ক্যালিডোস্কোপে স্মৃতির চল না একমুখী না সরলরৈখিক, এগিয়ে পিছিয়ে ঘুরতে থাকে।
আমাদের ছোটবেলায় আমাদের তিন ভাইকে যদি প্রশ্ন করা হত তোমাদের একটিমাত্র জায়গায় যাওয়ার বর দেওয়া হচ্ছে, কোথায় যেতে চাও, আমরা এক কথায় জানিয়ে দিতাম দত্তপুকুরে আমাদের মামাবাড়িতে। সু্যোগ পেলেই আমরা মামাবাড়ি গিয়ে হাজির হতাম। মামাবাড়ির দিক থেকে আমাদের বাড়ি এসে থাকা, খোঁজখবর নেওয়া, বেশিরভাগ সময়ে করত মা আর বাবার মাঝামাঝি বয়সের, আমাদের ছোটমামা। তার বিয়ের পরে মামিও এসেছে আমাদের বাড়ি। আমার বিয়ের পর যখন এই যুগল আমাদের বাড়ি এসেছে আমার স্ত্রীও তাদের অপার স্নেহের ধারায় সিক্ত হয়েছে। তাই বলে আমাদের ছোটবেলায় ছোটমামার উপস্থিতি কিন্তু বাকি মামাদের সান্নিধ্যের মতন সদা-সুখের ছিল না। যখন তখন আমাদের বাবা এইটা পারে না, ঐটা পারে না ইত্যাদি হাবিজাবি অভিযোগ অথবা ঘোষণায়, যেগুলি এখন আর একেবারেই মনে পড়ে না, সে আমাদের অস্থির করে ফেলত। আমরা রীতিমত প্রতাপশালী বাবা কিংবা স্নেহশীলা মা এমন কি আমাদের ঠাকুমার কাছে এই নিয়ে অভিযোগ করতে গিয়ে দেখতাম তারা মামাকে ত কিছু বলছেই না, বরং মুখ-টেপা হাসিতে পরিস্থিতিটা উপভোগ করছে। ঠাকুমা বললও একদিন, ‘হ্যায় ত তোমাগো বাপের শালা, হ্যায় ঠাট্টা করতেই পারে।’ বড়দের এই নাটকটা আমি কিছুতেই ধরতে পারতাম না। আজ অবশ্য অতীতে তাকিয়ে সেই হাসির শরিক আমিও। তবে সেদিনের সেই শিশু তিনটির জন্য মায়া হয় খুব।
সেই সময় ছোটমামা মানেই নাটক। থেকে থেকে অভিনয় করে বা না করে নাটকের সংলাপ বলে যাওয়া। তার প্রিয় সংলাপ ছিল – হাসি কিসের এত? এইটা কি নাট্যশালা? (না কি নাইট্যশালা, এই বিশেষ বাচনভঙ্গীতে বলত কি? হায় স্মৃতি, তুমি বড়ই প্রতারক!) কোন গল্পের বা কোন নাটকের থেকে এই সংলাপ, জানতাম না আমি, কিন্তু ছোটমামা বাড়িতে এসেছে আর এই সংলাপ শুনিনি এমন ঘটেনি কখনও। একটা সময় বুঝেছি জীবন যথার্থই নাট্যশালা।
অভিনয়ে কিভাবে নিজের অনুভবকে দর্শকের কাছে পোঁছে দেওয়া যায়, ছোটমামা ছিল তার আদর্শ উদাহরণ। আমাদের কোন আব্দার কি দাবি নাকচ করতে হলে এমন ভাবে জিভ বার করে, চোখ আধবোজা করে অল্প মাথা নাড়িয়ে সেটা মানা করত যেন আমরা একটা ভয়ানক লজ্জার কাজ করে ফেলেছি বা করতে বলছি। হঠাৎ হঠাৎ করে উপযুক্ত মুখভাব আর গলার স্বরের ওঠা-নামা সহ বিভিন্ন চরিত্রের মনোলগ বলে যেত। কখনো কখনো একাধিক চরিত্রের ডায়ালগ। সিরাজের ভূমিকায় জেলে বন্দি নবাবের অন্তিম মুহুর্তের দৃশ্যায়নে কথা বলতে বলতে সহসা এমন ‘আঁক’ করে থেমে গিয়ে চোখ বড় করে তাকাত যে আমরা পরিষ্কার বুঝতাম ঘাতকের ছোরা সিরাজের পেটে ঢুকে গিয়েছে। মুগ্ধ হয়ে ভাবতাম আমিও একদিন ছোটোমামার মত এমন অসাধারণ নাটক করব। কি কারণে জানা নেই, মঞ্চে মামার নাটক আমার কখনও দেখা হয়নি।
আমার নিজের অবশ্য মঞ্চে ওঠার সু্যোগ অনেক ছোটবেলাতেই এসে গিয়েছিল। আমি তখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে। ঠিক কি উপলক্ষে আজ আর মনে পড়ে না, আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়-এর একটা বড় অনুষ্ঠান হয়েছিল। রীতিমত মাঠ জুড়ে প্যান্ডেল বেঁধে। সেই উপলক্ষে প্রচুর বক্তৃতা আর নাচ-গান-আবৃত্তির সাথে একটা নাটকের আয়োজন করা হয়েছিল। রবিবুড়োর ডাকঘর থেকে একটা ছোট অংশ ছিল আমাদের পাঠ্যবইয়ে, অমল ও দইওয়ালা শিরোনামে। দিদিমণিরা সেটাই বেছে নিলেন মঞ্চস্থ করার জন্য। সম্ভবত: প্রচুর পটর-পটর করার যোগ্যতায় আমি মনোনীত হলাম অমল-এর ভূমিকায়। চতুর্থ শ্রেণীর এক শ্রীমান হল দইওয়ালা।
সেই প্রথম জেনেছিলাম রিহার্সাল কাকে বলে। শেষ ক্লাস-এর পরে শুরু হত। ভাল লাগত, তবে একটু ক্লান্ত হয়ে যেতাম – আমার তো কবে সব মুখস্থ হয়ে গেছে, ভাব ভঙ্গী সহ! দিদিমণিরা মাঝে মাঝে আলোচনা করতেন কেমন করে মঞ্চসজ্জা করলে বা আর কি কি করলে নাটকটা একেবারে সত্যির মত করে তোলা যায়। সেই সব কিছু কিছু শুনে আমার ধারণা হয়েছিল যে আসল অনুষ্ঠানের দিন আমাকে দইওয়ালা ছেলেটির হাত দিয়ে একটা সত্যি দই-য়ের ভাঁড় দেওয়া হবে। আমার কাছে নাটকের আসল আকর্ষণ ছিল সেটা এবং সেই নিয়ে ভিতরে ভিতরে খুব উৎফুল্ল থাকতাম।
এসে গেল দিনটা। আমরা কলা-কুশলীরা প্রথম থেকেই গ্রীনরুম-এ। মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে দেখে নিচ্ছি – সামনে মাথার পর মাথা, লোকের পর লোক। কালে কালে সম্ভাব্যতার যুক্তিতে সে সমাবেশের আকার ছোট থেকে ছোটতর হয়েছে, কিন্তু অন্তরের অন্ত:পুরে সেটা বিশাল-ই রয়ে গেছে। আমার চেতনায় সেটিই ছিল জনসমুদ্রের প্রথম ধারণা। মজার বিষয়, সেই জনসমুদ্র দেখে আমার কোন ভয় বা দ্বিধা হল না। বরং নিজের ভিতর থেকে একটা অজানা শক্তির জেগে ওঠা টের পেলাম। সেদিনের সেই অনুভূতিটা ফিরে এসেছে বারে, বারে – যতবার মঞ্চে উঠেছি ততবার। লাইম লাইটের আলোয় আমি অন্য মানুষ – আমি-ই তখন নিয়ন্তা।
কুচো ফর্মাটের সেই নিয়ন্তা একসময় মঞ্চে এসে বসল, ঘরের ভিতর জানালার পাশে। বসেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল তার। এটা একটা মঞ্চ সজ্জা হল! আমার সামনে হাঁটুর উচ্চতায় একটা ছোট কাপড়ের আড়াআড়ি বেড়া আর তার দু’ধারে দুটো কাপড়ের টুকরো মেঝে থেকে ছাদের দিকে উঠে গেছে, একটা সরু লম্বাটে চৌখুপী বানানো হয়েছে। এটা একটা জানালা হল! একসময় সেই জানালার পাশের দিক থেকে আমার মুখের সামনে একটি মাইক্রোফোন এল। আমাকে বলা হল মাইকে কথা বলতে। ওনারা মাইক টেস্ট করবেন। আমি ভাবলাম আমাকেই বলছেন টেস্ট করে নিতে। কি করে করব! মঞ্চের সামনে থেকে বড্ড আওয়াজ আসছে। গোলমালের সমুদ্র চলছে যেন। ভেবে দেখলাম, নিশ্চয়-ই ছোট বাচ্ছারা বেশী কথা বলছে। আগেও কয়েকবার এই অবস্থায় যে ঘোষণাটি শোনা গেছে এবার আমি-ই সেটি দিয়ে দিলাম, সঙ্গে দিলাম নাটক শুরু করার বার্তা – ছোট বাচ্ছারা গোলমাল না করে চুপ করে বসে পড়, আমাদের নাটক এখন-ই শুরু হবে।
ব্যাস! জনসমুদ্র যেন হো হো হাসির গর্জন-এ ফেটে পড়ল। এক মাস্টারমশাই উইংসের আড়াল থেকে ছুটে এসে আমায় বললেন এখন আর যেন মাইকে কিছু না বলি। আমি ত হতবাক! দোষটা কি করলাম! পরে বুঝেছি, মহা দোষ করেছিলাম। শান্ত ভাবে, উচ্চকিত আড্ডার কলতানে চারিদিক মথিত না করে অনুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষা করাটা আমাদের সংস্কৃতির সাথে মানানসই নয়। গোলমাল তো আর ছোটরা ততটা করছিলনা, যতটা করছিল বড়রা! তাই আমার তিরস্কার আসলে বিঁধেছে তাদের-ই। অতএব উপহাস আর মজার উল্লাসে আমার দোষের শাস্তি দেওয়া ছাড়া আর কি-ই বা তারা করতে পারতেন, এমন কি গোটা উপমহাদেশ জুড়েই আজো পারেন! আর একটা আঘাত-ও সইতে হল – দই-এর ভাঁড়-এ কোন দই ছিল না! দই-জনিত সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে বড়রা হয়ত ঠিক ব্যবস্থাই নিয়েছিলেন, কিন্তু নাটক শেষের হাততালির ঝড়-ও আমার ক্ষোভ আর অপ্রাপ্তির দু:খ মুছে দিতে পারে নি। সেই সন্ধ্যায় আমি প্রস্তুতি ছাড়াই একদফা বড় হয়ে গিয়েছিলাম!
আর আশ্চর্যভাবে, আমার কোন শিক্ষা হয়নি। অনেক বছর বাদে আরেক বিদ্যায়তনে আবারো নাটকে অংশগ্রহণ করেছি, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে মঞ্চে সন্দেশের বদলে কলার টুকরো ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যদি সন্দেশ খেতে গিয়ে তাড়াহুড়োয় গলায় আটকে বিপদ বেধে যায় তাই এই সতর্কতা। খুবই সঙ্গত ব্যবস্থা। কিন্তু আমার যে কি বিপুল হতাশ লেগেছিল, সে আর বলবার নয়। তারপর থেকে অন্যের নির্দেশনায় মঞ্চে ওঠায় খানিকটা অনীহা হয়ে গিয়েছিল। বন্ধুরা মিলে যখন নাটকের দল তৈরী করেছিলাম, নির্দেশনা হত সবার মিলিত সিদ্ধান্তে, কোন পরিচালক ছিলনা আমাদের। অবশ্য বাদল সরকার বা পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় কাজ করার যখন সু্যোগ এসেছে সেগুলো হাতছাড়া করিনি।
ছোটবেলার যে সমস্ত ঘটনা স্মৃতির কন্দরে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ অনুভবে রয়ে গেছে তার একটি ছিল এক মেলায় যাওয়া আর তার পরিণতি। সঠিক সময়কাল এখন খানিকটা ঝাপসা হয়ে গেছে। তবে তিন থেকে সাড়ে ছয় বছরের মধ্যে ঘটেছিল। বাবা আমি আর আমার পিঠোপিঠি মেজ ভাই তিন জনে মিলে মেলায় বেড়াতে গেলাম। মেলায় বেলুনওআলা বানিয়ে চলেছে নানা আশ্চর্য – কুকুর, মালা, মুকুট আরও কত কি! মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকি আমি। এক সময় আবিষ্কার করি – আমি হারিয়ে গেছি। বাবা-ভাই কাউকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। চিন্তায় পড়ে গেলাম। তবে ভয় করে নি আমার। চারপাশে এত লোক! উপায় হয়ে যাবে কিছু একটা। কিন্তু কি ভাবে! মাথায় যে কিছু আসছে না! এবার হতাশায় চোখে জল চলে আসে আমার!
হঠাৎ এগিয়ে আসে এক কাকু। প্রশ্ন করে করে ...
ক্রমশ...