডাল তেল মশলার দাম বাড়তে লাগল’।
প্রায় প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি ঘটনার অভিমুখ ঘুরে যায় রাজনৈতিক বৃত্তান্তে। এ যেন প্রায় জোর করে বিখ্যাত রাজনীতিবিদদের টেনে আনা! এ যেন চিরকেলে বাঙালির মুখর রাজনৈতিক খেউর। যা একসময় রকে, চণ্ডীমণ্ডপে হয়েছে, অধুনা পাড়ার মোড়ে, ক্লাবে বা সোস্যাল মিডিয়ার পেজে।
‘ভোর পাঁচটায় খুশিদিকে মায়ের জিম্মায় দিয়ে বিধান রায়ের বাড়ির সামনে ছাত্রদের জড়ো করে ফেলেছিল ভবেশকা। মাথা-গরম টাটকা সভা-ভাঙা মিছিলটা যখুন এগুচ্ছে, প্রিন্সেপ স্ট্রিট থেকে রইরই করে এসে হামলে পড়েছে পুলিশ। খণ্ডযুদ্ধ। সুযোগ বুঝে গুণ্ডা-মস্তানরাও ফাঁকতালে নেবে পড়েছিল। তোড়ে বৃষ্টি এসে কিছুক্ষণের বিরতি দিলে কী হবে, ভবেশকা আশুতোষ বিল্ডিঙে ছাত্রদের জড়ো করে, ঠেলাগাড়ি আর বিদ্যুৎ বিভাগের মই এনে রাস্তা জ্যাম করে দিলে। পুলিশের হাত থেকে বেটন ছিনিয়ে নিয়েছিল ভবেশকা। সন্ধে নাবতে, রাস্তায়-রাস্তায় আলো ভেঙে ফেলার নেতৃত্ব দিলে। অন্ধকারে জ্বলেছে গাড়ির টায়ার, ট্র্যাম-বাস। ঠেলাগাড়ি দমকল অ্যামবুলেন্স। মরে ছাই হয়ে গেল সনাতন কলকাতিয়াদের তিলোত্তমা কলকাতা। গোবিন্দ বল্লভ পন্হের মাথা-কাঁপানো অনুমতি নিয়ে গুলি চালালে পুলিশ। ভবেশকার বাহুর মাংস খাবলে শিস দিয়ে চলে গিয়েছিল গনগনে বুলেট’।
এরপর আর কী হতে পারে? পালিয়ে যাওয়াই যেন নিয়তি মানুষের। হয় পালিয়ে বেঁচে যাওয়া নয়ত একেবারে হারিয়ে যাওয়া। তবে পালিয়ে গেলেই যে বহাল তবিয়তে কেউ বাঁচবে, তেমন নিশ্চয়তা কোথায়? যা পেরেছিল ভবেশকা, সবাই কি তেমনি আখের গুছিয়ে নিতে পারে? সমূলে নিজেকে উৎপাটন করে দিতে পারে?
‘তারপর ব্যাস, ছেষট্টির খাদ্য আন্দোলনের একদিন সকালে পাড়ার সবাই টের পেল, ভবেশকা রাত্তিরে ফেরেনি। কিন্তু খুশিদিও বাড়িতে নেই। আগের দিন সন্ধে থেকেই দেখা পাওয়া যায়নি ওদের। কলোনির লোকেরা কত জায়গায় খুঁজল ওদের। কোথাও ওদের লাশ পাওয়া গেল না; হাসপাতালে, থানায়, মর্গে। কত জায়গায় সাইকেলে চেপে খোঁজ করেছিল যিশু, দিনের পর দিন। ভোরে তিলকনগর, সকালে পোদ্দারনগর, দুপুরে নেলিনগর, বিকেলে বাপুজিনগর। না, কেউ ওদের খবর জানে না। কেউ দেখেনি ওদের। অমন চটক আর গা-গতর, কেউ তুলে নিয়ে যায়নি তো খুশিদিকে, মা বলেছিল বাবাকে। খুঁজতে-খুঁজতে, নিজের প্রগাঢ় অনুভূতির ক্ষত আবিষ্কার করে কেঁদে ফেলেছিল যিশু, একা-একা দাশনগরের কাঁচা রাস্তায় দাঁড়িয়ে’।
কিশোর মনের ক্ষত শুকিয়ে যেতে সময় লাগে। দাগ তো থেকেই যায় কিছু। যীশু পরবর্তীকালে আবার ফিরে আসে সেই বৃত্তে। হিমঘরে ঘুরতে ঘুরতে আবিষ্কার করে, এমন কত কত চরিত্র যারা হারিয়ে যায় বা গেছে কালেদিনে। ভবেশকাদের ফিরে পাওয়া গেলেও সেই চরিত্ররা চিরতরে হারিয়ে গেছে। যেমন মোমতাজ হিমঘরের ক্যাশিয়ার শাসমল। কৃপাসিন্ধুর মুখ থেকে যীশু জানতে পারে প্রত্যেক বছর খাতাপত্রে হিমঘরে লোকসান দেখানোই দস্তুর। যদিও সংরক্ষণ ক্ষমতার অনেক অনেক বেশি আলু রাখে তারা, এইসব হিসেবনিকেশ কলকাতার খবরের কাগজে উঠে আসে না। আলুর দোষ খুঁজতে এসে এত রকম সমস্যা ও কারচুপির দেখা পেয়ে গেছে যীশু, যা ছিল তার কল্পনা বা অভিজ্ঞতা অতীত।
‘এর আগে অনেক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থেকেছে যিশু। কত কারখানা আর ব্যবসা দাঁড় করিয়ে দিতে সাহায্য করেছে মোদি গোয়েঙ্কা মল্ল ভারুচা খান্না খৈতান লালওয়ানি কেশওয়ানি মাহিন্দ্রা শিল্পপতিদের। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের। স্রেফ মগজ খাটিয়ে। এরকুম অভিজ্ঞতা হয়নি আগে। পেরু না বোলিভিয়া কোত্থেকে এসে বাঙালি জীবনে ঢুকে পড়েছে নির্বিকল্প আলু’।
হিমঘরের সার্ভে করতে গিয়ে আলুচাষের খুঁটিনাটি চোখের সামনে না দেখলে যীশুর এক অজানা জগত সম্বন্ধে কোনো ধারণাই হত না। আলুহীন পৃথিবী আজ তার কাছে আলুনি।
‘আলুহীন পৃথিবী ভাবাই যায় না। বেলে কিংবা পলি দোআঁশ অল্প-টোকো জমিতে মখমল মাটির লেপ চাপা দিয়ে কেমন ডিম্বাশয় গোলগাল, তিন থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে গভীর আয়ত চোখে ভূমিষ্ঠ হয় চন্দ্রমুখী আলু। ভূমিষ্ঠ হয় জ্যোতি অলঙ্কার কুন্দন সিঁদুরি নবীন সফেদ কুমার বংশের খোকাখুকু যুবকযুবতি। এদের অনেকে চন্দ্রমুখীর সদবংশের নামে পৌঁছোয় বাজারে। ভিজে হাওয়া আর কুয়াশা সহ্য হয় না ওদের। নাবি, ধসা, ভুষা, সাঙ্কোষপোরা রোগে ধরে। বড্ডো সুখী ওরা, তাই উই পোকা, পিঁপড়ে, কাটুই পোকা, লাল বিটল, জাব পোকা, থিপস, সাদা গ্রাব, সুতলি পোকার দলবল সুযোগ পেলেই ওদের শীতের রাত্তিরে জাপটে ধরে। ওদের আঃ উঃ লক্ষ্মীটি পায়ে পড়ি, প্রাণে মেরো না, বাঁচাও-বাঁচাও নিঃশব্দ চিৎকার মাঝরাতে মাটিতে কান পেতে শুনতে পায় আলমপুর গ্রামের কাশীনাথ মাইতি। টাকার মতন আলুও বহুবল্লভা’।
কাহিনির গতি আবার ঘুরে যায় অরিন্দম আর আদিত্যর দিকে। আদিত্য পুলিশ হলেও তত মোটা দাগের নয়, যতটা সিনেমায় দেখায়, আবার ততটাও সূক্ষ্ম বোধসম্পন্ন নয় যে তাকে সাহিত্যের সমঝদার বলা যাবে। ফলে অরিন্দমের কথায় সে একপ্রকার ক্ষেপে ওঠে। প্রসঙ্গ হল—পুলিশের কবি, সাহিত্যিক হওয়া।
‘আজগাল তো পদ্য লিকিয়েরাও পুলিশ কমিশনার হয়ে যাচ্চে। জিভের ডগা মুড়ে জানায় আদিত্য। রুণু স্যার ঠিকই বলেছিল, পদ্য লিকে-লিকে কলকাতা পুলিশের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল তুষার তালুকদারটা’।
অরিন্দম এই সুযোগে খোঁচা দিতে ছাড়ে না আদিত্যকে।
‘তুমিও লেখো না। তুমি পারবে। ধর্ষণকে বলতে হবে নিগ্রহ বা নির্যাতন’।
‘অরিন্দমের খোঁচাটা সূক্ষ্ম হয়ে গেল বোধয়, মর্মার্থ বুঝতে পারল না আদিত্য। বলল, পাগল নাকি। পদ্য লেকে বলে দীপক রুদ্র আর পার্থসারথী চৌধুরী সুপারসিড হয়ে মুখ্য সচিব হতে পারল না, দেখচেন না। প্রত্যুষপ্রসূন ঘোষ তো পদ্য লেকে বলে প্রোমোটি আই এ এস হতে পারেনি। তারাপদ রায় অবশ্য হয়েছিল মজার-মজার পদ্য লিকতো বলে। চাকরিটা খাবেন দেকচি। পদ্য নাটক-ফাটক লিকে মন্ত্রী-টন্ত্রী হওয়া যায় বটে। কিন্তু সিরিয়াস সরকারি কাজে ওসব চলে না’।
কাহিনির গতিবিন্যাস যথাযথ। পড়তে গেলে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার উপায় নেই। এমনকি পাঠকের আচ্ছন্ন হয়ে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। মেদবাহুল্য নেই প্রায়। সুঠাম, ছিমছাম আর টানটান এক কাহিনি, যার সঙ্গে পথ চলায় বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হবে পাঠক। কাহিনির সময়কালে এক মুহূর্তে পৌঁছে দেবে তাকে। রাজনৈতিক বৃত্তে কাহিনিকে চালিত করার চেষ্টা আছে, সেক্ষেত্রে অনেকটাই সফল হয়েছেন অভিজ্ঞ কাহিনিকার। মাঝেমাঝে যদিও মনে হয়েছে, ওপরমহলের রাজনৈতিক চরিত্রদের মুখরোচক বৃত্তান্ত বলে বাজি মাত করার চেষ্টা করছেন তিনি। ভবেশকার চরিত্র রয়েছে একমাত্র কর্মী হিসেবে। বিশ্বাসযোগ্যতার ধার ঘেঁষে বেরিয়ে গেছে সেই চরিত্র। ভাষা ব্যবহার প্রসঙ্গে আবারও আসি। জেলা ভিত্তিক চলিত ভাষার ব্যবহার করেছেন কাহিনিকার। প্রতি মুহূর্তে, এমনকি নিজের অর্থাৎ কথকের বয়ানেও। চরিত্রদের মুখে যা মানানসই হত, কথকের বক্তব্যে সেই ভাষার প্রয়োগ আমার কাছে শ্রুতিসুখকর মনে হয়নি।
সর্বোপরি, এটুকুই বলার, এই কাহিনির মধ্যে এমন অনেক রসদ রয়েছে, যা পাঠক বা ভবিষ্যতের লেখকদের কাছে শিক্ষণীয় হয়ে রয়ে যাবে। এবং এই লেখকের কলমের জোর ঈর্ষণীয়।
যাই হোক না কেন, পুরো কাহিনিকে লিপিবদ্ধ করে ফেলতে চাই না। তবে শেষটুকু বলে দিতে নেই—এই নিষেধাজ্ঞা মেনে নিতেও পারলাম না। কাহিনির শেষ হচ্ছে খুশিদি আর তার যিশকার পলায়ন বৃত্তান্ত দিয়ে। এইখানে গিয়ে পাঠক এক রহস্যের মুখোমুখি হবে হয়ত। অথবা কিছু প্রশ্নের মুখে পড়বে নিশ্চিত। রাজনীতি ছেড়ে ভবেশকার পলায়ন, খুশিদির সঙ্গে বিবাহ স্থির হওয়া পাত্রদের অকাল মৃত্যু—এইসবের পিছনে কি অন্য কোনো কাহিনি রয়ে গেল তাহলে? নাকি এক কল্পনার ভ্রাম্যময় জগতে পাঠককে দুম করে ছেড়ে দিয়ে লেখকের পলায়নগামী হওয়াই ছিল উদ্দেশ্য?
‘চুপ করলি কেন? আরও বল, যিশকা।
তুমি অনিমা, তুমি লঘিমা, তুমি গরিমা, তুমি প্রাপ্তি, তুমি প্রকাম্য, তুমি ঈশিত্ব, তুমি ঈশিত্ব। এসব মন্তর যিশুখ্রিস্টের মায়ের জন্যে।
সে কে?
আমার মা-বাবার ভগবান। যিশু কৈশোরের স্মৃতিতে যেতে চেষ্টা করে।
চুপ করে গেলি কেন? চুপ করিসনি। বল। বলতে থাক। যিশকা।
তোমার ডান কাঁধে পোকা কামড়াল বোধয়। লাল হয়ে গেছে।
ওটা জড়ুল। জন্মে ওব্দি আচে। তুই থামলি কেন? খুশিদির কন্ঠস্বরে ভাঙন।
তুমি মঙ্গলা, তুমি বিজয়া, তুমি ভদ্রা, তুমি জয়ন্তী, তুমি নন্দিনী, তুমি নারসিংহী, তুমি কৌমারী। কিছুক্ষণ চুপচাপ, তারপর শেষতম নিদানের মতন যিশুর ফিসফিস, আর কত কষ্ট পেতে চাও খুশিদি? কেনই বা চাও?’
এইখানে এসে তার চিরপরিচিত খুশিদিকে অন্যভাবে পায় যীশু। সকল ‘মুগ্ধতাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে যে সত্তা, তার দুর্নিবার ঔজ্জ্বল্যের সঙ্গে পরিচিত হয় যিশু’।
আর তারপরেই পাঠক আবার দ্বিধায় পড়বে। আলখাল্লা পরিহিত ভবেশকা স্রেফ পায়ের গোদ ঢাকতে(কোথাও কি পাঠকের মনে পড়ে যাচ্ছে না, বিশ্ববরেণ্য কবির কথা?) এই উপায় নিয়েছিল নাকি সত্যি সত্যিই পীর সাজার অজুহাত ছিল এইসব? নইলে ভবেশকা জলপড়া দিয়ে মানুষের রোগ সারিয়ে দেয় কীভাবে? জলপড়ার বাটি হারিয়ে যাওয়ায় খুশীর সঙ্গে মনান্তর হয় ভবেশকার। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে খুশী যীশুর সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার দিনক্ষণ স্থির করে। কাহিনি শেষ হয়ে যায় এখানেই। পাঠক মাঝপথে বসে থাকে।
‘যিশুর মাথার ওপরে সজোরে বাড়ি পড়তে, হাতছাড়া ব্রিফকেস ছিটকে গিয়ে লাগে বটগাছের ঝুরিস্তম্ভে আর ডালা খুলে শুকনো পাতার ওপর ছড়িয়ে পড়ে শার্ট-প্যান্ট, কাগজপত্তর, টর্চ, টাকাকড়ি, ডটপেন, ক্যালকুলেটর, মোবাইল ফোন, ক্রেডিট কার্ড, চেকবই, পাসপোর্ট, টাই, ঘড়ি, ডাকটিকিট, তুষলাব্রতর সরষে আর শুকনো মুলোফুল। টাল সামলে সোজা হয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করলে, পিঠের ওপর লাঠির শব্দ ওঠে। তারপর পায়ে আর কাঁধে। তবু দাঁড়াবার চেষ্টা করে যিশু। মাথার ওপর আবার আঘাত। যিশুর পরিপাটি আঁচড়ানো দামি পরচুলা মাথা ধেকে খুলে বেরিয়ে গেলে, আবার আঘাত। সেই মুহূর্তে, যিশু দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছে তখুনও, অন্তরীক্ষ থেকে পতনরত চকচকে রুপোলি কিলবিলে সাপটার ল্যাজ ধরে হ্যাঁচকা টান দ্যায় বুড়োশিব। প্রচণ্ড আওয়াজ তুলে কাছেই বজ্রপাত হল কোথাও। বজ্রপাতের কাঁপুনিতে, মৌমাছির চাক থেকে কয়েক ফোঁটা মধু ঝরে পড়ে যিশুর রক্তাক্ত মাথায়’।
‘শ্বাস দ্রুত আর হৃৎস্পন্দন খাপছাড়া হয়ে যাচ্ছে যিশুর। ফুসফুসে ভাসমান রক্তের হেমোগ্লোবিনে অক্সিজেনের স্হান সংকুলানে ব্যাঘাত ঘটছে বলে মস্তিষ্কে পৌঁছোতে অসুবিধা হচ্ছে। কপালে, হাতের চেটোয়, ঘাম জমছে আর জুতোর মধ্যে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে আঙুলগুনো। আলজিভের চারিপাশ শুকিয়ে যাচ্ছে। ক্রমক্ষীয়মান অশরীরী হলুদ ও বেগুনি অন্ধকার-কণার অজস্র খুদে-খুদে ফুল ভাসছে অস্পষ্ট চরাচর জুড়ে’।
‘ব্রিফকেস থেকে পড়ে বহুকালের পোরোনো হলদে খড়খড়ে কাগজের পাতা উড়তে থাকে ইতিউতি। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের খবরের কাগজ। প্রথম পৃষ্ঠায় তলার দিকে ডানকোণে ফুটফুটে আড়াই বছরের নাতনির ফোটোর তলায় তার হারিয়ে যাবার বিজ্ঞাপন দিয়েছে দাদু মিনহাজুদ্দিন খান। মেয়েটির ডান কাঁধে জড়ুল। ডান চোখে তিল আছে। কাঁদলে থুতনিতে টোল পড়ে। মেয়েটির নাম খুশবু। ডাক নাম খুশি’।