

পরাবাস্তববাদের একটা পূর্বের পর্যায় আছে, তাকে বলা হয় ডাডাবাদ। ডাডাবাদ থেকেই ক্রমে ক্রমে পরাবাস্তববাদের জন্ম হয়। ডাডাবাদী আন্দোলনের স্থায়িত্বকাল খুব বেশি নয়, পরাবাস্তববাদী আন্দোলনও ক্ষণবাদী হলেও তা পরবর্তীতে নানা পথে চলে যায়। যেমন একটা ধারা মার্কসবাদের দিকে চলে যায়। আরেকটি ধারা ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণের দিকে চলে যায়। পরাবাস্তববাদের সত্যিকারের সেই ভাবে আর অস্তিত্ব না থাকলেও, একথা অনস্বীকার্য যে পরাবাস্তববাদী শিল্পগুলি আমাদের নানাভাবে আগেও সমৃদ্ধ করেছে এবং আজও করে চলেছে। পরাবাস্তববাদ নিয়ে ও পরাবাস্তববাদী চলচ্চিত্রকার লুই বুনুয়েলের ছবি নিয়ে আলোচনার পূর্বে, ডাডাবাদ নিয়ে কিছু কথা বলার প্রয়োজন আছে। ডাডার অর্থ কি, ডাডা কারা এবং তাঁদের বক্তব্যই বা কী ছিল? ডাডা শব্দটি ফরাসী শব্দ। এই শব্দটির অর্থ হল কাঠের খেলনা ঘোড়া। ডাডা শব্দটি নির্বাচনের একটা ইতিহাস আছে। রোমানিয়ান কবি ত্রিস্তান জারা, জার্মান সাহিত্যিক হুগো বল এবং ফরাসী-জার্মান চিত্রকর ও স্থপতি হ্যান্স আর্প এই তিনজন মিলে এক-ধরনের আন্দোলন শুরু করেছিলেন যাকে বলা যেতে পারে বুর্জোয়া শিল্প-সাহিত্য বিরোধী আন্দোলন। অর্থাৎ, বুর্জোয়া-শিল্প বা যাকে বলা হয় অভিজাত শিল্প, শিল্পের নামে অভিজাততন্ত্র রচনা করা, এনারা ছিলেন তার বিরোধী। প্রথাগত শিল্পের যে ভূমিকা সেখান থেকে সরে এসে এনারা নতুন একটা আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। এই আন্দোলনটি আভাগার্দ আন্দোলনের অংশ ছিল। আভাগার্দ হল পৃথিবীকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি আন্দোলন। জারা, বল এবং আর্প মিলে যে বুর্জোয়া-বিরোধী আন্দোলন শুরু করেছিলেন তার মধ্যেই নিহিত ছিল ডাডাবাদের উদ্ভব ও বিকাশ। ডাডাবাদ হল প্রথা-বিরোধিতা। ধ্রুপদীয়ানার নামে বা রোমান্টিকতার নামে এবং এমনকি আধুনিকতার নামে এ পর্যন্ত শিল্পের জগতে যা কিছু হয়ে এসেছে এনারা সেই সমস্ত কিছুর বিরোধিতা করেছিলেন। যা কিছু প্রচলিত তার বিরোধিতা করে এনারাই প্রথম ঘোষিত ভাবে একটা বৈপ্লবিক অবস্থান নিয়েছিলেন। আধুনিক, রোমান্টিক এবং এমনকি ধ্রুপদী শিল্পেও প্রচলিতের বিরোধিতার ব্যাপারটা ছিল। কিন্তু সেই বিরোধিতার জায়গাটিও ডাডাবাদীদের মতে বুর্জোয়া ভাবনার ধারাতেই ছিল, বুর্জোয়া চিন্তা-চেতনার চৌহুদ্দির মধ্যেই অবস্থান করত। এনারা ঘোষিত ভাবে সেই বুর্জোয়া চিন্তার পাল্টা একটা বিদ্রোহী অবস্থান নিয়েছিলেন। এই ডাডা নামটির উৎপত্তি নিয়ে একটা প্রচলিত মজার কাহিনী আছে। জারা, বল ও আর্প একদিন সুইজারল্যান্ডের জুরিখের একটা পানশালায় বসে ছিলেন। প্রথা বিরোধী তাঁদের এই আন্দোলনের কি নাম দেওয়া যায় এই নিয়ে ভাবতে ভাবতে জারা একটা মজার কাজ করলেন, একটি অভিধান নিয়ে তার মধ্যে একটি ছুরি বসিয়ে দিলেন। ছুরির মাথাটা অভিধান ভেদ করে যে শব্দটাকে গিয়ে ছুঁল, ছুরি র মাথা-দ্বারা অবিক্ষত সেই শব্দটি ছিল ‘ডাডা’। অভিধানটি ছিল জার্মান-ফরাসী। প্রতিবাদী এই আন্দোলনের নামটিও প্রথা-বিরোধী ভাবেই দেওয়া হয়েছিল বোঝা যায়। তবে এর একটা অন্য মতও আছে। অনেকে মনে করেন ঐভাবে নয়, আসলে ডাডা হল শিশুদের ধ্বনি। শিশুরা যখন কথা বলা শুরু করে তখন তারা মুখ দিয়ে নানা রকম শব্দ বা আওয়াজ করে, ডাডা তার মধ্যে একটা। সেখান থেকেও শব্দটি নেওয়া হয়েছিল বলে মনে করা হয়। শিশুদের উচ্চারিত ঐ শব্দগুলির কোনো অর্থ থাকে না। পরে পরিবেশ থেকে তারা ধীরে ধীরে অর্থ-পূর্ণ কথা বলতে শেখে। এই যে অর্থ-হীন ডাডা শব্দ, এইটা যেন বুর্জোয়া বা প্রচলিত অর্থ-ব্যবস্থার বাইরে তাঁদের বৈপ্লবিক অবস্থানের প্রতীক। ১৯১৫ সালে এই শব্দটি প্রাপ্ত হওয়ার পর, ১৯১৭ সালে ডাডা নামে একটি পত্রিকা তাঁরা বার করতে শুরু করেন। এই ডাডাবাদীরা অদ্ভুত পোশাক-আষাকে সজ্জিত হয়ে ঘুরে বেড়াতেন। প্রচলিত অর্থে অর্থহীন কথা বলা ও কবিতা আবৃত্তি করা তাঁদের একটা সখ ছিল। তাঁদের এই বিচিত্র কার্য-কলাপ এক শ্রেণীর মানুষকে খুবই প্রভাবিত করেছিল। অদ্ভুতত্ব বা বিচিত্রতার প্রতি মানুষের একটা স্বাভাবিক আকর্ষণ থাকে। ডাডাবাদীদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। দেখা গেল প্যারিসে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের ঢেউ নিউইয়র্ক পর্যন্ত প্রসারিত হল। নিউইয়র্কে ১৯১৬ থেকে ১৯১৯ পর্যন্ত এই আন্দোলন স্থায়ী হয়েছিল। জারা, বল বা আর্পদের মতো আমেরিকাতে যারা এই শিল্প আন্দোলনটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তাঁরা হলেন, মার্সেল ডুক্যাম্প, ম্যান রে ও ফ্রান্সিস পিকারিয়া। এদের মূল চিন্তাটাই ছিল - সৌন্দর্যবোধ আসলে তৈরি হয়েছিল ধ্রুপদী বা রোমান্টিক বা বাস্তববাদী পৃথিবীর ধারণা থেকে। সেখান থেকে সরে যাওয়া। আরেকটি ব্যাপার হল, যুদ্ধ। ডাডাবাদ ও পরাবাস্তববাদের জন্মের ক্ষেত্রে যুদ্ধ একটা বড় ভূমিকা পালন করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখন শুরু হয়ে গেছে। এনারা যুদ্ধ-কালীন পরিস্থিতিতে বসেই এই ঘটনা গুলি ঘটাচ্ছিলেন। এর মূল কারণ হল, এতদিন ধরে পাশ্চাত্য-পৃথিবীতে শিল্প-সাহিত্যের নামে যে সংহতি আশা করা হয়েছিল, যে সংযত অবস্থা আশা করা হয়েছিল, যে সৌন্দর্য-বোধের স্তুতি করা হয়েছিল, সে সব যেন বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতেই এক লহমায় উবে গেল। লক্ষ লক্ষ মানুষে প্রাণ হারাচ্ছেন। মানুষের জীবনে নেমে আসছে চরম দুর্গতি। এই যে অবস্থা, এই যে ধ্বংস যজ্ঞের উপর দাঁড়িয়ে থাকা, এর মধ্যে দাঁড়িয়ে সুন্দর একটা পৃথিবী কামনা করা যায় না - এই ছিল তাঁদের বক্তব্য। যার ফলে, প্রচলিত যে সৌন্দর্য-বোধ, তার প্রতি তাঁরা হয়ে পড়েন বীতশ্রদ্ধ। যুদ্ধের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রীয় নিয়ম-নীতির বিরুদ্ধে, সামাজিক নিয়ম-নীতির বিরুদ্ধেই তাঁরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। কোথায় সমাজ আছে, সমাজে কোথায় সুস্থিতি আছে, কোথায় নিয়মকানুনের কর্তা রাষ্ট্র আছে? কোথাও কিছু নেই। যদি না থাকে, তাহলে আমরা যে বলি সুস্থিত পৃথিবী, যার উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে বাস্তববাদ ও যুক্তিবাদ, সেসব বাজে কথা। যুক্তি তো নেই, মানুষ তো ক্রমেই অযৌক্তিক ও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে। তার মানে, প্রচলিত পৃথিবীর কাছে যদি এই যুদ্ধ, এই বিনাশই কাম্য হয় তাহলে সেখানে যুক্তি বলে কিছু নেই। এই ছিল তাঁদের মত। এখানেই তাঁরা যুক্তির বিরোধিতা করলেন। যুক্তির বিরোধিতা করেও, তাঁরা পালটা একটা যুক্তি নির্মাণ করেছিলেন। তা হল মানুষকে ভাল রাখার, ভালবাসার যুক্তি। এখান থেকেই নির্মিত হয়েছিল তত্ত্বটি। ফ্রান্সের আন্দ্রে ব্রেঁত, পল এলুয়ার এবং লুই আরাগো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিশেষ করে আন্দ্রে ব্রেঁতর হাতেই পরে পরাবাস্তববাদের ইস্তেহার রচিত হয়। ব্রেঁত এবং আরাগো পরবর্তী কালে মার্কসবাদের দিকে চলে যান। এলুয়ার খানিকটা প্রতীকবাদ ও খানিকটা পরাবাস্তববাদের একত্রীকরণে একধরনের অবস্থান নেন। ডাডাবাদের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি নিয়ে এখন কিছু কথা বলা যাক।
ডাডা কোলাজ
ডাডাবাদীরা মনে করতেন মহৎ এবং চিরকালীন শিল্প-সাহিত্য বলে আসলে কিছু হয় না। তাঁদের বক্তব্য ছিল, মহৎ শিল্পের নামে যা চলছে তা স্রেফ ধাপ্পাবাজি। শিল্প-সাহিত্যের নির্মাণ, ছন্দ ও বিন্যাস সম্পর্কে তাঁদের বক্তব্য ছিল, শিল্প-সাহিত্য হবে স্বয়ম্ভু। ‘অটোমেটিক রাইটিং’ বলে একটা ব্যাপার তখন শুরু হয়েছিল যা আসলে এই ডাডাবাদী আন্দোলনেরই ফসল। অটোমেটিক রাইটিং বলতে বোঝায়, আমার মনে যা আসছে আমি তাই লিখে যাবো। মানে প্রথমত, আমাকে কেউ বলে দেবে না যে রোমান্টিক সাহিত্য রচনা করতে হবে বা কেউ বলে দেবে না যে এইরকম ভাবে ছন্দ (মাত্রাবৃত্ত বা অক্ষরবৃত্ত ছন্দ ইত্যাদি) মিলিয়ে লিখতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমার মনে যা আসবে কোনো রকম বাদ-বিচার না করে, নিজের মন থেকে কোনো রকম সম্পাদনা না করে তাই লিপিবদ্ধ করে যাবো। অর্থাৎ, এখানে ফ্রয়েডের মনোবিকোলন তত্ত্ব চলে আসছে। সেই তত্ত্বে প্রস্তাবিত যে মগ্ন-চৈতন্য, যে ভিতরের মন, যে নিজের মত করে স্বাধীন ভাবে চিন্তা করতে চায়, যা ইগো ও সুপার-ইগো দ্বারা শাসিত হয় না, শিল্পকে তার কাছে নিবেদন করতে হবে। ইগো ও সুপার-ইগো দ্বারা শাসিত হলে তা একটা শৃঙ্খলার মধ্যে চলে যাবে। ইগো ও সুপার ইগো মেনে আমরা যেরকম ভাবে সমাজে চলি, শিল্প-সাহিত্যও কিন্তু তেমনি ছন্দ বা এক নির্দিষ্ট ব্যাকরণ মেনে বাক্য-বিন্যাসের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়। তাঁরা বললেন এরকম শৃঙ্খলার আসলে কোনো প্রয়োজন নেই। মগ্ন-চৈতন্যই হল আসল কথা এবং সেইটিকেই প্রাধান্য দিতে হবে। ওখান থেকে যা উঠে আসবে, ঠিক সেরকম ভাবেই শিল্প-সাহিত্য রচিত হবে। অর্থাৎ, যা ইচ্ছে তাই রকমের। যেভাবে খুশি বাক্য-বিন্যাস কর, প্রচলিত কাঠামোটাকে সম্পূর্ণ ভেঙে দাও। ফ্রয়েড বলেছিলেন, মানুষের মনের মাত্র দশ শতাংশ হল সচেতন অংশ, বাকি নব্বই শতাংশই হল অচেতন বা অন্ধকার অংশ। ডাডাবাদীরা ঐ নব্বই শতাংশ অচেতন বা অন্ধকার অংশটাকেই সামনে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। অচেতন বা মগ্ন-চৈতন্য যা করে সেটাই হল শিল্প! তাঁদের মতে বুদ্ধির চালাকি বা বুদ্ধির হুকুম খাটে ঐ দশ শতাংশ সচেতন অংশে, নব্বই শতাংশ অচেতন অংশে তা খাটে না। ফলে ডাডাবাদী ও পরাবাস্তববাদীদের কাছে ঐ অংশটাকে প্রকাশ করার সাধনাই হবে তাঁদের শিল্পের সাধনা। তাঁরা আরো বললেন, এই নব্বই ভাগ মন, যা আসলে ভিতরে থাকে তা খুবই এলোমেলো। দশ শতাংশ যা দেখা যায় তা খুব সাজানো-গোছানো। মনের ঐ এলোমেলো অচেতন অংশে সারাক্ষণ নানান উথাল-পাতাল চলতে থাকে। আমাদের সমস্ত অবদমিত চিন্তা ও আঘাত ফ্রয়েডের মতে ঐ মগ্ন-চৈতন্যে গিয়ে ঘাপটি মেরে থাকে। ঐ বিশৃঙ্খল অচেতন মনটা যদি সামনে আসে তাহলে পৃথিবীটা বিশৃঙ্খলতায় ভরে যেতে পারে, ইগো এবং সুপার ইগো এই বিশৃঙ্খলতাকেই শাসন করে - ডাডাবাদীরা এটা মানেন না। তাঁদের বক্তব্য ছিল, সত্যই যদি সেটা হয় তাহলে বিশ্ব-যুদ্ধ হচ্ছে কেন, মানুষের প্রাণ যাচ্ছে কেন? কোথায় শৃঙ্খলা, কোথায় সুস্থিতি? তার মানে, সচেতন মনের শৃঙ্খলাটাই আসলে বিশৃঙ্খলা এবং যেখানে স্বপ্ন তৈরি হয় যেটা অন্ধকার কামনার কাঁচা জগত সেটাই আসলে ভালো। এটাই তাঁদের বিদ্রোহ ও বিপ্লব। অসংলগ্ন, দুর্বোধ্য ও পারম্পর্যহীন ঐ মগ্ন-চৈতন্যের জগতটা স্বৈরাচারী। এই স্বৈরাচারী জগৎটাকেই তাঁরা পছন্দ করেছিলেন।
পরাবাস্তববাদের মহারথীরা
ত্রিস্তান জারার যেরকম মত ছিল, এক মুঠো শব্দ নিয়ে যেরকম ইচ্ছে সেরকম ভাবে জুড়ে দিলে যা দাঁড়াবে সেটাই হল কবিতা! বোঝাই যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল একটা ব্যাপার এবং কোনো সচেতন মানুষই এই ব্যাপারটা মেনে নিতে পারবেন না। এত বেশি বিশৃঙ্খলতার জন্যই, এই ডাডাবাদী আন্দোলন বেশি দিন স্থায়ী হতে পারে নি। ১৯১৫ সালে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯২২ সাল নাগাদ তার সমাপ্তি ঘটে গেল। আরো ব্যাপার হল, ডাডাবাদী আন্দোলন যখন স্তিমিত হয়ে গেল, সেই সময়ই পরাবাস্তববাদী আন্দোলন শুরু হয়। পরাবাস্তববাদের বীজটি কিন্তু এই ডাডাবাদের মধ্যেই ছিল। কারণ, পরাবাস্তববাদীদের কাছেও মগ্ন-চৈতন্যের জগৎটাই প্রধান জগৎ হিসেবে থাকলো। দৃশ্যমান জগৎ ব্যতিরেকে স্বপ্ন ও কল্পনার যে জগৎ, যে জগৎটায় ভয়, ভীতি, কামনা-বাসনা বিরাজ করে পরাবাস্তববাদীরা বললেন সেটাও দৃশ্যমান জগতের মতই সত্য। কারণ কামনা-বাসনা যে জাগছে, ভয় যে পাচ্ছি সেটা তো সত্যি, তাহলে পারম্পর্যহীন ও যুক্তিহীন ঐ জগতটাও বাস্তব। সেই জগৎটাকেও আমাদের সামনে নিয়ে আসা উচিৎ। পরাবাস্তববাদীদের এইটাই ছিল প্রচেষ্টা। সাল্ভাদর দালি, পল ক্লে, ম্যাক্স আর্নেস্ট, গিওম আপলোনিয়ার, কিউবিস্ট পিয়ের রিভের্দি, লুই বুনুয়েল ইত্যাদি শিল্পীরা ছিলেন পরাবাস্তববাদী শিল্পের প্রধান পুরুষ। মোটামুটি ১৯২২ নাগাদ শুরু হয়ে এই আন্দোলন চলেছিল ১৯৫০, অর্থাৎ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পর্যন্ত।
লুই বুনুয়েল ও তাঁর ছবি সংক্রান্ত আমাদের আলোচনার পরবর্তী পর্ব সীমাবদ্ধ থাকবে তাঁর যে ছবি-গুলিতে পরাবাস্তববাদের সরাসরি প্রভাব দেখা যায় মূলত সেগুলিতে ও তৎসংলগ্ন বিষয়ে। ১৯০০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এক ধনী স্প্যানিশ পরিবারে জন্মগ্রহণ করা লুই বুনুয়েল বড় হয়ে ওঠেন কঠোর জেসুইট শিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে। ধর্মাচ্ছন্ন এক পরিবেশের মধ্যে তিনি বড় হন। কিন্তু পারিবারিক এই পরিবেশ তাঁকে প্রবলভাবে সংগঠিত ধর্মের ভণ্ডামি এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে। জীবনের বাকি সময়জুড়ে তিনি গির্জা, রাষ্ট্র এবং প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিরন্তর আক্রমণ চালিয়ে গেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে তথাকথিত ভদ্র সমাজের বাহ্যিক সৌজন্য আসলে একধরনের চাপিয়ে দেওয়া মুখোশ। এই মুখোশ মানুষের স্বাভাবিক মানবিক আকাঙ্ক্ষাগুলিকে দমন করে, যার ফলশ্রুতিতে সমাজে নানা বিকৃতি ও স্নায়বিক অসংগতির জন্ম হয়। ১৯১৭ সালে মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ে বুনুয়েলের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়। তিনি ছিলেন দর্শন-শাস্ত্রের ছাত্র। ছাত্রাবস্থাতেই কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা এবং চিত্রশিল্পী সাল্ভাদর দালির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। লোরকা ও দালির সাহচর্য তাঁর জীবনে ও সৃষ্টিতে গভীর ও স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। ১৯২৫ সালে পিতার মৃত্যুর পর বুনুয়েল প্যারিসে চলে যান। প্রখ্যাত ফরাসী চলচ্চিত্রকার জঁ এপস্টাইনের সঙ্গে সেখানে তাঁর পরিচয় ঘটে এবং অচিরেই এপস্টাইনের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। এই শিক্ষানবিশ পর্বের পর ১৯২৯ সালে সাল্ভাদর দালির সঙ্গে যৌথভাবে ১৬ মিনিটের নির্বাক ছবি ‘Un Chien Andalou’ বা ‘অ্যান্ডালুসিয়ান ডগ’ নির্মাণ করেন বুনুয়েল। এই ছবিটিই কবি আঁদ্রে ব্রেতঁর নেতৃত্বাধীন ফরাসি পরাবাস্তববাদী আন্দোলনের প্রথমসারিতে তাঁদের দাঁড় করিয়ে দেয়। পরাবাস্তববাদের মূল কথা নিয়ে আমরা ইতিমধ্যেই উপরে আলোচনা করেছি। দালি ও বুনুয়েল মিলে দালির বাড়িতে বসে মাত্র ছ-দিনে ‘অ্যান্ডালুসিয়ান ডগ’-এর চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন। ছবিটি তৈরি করতে অর্থ দেন বুনুয়েলের মা। ছবির ইমেজারি গুলির মধ্যে ফ্রয়েডের প্রভাব স্পষ্ট। ছবিটির শুরুতেই আমরা দেখতে পাই একটি নারীর চোখ ক্ষুর দিয়ে কেটে ফেলা হচ্ছে! বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী সমাজকে চমকে দেওয়া ও অপমান করার উদ্দেশ্যেই ছবিটি নির্মিত হয়েছিল। অভিনব ব্যাপার হল, এই ছবি দেখার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে আন্দাজ করতে পেরেই সম্ভবত, প্রিমিয়ারে সম্ভাব্য বিদ্রূপকারীদের দিকে ছোড়ার জন্য বুনুয়েল পকেট ভর্তি করে পাথর নিয়ে গিয়েছিলেন!
বুনুয়েল তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, “Our only rule was very simple: no idea or image that might lend itself to a rational explanation of any kind would be accepted…We had to open all doors to the irrational and keep only those images that surprised us, without trying to explain why.”। আশ্চর্যের হল, ‘অ্যান্ডালুসিয়ান ডগ’ বুর্জোয়া সমাজের কাছেও আশাতীত ভালো ভাবে গৃহীত হয়! বুনুয়েল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন যে তাঁর পরবর্তী চলচ্চিত্রটি এমন ভাবে নির্মাণ করতে হবে, যাতে সেটি যেন আর কোনোভাবেই বিরোধিতা জাগাতে ব্যর্থ না হয়। হয়ও তাই। ১৯৩০ সালে নির্মিত L’Age d’or বা ‘দ্য গোল্ডেন এজ’ শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশার চেয়েও বেশি বিতর্কের জন্ম দেয়। ছবিটি চার্চ, সামাজিক ভণ্ডামি এবং দ্বৈত নীতির বিরুদ্ধে একটা বিদ্রোহ। প্রিমিয়ারের সময় ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীগুলি প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। পর্দায় কালি নিক্ষেপ করা হয়। আসন ছিঁড়ে ফেলা হয়। প্রেক্ষাগৃহের ভেতরে বোমা ছোড়া এবং সংলগ্ন শিল্প-প্রদর্শনীতে ভাঙচুর চালিয়ে বহু মূল্যবান শিল্পকর্ম ধ্বংস করা হয়। ‘সার্বজনীন শৃঙ্খলার স্বার্থে’ পুলিশ এরপর ছবিটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ছবিটির শেষ দৃশ্যটি ব্ল্যাস্ফেমির দোষে দুষ্ট হয়, যেখানে খ্রিস্টকে দৃশ্যতই মার্কুই দ্য সাদের লেখার সঙ্গে যুক্ত করে দেখানো হয়েছিল। ভ্যাটিকান ছবিটির প্রযোজকদের ধর্মচ্যুতির হুমকি পর্যন্ত দেয়। তারপর থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ছবিটি আর জনসমক্ষে প্রদর্শিত হয়নি! বুনুয়েলের পরবর্তী প্রকল্প, ১৯৩৩ সালে নির্মিত পরাবাস্তববাদী তথ্যচিত্র ‘Las Hurdes’ বা ‘ল্যান্ড উইদাউট ব্রেড’। এক্সত্রেমাদুরা ছিল স্পেনের দরিদ্রতম অঞ্চলগুলির একটি। এক্সত্রেমাদুরার গ্রামীণ মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয় এই তথ্যচিত্রটি। স্থানীয়দের নিষ্করুণ জীবনযাপনকে উপস্থাপিত করতে গিয়ে পরিচালক এমন এক ধরনের ভয়ারিস্টিক ভঙ্গি গ্রহণ করেন, যা দর্শকদেরও দৃশ্যগুলির নীরব অংশীদার করে তোলে। এই ব্যাপারটাই দর্শকদের চরম অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। কমেন্ট্রি, সঙ্গীত ও দৃশ্যের প্রথাবিরোধী উপস্থাপনা তথ্যচিত্রটিকে বিশিষ্টতা প্রদান করেছিল। ‘ল্যান্ড উইদাউট ব্রেড’ পরপর তিনটি প্রজাতন্ত্রী সরকারের আমলে নিষিদ্ধ হয় এবং সেই নিষেধাজ্ঞা পরবর্তীতেও বহাল থাকে।
স্পেনের গৃহযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়কালের (১৯৩৪–১৯৪৬) শুরুর দিকে বুনুয়েল স্পেনের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র সংস্থা ‘ফিল্মফোনো’-তে কর্মরত ছিলেন। অতঃপর হলিউডে তাঁর একটি প্রায় নিষ্ফলা অধ্যায় কাটে এবং পরবর্তীতে নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট (MoMA)-এ শিল্পনির্দেশক জাতীয় এক ধরনের কাজে তিনি কিছুদিন নিযুক্ত থাকেন। এই সময়েই তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, বিখ্যাত কবি ও নাট্যকার ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে বাম-মনস্কতা ও সমকামিতার অভিযোগে স্পেনের গৃহযুদ্ধের প্রারম্ভেই ফায়ারিং স্কোয়াডে (জেনারেল ফ্র্যাংকোর শাসনকাল) হত্যা করা হয়! এই ঘটনা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁকে তাড়িত করে বেড়িয়েছে। নতুন সুযোগের সন্ধানে ১৯৪৬ সাল নাগাদ বুনুয়েল মেক্সিকো চলে যান। দীর্ঘ কুড়ি বছরের মেক্সিকো পর্বে নির্মিত তাঁর বিখ্যাত তিনটি ছবি হল, ‘Los olvidados’ (১৯৫০) বা ‘দা ইয়াং অ্যান্ড দা ড্যামড’, El বা ‘দিস স্ট্রেঞ্জ প্যাশন’ (১৯৫৩) এবং ‘নাজারিন’ (১৯৫৯)। ‘দা ইয়াং অ্যান্ড দা ড্যামড’ ‘কান’ চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পরিচালকের পুরষ্কার জিতে নিলেও ছবিটিতে প্রদর্শিত নৃশংসতা মেক্সিকোতে প্রভূত বিতর্ক তৈরি করে। বুনুয়েলের মেক্সিকান নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হোক এই দাবিও ওঠে। ‘দিস স্ট্রেঞ্জ প্যাশন’ একটি অদ্ভুত ছবি। এই ছবির প্রটাগনিস্টকে প্রখ্যাত দার্শনিক-মনস্তাত্ত্বিক জাঁক লাকা প্যারানোয়া, অবসেশন এবং সেই থেকে জাত পাগলামোর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। ছবিটিতে একজন স্বামীকে দেখানো হয় যিনি কোনো যথোপযুক্ত কারণ ব্যতিরেকেই তাঁর স্ত্রীকে পর-পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে ক্রমাগত সন্দেহ করে চলেন। সন্দেহ করতে করতে শেষে আশ্রয় নেন পাগলা-গারদে! ‘নাজারিন’ একটি অসামান্য ছবি। খৃষ্টের সমান্তরালে এখানে একজন পাদ্রিকে দেখানো হয় যিনি খৃষ্টীয় অনুশাসনের একজন একনিষ্ঠ পালক ও রক্ষক, কিন্তু বিনিময়ে তিনি প্রায় সর্বত্রই প্রতারিত হন।
১৯৬০ সাল নাগাদ বুনুয়েল পুনরায় স্পেনে ফিরে আসেন। মেক্সিকোর চিত্রতারকা সিল্ভিয়া পিনাল ও তাঁর প্রযোজক-স্বামী গুস্তাভ আলাত্রিস্তে সহ বেশ কয়েকজন অর্থ-লগ্নিকারীর সহযোগিতায় এই সুযোগটি তৈরি হয়। বুনুয়েল ও তাঁর সহচিত্রনাট্যকার হুলিও আলেখান্দ্রো ‘ভিরিদিয়ানা’ ছবিটির চিত্রনাট্য রচনা করেন। ভিরিদিয়ানা ‘নাজারিন’ ছবির পাদ্রির মতই ক্যাথলিক নীতিবোধে দীক্ষাপ্রাপ্ত একজন একনিষ্ঠ সন্ন্যাসিনী। কিন্তু তাঁর এই নীতিবোধে অবিচল থাকার সংকল্পের মূল প্রতিবন্ধকতা তাঁর এক লম্পট কাকা এবং ভবঘুরে, দরিদ্র ও পতিত মানুষের একটি বিচিত্র দল। ছবিটি নেক্রফিলিয়া, ধর্ষণ, পশুদের উপর নির্যাতন ইত্যাদি দৃশ্যে পরিপূর্ণ। বহুল বিখ্যাত দা ভিঞ্চির ‘দা লাস্ট সাপার’ছবির অনুরূপে ভবঘুরে পতিত মানুষদের নিয়ে দৃশ্য নির্মাণ, সেই সময় দর্শকদের মধ্যে প্রভূত বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। ‘কান’ চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ছবির পুরষ্কার পাওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই ছবিটি ভ্যাটিকানের ক্ষোভের মুখে পড়ে। ভ্যাটিকান ছবিটিকে শুধু ক্যাথলিক ধর্ম নয়, সমগ্র খৃষ্টধর্মকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে নির্মিত একটি প্রচেষ্টা বলে দেগে দেয়। ‘দ্য গোল্ডেন এজ’-র মতোই ‘ভিরিদিয়ানা’–র দুর্নাম বুনুয়েলকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে এবং অভিনেতা ফের্নান্দো রে–র সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ সহযোগিতার সূত্রপাত ঘটায়। এই ফের্নান্দো রে কে বুনুয়েলের অল্টার-ইগো হিসেবে ভাবা হয়। ‘দা এক্সটারমিনেটিং অ্যাঞ্জেল’ (১৯৬২) ও ‘সাইমন অফ দা ডেজার্ট’(১৯৬৫)-র সঙ্গে ‘ভিরিদিয়ানা’-কে জুড়ে দিয়ে এই তিনটি ছবিকে একত্রে পরবর্তীকালে বলা হয় ‘বুনুয়েলিয়ান ট্রিলজি’।
১৯৬৭ সালে নির্মিত বিখ্যাত ছবি ‘বেল দা জুর’-এ বুনুয়েল আবার ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় পরাবাস্তববাদের চৌহুদ্দিতে। ছবিটি জোসেফ কেসেলের একটি উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। ক্যাথরিন দেন্যুভ অভিনীত সেভেরিন মাদ্রিদের একজন ধনী গৃহবধূ, কিন্তু তাঁর দাম্পত্য জীবন যৌনতা-শূন্য! ছবিটির শুরুতে একটি দৃশ্য আছে যেখানে দেখানো হয় সেভেরিন তাঁর স্বামীর সঙ্গে ঘোড়ার গাড়িতে করে আসছেন। ছবির শেষ দৃশ্যে ঐ ঘোড়ার গাড়িটিকেই আবার দেখানো হয়, সেভেরিনের প্রাসাদের ব্যালকনি থেকে দেখা যায় গাড়িটি চলে গেল কিন্তু তাতে এখন আর কেউ বসে নেই। বস্তুত, সেভেরিন তাঁর সুপ্ত যৌন-সত্তাকে জাগিয়ে তোলার জন্য সাময়িকভাবে পতিতাবৃত্তির পথ ধরেন। খদ্দের গ্যাং-স্টার মার্সেল সেভেরিনের কিছু গোপন কল্পনাকে (ফ্রয়েডীয় মগ্ন-চৈতন্য জাত) বাস্তব রূপ দিতে সাহায্য করলেও শেষ পর্যন্ত সেভেরিনের যত্নে গড়ে তোলা সামাজিক মুখোশ এতে করে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। শুরুর পূর্ণ ও শেষের শূন্য ঘোড়ার গাড়ি, আগত যৌন-ইচ্ছের পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা ও শেষে সেই সম্ভাবনার প্রয়োজন মিটে যাওয়ার প্রতীকে দৃশ্যায়িত কিনা সেই প্রশ্ন ওঠে। বিষয়-নির্মাণশৈলীর ভারসাম্যে এই ছবিটি বুনুয়েলের অন্যতম সেরা ছবি এবং বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে সফল ছবি। ১৯৭২ সালে নির্মিত ‘দা ডিস্ক্রিট চার্ম অফ বুর্জোয়া’ যারা দেখেছেন তাঁরা জানবেন ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ইন্সেপশান’ (২০১০)-এর ‘স্বপ্নের ভিতর স্বপ্নের ভিতর স্বপ্ন’ নতুন কিছু নয়। ‘দা ডিস্ক্রিট চার্ম অফ বুর্জোয়া’ ধনী ও অভিজাত কয়েকজন বন্ধুর গল্প। বারবার একসঙ্গে বসে খাওয়ার চেষ্টা করেও প্রতিবারই তাঁরা কোনো না কোনো বাধার মুখে পড়েন। জনসমক্ষে অপমানিত হওয়া কিংবা কর্তৃপক্ষের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া – মানুষের আদি অকৃত্রিম ভয় গুলির মধ্যে পড়ে। এই ছবিটিতে এর সঙ্গে বুনুয়েল যুক্ত করেছিলেন ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কাকেও। একটি চরিত্রের স্বপ্নের দৃশ্য পরে আরেকটি চরিত্রের স্বপ্নের ভেতরে ঢুকে পড়ে, এই ভাবে স্বপ্নের ভিতর স্বপ্নের ভিতর স্বপ্নের এক পরম্পরা তৈরি হয়। আমরা ক্রমেই বুঝতে পারি, বুনুয়েল কেবল তাঁর চরিত্রদের নিয়েই খেলছেন না, আখ্যানের অর্থ ধরতে গিয়ে দর্শকদের সঙ্গেও তিনি সচেতনভাবে এক অভিনব খেলা খেলছেন। ছবিটি সেরা বিদেশি ভাষার ছবির অ্যাকাডেমি পুরষ্কার জিতে নেয়। এই ছবিটির সাফল্য বুনুয়েলকে অনুপ্রাণিত করে পরবর্তী ও ব্যক্তিগত ভাবে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছবি ‘দা ফ্যান্টম অফ লিবার্টি’ (১৯৭৪) নির্মাণ করতে।
বুনুয়েল ও তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু ও সহচিত্রনাট্যকার জাঁ ক্লোদ কারিয়ের প্রতিদিন সকালে একে অপরকে নিজেদের দেখা স্বপ্ন বর্ণনা করে শোনাতেন। তা থেকেই এই ছবির চিত্রনাট্য রচিত হয়েছিল। ‘দা ফ্যান্টম অব লিবার্টি’দেখা এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ছবিটি দেখলে মনে হয় দর্শক হিসেবে আমরা অদ্ভুত, অস্বস্তিকর এক স্বপ্নের অর্থ খুঁজে বের করার চেষ্টা করে চলেছি, যে স্বপ্নটি খুব শীঘ্রই অবচেতন মনের ঘোলাটে অঞ্চলে অন্তর্হিত হবে! ছবিটি ধর্ষ-মর্ষ কাম, ফেটিশিজম, শিশুদের উপর যৌন নিপীড়ন ও গণহত্যার মতো স্পর্শ-কাতর বিষয়গুলিকে সামনে নিয়ে আসে। সন্ত্রাসবাদী ও গণহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক অবস্থান ও এই সবকিছুর নির্মম উপস্থাপনায় ছবিটির অন্দর থেকে বেরিয়ে আসে এক অশুভ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। ছবিটি যেন বলতে চায়, মানুষের নির্বুদ্ধিতা ও স্বার্থপর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, যা প্রকারান্তরে আত্মঘাতী, তা প্রকৃতির অপরূপ আবাসভূমিকে ক্রমাগত কলুষিত করে চলেছে এবং এর ফলে পৃথিবীর ধ্বংস আসন্ন! বুনুয়েলের অন্তিম ছবি পিয়ের লুইসের ১৮৯৮ সালের উপন্যাস ‘লা ফাম এ ল্য পাঁতাঁ’ বা ‘দা ওম্যান অ্যান্ড দ্য পাপেট’ অবলম্বনে নির্মিত ‘দ্যাট অবস্কিউর অবজেক্ট অব ডিজায়ার’ (১৯৭৭)। স্পেন ও ফ্রান্সে সন্ত্রাসবাদী বিদ্রোহের পটভূমিতে স্থাপিত এই ছবিটি অগ্রসর হয় এক ফরাসী বৃদ্ধ মাতিয়ুর স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ, ফ্ল্যাশব্যাকের ধারায়। এই বৃদ্ধ মাতিয়ুরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ফের্নান্দো রে। উনিশ বছর বয়সী লাস্যময়ী ফ্লামেঙ্কো নৃত্যশিল্পী কনচিতা মাতিয়ুরের অতীত অবসেশন। কনচিতার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন দুজন অভিনেত্রী! কারোল বুকে ও আংহেলা মোলিনা। এদের সত্তা একেবারেই ভিন্ন। কনচিতা ক্রমাগত একধরনের কামুক খেলায় মাতিয়ুরকে উত্তেজিত করতে থাকে। কিন্তু কিছুতেই মাতিয়ুরের কামনা চরিতার্থ করতে দেয় না। এই মরীচিকাকে বুনুয়েল অবস্কিউর অবজেক্ট বলেছেন। অনুমান করা যায় জীবনের অন্তিম ছবিতে এসে পরাবাস্তবতার হাত ধরে বুনুয়েল যেন একধরনের স্বীকোরক্তির পথে হাঁটতে চেয়েছিলেন। জীবনের তথাকথিত বড় ভাবনাগুলির সঙ্গে নিজের মনের অনালোকিত কোণের উদ্বেগ ও অন্ধকারগুলিকে সমান গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা ও বিচার করার জায়গাটি বুনুয়েলকে অনন্য করে রেখেছে।
. | ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:৪৬738742
বিশ্বজিৎ রায় | 139.5.***.*** | ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:০০738743
রোহন | 223.223.***.*** | ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:২৪738795
হীরেন সিংহরায় | ০১ মার্চ ২০২৬ ২৩:৪৩738911
সুমিত্রা | 2409:40e0:8:30c1:8000::***:*** | ১৯ মার্চ ২০২৬ ১৮:৩৪739249
হীরেন সিংহরায় | ২০ মার্চ ২০২৬ ০৪:১৫739266
চলচ্চিত্রের নাম | 47.39.***.*** | ২১ মার্চ ২০২৬ ০৫:১৫739320
হীরেন সিংহরায় | ২১ মার্চ ২০২৬ ১০:৪৪739324