
বাবা মারা যাওয়ার পর সেই যে নেড়া হয়েছিল তারপর থেকে আর চুল কাটেনি ছোটু। কাঁধ ছাড়িয়ে এখন। আজ দুই বছর ধরে যত্ন করেছে তার চুলগুলোকে। নিয়ম করে শ্যাম্পু, তেল মাথায় লাগিয়ে বেশ সিল্কি হয়েছে।
আশেপাশের কাকিমার ডেকে বলতো, "কিরে ছোটু চুল কাটবিনা ?"
ছোটু একগাল হেসেই চলে যায়। ছোটবেলায় মা কে দেখেছিল সুগন্ধি তেল দিয়ে বেশ করে ম্যাসাজ করতে। কালী ঠাকুরের মতো লম্বা চুলগুলোর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। সেই থেকেই এক ছোট ইচ্ছে জন্ম নিয়েছিল, বড় চুল রাখার। কিন্তু বাপের শাসনে তা করতে পারেনি। এখন বাপ্ নেই, মা নেই। তাই শাসন করারও কেউ নেই। জগতে সে একা এক প্রাণী।
এমনিতে তার গায়ের রঙ দুধের মতো সাদা। মুখাকৃতি পান পাতার মতো। তার মধ্যে লম্বা চুল মাথা থেকে নেমে পড়াতে অনেকেই মেয়ে বলে ভুল করে বসে। দু একটা অচেনা বখাটে ছেলে সিটিও মেরেছিল। অলিতে গলিতে "ছক্কা" বলে কিছু বাচ্চা পালিয়ে যেত। কিন্তু তাতে ছোটুর কিছু যায় আসেনা।
Hide quoted text
সে নিয়মিত পাখির প্রথম ডাকের সাথে উঠে গিয়ে চায়ের দোকান খোলে আর রাতে পেঁচার মতো বই নিয়ে বসে থাকে। পড়াশুনার শখও যে অনেক। বাবা ঠুঁটো হয়ে যাওয়ার পর থেকে সেই তো দোকানতাকে দেখতো।
চা বানানো, রুটি করা, তরকারি রাধা সব দিক দিয়েই সে পটু। নর্মাল স্কুলে যাওয়ার তার সময় নেই, তাই নাইট স্কুলেই ভর্তি হয়েছিল। বড় হতে হবে তাকে। নিজের মতো করে বাঁচতে হবে। কিন্তু পেটের ব্যবস্থা তো আগে করা দরকার।
"ছোটুর চায়ের স্বাদই আলাদা ",কাস্টমাররা হামেশাই বলে থাকে। গর্বে ছোটুর বুক উঁচু হয়ে যায়। এইটুকুই তো চাহিদা। বাবা মা চলে যেতে স্বাধীন হয়েছে ঠিকই কিন্তু ভালোবাসা হারিয়ে ফেলেছে। এখন সে কুকুরের মতো খালি ভালোবাসার বিস্কুট খোঁজে। এক চিলতে ভালোবাসা তার ঝোলায় এলেই হবে।
পৌষ মাসের এক কুয়াশা ভরা সকালে ছোটু সবে দুধ বসিয়েছে। এমনি সময়ে একজন কাস্টমার এসে প্রথম চায়ের অর্ডার দিলো। লোকটি আপাদমস্তক পাহাড়ি ভেড়ার মতো উলে মোড়া। ঠান্ডায় ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে এসে বলল, "ভাই, চা হবে তো "
ছোটু একটু হেসে বলে উঠলো, "চায়ের দোকানে চা হবেনা কেন ?"
"তা তো ঠিকই "
"আপনি বসুন, এখুনি বানিয়ে দিচ্ছি "
কিছুক্ষন পর এক পেয়ালা চা এগিয়ে দিলো লোকটার দিকে।
"বাহ্ !, দারুন চা করো তো তুমি "
ছোটু হেসে উঠলো। এরকম কথা সে সারাক্ষণই শুনতে পায়।
"কি নাম তোমার ?"
"নীলাঞ্জন, তবে এখানে সবাই আমাকে ছোটু নামেই জানে "
"ইশ ", মা কালির মতো এক হাত জীভ বার করে ছেলেটা বলল, " এতো সুন্দর নাম থাকতে কেন এই ছোটু বলে ডাকে লোকে ?"
ছোটু একটা হাত দিয়ে চা নাড়াতে নাড়াতে বলে উঠলো, "ছোটবেলা থেকে বাবা ডেকে ডেকে এইটাই হয়ে গেছে "
লোকটা মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল, "আহা, এইরকমভাবেই কত শত নীলাঞ্জন হারিয়ে যায় ছোটুদের দলে "
ছোটু এইধরণের কথা শুনতে অভ্যস্ত নয়। সে বলে উঠলো, "আপনি কি কবি ?"
লোকটি হেসে ফেলল। তারপর চায়ের দাম মিটিয়ে বলল, "আমি ব্যবসাদার "
"কিসের ব্যবসা আপনার ?"
লোকটি একটু মৃদু হেসে বলল, "জ্ঞানের ব্যবসা করি। তার পরিবর্তে অনেকে টাকা দেয়, আবার অনেকে দেয় না। কিন্তু আমি সারাক্ষন জ্ঞান দি। আচ্ছা চলি কেমন ?পরে আবার আসবো "
ছোটু চলে যাওয়া লোকটার দিকে তাকিয়ে খালি বলে উঠলো, "ভারী অদ্ভুত মানুষ তো "
(২)
দোকান বন্ধ করতে বেশ বেলা হয়ে গেছিল। সূর্য তখন ঘড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে তাকে জানান দিচ্ছিল যে আজ বড্ডো দেরি হয়ে গেছে। স্কুলের জন্য লেট্ হয়ে গেল অনেক। তিনটে থেকেই শুরু হয়ে যায়। পড়াশুনায় গাফিলতি সে করতে চায় না। নরমাল স্কুল নয়, তাতে কি হয়েছে ? দেরি হলে অনেক কিছু মিস হয়ে যায়।
ছুটতে ছুটতে বাড়ি তে গিয়ে কোনরকমে স্নান করে আবার বেরিয়ে পড়লো। খাবার সময় নেই তার। একেবারে রাতে এসেই উদরে দু একটা ভাতের দানা পড়বে। একা থাকাটা একটু কষ্ট দায়ক তো বটেই।
তার উপর আজ আবার বাংলা ক্লাস। খুব প্রিয় যে, তা নয়। সিলেবাসে আছে তাই পড়তে হচ্ছে। এতো সাহিত্য জ্ঞান তার ভালো লাগেনা। কোন কবি কি ভেবে কিছু একটা লিখেছিল সে নিয়ে ও কেন মাথা ঘামাতে যাবে ? কি লাভ তাতে ?
স্যার কয়েকটা নোটস দিয়ে দেবে, সেই পড়েই কোনোরকমে উতরে যাবে। কিন্তু ক্লাসে ঢুকতেই তার চমকটা লাগলো। ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে তার সকালের সেই কাস্টমার দাঁড়িয়ে।
"কি ব্যাপার নিলাঞ্জন, এত লেট কেন?",লোকটা বলে উঠলো।
ছোটু অনেকদিন পরে কারুর মুখে এই হারিয়ে যাওয়া নামটা শুনলো। লোকে জিজ্ঞেস করলে সে বলতো ঠিকই কিন্তু আদতে যে সবাই ছোটু বলেই ডাকতো।
"যাক, এসেছ যখন বসে পর "
ছোটু গুটি গুটি পায়ে গিয়ে বসে পড়লো তৃতীয় বেঞ্চে।
"আমার নাম অনিমেষ। আমি এবার থেকে তোমাদের বাংলার ক্লাস নেব"
ছোটুর মনে হল আবার এক গন্ডা জ্ঞান দেবে। সকাল সকাল সে ট্রেলার দেখেছে অনিমেষবাবুর। এইবার আসল সিনেমা স্টার্ট হবে।
পনেরো জনের ক্লাস। সবাই ছোটুর মতোই ছেড়ে দিয়েছিল কোন এক সময়, এখন আবার কোমর বেঁধে নেমেছে। বাংলার ক্লাস যে সকলেরই অপছন্দের তা ছোটু ভালো করেই জানে।
কিন্তু অনিমেষের পড়ানোর ধরণ খুবই আলাদা। কেমন যেন একটা আকর্ষণ আছে লোকটার মধ্যে। এই স্যার অন্য স্যারদের মতো নোটের খাতা ভরে দেয় না। ইনি খুব গল্প করেন। আর সেই গল্পের মধ্যে দিয়েই কিভাবে যেন পুরো বিষয়টাকে বুঝিয়ে দেন।
ছোটু পুরো ক্লাস্টা মন দিয়ে শুনে গেল। এক অন্য ধরনের জ্ঞান পেল আজকে। গল্পের মধ্যে দিয়েও যে লেখাপড়া হয় সেটা প্রথমবার বুঝতে পারলো।
এর পর থেকে ছোটুর আর কোনোদিন কামাই ছিলোনা। আর কেউ আসুক কি না আসুক ছোটু সবার আগে হাজির।
অনিমেষ যেন পড়ানোর মধ্যে দিয়ে এক অন্য পৃথিবীর রচনা করে। আর ছোটুর এই ঘরকে ক্লাসঘর মনে হতো না। সে যেন অনিমেষের রচিত এই কল্পিত জগতে পাখির মতো উড়ে বেড়াতো। স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতো।
এরকমই একদিন ক্লাস শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও সে কিছুক্ষন বসে রইলো। অনিমেষ কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলো, " কি নীলান্ঞ্জন বাড়ি যাবেনা ?"
ছোটু একটু হাসলো খালি।
অনিমেষ কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলো, " বড় হয়ে কি হতে চাও ?"
ছোটুকে ছোটবেলায় অনেক লোকে জিজ্ঞেস করতো, বড় হয়ে কি হতে চাও ? কখনো পরিষ্কার করে সে উত্তর দেয় নি। উত্তর দেবে কি করে, সে নিজেও ভালো করে জানে না। কি ভালো লাগে তার ? ভালো করে মনে করতে পারেনা। চা বানাতে পারে, কিন্তু সে তো পেটের জন্য। এমনি কি ভালো লাগে ?
শুকনো মুখে বলল, "জানিনা স্যার। অনেক দিন জিজ্ঞেস করেছি নিজেকে, উত্তর পাইনি। সেরকম কিছু ইচ্ছাও নেই। ভালো লাগে তাই পড়তে আসছি। শুনেছি পড়লে বড় হওয়া যায়। আমি বড় হতে চাই। "
অনিমেষ একটু হেসে বলল, "বাহ্, বড় তুমি হবেই নীলাঞ্জন। তুমি এক কাজ কর। ..তুমি অমলকান্তির সাথে দেখা করে এস। কেমন ?"
ছোটু বুঝতে পারলো না। সে শোনে নি কখনো অমলকান্তির নাম। জানেনা তার ঠিকানা। " কি বললেন অমলকান্তি ? কোথায় পাবো তাকে ?"
অনিমেষ হেসে বলল, "অমলকান্তি ভগবান নয়। একটু খোঁজ, পেয়ে যাবে "
স্কুল শেষ হওয়ার পর বাড়ি যেতে যেতে সে ভাবলো অমলকান্তির কথা। কে এই ব্যক্তি, এরকম প্রাচীন নাম ওয়ালা লোককে কোথায় পাবে সে এখন। রাস্তায় যেতে যেতে পরিচিত এক রিকশাওয়ালাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, "দাদা, অমলকান্তিকে চেনো ?"
রিকশাওয়ালা মাথা নাড়িয়ে চলে গেল। তারপর চপের দোকানে, মিষ্টির দোকানে, মুদির দোকানে সব জায়গাতে খুঁজতে লাগলো অমলকান্তিকে। একটা যেদ চেপে গেল তার বুকের ভেতরে। খুঁজে তাকে বার করতেই হবে।
ঝিমিয়ে পরা শহরতলীর অলিতে গলিতে সে খুঁজতে লাগলো অমলকান্তিকে। যেমন তার যেদ, সেরকমই তার নেশা। এইরকম নেশায় হয়তো অমলকান্তি কোন এক হেমন্তের সকালে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল। ছোটুও কিছু হতে চায়, কিন্তু সে জানে না কি।
রাত বাড়ে, শীত বাড়ে, খিদে কেঁদে কেঁদে বলে বাড়ি যেতে। কিন্তু তার যেদ মায়াবী , অমলকান্তিকে খুঁজতেই হবে। অবশেষে রাত এগারোটার সময় শুনসান এক রাস্তাতে সে হার মানলো। না, খিদেরও বড্ডো খিদে পেয়েছে।
(৩)
রাতে শুয়ে শুয়ে অনেকক্ষন ভাবলো অমলকান্তির কথা। কে এই ব্যক্তি ? কেমন দেখতে তাকে ? সকালে উঠে যদি তার সামনে এসে দাঁড়ায় তাহলে কি চিনতে পারবে সে ? রাতে ঘুম এলো না ভালো। বারবার উসখুস করছিলো মন।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কি যেন ভাবতে লাগলো। হঠাৎ করেই তার চোখ আটকে গেলো আয়নার ফ্রেমের উপর একটা মোমের মতো জিনিসে। নিখুঁত টিকালো নখ দিয়ে খুঁটিয়ে বার করলো ধুলোমাখা একটা টিপ্। কোন এক কালে মা স্নান করতে যাওয়ার আগে সেখানে লাগিয়ে গেছিল। তারপর ছোটুর মতো টিপটাকেও ভুলে চলে গেছে।
ছোটু টিপটাকে নিজের দুই ভুরুর মাঝখানে আলতো করে ছুঁইয়ে দিল। বেশ মানাচ্ছে তাকে। নিজের খেয়ালেই পুরানো তালাভাঙা আলমারি খুলে মার্ নীল চুড়িদারটা বার করে পরে নিলো। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়াতেই লজ্জায় মাথা হেট্ হয়ে গেল। নিজের রূপেই নিজে বিভোর হয়ে গেছে। কপালে টিপ্, মাথায় লম্বা লম্বা চুলের গোছা নিয়ে সে এক দৃষ্টিতে আয়নার দিকে তাকিয়ে রইলো।
রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে এলো। একফালি রোদ্দুর জানলা দিয়ে উঁকি দিতেই সে বুঝতে পারলো, "দেরি হয়ে গেছে "
চটপট তৈরী হয়ে দৌড়ালো আবার দোকান খুলতে। হালকা ঠান্ডায় সে রোদ্দুর খুঁজতে খুঁজতে পৌঁছে গেলো দোকানে। দীর্ঘদিনের কাস্টোমার রতনবাবু এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
"আজ এতো দেরী করলি যে, আর একটু হলে চলেই যেতাম "
ছোটু একটু মিনমিন করে বলল, " হয়ে গেল গো জেঠু। একটু বসো, পাঁচ মিনিটে রেডি হয়ে যাবে "
রতনবাবু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, "তোর আবার সঙ সাজার অভ্যেস আছে নাকি রে ?"
"মানে ?"
"মাথায় টিপ্ কেন ?"
ছোটু লজ্জা পেলো। মাথা থেকে টিপটা বার করে চা বানাতে লাগলো। এমন সময় আর একজন পরিচিত কাস্টমার এসে বলল, " ছোটু শনিবার দিন কিন্তু মিছিল আছে। যেতেই হবে তোকে "
ছোটু একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, " আমাকে ছেড়ে দাও দাদা। সারাদিন দোকান বন্ধ থাকলে কি করে চলবে ?"
"ঐসব হবে না রে। বাজারের সবাই যাচ্ছে, তোকেও যেতে হবে। ", বলেই সে চলে গেল।
রতনবাবু ব্যাপারটা দেখে বলল, "তুইও কি পার্টি করিস নাকি ?"
ছোটু চা টা এগিয়ে দিয়ে বলল, "শখে কি আর করি জেঠু ?"
রতনবাবু একটু চুপ করে রইলেন। বয়স তার যথেষ্ট হয়েছে। এইসব দেখতে দেখতেই তো এতোগুলো বছর কেটে গেল। চায়ের পেয়ালাতে দু কাপ চুমুক দিয়ে বলল, "হ্যা রে, কারুর মুখে আমার ছেলের কথা কিছু শুনতে পেলি ?"
ছোটু এই প্রশ্নটার জন্যই বসেছিল। রোজ একইভাবে, একই সময়ে আসে। আর একই উত্তর পেয়ে চলে যায়। বছর তিনেক আগে হারিয়ে যাওয়া ছেলেটা খোঁজে এখনো বুড়ো বেরোয় রোজ। থানা পুলিশ কোন কিছুই বাকি নেই, তাও তার ছেলেকে পাওয়া যায়না। কিছু কিছু মানুষ আছে যারা হারিয়ে যেতে চায়। রতনবাবুর ছেলেও হয়তো সেরকমি।
ছোটু মাথা নাড়িয়ে না জানায়। বড় ঈর্ষা হয় তার রতন বাবুর ছেলের প্রতি। বাপ্ মা সব থাকতেও সে হারিয়ে গেছে। আর ছোটু সব কিছু হারিয়েও রয়ে গেছে।
বেলা বয়ে যায়, কত লোক আসে আর যায়। কিন্তু যেই লোকটির জন্য সে অপেক্ষা করে আছে তার ঠিকানা নেই। কোথায় পাবে তাকে ? শেষবার কে দেখেছিল ? বেঁচে আছে নাকি চিতার ধোয়াতে তার বাবা মার্ মতো উড়ে গেছে। কিছুই জানে না সে। এই নতুন স্যার যে কি মাথায় ঢুকিয়ে দিলো।
দুদিন পরে সে আবার স্কুলে গিয়ে অনিমেষ স্যারকে জিজ্ঞেস করে, " স্যার, অমলকান্তি কে ?"
অনিমেশ হেসে বলেছিল, "অমলকান্তি এক স্বপ্নের নাম। সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল "
কবিতার ছলাকলা ছোটুর মাথায় ঢোকে না। কিন্তু অনিমেশ স্যারের কথা শুনে সে একটু চমকে উঠলো। এমনও লোক আছে যে কিনা রোদ্দুর হতে চায় ? নিজেকেই জিজ্ঞেস করে ছোটু। তারপর অনিমেশ স্যারের থেকেই নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বইটা ধার নিয়ে বাড়ি গেল।
রাতে প্রথমবার তার অমলকান্তির সাথে দেখা হল। আর দেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার প্রেমে পড়লো। এমন লোকও আছে যে কিনা রোদ্দুর হওয়ার স্বপ্ন দেখে। এমন লোকও আছে যে নিজের মতো বেঁচে থাকার চিন্তা করে। ঠিক তখুনি সে বুঝতে পারলো সে কি চায় ?
আলমারি খুলে আবার সেই নীল চুড়িদার বার করে ফেলল। সে নীলাঞ্জন হতে চায়।
শনিবার সকালবেলায় ভেজা কুয়াশার মাঝে নীল বসনা এক সুন্দরী হেটে চলল বাজারের দিকে। বুকের উপরে ওড়না, হাতে চুরি, লম্বা চুলের বেণী দিয়ে যেন খয়েরি আভা ঠিকরাচ্ছে। হরিনের মতো চোখ তুলে দেখছে এই ঝাপসা রাস্তাঘাটকে। এক নতুন পৃথিবী খুঁজতে বেরিয়েছে যেন। আসে পাশে দু একজন হা করে দেখছে আর একটু মিটিমিটি হাসছে। দু একজন বলেই উঠলো, " এই ছোটু, এ কি পড়েছিস ?"
কে ছোটু ? ছোটু এখন নেই। রাস্তার ধারে চা বানানো এমন হাজারো ছোটুর মধ্যে দিয়ে মাঝে মাঝে এক একটা নীলাঞ্জন বেরিয়ে আসে। যারা নিজেদেরকে খুব ভালোবাসে। নিজের শরীরের বাধা গণ্ডিকে অতিক্রম করে তারা রোদ্দুর খুঁজতে চায়।
মিছিলের সামনে এসে দাঁড়াতেই সেই পরিচিত দাদা এসে বলল, " এইভাবে যাবি ? হঠাৎ কি হলো তোর ?"
নীলাঞ্জন হেসে বলল, " আমি এইভাবেই জন্মেছি "
লোকটি আর কথা না বাড়িয়ে বলল, " ঠিক আছে, চল তাহলে। "
আকাশে আজ আলো কম। ঠান্ডা বেড়েছে। আর এর মাঝেই ঝান্ডা হাতে নিয়ে দল বেঁধে ভোটের প্রচারে নেমে পড়েছে সব। মিছিলের পরে মাংস রুটি সবার জন্য। ওই লোভেই সব আরো ছুটে এসেছে। আর নীলাঞ্জনের মতো কিছু মানুষ গুন্ডাদের অত্যাচারের ভয়ে।
"চলছে না, চলবে না "
খালি এইটুকুই বলতে হবে পিছনের লোকেদের। এই টুকুই তাদের সাপোর্ট। নীলাঞ্জন পিছনে আসতে আসতে হেটে চলেছে। আজ খুব ভালো লাগছে তার। নিজেকে সে প্রথমবার বুঝতে পেরেছে।
এমন সময় হঠাৎ করে কিসের একটা কোলাহল শুরু হল। লোকজন এদিক ওদিক দৌড়াতে লাগলো। রিকশা টোটো সব যে যার মতো রাস্তার গলিতে ছেড়ে দিয়ে দৌড়াতে লাগলো। আবহাওয়া খারাপ হচ্ছে। এলো মেলো জনজটের মধ্যে দিয়ে নীলাঞ্জনও দৌড়োতে লাগলো।
বুঝতে পারছেনা কি হচ্ছে। সামনে থেকে পুলিশের একটা বড় গাড়ি এসে দাঁড়ালো।
হাতে লাঠি আর মাথায় হেলমেট পরে এলো পাথাড়ি লাঠি চার্জ করতে থাকলো। নীলাঞ্জন এই দৃশ্য দেখে ভয়ে আটকে উঠেছে। এ যেন এক দাঙ্গা শুরু হয়েছে।
পিছন থেকে কে যেন বলে উঠলো, "ছোটু ভাগ !!!"
কিন্তু নীলাঞ্জনের পা আটকে গেছে। পুলিশের এই রুদ্র রূপ দেখে তার হাত পা ঠান্ডায় অবশ হয়ে গেছে। এমনসময় মেঘের আড়াল থেকে এক চিলতে রোদ্দুর এসে পড়লো তার মুখে। আর সেই ক্ষনিকের রোদ্দুরকে আড়াল করে এক হেলমেটধারী পুলিশ তার হাতটা চেপে ধরে বলল, "সালা, বাওয়ালি হচ্ছে। ছক্কা কোথাকার"
নীলাঞ্জনের মুখ থেকে কথা বেরোলো না। পুলিশ তার চুলের গোছা ধরে হিড়হিড় করে টেনে তুলে দিলো গাড়ির ভেতরে। তার হাত পা ছোড়ে গেছে। ফর্সা, পা দিয়ে টপ টপ করে রক্ত পড়তে লাগলো কালো গাড়িটার সিটের উপর। তার বুকের ওড়না পরে গেছে কোন এক ফাঁকে।
নোনতা জল তার গাল চুইয়ে পড়তে লাগলো। সে তো অমলকান্তির মতো রোদ্দুর হতে চেয়েছিল। সে শুধু নিজের মতো বাঁচতে চেয়েছিল।
জানালার গরাদ ধরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলো সে। হাজারো মানুষের ভিড়ের মাঝে খুঁজে পেলো তার লজ্জা বস্ত্র।
পীচগলা রাস্তার উপর এক ফালি রোদ্দুরের মাঝে নীল ওড়নাটা তাকিয়ে আছে তার দিকে।
©জীৎ