

ছবি: রমিত
আজকের (২৮শে মার্চ, ২০২৬) আনন্দবাজারের একটি সংবাদের শিরোনাম, “জঙ্গিপুরে রামনবমীর মিছিলে অশান্তি, RSS-হিন্দুত্ববাদী দলের নেতা সহ গ্রেফতার একাধিক”। খবরের ভেতরে ঢুকলে জানা যাবে, আর-এস-এস নেতা কিংশুক ভট্টাচার্য-ও গ্রেপ্তার হয়েছেন, উনি ওয়াকি-টকি নিয়ে যোগাযোগ রাখছেন অন্য সহকারী দাঙ্গাবাজদের সাথে, হয়তো বা উপরতলার সাথে। ওয়াকি-টকি নিয়ে কো-অর্ডিনেটেড জিনিষ স্বতঃস্ফূর্ত নয় সে তো বলার অপেক্ষা রাখে না, এবং বিজেপি ও দাঙ্গাবাজ এতোদিনে সমার্থক শব্দ।
তবুও, প্রশ্ন উঠতেই পারে, ঠিক এখনই কেন? উস্কানি/দাঙ্গা ঠিক এই ভোটের আগেই কেন? এই তো এস-আই-আর করে যেখানে যত মার্জিন, সেই বুঝে বুঝে সমস্তরকমের সংখ্যালঘু মানুষকে বাদ দেওয়ার, বেনাগরিক করার এক প্রস্থ নির্বাচনী প্রস্তুতি হলোই। আবার দাঙ্গাও দরকার?
এর উত্তর, হ্যাঁ, কারণ এই গত কয়েক দশকের বিজেপির অস্তিত্বের এবং উত্থানের প্রথম ও প্রধান স্তম্ভ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এই বিষবৃক্ষের ঐটিই একমাত্র সার।
আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে ২০১৪ সালের ভোটের আগে মুজাফফরনগরে দাঙ্গার কথা। যাতে ৬০-৭০ জন মানুষ খুন হন, আর ছ-হাজার মানুষ ঘরছাড়া । বা ২০২০ সালেই হয়ে যাওয়া দিল্লীর দাঙ্গা - যার ক্ষত এখনো দগদগে, যেখানে বিজেপি নেতারা “গোলি মারো শালো কো” স্লোগান দিয়ে মানুষকে উত্তেজিত করে দাঙ্গা লাগিয়ে দেয়। বিজেপি খুব ভালো করে জানে যে ভোটের আগে একবার দাঙ্গা লাগিয়ে দিতে পারলে, আর সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যার কথা – যেমন, এল-পি-জি ক্রাইসিস, পেট্রোল-ডিজেলের দাম, নোটবন্দীর বীভিষিকা, নাগরিকত্ব আইনের অত্যাচার, বা নেতাদের মিথ্যে প্রতিশ্রুতি এসব কিছুই আর ইস্যু হয় না। ভেবে দেখুন, ছকটা পরিষ্কার। দাঙ্গা আসলে স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা নয়। দাঙ্গা নিজে থেকে লেগে যায় না, একদম ঠান্ডা মাথায় দাঙ্গা লাগানো হয়, উদ্দেশ্য একটাইঃ ভোট-ব্যাঙ্কের দখল। না হলে যে গুজরাটে সাতচল্লিশের দেশভাগের সময়েও বড়োসড়ো কোনো দাঙ্গা হয়নি, সেই রাজ্য আজ দেশের মধ্যে সাম্প্রদায়িক মৃত্যুর হারে প্রথম হয় কী করে?
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলে যে সত্যিই বিজেপির সুবিধে হয়, এর অনেক তথ্যভিত্তিক প্রমাণও রয়েছে। ২০১৪ সালের একটি গবেষণাপত্রে, “দ্য পোলিটিক্যাল লজিক অফ এথনিক ভায়োলেন্স : দ্য অ্যান্টি-মুসলিম পোগ্রোম ইজ গুজরাট, ২০০২”, একটি মারাত্মক ছবি পাওয়া যাচ্ছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন গবেষক, রাহীল ধাত্তিওয়ালা আর মাইকেল ব্রিগস, ১৯৯৮ থেকে ২০০২ পর্যন্ত গুজরাটের নির্বাচনী তথ্য আর বিজেপির ভোটের সাথে মিলিয়ে দেখেন কোন জেলায় কতগুলো দাঙ্গা হয়েছে, এবং সেই জেলায় তারপর বিজেপির ভোট-শেয়ার কীভাবে বেড়েছে।

পুরো গবেষণাপত্রটিই পড়া উচিত, এবং আন্তর্জালে সহজলভ্য, তবে, ধাত্তিওয়ালা ও ব্রিগসের গবেষণাপত্র থেকে আমি বেছে-বেছে কয়েকটি তথ্য-উপাত্ত নিচে পেশ করছি। আর একটি লেখচিত্র নিচে।
১) প্রতি ১০০০-জন মুসলিম ধর্মের মানুষের হত্যার সাথে বিজেপির ভোটের সরাসরি যোগাযোগ অর্থাৎ আন্তঃসম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে। রাশিবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ভাষায় স্ট্রং-পজিটিভ কোরিলেশন বলা হয়। এই পেপারে দেখানো হয়েছে যে ঐ ২০০২ সালের গুজরাতে দাঙ্গায় হতাহতের হারের সঙ্গে বিজেপির ভোটের শেয়ার বাড়ার কোরিলেশন (r = 0.81)। যেখানে দাঙ্গায় সবথেকে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেখানে বিজেপির ভোটের ভাগ বেড়েছে ১২% অব্দি। ২০০২-এর গুজরাতের সাথে ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গের পার্থক্য আছে, এবং সেই ২০০২-এর বিজেপির সাথেও কি ২০২৬-এর বিজেপির পার্থক্য নেই? তাই, ঐ এক-ই আন্তঃসম্পর্ক অন্যত্র একদম-ই একরকম হবে না বললেও, এইটুকু বলাই যায় যে এই প্যাটার্ন ব্যাপকতর। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে একবার দাঙ্গা লাগিয়ে দিতে পারলে মানুষের কাছে জীবিকা নয়, উন্নয়ন নয়, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়াচ্ছে ধর্ম আর বিভাজনের অঙ্ক।

২) বিজেপি শাসিত রাজ্যে বহুদিন ধরেই দেখা যায় যে দাঙ্গায় সরাসরি বা পরোক্ষ মদত দিয়েছে যে সব পুলিশ অফিসার, তাদের কপালে জুটেছে পুরস্কার। এই দুই গবেষক স্টেট ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর এফিডেভিট খুঁড়ে বের করে এনেছেন চাঞ্চল্যকর দুটি সংখ্যা। যে অঞ্চলে একটিও খুন হয়নি – সেখানে পদ হারানোর সম্ভাবনা ৪৩% আর উঁচু পদে যাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ৪%। অন্যদিকে যে অঞ্চলে প্রাণ গেছে মানুষের? আমেদাবাদ, যে শহর দাঙ্গায় খুনোখুনির বিচারে একদম উপরেই থাকা একটি শহর, সেখানে এটা ঠিক উল্টো। উঁচু পদে যাওয়ার সম্ভাবনা ৮৫% আর পদ হারানোর সম্ভাবনা মাত্র ১%!
৩) আরও ভয়ানক ব্যাপার এই যে, এই গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি নয়, বরং যে সব জেলা বা নির্বাচনী কেন্দ্রে বিজেপির প্রতিদ্বন্দিতা সব থেকে কঠিন, দাঙ্গায় নিহতের সংখ্যা সেই সব জায়গাতেই সর্বাধিক।

অক্সফোর্ড-ই শুধু নয়, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন গবেষক (নেলিস, উইভার ও রোজ়েনজ়োয়াইগ) উনিশশো বাষট্টি থেকে দুহাজার দুই সাল অব্দি তথ্য ঘেঁটে দেখাচ্ছেন যে শুধু এই চল্লিশ বছরে একটি জেলায় বিকল্প কোনো শক্তি ক্ষমতায় এলে দাঙ্গার সম্ভাবনা কমে যায় ৩২%। সহজ কথায়, অ-বিজেপি দল ক্ষমতায় এলে দাঙ্গার সম্ভাবনা কমে তিনভাগের একভাগ হয়ে যায়। আর শুধু ১৯৬২-২০০২ এই চল্লিশ বছরে যদি সব নির্বাচনে বিকল্প দলগুলি হেরে যেতো বিজেপির কাছে? সিমুলেশন স্টাডি করে এই তিন গবেষকের অনুমান, তাহলে ভারতবর্ষে দাঙ্গা হতো অন্তত ১১% বেশি, প্রাণহানি হতো সহস্রাধিক মানুষের।

“ক্রোনোলজি” কথাটা বলতেও অস্বস্তি হয় আজকাল, তবুও আপনি বিজেপির “ক্রনোলজির” দিকে একবার তাকান। গণহত্যার ষড়যন্ত্রটি পরিষ্কার দেখতে পাবেন। যারা আইনের রক্ষক থেকে নির্বাচনী কমিশনকেও ব্যবহার করছে হাতের পুতুলের মতো, তাঁদের আটকাবে না বাংলায় আরেকটা গুজরাত, আরেকটা দিল্লী বানাতে, শুধু বেঘোরে প্রাণ যাবে বাংলার আনন্দ বর্মণ, ছামিউল হকদের (এদের নাম মনে আছে, আপনার?)। আগেই বলছিলাম যে - তথ্য অনুযায়ী অতীতে দেখা গেছে যে সব জেলা বা নির্বাচনী কেন্দ্রে বিজেপির প্রতিদ্বন্দ্বিতা সব থেকে কঠিন, দাঙ্গায় নিহতের সংখ্যা সেই সব জায়গাতেই সর্বাধিক। এই কথাটা প্রশাসনের বোঝার বা আন্দাজ করার ক্ষমতা আছে কি না সে আমি জানি না যদিও।
হ্যাঁ, এখনও পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় কম। তথ্যের দিকে তাকালে, ২০২৪ সালের সি-এস-এস-এস-এর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ৩টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রেকর্ড করা হয়েছে — মহারাষ্ট্র (১২), বিহার ও উত্তরপ্রদেশ (৭ করে)-র তুলনায় এই সংখ্যা অনেকটাই কম। অন্য রাজ্যের তুলনায় বাংলা এখনও অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ, সে কৃতিত্ব এই রাজ্যের লোকের-ই, আর কারুর নয়, এই ঐতিহ্য আমাদের রক্ষা করতে হবে।

তবে, এখানে বলে রাখা উচিত যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিরল হলেও, রাজনৈতিক হিংসা মোটেই বিরল নয়। শুধু গত এক বছরে ভারতে মোট ২,৯৪১টি রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা ঘটেছে, এবং পশ্চিমবঙ্গ (২৪৫টি ঘটনা) এই তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে, শুধু উত্তরপ্রদেশ ও জম্মু-কাশ্মীরের পরেই। এ-ও আমাদের অস্বস্তিকর ইতিহাস ও বর্তমান। এই দুঃসময়ে আশা করা প্রায় বোকামো, তবুও আমরা আশা করি, অদূর না হোক সুদূর ভবিষ্যতে বাংলা কেবল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতেই নয়, সামগ্রিক রাজনৈতিক শান্তিতেও দেশের পথ দেখাবে। যদিও, সেই দিন আমাদের জীবদ্দশায় আসবে, এমন আশা আমি নিজেই করি না।

তাই, সতর্ক থাকুন, গুজবে কান দেবেন না। জঘন্য দাঙ্গাবাজদের বাংলায় ঢুকতে দেবেন না, আর যারা ঢুকেই আছে তাদের আর মাথা চাড়া দিতে দেবেন না। আর ছুঁড়ে ফেলে দিন এই গণহত্যার রাজনীতি। আসুন প্রতিজ্ঞা করি, বিজেপির এই প্রাণঘাতী খেলা আমরা খেলবো না কিছুতেই।
বরং ভোট দেবার সময় আমরা মাথায় রাখবো এস-আই-আরের নামে সাধারণ ও উপায়হীন মানুষের অমানুষিক ভোগান্তি ও মৃত্যুর মিছিল, মনে রাখবো বিজেপির প্রত্যেকটি মিথ্যা, অতীতের নোটবন্দীর ভোগান্তি থেকে আজকের এল-পি-জি ক্রাইসিস, মনে রাখবো সেনাদের মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি, করোনার সময় পরিযায়ী শ্রমিকদের অসহায় দশা, ক্রমবর্ধমান পেট্রল-ডিজেলের দাম, মনে রাখবো হাথরস-উন্নাও, আর প্রত্যেকটি নারীবিদ্বেষী অপমান।
“আমার মাটি, আমার মা, দাঙ্গাবাজের হবে না”।
dc | 2402:e280:2141:1e8:341f:3dee:b171:***:*** | ২৯ মার্চ ২০২৬ ০৮:১৯739521
dc | 2402:e280:2141:1e8:341f:3dee:b171:***:*** | ২৯ মার্চ ২০২৬ ০৮:২৩739522
:|: | 2607:fb90:bd4b:9211:9f7:fd0e:3d18:***:*** | ২৯ মার্চ ২০২৬ ০৮:৪৯739523
b | 117.238.***.*** | ২৯ মার্চ ২০২৬ ১৪:২২739528
dc | 2402:e280:2141:1e8:f416:ff81:b462:***:*** | ৩০ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫১739545
ঠোঁটকাটা | 51.222.***.*** | ৩০ মার্চ ২০২৬ ১০:১৪739547
dc | 2402:e280:2141:1e8:f416:ff81:b462:***:*** | ৩০ মার্চ ২০২৬ ১০:৫৭739548
স্টিভ রোজ়েনজ়োয়াইগ | 14.139.***.*** | ৩০ মার্চ ২০২৬ ১১:৪৬739549
dc | 2402:3a80:47f:b9aa:d9f6:850f:5a0b:***:*** | ৩০ মার্চ ২০২৬ ১৫:২২739561
aranya | 2601:84:8501:15b0:80b7:11f7:c508:***:*** | ৩০ মার্চ ২০২৬ ২৩:৩৭739574
Ranjan | 2402:e280:3d02:20a:de77:1e5c:7186:***:*** | ৩১ মার্চ ২০২৬ ০০:৫৩739577
b | 14.139.***.*** | ৩১ মার্চ ২০২৬ ০৯:১৯739580
স্বাতী রায় | 42.108.***.*** | ৩১ মার্চ ২০২৬ ১৩:০১739585
aranya | 2601:84:8501:15b0:9d92:f95c:fccd:***:*** | ০১ এপ্রিল ২০২৬ ০২:০২739606
:|: | 2607:fb90:bd09:dbdd:da0:8f04:c465:***:*** | ০১ এপ্রিল ২০২৬ ০৫:২০739609