

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আসামের বাঙালি হিন্দু অধ্যুষিত, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী শহর শিলচরে একটি জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময়, বিজেপির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদি বলেন যে, “অন্যান্য দেশে নির্যাতিত ও দুর্দশাগ্রস্ত” হিন্দুদের প্রতি ভারতের একটি দায়িত্ব রয়েছে। তাঁদের ভারতে নাগরিকত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি, “ভোট-ব্যাংকের রাজনীতির” খাতিরে ভারতে “এনে বসানো” বাংলাদেশীদের তাড়ানো হবে।
হিন্দু অভিবাসী এবং মুসলিম অভিবাসীদের সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একদম স্পষ্ট: সমস্ত বাংলাদেশি হিন্দু অভিবাসীরাই “শরণার্থী” আর মুসলমানরা “অনুপ্রবেশকারী”।
এরপর ‘অনুপ্রবেশকারী’ তাড়ানোর একই কথা তিনি বাংলার নির্বাচনী প্রচারে এসে বলেন, যাকে কেন্দ্র করে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয়।
২০১৫য় বিজেপির মূল সংগঠন, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে ভারসাম্যহীনতার চ্যালেঞ্জ’ নামে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। সেটা অক্টোবর ২০১৫। এখানে তাঁরা দেশে মুসলিম ও খ্রিস্টান জনসংখ্যার “অস্বাভাবিক বৃদ্ধি” নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশের জনসংখ্যা নীতির পর্যালোচনা দাবি করলেও, দেশে ভাষাগত জনবিন্যাসের বিপুল পরিবর্তন হচ্ছে মূলত হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির অধিক হারের ফলে, সে বিষয়ে নিরব থাকে।
এর পর, ২০১৭ র মার্চে, আবার একটি রেজোলিউশন নেয় আরএসএস। এবারের বিষয় “পশ্চিমবঙ্গে ক্রমবর্ধমান জিহাদি কার্যকলাপ।” এখানেও মূল আলোচ্য পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধি। “অনুপ্রবেশকারী” বিতাড়নের মধ্যে দিয়ে সেই জনসংখ্যা কমাতে হবে।
এরপর, ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনী প্রচারের শেষ পর্যায়ে কলকাতায় এক ভাষণে তৎকালীন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ তাঁদের এই দ্বিমুখী প্রকল্পের পথ স্পষ্ট করেন।
শাহ বলেন, “প্রথমে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (সিএবি) আনা হবে। সকল শরণার্থীকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এরপর এনআরসি করা হবে (অনুপ্রবেশকারী বিতাড়নের জন্য)। তাই শরণার্থীদের চিন্তার কোনো কারণ নেই।”
তাঁর সেই বিখ্যাত “ক্রনোলজি সমঝিয়ে” বক্তব্যে তিনি বলেন, “প্রথমে সিএবি আসবে। তারপর এনআরসি। আর এনআরসি শুধু বাংলার জন্য হবে না; এটি পুরো দেশের জন্য হবে।”
সেই লোকসভা নির্বাচন জেতার মাস ছয় পর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ২০১৯ প্রণীত হয়। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে বিজ্ঞপ্তি জারি করে সিএএ-এর প্রয়োগ শুরু হয়।
কিন্তু নাগরিকত্ব পেতে হলে বাংলাদেশে শিকড় থাকার প্রমাণ হিসাবে সেদেশের কোনও-না কোনও নথি দেখানোর বিধির কারণে বাংলাদেশ থেকে আসা অধিকাংশ হিন্দুই, বিশেষত মতুয়া-নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষ, নাগরিকত্ব আইনের অধীনে আবেদন করেন নি।
তাঁদের দাবি, বাংলাদেশী নথির প্রয়োজনীয়তা সরকার তুলে দিক। শান্তনু ঠাকুর-পরিচালিত মতুয়া মহাসংঘ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিল, কেউ তাঁর নথি হারিয়ে গেছে বলে থানায় ডায়রি করে সেই ডায়রির কপি দিলে সেটাই যেন গ্রাহ্য হয়।
এ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের তরফে কোনো আশ্বাসের খবর এখনও নেই। এরকম আশ্বাস দিলে বা প্রয়োগ করলে তা আইনি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
কারণ, এই আইন অনুযায়ী, শুধু মাত্র বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের নির্যাতিত হিন্দুরাই এই ভাবে নাগরিকত্ব পেতে পারেন। নির্যাতনের প্রমাণ দিতে না হলেও, ওই তিন দেশের হিন্দু হওয়ার প্রমাণ তো দিতে হবে? প্রমাণ ছাড়া সরকার কিভাবে নিশ্চিত করবে, ইনি নেপাল, ভুটান বা মায়ানমারের হিন্দু নন?
অমিত শাহ “প্রথমে সিএএ, তারপর এনআরসি” বললেও, এনআরসির প্রথম ধাপ, এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন—যার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন আইনের মাধ্যমে কেন্দ্রের পছন্দে নিযুক্ত নির্বাচন কমিশনরাররা বারবার নাগরিকত্ব যাচাইয়ের দাবি তুলছেন— এসে পড়েছে তথাকথিত শরনার্থীরা নাগরিকত্ব আইনের সুবিধা নেওয়ার আগেই।
আসাম, বাংলা, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যায় গত কয়েক বছর ধরে লাগাতার স্থানীয় মুসলিমদের বাংলাদেশী বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছিলই; ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর অভিবাসী বিরোধী অভিযান শুরু করে অন্যান্য দেশের সাথে ভারতেও বিমানবন্দীকরে অবৈধ অভিবাসী ফেরত পাঠানোর পরই ভারতও বাংলাদেশি ও রোহিংগা ধরপাকড় অভিযান শুরু করে। এটাই অনেক তীব্রতা পায় এপ্রিলে পহলগাম জঙ্গি হামলার পর। তারপর থেকেই গণহারে ধরপাকড় শুরু।
কিন্তু ধরবে কি করে? একটাই সহজ উপায়—খোঁজ কোথায় কে বাংলায় কথা বলে।
কারোর ভাড়া বাড়িতে পুলিশ এল মধ্যরাতে; বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে বাংলায় কথা বলায় শুধু গ্রেপ্তার নয়, একেবারে বাংলাদেশে পাচার হয়ে গেলেন কেউ; কোথাও কোনও নির্মাণ প্রকল্পের পাশে শ্রমিকদের তাঁবু বা ঝুপড়ি থেকে বেছে বেছে বাঙালি তুলে নিয়ে যাওয়া হল মধ্য রাতে; কোথাও রাস্তায় বাঙালি ফেরিওয়ালাকে পিটিয়ে দিল হিন্দুত্ববাদী মব, তারপর আক্রান্তদেরই আটকে রাখলো পুলিশ।
হিন্দুত্ববাদীদের হিসাবে বাঙালি মুসলমানরাই “অনুপ্রবেশকারী”, হিন্দুরা “শরণার্থী”—কিন্তু কালচক্রে ধরা পড়তে থাকলেন হিন্দুরাও। লাতাগার প্রচারে বাঙালি আর বাংলাদেশি একাকার করে দিয়ে বরাবর এপার বাংলায় শিকড় থাকা হিন্দু-মুসলমানকেও “শরণার্থী” বা “অনুপ্রবেশকারী” বানিয়ে দিল বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ। পশ্চিমবাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা শয়ে শয়ে আটক হলেন বিভিন্ন রাজ্যের ডিটেনশন সেন্টারে। পুলিশ আধার, প্যান বা ভোটার আইডিকে নথি হিসাবে গ্রাহ্য করেনি। তাঁদের যুক্তি, এগুলো সহজেই জাল করা যেতে পারে।
তাঁরা চায় ডিজিটাল বার্থ সার্টিফিকেট (পুরনো হাতে লেখা সার্টিফিকেট নয়), জমির দলিল, স্কুল সার্টিফিকেট, ১৯৭১ সালের আগের ভোটার তালিকায় আটক ব্যক্তি বা পিতামাতার নাম, অথবা ব্লক উন্নয়ন কর্মকর্তা বা মহকুমা কর্মকর্তাদের দ্বারা জারি করা রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট—যে সার্টিফিকেটগুলি পুলিশ ভেরিফিকেশন পরেই জারি করা হয়। কিন্তু এধরনের কাগজপত্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক পরিবারের কাছেই থাকে না। তাঁদের কপালে এল ভোগান্তি।
বীরভুমের সোনালী খাতুন ও সুইটি বিবিদের ব্যাপারটাই ভাবুন। ২১ জুন, ওই ছয় জনকে আটক করে আর কে পুরমের ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসে (এফআরআরও) নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ। সবারই আধার কার্ড, ভোটার আইডি আর রেশন কার্ড ছিল। পরে, পরিবারের সদস্যদের হাতে এফআরআরও থেকে জারি করা আলোচ্য ডিপোর্টেশন অর্ডারের একটি কপি আসে। তাঁরা রাজ্য প্রশাসনকে সেটি জানান। সেই নির্দেশে দেখা যায়, এই ছয় ‘বিদেশি’কে “দেশে ফেরত পাঠানো পর্যন্ত” একটি কমিউনিটি সেন্টারে আটকে রাখতে বলা হচ্ছে।
নির্দেশটিতে ছয়জনকেই “মোলারগাংচেপুয়ারপাড় গ্রাম, পোস্ট অফিস: দেপুসারপাড়, বাগেরহাট, বাংলাদেশ”-এর বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করা হয়—এমন একটি জায়গা যেখানে তাঁদের কেউই কস্মিনকালেও থাকেননি। তাতে বলা হয়, তাঁদের “অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে” আর তাঁরা “ভারতে অবৈধ প্রবেশ বা মেয়াদ-অতিরিক্ত অবস্থানের ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য কোনো উপযুক্ত কারণ বা সহায়ক নথি সরবরাহ করতে পারেননি।”
ভোদু শেখ আদালতে তাঁর আবেদনে উল্লেখ করেন যে, তাঁর নিজের নামে জমি আছে এবং বাবা হাতিমতাই শেখের নাম পুরনো ভোটার তালিকায় রয়েছে। আদালতের কার্যবিবরণী থেকে জানা যাচ্ছে যে, ২৩শে জুন কে এন কাটজু মার্গ থানায় একজন সাব-ইন্সপেক্টর এই আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তাঁদের সব রেকর্ড এফআরআরও-তে পাঠানো হয়। এফআরআরও আবার এই আটককৃতদের একটি কমিউনিটি সেন্টারে পাঠায় ২৪ জুন। ২৬ তারিখ ডিপোর্টেশনের আদেশ জারি হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি মাত্র পাঁচ দিনে শেষ। তারপর ওই ছয়জনকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
পরিবারগুলি রাজ্য প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দায়ের করার পর বীরভূমের পাইকার থানা তাঁদের বাসস্থানের প্রমাণ, আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ভোটার আইডি, জমির দলিলসহ নথি সংগ্রহ করে। স্থানীয় ভাবে যাচাইয়ের পর পাইকার পুলিশ ১০ জুলাই রোহিনীর কে এন কাটজু মার্গ থানায় তাদের অনুসন্ধান রিপোর্ট ইমেল করে। কিন্তু কলকাতা হাইকোর্টের বেঞ্চ তাদের ২৬ সেপ্টেম্বরের রায়ে উল্লেখ করে যে, সেই ই-মেলের কোনো উত্তরই আসেনি।
ঠিক এই আবহে এল এসআইআর। যে যে নথি বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্যের পুলিশ মানতে চাইছিল না বছরের শুরু থেকে, আর চাইছিল যে যে নথি—-নির্বাচন কমিশনের তালিকাও এলো ঠিক সেভাবেই।
আপ ক্রোনোলজি সমঝিয়ে।
মাঝখান থেকে, নাগরিকত্বের মুলো ঝুলিয়ে মতুয়া-নমঃশুদ্রদের এতদিন নাচানোর পর, তাঁরা সিএএ-র সুবিধা পাওয়ার আগেই এসে গেছে এসআইআর। এতেই আপাত একটু ঘেঁটে আছে রাজ্যের হিন্দুত্ববাদী কৌশল। নইলে বাকি সব চলছে বাংলার জনবিন্যাস স্থায়ী ভাবে পালটানোর জন্য সংঘের ছকা পরিকল্পনানুসারে।
তবে ক্রোনোলজি আরও আছে। এই ২০২৬-এই ফুরিয়ে যাচ্ছে লোকসভা আসন ডিলিমিটেশনের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা। এই নিষেধাজ্ঞা ফের বহাল না করে ২০২৮-এর মধ্যে নতুন সেনসাসের রিপোর্ট বার করে ফেলা গেলে ২০২৯-এর নির্বাচনেই ডিলিমিটেশনের মাধ্যমে অধিক জনসংখ্যাবৃদ্ধি পাওয়া হিন্দী বলয়ের রাজ্যগুলিকে অতিরিক্ত লোকসভা আসন পাইয়ে দেওয়ার এক মরিয়া চেষ্টা সংঘ পরিবার ও তাঁদের অধীনে থাকা প্রশাসন করতে পারে বলে নানান মহল থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।