এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ভূত-ই ভবিষ্যৎ 

    Rajat Das লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ৪৮ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • সোগাদা অর্থাৎ সোগেন্দ্রনাথ সাহার জন্য অগত্যা বইমেলায় গেছলুম। আমি বইমেলায় যাইনা। আমার না যাওয়াই ভাল ভেবে যাইনা। কারণ রেস্তোরাঁর সামনে হরেক কিসিমের সুখাদ্যের গন্ধ শুঁকে পালিয়ে যাওয়ার মত দুঃখের কিছু নেই। আমার কাছে বইমেলা ব্যাপারটাও ঐ ধাঁচের। থরে থরে সাজানো বই, নেড়েচেড়ে দেখে চলে আসো... কারণ বইয়ের যা দাম তা কেনার সামর্থ্য আমার মত অর্থনৈতিক দুর্বলের কাছে সোনা কেনার মতই। যাইহোক, বছর দুয়েক হল সোগাদার সাহিত্য জগতে বিশাল নাম। সোগাদার লেখা ভূত, পেত্নী, মামদো, ব্রহ্মদত্যি ইত্যাদি তো আছেই। তার সাথে সোগাদার দোকানে আরও মেলে অলৌকিক ও তন্ত্রমন্ত্র। মানে ভৌতিক, অলৌকিক ও তান্ত্রিক সাহিত্যের বিশাল ভান্ডার। প্রতিমাসে কোনো না কোনো প্রকাশক ধুমধাম করে প্রকাশ করছে, স্বনামধন্য সাহিত্যিক সোগাদার কোনো না কোনো বই। অবশ্যই ভৌতিক, অলৌকিক কিংবা তন্ত্রমন্ত্র জঁরের। ওসব ছাড়া উনি অবিশ্যি অন্য কোনো বিষয়ে লিখতে পারেন না। ওঁর থেকে যদিও কোনো পাঠক বা প্রকাশক আশাও করেননা। কয়েকদিন আগেই সোগাদা বলেছিলেন, এক বড়সড় প্রকাশকের কাছে নাকি কয়েকমাস আগে বইমেলায় ছাপার জন্য একটা উপন্যাস লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন। উপন্যাসটি পড়লে নাকি পাঠক নাকের জলে চোখের জলে হয়ে যাবে, মানে বলতে চাইছি কেঁদে ভাসাবে। সেই প্রকাশক নাকি সোগাদাকে দূর দূর করে ভাগিয়ে দিয়েছে। ওসব নাকিকান্নার লেখালিখি নাকি এখন আর চলে না। অগত্যা সোগাদা ফের নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছেন ভূত প্রেত দত্যি-দানোর সমুদ্রে।

    স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ভৌতিক গপ্প লিখেছিলেন। ভূতকে কেউই ছেড়ে থাকতে পারেননি। প্রফুল্লবাবু সারাজীবন সামাজিক আলো অন্ধকার নিয়ে লিখেও পার পাননি। তিনিও হাত সেঁকে ছিলেন, ভূতেরা ছিলেন ভূতেরা থাকবেন লিখে। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, যাঁর রস সাহিত্যে আকাশ জোড়া খ্যাতি। শেষের দিকে রস সমুদ্র ছাড়াও শ্রীকৃষ্ণ কিংবা পরমহংসকে ধরে, আধ্যাত্মিকতার জারকে পাঠককে ডুবিয়ে ছেড়েছেন। সেই সঞ্জীববাবুও ভূতকে ছাড়তে পারেননি। তাঁরও ভূত সমগ্র বই আছে। সেদিনের কার কথা বাদ দিই? বিভূতি থেকে শরদিন্দু কিংবা সুনীল থেকে শীর্ষেন্দু সকলেরই ঝোলায় ভূতেরা ছিল। তার সাথে ছিল গোয়েন্দা। দু চারজন বাদে গোয়েন্দা গপ্পেও অনেকেই হাত পাকিয়েছেন শুধু নয়, দুনিয়া জয় করেছেন। শরদিন্দুবাবুর ব্যোমকেশ এখন রূপোলী পর্দা কাঁপাচ্ছে। এমনকি সমরেন্দ্র পাণ্ডে অর্থাৎ স্বপন কুমার পাল্প ফিকশনে গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জিকে দিয়েই যাবতীয় ফানুস উড়িয়েছেন। তাঁর অলৌকিক, তান্ত্রিক কিংবা ভৌতিক সৃষ্টির কথা আমি শুনিনি।
    কিন্তু সে ছিল সাহিত্যের একটি স্বর্ণযুগ। যখন অধিকাংশ পাঠককুল সামাজিক পটভূমিকায় গপ্প উপন্যাস পড়তে ভালবাসতেন। তার ফাঁকে ফাঁকে অবিশ্যি ভূত বা গোয়েন্দাও চলত। মূলতঃ কিশোর কিশোরীরা অলৌকিক ভৌতিক বা গোয়েন্দা গপ্পের দিকে বেশি ঝুঁকত। ইদানিং কয়েক বছর হল দেখছি অলৌকিক ভৌতিক জঁর সাহিত্যের আঙিনায় প্রধান হয়ে উঠেছে। তার সাথে সঙ্গত করছে তন্ত্র মন্ত্রের কাহিনী। ব্যাপারটা এতটাই সিরিয়াস যে মূল ধারার কিছু সাহিত্যিক তো আছেনই। সঙ্গে আবির্ভূত হয়েছেন কয়েক ডজন স্পেশালিস্ট লেখককুল। যাঁরা শুধুমাত্র ভৌতিক, অলৌকিক আর তন্ত্র মন্ত্রের কাহানিই লেখেন। যাঁদের লেখার সাথে মূলধারার সাহিত্য অর্থাৎ বাস্তবিক সমাজ, সংসার, মূল্যবোধ, মানব জীবনের ক্রাইসিস বা রাজনীতি এসবের সঙ্গে দূর দূর পর্যন্ত কোনো যোগ নেই। সাহিত্য যেখানে একটুও ভাবাবে না। হাসাবে না। কাঁদাবে না। শুধুই নিছক বিনোদন বিলোবে। শুধুই কাঁড়ি কাঁড়ি ভয় বিকোবে। তাই গা ছমছমে ভয়ের গপ্পই এখন বিকোচ্ছে। ভরপুর বিকোচ্ছে। সবটাই বোধহয় ভয়ের দুনিয়া... মূল্যবোধের সাহিত্য এখন অতীত। 

    এখনও যাঁরা সামাজিক মূল্যবোধের সাহিত্য রচনা করে চলেছেন, তাঁরা বইমেলায় একা একাই নিঃসঙ্গ দ্বীপের মত ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের রচিত বইগুলো স্টলে স্টলে রুক্ষ পাটাতনের শুষ্ক টেবিলে কান্নারত। কদাকচিৎ দু একজন বোদ্ধা পাঠক যদি এসে কয়েক পৃষ্ঠা উল্টে দেখে তো বর্তে যায়। আর ওদিকে ভূতেদের নিয়ে ঘর করা লেখকগণের চাদ্দিকে থিকথিকে ভিড়। অল্পবয়েসী বেশি বয়েসী সবধরনের পাঠকেরা নিজের বইয়ে একখানি সইয়ের জন্য দুই তিনঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেও কসুর করছে না। সেইসব সই শিকারী পাঠকদের দেখিয়ে সোগাদা নিজের গুটখা খাওয়া কালো দাঁত বের করে খ্যাস খ্যাসিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, দেখলি... বেঁচে থাকা মানুষের গপ্প লিখে এখন কিস্যু জোটেনা। ভূতের জন্য আমাদের কত কদর!! সাহিত্যে ভূতই হল ভবিষ্যৎ।

    _____________
    ©রজত দাস
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Anindya Rakshit | ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:০৮738190
  • একদম হক কথা বলেছেন yes
  • Manali Moulik | ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:২৪738191
  • ধূর! বিরক্তি লাগে এসব ভূত প্রেত। সামাজিক প্রয়োজনীয়তা কি চলে গেছে সাহিত‍্যের?
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক প্রতিক্রিয়া দিন