এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  সিনেমা

  • ফ্লেভারস

    শমীক
    আলোচনা | সিনেমা | ১০ জুন ২০০৭ | ৫৮০ বার পঠিত
  • এই সিনেমাটা আসলে আমেরিকায় যাওয়া বিভিন্ন কিসিমের ভারতীয়দের জীবনের টুকরো টুকরো কোলাজ।

    সিনেমাটা সম্ভবত স্লোডাউনের সময়ে বানানো। একটা অ্যাপার্টমেন্টে কিছু ব্যাচেলর ছেলে থাকে, ঐ বডি শপিংয়ের মাধ্যমে আমেরিকায় চাকরি করতে এসেছে, এবং সফ্‌টওয়্যারের চাকরি। স্লো ডাউনের জেরে তারা চাকরি খোয়ায়। ভুলভাল কিছু ফান্ডা দিয়ে তাদের চাকরি খেয়ে নেয় বস। এর মধ্যে দুটো ছেলে একদম বিন্দাস টাইপের, চাকরি গেছে তো কি হয়েছে, আমাদের ট্যালেন্ট আছে, ওর'ম চাকরি আবার পাবো টাইপের। ইন্টারভিউয়ের জন্য কল এলেও বেজায় রোয়াব দেখায়, কত মাইনে দেবেন, কিসের ওপর কাজ, টিম সাইজ কত বড়, ক্লায়েন্ট দেসি না আমেরিকান, এই সব জিজ্ঞেস করে ফোন কেটে দেয়।

    তিন নম্বর ছেলেটা চূড়ান্ত আনস্মার্ট, ইংরেজি বলে কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে, প্রচন্ড পেসিমিস্টিক, আর দেশে ছেড়ে আসা এক পুরনো বান্ধবীকে মনে করে কেবলই কান্দে। সে বান্ধবীর সাথে যোগাযোগও নেই, সামনাসামনি কখনও কথাও হয় নি ভালো করে (এগুলো আমরা সিনেমার শেষের দিকে জানতে পারি), কিন্তু মাঝে মাঝেই ফোন করার চেষ্টা করে, আর মেয়েটার বাবার গলা শুনে ফোন রেখে দেয়।

    এরা যে অ্যাপার্টমেন্টে থাকে, তার কেয়ারটেকার একটি ভারতীয় মেয়ে, কোনও একটা সিকিওরিটি এজেন্সিতে কাজ করে। তার চাকরিতে কোনও খতরা নেই। সে মাঝে মাঝে আড্ডা মারতে আসে এদের সাথে।

    একদিন কীভাবে যেন সেই বান্ধবীর বিয়ের কার্ড আসে ছেলেটির হাতে, ছেলেটি প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেদের মত ভাব করে ফ্রাস্টুতে কান্নাকাটি করে, মদ খেতে চায়। মানে, সে বয়েসের দিক দিয়ে অ্যাডাল্টই, কিন্তু মনের দিক থেকে একেবারে ইম্‌ম্যাচিওর্‌ড, বাচ্চা ছেলে। তার দুই রুমমেট নিজেদের ঝামেলা ভুলে ঐ কেয়ারটেকার মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে একে সান্ত্বনা দিতে থাকে। ছেলেটিকে নিয়ে তারা একসাথে মদ খায়। ছেলেটা দূ:খে খুব বেশিই খায়। মাতাল অবস্থায় মেয়েটিকে তার খুব 'মনের-কথা-একেই-বলা-যায়' টাইপের মনে হতে থাকে, এবং নিজেদের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এসে ইনিয়ে বিনিয়ে পুরনো ব্যথার বৃত্তান্ত শোনাতে থাকে। দূ:খ পাবে বলে মেয়েটা অনেকক্ষন ধরে কিছু না বলে মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করে, অবশেষে চূড়ান্ত বোর হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, ঘটনাচক্রে এক বিছানাতেই।

    সকালে মেয়েটার আগে ক্যাবলা ছেলেরই ঘুম ভাঙে, এবং ঘুমচোখে পাশে ঘুমন্ত মেয়েটিকে দেখে মনের মধ্যে কিছু রাসায়নিক ক্রিয়া ঘটে। আগের রাতেই যাকে মাতাল অবস্থায় পুরনো ব্যাথাকে সে কত ভালোবাসে সেই গল্প শুনিয়েছিল, পরদিন সকালেই সেই মেয়েকে সে প্রপোজ করে বসে, এবং উত্তাল ঝাড় খায়।

    এদের গল্প এই টুকুই।

    কার্তিক আর রচনা (এই মেয়েটাকে আমার উত্তাল লেগেছে), ঐ, আমেরিকার দুই প্রান্তে থাকে, কখনও ছুটিছাটায় একসাথে আড্ডা মারতে জমায়েত হয় দুজনে। জাস্ট ফ্রেন্ড্‌স। রচনার বিয়ের কথা চলে, প্রস্পেকটিভ হাসব্যান্ডদের সাথে তার প্রাথমিক আলাপ চলে বিভিন্ন রেস্টোর‌্যান্টে, কার্তিক সাহায্যও করে এই সব অ্যাপোতে, এবং পেছন থেকে ক্যারিকেচার করে বোঝাতে থাকে যে এই সব ছেলেরা রচনার জন্য উপযুক্ত নয়। পুরো সিনেমাতে কার্তিকের সেন্স অফ হিউমর অনবদ্য, অসাধারণ। কার্তিক বিলংস টু হায়দরাবাদ। এরা দুজনেই ভালো চাকরি করে, এবং এদের চাকরিতেও কোনও খতরা নেই।

    র‌্যাডের একটা ভারতীয় নামও ছিল, কিন্তু সে মনেপ্রাণে আমেরিকান হতে চায়। তার আমেরিকান প্রেমিকাকে সে বিয়ে করবে বলে তার বাবা মা এসেছেন। র‌্যাডের লম্বা চুল পনিটেল করা, মায়ের চোখে ভালো না লাগলেও বাবা মানিয়ে নেন, যে দেশে যেমন বলে। এদিকে র‌্যাডের প্রেমিকা কিন্তু বেশ নরম সরম মেয়ে। ভারতীয় ছেলেকে বিয়ে করছে সে, ভারতীয় কালচারের প্রতি সে যথেষ্ট সম্মান দেখায়। আর র‌্যাড চায় ভারতীয় সমস্ত গন্ধ ঝেড়ে ফেলে আমেরিকান হতে। মেয়েটির বাবা মা ডাইভোর্স্‌ড,

    একদিন র‌্যাডের অনুপস্থিতিতে তার বাবা মা হাওয়া খেতে বেরিয়ে আমেরিকার রাস্তায় হারিয়ে যান। শেষে কার্তিক রচনার সাথে হঠাৎ দেখা, তারাই তাঁদের র‌্যাদের বাড়ির কাছে পৌঁছে দেয়। বদলে ছেলের বিয়ের পার্টিতে কার্তিক রচনাকে নেমন্তন্ন করেন বাবা মা।

    নিখিল সফটওয়্যারে ছিল, রিসেন্টলি লেড্‌ অফ হয়েছে। নতুন বিয়ে করা বউ সঙ্গীতাকে জানায় নি এখনও। রোজ সকালে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যায়, কোনও একটা পাবে বসে মদ খায়, আর চাকরির খোঁজ করে। সঙ্গীতা টিপিক্যাল এ৪ বা আ৪ ভিসাধারিনী স্ত্রী। সারাদিন ঘরে বএ থাকে। একবার দেখা টিভি সোপ রিপিট টেলিকাস্ট দ্যাখে, ঘর গোছায়। সংসার করার ইচ্ছে তার ছিল, কিন্তু বর সারাদিন থাকে না, তারও সারাদিনে সময় কাটে না। মাঝে মাঝে বরকে ফোন করে, পাব থেকে বর জানায় সে এখন মিটিংয়ে ব্যস্ত। সঙ্গীতা চুপ করে ঘরে বসে থাকে। কখনও বান্ধবীর সাথে শপিংয়ে বেরিয়ে জীবনের মানে খোঁজে, সে যে কোনওদিন ভালো আঁকতে পারত, তা মনে করার চেষ্টা করে।

    একদিন নিখিল জানিয়ে দেয় তার চাকরি না থাকার খবর। সঙ্গীতার কাছ থেকে খুব শকিং কিছু এক্সপ্রেশন আশা করেছিল সে, কারণ সঙ্গীতা তার ওপর নির্ভর করেই দেশ ছেড়ে আমেরিকায় প্রবাসী, কিন্তু অদ্ভূতভাবে সঙ্গীতা খুব সমঝদার স্ত্রীয়ের মত স্বামীকে বয়ফ করে বলে, চিন্তার কিছু নেই, সে অবশ্যই আবার একটা ভালো চাকরি পেয়ে যাবে। ফ্রাস্টেশনের চূড়ান্ত অন্ধকার থেকে বউয়ের আলিঙ্গনে নিখিল আবার বেঁচে থাকার, লড়াই করার দিশা খুঁজে পায়।

    তার পর? একদিন রচনা ফাইনাল করে একটি ছেলেকে তার হবু বর হিসেবে মেনে নেয়, তখন কার্তিক নিজেদের মনের দিকে চেয়ে দ্যাখে, সে রচনাকে, তার প্রিয় বন্ধুকে একজন অচেনা ছেলের হাতে ছেড়ে দিতে পারছে না। সে রচনাকে শুধোয়, you'll get married, you'll have a family, then what happens to me?

    রচনা প্রাথমিকভাবে কার্তিকের প্রপোজাল উড়িয়ে দেয়, তারা জাস্ট ফ্রেন্ড্‌স, সে এই সব ভাবে নি কার্তিকের সম্বন্ধে। কিন্তু আলটিমেটলি সে-ও বোঝে, মনের অজান্তেই সে-ও কার্তিককে ভালোবেসেছে, কার্তিককে ছাড়া সে থাকতে পারবে না। কার্তিককে ফোন করেও সে নারীসুলভ লজ্জায় 'আই লাভ ইউ' বলতে পারে না, বলে ফ্যালে, 'আই ... আই ... আই'ল ইমেইল ইউ'।

    সেই ফোন যখন কার্তিক রিসিভ করে তখন এক চার্চের ফাদারের সামনে র‌্যাডের বিয়ে হচ্ছিল। আরেক বিয়ের সূচনা হয় মোবাইলের বদখত রিংটোনের মাধ্যমে।

    সেই বিয়েতে হাজির হয় সমস্ত কুশীলবরা। সেই ক্যাবলা ছেলে আচমকা দেখতে পায় নিখিলের বউ সঙ্গীতাকে, যে তার কলেজজীবনে ব্যথা ছিল। সেই ব্যথা। যার বিয়ের খবর পেয়ে সে মদ খেয়েছিল। আজ সামনে দেখেও সঙ্গীতার সাথে সে দুটোর বেশি তিনটে কথা বলতে পারে না, এবং অবশেষে হাল ছেড়ে সে সঙ্গীতার কাছ থেকে সরে যায়।

    সিনেমার মূল চরিত্র কার্তিক আর রচনা-ই, বাকিরা সব পার্শ্বচরিত্র, কিন্তু প্রত্যেকে একেকটা আস্ত গল্প। সিনেমাটা দেখে ফেলুন।

    জুন ১০, ২০০৭
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ১০ জুন ২০০৭ | ৫৮০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন