হাসদেও বনাঞ্চল ছত্তিশগড়ের কোরবা, সুরগুজা ও কোরিয়া জেলার প্রায় ১,৭০,০০০ হেক্টর জুড়ে বিস্তৃত। একে মধ্য ভারতের 'ফুসফুস' বলা হয়, কারণ এটি ঘন শাল ও সেগুন গাছের এক মস্ত জঙ্গল। এই বনাঞ্চল হাতি ও ভাল্লুকসহ নানা বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং একটি সুপরিচিত হাতি করিডোর। এই অঞ্চলের ওপর ভিত্তি করে হাসদেও বঙ্গ বাঁধ (মিনিমাতা বাঁধ) নির্মিত হয়েছে, যা লক্ষাধিক হেক্টর জমিতে জলসেচের কাজ চালায়। ছত্তিশগড় রাজ্যে অবস্থিত হাসদেও উপত্যকা বা হাসদেও আরন্দ অঞ্চলটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ কয়লা খনি এলাকা এবং বিশাল প্রাকৃতিক অরণ্য। মহানদীর প্রধান উপনদী হাসদেও নদী এই উপত্যকার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পরিবেশগত বৈচিত্র্য এবং কয়লা উত্তোলন সংক্রান্ত বিরোধের জন্য এটি ভারতের একটি অন্যতম আলোচিত স্থান। হাসদেও উপত্যকার মাটির নিচে প্রায় ৫ বিলিয়ন টন কয়লার বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে বলে জানা যায়। এই অঞ্চলে ইতোমধ্যেই একাধিক কয়লা ব্লক ও খনি রয়েছে, যা ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়। বিশাল পরিমাণে গাছ কাটা ও কয়লা উত্তোলনের ফলে স্থানীয় আদিবাসী সমাজ ও পরিবেশবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন ও প্রতিবাদ চালিয়ে আসছেন। সম্প্রতি এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বর্তমান বিতর্কে ঢোকার আগে হাসদেও অঞ্চল ও তার অধিবাসীদের সম্পর্কে কিছু কথা জেনে নেওয়া যাক।
হাসদেও অঞ্চলের মূল পরিচয় গড়ে উঠেছে হাসদেও নদীকে কেন্দ্র করে। নদীটি ছত্তিশগড়ের করিয়া জেলার পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে মহানদীর প্রধান উপনদী হিসেবে প্রবাহিত হয়েছে। এই নদীর অববাহিকায় যে বিশাল জঙ্গল গড়ে উঠেছে, তাকেই বলা হয় হাসদেও আরন্দ বা হাসদেও অরণ্য। ছত্তিশগড়ের এই অঞ্চলটি মূলত গোণ্ড (Gond) ও ওরাওঁ (Oraon) এবং পাহাড়ি কোরবা (Pahari Korwa) আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যগত বাসস্থান। আদিবাসী সম্প্রদায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই গভীর অরণ্যের বুকে তারা এক অনন্য জীবনধারা, ইতিহাস এবং বিশ্বাস ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। স্থানীয় উপজাতীয় লোকগাথা এবং লোককথা অনুসারে প্রাকৃতিকভাবে বয়ে চলা নদী বা বনের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে আদিবাসীরা এই নামকরণ করেছিলেন। এটি তাদের সংস্কৃতিতে জীবনদায়ী এক জলস্রোতের প্রতীক। হাসদেও উপত্যকাকে প্রায়ই 'হাসদেও আরন্দ' বলা হয়। এখানে 'আরন্দ' বা 'অরণ্য' শব্দের অর্থ হলো জঙ্গল বা বন। অর্থাৎ, 'হাসদেও আরন্দ' শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় "হাসদেও নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা অরণ্য"। হাসদেও অঞ্চলের আদিবাসীদের ধর্ম মূলত প্রকৃতি পূজা বা সর্বপ্রাণবাদের (Animism) ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁরা কোনো মন্দির বা মূর্তিতে বিশ্বাস করেন না, বরং প্রকৃতিকেই ঈশ্বর মনে করেন। [১, ২, ৩, ৪, ৫]
এই অঞ্চলের দেবদেবী, ধর্মবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক উৎসবগুলো সম্পর্কে কিছুটা জানলে আমরা বুঝতে পারবো কেন ওঁরা সরকারি প্রকল্পের এত বেশী বিরোধীতা করছেন। আসুন দেখা যাক। গোণ্ড উপজাতির প্রধান দেবতা হলেন 'বড়া দেব' (Bara Deo / Persa Pen)। ওঁদের বিশ্বাস বড়া দেব মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি বনের সবচেয়ে প্রবীণ বিশাল শালগাছে বাস করেন। তাঁরা পৃথিবীকে বা মাটিকে 'ধরণী মাতা' হিসেবে পূজা করেন, যা তাদের ফসল ও জীবন ধারণের শক্তি দেয়। ওরাওঁ এবং অন্যান্য উপজাতিদের প্রতিটি গ্রামে একটি পবিত্র বনাঞ্চল বা কুঞ্জ থাকে, যাকে 'সার্নাস্থল' বলা হয়। এখানে কোনো গাছ কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং সমস্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠান এই খোলা বনেই অনুষ্ঠিত হয়। গোণ্ড আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী দেয়াল চিত্র ও ক্যানভাস পেইন্টিং বিশ্ববিখ্যাত। তারা রেখা ও বিন্দুর (Dots and Dashes) নিখুঁত ছন্দে বনের পশুপাখি, গাছপালা এবং তাদের দেবদেবীর ছবি আঁকেন। এখানকার উৎসবগুলো সরাসরি বনের ঋতুচক্র এবং কৃষিকাজের সাথে যুক্ত।
সারহুল উৎসব (Sarhul): ওরাওঁ উপজাতির সবচেয়ে বড় উৎসব হল বসন্তোৎসব। যখন শাল গাছে নতুন ফুল ফোটে, তখন এই উৎসব হয়। তাঁরা প্রতীকীভাবে আকাশ ও পৃথিবীর বিয়ে দেন, যাতে ধরিত্রী উর্বর হয়।
কর্ম উৎসব (Karma Festival): ভাদ্র মাসে আদিবাসীরা 'করম' গাছের ডাল কেটে এনে উঠোনে পুঁতে তার চারপাশে নাচ গান করেন। এটি মূলত ভাই বোনের বন্ধন এবং প্রকৃতির অকৃপণ দান উদযাপনের উৎসব।
ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ার (https://wii.gov.in/) প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাসদেওএর আদিবাসীদের বাৎসরিক আয়ের ৬০% থেকে ৭০% আসে বনজ সম্পদ থেকে। তাঁরা শালপাতা, মহুয়াফুল, তেন্দুপাতা, ভেষজ ওষুধ এবং মধু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ঐতিহ্যগতভাবে আদিবাসী সমাজে ভূমির ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার চেয়ে 'গ্রামসভা' বা সম্প্রদায়ের যৌথ অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। মধ্য ভারতে গোণ্ড আদিবাসীদের একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। চতুর্দশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি স্বাধীন গোণ্ড রাজ্য (Gondwana Kingdoms) ছিল, যার মধ্যে রাণী দুর্গাবতীর বীরত্বের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবময়। ব্রিটিশ আমল থেকেই এই অঞ্চলের আদিবাসীরা তাদের জল, জঙ্গল আর জমির অধিকার রক্ষায় একাধিক বিদ্রোহ করেছেন। বর্তমানের 'হাসদেও বাঁচাও আন্দোলন' আসলে তাঁদের সেই ঐতিহাসিক আত্মরক্ষা ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়েরই একটি আধুনিক রূপ। আদিবাসীদের মতে, বন ধ্বংস হওয়া মানে শুধু গাছ কাটা নয়, বরং তাঁদের দেবতা, তাঁদের সংস্কৃতি এবং তাঁদের পুরো ইতিহাসটাই চিরতরে মুছে যাওয়া। এই গভীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক টানের কারণেই তাঁরা হাসদেওএর জঙ্গল বাঁচাতে নিজেদের জীবন বাজি রেখে লড়াই করছেন। সম্প্রতি সেই লড়াইয়ের তীব্রতা বেড়েছে। [৬,৭]
বর্তমান পরিস্থিতি ও নতুন বিতর্ক (২০২৬)
এবারে দেখা যাক বর্তমানে বিরোধীতা তীব্র আকার ধারণ করার কারণ কী। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক (MoEFCC) এই বনাঞ্চলের 'কেন্তে এক্সটেনশন' (Kente Extension) কয়লা ব্লকে নতুন খনির অনুমোদন দেয় এবং খননকাজের জন্য চূড়ান্ত পরিবেশগত ছাড়পত্র দিয়ে দেয়। এই ব্লকটি রাজস্থান সরকারকে বরাদ্দ করা হয়েছে এবং আদানি গ্রুপ এর খনি অপারেটর হিসেবে কাজ করছে। এই অনুমতির জন্য বন অধিকার আইন (FRA 2006) এবং পেসা আইন (PESA 1996) অনুযায়ী তফশিলি এলাকায় জমি হস্তান্তরের আগে গ্রামসভাগুলোকে অবহিত করা ও তাদের সম্মতি নথিভুক্ত করা বাধ্যতামূলক। বন সংরক্ষণ বিধি অনুযায়ী জেলা কালেক্টরকে প্রকল্প এলাকার বাসিন্দাদের বন অধিকার স্বীকৃতির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয় এবং সংশ্লিষ্ট বনভূমির উপরে এক্তিয়ার থাকা প্রতিটি গ্রামসভার সম্মতি নিতে হয়। জুলাই ২০২৫এ ছত্তিশগড় বনবিভাগ ১৭৪২.৬ হেক্টর ঘন বনভূমি আদানি গ্রুপ পরিচালিত RRVUNL সংস্থাকে হস্তান্তরের সুপারিশ করে। আদিবাসী ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, স্থানীয় গ্রামসভাগুলোর নামে ভুয়া বা জাল সম্মতিপত্র তৈরি করে এই ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। রাজ্য বিধানসভা ও জাতীয় স্তরে বিরোধী দলগুলো এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করছে। আপত্তি ও বিরোধীতার মূল কারণগুলো নীচে বলা হল।
১) স্থানীয় আদিবাসী গ্রামসভার নামে ভুয়ো সম্মতিপত্র দেক্ষিয়ে অনুমোদন দেওয়াঃ- প্রস্তাবের সমর্থনে দেখানো একাধিক গ্রামের গ্রামসভার প্রস্তাব জাল বলে অভিযুক্ত, যা পার্সা কয়লা ব্লকের ক্ষেত্রে ছত্তিশগর রাজ্য তফিশিলি জনজাতি কমিশান (CSSTC) আগেই ভুয়ো বলে সনাক্ত করেছিল। সেখানে গ্রামসভার বৈঠক শেষ হবার পরেই খনির প্রস্তাব যোগ করা হয়েছে বলে প্রমাণ মিলেছে। ১৫০০রও বেশী লিখিত আপত্তি স্থানীয় আদিবাসীরা জমা দিলেও রাজ্য প্রশাসন তা যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি বলেই অভিযোগ। [৮]
২) বিপুল পরিমাণে ঘন বনভূমি ও বৃক্ষ ধ্বংসঃ- এই নতুন অনুমোদনের ফলে ১,৭৪২ হেক্টরের বেশি ঘন বন ধ্বংস হবে এবং প্রায় ৪ লক্ষ ৪৮ হাজার গাছ কেটে ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে। [৯]
৩) হাতি ও মানুষের সংঘাত বৃদ্ধি:- হাসদেও অরণ্য ভারতের একটা প্রধান হাতি যাতায়াতের পথ (Elephant Corridor)। খনি সম্প্রসারণের কারণে বনের ধারাবাহিকতা ভেঙে যাচ্ছে (Forest Fragmentation), যার ফলে বন্য হাতিরা লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে এবং হাতি ও মানুষের সংঘাত মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এর ফলে মারা পড়ছে বনের সীমান্তবর্তী গ্রামের দরিদ্র মানুষ ও অবোলা হাতি। [১০]
৪) জল সংকট:- হাসদেও নদী এবং এর আশেপাশের ঝরনাগুলো হাসদেও বনের ওপর নির্ভরশীল। খনি খননের কারণে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর ক্রমশ নীচে নেমে যাচ্ছে এবং স্থানীয় জলের উৎসগুলো কাদামাটি ও রাসায়নিক মিশ্রিত হয়ে জল দূষিত হচ্ছে। ফলে পানীয় ও নিত্য প্রয়োজনে ব্যবহার্য জলের সঙ্কট দেখা দিচ্ছে। নতুন খনির ফলে এই সঙ্কট আরো বড় আকার ধারণ করবে। [১১]
৫) জীবিকা চ্যুতি:- এখানকার প্রায় ৯০% আদিবাসী (প্রধানত গোণ্ড ও ওরাওঁ উপজাতি) বনজ সম্পদ ও কৃষির ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বন ধ্বংসের ফলে তাদের ঐতিহ্যগত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ছে। এই অঞ্চলের জনসংখ্যার ৪১ শতাংশ, যার অধিকাংশই আদিবাসী, দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন, ফলে জীবিকার একমাত্র উৎস বন হারিয়ে গেলে তাঁদের বিকল্প আয়ের উৎস প্রায় থাকে না। [১২]
৬) বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কৌম জীবন ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি ধ্বংসঃ- হাসদেও অঞ্চলে গোন্ড, ওরাওঁ প্রভৃতি আদিবাসী সম্প্রদায় শুধু জীবিকার জন্যই নয়, আধ্যাত্মিক পরিচয়ের জন্যও বনের ওপর নির্ভরশীল। খনি সম্প্রসারণের ফলে বন ও পবিত্র স্থানগুলি ধ্বংস হয়ে চলেছে বলে গ্রামবাসীরা অভিযোগ করেছেন। কেতে গ্রামের একজন বাসিন্দা তাঁর গানে লিখেছেন, গ্রাম উচ্ছেদ হওয়ার পর তাঁদের "আধ্যাত্মিক জীবনও" বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সালহি, হরিহরপুর, ঘাটবাররা ও ফতেহপুর গ্রামের বাসিন্দারা পূর্বপুরুষের আত্মা "বুড়াদেব"-এর পবিত্র বৃক্ষ কাটার প্রতিবাদে ২০২৪ সালের অক্টোবরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিলেন, কারণ এই বন তাঁদের কাছে উপাসনার স্থান। এছাড়া ১০-১২ বছর ধরে আন্দোলন চলা সত্ত্বেও প্রকল্প এগিয়ে চলায় গ্রামগুলিতে বিভাজন তৈরি হয়েছে। জাল সম্মতিপত্র, চাপ ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগে সম্প্রদায়ের ভেতরে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে, যা তাঁদের পরম্পরাগত সকলে মিলে একসাথে সিদ্ধান্ত নেবার ব্যবস্থাকেও দুর্বল করছে। [১৩]
৭) উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের ব্যর্থতাঃ- আদানি এন্টারপ্রাইজেসের পারসা ইস্ট কেতে বাসান (PEKB) খনির সম্প্রসারণে উচ্ছেদ হওয়া মানুষদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, কেতে গ্রামের বাসিন্দাদের বাসান গ্রামে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। এখানে পুনর্বাসনের জন্য নির্মিত বাড়িগুলো ছোট, আধুনিক সিমেন্টের কাঠামো, ঠাসাঠাসি করে তৈরি। সেখানে ওঁদের ঐতিহ্যবাহী মাটি ও বাঁশের ঘরের মতো বাড়ির চারপাশে রান্নাঘরের জন্য বাগানের পর্যাপ্ত জায়গা নেই। পুনর্বাসন প্যাকেজের অংশ হিসেবে তৈরি এই নতুন কলোনির বাড়িগুলো ছিল যৌথ শৌচাগারযুক্ত জল ও বিদ্যুতবিহীন সংকীর্ণ দুই কামরার বাড়ি। ফলত ন্যুনতম প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধার অভাবে অনেকেই সেখানে থাকতে অস্বীকার করেছেন। চাষের জমি ও রান্নাঘরের বাগান ছাড়া এই বাড়িগুলোর বেশিরভাগই এখন পরিত্যক্ত, আগাছায় ভরা। বনজ সম্পদ ও কৃষির ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলো জীবিকার বিকল্প উপায় হারিয়েছেন। যাঁরা ঘর, জমি বা বন হারান, তাঁরা সামান্য ক্ষতিপূরণ পান; ওদিকে তাঁদের স্বনির্ভর, ভূমিনির্ভর জীবিকা ধ্বংস হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা সেই খনিতেই শোষিত শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন যা তাঁদের জমি ও মূল জীবিকা ধ্বংস করেছে।[১৪]
৮) আইনভঙ্গ ও অধিকারভঙ্গের অভিযোগঃ- গ্রামবাসীরা দাবি করেছেন গাছ কাটা তাঁদের বন অধিকার আইনের অধীনে প্রাপ্ত কমিউনিটি ফরেস্ট রিসোর্স (CFR) অধিকার লঙ্ঘন করেছে, আর ছত্তিশগড় সরকার এর আগে সেই অধিকার বাতিল করারও চেষ্টা করেছিল, যদিও বর্তমান আইনে তা তারা করতে পারে না। [১৫]
হাসদেও আরন্দ বাঁচাও আন্দোলন
২০১১ সালে প্রথম সংগঠিত আন্দোলন প্রচেষ্টা শুরু হয়। অ্যাক্টিভিস্ট আলোক শুক্লা সেই বছর হীরা সিং মারকাম (গোন্ডোয়ানা গণতন্ত্র পার্টির আদিবাসী নেতা)এর সঙ্গে হাসদেও অঞ্চলে যান। ২৩টি কয়লা ব্লক এবং তাদের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে জানার পর ২০১২ সালে "হাসদেও আরণ্দ বাঁচাও সংঘর্ষ সমিতি" (HABSS) গঠিত হয়। এক দশকের বেশী সময় ধরে চলা এই আন্দোলনকে ভারতের দীর্ঘতম কয়লাখনি বিরোধী আদিবাসী আন্দোলন বলা হয়। [১৬]
আন্দোলনের নেতৃত্বে আছেন [১৭]
আলোক শুক্লাঃ- ছত্তিসগড় বাঁচাও আন্দোলন নামক সংগঠনের কনভেনর, যারা হাসদেওর সম্প্রদায়গুলিকে সহায়তা দেয়।
রামলাল কারিয়াম হরিহরপুর গ্রামঃ- — হাসদেও আরণ্দ বাঁচাও আন্দোলনের একজন প্রধান কর্মী। ইনি বারবার পুলিশি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন।
জয়নন্দন পোর্তে, ঠাকুর রামসহ HABSSএর অন্যান্য সদস্যরা।
স্থানীয় গ্রামের প্রধান/সরপঞ্চ ও গ্রামবাসী নারীরাও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন।
প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের উপায় হিসাবে তাঁরা বেছে নেন
অনির্দিষ্টকালীন ধর্নাঃ- হরিহরপুরে ২রা মার্চ ২০২২ এ শুরু হওয়া এক ধর্না, ফেব্রুয়ারী ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় ৭০০ দিন ধরে চলার পরে প্রখ্যাত আদিবাসী কবি ও অ্যাক্টিভিস্ট জেসিন্তা কেরকেট্টা ধরনাস্থলে আসেন তাঁর সমর্থন জানাতে। ততদিনে ৭৫০ দিন অতিক্রম করা এই ধরনা ভাঙতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ধরনামঞ্চে অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটে।
চিপকো আন্দোলন অনুসরণে গাছ জড়িয়ে ধরে বৃক্ষছেদনে বাধা দেওয়াঃ- প্রকল্প রূপায়ণকারীদের তরফে গাছ কাটতে এলে নারী পুরুষ শিশু সকলে গাছ জড়িয়ে ধরে প্রতিরোধ করেছেন।
আইনি লড়াইঃ- হাইকোর্ট, ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল ও সুপ্রিম কোর্টে মামলা
গ্রাম সভার প্রস্তাব ও রাজনৈতিক চাপঃ- একাধিক গ্রাম সভা কর্তৃক প্রকল্প বাতিলের প্রস্তাব জানায়। এছাড়া ২০২৩ এর আগে ছত্তিশগড় বিধানসভাইয় পূর্ববর্তী সরকার সর্বসম্মতিক্রমে #SaveHasdeo প্রস্তাব পাশ করে সব খনি বাতিলের দাবির সাথে সংহতি জানায়।
শিক্ষামূলক প্রচারঃ- গ্রামে গ্রামে গিয়ে সভা, প্রজেক্টরের সাহায্যে তথ্যচিত্র প্রদর্শন, পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপনা ও ফ্ল্যাশকার্ড বিতরণ।
সামাজিক মাধ্যম ও নাগরিক সংহতিঃ- শহুরে যুবক যুবতী, শিল্পী, ইউটিউবারদের সমর্থন, #SaveHasdeo হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে আন্দোলনের মূল বক্তব্যগুলোর বহুল প্রচার। ফ্ল্যাশ মব, গান ও শিল্পকর্মের মাধ্যমে আন্দোলনকে তুলে ধরা।
দীর্ঘ পদযাত্রা বা লং মার্চঃ- শহরাঞ্চলে সংহতি বাড়ানোর জন্য ১০ দিন ব্যাপী পদযাত্রার আয়োজন করেন প্রতিবাদী আন্দোলনকারীরা। ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে চালু ও প্রস্তাবিত সবকটা মুক্ত কয়লাখনি সম্পূর্ন বন্ধের দাবীতে হাসদেও আরন্দ অরণ্য থেকে ছত্তিশগরের রাজধানী রায়পুর পর্যন্ত হেঁটে যান প্রায় ৩০০ জন গ্রামবাসী, বনবাসী ও পরিবেশরক্ষাকর্মী। [১৮]
৭ জুলাই ২০২৫ ছত্তিশগড় বন বিভাগ কেন্তে এক্সটেনশন কয়লা ব্লকের জন্য ১,৭৪২.৬ হেক্টর ঘন বনভূমি আদানি এন্টারপ্রাইজেস পরিচালিত RRVUNLকে বরাদ্দ করে হস্তান্তরের সুপারিশ করার পরেই তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ছত্তিশগড় বাঁচাও আন্দোলন এই সুপারিশকে আদিবাসী জনজাতিদের আইনি সুরক্ষাকে এড়িয়ে PESA ও FRA লঙ্ঘন করে কর্পোরেটের স্বার্থ দেখা হচ্ছে বলে তীব্র নিন্দা জানায়। তারা আরও বলে এটি গ্রাম সভার অসম্মতি উপেক্ষা করে বহু প্রজন্ম ধরে বন রক্ষাকারী সম্প্রদায়কে চুপ করিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেল বিজেপি সরকারকে আক্রমণ করে বলেন সরকারের "এক পেড় মা কে নাম" প্রচারণা আসলে এক বিরাট প্রহসন। একদিকে সরকার কর্পোরেট স্বার্থে ৬ লক্ষ গাছ কাটার পরিকল্পনা করছে আর অন্যদিকে গাছ লাগানোর কথা প্রচার করছে। সিপিআই(এম) নেত্রী বৃন্দা কারাত কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবকে চিঠি লিখে প্রকল্প বন্ধের দাবি জানান। রাজ্য তফসিলি জাতি/জনজাতি কমিশনের (CGSTC) তদন্ত পার্শ্ববর্তী পার্সা কয়লা ব্লকের ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়ায় জাল গ্রাম সভা সম্মতি ও আদিবাসী নেতাদের উপর জবরদস্তি ও নানা অনিয়মের ঘটনা উদঘাটন করে। [১৯]
ঘাটবাররা গ্রামের ফরেস্ট রাইট কমিটি এবং হাসদেও আরণ্য বাঁচাও সংঘর্ষ সমিতি (HABSS), এই গ্রামের কমিউনিটি ফরেস্ট রাইটস (CFR) খেতাব বাতিলের বিরুদ্ধে ছত্তিশগড় হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করে। বিচারপতি রাকেশ মোহন পান্ডের একক বেঞ্চ ৮ই অক্টোবর ২০২৫এ অতি দ্রুত এই পিটিশান খারিজ করে দেয়। আদালতের যুক্তি ছিল ২০১৩ সালে ঘাটবাররা গ্রামের গ্রামবাসীদের তিনটে কমিউনিটি ফরেস্ট রাইটস দেবার আদেশটাই আদতে ভুল ছিল কারণ ইতোমধ্যে ২০১২ সালেই খননের জন্য জমি হস্তান্তর হয়ে গিয়েছিল। HABSS এই রায়কে লোকাস স্ট্যান্ডাই (মামলা করার অধিকার) নিয়ে প্রশ্ন তুলে ন্যায্যতা এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল বলে সমালোচনা করে। রায়ে আরো বলা হয়েছিল পিউটিশনাররা যে ঘাটবাররা গ্রামের বাসিন্দা তা প্রমাণ করার মত উপযূক্ত নথি তাঁরা দাখিল করেন নি। অথচ ২০০রও বেশী বাসিন্দার সই করা একটা রেজোলিউশান এবং ব্যক্তিগত হলফনামা যথাযথ সময়ে দাখিল করা হয়েছিল। দেশে প্রথমবারের মত কমিউনিটি ফরেস্ট রাইট বাতিল হওয়ার এই ঘটনাকে HABSS অত্যন্ত খারাপ নজির বলে উল্লেখ করে যা বন অধিকার আইনের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট আবেদন পেশ করে HABSS এবং সেটিও খারিজ হয়ে যায়। এখানে উল্লেখ করে রাখা যাক এই মামলার পাশাপাশি বন ছাড়পত্রের বৈধতা নিয়ে সুপ্রীম কোর্টে একটি পৃথক মামলাও বিচারাধীন রয়েছে। সেটার রায় এখনো বেরোয় নি।
২০২৫ - ২৬ সালে আন্দোলন মূলত তিনটি সমান্তরাল পথে চলেছে: (ক) নতুন প্রকল্প ঘোষণার সাথে সাথে গণপ্রতিবাদ ও বিবৃতি (খ) হাইকোর্ট/NGT/সুপ্রিম কোর্টে ধারাবাহিক মামলা, এবং (গ) কংগ্রেস ও সিপিআই(এম)এর মতো রাজনৈতিক দলগুলোর সংসদীয় ও প্রচারণামূলক সমর্থন। মাঠপর্যায়ে সরাসরি সংঘাত (গাছ কাটা ঠেকানো, ধর্না) এখনও চলছে, তবে গ্রামসভার সম্মতি জালিয়াতির অভিযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত (যেমন CGSTC) নতুন মাত্রা যোগ করেছে।[২০]
আন্দোলন দমনে প্রশাসনিক তৎপরতা ও নিপীড়ন
এত বছর ধরে আন্দোলন চলছে তা সত্ত্বেও সরকার যখন আরো বেশী পরিমাণে ঘন বন এলাকা আদানিগোষ্ঠীর হাতে তুলে দেবার ব্যবস্থা করেছেন, তখন আন্দোলনের তীব্রতা বাড়লে তাঁরা যে হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না, তা তো বোঝাই যায়। তা তাঁরা বসে থাকেনও নি। সরাসরি শারীরিক দমন পীড়ন, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার অপব্যবহার (এই পদ্ধতিটি বিজেপী তথা বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের সিগনেচার মুভ বলা যায়), নথি জালিয়াতি ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ, আইনি ও আমলাতান্ত্রিক পথে বাধা ইত্যাদি যতরকম ভাবে পারা যায় সবরকম পীড়নের কাজই প্রশাসন করে চলেছে।
সরাসরি শারীরিক দমন পীড়ন ১৭ অক্টোবর ২০২৪এ সালহি, হরিহরপুর, ঘাটবাররা ও ফতেহপুর গ্রামের প্রতিবাদকারীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করে, ক্ষেত ও জঙ্গলের মধ্য দিয়ে তাড়া করে যায়। রামলাল কারিয়ামসহ একাধিক কর্মী আহত হন। ডিসেম্বর ২০২৩এ আন্দোলনের একাধিক নেতাকে (রামলাল কারিয়াম, জয়নন্দন পোর্তে, ঠাকুর রাম) গ্রেপ্তার করা হয়। সেপ্টেম্বর ২০২৫এ হরিহরপুরের ৭৫০ দিনের প্রতিবাদ ও ধরনা মঞ্চে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা অগ্নিসংযোগ করে, বেশ কিছু মানুষ আহত হন।
কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার অপব্যবহার ওয়াশিং পোস্টের তদন্ত রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে আয়কর দপ্তর, ED ও CBIকে পরিবেশ কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। এরকম একজন কর্মীকে বিদেশি গবেষকদের সঙ্গে তথ্য ভাগাভাগির জন্য "গোয়েন্দাগিরি" ও "আদানির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের" অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। অক্সফ্যাম ইন্ডিয়াকে "বিদেশি নীতির হাতিয়ার" বলে চিহ্নিত করা হয়, যার প্রভাবে তাদের নিযুক্ত ও অর্থায়িত আইনজীবীরা মামলা থেকে সরে দাঁড়ান।
নথি জালিয়াতি ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ স্থানীয় প্রশাসন দ্বারা সরপঞ্চদের জোর করে সম্মতিপত্রে সই করানো, এমনকি মৃত ব্যক্তিদের নামেও জাল স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছে। গ্রামসভার সম্মতি যে জাল করা হয়েছে তা CGSTC তদন্তে প্রমাণিত। এই নিয়ে আগেই লিখেছি। ঘাটবাররা গ্রামের কমিউনিটি ফরেস্ট রাইটস খেতাব বাতিল, এবং হাইকোর্টে (একক ও ডিভিশন বেঞ্চ উভয় স্তরে) সেই বাতিলের বিরুদ্ধে করা HABSSএর আবেদন খারিজ হয়ে গেছে।
আইনি/আমলাতান্ত্রিক পথে বাধা হাইকোর্ট "লোকাস স্ট্যান্ডাই" নিয়ে প্রশ্ন তুলে মূল বিষয়ের (বন ছাড়পত্রের বৈধতা) বিচার এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। "বৈজ্ঞানিক বন ব্যবস্থাপনা"র অজুহাতে PESA ও FRA FRA আইন এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চলছে সমানে।
সব মিলিয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি সরকারের তরফে একটা বহুস্তরীয় দমন কৌশল কাজ করছে। সরাসরি পুলিশি বলপ্রয়োগ, রাষ্ট্রীয় তদন্ত সংস্থা দ্বারা হয়রানি, নথি জালিয়াতি এবং আইনি প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তিগত বাধা এই সবকিছু একসাথে ব্যবহার করে আন্দোলন সম্পূর্নভাবে দমন করার চেষ্টা হয়েছে।[২১]
বিকল্প পথের সন্ধান
খোলামুখ কয়লাখনির এলাকা বৃদ্ধির কারণ হিসাবে সরকারি তরফে মুখ্য কারণ হিসাবে উঠে আসছে রাজস্থানের বিদ্যুৎ চাহিদা। রাজস্থান তার ৪৩৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার জন্য ছত্তিশগড়ের কয়লা সরবরাহের উপরে নির্ভরশীল। এই কারণে রাজস্থান ইতোমধ্যেই ছত্তিশগড়ে তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পে ৪০,০০০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। বিনিয়োগের উপরে রিটার্ন (ROI) ফেরত পেতে ও প্রতিশ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সরকার এই সম্প্রসারণের জন্য মরীয়া। এর জন্য তারা ছত্তিশগড় রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের উপরে সমানে চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। এছাড়া ছত্তিশগড়ে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ কয়লা মজুত আছে, যা এই রাজ্যের রাজস্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাই রাজ্য সরকারও এই রাজস্বের যোগান কমাতে আগ্রহী নয়। অন্যান্য রাজ্যের ক্ষেত্রেও দেখা যায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পূর্বশর্তই হল কয়লার যোগান নিশ্চিত করা। এই মর্মে রাজ্য সরকারগুলি কেন্দ্রীয় সরকারকে নিরন্তর চাপ দেয়।
এবারে দেখা যাক অরণ্য ধ্বংস না করে, খোলামুখ কয়লাখনি না বানিয়ে অন্য কোন উপায়ে কয়লার যোগান দেওয়া বা বিদ্যুৎ উৎপাদন অক্ষুন্ন রাখা যায় কিনা। হ্যাঁ ভারতের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর জন্য পরিবেশবিদ, রাজনীতিবিদ এবং সরকারি গবেষণা সংস্থাগুলো হাসদেও অরণ্য সম্পূর্ণ ধ্বংস না করে বেশ কিছু বিকল্প উপায় ও নীতিগত প্রস্তাব দিয়েছেন। খনি পুরোপুরি বাতিল করার দাবির বিপরীতে যে বিকল্পগুলো উঠে এসেছে, সেগুলো নতুন খনি না খুলে মূলত বিদ্যমান কয়লাসম্পদ ব্যবহার এবং বাস্তুতন্ত্র রক্ষার উপর জোর দিচ্ছে। সাংবাদিক আলোক শুক্লা (ছত্তিশগড় বাঁচাও আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা, ২০২৪ সালে গোল্ডম্যান এনভায়রনমেন্টাল প্রাইজ প্রাপ্ত), পরিবেশবিদ আইনজীবি সুদীপ শ্রীবাস্তব, গোন্ডয়ানা গণতান্ত্রিক পার্টির প্রয়াত আদিবাসী নেতা হীরা সিং মারকাম এই প্রস্তাবগুলি রেখেছেন। এছাড়া ছত্তিশগড়ের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং বর্তমান বিরোধীদলের নেতারাও কিছু সুনির্দিষ্ট বিকল্পের সন্ধান দিয়েছেন। বিকল্পগুলো সংক্ষেপে একটু নেড়েচেড়ে দেখা যাক।
১) বিদ্যমান কয়লা ব্লকের দক্ষ ব্যবহারঃ- নতুন অক্ষত জঙ্গল কয়লাখনির জন্য খুলে না দিয়ে ইতোমধ্যে চালু কয়লা ব্লকগুলোর উন্নত ব্যবহার, দক্ষ ব্লেন্ডিং কৌশল অবলম্বন করে অব্যবহৃত বনভূমির উপর চাপ কমানো।
২) নবায়নযোগ্য শক্তিতে ধাপে ধাপে রূপান্তরঃ- বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা কয়লা থেকে ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎসে স্থানান্তর। COP26এ ভারতের নিজস্ব প্রতিশ্রুতির (কয়লা নির্ভরতা ৫০% কমানো) কথা উল্লেখ করে মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে নতুন খনি খোলা সেই প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী। রাজস্থান সরকারের বিদ্যুৎ চাহিদার সিংহভাগই এখন সৌরশক্তি (Solar Energy) দিয়ে মেটানো সম্ভব, কারণ রাজস্থান ভারতের সবচেয়ে বড় সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী রাজ্যগুলোর একটি। বিকল্প উপায় হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে যে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত গ্রিন এনার্জি গ্রিডে বিনিয়োগ বাড়ানো হোক, যাতে হাসদেও-এর মতো প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংস করার প্রয়োজনই না পড়ে।
৩) লেমরু রিজার্ভ ফরেস্ট সুরক্ষাঃ- প্রায় ১,৯৯৫ বর্গ কিমি লেমরু রিজার্ভ এলাকা সংরক্ষণের দাবি, যাতে হাতির যাতায়াত পথ সুরক্ষিত থাকে ও বনভূমি আর খণ্ডিত না হয়। মানুষ ও হাতির সংঘাত ঠেকাতে হাসদেও আরণ্দ জঙ্গলে লেমরু হাতি সংরক্ষণাগার ঘোষণার সিদ্ধান্ত বহু বছর ধরে ঝুলে আছে। এটি মূলত রাজ্য সরকারের নিজস্ব ঘোষিত (কিন্তু বাস্তবায়িত না হওয়া) পরিকল্পনা, যা কর্মীরা বাস্তবায়নের দাবি জানান।
৪) স্বাধীন পরিবেশগত পর্যবেক্ষণঃ- সম্প্রসারণ অনুমোদনের আগে ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া ও স্বাধীন বৈজ্ঞানিক সংস্থার দ্বারা নিয়মিত জীববৈচিত্র্য নিরীক্ষা ও সামগ্রিক প্রভাব মূল্যায়নের দাবী। ICFRE (Indian Council of Forestry Research and Education) ও WII (Wildlife Institute of India)র যৌথ বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে NGTর নির্দেশে যৌথভাবে পরিচালিত এই সরকারি গবেষণা সংস্থাগুলো একটি নির্দিষ্ট বিকল্প কাঠামো দিয়েছে। সেই কাঠামো অনুযায়ী ২৩টি কয়লা ব্লকের মধ্যে ১৪টিতে খনির ছাড়পত্র না দেওয়ার সুপারিশ, যাতে ঘন বনভূমি ও হাতির বড় পালের বাসস্থান রক্ষা পায়। প্রতিবেদনে হাসদেও আরন্দ কয়লা ক্ষেত্র ও তার আশপাশের এলাকাকে সম্পূর্ণভাবে "নো গো" (খনন নিষিদ্ধ) এলাকা ঘোষণার সুপারিশ করা হয়। তবে যদি সরকার তবুও এগোতে চায়, তাহলে শুধুমাত্র 'PEKB, কান্তা এক্সটেনশন, তারা ও পার্সা' ব্লকে "কঠোর পরিবেশগত সুরক্ষা ব্যবস্থার" অধীনে সীমাবদ্ধ রাখার শর্তসাপেক্ষ বিকল্প দেওয়া হয়।
৫) সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনাঃ- হাসদেও নদীর অববাহিকা অঞ্চলে বনভূমি রক্ষা করে লক্ষ লক্ষ হেক্টর সেচ এবং মহানদী অববাহিকায় জলপ্রবাহ বজায় রাখা।
৬) প্রাতিষ্ঠানিক/আইনি বিকল্প কাঠামোর দাবিঃ- সব কয়লা ব্লক বাতিল করে PESA আইন অনুসারে গ্রাম সভার সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত মান্যতা দেওয়া। ঘাটবাররার মতো গ্রামের কমিউনিটি ফরেস্ট রাইটস (CFR) পুনর্বহাল ও সব গ্রামে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক বন অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া।
সংক্ষেপে বললে, প্রতিরোধকারীদের বিকল্প রূপরেখাটি "নতুন খনি নয়, বরং বিদ্যমান সম্পদের দক্ষ ব্যবহার + নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর + স্থানীয় জনগণের হাতে বন ব্যবস্থাপনার অধিকার" এই তিনটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে, কোনো একক মাস্টার প্ল্যান আকারে নয়।
বিকল্প উপায়গুলোর পক্ষে সরকারি গ্রহণযোগ্যতা ও আইনি অবস্থান
হাসদেও উপত্যকায় খনি বাতিলের দাবীতে আন্দোলনকারীদের প্রস্তাবিত বিকল্প উপায়গুলোর আইনি পরিস্থিতি বেশ জটিল এবং আইনি মারপ্যাঁচে তা খনি মালিকদের পক্ষেই রায় দিচ্ছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এবং ছত্তিশগড় হাইকোর্টে এই সংক্রান্ত একাধিক মামলা চলমান। কয়লাখনি বাতিলের বিপরীতে দেওয়া নির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলোর বর্তমান আইনি স্ট্যাটাস নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো।
১) 'কমিউনিটি ফরেস্ট রাইটস' (CFR) বাতিল এবং আইনি ধাক্কা সম্পর্কে উপরে লিখেছি। বিকল্প ব্যবস্থার অন্যতম মূল ভিত্তি ছিল বনের ওপর আদিবাসীদের আইনি অধিকার (Forest Rights Act, 2006) প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু ছত্তিশগড় হাইকোর্টের একটি সিঙ্গল বেঞ্চ ঘাটবাররা গ্রামের আদিবাসীদের দেওয়া 'কমিউনিটি ফরেস্ট রাইটস' বা যৌথ বনের অধিকারের স্বীকৃতি বাতিল করে দেন। আদালত রায়ে জানাযন, এই অধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্তটিই একটি "ভুল" ছিল, যা পরবর্তীতে সরকার সংশোধন করেছে। আদালত আরও স্পষ্ট করে দেয় যে, খনির কারণে আদিবাসীদের বনের অধিকার নষ্ট হলে তাদের আইনিভাবে শুধুমাত্র আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া যেতে পারে, খনি বন্ধ করার জন্য বনের অধিকারকে হাতিয়ার করা যাবে না। এই রায়টি বিকল্প ব্যবস্থার আইনি লড়াইকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
২) গ্রাম সভার ভুয়া সম্মতি ও আইনি চ্যালেঞ্জঃ- আন্দোলনকারীরা আইনিভাবে দাবি করেছিলেন যে, 'পঞ্চায়েত সম্প্রসারণ আইন' (PESA) এবং বন অধিকার আইন অনুযায়ী খনি সম্প্রসারণের জন্য গ্রাম সভার লিখিত অনুমতি বাধ্যতামূলক। আন্দোলনকারী সংস্থা 'হাসদেও আরণ্য বাঁচাও সংঘর্ষ সমিতি' হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছে যে, খনির ছাড়পত্র পেতে স্থানীয় গ্রাম সভাগুলোর ভুয়া বা জাল সম্মতিপত্র তৈরি করা হয়েছে। এই মামলাটি বর্তমানে ছত্তিশগড় হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে (WA No. 313 of 2026) বিচারাধীন রয়েছে।
৩) "ধাপে ধাপে খনন" ও সরকারি ছাড়পত্রের আইনি স্ট্যাটাসঃ- সরকারি পরিবেশ সংস্থাগুলোর প্রস্তাবিত "ধাপে ধাপে খনন" বা পর্যায়ক্রমিক বনায়নের বিকল্প প্রস্তাবটি পরিবেশ মন্ত্রক আইনি ছাড়পত্রের শর্ত হিসেবে যুক্ত করেছে। ভারতের বন সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, পরিবেশ মন্ত্রক (MoEFCC) 'স্টেজ-১' (ইন-প্রিন্সিপাল ক্লিয়ারেন্স) এবং 'স্টেজ-২' (চূড়ান্ত ক্লিয়ারেন্স) নীতি অনুসরণ করছে। এর আইনি শর্ত হলো, 'কেন্তে এক্সটেনশন' ব্লকে খনন করতে হলে কোম্পানিকে অন্য কোথাও সমপরিমাণ জমিতে বাধ্যতামূলকভাবে ক্ষতিপূরণমূলক বনায়ন (Compensatory Afforestation) করতে হবে এবং ওয়াইল্ডলাইফ ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে। এখানে দুশ্চিন্তার বিষয় হল শতাব্দীপ্রাচীন বন ধ্বংস করে যে গাছ লাগানো হবে তাদের বেড়ে উঠে সমপরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করতে বহু বছর দেরী, ততদিনে বিশ্ব উষ্ণায়নের হার আরো দ্রুত হবে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় রোপিত বৃক্ষগুলোও (ইউক্যালিপটাস, কৃষ্ণচুড়া ইত্যাদি) ঠিক পরিবেশবান্ধব নয় বরং দেখনশোভা বেশী। এতে পরিবেশের আরো ক্ষতি ছাড়া লাভ বিশেষ হবে না।
৪) "নো গো জোন" ও বিকল্প ব্লকের আইনি জটিলতাঃ- ২০১০ সালে হাসদেও আরন্দকে সম্পূর্ণ "নো গো জোন" বা খনি নিষিদ্ধ এলাকা ঘোষণা করার প্রস্তাব দেওয়া হলেও আইনি দলিলে তার স্থায়ী কোনো রূপ দেওয়া হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে (যেমন চুক্তি ভঙ্গের ক্ষতিপূরণ মামলা) এটি স্পষ্ট যে, কোনো রাজ্য সরকারকে একবার কয়লা ব্লক আইনিভাবে বরাদ্দ করার পর তা বাতিল করলে সরকারকে 'চেঞ্জ ইন ল' (Change in Law) ধারার অধীনে বিপুল আর্থিক জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। এই আইনি ও আর্থিক বাধ্যবাধকতার কারণে কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রক রাজস্থান সরকারের জন্য বরাদ্দকৃত হাসদেওএর ব্লকটি সম্পূর্ণ বাতিল করে অন্য ব্লক দেওয়ার আইনি দাবি সহজে মেনে নিচ্ছে না। আদানিজাতীয় কর্পোরেটগোষ্ঠীগুলোও ঠিক এই কারণেই চেষ্টা করে যেন তেন প্রকারেণ একবার কয়লা ব্লক বরাদ্দের আদেশ বের করিয়ে নিতে।
উপসংহার
সংক্ষেপে, আইনি দিক থেকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার বিকল্প প্রস্তাবগুলোর চেয়ে কর্পোরেট খনি লিজের চুক্তিগত অধিকার এবং সরকারের উন্নয়ন নীতিই আইনি আদালতগুলোতে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। যেমন 'লেমরু হাতি রিজার্ভ'’এর কাগজ কলমে অস্তিত্ব থাকলেও, এর সীমানা এমনভাবে আইনি মারপ্যাঁচে ছোট করা হয়েছে যাতে আদানি গ্রুপের মতো বড় কর্পোরেট খনি অপারেটরদের বাণিজ্যিক স্বার্থে কোনো বড় আইনি বাধা তৈরি না হয়। বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং আইনি সমীকরণ বিবেচনা করলে, আন্দোলনকারীদের প্রস্তাবিত বিকল্প উপায়গুলো সরকারের পক্ষ থেকে মেনে নেওয়ার কোনো আশু বা নিকটবর্তী সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
এর পেছনে প্রধান ৫টি বাস্তবসম্মত কারণ দেখা যাচ্ছে।
১) সরকারের আইনি ও চুক্তিগত বাধ্যবাধকতাঃ ভারতের কয়লা মন্ত্রক ইতিমধ্যে রাজস্থান রাজ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন নিগম লিমিটেডকে (RRVUNL) এই কয়লা ব্লকগুলোর আইনি মালিকানা হস্তান্তর করেছে। আদানি গ্রুপ এখানে খনি অপারেটর (MDO) হিসেবে চুক্তিবদ্ধ। সরকার যদি এখন খনি বাতিল করে বিকল্প খোঁজার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা চুক্তি ভঙ্গ (Breach of Contract) হিসেবে গণ্য হবে। এর ফলে সরকারকে শত শত কোটি টাকার আইনি জরিমানা ও ক্ষতিপূরণের মুখে পড়তে হবে, যা কোনো সরকারই করতে রাজী নয়।
২) রাজস্থানের বিদ্যুৎ সংকটজনিত রাজনৈতিক চাপঃ রাজস্থান সরকারের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো তীব্র কয়লা সংকটের মুখোমুখি। রাজস্থান বিদ্যুৎ বোর্ডের যুক্তি হলো, হাসদেও আরন্দের উচ্চ মানের কয়লা যদি দ্রুত সরবরাহ না করা হয়, তবে রাজ্যে মারাত্মক লোডশেডিং দেখা দেবে। এই বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে বিকল্প খোঁজার চেয়ে খনি চালু করাকেই তারা একমাত্র আশু সমাধান মনে করছে।
৩) ২০২৩ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনঃ ছত্তিশগড়ের রাজ্য রাজনীতিতে হাসদেও একটি বড় ইস্যু ছিল। আগের কংগ্রেস সরকার পরিবেশ ও আদিবাসীদের পক্ষে কিছুটা সহানুভূতিশীল অবস্থান দেখিয়ে এই খনি প্রক্রিয়া কিছুটা ধীরগতির করে রেখেছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের শেষের দিকে রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর নীতিগতভাবে খনির কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ফলে, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও বিকল্প উপায় মেনে নেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা এখন আর অবশিষ্ট নেই।
৪) ২০২৬ সালের চূড়ান্ত পরিবেশগত ছাড়পত্রঃ সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি। ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রক (MoEFCC) সমস্ত বিকল্প প্রস্তাব বা "নো গো জোন" এর দাবি খারিজ করে 'কেন্তে এক্সটেনশন' ব্লকে খননকাজের জন্য চূড়ান্ত ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছে। এর সহজ অর্থ হলো, আমলাতান্ত্রিক বা প্রশাসনিক স্তরে বিকল্প ব্যবস্থার আলোচনা ইতিমধ্যে সমাপ্ত হয়ে গেছে এবং সরকার সরাসরি বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে।
৫) আদালতের কঠোর অবস্থানঃ আদালতগুলো পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করলেও, দেশের "বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থ" এবং "শক্তি নিরাপত্তা"* (Energy Security)কে আইনিভাবে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ছত্তিশগড় হাইকোর্ট আদিবাসীদের বনের যৌথ অধিকার (CFR) বাতিল করার পর, আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে খনি থামানোর সুযোগ আরও সংকুচিত হয়ে গেছে। * কোনো দেশের নিরবচ্ছিন্ন নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ গ্যাস ও জ্বালানি পাওয়ার দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থাকে শক্তি নিরাপত্তা বলা হয়।
তাহলে একমাত্র সম্ভাবনা হল বিকল্প উপায়গুলো তখনই বাস্তবায়িত হতে পারে, যদি আদিবাসীদের মাঠপর্যায়ের প্রতিরোধ আন্দোলন (Grassroots Protest) এতোটাই তীব্র রূপ নেয় যে সেখানে আইন শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটে এবং জাতীয় স্তরে ব্যাপক জনরোষ তৈরি হয়। তবে বর্তমান প্রশাসনিক কড়াকড়ি এবং পুলিশি পাহারার মধ্যে তেমন কোনো বড় গণআন্দোলন গড়ে ওঠার সুযোগও বেশ সীমিত। [২৩]
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
অসাধারণ তথ্যসমৃদ্ধ এবং বহুদিনের এক জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে খুবই প্রাসঙ্গিক একটি লেখা। একদিকে অসহায় আদিবাসীরা অন্যদিকে প্রশাসন, গুন্ডাবাহিনী, কর্পোরেট মাফিয়া এমনকি কোর্টের সম্মিলিত আগ্রাসন। প্রতিরোধ বলতে অসম লড়াই চালিয়ে যাওয়া কিছু আপসহীন মানুষ এবং কিছু বিচ্ছিন্ন সংগঠন। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক বেশি করে আন্দোলনে নামা উচিত, কারণ এই ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়।
স্বাতী রায় | ১৬ আগস্ট ২০২৬ ২৩:৩১742272
পড়ছি। সব কেটে কুটে পাহাড় উড়িয়ে দিয়ে শেষ করে দিতে পারলেই ব্যস, লাভ হি লাভ ! .
kk | ১৭ আগস্ট ২০২৬ ০০:০৮742273
এই সিরিজটা ভারী ভালো হচ্ছে। খুবই তথ্যসমৃদ্ধ। কত যে ভয়ানক ব্যাপার ঘটে চলেছে! খুব ভাবনার কথা।
হ্যাঁ অসম্ভব অসম একটা লড়াই। সমানে বুলডোজ করে যাচ্ছে প্রশাসন এবং আদালত। আশা খুব একটা দেখছি না। এই যে হস্তান্তর হবার পর ক্যান্সেল করলে ভীষণ বেশী হারে শিল্পপতিকে কম্পেনসেট করতে জবে এইটা খুবই মারাত্মক একটা বাধা। আর আইন তামাশামাত্র। বড়লোকেরা পয়সা খরচ করিয়া উহা দেখিয়া থাকে, বঙ্কিম সেই কবেই লিখে গেছেন।
স্বাতী,
একেবারে ঝড়ের গতিতে বেচাবিক্রি শুরু করেছে। মহারাষ্ট্র, কাজিরাংা, নিকোবর।
কেকে,
লিখে একটু চিন্তায় ছিলাম এত বড় লেখা, তায় আবেগ টাবেগ বিশেষ নেই ( মানে পরিবেশ নিয়ে লেখায় যে লোকে লচপচে আবেগ গুঁজে দেয় দেখি) কেউ পড়বে কিনা। সত্যিই চিন্তার বিষয়।
কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে এককালীন বা ধারাবাহিক ভাবে গুরুভার বহন করুন।
বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে,
মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা,
কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
আমাদের কথা
আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের
কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি
জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
বুলবুলভাজা
এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ।
দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও
লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
হরিদাস পালেরা
এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে
পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান
নিজের চোখে...... আরও ...
টইপত্তর
নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান।
এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর।
... আরও ...
ভাটিয়া৯
যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই,
সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক
আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
টইপত্তর, ভাটিয়া৯, হরিদাস পাল(ব্লগ) এবং খেরোর খাতার লেখার বক্তব্য লেখকের নিজস্ব, গুরুচণ্ডা৯র কোন দায়িত্ব নেই। | ♦ :
পঠিত সংখ্যাটি ১৩ই জানুয়ারি ২০২০ থেকে, লেখাটি যদি তার আগে লেখা হয়ে থাকে তাহলে এই সংখ্যাটি সঠিক পরিমাপ নয়। এই বিভ্রান্তির জন্য আমরা দুঃখিত।
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক।
অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি।
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি
বার পঠিত
সকলকে জানান
উপরে যে কোনো বোতাম টিপে পরিচিতদের সঙ্গে ভাগ করে নিন
গুরুচন্ডা৯ বার্তা
গুরুতে নতুন?
এত নামধাম দেখে গুলিয়ে যাচ্ছে? আসলে আপনি এতদিন ইংরিজিতে সামাজিক মাধ্যম দেখে এসেছেন। এবার টুক করে বাংলায়ও সড়গড় হয়ে নিন। কটা তো মাত্র নাম।
গুরুর বিভাগ সমূহ, যা মাথার উপরে অথবা বাঁদিকের ভোজনতালিকায় পাবেনঃ
হরিদাসের বুলবুলভাজা : গুরুর সম্পাদিত বিভাগ। টাটকা তাজা হাতেগরম প্রবন্ধ, লেখালিখি, সম্ভব ও অসম্ভব সকল বিষয় এবং বস্তু নিয়ে। এর ভিতরে আছে অনেক কিছু। তার মধ্যে কয়েকটি বিভাগ নিচে।
শনিবারের বারবেলা : চিত্ররূপ ও অক্ষরে বাঙ্ময় কিছু ধারাবাহিক, যাদের টানে আপনাকে চলে আসতে হবে গুরুর পাতায়, ঠিক শনিবারের বারবেলায়।
রবিবারের পড়াবই : পড়া বই নিয়ে কাটাছেঁড়া সমালোচনা, পাঠপ্রতিক্রিয়া, খবরাখবর, বই নিয়ে হইচই,বই আমরা পড়াবই।
বুধবারের সিরিয়াস৯ : নির্দিষ্ট বিষয় ধরে সাপ্তাহিক বিভাগ। ততটা সিরিয়াসও নয় বলে শেষে রয়ে গেছে ৯।
কূটকচা৯ : গুরু কিন্তু গম্ভীর নয়, তাই গুরুগম্ভীর বিষয়াশয় নিয়ে ইয়ার্কি ফুক্কুড়ি ভরা লেখাপত্তর নিয়েই যতরাজ্যের কূটকচা৯। কবে কখন বেরোয় তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই।
হরিদাস পাল : চলতি কথায় যাদের বলে ব্লগার, আমরা বলি হরিদাস পাল। অসম্পাদিত ব্লগের লেখালিখি।
খেরোর খাতা : গুরুর সমস্ত ব্যবহারকারী, হরিদাস পাল দের নিজের দেয়াল। আঁকিবুঁকি, লেখালিখির জায়গা।
টইপত্তর : বিষয়ভিত্তিক আলোচনা। বাংলায় যাকে বলে মেসেজবোর্ড।
ভাটিয়া৯ : নিখাদ ভাট। নিষ্পাপ ও নিখাদ গলা ছাড়ার জায়গা। কথার পিঠে কথা চালাচালির জায়গা। সুতো খুঁজে পাওয়ার দায়িত্ব, যিনি যাচ্ছেন তাঁর। কর্তৃপক্ষ দায়ী নন।
লগিন করে থাকলে ডানদিকের ভোজনতালিকায় যা পাবেনঃ
আমার গুরুঃ আপনার নিজস্ব গুরুর পাতা। কোথায় কী ঘটছে, কে কী লিখছে, তার মোটামুটি বিবরণ পেয়ে যাবেন এখানেই।
খাতা বা খেরোর খাতাঃ আপনার নিজস্ব খেরোর খাতা। আঁকিবুকি ও লেখালিখির জায়গা।
এটা-সেটাঃ এদিক সেদিক যা মন্তব্য করেছেন, সেসব গুরুতে হারিয়ে যায়না। সব পাবেন এই পাতায়।
গ্রাহকরাঃ আপনার গ্রাহক তালিকা। আপনি লিখলেই সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকরা পাবেন নোটিফিকেশন।
নোটিঃ আপনার নোটিফিকেশন পাবার জায়গা। আপনাকে কেউ উল্লেখ করুক, আপনি যাদের গ্রাহক, তাঁরা কিছু লিখুন, বা উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটুক, জলদি পেয়ে যাবেন নোটিফিকেশন।
বুকমার্কঃ আপনার জমিয়ে রাখা লেখা। যা আপনি ফিরে এসে বারবার পড়বেন।
প্রিয় লেখকঃ আপনি যাদের গ্রাহক হয়েছেন, তাদের তালিকা।