এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বই

  • ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ - ১৮৫৭-৫৯

    দীপ্তেন
    আলোচনা | বই | ০১ জুন ২০০৭ | ১৮০০ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • "ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ - ১৮৫৭-৫৯" - লেখক মার্ক্স ও এঙ্গেল্‌স।

    মার্ক্স বা এঙ্গেলস - কেউই কখনো সিপাহী বিদ্রোহকে ভারতের স্বাধীনতা সংগাম বলেন নি। ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার ইনস্টিটুট ওব মার্ক্সিসজম লেনিনিজম, এই দুজনের ভারতবর্ষ সম্পর্কে সংবাদ প্রবন্ধের সংকলন ঐ শিরোনামায় বার করেন।

    ওনারা দুজনে তখন ইংলন্ডবাসী। আমেরিকার নিউ ইয়র্ক ডেইলী ট্রিবিউনের রাজনৈতিক সংবাদদাতা। পালা করে লিখেছেন দুজনে - হিন্দুস্তান নিয়ে। প্রথম প্রবন্ধটি প্রকাশ পায় ১৯৫৩ সালের জুন মাসে আর শেষেরটি সেপ্টেম্বর ১৯৫৮।

    বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ কি ভাবে ভারতীয় অর্থনীতি এমন কি সমাজকেও তচনছ করছে সেই নিয়ে মার্ক্স লিখলেন। জানালেন ঢাকা শহরের জনসংখ্যা দেড় লাখ থেকে কমে কুড়ি হাজারে এসে ঠেকেছে।

    কেন? তার উত্তর ও দিলেন মার্ক্স -- "ইংলন্ডের দুটি মিশন রয়েছে ভারতের জন্য ... পুরনো এশিয়াটিক সমাজকে নিশ্চিহ্ন করা এবং এক পশ্চাত্য সমাজের ভিত্তি স্থাপন করা।"

    আরো বললেন, "আরব, টুর্কী, টার্টার, মুঘল এরা ভারতবর্ষকে পদানত করেছে কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি তারা হিন্দু (Hinduized) বনে গেছেন। ইতিহাসের অমোঘ নীতি মেনে এইসব বিজয়ী বর্বরেরা তাদের বিজিত উন্নততর সভ্যতার বশ্য হয়েছেন।" পরের দুটো লাইন যথাযথ তুলে দিলাম - পাছে অনুবাদে সীমা লংঘন হয়। The British were the first conquerers superior, and, therefore inaccessible to Hindu civilization. They destroyed it by breaking up the native communities....'

    এই ভাবেই ১৮৫৭'র সেনা বিদ্রোহ শুরু হলো। মার্ক্স খুব উৎসাহিত বোধ করলেন। "কুড়ি কোটী মানুষকে দাবিয়ে রেখেছে দু লক্ষ সিপাহী, যাদের উপর নজর রাখছে চল্লিশ হাজার বৃটীশ সেনানী"। হিন্দু মুসলমানের ঐক্য তাকে উদ্বুদ্ধ করেছিলো।

    তবে এটাকে বিদ্রোহ বলেই মেনে করেছেন তাঁরা। লিখেছেন "ফ্রেঞ্চ রাজশক্তিকে প্রথম আঘাত হেনেছিলো কৃষকেরা। ভারতীয় বিদ্রোহ কিন্তু অত্যাচরিত, অসন্মানিত, নগ্ন কৃষকেরা শুরু করে নি, করেছে সিপাহীরা, যারা বৃটীশের দ্বারা clad, fed, fatted and pampered "। আরো লিখলেন "এই বিদ্রোহকে ইওরোপীয়ান বিপ্লবের সমতুল্য ভাবা ঠিক হবে না"।

    এই বিদ্রোহ চলাকালীন তারা বারবার পুঙ্খানুপুর্ন তথ্য সারনী দিয়েছেন, বার বার আশা করেছেন এই বিদ্রোহ সফল হবে। শেষের দিকে নিরুদ্যম ছত্রভংগ ও নেতৃত্বহীন সিপাহী বিদ্রোহ লেখক দুজনকেই নিরাশ করেছেন।

    যেমন তথ্য দিয়েছেন বেংগল আর্মি সম্পর্কে - "প্রায় আশি হাজার সেনা - এর মধ্যে আঠাশ হাজার রাজপুত, তেইশ হাজার ব্রাহ্মন, তেরো হজার মহমেডান, পাঁচ হাজার নীচু জাতের হিন্দু এবং বাকীটা প্রায় তিরিশ হাজার ইউরোপীয়ান"।

    সিপাহীদের বিরুদ্ধে অত্যচারের অভিযোগে মার্ক্স কোম্পানীর অত্যাচারের অনেক ঘটনার উল্লেখ করেন। আসলে তখন দিনকাল ই ওরকম ছিলো। বৃটীশ বা দেশী সিপাহীরা যখন কোনো গ্রামের মধ্য দিয়ে যেতো তখন কৃষকদের কাছে থেকে জোর করে তারা "প্রভিশন" তুলে নিতেন। দাম? প্রশ্নই নেই। কোনো রায়ত ভুলেও দাম চাইলে তার কপালে জুটতো নির্যাতন।

    লোকেদের ফাঁসী দেওয়া জলভাত। বিয়ের রাত্রে বাজী ফাটানোর জন্য স্বচ্ছন্দে মেরে ফেলা হলো বরকর্ত্তাকে। "We have power of life and death in our hands and we assure you we spare not"। আরো কেউ উল্লসিত ভাবে বলেন "Holmes is hanging them by the score"। নির্বিচারে গুলি করে মারার ঘটনায় আরেক কোম্পানীর কর্তা বলেন "Then our fun commenced"।

    বলেছেন "ঔধ" পুনর্দখলের পর চারদিন বৃটীশ সেনারা যে অবাধে লুঠতরাজ চালিয়েছেন তাতে প্রায় ১৫০ জন বৃটীশ অফিসার "অনেক কামিয়েছি, যথেষ্ট হয়েছে এবার দেশে ফিরে যাই" বলে পদত্যাগ পত্র দাখিল করেছেন।

    উল্লেখযোগ্য এই অত্যাচার ও লুঠতরাজের বিরুদ্ধে সরব ছিলো খোদ বৃটীশ পার্লিয়ামেন্টও।

    স্বাভাবিক ভাবেই মার্কস যে প্রবন্ধগুলি লিখেছেন তাতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঘটনা ও ব্যাখ্যা বেশী গুরুত্ব পেয়েছে। এঙ্গেল্‌স জোর দিয়েছেন সামরিক কৌশল ও লড়াই-এর বিবরনের উপর। দেশী সিপাহীদের রননীতি সম্পর্কে অজ্ঞতা তাকে অত্যন্ত বিরক্ত করেচে। দিল্লী অবরোধের সময় গোলন্দাজ বাহিনীর কামান সাজানোর তিনি সমালোচনা করেছেন। ঔধের যুদ্ধে গোলন্দাজ বাহিনীর কৌশল দেখে মন্তব্য করেছেন ... "কোনো সভ্য দেশের সামরিক বাহিনীতে মিলিটারী ইনজিনীয়ারিং নিয়ে এতো অজ্ঞতা দেখা যায় না।"

    জাতিচরিত্র নিয়ে এঙ্গেল্‌সের কিছু কমেন্ট বর্তমানের মার্কসবাদীদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। হিন্দু সেনারা ভালো ঘোড়সওয়ার নন, আর মহমেডানেরা ইরে্‌রগুলর ইনফ্যান্ট্রি হিসাবে বেশ ভালো। শিখরা বিশ্বাসযোগ্য নয়, গুর্খা সেনারা নেটিভদের অধীনে ভালো সেনা নয় এইরকম কিছু আপাত পলিটিকালি ইন্‌কারেক্ট তত্ত্ব জানিয়েছেন এঙ্গেল্‌স।

    এঙ্গেল্‌স বোধহয় একটু অসহিষ্ণু বেশী ছিলেন, দেশী সিপাহীদের হেরে যাওয়া তার পক্ষে বড় হতাশার ঘটনা ছিলো। অন্তত: তিনবার, তিনটি পৃথক প্রবন্ধে তিনি লিখলেন, সিপাহীরা এবার ডাকু, লুঠেরা বনে যাবে। দেশের লোকের শত্রু হয়ে যাবে। বৃটীশদের থেকেও বেশী ঘৃনিত হবে তারা।

    সেই সময়কার দলিল। এক ভিন্ন রকমের দৃষ্টিপাত। নিরপেক্ষ নয়, বড়ই বৃটীশ বিরোধী। একটু খুঁটিয়ে পড়লে বোঝা যায় মার্ক্স ও এঙ্গেলেসের নজরের ফারাক, মনোভাবের তফাৎ।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ০১ জুন ২০০৭ | ১৮০০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ১২ জুলাই ২০২১ ২১:২৪495744
  • চোদ্দ বছর আগে, তখন আলোচনা বুলবুলভাজায় মতামত দেওয়া যেত না। বুলভাজার একটা টই ছিল সেখানে কমেন্ট করা হত। 

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই মতামত দিন