কাঞ্চি মোটামুটি হিসাব করে দেখেছে সার্কাস আসে নভেম্বরের মাঝখানটাতে, ঠিক যখন ওদের পরীক্ষা চলে। অন্য ইস্কুলের থেকে ওদের রাজনারায়ণ ইস্কুলের একটা আলাদা ব্যাপার হলো ওদের আনুয়াল পরীক্ষাতেই এসপার ওসপার হয়না। এপ্রিল,সেপ্টেম্বর আর নভেম্বর ---মোট তিনটে পরীক্ষার উপর গড় হয়। গড়ে পঞ্চাশে সতেরো পেলে পাস। তার মানে আগের দুটোতে কেউ যদি মোট একান্ন তুলে ফেলে তাহলে আর তাকে ফেল করানো যাবেনা। কিন্তু শেষের পরীক্ষাটাতে না বসতে চাইলে কী হবে, সেটা কাঞ্চি ঠিক জানেনা। ভয়ও করে জিজ্ঞেস করতে। যা মেজাজ একেকজনের! মা-ই বা কম কী? তবে শ্যামলীদিকে একদিন খেলার ক্লাসে একটু আস্তে আস্তে জিগ্যেস করবে কিনা ভাবে। কিন্তু, উনি আবার হয়তো হেসেই মাকে বলে দেবেন। তার পরে কী হইবে ও বেশ ভালোই জানে! তার চেয়ে আগেভাগে বেশি বেশি পড়ে অনেক নম্বর তুলে নিলে শেষেরটায় চাপ কম থাকবে। পরীক্ষা শেষে যোগ দিতে পারে সার্কাসে। দিলদারনগর থেকেই ও জয়েন করবে। তারপর জানুয়ারিতে তো স্পোর্টস, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা সব চলে, ক্লাস প্রায় হয়ইনা। ফেব্রুয়ারির গোড়ায় নাহয় ফিরে আসবে। ডিসেম্বর জানুয়ারি পর্যন্ত দিলদারেই থাকে সার্কাস,তারপর হয়তো কিছুদিন ওকে বাইরে থাকতে হতে পারে। বাবাকে বলে দেখবে সেই জায়গা থেকে নিয়ে আসতে পারবে কিনা। তবে ট্রেনে উঠিয়ে দিলে ও কী আর পারবেনা? রেল সহর পর্যন্ত এলেও পারবে। ও যায়না সেখানে? বাস ধরে চলে আসবে। একটু এডজাস্ট সকলকেই করতে হয় সংসারে থাকতে হলে-- মা বাবাকেই তো বলতে শোনে!
জানুয়ারীর রোদঝলমলে কনকনে শীতের দিনটিতে কাঞ্চি একা একাই চলে গেলো ক্যাম্পে যোগ দিতে। কতটুকু আর ওদের বাড়ি থেকে! সবাই যে খুব উৎসাহ দিলো এমন নয়। আবার বাধাও দিলোনা। বিদ্যাসাগর বিদ্যাপীঠে চলবে সে ক্যাম্প। এ ইস্কুল নাকি অনেক পুরোনো। কেউ কেউ একে ‘ হাঁড়ি ভাঙা' ইস্কুল বলে। কেন বলে কাঞ্চি ঠিক জানেনা। এটা ছেলেদের ইস্কুল। মেয়েদের বিভাগ রাস্তার ওপাশে। ইস্কুলের মধ্যে মাঠ আছে , আবার পাশে একটা মস্ত বড় মাঠও নাকি ওদের। সেখানে একবার কালীপুজোর সময় ভয়ঙ্কর কঙ্কালের মুন্ডু তালগাছে ঝুলছিলো। কাঞ্চি খুব ভয় পেয়েছিল। ও পথে আসতেই চাইতোনা। কিন্তু এখন ওসব ভয় নেই। দুপুরে একবার এসে ভাত খেয়ে যাবে। তারপর আবার চারটে পর্যন্ত চলবে অনুশীলন।
ক্যাম্পে ছেলের সংখ্যা বেশি। মেয়ে কম। একটা সরু কালো ফ্রেমের চশমা পরা দিদি ওকে খুব আপন করে নিলো। ও মুগ্ধ হয়ে গেলো। দিদি পড়ে ক্লাস নাইনে। প্রথমে ওরা শপথ নিলো। তারপর নানা রকম কসরত এক এক করে শিখতে লাগলো। দু জন স্যার আর এক জন ম্যাডাম শেখাতে শেখাতে নানান গল্প করতে লাগলেন। এক স্যার এর ছেলে ক্যাম্প এর কোনো দাদার সাথে একই ইস্কুলে পড়ে। তবে ক্লাসে উঠতে পারেনি এ বছর। স্যারই বললেন সোজাসাপ্টা ছেলের ফেল হবার কথা। তারপর রাজেশ খান্নার মত একটা হাত একটু ছুড়ে আঙ্গুলগুলি কপালের একটু ডান দিকে ঠেকিয়ে বললেন “ ব্যাড লাক !” খুব ভালো লাগলো কাঞ্চির । কম নম্বর পেলে ও ও এভাবে বলবে ঠিক করলো। নয়তো সবাই বলবে ফাঁকি মেরেছে! ও ফিসফিস করে কথাটা আওড়ালো কিছু সময়, ড্রিল এর ফাঁকে ফাঁকে।
কী করে জানি এক সপ্তাহ চলে গেল। পরের সপ্তাহের শুরুতে ওরা ছোট ছোট মানুষ পিরামিড তৈরী করতে লাগলো। তারপর পিরামিডের আকার বড় হতে লাগলো। কাঞ্চি সবচেয়ে ছোট হওয়ায় ওকে একেবারে মাথায় উঠতে হয় সবসময়। এমনিতে মজার, কিন্তু মুশকিল হলো ছেলেগুলির মাথায় অনেক সময়েই ভালো রকম নারকেল তেল মাখা থাকে। তেল চপচপে মাথার উপর সটান দাঁড়িয়ে থাকা বেশ কঠিন। পা পিছলে যাওয়ার ভয়ে ও পায়ের আঙ্গুল দিয়ে সে ছেলের চুলগুলি খালি আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে আর সে “
উরি বাব্বারি” করে চেঁচায়। এমনি এক সংকটজনক মুহূর্তে, যখন পিরামিড তার পূর্ণ মহিমায় প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু কাঞ্চি তার দুই পা তেলের উপর প্রানপনে আটকে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন হটাৎ দূর থেকে পেঁচাকে দৌড়ে আসতে দেখা যায় দুহাতে দুটো আধখানা পেয়ারার টুকরো ধরে খঞ্জনীর মত বাজাতে বাজাতে!
পেঁচা এক আশ্চর্য় মানুষ, আপনা দিল কা বান্দা। তাই ক্যাম্পএ যোগ দিলেও কোনো রকম নিয়ম কানুনে ওকে বদ্ধ করা যায়নি। হালও ছেড়ে দিয়েছেন প্রশিক্ষকরা। তবে ভারী হাসিখুশি ছেলে। কসরত যদি দেখায় মর্জিমত সেটি কিন্তু যথেষ্টই সুন্দর হয়। পেঁচার এ হেন নামকরণের কারণ তার চোখ দুটি মস্ত বড় গোল গোল আর মনি দুটি মাঝে মাঝেই কাছাকাছি নাকের দু পাশে চলে আসে। তার উপর সে মাঝে মাঝেই স্যান্ডো গেঞ্জিটির পিছনের দিকটি সামনে করে পরে। ফলে ঘাড়ের অল্প কাটা অংশ সামনের গলার কাছে চেপে বসে আর পেছনের দিকের কাঁধ থেকে বগলের অনেক নিচ পর্যন্ত গভীর করে কাটা দুই অংশ সামনে বুকের দু পাশে দুটি পাখনার মত দেখায়।
আজও পেঁচা সেই মূর্তিতেই আবির্ভূত হয় পেয়ারার খঞ্জনী বাজাতে বাজাতে, আর সেই অপরূপ দৃশ্য দেখে পিরামিড এর মানব ইঁটগুলি হাসির ছটায় কাঁপতে থাকে। সবার আগে ভেঙে পড়ে তার শীর্ষ দেশ ---যার নাম কাঞ্চি, তারপর হুড়মুড় করে সমস্তটা। পড়ার সময় খাবলে খুবলে একে ওকে ধরবার চেষ্টার মধ্য দিয়ে মাথাটি বেঁচে গেলেও ডান হাতের কব্জিটির উপর ভর দিয়েই সে ভূমিশয্যা নেয়। জল, বরফ, স্প্রে ইত্যাদি দিয়ে বাকি দিনটি শেষ হলেও রাতে সে কব্জি ফুলতে থাকে। কাঞ্চি শত গোপনীয়তা সত্ত্বেও তা ঢাকা দিতে পারেনা। পরদিন সে ক্যাম্পের বদলে যায় নিরাময় ক্লিনিক এ এক্সরে করাতে এবং প্লাস্টার করা হাত গলায় ঝুলিয়ে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বিদায় দেয় তার সাধের ক্যাম্প কে ---নিরাময়ের ঠিক উল্টো দিকে।
ওদের গুলঞ্চ তলার বাড়ির সামনের মাঠে নগেন কাকু দাঁড়িয়ে। জর্দা পান মুখে নিয়ে পানের বোটায় লাগানো চুন আলগোছে জিভে ঠেকিয়ে ফোড়ন কাটে :
মেয়েছেলে, হাত পা ভাঙলে বিয়ে থা দেওয়া মুশকিল! সব সময় লুঙ্গি পরে ঘুরে বেড়ানো চিমড়ে নগেনকে যে বড়ো মা, ছোট কাকিমা -- কেউই দেখতে পারেনা তা ও জানে। রান্নাঘরে ওদের আলোচনা মন দিয়ে শুনেছে ও। সব কথা বুঝেছে তা নয়, তবে “নগেন ইশারা করে” শুনে একটু ঘাবড়েছে কারণ, ও বুবলা, টুটু সবাই নিজেদের মধ্যে ইশারাতে কথা বলে অনেক সময়। ব্যাপারটা বোধ হয় ভালো না। নগেনের কথায় গায়ে জ্বালা ধরে ওর। দাঁত কিসকিস করে বলে :
শালা! চিমড়া নগেন ! যদিও খুবই আস্তে, তবু, মা হুঙ্কার ছেড়ে ওর মাথার ঝুঁটিতে টান দেয়।
কাঞ্চির আরেকটি সাধ আছে। জর্দা পান না হোক, একদিন মুখ ভর্তি মিষ্টি পান ,হাতে পানের বোটায় চুন লাগিয়ে রাস্তার দু পাশে পানের পিচ অনেক দুর পর্যন্ত ছুঁড়তে ছুঁড়তে পথ চলবে! দিলদারে অনেক চটপটে মানুষকেই ও দেখেছে। বেশ একটা যেন কাজে ওস্তাদ ভাব আসে । অবশ্য মেয়েদের কাউকে অমন ভাবে পানের পিচের পিস্তল ছুঁড়তে ছুঁড়তে হাঁটতে দেখেনি সে। বড়মা, ঠাকুমা সবাই জর্দা পান খায়, তারা উঠে গিয়ে এক জায়গায় ফেলে আসে। তাতে কী? সেই না হয় শুরু করবে! ছোট কাকিমা যেমন ওদের নিয়ে ফুটবল খেলা দেখতে যাওয়া শুরু করেছে! কিন্তু সমস্যা হলো তার জন্য দোকানে আগে পান কিনতে হবে, আর প্রবীর কাকু ছোটদের একটু মিষ্টি মশলা হাতে ধরিয়ে ছেড়ে দেয়,পান চাইলে ধমক মারে! আশেপাশের সব পান দোকানেই এই হাল । তা ছাড়া একটু দূরের রাস্তা না হলে আড়াল হবে কেমন করে? খানিকটা পথ তো হাঁটতেও হবে পান মুখে। অন্য পাড়ার দোকানিও যদি ধমক মারে?
তবে সুযোগ মিলে গেল একদিন। ওদের একটা পিরিয়ড আগে ছুটি হয়, তখন রাস্তাঘাট বেশ ফাঁকা থাকে। এই সময় ইস্কুলের সামনে দেখা হয়ে গেলো টিঙ্কু দাদার সাথে। টিঙ্কু দাদা সাইকেল নিয়ে পান দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। হাতে একটা সিগরেট। লোকে বলে পড়াশুনা ছেড়ে আফুয়া হয়ে গেছে, বাপের জমিদারি ভাঙিয়ে খাবে আর কি! টিঙ্কু দাদা কিন্তু খুব ভালো ব্যবহার করে ওদের সাথে। ওকে দেখতে পেয়ে ডেকে লজেন্স কিনে দিতে চাইলো আর ও চাইলো মিষ্টি পান।
সেই পান মুখে ও একটু ঘুর রাস্তা ধরলো বাড়ির পথে। একটা পানের বোটাও চেয়ে নিয়েছিল। ঠাকুমা ওকে তো এমনিইই খেতে দেন ,পান সাজার সময়, পানের বোটায় পাপ নেই। সে বোটা জিভে ঠেকায় আর পানের পিচ ছোড়ে দু দিকে। এমন সময় মুখোমুখি হয় ও টুটুর, ওর ইস্কুলও ছুটি হয়েছে। ও পড়ে দিলদার নগর কলেজিয়েট ইস্কুলের মেয়েদের বিভাগে। ওদের লাল রং এর টিউনিক,তবে সাদা ব্লাউজ এর সাথে লাল স্কার্ট ও চলে। অবাক হয়ে ওর পানের পিচ ফেলা দেখে সে, জিগ্যেস করে নিজের পয়সা দিয়ে দোকান থেকে কিনেছে কিনা । ও বলে, টিঙ্কু দাদা কিনে দিয়েছে। টুটু বলে, আমায় দেয়নি তো কোনোদিন! নিজের মনেই গজগজ করে: আমরা তো একই প্রতিহার বংশের ! কাঞ্চি খেয়াল করে তাইতো! টিঙ্কু দাদারাও তো প্রতিহার, বাড়ি আলাদা হলেও! মাঠের পশ্চিম দিকের ওদের সব বাড়িগুলিই বেশ পুরোনো থাম টাম ওয়ালা। এই সময় সাইকেলে হটাৎ ই কেউ এসে পড়ে ডান দিক থেকে আর পানের পিচ বেরিয়ে গেলে কী আর আটকানো যায়?
সাদা ধুতি আর পাঞ্জাবির কিনারায় লালের ছোপ নিয়ে সে লোক সাইকেল থেকে নেমে পড়ে। সবুজ টিউনিক কোন ইস্কুলের বলে দিতে হয়না! ওর হাতের নাড়া ধরে ইস্কুলে বড়দির কাছে নিয়ে যেতে চায় সে গোমড়া মতো লোক। কাঞ্চি তো ভয়ে কাঠ! টুটু এগিয়ে এসে কাকুতি মিনতি করে বলে , আর হবেনা জ্যেঠু, ওকে ছেড়ে দিন, আমি বাড়িতে বলে দেব। সে লোক ওকে ছেড়ে রাস্তার টিউবওয়েল পাম্প করে রং ধুয়ে সাইকেলে উঠলে ওরাও হাঁফ ছাড়ে। বাড়ির কাছাকাছি এসে ও টুটু কে থ্যাংকু জানায়,কিন্তু টুটু সত্যরক্ষার পথ থেকে নড়েনা। বাড়ি বয়ে এসে বলে যায়। ও অবাক হয়ে যায়---এই টুটুর সাথেই ও সেদিন নিজের জমানো পয়সায় একটা বরফ আইসক্রিম কিনে লুকিয়ে ভাঙা বাড়িতে ভাগ করে খেয়েছে! নর্দমার জল দিয়ে বানানো বলে বাড়িতে বারণ আছে, যদিও নর্দমায় অমন বরফ সাদা জল কখনো দেখেনি ওরা ! বরফ আইসক্রিমের অন্য রঙ --- কটকটে রানী কালার বা সবুজও না! সে রাশিয়াতে হতে পারে! সেখানে বরফ পড়ে আর ছেলেমেয়েদের কেউ পেটায়না।
সন্ধ্যেবেলা ওর বিচার সভা বসে। খুবই অপমানিত হয় সে সেদিন। তবে সবাই ছিলো বলে মায়ের মারের হাত থেকে অন্তত রক্ষা পায়। অথচ ওরাই ছোটদের রাশিয়ান বই কিনে জন্মদিনে উপহার দেয় গদগদ হয়ে! নির্ঘাত দাম কম বলে! ছোট কাকিমা শুধু ঘটনার বর্ণার সময় হটাৎ ফিক করে হেসে উঠে আঁচল দিয়ে মুখ মোছার ভঙ্গি করে। সভা বসেছিলো ঠাকুমার ঘরে। ও পাশের ঘরের একটা জানলা আছে মাঝখানে, পর্দা ফেলা থাকলেও কাঞ্চি বেশ বুঝতে পারে দাদা আর বড়দা পড়া ছেড়ে এদিকেই মন দিয়ে আছে। এক সময় একটু পর্দার ফাঁকে দাদার দাঁত বের করা মুখ দেখে জ্বলে ওঠে। ওর মস্ত ম্যাপ বই এর ভিতর থেকে সিনেমার বই ও সবার সামনে টেনে বার না করে একদিন! ঝুটুন ছিলোনা। গান শিখতে গিয়েছিল। ঝিল্লি ছোটকাকিমার গায়ের উপর লেপ্টে শাড়ির ্পাড় পাকিয়ে হাতে সুড়সুড়ি খাচ্ছিলো। আর বুবলা কাঁচমাচু মুখ করে ছিলো। মাত্র দশ দিনের ছোট বুবলার সাথে চুলোচুলি লেগেই থাকে, কিন্তু অন্য কোনো বাইরের ঝামেলায় ওরা ঐক্য বজায় রাখে অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে। অনেক্ষন পর ঠাকুমা বলে উঠলেন: এবার ছাড়ান দ্যাও অরে, অনেক হইসে!
কাঞ্চি বসে থাকে ঠাকুমার ঘরে, বুবলাও। ঝিল্লিকে খাইয়ে ছোটকাকিমা খেতে ডাকতে আসে। কাঞ্চি উত্তর করেনা, গোঁজ হয়ে বসে থাকে। ঠাকুমা ছোটকাকিমাকে বলেন ,একখান থালায় ভাত লইয়া আসো,খাওয়াইয়া দ্যাও দুজনরে এখানেই। ছোট কাকিমা অবাক হয়ে ইতস্তত করে, ঠাকুমার বিছানায় এঁটোকাঁটার কথা ভেবে। ঠাকুমা বলেন, চাদর বদলাইয়া লইব। লইয়া আসো আগে ভাত। সেইদিন রাতে ঠাকুমার কাছেই শোয় কাঞ্চি,বুবলাও বায়না করে। সব আলো নিভে গেলে ঠাকুমা চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলেন, আর অমন কইরোনা। কাঞ্চি টের পায় ওর দু চোখের দুকোন দিয়ে জলের লাইন কানে গিয়ে পড়ছে , কান সুড় সুড় করে। ঠাকুমা হাতড়ে হাতড়ে মুছিয়ে দিয়ে গুন গুন বলে চলেন তাঁর পতিরামের ইস্কুলের কথা। গায়ে রোজ আরশুলা ছেড়ে দিত এক ছেলে, শুনতো না বারণ। তা একদিন ক্ষেপে গিয়ে তাকে ছাতা দিয়ে এমন পিটুনি দিয়েছিলেন যে আর কোনো দিন করেনি! কাঞ্চি হেসে ফেলে। আসতে আসতে ঘুমের অতলে হারিয়ে যায়। ঝিমঝিমে শেষ রাতে বুঝি একবার ঘুম ভেঙেছিলো তার। ল্যাম্পপোস্ট থেকে হলুদ আলো তেরছা ভাবে পড়েছিল দেওয়ালে। রাত পাহারাদার বাহাদুর ল্যাম্প পোস্ট এ লোহার শিক দিয়ে ঠং ঠং করে মোট তিনবার বাজালো ও খেয়াল করে, তারপর এটা সেটা ভাবতে ভাবতে কখন আবার ঘুমিয়েছে জানেনা।
কাঞ্চি নাকি এক প্রাচীন শহর, যার নামে তার নামটা রাখা হয়েছে, মা বলেছিলো। কিন্তু একদিন দুপুরবেলা লেবুপাতা আর বেশ করে কাঁচা লঙ্কা,নুন আর চিনি দিয়ে তেঁতুল মাখার খুব অল্পই ভাগ দিয়ে দিদি ঝুটুন মুখ বেঁকিয়ে বলেছিলো ,দূর! ওতো ছোটকাকা রেখেছে তোর নাম, “হরে রাম হরে কৃষ্ণ” সিনেমা থেকে। সে সিনেমা নাকি আটবার দেখেছিলো কাকা। কৃষ্ণ ঠাকুরের সিনেমাতে রাধা থাকার কথা ,কাঞ্চি সেখানে কে? মনে করার চেষ্টা করে ও। ঠাকুমার কৃষ্ণঠাকুরের গল্পেতো কাঞ্চি নামটা শোনেনি ! কী ভেবে আর কাউকে জিগ্যেস করেনি ও। ঝুটুন যদি রাগ করে আবার! ওর কাছে লুকোনো কাজল পেন্সিল আর লিপস্টিক আছে। বড়মা , মানে ঝুটুনের মা, তা জানেনা। কেউই জানেনা। ছোট কাকিমা লুকিয়ে দিয়েছে।
দুপুরবেলা ওরা ছোট কাকিমার শাড়ি পরে সাজে। গামছা দিয়ে লম্বা চুল করে দেয় ঝুটুন ওর ,ও শ্যামলীদি হয়ে যায়। তারপর হটাৎ গোলাপি প্লাস্টিকের সানগ্লাসটা পরে নিয়ে কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে হাঁটতে থাকে! ঝুটুন হাহা করে হেসে ওঠে। কাঞ্চি এখন হেনা পিসি। ছোটকাকার বন্ধুর বোন হেনা পিসির হেব্বি স্টাইল, সবসময় স্নো লিপস্টিক,সেন্ট মেখে থাকে, শীতকালেও ছাতা নেয়। ওদের বাড়িতে সবাই খুব সমীহ করে পিসিকে। ওরা সামনে আসেনা,দূর থেকে দেখে। ওদের জামা, চেহারা সব নিয়েই পিসির কিছু বক্তব্য থাকে। সিনেমার বই দেখায় ঝুটুন ওকে। সার্কাসের মেয়েদের মতোই ঝলমলে সাজের সব নায়িকা।
কাঞ্চির প্লাস্টার কাটা হলো প্রায় এক মাস পরে ---ফেব্রুয়ারির সাত আট তারিখ। ঐ হাত নিয়েই ইস্কুলে গেছে সে। টিফিনে তেমন খেলা টেলা কিছুই হয়নি। মা কে দেখতো মাঝে মাঝে টিচার্স রুম থেকে বেরিয়ে বারান্দায় দাঁড়াতে। এখনো দিলদারে বেশ শীত আছে , তবে দিন বড় হয়েছে,দুপুরের রোদ চড়া। কাঞ্চি একদিন সকালের দিকে সার্কাসের তাঁবুর দিকে যাবে বলে ভেবে রাখলেও রবিবার বাড়ি থেকে বেশি দূর যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে শিবরাত্রির দিন একটা সুযোগ নিলো মিথ্যে বলে। টুটুকে মা জেঠীদের সাথে জল ঢালতে যেতে দেখেছে কেবল ওই। ঠাকুমাকে বললো টুটুদের সাথে মন্দিরে যাবে, ঠাকুমা খুশি হয়ে বললেন, যাও গিয়া, ঘুইরয়া আইস ।
চার্চ এর মাঠ খুব কাছে নয়, আবার খুব দূরেও নয়। ওদের বাড়ি থেকে ইস্কুল যতখানি, ইস্কুল থেকে প্রায় ততখানি বা আর একটু কাছে। ও হাঁটতে থাকে। সার্কাসের শো তিনটে থেকে শুরু। এখন সকাল দশটা। ঢের দেরি। আজই কথা বলে নিতে চায় ও। সার্কাসে একজন ম্যানেজার থাকে ও জানে।
সকালের আলোয় রাতের সে ঘোর নেই। দূরে দূরে মানুষজন এটা সেটা কাজে ব্যস্ত। দুটো ঘোড়া দেখতে পেল ও। পেছনের দিকে এসে দেখে ভেজা কাপড় সব ঝুলছে সার সার। স্কার্ট, ব্লাউজ, শার্ট প্যান্ট, গামছা। বেশ বিবর্ণ । কয়েকটা মেয়ে বসে আছে ,চুল আঁচড়াচ্ছে কেউ। সাধারণ রং চটা জামাকাপড়। কলাই করা কানা উঁচু থালায় করে ভাত খাচ্ছে কেউ কেউ হাতে নিয়ে। ও লক্ষ্য করে ভাত আর ডালের পাশে একটু আলুসেদ্ধ মাত্র। ওর থেকে বড়, ওর বয়সী, আরো ছোট –মেয়েগুলি। ছেলেরাও ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছে নানা কাজে, কসরত করছে কেউ কেউ। ,কেউ খাচ্ছে।
ওকে ঘোরাঘুরি করতে দেখে একটু বড় একটি মেয়ে জিগ্যেস করে কী চাই। ও বলে, ও সার্কাসে যোগ দিতে চায় ,ম্যানেজার কে চাই। ও সব কিছু আসলে ঠিক করে নিয়ে তবেই বাড়িতে জানাতে চায়। ম্যানেজারকে পাওয়া যায়না, কোনো কাজে রেল শহরে গেছে। বড় মেয়েটি বলে ,তোমার বাড়ির লোক জানে? ও কোনো উত্তর দেয়না । ----কী খেলা দেখাতে চাও তুমি? ও বলে, গ্লোবের উপর। আর দড়ির উপর। --- পারবে তুমি? ও বলে, আমি প্র্যাক্টিস করবো ট্রেনিং নেবো। ----আমাদের ভোর পাঁচটায় উঠতে হয়। ছটা থেকে প্রাকটিস করতে হয়। একটু আগে ছাড়া পেয়েছি। আবার একটা থেকে দুটো প্রাকটিস। তিনটে থেকে শো। পর পর তিনটে । রোজ। --- তোমরা বাড়ি যাওনা? হিহি করে হাসে সে। ---এটাই বাড়ি। ঐ যে কল্পনা,ওর মা বাবা দুজনেই সার্কাসে। তবে সবার মা বাপ নয়।---- তারা বাড়ি যায়না?--- যায় হয়তো কয়েকজন বছরে একবার, দিন কয়েকের জন্য ছুটি পায়। তবে বাড়ির সন্ধানই অনেকের নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে মেয়েটি। কবে কোন ছোটবেলায় কলকাতায় কাজের সন্ধানে গ্রামের কাকা মা বাবার কাছ থেকে নিয়ে এসেছিলো। সার্কাসে দেয় সে আমায়। পরে শুনি টাকা নিয়েছে। মালিক ছাড়েনি।--- মা বাবা খোঁজ করেনি? ---আমি কোথায় আছি জানবে কী করে?--- তোমার গ্রামের নাম মনে নেই? ---আছে। কিন্তু, কীভাবে যেতে হয়, চিঠির ঠিকানাই বা কী ,তাতো জানিনা। ---মা বাপ খোঁজ করেনি? পুলিশে,কাগজে? উত্তর মেলেনা। কাঞ্চির গলা শুকিয়ে আসে। বলে, তাও তো কত মজা, কত জায়গা ঘোরো,পড়াশুনা করতে হয়না, কেউ বকেনা, কত মানুষ হাততালি দেয়!--- তাই? হাসে সে। চোখের কোন চিকচিক করে বুঝি। ---দড়িতে হাঁটার খেলার সময় ব্যালেন্স হারিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম বলে ট্রেনার পিঠের উপর লাঠি ভেঙেছিলো। পুরো একদিন খেতে দেয়নি। ট্রাপিজের খেলায় যে নেট দেখো ,ওটা এতটাই পলকা, যে পড়ে গেলে মাটিতেই পড়বো।
এমন সময় ওদিকে লাফ ঝাঁপ করা একটা ছেলে হটাৎ এদিকে এগিয়ে আসে। ছেলে ঠিক নয় অনেকটাই বড়। ধমক দিয়ে বলে, এদিকে কী হচ্ছেরে তোদের? কাজ কাম নেই? এটা কে? ---সার্কাসে নামতে চায়। ছেলেটা ওকে খুব বিচ্ছিরি ভাবে তাড়িয়ে দেয়! ----যাহ! ভাগ এখন থেকে! বাড়ি যা। এদিকে আর যেন না দেখি! মেয়ে গুলি হিহি করে হেসে ওঠে। ও দৌড়োতে থাকে,পেছনে শুনতে পায়: সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়! কাঞ্চি ঢোক গেলে।ওর মনে হয় টুটুরা এতক্ষনে শিবের মাথায় জল ঢেলে ফিরে গেছে,আর ওকে সবাই খুঁজছে। মার ও খাবেই মার হাতে। তাও ওর ভয় লাগেনা আজ। শুধু বুঝতে পারে জমাট বাঁধা ঝিম আঁধার আর গলার কাছে দলা পাকানো কষ্ট –--ইধার ভি হ্যায় উধার ভি! তবে উধার বুঝি আরো গাঢ় ,আরো অচেনা।
বাড়ির কাছাকাছি আসতে দেখে মাঠে রীতিমত জটলা। যা ভয় করেছিল তাই। টুটু হাত পা নেড়ে কি সব বলছে। চিমড়া নগেন যথারীতি পানের বোটা হাতে গুলঞ্চ গাছ ভর দিয়ে একটু বেঁকে দাঁড়িয়ে ফুট কাটছে। ওকে দেখে একটা “এইযে এইযে” রব উঠলো। তারপর, “কোথায় কোথায়?” ও শুধু বলে, সার্কাসের ঘোড়া দেখতে। এই সময়ই মাঠে চরে বেড়ায় ওরা! তারপর এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। বকাবকিতেই শেষ হয় সেই দিন। তখনও ‘সার্কাস ক্রীতদাস’ বা ‘সার্কাস অপরাধী’ ধারণাগুলির সাথে লোকের পরিচয় হয়নি।
অনেক বছর পর, সবে গরমের ছুটি শেষ হয়ে ইসকুল খুলেছে, এমন এক বাদলা দিনে, দিলদার নগর ব্যাপটিস্ট মিশন ইস্কুলের ভূগোলের কাঞ্চি দিদিমনি খবরের কাগজে একটি খবর পড়ে চমকে ওঠে! কৈলাশ সত্যার্থী নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বে ‘বচপন বাঁচাও’ আন্দোলনকারীদের একটি দল, সরকারি সহায়তায়, উত্তরপ্রদেশে চলা এক ভ্রাম্যমান সার্কাসের ভিতরে জোর করে ঢুকে পড়ে একান্নটা বাচ্চা মেয়েকে উদ্ধার করেছে! বেশির ভাগই হত দরিদ্র, নেপালের গ্রামের মেয়ে তারা! মা বাপকে এক কালিন মোটা টাকা ও পরবর্তী মাসিক কিস্তির চুক্তিতে তাদের মেয়েদের রঙিন ঝিকিমিকি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছিল দালালরা। তারপর সার্কাস দলে বেচে দিয়ে পালিয়েছে!
কাঞ্চি আরো খবর চায়। ইস্কুলের অফিস ঘরে সবে কম্পিউটার বসেছে। সেখানে অন্তর্জাল দুনিয়া মেলে ধরতে শুরু করেছে চোখের সামনে।সে জানতে পারে দশ- বারো - চোদ্দ বছরের মেয়েগুলি ঠিকঠাক খেতে শুতে পাওয়াতো দূরের কথা , হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমএর পর তাদের নিত্যসেবা দিতে যেতে হত পুরুষ সিংহদের, আর খেতে হত রাশি রাশি জন্মনিরোধক বটিকা! কৈলাশ আর তার সঙ্গীদের বীভৎস মার খেতে হয় সার্কাস দলের মালিক, ম্যানেজার আর তাদের গুন্ডাদের হাতে । তারা অবশ্য দোষী সাব্যস্ত হয় পরে। কিন্তু, সরকারি ঢিলেঢালা ভাবের মাশুল গুনতে হয় উদ্ধার পাওয়া মেয়েগুলিকে। তাদের নিরাপদ স্থানান্তর না করে নাকি রেখে দেওয়া হয় সিল করা সার্কাসের তাঁবুতেই। এর মধ্যে গায়েব হয়ে যায় অনেকগুলি নিতান্ত শিশু কন্যা,তাদের বাপ মারা নিতে এসেও পায়না তাদের!
সময় গড়িয়ে চলে, এক সময় পেশা আর সংসার গিলে ফেলে কাঞ্চি দিদিমনিকে।
কাঞ্চি যা জানতে পারেনি, তা হলো, সে যা জেনেছিলো, সেটি ঘটনামাত্র নয়, আর কৈলাশের সাথে সাথে আরো অনেকেই ভ্রাম্যমান সার্কাস দল থেকে শিশু ক্রীতদাস উদ্ধারের কাজ চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। শ্রম আইনকে কাঁচকলা দেখিয়ে সার্কাস মালিকরা বলতে থাকে, শিশুগুলির টাকায় তাদের গরীব বাপ মায়ের সংসার চলে!
এই ক্রীতদাসদের কথা আবারো জোরালো আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ালো আরো বছর সাতেক পর, যখন দেরাদুনে চলা এক সার্কাসের অপরাধ জগৎ এর পর্দা আবার ও ফাঁস করে দিলো সমাজ কল্যাণ সংস্থাগুলি। কাঞ্চির হাতে তখন মুঠোফোন, দুনিয়ার তামাম খবর এখন নিজে এসে ধরা দেয়---তাদের খুঁজতে যেতে হয়না! সে জানতে পারে এস্থার বেঞ্জামিন ট্রাস্ট এর কথা। একা তারাই নাকি উদ্ধার করেছে চারশ সার্কাস ক্রীতদাস বাচ্চাকে গত সাত বছরে!
দেরাদুনের সেই সার্কাসে রেড যখন হল , সার্কাস পার্টির লোকজন নাকি চেষ্টা করেছিল মেয়েগুলিকে লুকিয়ে অন্য গেট দিয়ে সরিয়ে ফেলতে। কিছু বাচ্ছাকে উদ্ধার করা গেলোইনা। স্থানীয় অপরাধ জগতের সাথে যোগ সাজসে কয়েকটা বাচ্চা লোপাট করে দেওয়া কী এমন ব্যাপার?
কাঞ্চি আবারও শুনলো সত্যার্থীর নাম। সরকার নড়েচড়ে বসলো। অবশেষে সুপ্রিম কোর্ট চোদ্দ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের সার্কাসে ব্যবহার নিষিদ্ধ করলে তাদের শিক্ষার অধিকারের সংবিধানিক ধারা বলে।কাঞ্চির ঘরে তখন সাত বছরের মালিনী দেওয়ালে ছবি আঁকছে কলকল করে কথা বলতে বলতে! সে তার দিকে চেয়ে থাকে আর ভাবে। বুকের ভিতর সমুদ্রের ঢেউ ভাঙে। আহা! সেই বালিকাগুলি! যদি সে.... কিংবা মালিনী...!!! মনে মনে কুর্নিশ জানায় কৈলাশ সত্যার্থী সহ সমস্ত মানবাধিকার সংগঠনএর মানুষজনদের, যারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সার্কাস অপরাধীদের উপর, মুক্তি দিয়েছিল সার্কাস ক্রীতদাসদের ! সব্বাইকে হয়তো পারেনি,তাও। তবে বাহাদুর বাচ্চা নীতা লামাকে রাখে সব্বার আগে। হত দরিদ্র বাপ মায়ের সেই পুঁচকে মেয়েইতো প্রথম সব ফাঁস করে দিয়েছিল সার্কাস থেকে গোপনে মা বাপকে চিঠি লিখে। একটু এদিক ওদিক হলে সেও তো লোপাট হয়ে যেত!
আর এক জনকেও সে মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানায়। সেইযে, ওকে বিচ্ছিরি ভাবে তাড়িয়ে দেওয়া সেই সার্কাসের দাদাটা ! কিন্তু, সবটা কি হলো? কে জানে!
দিলদার নগরে কত কিছুই তো বদলে গেলো! ওদের মাঠের গুলঞ্চ গাছটা এক ঝড়ে একদিন পড়ে গেল। সেই জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গেল। তাদের সেই মোটা মোটা কড়ি বরগা আর লোহার শিকওয়ালা দোতলা ভাড়া বাড়িটাই তো হারিয়ে গেল। পরিবারটি শহরের ইতিউতি ছড়িয়ে পড়লো। অবশ্য তার আগেই এক পৌষের রাতে ঠাকুমা গোপালকে শেষ শয়ানটি দিয়ে সেই যে শুলেন আর উঠলেননা। দিলদারে কত মাঠ হারিয়ে গেল। হারিয়ে গেল ডাঙ্গুলি--মারবেল –পিট্টু --বৌ বসন্ত --- স্বপন স্মৃতি টুর্নামেন্ট। হাসপাতালের মর্গের পেছনের জোনাকি জ্বলা শুনশান রাস্তায় এখন কাফে আর বিরিয়ানি পয়েন্ট। বরফ আইসক্রিমের বদলে গুরুজন স্বীকৃত ‘নভেল্টি’ আইসক্রিম ও এখন হাসির খোরাক বেলজিয়ান ওয়ফেল এর কাছে। বিশ্বায়নের যুগে দিলদার ই পিছিয়ে থাকে কেন?
শীত এলে আজও সার্কাসের তাঁবু পড়ে চার্চ এর মাঠে। কিন্তু সার্কাসে এখন ভিড় কই তেমন? পশুদের ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়েছে বলে অনেকেই আর গা করেনা যেতে। মানতেই চায়না তারা নতুন নতুন সংগীতময় রম্য কসরত এর আকর্ষণ । তবু, ছোট শিশুরা সার্কাস দেখার বায়না আজও করে । আর তাদের সঙ্গে ছোটে কাঞ্চির মত লোকজন।
শিশুরা সার্কাস দেখে, কিন্তু সার্কাসে আর কোনো ছোট শিশুকে আগুনজ্বলা হুলা হুপ কোমরের চারপাশে ঘোরাতে বা দড়ি বেয়ে বিপজ্জনক উচ্চতায় দোল খেতে দেখা যায়না। অন্তত দেখার কথা লোকে ভাবতে পারেনা, দেখা যাওয়া উচিত নয় ---এমন একটা বোধের জায়গা থাকে। সবার থাকে তা নিশ্চিত বলা যায়না অবশ্য।
সাধারন মানুষ বোধ হয় বুঝেছে সার্কাসের সবটা রোমান্টিক নয়, যা হয়ে আসতো তার সবটা ঠিক নয়। সার্কাস কোনো অলৌকিক জাদু নয়, হাড়ভাঙ্গা মেহনত আর মনসংযোগের আনন্দময় ফলাফল। যারা আনন্দ দেয় তাদের আনন্দ আর ইচ্ছেটাও খুব জরুরি --- সভ্য বিনোদনে! নতুন ধারার সার্কাস শিল্প উঠে আসে---চিরায়ত সার্কাসের দক্ষতার সাথে সংগীত ও অন্যান্য ললিতকলার হাত ধরে, যেখানে শিল্পীর নিরাপত্তার দাবিটি সবার আগে ঠাঁই পায়! মা বাপহীন সার্কাস-শিশুদের স্বপ্ন দেখায় এই নতুন সার্কাস।
সার্কাস বড্ডই রোমান্টিক! কাঞ্চি ও ভুলতে পারেনা সেই মোহ। শুধুই কি কাঞ্চি? দিলদারের আরো অনেকেই! আসলে কিছু ঘাড়ত্যাড়া রোমান্টিক বুঝি সব দেশে সব কালেই থেকে যায়। কাঁটাকে ‘কাঁটা’ বলে দেখতে তাদের অসুবিধা নেই, আবার তাই বলে কমল তুলতে যাবেনা তাও কি হয়? কাঁটাটি উপড়ে তাই তারা কমলটি তুলিতে ছোটে ! তাই বুঝি সার্কাসে সব সিট খালি যায়না আজও ! তাদের কাছে দিলদারের পথঘাট, কুয়াশা ঢাকা কপিশার বুকে ট্রেনের হুইশল, চার্চ এর বড়দিন মেলা, মকর সংক্রান্তির বনদেবী বা বড়াম পূজা, ঘুড়ি-লাটাই , খেলার তীর -ধনুক, বড়ো হুজুরের উরস পাক এর ধুলো মাখা আতরের তীব্র গন্ধ, দিদিমার হালকা ভাজা, ফেলুদার আলুকাবলি --- ইত্যাদি যেমন পুরোনো হয়না, তেমনি পুরোনো হয়না সার্কাস!
দিলদার ছাড়া অন্য কোনো নগরের নাগরিক যারা ---তারা কি এমন ভাবেই ভাবে? কাঞ্চিরা তা জানেনা।