এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক

  • দিলদার নগর ১২

    Aditi Dasgupta লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ২১ জানুয়ারি ২০২৫ | ৩২২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • প্রাণের সঙ্গে জমে এ প্রাণের খেলা।
    আলোছায়া হাসি রাগ কান্না অভিমান ---
    সময়ের তন্তুতে গাঁথা সেই মালা---
    দ্বি কোটিক বিভাজন করেনা আহ্বান।
     
    হিমানীবালা ভাত বসিয়েছেন প্রাইমাস স্টোভে।আক্রার কেরোসিন পুড়িয়ে এই বিলাসিতা তিনি অন্যদিন করেননা। সকালের চা, টোস্ট বা টুকটাকেই স্টোভ জ্বলে। আজ আসলে বড্ড রাত হয়ে গেল ইস্কুলের কাজ মিটিয়ে ফিরতে! আর উনুন ধরাতে ইচ্ছে করছেনা। তাঁর রান্নাঘরের মধ্যে মেঝেতে মাটির উনুন করাই আছে, তবুও তোলা উনুনটি তিনি বেশী পছন্দ করেন। কারণ, রান্নাঘর লাগোয়া ছোট্ট উঠোনে সেটি নিয়ে গিয়ে ধরানো যায়, ধোঁয়ার ঝামেলা মিটে আঁচ উঠলে ঘরের ভেতর আনেন তিনি। নয়তো বিলুর বড্ড কষ্ট হয়, কাশতে থাকে আট বছরের ছেলেটা। সেই যে জ্বর আর কাশি শুরু হলো ওর বাবার অসুস্থতার সময় থেকেই আর পুরোপুরি সারলোনা। হিমানীও ছেলের দিকে তেমন নজর দিয়ে উঠতে পারেননি তখন স্বামীর সেবা করতে গিয়ে। সেও তো রইলোনা! দুই বছর চলে গেল দেখতে দেখতে! বড়ো মেয়ে দুটির একটি ইস্কুলের শেষ সীমায় ---ম্যাট্রিক সামনে,আরেকটি সবে ঢুকেছে হাই ইস্কুলে।তারা পড়ছে দিলদারের ব্যাপটিস্ট মিশন ইস্কুলে। হিমানী আর নিজের রাজনারায়ণ ইস্কুলে আনেননি তাদের। সবার বড় ছেলেটি বাঁকুড়ায় ডাক্তারি পড়ে, মেজটি বাঁকুড়া খ্রীষ্টান কলেজেই ইংরেজি তে সাম্মানিক নিয়ে ভর্তি হয়েছে। হিমানীর বাড়তি চার হাত তারা। বিলু কে তারাও কম আগলায়না। কিন্তু সংসার তো কেবল মমতায় চলেনা! হিমানীর সামান্য মাস মাইনে থেকে সব দিকের ই সংস্থান করতে হয়। বড়ো মেয়েকে এখনই টিউশন করতে দিতে চাননা তিনি। যদিও তাদের বয়সী অনেকেই এখন করে। ছেলেদুটিও তো পড়া সামলাতে ব্যস্ত, তবে হিমানী টের পান তারা লুকিয়ে কিছু করে, না হলে মায়ের কাছ থেকে এতো কম নিয়ে চালাতে চায় কেন?
     
    হিমানী তাকিয়ে আছেন আগুনের দিকে, লালচে, হলদেটে আবার কখনো বা নীলচে শিখায় যেন ছবি এঁকে চলছে সে। আগুন ---এক রঙ এর উপরে আরেক ---তারপর আরেক ---আর হিমানী যেন দেখে চলেছেন তাঁর জীবনটা ---নিঃশব্দে ও –দীর্ঘশ্বাসে। একা একা কাঁদছেন তিনি আজ। অথচ তিনি নিজেই এই দুর্বলতা কে প্রশ্রয় দেননা পছন্দ ও করেননা। মঙ্গলময় প্রভুর উপরে আস্থা রেখে সব কিছুই সামলান, সামলে এসেছেন তিনি স্মিত ধৈর্য্যে।
     
    টলটলে জলে সারা বছর ই ভরে থাকে কিল্লা তালাও। তার দুপাশে দুটি লম্বা রাস্তা উত্তর দক্ষিণ বরাবর। কিল্লা তালাও এর উত্তরে এক মনোরম উদ্যান, জলের উপরে অনেকটাই এগিয়ে এসেছে ঘাটের থেকে টানা অতিরিক্ত একটি অংশ। সেখানে বসতে ভারী ভালো লাগে। এছাড়াও বেশ কিছু সৌখীন কারুকার্য করা লোহার চেয়ার আছে উদ্যানের ঘাস জমিতে ,আছে গ্যাস বাতির সুদৃশ্য স্ট্যান্ড। উদ্যানের ওপারে সরু লাল মোরামের রাস্তা আর ধবধবে সাদা রং এর বেইলি লাইব্রেরি।বেইলি সাহেব একদা দিলদারের কালেক্টর ছিলেন। তিনি পড়াশুনা ভালো বাসতেন। রাজনারায়ণ আর তিনি মিলে নানান ভাষার বইয়ের সমাহারে গড়ে তুলেছিলেন এ লাইব্রেরি। দুপাশের দুটি রাস্তা যেন দুই বাহুর মত তালাও, উদ্যান আর লাইব্রেরিটিকে আগলে আরো উত্তরে গিয়ে একসাথে মিলেছে। পুব দিকের রাস্তাটির ডান দিকে দাঁড়িয়ে আছে উঁচু উঁচু মিনার নিয়ে কিল্লা মসজিদ ---যার পাঁচ ওয়াক্ত আজান নগরের সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত হয়ে রাতের কর্ম বিরতির চেতনার সাথে নীরবে জড়িয়ে আছে । তালাও এর দক্ষিণ গা ছুঁয়ে আছে বস্তি, গরীব গুরবোর আবাস। পুবের লম্বা রাস্তা একটু নিজেকে মানিয়ে গুছিয়ে সরু করে নিয়ে সেই ঘিঞ্জি বস্তির মধ্য দিয়ে নিয়ে যায় একটা বড়ো রাস্তায়। এদিকে একটা গলিপথ আবার মসজিদের পাশ দিয়ে এসে সমকোনে মিলিত হয় তার সাথে। যেখান থেকে সেটি এসেছে সেই রাস্তা ধরে ডান দিকে গেলে রাজনারায়ণ ইস্কুল,  আরো এগোলে বোঝা যায় সেটি আসলে বস্তি ছাড়িয়ে সেই বড়ো রাস্তাটিই যা আরো পশ্চিমে গিয়ে মিশেছে কিল্লা তালাও এর পশ্চিম পাড়ের রাস্তার সাথে! আবার বাঁ দিকে এগোতে এগোতে সে গিয়ে ছোঁয় চারকুঁয়া, আর তাকে ছাড়িয়ে উত্তরে সোজা এগোলে ডান দিকে কলেজিয়েট ইস্কুল, কলেজ আর বাম দিকে পুরোনো জেলখানার সেই তেপান্তরের মাঠ। রাজনারায়ণ ইস্কুল থেকে ঐদিকে যেতে অনেকেই কিল্লা তালাও এর পাশ দিয়ে রাস্তাটি ব্যবহার করে, কারণ তাড়াতাড়ি হয়।
     
    বস্তির বাসিন্দা মুক্তা শেখ স্টেশন থেকে মূল শহর পৌঁছানোর টাঙাওয়ালাদের একজন। দিলদারের স্টেশনটি মূল শহর থেকে অনেকটাই বাইরের দিকে। শাল পিয়াশালের সারির মধ্য দিয়ে বেশ আপ রাস্তা। বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ের রেল শহরকে বিহারের সাথে যুক্ত করেছে যে পথটি তার ধারেই দিলদারের ছিমছাম পরিচ্ছন্ন স্টেশনটি। শহরের মানুষ এখান থেকে রেল শহরের জংশনএ গিয়ে কলকাতা যায়। আরো কাঁহা কাঁহা মুল্লুকে যায় ---পশ্চিমে বোম্বাই, দক্ষিনে মাদ্রাজ! মুক্তা শেখ সেসব জায়গার নাম শোনে, গল্প শুনতে চায়। তবে সবাইতো আর তেমন গল্প বলতে উৎসাহী থাকেনা! আবার অনেকেই স্টেশন থেকে ফিরতে ফিরতে বা সেথা যেতে যেতে গল্প বলে। ফেরার রাস্তা ঢালু পথ, তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়, বাড়িটিও বুঝি টানে। যাওয়ার রাস্তা চড়াই, সময় নেয়, ঘর ছেড়ে যাওয়া মানুষ ও বুঝি মায়ায় জড়ায়। মুক্তা গল্প পায় বেশী। মুক্তা তার নামের মানে জানেনা। ‘মুক্তার’ নামটা কখন জানি মুক্তা হয়ে গেছে। কোনোটার ই মানে না জানায় কিছতেই তার যায় আসেনা। সবার একটা নাম হয়, সেটা চেনা জানা নাম থেকেই দিয়ে দেওয়া হয় একটা, একটু উনিশ বিশ হলে মন্দ কি?
     
    আজ আটটার ট্রেন বেরিয়ে যেতে মুক্তা টাঙ্গা নিয়ে আজকের মতো ফিরে আসছিলো । একজন সওয়ারি পেয়েছিল একেবারে উল্টোদিকে সেই হোসেনাবাদের দিকে ---যেদিকে মোটর চলার রাস্তা। তাকে নামিয়ে ও কিল্লার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো টাঙ্গা মালিকের আস্তাবল এর দিকে, আজকের মত জমা রাখতে। সামনে অন্ধকারে শাড়ি পরা একলা কাউকে পেছন থেকে দেখে একটু চিন্তিত হয়। মাথায় চাদর জড়ানো হিমানীকে চিন্তে পারে একেবারে পাশে এসে। এতো রাতে দিদিমনি কে দেখে ও জোর করেই তুলে নেয়। দিনকাল ভালো না, বাতাসে বারুদের গন্ধ! পর পর তিনটি ম্যাজিস্ট্রেট মারার খেসারত দিচ্ছে এ শহর। হিমানী উঠতে চাননা, দুই আনা খরচ করতে গায়ে লাগে তাঁর। কিন্তু উঠতেই হয় মুক্তার জোরাজুরি তে। তাঁকে বাড়ি নামিয়ে দেয় মুক্তা। চার কুঁয়ার ডান দিকে কিছুটা এগিয়ে তাঁর বাড়ি।চার কুঁয়া আসলে চারটে কুঁয়ো নয় ---একটাই মস্ত  ইঁদারা ---চৌকোনা। এতে সুবিধা হলো,  চারদিকে চারটে কপিকলে চার জনা এক সাথে জল তুলতে পারে। জ্বালা পোড়া গরমেও এ ইদারা শুকায়না। মুক্তা পয়সা নেয়না কিছুতেই। আল কাদরি সায়েব আর তাঁর বেগমের উর্দু ইস্কুলে তার দুই মেয়ে কিছুদিন পড়েছিল। হিমানী ছিলেন দিদিমনি। সে ইস্কুল ছিল কিল্লা মসজিদের গা ঘেঁষে।
     
     শিখেওছিল অনেক কিছু মেয়েরা । তারা মুক্তাকে গল্প বলতো। উঠে গেছে সে ইস্কুল। সেই যমজ মেয়ের একটার নিকাহ হয়েছে কাছেই পাঠান মুহাল্লায়। আরেকটা ভালোবাসা করেছিল মুক্তা ই নিকাহ করিয়ে দেয়। ওদের আম্মা গুস্সা মুসসা করলেও আর অমত করেনি। গ্রামের দিকে পড়েছে সে।জামাই দিলদারের ওস্তাগরে কাজ করতো, ছেড়ে দিয়ে খেতি বাড়ি আর পটেই মন দিয়েছে। জাত পেশা তাদের। সে বাড়ির মেয়েরা পট আঁকে আর গান গেয়ে গেয়ে কত কিস্যা শোনায় ----রামায়ণ, মহাভারত, লায়লা মজনু, কারবালা, ক্ষুদিরাম,প্রফুল্ল ---আরো কত কি।মুক্তা বায়োস্কোপের কল্পনা করে সে সব দেখে। কে যেন বলেছিলো এগুলি বায়োস্কোপের আদি রূপ। মুক্তা বায়োস্কোপ দেখেনি। মুক্তার মেয়েও এখন শিখে গেছে। মুক্তার বেশ লাগে সেসব। তবে তাকে কাছে আর তেমন পায় কই? ওই যখন আসে বা ওরা যায় কুটুমবাড়ি।
     
    আমেলিয়া হিমানী ব্যানার্জী টাটা নগরের মেয়ে। ডায়াসেশন কলেজে আই এ. পড়তে পড়তেই বিয়ে কৃষ্ণনাথ এর সাথে। এখন অবশ্য ডায়াসেশন আর কলেজ নয়। খোদ লাট সাহেবের উপর যে প্রতিষ্ঠানের এক পুঁচকে ইস্কুল ছাত্রী গুলি চালিয়ে দেয় ---সেই প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষা দিতে একটু নামিয়ে না দিলেতো আর মান থাকেনা সরকারের! দিলদারের মেধা, বিত্ত এবং সংস্কৃতিতে উজ্জ্বল এক পরিবারের সন্তান স্যামুয়েল কৃষ্ণনাথ ব্যানার্জী ওকালতি পাশ করেছিল। হাই কোর্ট এ কিছুদিন প্রাকটিস করে দিলদারের জাজ কোর্টএ চলে আসে। শ্বশুর মশাই ও বিলেত গিয়েছিলেন বই ও তাঁর ছাপা হয়েছিল বিখ্যাত অক্সফোর্ড পাবলিকেশন থেকে। কিন্ত বিত্ত ও মেধার বাড়াবাড়ি র সাথে স্থির বুদ্ধির সহজ সমন্বয়টি না হওয়ায় অমিতব্যয়িতা একটি পারিবারিক ব্যাধিই হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। যার ফল ভুগতে হচ্ছে হিমানীকে ।
     
    আল কাদরি সাহেব ছিলেন দার আল উলুম মাদ্রাসার শিক্ষক। মুসলিম মেয়েদের জন্য একটি ইস্কুল করলেন তিনি আর তাঁর বেগম। উর্দু ছিল তার মাধ্যম। হিমানীবালা কে তিনি আমন্ত্রণ জানালে তিনি আর্থিক কারণেই হাতে চাঁদ পেলেন। যদিও উর্দু নিয়ে তাঁর সংশয় ছিল। তিনি মূলত শেখাতেন ইংরেজি যদিও। হিন্দিতে অভ্যস্ত তাঁকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি আল কাদ রি সাহেব ও তাঁর বেগমের।তবে অসুবিধে এসেছিলো লিখতে শেখার ক্ষেত্রে। সেনা ছাউনি তে হরেক কিসিমের খেটে খাওয়া সাধারণের হরেক কিসিমের মুখের বুলি থেকে উঠে আসা মিশ্র ভাষাটি র সাবলীল গতি যাপিত জীবনের পথটি ধরেই, কলমের আঁচড়ে তাকে ধরতে গেলে সে সবসময় ধরা দেয়না প্রথাসিদ্ধ স্বর আর ব্যঞ্জনের ধ্রুপদী রন্ধন নিয়মে। তাকে যাপন না করলে সে লিখনে আসেনা। হিমানীর সময় লেগেছিলো একটু, কিন্তু ভাষা খেলায় একবার ঢুকে পড়ার পর আর অসুবিধে হয়নি। বড্ড স্নেহ পেয়েছিলেন তাঁদের কাছ থেকে হিমানী। বেলালের মুখ দেখেছিলেন তাঁরা চাঁদির কয়েন দিয়ে। নামটিও তাঁদের ই দেওয়া। মাঝে মাঝে বেগম তাঁর ঘরে নিয়ে গিয়ে সযত্নে মাথায় মাখিয়ে দিতেন ফুলেল তেল, যত্ন করে খেতে দিতেন সিমুই বা ফিরনি। হিমানীর অস্বস্তি হত একটু প্রথম প্রথম। তিনি বলতেন এটাই দস্তুর।  অন্তঃপুরে  শিক্ষিকাদের সম্মান জানানোর এটাই রীত। অনেক আরবি জানা মহিলাই অন্তঃপুরে  শিক্ষা দেন সম্মানের সাথে দিলদারে।
     
    সেই ইস্কুল তিনি ছাড়লেন রাজনরায়নের ডাক পেয়ে। একটু বেশী অর্থই তখন অনেক! আল কাদ রি সাহেব ---পাগল মানুষ ---বাচ্চার মত কেঁদেছিলেন। আজ তাঁদের খুব মনে পড়ছে! বেলালের নতুন ওষুধের পাতাটা আজ ওর বিছানার পাশে না রেখেই চলে এসেছিলেন ইস্কুলে। মনে পড়তেই ছুটে যাওয়া আবার, আর ফিরেই বনলতার মুখোমুখি। বনলতার এই রূদ্র মূর্তি তাঁর অপরিচিত। বড্ড অপমান হলো আজ তাঁর! কোনো বড়ো ভাই, বড়ো বোন যদি থাকতো তাঁর, তাঁদের বুকে মাথা রাখতেন।
     
    একলা বসে রাত জাগছিলো আরো একজন। বনলতা দাশ দিলদারে এসেছে বছর তিনেক ---বেথুনের পাঠ চুকিয়েই। শ্যামলা ঋজু মেয়েটির চোখে মুখে চলনে বলনে এমন এক ব্যক্তিত্ব ঝরে পড়ছে যা ফর্সা -কালো -সুন্দরী- অসুন্দরীর সমস্ত প্রথাসিদ্ধ বিতর্ককে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়। তার ছোট্ট কোয়ার্টারএর একলা সংসারটি সহজ, পরিপাটি, সৌখিন। জীবন যে যাপন করবার সম্পদ সে কথা লেখা আছে তার ঘরের প্রতিটি কোনে। দেওয়ালের পর্দা থেকে টেবিলের পেয়ালা -পিরিচ -টি পট- টিকজি ---লেস, এমব্রয়ডারি, রুপো, পোরসেলিন এর অনায়াস সহজ বিন্যাসে অনাড়ম্বর নান্দনিক। সে নিজেকে ভালোবাসে। তাই নিজেকে ও তার চারপাশ গুছিয়ে রাখতে ভালোবাসে। অবিন্যস্ত পোশাকে, চুলে আসা ইস্কুলের মেয়েরা, সস্তা রসিকতা করে এ ওর গায়ে ঢলে পড়া মেয়েরা--- বকা খায় তার কাছে। তাদের কাছেও সে আদর্শ হয়ে ওঠে। সে জানে পোশাকে চলনে বলনে দূরত্ব আসে আর সেই দুরত্বের প্রাচীর একলা হাঁটা মেয়েদের সুরক্ষা দেয় অনেকটাই। সে সুযোগ সন্ধানী মানুষকে সুযোগ দিতে চায়না। মেয়েগুলিকেও রক্ষা করতে চায়। মাঝে মাঝে হয়তো বা একটু বেশিই ভেবে ফেলে! তবু আজ বুঝি সে বাড়াবাড়ি করে ফেললে! বেলাল এর মুখখানা ভেসে উঠছে বার বার ---বড়ো বড়ো টানা টানা চোখের রোগা দুবলা ছেলে! বিলুকে নিয়েই জড়িয়ে আছেন হিমানীবালা। তিনি তো শান্ত স্থিতধী মানুষ, সময়ের কাজ সময়ে করে যান যথাসাধ্য! কিন্তু আজই তার ব্যতিক্রম। সেই ব্যতিক্রম বনলতাকে যে খুব একটা পীড়িত করেছিল এমনও নয় ! কিন্তু যখন সে দেখে, ক্লাসে টিচার না ঢোকার সুযোগে দুটি মেয়ে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে, মাথাটা কেমন গরম হয়ে গেল! এই বড় রাস্তায় ইস্কুলের টাইমে বকাটে ছোঁড়া দের আনাগোনা। ইস্কুলের দুর্নাম তাকেও ছাড়বেনা । মেয়েদুটি ইস্কুলে আসার সুযোগ পেলেও তাদের ভাব গতিক আগে থেকেই ঠিক ভালো লাগেনি বনলতার। একটু পাকাটে মুখ চোখ, চুলের সামনে তারা আলবার্ট কাটে, নাকে নাকছাবি। একটু উদ্ধত ভাবও বুঝি দেখেছে। ক্লাস চুপ করিয়ে মেয়ে দুটিকে ধমক দিয়ে বসিয়ে কিছু একটা লিখতে দেয় সে। তারপর হিমানীবালার খোঁজ করে। তাঁকে প্রেয়ার লাইনে দেখেছে সে , কিন্তু ক্লাসে যাননি কেন? তিনিই তো ক্লাস টিচার ওই ক্লাসে! একটু বাদেই হন্তদন্ত হয়ে টিনের গেট ঠেলে ঢোকেন তিনি। তার মানে এই অল্প সময়ের মধ্যে আবার বাড়ি গিয়েছিলেন! অন্ধ একটা রাগ কেমন করে চেপে বসলো বনলতাকে। কার্য -কারণ  জিজ্ঞাসার সুযোগ দিলোনা সে রাগ। পঁচিশের বনলতার দাপটের সামনে একচল্লিশের হিমানীবালা কেমন জানি কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে গেলেন! ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিলেন তার দিকে। বাকিরাও হতবাক। হ্যাঁ,বনলতা হেরে গেল তার রিপুর কাছে। এখন দুই হাত জোড় করে সে বসে আছে একটু হেলে তার চেয়ারখানিতে। চোখ দিয়ে নামছে জলের ধারা। আহা বিলু ---বেলাল ---জোসেফ বেলাল ব্যানার্জী , ক্লাস থ্রী ---দিলদার নগর কলিজিয়েট স্কুল ---ভালো হয়ে যাক!
     
    কে বলে উষা, গোধূলি আর সন্ধ্যাই কেবল সুন্দর? ঝিমঝিমে বেলা -দ্বিপ্রহর এর আলাদা একটা মাধুর্য নেই? আপিস আদালত হাট বাজার ইস্কুল কলেজ ---তাদের নিজের নিজের ধরণে কর্ম চঞ্চল ---জমজমাট। কিন্তু এই সময় ঘর গেরস্থালী? মাঠ ঘাট ---ছাদ উঠান? তারা কী করে? এই তো সময় তাদের নিজেদের মেলে ধরবার! অন্য সময়তো কাজে বেরোনো মানুষদের সেবা যত্ন তদারকি তেই বয়ে যায় সময়! এই সময়টুকুই তাদের একান্ত নিজের, সাংসারিক কাজের ফাঁকে ফাঁকে একটু নিজেদের নিয়ে আয়েস করা, নিজেদের যাপন। কত টুকুই বা লাগে সেই আয়োজনে! হয়তো স্নান সেরে উঠোনে শাড়ি গুলি মেলতে মেলতে কাপড় মেলার তারের দখলদারি নিয়ে কৃত্রিম ঠেলা ঠেলি ঝগড়া ঝাঁটি -----কখনো হয়তো সত্যিই ঝগড়া ------একথালা মুড়ি বা বাসি ভাত ----এটা সেটা ফেলা ছড়ার জিনিস দিয়ে মুখরোচক ভোজ ----যা কাজের মানুষদের চলেনা। ফেরিওয়ালা ডেকে দুহাত ভরে কাঁচের চুড়ি পরা। বাইরে কাজ না পেয়ে সংসারের খুঁটিনাটি সামলানো পুরুষটিকে একটু পছন্দ মত করে হয়তো একটি সেদ্ধ আলু লঙ্কা পেঁয়াজ ভাজা দিয়ে মেখে দেওয়ার প্রশ্রয়। সুস্বাদু, মুশকিল আসান এই কন্দটি বেশ পছন্দের হয়ে উঠছে এখন সাধারণের হেঁসেলে। কে বলে ----মেয়েরা কেবল মোটা উপার্জন করা পুরুষকেই গুরুত্ব দেয়? তার একটা এলোমেলো ঝিলিমিলি মেয়েবেলা আছেনা? ছাড়া ছাড়া সুখ দুঃখ ছাড়া ছাড়া হাসি, চাপা পড়া ইচ্ছেগুলো? মন দিয়ে শুনবার শখগুলি মেটাবার জন্যও পুরুষ লাগে, কাজের মানুষরা ইচ্ছে থাকলেও সময় করে উঠতে পারে কই? এই সময় তাই সাংসারিক মধুর ষড়যন্ত্রের সময়। দিলদারের মানুষ খুব দোলনা ভালো বাসে। দড়ির দোলনা ঝোলে উঠোনে বারান্দায়। মেয়েরা ই বসে সাধারণত, আর কচি শিশু গুলি। একনাগাড়ে ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে যায় কেউ দোলায় শোয়া শিশুটিকে দোল দিতে দিতে, সেও হয়তো ঢোলে একটু একটু ---সেই রাত থাকতে ওঠা তো! পোষা টিয়াটিকে কেউ কাঁচা লঙ্কা খাওয়াতে খাওয়াতে কথা বলে। সদ্য গোঁফের রেখা ওঠা ইস্কুল না যাওয়া কিংবা একেবারেই ছেড়ে দেওয়া কিশোরটি লাটাই ঘুড়ি নিয়ে এগোতে এগোতে বাধা পায় অল্প একটু বয়সে বড়ো কাকী পিসির ফরমাসে। পা ছড়িয়ে গল্পের মাঝে হয়তো এসে যোগ দেয় খরখরে শাশুড়িটিও। তার ও বুকের ভিতরকার মেয়েবেলার গল্পগুলি পাপড়ি মেলে এই দ্বিপ্রহরেই।অন্য সময় তাকে রাশ ভারী রাখতে হয়। তবে যাদের জন্য তার রাশটি ভারী রাখতে হয় ---তাদের কাছেই খুলে বসে লুকোনো পুতুলের বাক্স। তারাও ঝাঁপিয়ে পড়ে হাসতে হাসতে। কাঁঠাল গাছে বাঁধা ছাগলটিও ঢুলু ঢুলু চোখে যেন মৃদু মৃদু হেসে চলে। ময়রার দোকানে এই সময়টিতেই নামে দিলদারের বিখ্যাত ক্ষীরের গজা, রং তার ঘোর বাদামী। ঘন রস আর কাঁচা শালপাতার মৌতাতে জমে ওঠে বেলা যাপন। এই স্বাদ ভাগ করে ছাড়া জমেনা। আবার কখনো কখনো লাগে তুমুল ঝগড়া -----মনে হয় সব বুঝি ভেঙে চুরে তছনছ হয়ে গেল -----তারপর হটাৎ শান্তি, চুপচাপ। সূর্য ঢলে, উনুনে আঁচ পড়ে, সাঁঝ নামে, পিদিম জ্বলে, ।কাজের মানুষ ঘরে ফেরে বাইরের গপ্পো নিয়ে। রাত গড়িয়ে চলে।খাওয়া দাওয়া মেটে। দুয়ারে খিল পড়ে। নিঝুম উঠোনে হাওয়া খেলা করে ---ঝোপঝাড় আর সন্ধ্যা মালতির গন্ধ মেখে! জোনাকিরা রাত পাহারা দেয় তাদের আলো জ্বেলে।
     
    পড়াশুনা শেখানোর পাশাপাশি মেয়ে ইস্কুলের দিদিমণিদের বাড়তি দায়িত্ব মেয়েগুলির পড়া ছেড়ে দেওয়া আটকানো।কারুর হটাৎ ‘ভালো’ সম্বন্ধ এসে যায় ---তাই বারো তেরোতেই বিয়ের পিঁড়িতে! কেউ বা আর পড়তেই চায়না নিজেরাই! বাড়ির মজা, পুতুল খেলা তাদের কাছে অংক কষা, বানান মুখস্ত করার চেয়ে অনেক বেশী রঙ্গিন হয়ে ওঠে। আবার সংসারের যাঁতাকলে পড়ার পর এই দিনগুলিই তারা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে মেয়েবেলার যাদু বাক্স থেকে সযত্নে বার করে!
     
    খুকুমনি খান এর অংকের মাথাটি বেশ পরিষ্কার । পাটিগণিত, এলজেব্রা, জিওমেট্রি ----সবেতেই তার আশ্চর্য দখল। কিন্তু ক দিন ধরেই সে আসেনা ইস্কুল! আর কাউকে না বলে বনলতা নিজেই একদিন বেরিয়ে পড়ে ইস্কুল বসার পর। সে জেনেছে খুকুমনির বাড়ি কর্ণেলগোলা ছাড়িয়ে হাঁসপুকুর। জিজ্ঞাসা করে করে সে পৌঁছয় এক মস্ত দীঘির ধারে--- যার চারপাশে ইতিউতি বাড়ি ঘর মাঠ ঝোপঝাড়। মাটির দোতলা বাড়ি শক্ত পোক্ত টিনের চাল। মূল ফটক পেরিয়ে উঠোন ---তাকে ঘিরেই গেরস্থালি । বনলতাকে দেখে তারা অবাক আবার খুশী। খুকুমনি বসে ছিল নিকোনো দাওয়ায়--- কোলে একটি বছর খানেকের শিশু । বেড়া বিনুনি বাঁধা মুখ খানি বেশ শুকনো। জ্বর চলছে তার তিনদিন। বনলতার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। বাড়ির লোক যত্ন করে মাদুর বিছিয়ে দেয় দাওয়ায়। কী করবে ভেবে পায়না। কাঁসার গেলাশে জল আসে, কাঁসি করে দুটি চালভাজা, নাড়ু দু চার খান। এরা চা খেতে শিখেছে। কলাই করা কাপে তাও আসে। বনলতা একটু বুঝি আড়ষ্ট। বড়ো ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে এরা ---মা বাপ বিয়ে থা। ও উঠে পড়ে একটু পরে। খুকুমনি কে জ্বর ছাড়লে ইস্কুলে অবশ্য ই আসতে বলে। ও ওর একান্ত নিজস্ব ঘরের কোনটিতে ফিরতে চায়, ব্যক্তিগত পরিসর, মেধার আয়োজনের জন্য হটাৎ হাঁফিয়ে ওঠে।অনেক অনেক কাজ পড়ে আছে তার। বেরোনোর সময় একবার পেছন ফিরে হাত নাড়ে ---বাড়ির মানুষজন কে, রোদ ঝলমলে উঠোনটিকে ।
     
     সেদিনই ইস্কুলে ফেরার পর ঘটে যায় সেই বিশ্রী ঘটনাটা! সে পরে ক্ষমা চেয়েছিল হিমানীবালার কাছে, একান্তে। তখন সন্ধ্যে নামে নামে। খুঁটিনাটি কাজে আরো দেরী হলো দুজনার। বাকিদের ছেড়ে দিয়েছিলো সে। সেদিন বেলালের কথা, হিমানীর কথা ভাবতে ভাবতে , অনুশোচনা করতে করতেই ঠিক করে ফেলে একদিন হিমানীর কাছে রবিবার যাবে সে। থাকবে সারাটি দিন সেখানে। তার ঘরটিতে এই শীতের দিনে রোদ কম ঢোকে, দুপুরের দিকটি ঘরে ভালো লাগেনা তার।
     
    দিলদারের ব্রাহ্ম সমাজ টি বেশ পুরোনো, রাজনারায়ণএর উৎসাহেই এর প্রতিষ্ঠা। চারকুঁয়ার পাশেই এর মোটা মোটা থামওয়ালা সাদা বাড়িখানি। তবে বনলতা সেখানে যেতে তেমন উৎসাহ বোধ করেনি এতদিন, যদিও তারা সমাজের লোক পেয়ে যথেষ্ট উৎসাহ দেখিয়েছে বনলতা সম্বন্ধে। বিশেষত যুবকবৃন্দ। বনলতা যায়না কারণ, ওখানে মূলত পুরুষরাই বসে নানান আলাপ আলোচনা করে। মেয়েরা যায় কালে ভদ্রে কোনো প্রার্থনা সভা বা বিয়ে থার উপলক্ষ থাকলে। বাংলায় বিয়ের মন্ত্র পড়েন আচার্য মশাই। বনলতা আমন্ত্রিত হয়েছিল দুটি বিয়েতে। একটিতে গিয়েছিল। আর একটি প্রার্থনা সভায়।সেদিন হিমানীর বাড়িতে দেখা হয় তার চন্দ্রহাসের সঙ্গে। ব্রাহ্ম সমাজের সক্রিয় সদস্য সে, তাদের ইস্কুলের পরিচালন সমিতিতেও সে আছে। ইস্কুল চলে দিলদারের নগর পালিকার তত্ত্ববধানে। চন্দ্রহাস নগরপালিকায় উঁচু পদে রয়েছে। বেলালের খবর নিতে প্রায় রবিবার সমাজের পাশেই হিমানীর বাড়িটিতে সে চলে আসে। সেই আমন্ত্রণ জানায় তাকে মাঘোৎসবে আসার। দিলদারের পশ্চিমে অরণ্যময় গোপগৃহ পাহাড়েই হয় এই উৎসব। রাজনারায়ণের সময় থেকে। তিনি ভারী ভালোবাসতেন। মৃত্যুর পর এখানেই ঠাঁই নিতে চেয়েছিলেন। বনলতা রাজি হয়। হিমানী বলেন ভোর ভোর রওনা হলে ভালো লাগবে, মুক্তাকে টাঙ্গা নিয়ে আসতে বলে দেবেন তিনি।বনলতা হিমানী কেও সাথে চায়, কিন্তু বেলাল কে ছেড়ে তিনি এতটা সময় থাকতে পারবেননা। বনলতা আর জোর করেনা।
     
    গোপগৃহর চূড়ায় একটি ভাঙাচোরা আট্টালিকার অবশিষ্ট দেখা যায়। স্থানীয়রা বলে বিরাট রাজার গোশালা। বিশ্বাস করেনা অনেকেই। মৎসরাজ বিরাটের সময়কালের জিনিস এতো দূরে, এতো দিন পর টিকে থাকা সম্ভবও নয়। তবে কি অন্য কোনো বিরাট? সমাজে একটা লম্বা সময় ধরে , কোনো একটি শ্রেণীর মধ্যে কিছু নাম প্রচলিত থাকে। হয়তো একই নামের অন্য কোনো রাজা -----কিছু সময় পরের হয়ত। বৌদ্ধ কোনো রাজার নামও উঠে আসে। বনলতা ও চন্দ্রহাস দাঁড়িয়েছিল সেই ভগ্নাবশেষের চাতালে। অপরাহ্ন র আলোয় তা আলোকময়। সামনে নেমে গেছে খাড়া পাহাড়ের ধার।অনেকটা নীচে কপিশার আশ্চর্য সুন্দর বাঁকটি ও গোলাপী হয়ে উঠেছে। একটু আগেও দ্বিপ্রহরের আলোয় তা ঝকমক করছিলো খোলা তলোয়ার এর মতো! বনলতা দিলদারের লাল মাটি, শাল জঙ্গল আর পাহাড় তলীর রূপটির সাথে পূব বাংলার নিজের শহরটির ভারী মিল খুঁজে পায়। আহা! আমার পুরুষেরা গান গায় ---ইংরেজি বানানটি খুললে তাইতো অর্থ দাঁড়ায় তার!
     
     কিন্তু সে শহর জানে তার শৈশব আর কৈশোরের একটুখানি, চেনা সম্পর্কে জড়িয়ে, তাদের আয়নায়। এই বনলতাতো কেবল অন্যের দ্বারা সৃষ্ট নয়, সে নিজেও নিজেকে কি সৃষ্টি করেনি? করে চলছেনা? সেই সৃষ্টিকে স্বীকৃতি কি দিতে পারবে সে শহর? তার দেখার রূপটি বদলে? রাজি হবে সে ব্যক্তি নারীটিকে –নতুন -মানুষটিকে নিজের শর্তে বাঁচার অধিকার দিতে ? দিলদার তো তাকে দিয়েছে সেই স্বীকৃতি! নাই বা জানলো তার শিকড় কে! এই ঝলমলে ডালপালা মেলা পরিচয়টিওতো সত্য! আরো বেশী বুঝিবা! সেখানে পুবে গেলে পর্বতমালা, এখানে তা পশ্চিমে। আর কি সে ফিরবে পুব পানে? নাকি ঝুরি নামাবে এখানেই?
     
    দিন ঢলে পড়লে মুক্তা এসে দাঁড়ায় নীচে। ধীরে ধীরে উৎসবের দলটিও নেমে আসে। জানুয়ারির হাড় কাঁপানো বাতাস ছাড়ে, গালে ঠোঁটে টান লাগে।। চন্দ্রহাস বনলতাকে টাঙ্গায় তুলে দিয়ে নিজে অন্য একটি টাঙাতে ওঠে আরো তিনজনের সাথে। দিলদারে এখন গুটি কয় রিকশা গাড়িও চালু হয়েছে। সেগুলিও অপেক্ষায় ছিল সওয়ারীর। ভরে যায় সব। এমনিতে এদিকটা ভারী নির্জন। কিছুই থাকেনা। আজকের দিনের কথা আলাদা।
    আজকের দিনটি তার কাছেও অন্যরকম।
     
    সে আজকাল রবিবার প্রায়শই সমাজের বাড়িটি ছুঁয়ে হিমানীর বাড়ি যায়। গুঞ্জন ওঠে একটু আধটু। হিমানী স্মিত চিত্তে বনলতাকে শনিবার দুপুরে ছুটির পর বলতে ভোলেননা রবিবার তাঁর বাড়ি যেতে। বেলালও খুব খুশী থাকে তাকে পেয়ে।তার রোগা মুখটি উজল হয়ে ওঠে। ঠোঁট দুটি তার একটু নীলচে, হাতের নখ গুলিও। তার বড়দা নাকি এ নিয়ে বাঁকুড়ায় কথা বলেছে। হিমানীর মেয়ে দুটিও খুশি হয় বন লতাকে পেয়ে।।  বড়ো ছেলেদুটি বড়ো ছুটি ছাড়া আসতে পারেনা। বনলতা দোলের দিন রবিবাবুর একটি গান গায় সমাজের অনুষ্ঠানে :
    এই যে তোমার প্রেম ওগো হৃদয় হরণ ---
    এই যে পাতায় আলোক নাচে সোনার বরণ ---হৃদয় হরণ।
     
    সে দিন অনুষ্ঠান ছিল ঈশ্বর স্মৃতি মন্দির প্রাঙ্গনে। প্রেক্ষাগৃহটি এখনো যদিও সম্পূর্ণ হয়নি, তবে প্রাঙ্গনটি ইতিমধ্যেই মনোরম বাগিচায় সেজে উঠছে ধীরে ধীরে।তার গান শাল সেগুনের পাতায় প্রতিধনিত হয়ে বসন্তের বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। অনেকের ইচ্ছে ছিল বসন্ত পূর্ণিমার কীর্তন উৎসব গোপগৃহেই হোক। কিন্তু, বর্ষীয়ান মানুষরা সে প্রস্তাব নাকচ করেছেন, কারণ এই সময় সেই স্থান শুকনো পাতায় ঢাকা থাকে যার তলায় শীত ঘুম থেকে সদ্য ওঠা সরীসৃপ দের চলাচল। ভগ্ন প্রাসাদ ও এই সময় সাপ খোপের আড্ডা।
     
    দেখতে দেখতে দিলদারের লু বওয়া গরম এসে পড়ে। ইস্কুল ছুটি হয়। বনলতা খুব ভোরে উঠে কিল্লা দীঘির পাড় ধরে একটু হাঁটে। ফিরে এসে কোয়ার্টারএই থাকে নানা কাজে। কখনো কখনো দুপুর টা কাজে লাগায় বেইলি লাইব্রেরি তে। উঁচু উঁচু ছাদ মোটা দেওয়াল আর খসখস ভেজা পর্দায় এক আরামদায়ক মস্তিস্ক যাপন হয় তার। সন্ধ্যের দিকে মনোরম বাতাস টানে এ শহরের মানুষকে। কেউই আর ঘরে থাকেনা তখন। বনলতাই বা থাকবে কোন দুঃখে? দিলদারে একটি রেস্তোরাঁ খুলেছে রাঁদেভূ নামে।
     
    ইস্কুলের ছুটি ফুরোয়, বর্ষা নামে, বর্ষার শেষে আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা, রাত্রিগুলি প্রায়শই নক্ষত্র খচিত। মোটামুটি পুরোনো রুটিনেই চলতে থাকে বনলতার দিনগুলি,কেবল সান্ধ্য ভ্রমণএর ব্যতিক্রমটি ছাড়া। ক দিন ধরেই ইস্কুলের প্রার্থনা সঙ্গীত নিয়ে কিছু আলোচনা চলছিল। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ এর “তস্মেই দেবায় নমো নমঃ” মন্ত্রটি এতদিন গাওয়া হত মূল সংস্কৃতে। প্রস্তাব উঠেছিল রবিবাবুর বাংলা অনুবাদটি চালু করলে কেমন হয়? ছাত্রীদের কাছে “যিনি অগ্নিতে যিনি জলেতে…”  অনেক বেশী সহজ হবে বোঝা। পরিচালন সমিতিও সায় দেয়। তবে সেই সমিতির মাথা অঘোর বাবু এরই সাথে আরেকটি ব্রহ্ম সংগীত ---“আমরা সবাই প্রেমেরসে মগ্ন হয়ে থাকবো সদাই…”  চালু করার জন্য জোরাজুরি করতে থাকেন। নিমরাজি লোকজনকে রাজি করাতে মিটিং এর মধ্যেই ইস্কুলের হারমোনিয়াম টি আনিয়ে নিয়ে সা পা টিপে নিজেই গাইতে শুরু করলেন:
    আমরা সবাই প্রেমরসে মগ্ন হয়ে থাকবো সদাই ---
    হয়ে সর্বত্যাগী প্রেমিক বৈরাগী,
    হব তোমার প্রেমে অনুরাগী…..ই।
    সকলেই অগত্যা মাথা নাড়তে লাগলো। অঘোরবাবুর পরকলার ডাঁটিটির সাথে সাথে সামনের দুটি দাঁতের মধ্য উপস্থিত নড়বড়ে দাঁতটিও কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো। চন্দ্রহাসকে দেখা গেল একবার কাঁধের উপরে পড়ে থাকা চাদরটি ঠিকঠাক করতে, একবার পায়ের অবস্থান বদলাতে। তারপর ডান ভুরুটি তার উঠে গেল, কপাল কুঁচকে সে চেয়ে রইলো অঘোরবাবুর দিকে। হটাৎ ই সে পূর্ণ দৃষ্টিপাত করলো বনলতার মুখের উপরে! এতক্ষন যে প্রবল চেষ্টায় নিজেকে সামলে রেখেছিলো বনলতা ---সেই বাঁধ ভেঙে পড়লো! মুখে রুমাল টি চেপে ধরে হাসি চাপা দিতে যাওয়ার চেষ্টার ফল হলো আরো মারাত্মক!
    সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল হটাৎ, তারপরেই শুরু হলো প্রবল ঝড়! অঘোর বাবুর প্রলয় নাচন!
     
    হিমানী বালার কাছে সেই রাতেই প্রস্তাব গেল প্রধান শিক্ষিকার কার্যভার গ্রহণ করার ---বনলতার বদলে। হিমানী রাজি হলেননা। তখন প্রস্তাব আদেশ হলো। হিমানী এই পুতুল খেলায় বড্ড ভয় পেলেন। বনলতার ব্যবহারে তিনিও অবাক হয়েছিলেন, কিন্তু পরিণত পুরুষের অপরিণত অসহিষ্ণুতা ----ক্ষমতার আস্ফালন ---তাঁর মনটি তেতো করে দিল।
     
    গৃহীত স্বীকৃতির ছত্রছায়ায় থাকা মানুষের বুঝি কোনোদিনই আর সঠিক পথে স্বাধীন আত্মবিকাশ সম্ভব নয়। বাধার মুখে নিজের মত যুঝতে যুঝতেই ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে! উচ্চ বর্ণ ও অর্থনৈতিক অবস্থানে থাকা পুরুষের ক্ষেত্রে কথাটি বুঝি একটু বেশীই খাটে। ক্ষমতার রাজপথের সহজ দাবিদার হটাৎ ই সম্মুখে 'দ্বিতীয়' শ্রেণীর নাগরিকের সাক্ষাতে একটু থমকে দাঁড়ায়। বিশেষ করে সে যদি নারী হয়। সুস্থ নাগরিক পথটি ভুলে অনেকেই ছোটে পিছনপানে, ধুলো ঝেড়ে নামিয়ে নিয়ে আসে চিরায়ত দমনের লাঠিটি! তাদের গণতান্ত্রিক স্বীকৃতি দিয়েও নিজেকে সপ্রতিভ ভাবে তাদের কাছে উপস্থাপিত ও প্রতিষ্ঠিত করার আর কোনো সদর্থক পথ আসলে তার চেনাই হয়নি।
     
    ধৌলিপত্তন নগরটি দূর সাগরের তীরে। দিলদার থেকে দক্ষিণ পূবে অনেকটাই পথ। এ নগরের রং শ্বেতশুভ্র। আসলে শ্বেত বালুকারাশির মধ্যেই এই নগর, আসে পাশে তার বালুকা প্রাচীর ---লোকে বলে—“কাঁথ”। মানুষজন মেধাবী, শিক্ষানুরাগী, উদ্যোগী।
    সেখানে দুটি মেয়ে ইস্কুল ---একটি ব্রাহ্ম আরেকটি হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় অনেকদিন আগেই বনলতা কে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল প্রধান শিক্ষিকা হওয়ার জন্য। বনলতা মন দিয়ে ফেলেছিলো দিলদারকে। ক দিন আগেও চিঠি এসেছে দুটি ইস্কুল থেকেই। বনলতা ব্রাহ্ম ইস্কুলকে তার করে দিলো। চিঠি দিয়ে আবার তার উত্তর আসতে বেশ কিছুদিনের ধাক্কা। সারাদিন ইস্কুলে তার কাটলো অন্যমনস্কতায়। সন্ধ্যায় একলা ঘরটিতে শুয়ে সে মানস ভ্রমণে বেরোলো ধৌলিপত্তনে। তার সুদৃশ্য হর্ম্যরাজি, প্রশস্ত আলোকজ্জ্বল রাজপথ, দোকানপাট,বিদ্যানিকেতনগুলি, নগর উপান্তে শুভ্র বালুকারাশি, সাগর থেকে বয়ে আসা ঠান্ডা বাতাস তাকে হাতছানি দিল। মরিচা রং এর দিলদার তাকে ইদানিং বড়ো পীড়িত করছে ! আবার পিছুও ছাড়ছেনা!
     
    দিন কয়েক পরেই সে রওনা দিলো সেই নগরের উদ্দেশ্যে। চন্দ্রহাস কিছুই বলেনি তাকে, আটকায় ও নি। শুধু মুক্তার টাঙ্গায় তাকে তুলে দিয়ে উল্টোমুখী আসন টি তে উঠে বসলো বনলতার বাক্স বিছানা সামলে। তার কোনো ওজর আপত্তিতে কান দিলোনা সে। হিমানী ও অন্যান্য রাও চন্দ্রহাসের পক্ষই নিল। দিলদার থেকে রেলগাড়ি চেপে তারা গেল রেল শহরের জংশনে। সেখানে নীলাচলমুখী রেলগাড়ির সেকেন্ড ক্লাসে তাকে তুলে দিয়ে ফিরে এলো। সেই গাড়ি বনলতাকে নামিয়ে দেবে ধৌলিপত্তনের সবচেয়ে কাছাকাছি কোনো ইষ্টিশনে। সেখানে তারজন্য একটি মোটর গাড়ি অপেক্ষা করবে। ধৌলিপত্তনে রেলপথ নেই।
     
    যমুনা পেরিয়ে একজন চলে গিয়েছিল মথুরা, তারপর আরো পশ্চিমে দ্বারকা। তাঁকে খুঁজতে কত কত বছর পর আরেকজন পেরোলো নবদ্বীপের গঙ্গার ঘাট। সেই নিদয়ার ঘাট পেরিয়ে ওপারের কন্টক নগরী হয়ে এই দিলদারেরই পাশ দিয়ে চলে গেল নীলাচল। এই মানবী আজ ঝমঝম করে উন্নত শিরে কপিশা র বুকের উপর দিয়ে চলে গেল কাকে খুঁজতে? হয়তো কাউকেই নয় ---শুধু নিজেকে পূর্ণ অবয়বে অবলোকনের নিমিত্ত একটি স্বচ্ছতর দর্পণের সন্ধানে। পিতৃতর্পণের জলাশয়ে সে স্বছতা নেই। নেই মাতৃ বন্দনার সমপনে মাতৃমুখ দর্শনের দর্পণটিতেও। সেই স্বচ্ছ দর্পণটি নিজেকেই অর্জন করতে হয়। কঙ্করময় পথে প্রস্তরখন্ডে পদযুগল রক্তাক্ত না হলে তাকে পাওয়া যায়না। হৃদয়েও রক্ত ঝরে।
     
    হিমানীবালা বাধ্য হয়েছিলেন দায়িত্ব গ্রহণ করতে। ইস্কুলটি আসতে আসতে নগরপালিকার হাত থেকে গেল শিক্ষা দপ্তরের হাতে। ছাত্রী সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজও বাড়লো। মাঝে মাঝেই তাঁকে ছুটতে হত কলিকাতা। একলা সেখানে যেতে তাঁর ভারী ভয়। তাঁকে তাই সঙ্গ দিতেন ভাতৃসম বঙ্কিম বাবু ---দিলদার নগর কলেজিয়েট  ইস্কুলের শিক্ষক। স্নেহের পরিমন্ডল রচনা করে বাঁচা হিমানীর স্বভাবসিদ্ধ। নতুন নতুন শিক্ষিকারাও সেই মায়ার বাঁধনে বাঁধা পড়তে লাগলেন।
     
    চন্দ্রহাসকে কোনো একদিন সুখে থাকতে ভূতে কিল মারলো। পারিবারিক ভদ্রাসনে সহজলভ্য স্বীকৃতি, প্রতিপত্তি, নগরপালিকার সুখের চাকুরীটি, ব্রাহ্মসমাজের বাৎসরিক কর্মসূচী ---সব কিছুই হয়তো তাকে ক্লান্ত করে তুলছিলো আসতে আসতে। সে বেরিয়ে পড়েছিল রেলের চাকরি নিয়ে। অবশেষে নাগপুর বা বিলাসপুর ---কোথাও একটা থিতু হয়েছিল। অনেকটা জীবন পার করে সংসার পেতেছিলো সেখানে একটি ভূমিজ মেয়ের সাথে। দিলদারে তার আর ফেরা হয়নি। হয়তো নিজেই সে ফিরতে চায়নি। শুধু হিমানীবালার সাথে তার পত্র যোগাযোগ ছিল। সে সব অবশ্য অনেক পরের কথা, পৃথিবী তখন টালমাটাল যুদ্ধ এবং নানান দেশ ও জাতির সার্বভৌমত্বের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে। দিলদারের আত্মা তো চিরকাল এই পথেই হেঁটে এসেছে! সেখানেও ভারী গোল।
     
    স্বাধীনতার দাম চোকালো মানুষ--- ঘর ও প্রাণের বিনিময়ে। পুব দেশ থেকে মানুষ দিলদারে এসেছে বহুদিন ধরেই ---চাকরি বাকরি নিয়ে অথবা নির্বাসনের শর্তে। স্বাধীন দেশে তারা এল সর্বস্ব হারিয়ে। দিলদারও তার নির্লিপ্ত আবাহন ও নাই বিসর্জন ও নাই  ---ভঙ্গিটিতে নিজের দাওয়ার চারপাশে মাদুর বিছিয়ে দিতে লাগলো। চার পাশে ছড়িয়ে থাকা ভব্বর কাঁকুড়ে জমিগুলি ভরে উঠতে থাকলো সবুজ সবুজ নতুন পাড়ায়। তারাও দিলদারের বিচিত্র জমিনটির সাথে মিথস্ক্রিয়া করতে করতে দিলদারি হয়ে উঠতে লাগলো। ইস্কুলগুলিতে হটাৎ ই ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে গেল অনেকটাই। রেলগাড়িও বাড়লো, বাড়লো ফেরিওয়ালার সংখ্যা আর ইষ্টিশন এর বাইরে গড়ে ওঠা সাইকেল স্ট্যান্ড এ সাইকেলের সংখ্যা। হিমানীবালাদের আরো দৌড়োতে হতে লাগলো কলিকাতা ---ইস্কুলের শ্রেণী কক্ষের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য টাকার তদবির করতে। ততদিনে বনলতা তার ধৌলিপত্তনের পথ হাঁটা শেষ করে পা গুটিয়ে বসেছে কলিকাতায় ---নতুন গড়ে ওঠা উদ্বাস্তু মেয়েদের ইস্কুলে।
     
    হিমানীবালা কলিকাতায় এলে হোটেলে এখন কমই ওঠেন। বনলতার ছোট্ট ঠাঁইখানিই তাঁকে আরাম দেয় বেশী। একলাই আসতে পারেন তিনি এখন। সারাদিনের কাজের শেষে সন্ধ্যাবেলা দুই নারী খুলে বসেন দিলদার পেটিকা। শীত কেমন পড়লো এবার, কোন কোন নতুন পাড়া বসলো, রেলগাড়ি বাড়লো, আসাযাওয়ার সময় কত কমলো, ইস্কুলের কথা, নতুন কারা এলো, কোন মেয়ে ভালো ফল করলো ম্যাট্রিক এ ----গল্পের কি শেষ আছে? রাত গড়ায়। খাওয়া দাওয়া চুকলে বনলতা হিমানীর ঘরে খাবার জলের কাঁচের জাগটি রাখতে গিয়ে একটু দাঁড়ায়। ইতস্তত করে মৃদু গলায় জানতে চায় আরো কোনো খবর, কারোর খবর। নিভু নিভু রাতবাতির আলোয় হিমানীও কিছু জবাব দেন। আমরা তা জানিনা।
     
    মুক্তার টাঙ্গার ঘোড়াটির বয়স হওয়ায় আর গাড়ি টানতে পারেনা, মালিক তাকে কোথাও বেচে দেয় একদিন ---হয়তো কোনো গরীব সার্কাস দলে। মুক্তাও কি আর আগের মত আছে? তার ছেলে শওকত একটি রিক্স কিনেছে। রং বেরং এ সাজিয়েছে সেটি। মাঝে মাঝেই বিবি সাবিনা আর ছেলে গগন কে চাপিয়ে সে রিক্স ছোটায় আর মুখে আওয়াজ করে করে গান গায় –“চলতি কা নাম গাড়ি…“। চার বছরের গগন খিলখিল করে হাসে। সেও রিক্স ছোটাবে এমন করে একদিন। দিলদারে একটি ছবিঘর খুলেছে ---অরোরা টকিস
     
    হেনরি অমিয় ব্যানার্জী দিলদারের নামকরা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। ভাই ম্যাথিউ রঞ্জন স্টেটস ম্যান হাউসে। বোন ডরথি মনিকা দিলদার নগর ব্যাপটিস্ট মিশন গার্লস স্কুল এই পড়ায়। ছোটো বোন মেরি দীপিকা আসানসোলে এক মিশনারি ইস্কুলে চাকরি নিয়ে চলে গেছে। বেলালের আর বয়স বাড়েনি। ভাইবোনেরা কেউই চায়না মা আর কাজ করুক। হিমানীর ও শরীর ভেঙেছে, অবসর এর সময় এসেই গেছে, আর কটা দিন মাত্র!
     
     হিমানীর অবর্তমানে কে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব নেবেন তা নিয়ে আলাপ আলোচনা শুরু হয়েছে। হিমানীর ইচ্ছে বরুণা মিত্র সে ভার নিক। গত সাত বছর ধরে তাকে দেখছেন তিনি। শক্তপোক্ত শরীর আর মনের অধিকারিণী মেয়েটির কাজের দক্ষতা ও নিষ্ঠা রাজনারায়ণ ইস্কুলকে অনেকটাই সামনে এগিয়ে দিয়েছে। আদর করে হিমানী তাকে 'হংসিনী' বলে ডাকেন। কিন্তু এখন অনেক নিয়ম কানুনের বেড়াজাল। ইন্টারভিউ ডাকতে হবে বিজ্ঞাপন দিয়ে। দরখাস্ত পড়লো অনেকগুলি। ইন্টারভিউ এ সবাইকে ছাপিয়ে গেল হৈমবতী বাগচী। শিক্ষাগত যোগ্যতা তার সবার চেয়ে অনেকটাই বেশী, অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ডুয়ার্স অঞ্চলের এই দোহারা দীর্ঘাঙ্গিনী র মধ্যে অদ্ভুত এক ব্যক্তিত্ব। হিমানী হৃদয়ের টলটলে খিড়কি র পুকুরটিতে তাঁর হংসিনীকে ভাসিয়ে দিয়ে হৈমবতীকেই বেছে নিতে বাধ্য হলেন। বরুণা কষ্ট পেলোকি?
     
    হৈমবতী আর রাজনারায়ণ ইস্কুল একার্থক হয়ে উঠলো আসতে আসতে। হিমানীবালাকে শিক্ষিকা রা ভালোবাসতো, তার সুযোগও তারা নিত মাঝে মাঝে। হৈমবতীর নৈর্ব্যক্তিক অথচ সম্মান পূর্বক ব্যবহার তাদের বাধ্য করল অনেকটাই তাঁকেই অনুসরণ করতে। হৈমবতীর চারপাশে বলয়ের মত ঘিরে থাকা একটা শ্রদ্ধাপূর্ণ ভয়ের পরিবেশ আসতে আসতে সমগ্র বিদ্যালয়টিকেই আচ্ছাদন দিল। হিমানীবালা তৃপ্ত হলেন। তিনি ভুল করেননি। হৈমবতী নিজের জীবনটি উৎসর্গ করলেন ইস্কুলটিকে উচ্চ থেকে উচ্চতর জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার।
     
     একলা হৈমবতীর দেখাশোনা করার কেউ ছিলোনা ঘরে, তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রাচীর ভেদ করে মানুষটির কাছে পৌঁছনোর পথ জানা ছিলোনা বাইরের মানুষের। হয়তো সেই কারণেই কাজ তিনি শেষ করতে পারলেননা। তিনতলার মস্ত বড় হল ঘরটি নিয়ে চিন্তা করতে করতেই সন্ন্যাস রোগে আক্রান্ত হয়ে হটাৎ ই চলে গেলেন। সহ প্রধান শিক্ষিকা বরুণা প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব নিলেন তাঁর নিজের মত করে। হিমানীর দীর্ঘ দিনের একটা অপরাধ বোধের ক্ষত তে বুঝি প্রলেপ পড়লো।। হৈমবতীর নৈর্ব্যক্তিক ভাব আনা আর সম্ভব ছিলোনা বরুণার পক্ষে দীর্ঘ দিনের সহকর্মীদের সাথে ব্যবহারে। কখনওবা নিকট সম্পর্ককে তিনি অজান্তেই পেশাদারী ক্ষেত্রে একটু ভুল ভাবেই ব্যবহার করে ফেললেন। তুলনা উঠলো। ছাত্রীদের প্রতি গভীর স্নেহ সত্ত্বেও তাঁর আবেগীয় দিকটি তাঁকে ই প্রবঞ্চনা করে কখনো কখনো অযথা ক্ষিপ্ত করে তুলতো তাদেরই প্রতি!  সে কথা হিমানীর কানে পৌঁছলে তিনি কষ্ট পেলেন। তবুও নিষ্ঠা আর ভালোবাসায় এগিয়ে চললো রাজনারায়ণ ইস্কুল।
     
    একষট্টি সালের জুলাই শেষের এক ঝলমলে সকালে হিমানী টেবিলে বসে চা খাচ্ছিলেন অমিয় আর মনিকার সাথে।অমিয় খবরের কাগজে খেলার পাতা দেখছিলো। মনিকা প্রথম পাতা। হিমানী দুপুরে পড়েন খবরের কাগজ। অমিয় মনিকা কেউই বিয়ে করলোনা। দীপিকা আসানসোলেই সংসারী, একটি ছেলে তার। রঞ্জনের ঘরে একটি নাতনি।। মনিকা কাগজের উপরে ঝুঁকে পড়ে ভুরু কুঁচকে কী পড়ছে? একটু পরেই অমিয় ওঠে, তার স্নান শেষ হলে স্নানঘরের দিকে এগোয় মনিকা। হিমানী আলগোছে কাগজটি টেনে নেন যদিও এখন তাঁর মেলা কাজ।
     
    একটু পরে অমিয় বাইরের পোশাকে তৈরী হয়ে খাবার টেবিলে আসে। দেখে মা অমনিই বসে আছেন। মাথাটা একটু হেলানো।সে অবাক হয়। পরক্ষণেই অভিজ্ঞ চোখে বুঝে যায় সবকিছু, তবুও আঁকড়ে ধরে মায়ের কব্জিখানা নাড়ির সন্ধানে!
     
    ব্যাপটিস্ট চার্চ এর সন্নিহিত সমাধি ক্ষেত্রেই সমাধিস্থ হলেন হিমানী বালা ----বেলালের ছোট্ট সমাধিটির ঠিক পাশেই। আটতিরিশ সালের হেমন্তের এক বিকেলে সে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়েছিল হৃদকমলের গহীন পাপড়িতে ছোট্ট একটি অনুপপত্তি নিয়ে। সেই অনুপপত্তি যে সংশোধন করা যায় ---এই পোড়া দেশেই ---তা আজই খবরের কাগজে বেরিয়েছিল। গতকাল ই ভেলোরের খ্রীষ্টান মিশনারি হাসপাতালে এমনটাই করতে পেরেছেন এক ডাক্তার---নাগারুর গোপীনাথ!
     
    সেই সন্ধ্যায় মৌসুমী বাতাস দুদিনের বিশ্রাম শেষে আবার ধেয়ে এলো দিলদারে। হিমানীর সমাধিতে রাখা ফুলগুলির কিছু উড়ে গিয়ে পড়লো বেলালের বুকে। বৃষ্টিতে সমাধির কাঁচা মাটি থেকে মাতৃগন্ধ প্রকট হলো। “আজ কতদিন পরে মা আর ছা ভিজবে একসাথে!”----পাঁচিলের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একজোড়া উইপিং উইলো মাথা নেড়ে নেড়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে থাকলো।
     
    কলিকাতার এই শহরতলি গড়ে উঠেছে পুব দেশের মানুষকে ঠাঁই দিতে। বনলতার তো কৈশোর যৌবন কাটলো এই দিকেই! শেষ বিকেলে সে এখানেই একটি ছোট্ট বাড়ি বানিয়েছে। মাত্র দেড় কাঠা জমিতে ---একতলা।বাড়ির পেছনে একটি সেগুন, একটি শাল, চারপাশ ঘিরে লাল মোরামের রাস্তা। সেগুন গাছে ফুল ধরেছে। সামনে কিছু ফুল পাতা। হিমানীর খবর সে আজ সন্ধ্যাতেই পেয়েছে। এখন খবর দ্রুত পৌঁছয়। ও ভাবে –পরশু ও তিনি ছিলেন এমন সময়! বিদ্যুৎবিহীন এই সন্ধ্যায় একটি মোমের আলোর দিকে তাকিয়ে সে ভেবে চলে--- গারো পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ছোটোনাগপুর পর্যন্ত ছেয়ে থাকা এক বিস্তৃত অঞ্চলের কথা ---যা গাঙ্গেয় বর্ষার এই অন্ধকারে ভিজে চলেছে। ভিজছে তার জন্মভূমি ময়মনসিং, আর তার দিলদার নগর! মাঝে ভিজছে এই কলিকাতা ---তার শাল সেগুন,তার ছোট্ট বাড়িটি ---ভিজে যাচ্ছে গেটের গায়ে একদিকে তার নাম ফলক, আরেক দিকে বাড়ির নামটি---“দিলদার "।
     
    এই বাড়িটি নিজেই এখন একটি আরশি নগর---যার বর্ণালী অতীত আর সিপিয়া বর্তমান  ঘুরে ঘুরে আনাগোনা করছে একটি মোমবাতির চারপাশে।
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ২১ জানুয়ারি ২০২৫ | ৩২২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Kakali Bandyopadhyay | 223.223.***.*** | ২১ জানুয়ারি ২০২৫ ১৫:৫৯540758
  • রাজনারায়ণ ইস্কুলের সেই মেয়েগুলিকে মনে  পড়ছে ..যারা  ' যিনি  অগ্নিতে  যিনি  জলেতে ' র  সুরে প্রখর  গ্রীষ্মে  মাঠে  দাঁড়িয়ে  গাইত  ' মোরা  কাঠফাটা রোদ্দুরেতে '...
     
     
     
  • অঙ্কিতা ঘোষ | 2409:4060:2d91:9b80::44ca:***:*** | ২১ জানুয়ারি ২০২৫ ২০:২৩540763
  • হলদেটে আলো মাখা মফস্বলের সন্ধ্যে, লড়াকু চেনা মুখদের ফিরে দেখা ... অসাধারন
  • kk | 172.58.***.*** | ২১ জানুয়ারি ২০২৫ ২০:৫৮540764
  • নিখাদ বিশুদ্ধ জাদু আছে আপনার কলমে। গল্পের মধ্যে থেকে আরো গল্প এসে হাজির হয়। কেউ উঁকি মারে, কেউ সামনে এসে বসে। একেক লাইনে অন্য অন্য গল্প। একেক শব্দে। জোসেফ বেলাল ব্যানার্জী, কী অদ্ভুত সুন্দর নাম! একটা ছোট্ট লাইন -- "বেলালের আর বয়স বাড়েনি"... কত কিছু বলে দিয়ে চলে গেলো। কুর্নিশ আপনাকে।
  • | ২১ জানুয়ারি ২০২৫ ২৩:০৫540766
  • অদ্ভুত অপূর্ব। আস্ত উপন্যাস যেন একটা পাতায় ধরানো। 
     
    (হৈমবতী এক জায়গায় হৈমন্তী হয়ে গেছে। আরো দু একটা ছোট টাইপো। একটু দেখুন না।) 
  • কালনিমে | 103.244.***.*** | ২১ জানুয়ারি ২০২৫ ২৩:৫৮540767
  • খুব মায়াময় লেখা- এক আশ্চর্য জগৎ 
  • Aditi Dasgupta | ২২ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:২৯540774
  • যত্ন নিয়ে পড়া ও মতামত দেবার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাদের। @দ হ্যাঁ তাইতো! ঠিক করে নিচ্ছি।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন