
এই সামান্য কয়েকশো বছর আগেও আমাদের পৃথিবী চলেছিল সেই সময়ের মধ্যে দিয়ে, যখন মানুষের সমাজ-জীবনের প্রতিটা স্তরেই চরমতম নিয়ন্ত্রক শক্তি ছিল ধর্ম । তখন মানুষের সাধারণ জীবন যাপন তো ধর্ম-সম্পৃক্ত অনুশাসন, বিশ্বাস ও লোকাচারের শৃঙ্খলে কঠিনভাবে বাঁধা থাকতই (আজও বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে যা অনেকাংশে সত্যি), কিন্তু শুধু সেটুকুই নয় । তখন রাজাগজা বা সম্রাট যে আমাদেরকে শাসন করবেন তার পেছনে ধর্মীয় সমর্থন থাকতে হত, তিনি কীভাবে শাসন করবেন এবং কাকে কখন শূলে চড়াবেন সেটা ধর্মশাস্ত্রেই লেখা থাকতে হত, জ্ঞানচর্চার প্রধানতম বিষয় হতে হত ঈশ্বরের স্বরূপ নিয়ে বাগ্বিস্তার, আকাশের নক্ষত্র থেকে জীবনের অর্থ থেকে মনুষ্যদেহের রোগভোগ এবং ভাষার ব্যাকরণ পর্যন্ত যে কোনও জ্ঞানচর্চাকেই সঙ্গতি রেখে চলতে হত ধর্মীয় শাস্ত্র ও লোকবিশ্বাসের সঙ্গে, এবং এমন কী, ছবি আঁকা গান গাওয়া কবিতা লেখা নাটক করা মূর্তি গড়া এসবও হতে হত কোনও না কোনও ধর্মীয়/পৌরাণিক থিমকে ঘিরেই । বলা বাহুল্য, সে সব দিন আমরা মোটের ওপর পেরিয়ে এসেছি, পৃথিবীর সব অংশে সমানভাবে না পারলেও । কিম্বা, বিশ শতকের শেষদিক থেকে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করছেন, কে জানে, বলাটা হয়ত আসলে ততটা বাহুল্য নয় --- সত্যিই কি আমরা ও সব দিন ‘পেরিয়ে এসেছি’ ? আর, যদি তা এসেই থাকি কোনও গতিকে, তো তাতে কি আদৌ মানুষের ‘ভাল’ হয়েছে ? হ্যাঁ, সে সব প্রশ্নও জরুরি বইকি । তবে তার আগে, এ প্রসঙ্গে, ‘হে অতীত’ ভদ্রলোককে দিয়ে আরও কিছু কথা কওয়ানো দরকার বোধহয়। আর, তারও আগে দরকার এই কথাটা মনে রাখা যে, এই ‘পেরিয়ে আসা’-র প্রক্রিয়াটাকেই পণ্ডিতেরা আজ বলছেন ‘সেক্যুলারাইজেশন’, বাংলায় হয়ত বা কোনও মতে বলতে পারি ‘ধর্মনিরপেক্ষীভবন’ ।
গল্পটি অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালের, তবুও কম লম্বা নয় । চতুর্দশ শতকের ইউরোপে দম ফুরিয়ে আসা মধ্যযুগীয় সমাজের গর্ভে সংঘটিত ‘রেনেসাঁ’, তার পিঠোপিঠি খ্রিস্টধর্মে খাড়াখাড়ি ফাটল ধরিয়ে ইউরোপ কাঁপিয়ে দেওয়া ধর্ম-সংস্কার আন্দোলন ‘রিফর্মেশন’, তার ঠিক পরে পরেই গ্যালিলিও-ব্রুনো-কেপলারের হাতে শুরু হয়ে নিউটনের হাতে সমাপ্ত হওয়া বৈজ্ঞানিক বিপ্লব, তারই সুদূরপ্রসারী জের হিসেবে পরের শতকেই যুক্তিবাদ ধর্মমুক্তি ও গণতন্ত্রের ধ্বজা উড়িয়ে ‘এনলাইটেনমেন্ট’ এবং তার গায়ে গায়েই একে একে প্রথম ও দ্বিতীয় ‘শিল্পবিপ্লব’, এবং সবশেষে ‘কলোনাইজেশন’ বা ঔপনিবেশিকীকরণের মধ্য দিয়ে এ সমস্ত ঘটনা ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিন্তার ঢেউ ইউরোপ থেকে এশিয়া আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকাতে পৌঁছে যাওয়া। কয়েকশো বছরের এই গোটা সময়সীমাটা জুড়ে ধর্মকে কেবলই সরতে হয়েছে ‘ইতিহাস’ নামক নাটকটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক চরিত্র থেকে ক্রমশ গুরুত্বহীন হতে থাকা পার্শ্বচরিত্রে । এ প্রক্রিয়ার তিনটে দিক । প্রথমত, রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর থেকে ধর্মের রাশ আলগা হয়ে যাওয়া, প্রশাসন-অর্থব্যবস্থা-সেনা-শিক্ষাব্যবস্থা এইসব থেকে ধর্মের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া । দ্বিতীয়ত, জ্ঞান-চিন্তা-শিক্ষা-শিল্প-সংস্কৃতির জগতে আধুনিক বিজ্ঞান যুক্তিবাদ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের দ্বারা ধর্মের তাত্ত্বিক পরিসরটি দখল হয়ে যাওয়া । এবং তৃতীয়ত, ব্যক্তি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ও মনোজগতে ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত ক্রমশ আলগা হয়ে আসা । বোঝা যায়, প্রক্রিয়াটি অনতিসংক্ষিপ্ত, জটিল, বহুমাত্রিক, বহুস্তরীয় । ‘সেক্যুলারাইজেশন’ নিয়ে চর্চা, কাজে কাজেই, খুব সোজা না ।
ব্যাপারটাকে বড়ই সংক্ষেপে, প্রায় মন্ত্রের মত করে বলছি বোধহয় । একটু বিস্তারে যাই বরং । প্রাচীন যুগে পৃথিবীর এখানে ওখানে বিভিন্ন সভ্যতার বুকে যুক্তিবাদ ও মুক্তচিন্তার দু-একটি স্ফূলিঙ্গ দেখা যায়নি এমন নয়, এবং একেক সময়ে জ্ঞানচর্চাও বেশ উচ্চে উঠেছিল (অবশ্যই তখনকার মাপে) । কিন্তু, নানা তথ্য অনুসন্ধান করতে করতে এবং তার ওপর যুক্তিবুদ্ধি খাটাতে খাটাতে এ জগতের সবটাই একদিন না একদিন জেনে ফেলা যাবে, এবং সে জ্ঞানের সাহায্যে সম্ভাব্য সব সমস্যাই হয়ত বা সমাধান হয়ে যাবে --- এ ধরনের আত্মবিশ্বাস তখন ঐতিহাসিকভাবেই সম্ভব ছিল না মানবীয় জ্ঞানবুদ্ধির ওই প্রাথমিক দশায়। আর তার ওপর, যে অতি বিরল সামান্য কয়েকজন সাহস করে ধর্মের ঠিক-বেঠিক নিয়ে প্রশ্ন তুলত, তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলাও খুব সোজা ছিল । ফলত, যুক্তিবাদী মুক্তচিন্তার এক স্থায়ী ও প্রভাবশালী ধারা গড়ে ওঠা সেই সময়ে প্রায় অসম্ভবই ছিল। এবং, তখন যা অসম্ভব ছিল, মধ্যযুগে এসে তা অসম্ভবতর হয়ে পড়ল, ইউরোপ ও ভারত দুই অঞ্চলেই । ততদিনে এইটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে, ‘ধর্ম’ জিনিসটা স্থানীয় প্রভাব ছাড়িয়ে এক বৃহত্তর এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে, এবং সেটা কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষকে সুসংহতভাবে একসূত্রে গেঁথে ফেলা সম্ভব । রাজা-গজা-সম্রাট এবং তাঁদের বশংবদ পুরুত ও পণ্ডিত শ্রেণি সে সুযোগ ছাড়বেন কেন, তাঁরা তাঁদের অধীন সমস্ত এলাকার মানুষকে একই ধর্মে দীক্ষিত করে সাম্রাজ্যকে সুসংহত করে তুলতে লাগলেন । এর ফলে মহাদেশগুলোর একেকটা বিরাট বিরাট অংশ জুড়ে মানুষের সমাজ সুসংহত হতে পেরেছিল ঠিকই, এবং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক মানবসমাজের সূচনা হয়ত বা কোনও এক অর্থে ওভাবেই হয়েছিল, কিন্তু তার কুফলটাও ছিল মারাত্মক । অপেক্ষাকৃত অসংগঠিত প্রাচীন সমাজে সংশয়বাদ, যুক্তিবাদ ও মুক্তচিন্তার সামান্য যা-ও বা দু-একটি বিচ্ছিন্ন স্ফুলিঙ্গ স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেখা দিয়েছিল, মধ্যযুগীয় ধর্মকারার অন্ধকারে সে সব সম্পূর্ণ লোপাট হয়ে গেল ।
কিন্তু, ইউরোপে আর ভারতে যখন এইসব কাণ্ড চলছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের নবগঠিত ইসলামীয় সভ্যতায় ঘটছে একটু অন্য ধরনের ব্যাপার । এই সভ্যতার অনুসন্ধিৎসু বিদ্বজ্জনেরা তখন প্রাচীন সভ্যতার বইগুলো সাগ্রহে সংগ্রহ করে গুছিয়ে রাখছেন, নতুনভাবে নকল করে ব্যবহার্য আকারে নিয়ে আসছেন, মন দিয়ে পড়ছেন, তা নিয়ে গভীর চর্চা ও গবেষণায় মাতছেন, আরবী ভাষায় অনুবাদ করছেন, তার ব্যাখ্যা ও ভাষ্য রচনা করছেন, এবং অনেক সময়ে চমকপ্রদ মৌলিক অবদানও রাখছেন (সেই সময়ের মাপে, বলা বাহুল্য) । হাজার খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী শতকগুলোতে যখন সে সভ্যতা নিম্নগামী হতে লাগল, ততদিনে ইউরোপের মধ্যযুগীয় ধর্মকারাটি কালের নিজস্ব নিয়মে কিঞ্চিৎ জীর্ণ হয়েছে, এবং সে সমাজের পণ্ডিতেরা ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তা-কাঠামোর মধ্যে থেকেই জ্ঞানার্জনের নতুন উপায়ের সন্ধান শুরু করেছেন । ঠিক এই সময়েই তাঁদের হাতে গিয়ে পৌঁছল আরবী পণ্ডিতদের কাজগুলো, লাতিন ও সিরীয় অনুবাদের মাধ্যমে । এরই মধ্য দিয়ে তাঁরা প্রাচীন পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া জ্ঞানচর্চাকে পুনরাবিষ্কার করলেন, এবং সবিস্ময়ে টের পেলেন, অনেক আগে একটা সময় ছিল যখন তাঁদের নিজের সময়ের থেকে অনেক বেশি অবাধে জ্ঞান ও শিল্পের চর্চা হত, এবং সেই সময়কার প্রাচীন পণ্ডিতেরা বিজ্ঞান শিল্প সাহিত্য দর্শনে অসাধারণ সব কাজ রেখে গেছেন । তাছাড়া, এই সময় নাগাদই ঘটল আরও দুটো অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ।
এক, গোটা মধ্যযুগ ধরেই ধীরে হলেও বেশ কিছুটা বেড়েছে কৃষিজাত ও কারিগরি উৎপাদন, এবং সে সব নিয়ে দূর দূর দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করে ফুলে ফেঁপে উঠেছেন এক শ্রেণির বুদ্ধিমান ও উচ্চাকাঙ্খী বণিকের দল । আবার, তাঁদেরকে ব্যবসার টাকা ধার দিয়ে এবং তা থেকে সুদ আদায় করে লাল হয়ে উঠেছেন নবোদ্ভিন্ন মহাজন বা ‘ব্যাঙ্কার’-রাও । এই শ্রেণির ভুঁইফোঁড় বড়লোকেরা পুরনো রাজাগজা আর জমিদারদের মতন ধর্মটর্ম নিয়ে মাথা ঘামাতে চান না, পুরুত আর পাদ্রীদের বিশেষ পাত্তা দিতে চান না, ধর্মের নিষেধাজ্ঞাও মানতে চান না, বরং আরাম ও কেতায় থাকতে চান, আর দেদার টাকাকড়ি খরচা করে আমোদ আহ্লাদ ফুর্তিফার্তায় মেতে থাকতে চান । এঁদেরই প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতায় একদল প্রতিভাবান শিল্পী ও সাহিত্যিক তাঁদের সৃষ্টিকে বার করে নিয়ে এলেন পুরাণ ও ধর্মের কব্জা থেকে, মানুষের জাগতিক সম্পর্ক ও অনুভূতিকে নিয়ে তৈরি হতে লাগল আনকোরা নতুন জাতের অসামান্য সব শিল্পকর্ম । আর তার ওপর আবার, এইসব নতুন ব্যবসায়ী বড়লোক এবং রাজাগজা গোত্রের পুরোনো বনেদী বড়লোক --- উভয়ের পক্ষেরই দরকার হতে লাগল ভাল মানের লেখাপড়া জানা বহুভাষাবিদ লোকজন, যারা ভিনদেশী প্রশাসক ও বণিকদের সঙ্গে দক্ষভাবে কথাবার্তা বলে তাদেরকে নানা ব্যাপারে রাজি করাতে পারবে, নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্যভাবে নানা দলিল ও চুক্তিপত্র লিখতে পারবে, বাণিজ্য ও প্রশাসনের নানা জটিল প্রশ্নে পরামর্শ দিতে পারবে । এই পরিস্থিতিতে যে ধর্ম-বহির্ভূত জ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চার পরিসরটি হু হু করে বাড়বে, তাতে নিশ্চয়ই আশ্চর্যের কিছু নেই ।
দুই, পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি ইউরোপে আবিষ্কৃত হল ছাপার যন্ত্র, যার ফলে বই জিনিসটা আগের চেয়ে অনেক সস্তা ও সহজপ্রাপ্য হয়ে গেল, এবং জ্ঞানচর্চাও অনেকটাই বেরিয়ে এল পুরুত ও ক্ষমতাবান অভিজাতদের হাত থেকে । বাইবেলে সত্যি সত্যি কী লেখা আছে সেটা আগে শুধু পুরুতদের থেকেই জানতে হত, এখন চাইলে অনেকেই সেটা নিজে পড়ে দেখতে পারে । আর, ঠিক এই মাহেন্দ্রক্ষণেই ইউরোপীয় পণ্ডিতদের হাতে আরব থেকে এসে পৌঁছল প্রাচীন পৃথিবীর জ্ঞানচর্চার আকরগ্রন্থগুলো !
এত সব কাণ্ডের সমাহারে চতুর্দশ শতক থেকে ষোড়শ শতকের মধ্যে ইউরোপের মাটিতে মোদ্দা যে ঘটনাটি ঘটে গেল, তাকেই আজ আমরা বলি ‘রেনেসাঁ’ --- মনুষ্য সমাজের ‘সেক্যুলারাইজেশন’ বা ধর্মনিরপেক্ষীভবনের প্রথম ধাপ । তার পরেই কোপার্নিকাস-গ্যালিলিও-কেপলারের হাত ধরে যে বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের শুরু হয়েছিল, তার জমি তৈরি করেছিল এই রেনেসাঁ-ই। রেনেসাঁর রথী-মহারথীরা যে ধর্মের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট করে এবং সোচ্চারে বিরাট কিছু বলেছিলেন, এমন নয়, বরং তাঁরা অনেকেই অন্তত তত্ত্বগতভাবে এবং একান্ত নিজস্ব ঢঙে খ্রিস্টধর্মের মাহাত্ম্য মেনেছেন । কিন্তু তাঁদের মূল কাজকর্ম ও চিন্তায় ‘ধর্ম’ জিনিসটার আদৌ কোনও ভূমিকা না থাকায় তা নিঃশব্দে একপাশে সরে যেতে বাধ্য হয়েছিল । এই রেনেসাঁ-র পরে ইউরোপের মধ্যযুগীয় ধর্ম-কারাগারে দ্বিতীয় বড় আঘাতটি এল ধর্মের বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকেই, ‘রিফর্মেশন’ নামক মহা-আন্দোলনের হাত ধরে । এ আন্দোলনের ফলস্বরূপ খ্রিস্টধর্ম খাড়াখাড়ি ভাগ হয়ে গেল ।
বলা হয়, জার্মান ধর্ম-সংস্কারক মার্টিন লুথার ১৫১৭ সালে যখন ক্যাথলিক চার্চের কর্তৃত্ববাদ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে পঁচানব্বইটি দাবিওয়ালা একটি সনদ উইটেনবার্গ-এর চার্চের দরজায় লটকে দেন, তখন থেকেই রিফর্মেশন আন্দোলনের শুরু। তাঁর অভিযোগ ছিল, রোমান ক্যাথলিক চার্চের কর্তারা সব অত্যন্ত উদ্ধত ও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে যিশু এবং ঈশ্বরকে কুক্ষিগত করে ফেলেছেন, যদিও আসলে ঈশ্বর সবারই, এবং যে কোনও খ্রিস্টানই ঈশ্বরের কৃপা পেতে পারে, যদি সত্যিকারের ভক্তি ও বিশ্বাসটা থাকে । বোঝা যায়, এ আন্দোলন মোটেই যুক্তিবাদের আন্দোলন নয়, বরং আসলে ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যেই এক ধরনের ভক্তি-আন্দোলন । এর প্রভাবে দিকে দিকে দরিদ্র খ্রিস্টান চাষীরা খেপে উঠে রাজাগজা-জমিদার-পুরুতদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে থাকে । সে সব বিদ্রোহ অবশ্য শেষপর্যন্ত খুব নির্মমভাবেই দমন করা হয়, এবং সে দমনপীড়নে সম্ভবত লুথার সাহেবের তেমন আপত্তিও ছিল না । কিন্তু তবুও, ইউরোপের ধর্ম-মুক্তির পেছনে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী । একে তো অসীম প্রভাবশালী চার্চ-কর্তাদের কর্তৃত্ব নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তুলে দিয়ে তিনি ধর্মের শৃঙ্খলে একটি বড়সড় টান দিতে পেরেছিলেন --- তখন এক ধাক্কায় ইউরোপের এক বিরাট অংশ ক্যাথলিক ধর্ম ছেড়ে ‘প্রোটেস্টান্ট’ ধর্মে দীক্ষা নিয়ে নেয় । আর তার ওপর, ইউরোপের সেক্যুলারাইজেশন বা ধর্মনিরপেক্ষীভবনের পেছনে এর আরও অন্তত দুটি পরোক্ষ প্রভাবের কথা পরবর্তীকালের ইতিহাস-তাত্ত্বিকেরা বলেছেন । এক, সমাজতত্ত্ববিদ ম্যাক্স ওয়েবার বর্ণিত ‘প্রোটেস্টান্ট ওয়ার্ক এথিক্স’, অর্থাৎ মিতব্যয়িতা ও কঠোর পরিশ্রমের অভ্যাস, যা নাকি কালক্রমে পুঁজি ও শ্রম জুগিয়ে ইউরোপে ধনতন্ত্রের উদ্ভবের পথ সুগম করেছিল । এবং দুই, স্বয়ং মার্টিন লুথারের তৈরি নির্দেশিকা, যাতে তিনি ‘কোরাম দিও’ বা ঐশ্বরিক ধার্মিকতা থেকে ‘কোরাম মুন্দো’ বা জাগতিক ধার্মিকতাকে আলাদা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন । ক্ষমতা ও সম্পদের ভাগাভাগি নিয়ে রাজতন্ত্র ও চার্চের দীর্ঘমেয়াদি তিক্ত ঝগড়া মেটানোর লক্ষ্যে পরবর্তীকালে এসব নির্দেশ কাজে এসেছিল । অনেক পণ্ডিতের মতে, পরবর্তীকালে ধর্ম যে ক্ষমতার অঙ্গন থেকে ক্রমশ সরতে সরতে অনেকটাই ব্যক্তিগত পরিসরের মধ্যে আটকে পড়তে থাকে, সে প্রক্রিয়ার প্রথম বীজটি এভাবে নাকি মার্টিন লুথারই স্বহস্তে রোপণ করেছিলেন, যদিও নিজের অজান্তেই ।
এভাবেই, রেনেসাঁ এবং রিফর্মেশন নামক দুই অতি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া খুলে দিল সপ্তদশ শতকীয় বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের রাস্তা । এগুলো যদি না ঘটত, তাহলে সপ্তদশ শতকের একেবারে গোড়াতেই, বা এমন কি তার আগেই, কোপার্নিকাস-গ্যালিলিও-ব্রুনো-কেপলার প্রমুখ বিজ্ঞানীরা যেভাবে বাইবেল-বিরোধী বৈজ্ঞানিক সত্যকে সাহস করে সোচ্চারে তুলে ধরতে পেরেছিলেন, সে প্রেক্ষিতটিই বোধহয় কোনওদিন রচিত হত না । এর পরেও যে এসব কাজের ফলাফল খুব স্নিগ্ধ হয়েছিল, এমন নয় । কোপার্নিকাস তো ভয়ে সারা জীবনে তাঁর গবেষণা প্রকাশই করে উঠতে পারলেন না, গ্যালিলিওকে শেষ জীবনে থাকতে হল গৃহবন্দী হয়ে, আর ব্রুনোকে জীবন্ত পুড়ে মরতে হল ধর্মীয় বিচারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ।
তবু, ইতিহাসের গতি অমোঘ, সেখানে সত্যির প্রকাশকে তো আর অনন্তকাল আটকে রাখা যায় না । তাই, এত নিপীড়নের পরেও ধর্মই ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে লাগল, এবং জাঁকিয়ে বসতে লাগল আধুনিক বিজ্ঞান । সপ্তদশ শতকের গোড়াতেই ইংরেজ দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন এবং ফরাসি দার্শনিক র্যনে দ্যকার্তে আবিষ্কার করলেন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি-দর্শন --- জ্ঞানার্জনের নতুন হাতিয়ার । বেকন বললেন, জগতের সত্যকে জানতে হলে প্রাচীন শাস্ত্রগ্রন্থের ভরসায় না থেকে সরাসরি যেতে হবে বাস্তব জগতটার কাছেই, চারপাশের বস্তুগুলো ঘেঁটেঘুঁটে নিজের হাতে করতে হবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এবং তা থেকে সরাসরি অনুমান করে নিতে হবে বাস্তব জগতের চলার নিয়মগুলো । দ্যকার্তে বললেন, জগতকে ঠিকঠাক জানার রাস্তা আসলে দুটো । প্রথমত, ভাল করে ভেবে ভেবে জগত সম্পর্কে এমন অল্প কয়েকটা প্রাথমিক সত্যিকে বুঝে নিতে হবে, যার সত্যতায় সন্দেহ করার কোনও উপায় নেই । তারপর সেগুলোকে স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নিয়ে এবং তার ওপর কঠোর যুক্তি প্রয়োগ করে জগত সম্পর্কে বাকি সত্যগুলোতে পৌঁছতে হবে । আর দ্বিতীয়ত, এই বৃহৎ ও জটিল গোটা জগতটাকে একসাথে বোঝবার চেষ্টা না করে প্রথমে তাকে ছোট ছোট সরল অংশে ভেঙে নিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে হবে, এবং তারপর আবার সেই খণ্ড খণ্ড বোধগুলোকে জুড়ে নিয়ে নির্মাণ করতে হবে জগত সম্পর্কে এক পূর্ণ ধারণা । কোপার্নিকাস-গ্যালিলিও-ব্রুনো-কেপলার প্রমুখ বিজ্ঞানী যে বৈজ্ঞানিক বিপ্লব শুরু করেছিলেন, এইসব পদ্ধতিগত উপলব্ধিকে সম্বল করে সপ্তদশ শতকের শেষদিকে এসে নিউটনের হাতে তা সমাপ্ত হল । আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের নড়াচড়া যা নাকি একান্তভাবে ঈশ্বরের এখতিয়ার বলে গণ্য হয়ে এসেছে এতকাল, তা শেষপর্যন্ত, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘তালপতনের সমগোত্রীয়’ বলে সাব্যস্ত হল, হাত পড়ল ঈশ্বরের রাজ্যপাটে । মহাজগত থেকে ঐশ্বরিক অলৌকিকতার নির্বাসন ঘটল, অন্তত একটা স্তর পর্যন্ত । জাগতিক ও মহাজাগতিক বস্তুর নড়াচড়ার মৌলিক বিজ্ঞানটা যখন নিউটন একবার স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেললেন, তারপর স্বভাবতই আরও চওড়া করে খুলে গেল ধর্মীয় ধ্যানধারণা মুক্ত হয়ে জগতটাকে আরও আরও বেশি করে জানার বোঝার রাস্তা। আরও ব্যাপকভাবে, আরও গভীরে, এবং নানা নতুন নতুন দিকে ।
লাগ্রাঁজ, লাপ্লাস, পয়জন, অয়লার প্রমুখ অষ্টাদশ শতকীয় ধুরন্ধর গণিতজ্ঞেরা নিউটনের পদার্থবিদ্যাকে সাজিয়ে গুছিয়ে এক অমোঘ অব্যর্থ হাতিয়ারে পরিণত করলেন । কার্ল লিনিয়াসের হাতে রূপ পেল জীববিজ্ঞান । মধ্যযুগীয় ‘অ্যালকেমি’-র গা থেকে তন্ত্রমন্ত্রের গন্ধ ছাড়িয়ে তাকে এক আধুনিক বিজ্ঞানের রূপ দিলেন যুগান্তকারী রসায়নবিদ আন্তন ল্যাভয়সিয়ের । এতদিনে যুক্তিবাদী মুক্তচিন্তার দর্শন পেল এক সত্যিকারের স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য সমর্থন, কারণ বিজ্ঞান আর যুক্তি এখন হাত রাখতে পারে প্রকৃতির সব মহলেই । কাজেই এখন যুক্তিবাদ হয়ে উঠল দর্শনের অন্যতম প্রধান ধারা, নিরীশ্বরবাদী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গী হয়ে উঠল এক বাস্তব সম্ভাবনা । ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়র-দিদেরো-ওলবাক-এলভেতিউস এবং স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম তখন প্রবল উৎসাহে যুক্তির তরোয়াল নিয়ে কেটে খান খান করে চলেছেন ধর্মের ঐশ্বরিক মহিমা (যদিও আসলে তখন এ সব যুক্তিতর্কের প্রভাব সীমাবদ্ধ ছিল শুধু এলিট চিন্তাবিদদের মধ্যেই, সাধারণ্যের নাগাল থেকে বহু দূরে) । চিন্তার জগতে এই আলোড়নেরই নাম ‘এনলাইটেনমেন্ট’, এর প্রতিশব্দ হিসেবে বাংলায় ‘আলোকপ্রাপ্তি’ শব্দটি ব্যবহার হতে দেখেছি অনেক জায়গায় । এই আলোড়নের বৈজ্ঞানিক ফল হিসেবে একদিকে ঘটেছিল প্রযুক্তিবিপ্লব (এবং সেই সুবাদে প্রথমে ব্রিটেন এবং পরে অন্যান্য সমস্ত ইউরোপীয় দেশগুলোতে নাটকীয় অর্থনৈতিক বৃদ্ধি), এবং অন্যদিকে রাজনৈতিক ফলাফল হিসেবে উঠে এসেছিল ঈশ্বরাদিষ্ট বংশানুক্রমিক অভিজাতদের শাসনের বদলে সাধারণের গণতান্ত্রিক শাসনের দাবি । অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে আমেরিকার স্বাধীন হওয়া এবং ফরাসি বিপ্লব ঘটে যাবার মধ্য দিয়ে এই দ্বিতীয়োক্ত রাজনৈতিক দাবিটির প্রবল প্রকাশ ঘটে । এরই সঙ্গে সঙ্গে দাবি ওঠে প্রশাসনিক ব্যবস্থা থেকে ধর্মের নির্বাসনেরও, কারণ সেটা না হলে ঈশ্বরাদিষ্ট বংশানুক্রমিক অভিজাততন্ত্রকে হঠানো যাবে না । রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করার যে প্রক্রিয়াকে আজ আমরা ‘সেক্যুলারাইজেশন’ বলি, তার বাস্তব প্রকাশের শুরু এখান থেকেই, এবং পরবর্তী শতক অর্থাৎ উনবিংশ শতকের গোটাটা জুড়ে সে প্রক্রিয়া চলেছিল প্রবল বেগে । তার নির্দিষ্ট রূপটি সব জায়গায় ঠিক একই রকম ছিল না, স্বভাবতই ।
যেমন, আমেরিকাতে আইনবলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় চার্চের নাক গলানো নিষিদ্ধ হয়, এবং মানুষকে তার ইচ্ছেমত যে কোনও ধর্ম মেনে চলার ও প্রচার করার অধিকার দেওয়া হয়, কিন্তু উল্টোদিকে আবার রাষ্ট্রের হাতেও চার্চের কাজকর্মে নাক গলানোর অধিকার দেওয়া হয়নি । কিন্তু ফ্রান্সে আইন করে চার্চের প্রচুর সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হয়, এবং রাষ্ট্র যাতে চার্চের কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সে ব্যবস্থা রাখা হয় (একই চেষ্টা তুর্কিতে করেছিলেন কামাল আতাতুর্ক, কিন্তু সাময়িক সাফল্যের পরে তা ভেস্তে যায়) । ‘সমাজতান্ত্রিক’ দেশ চিন ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে সেক্যুলারাইজেশনের ধরনটি আরেকটু কড়া । রাষ্ট্র এখানে যদিও ব্যক্তির ধর্মবিশ্বাসের অধিকারকে স্বীকার করে, কিন্তু আবার ধর্মের সংগঠন ও প্রচারের কর্মকাণ্ডকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণও করে, এবং স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ধর্মের অসারতার কথা প্রচার করে সাধারণকে এ বিষয়ে সচেতন রাখতে চায় । ভারতে আবার ‘সেক্যুলার’ কথাটার আসল পশ্চিমী অর্থকে একটু পাল্টে নিয়ে ‘সব ধর্মের প্রতি সমান মর্যাদা’ গোছের এক নরমসরম ধোঁয়াটে অর্থ খাড়া করা হয় । ভারতের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান ও বাংলাদেশ এমনিতে চলে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ আইনে, এবং সেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকারও স্বীকৃত, কিন্তু আবার তাদের সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম বলে ঘোষণা করে তাকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে ।
বেশ কিছু রাষ্ট্র আজও ধর্মনিরপেক্ষ নয়, যেমন সৌদি আরব ও ইরান, এবং সেখানে ধর্মীয় শাস্ত্রভিত্তিক আইনে রাষ্ট্র চলে । নেপাল কিছুদিন আগে পর্যন্তও ধর্মীয় রাষ্ট্র ছিল (পৃথিবীর একমাত্র হিন্দুরাষ্ট্র), কিন্তু সম্প্রতি সেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়ে তা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিবর্তিত হয়েছে । এতদিন ভাবা হত, আস্তে আস্তে সব রাষ্ট্রই ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে উঠবে, এবং একবার ‘সেক্যুলার’ বা ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে উঠলে কোনও রাষ্ট্র বা সমাজ আর কোনওদিনই পশ্চাৎমুখী হয়ে ধর্মীয় শাসনে ফিরতে পারবে না ।
কিন্তু, গত কয়েক দশকে প্রশ্ন উঠেছে সে প্রত্যয় নিয়ে । ইরান ও আফগানিস্তান আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থেকে ইসলামীয় রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছে, আলবেনিয়া রূপান্তরিত হয়েছে ‘সমাজতান্ত্রিক’ রাষ্ট্র থেকে খ্রিস্টান রাষ্ট্রে, তুর্কির ধর্মীয়করণ চলছে একটু একটু করে । বিভিন্ন দেশে নানা রঙের মৌলবাদীরা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে আসছে । তারা একদিকে নানা জঙ্গী এবং নাশকতামূলক কাজকর্ম চালাচ্ছে, এবং অন্যদিকে আবার আধুনিক রাজনীতিতে অংশ নিয়ে গণতান্ত্রিক পরিসর দখল করার চেষ্টা চালাচ্ছে । এমন কি, ইরাক ও সিরিয়া থেকে এক বড়সড় অংশ খামচে নিয়ে এক নতুন ধর্মীয় রাষ্ট্রই গড়ে ফেলেছে। এই প্রেক্ষিতে ধর্মনিরপেক্ষতার ঠিক-বেঠিক ও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন ওঠারই কথা, এবং উঠছেও ।
কিন্তু, সে সব কথা না হয় বারান্তরেই হবে ।
&/ | 151.14.***.*** | ২২ মার্চ ২০২২ ০৭:৫৭505167
s | 2a03:e600:100::***:*** | ২২ মার্চ ২০২২ ০৮:০২505168
Amit | 121.2.***.*** | ২২ মার্চ ২০২২ ০৮:৫৬505171
Raj | 2a0b:f4c0:16c:3::***:*** | ২২ মার্চ ২০২২ ০৯:১৯505172
&/ | 151.14.***.*** | ২২ মার্চ ২০২২ ২০:৩৩505192