এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • হৃদয়

    শমীক মুখোপাধ্যায় লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ১৩ ডিসেম্বর ২০০৯ | ১০৪৪ বার পঠিত
  • এই দেশে আমরা সংখ্যায় যত বেড়েছি, তত বেড়েছে আমাদের মধ্যে একলা মানুষের দল। একলা। ভিড়ের মাঝে একা। আজ আমাদের দেশের লোকসংখ্যা কিছু-না-হোক, তিরিশ কোটি। টেকনোলজির হাত ধরে কম্পিউটার খুললেই মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা সবাইই একটা বিশাল ফেসবুক কি অর্কুট ফ্যামিলির অংশ; কোটিতে কোটিতে স্ক্র্যাপ, কোটিতে কোটিতে মেইল আদান প্রদান হচ্ছে প্রতি ঘন্টায়। কিন্তু লোকগুলির সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে দেখুন, মনের কথা আলোচনা করবার মত তাদের কেউ নেই। কারুর সাথে ঘটে না ভাবের আদানপ্রদান।

    আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৮৫ থেকে ২০০৪-এর মধ্যে এই রকম একলা হয়ে ওঠা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে পঁচিশ শতাংশ। মনের ভেতর গুমরে চলা না-বলা বাণী, বাড়িয়ে তুলছে হার্টের সমস্যা, ঘটিয়ে ফেলছে মৃত্যু। ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা গবেষণা চালাচ্ছেন এই রকম একাকীত্বে ভোগা মানুষজনের ওপর।

    কথাগুলো আমাদের কাছে নতুন নয়। তবু ফিরে শোনার মত। সোশ্যাল আইসোলেশনের ঘেরাটোপে স্বেচ্ছাবন্দী এই মানুষগুলোর মধ্যে বেড়ে চলেছে শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা, বেড়ে চলেছে ডিপ্রেশন, ঘটে যাচ্ছে সুইসাইড। অজস্র। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নিউরোসায়েন্টিস্টের কথায়, এই একাকীত্ববোধ আমাদের স্নায়ুকোষের ওপর এত চাপ তৈরি করে, যে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা আস্তে আস্তে কমে যেতে থাকে। রাতে ঘুম আসে না, অ্যালকোহলে আসক্তি বাড়ে, অবসাদ গ্রাস করে নেয় সারা শরীর।

    আর এই একাকীত্ব যে কেবল একা থাকার কারণেই ঘটে, এমনটাও কিন্তু নয়। সমীক্ষা জানাচ্ছে, এই একাকীত্বের অনুভূতি আরো বেশি তীব্র হয়ে ওঠে অনেক লোকজনের মাঝে। ধরা যাক, একটি ছাত্র স্কুলের পড়া শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রথম যখন কলেজে আসে, হস্টেলে আসে, তখন তার চারপাশে কিন্তু অধিকাংশ লোকজনই ঘুরে বেড়ায় যারা তারই এজ গ্রুপের। অথচ সে সেখানে নতুন। তার মত অনেকেই নতুন, কেউ কারুর সাথে প্রথম মনের অনুভূতি শেয়ার করে উঠতে পারে না। প্রথম বাবা-মা প্রিয়জনকে ছেড়ে হস্টেলে চলে আসার যে দু:খ, সেই কথা শোনাবার মত কেউ নেই। অথচ, তার চারপাশেই সেকেন্ড থার্ড ইয়ারের ছেলেমেয়ের দল, দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে, একসাথে হাহা-হিহি করছে, ফুচকা খাচ্ছে, সিনেমা যাচ্ছে। এই একাকীত্ব কিন্তু স্থায়ী হয় না বেশিদিন। কিশোর বয়েসে মিক্সিংয়ের ক্ষমতা থাকে অনেক অনেক বেশি, খুব তাড়াতাড়িই তারা বাড়ি ছেড়ে আসার দু:খ ভুলে গড়ে নেয় নতুন বন্ধুবৃত্ত। বাড়ির সাথে মানসিক দূরত্ব বেড়ে ওঠে আস্তে আস্তে। তখন বন্ধুদের মনের অনেক কথা খুলে বলা যায় যা বাড়ির লোককে আর বলা যায় না।

    কিন্তু জীবন গড়িয়ে চলে। কলেজ ছেড়ে উচ্চতর কলেজ, সেখান থেকে কর্মক্ষেত্র থেকে ক্ষেত্রান্তরে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে আস্তে আস্তে, আর জীবনে বাড়তে থাকে জটিলতা। সেইসব জটিলতা শেয়ার করার মত লোক পাওয়া যায় না আর। মানুষ আস্তে আস্তে অফিসপাড়ার ভিড়ের মাঝে, অন্য অন্য কর্মক্ষেত্রের জটলার মাঝে নিজেকে সরিয়ে নিতে থাকে আলাদা করে, গুটিয়ে যেতে থাকে। একলা হয়ে যায় মানুষ।

    এ সব তো চিরন্তন সত্য। এসবের মাঝখানেই হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়েছে ডিজিটাল এজ। আলোর গতিতে উগান্ডা থেকে আন্টার্কটিকায় পাস হয়ে যাচ্ছে ছবি, চিঠি। তৈরি হয়ে গেছে সোশ্যাল ইন্টার‌্যাকশনের সাইট - অর্কুট, ফেসবুক, টুইটার। কিন্তু এত করেও এরা কি কমিয়ে দিতে পেরেছে এই সোশ্যাল আইসোলেশনের রোগ? কমাতে পেরেছে একলা মানুষের একাকীত্ব?

    সমীক্ষা বলছে, না। বরং মানুষ প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে আরও বেশি একা হয়ে যাচ্ছে। ঘরের প্রিয় মানুষটির সঙ্গ ছেড়ে সে পাড়ি দিচ্ছে ইন্টারনেটের অজানা জগতে। আপাতদৃষ্টিতে বন্ধুস্থানীয় একঘর মানুষের মাঝে আপনি কম্পিউটার খুলে কাউকে টুইটারে টেক্সট পাঠাচ্ছেন। এর মানে কি, এই ঘরের বাইরেও আপনার আরও অনেক বন্ধু আছে? ... না। এর মানে এই, ঘরের লোকগুলিকে আপনি আর বন্ধু বলে ভাবতে পারছেন না। তাদের চেয়েও কোনও কম জানা লোককে গুরুত্ব দিয়ে টুইটিংয়ের মাধ্যমে আপনি বোঝাতে চাইছেন যে, আপনি এদের সাথে আপনার অনুভূতি শেয়ার করতে তেমন আগ্রহী নন।

    মানুষ কখন একা অনুভব করে? যখন, কোনো কারণবশত তার প্রিয়জনদের সাথে, সে নিজের পরিবারই হোক, বা বন্ধুবান্ধব, ভাবনার আদানপ্রদানের মূল সূত্রটা হারিয়ে ফেলে। চারপাশে তাকে ঘিরে থাকা অসংখ্য মানুষও তখন তার কাছে অর্থহীন হয়ে যায়। মনের চিন্তার গতিপথ রুদ্ধ হয়ে জমতে থাকে স্নায়ুর অলিতে গলিতে। তারপর একদিন সে ফেটে বেরিয়ে আসে অন্য কোনও রূপে।

    একাকীত্বঘটিত হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হবার চান্স সবচেয়ে বেশি মহিলাদের। গবেষণা জানাচ্ছে, একাকীত্বঘটিত মানসিক চাপ একজন পুরুষ কোনওভাবে হজম করে নিতে পারেন, কিন্তু মেয়েদের পক্ষে সেটা হজম করা একটু কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, সাইকোলজিকালি, সম্পর্ককে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখে মেয়েরা। যখন সেই সম্পর্ক আর কাজ করে না, একাকীত্ব গ্রাস করে, তখন সেই ভেঙে পড়া সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি গ্রাস করে মেয়েদের মন। ফলে হার্টের সমস্যা শুরু হয়। মানসিক অবসাদের শুরু হয়। একজন একাকীত্বে ভোগা মহিলা, মানসিক অবসাদগ্রস্ত মহিলা, অন্য যে কোনও মহিলার থেকে পঁচাত্তর শতাংশ বেশি মাত্রায় হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার চান্স রাখেন।

    সঙ্গী নিয়ে সারা জীবন পথ চলবার অঙ্গীকার করে আমরা বিয়ে করি। জীবনসঙ্গী বেছে নিই। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই বিয়ের পরে দেখা যায় সঙ্গী নির্বাচন যথাযথ হয় নি। আমরা হতাশ হই। ভেঙে পড়ি। কোনওভাবে মানিয়ে নিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবার চেষ্টা করি, আজকের জেটযুগে, অনেকেই তা পেরে উঠি না, কাটিয়ে ফেলি সম্পর্কের বেড়াজাল। একটি দম্পতি থেকে জন্ম নেয় দুটি একাকী মানুষ। সঙ্গীর খোঁজ কিন্তু থেমে থাকে না। অনেকেই পেয়েও যায় নতুন সাথী। হয় তো সেই নতুন সম্পর্ক টেকে, হয় তো টেকে না। সমীক্ষা বলছে, একটি যে কোনও রকমের বিবাহ একজন পুরুষকে হৃদরোগ থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারে, সে রাজযোটক হোক বা একেবারেই মিসম্যাচ। কিন্তু একজন মহিলার ক্ষেত্রে একটি ব্যাড ম্যারেজ ইজ অ্যাজ ব্যাড অ্যাজ হৃদরোগের জন্ম নেওয়া।

    তাহলে? দূরে হোক, বা কাছে, ইন্টারনেটে হোক বা ঘরের সোফায়, ঠিক কতজন বন্ধু দরকার আপনার? একাকীত্ব ঘোচাতে?

    দুর্ভাগ্যবশত, এর কোনও ম্যাজিক নাম্বার নেই। একজন এক্সট্রোভার্ট লোকের হয় তো দুই, তিন কি চারজন বন্ধু হলেই হয়ে যায়। আবার না-হতেও পারে। স্কুলের সবচেয়ে পপুলার ছেলেটিই হয় তো বেড়ে উঠেছে সবচেয়ে একা একা। কে জানে? সারা বিশ্ব যার জন্য পাগল, এমন পপুলারতম সেলিব্রিটিকেও ঘরের মধ্যে গুমরে মরতে হয়, একা একা। কে তার খবর রাখে?

    পারলে একা একাই নিজের হাতদুটো বাড়িয়ে দিন। তুমুল একাকীত্বের এই বাজারেও, আজও, দু তিনটে হাত ঠিক জুটে যায়।

    ১৩ই ডিসেম্বর, ২০০৯

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ১৩ ডিসেম্বর ২০০৯ | ১০৪৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন