অনেক কিছুই আছে যা আমরা জানি অবধারিত কিন্তু সেই অবধারিত বিষয়টাই যখন সামনে এসে হাজির হয়, তা যদি দুঃখের হয়, কষ্টের হয় তখন তা মানতে ইচ্ছা করে না। মনে হয় মাথা ঝাঁকিয়ে ফেলে দেই চোখের সামনে হতে যাওয়া এই দুর্ঘটনা। যেমন স্বাভাবিক নিয়মেই আমাদের বাবা মা আমাদের আগেই চলে যাবে পৃথিবী ছেড়ে এইটা আমরা জানি। কিন্তু যখন ওই দিনটা এসে হাজির হয় তখন কোন যুক্তিই মাথায় থাকে না। হাহাকার তৈরি হয় মনে। বাংলাদেশে তেমনই অবস্থা এখন। খারাপ হবে সব কিছু জানতাম, কিন্তু সেই খারাপটা যখন চোখের সামনে ঘটতে থাকল, ঘটে চলল তখন বারবার মনে হচ্ছে এগুলা সব ভ্রম, চোখ কচলে ভালো করে তাকালেই দেখব সব ঠিক আছে, সব স্বাভাবিক আছে।
কিন্তু তা হওয়ার নয়। আম গাছে তপস্যা করলেও কলা ফোলানো সম্ভব না। ইউনুস সরকারের কাছেও সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থা চাওয়া অনেকটা তেমনই। আইনের শাসন, স্বচ্ছ নিরপেক্ষ বিচার বিভাগের গল্পই শুনি আমরা। তার অবস্থা আসলে কেমন তার নজির স্থাপন হয়ে গেল গতকাল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার ওপরে গ্রেনেড হামলার আপিল বিভাগের রায় প্রকাশ হয়েছে গতকাল। বিচারপতি সবাইকে বেকসুর খালাস করে দিয়েছে। আগের রায়কে অবৈধ বলে রায় দিয়েছেন! ১৯ জন মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত, ১৯ জন যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া সবাই মুক্ত! সবাই সাধু পুরুষ, আওয়ামীলীগ সরকার ষড়যন্ত্র করে এদেরকে এমন রায়ে অপরাধী করে রেখেছিল।
বিএনপি আমলে ঘটনা। সংসদে দাঁড়িয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন শেখ হাসিনা নিজেই ভ্যানেটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গেছিলেন! এরপরে জজ মিয়া কাণ্ড করে জজ মিয়াকে ফাঁসানো হল। গতকালের রায়ে যা বুঝা যাচ্ছে তাদের এই ফর্মুলার কোন একটাই হয়ত ঘটেছে বলে ভাবছে আদালত! আকাশ থেকে তো আর গ্রেনেড এসে পড়েনি, তাই না? তাই হব হয়ত, এইটাও অনেকটা যুক্তি সংগত মনে হচ্ছে এখন!
বর্তমান আইন উপদেষ্টার নানা স্ক্রিনশট এখন খুব ছড়িয়ে গেছে। ফারুকি উপদেষ্টা হওয়ার পরে অবশ্য উনি একটু রেহাই পেয়েছেন, ঝড় যাচ্ছে ফারুকির ওপর দিয়ে। কিন্তু আইন মন্ত্রী আবার সবার সামনে নাঙ্গা বাবা! খালেদ মহিউদ্দিনের এক অনুষ্ঠানে তিনি জোর দিয়ে বলছেন ২১ আগস্টে তৎকালীন সরকারের উপরের সারির লোকজন জড়িত ছিল, তৎকালীন সরকার এইটাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, এমন একটা ভিডিও এখন সবার কাছে পৌঁছে গেছে!
কিন্তু এগুলার কোন মানে নেই। বাংলাদেশের বিলো এভারেজ আইকিউ সমৃদ্ধ মানুষের এগুলা দিয়ে কিচ্ছু আসে যায় না। মানুষ একটু জটিল চিন্তা মাথায় ঢুকে না। ক্রিটিক্যাল থিংকিং বলে কোন বস্তু এই দুনিয়ায় আছে বলে এরা জানে না। ভেড়ার পালের মতো চলছে খাদের দিকে, কোন হুশ জ্ঞান নাই কারো। এই জন্যই এইখানে ন্যায় বিচার হবে এমন আশা করাও বোকামি। এই জন্যই আম গাছে কলা আশা করার মতোই এইটা আশা করা যে এই সরকার ২১ আগস্টের সমস্ত তথ্য উপাত্তকে হিসাব করে একটা রায় দিবে।
এইটা নিয়ে এত কথা, এত লেখালেখি করা হয়েছে যে এইটা আজকে আবার যদি লেখতে বসি যে কোন কোন দিক থেকে তারেক রহমান সহ বিএনপির প্রথম সারির অনেক নেতা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত তাহলে তা দুঃখজনক। হরকাতুল জিহাদের নেতা মুফতি হান্নান ২১ আগস্টের আগে তারেক রহমানের সাথে দেখা করে গ্রিন সিগনাল নিয়ে আসে। তারেক রহমান ওকে করে এই অপারেশন। মুফতি হান্নান সাক্ষী দিয়ে গেছে এইটা। উইকিলিকসেও পাওয়া গেছে এই তথ্য। কিন্তু নোবেল ম্যানের আদালতের মনে হয়েছে এগুলা সব ভুয়া। প্রথম আলো ডেইলি স্টার তাদের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় জজ মিয়া কাণ্ডকে সবার সামনে আনে। তখন তারা সিরিজ আকারে লিখে গেছিল ২১ আগস্ট নিয়ে। এখন সব চুপ! সব মিথ্যা।
এমন রায় হওয়া খুব অস্বাভাবিক না। গতকাল ১ ডিসেম্বর, রোববার হাইকোর্টের বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ যে কুৎসিত রায় দিল তার অনেক কারণের মধ্যে একটা শুধু বলি, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান নিয়োগ পান ২০০৩ সালে, বিএনপি আমলে। বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনকে এই সরকার নিয়োগ দিয়েছে। তিনি কোন তরিকার লোক তা সহজেই বুঝা যায়। তো এদের কাছ থেকে কী আশা করি আমি? ১ ডিসেম্বর বিচার বিভাগের জন্য কালোদিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে এখন থেকে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কেমন হবে বুঝা যায়? এই ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনাসহ সবার বিচার করা হবে। যে ট্রাইব্যুনালের প্রধান কসুলি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এই ট্রাইব্যুনালেই যিনি জামাত নেতাদের পক্ষে আইনই লড়াই করেছে, যিনি যুদ্ধাপরাধীদেরকে এই ট্রাইব্যুনালেই বাঁচানোর জন্য আইনই লড়াই চালিয়ে গেছেন, এই নিয়োগ পাওয়ার সময়ও যার কাছে জামাত নেতাদের কেস ছিল তিনি এখন রাষ্ট্র পক্ষের প্রধান আইনজীবী! শুধু তিনিই না, টবি ক্যাডম্যানকে এই ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হইছে। টবি ক্যাডম্যান কে? ওই, একই রসুনের… তিনিও এর আগে জামাতের পক্ষে কাজ করে গেছেন এই আদালতেই!
এই জন্যই বলছি যে আশা করাটাই ভুল এখানে। এরা বসেই আছে এমন কাজ করার জন্য। কিচ্ছু করার নাই! আমি-যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে! বিচারের বানী আরও কতদিন নিভৃতে কাঁদবে এইটাই এখন এখন দেখার বিষয়। এরা এখন আইন নিয়ে ফুটবল খেলবে, ইতিহাস নিয়ে ফুটবল খেলবে। সলিল চৌধুরীর একটা গান আছে, বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা… না আজ জাগে নাই সেই জনতা। জনতা নিরেট মাথা নিয়ে বসে ভাবছে কী চাইলাম কী হইল এইটা! মাথা চুলকাচ্ছে আর ভাবছে এমন হইল কেন!
একবার এখন চিন্তা করে দেখা যেতে পারে যদি রাজাকারদের ফাঁসি না হত, এরা যদি জেলেও থাকত তাহলে এই বিচার বিভাগ তাদেরকে আজকে কী উপহার দিত? ডিসেম্বর মাসে হাসতে হাসতে সব ষড়যন্ত্র বলে বের হয়ে আসত জেল থেকে। আলী আহসান মুজাহিদ আবার হুঙ্কার দিত, আমাদেরকে বিচার করবে? এত্ত সোজা? বলে আস্ফালন করত। এক ভি চিহ্ন দেখানোতে শাহবাগে গণ জাগরণ মঞ্চ তৈরি হয়েছিল এক সময়। দশ এগার বছর পরে এই পরিস্থিতি নাই, এখন ফুলের মালা নিয়ে জেলের সামনে ছাগলদের জ্যাম বেঁধে যেত। ভাগ্যিস, ভাগ্যিস বিচারকার্য শেষ করতে পেরেছিল শেখ হাসিনা। না হলে এগুলাও দেখতে হত এই দেশে।
ডিসেম্বর মাস এসে গেল। কী অদ্ভুত একটা সময়। ডিসেম্বর মাস, বিজয়ের মাস। বিজয়ের আনন্দ মাসের শুরু থেকে পাওয়া শুরু হত এতদিন। একটা করে দিন যেত পত্রিকায় আসত আজকে অমুক অমুক জেলা মুক্ত দিবস। আগ্রহ নিয়ে পড়তাম, কোন জেলা কীভাবে মুক্ত হল, বুঝতে চাইতাম ঢাকা মুক্ত করার জন্য কত পরিকল্পনা কাজ করেছে সে সময়। যৌথ বাহিনীর পরিকল্পনা, পাকিস্তানিদের তখনও অহামিকায় বাস করা এগুলা এত এত পড়ছি তবুও আবার পড়তে বসে যেতাম। মাসের এক তারিখেই বিজয়ের মাস বলে পত্রিকায় কলাম শুরু হয়ে যেত। এবার তো মনে হচ্ছে গোপনেই পালন করতে হবে বিজয় দিবস। এরা তো জানিয়েই দিয়েছে রাম ছাড়াই রামায়ণ লিখবে! মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় দিবস অস্বীকার করতে পারবে না এখনই, তাই হয়ত স্মৃতিসৌধে যাবে ইউনুস সাহেব। কিন্তু সেই ফুল দেওয়া, সেই বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকবে শেখ মুজিব! একটা লাইনও যদি বলতে হয় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তাহলেও তা বলার আগে ৩২ নাম্বার সংস্কার করে তারপরে বলতে হবে। তবে চিন্তা নাই, রাম ছাড়া রামায়ণে এইসবের কোন দরকার নাই। ৩২ নাম্বার বুলডজার দিয়ে গুড়িয়ে দিলেই কী?
আমরা গরিব মানুষ, বুদ্ধিসুদ্ধি করে বাঁচতে হব, এইটাই হচ্ছে কথা! বেশি বুদ্ধিমান একজনের সাথে দেখা হয়েছে। তিনি জামাতের একাউন্টে টাকা দেওয়া শুরু করেছেন, দুই হাজার টাকা করে দেন, টাকা দেওয়ার রসিদ পকেটে রাখেন। কেউ কিছু বললেই বের করে দেখায় দেন! আমাকে তিনি একটু ঘুরিয়েই বললেন যেন এই কাজ করি! বললেন বুদ্ধি করে চলতে হব, বুঝেন নাই? বুঝছি।
চিন্তা করলাম পলটি নিতে পারলে এখনই নেওয়া উচিত। টুকটাক লিখতে পারি। যদি এখন দুঃস্বপ্নের ১৭ বছর নামে একটা বই লিখে ফেলতে পারি কিংবা সাত বীর শ্রেষ্ঠের কথা নামে একটা বই, যেটাতে থাকবে আলী আহসান মুজাহিদ, নিজামি, কামরুজ্জামান, কাদের মোল্লা, সাকা চৌধুরীর, সাইদি, গোলাম আজম নিয়ে হুদাই একটু প্যাঁচাল! ভিতরে কী আছে কেউ দেখবেও না, মুড়ির মতো কিনে নিয়ে চলে যাবে! বন্ধু তুমি শত্রু তুমি নামে ভারত বিদ্বেষী একটা বই লিখতে পারলে সুপার হিট হয়ে যাবে এখন। ছাগলেরা বুয়েটের গেটে ভারতের পতাকা আঁকছে। তার উপর দিয়ে হেঁটে যায় দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে। এই ছাগলদেরই টার্গেট করতে হবে। বই ছাপিয়ে ওইখানে ফুটপাথে চটের ছালা বিছিয়ে বসে থাকলেও সব বিক্রি হয়ে যাবে। ছাগল সব খায়! ছাগলদের মধ্যে বড় ছাগল, অরিজিনাল ছাগল হচ্ছে কাঠমোল্লারা। তাদের জন্য লিখতে হবে গাজয়াতুল হিন্দ! আল্লা গো! দশম মুদ্রণ হাতে নিয়ে নামতে হবে না হলে গণপিটুনি খেতে হতে হবে বই নাই কেন এই প্রশ্নে! আমি এখানে এগুলা নিয়ে হাসিঠাট্টা করে ঘুমিয়ে যাব। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারেন সামনে এইসবের সবই দেখতে পাবেন। বিশ্বাস হল না? আমার খুব পছন্দের প্রকাশনী হচ্ছে ঐতিহ্য, বাংলাদেশের প্রথম সারির প্রকাশনী, তারা সরকার পতনের কয়েকদিন পরেই বিজ্ঞাপন দিয়েছিল রচনাবলী বিক্রি করবে, কার? পিনাকী ভট্টাচার্যের! সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ!
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।