আমার বাবার মেটামরফোসিস
বাবা অনেকদিন সিনিয়র সিটিজেনের লক্ষ্মণরেখা পেরিয়ে গেছেন।
ব্যাংকের চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর কিছুদিন মাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। দেশের এ’মাথা থেকে ও’মাথা।
না না, চার ধাম অথবা গয়া-গঙ্গা-প্রভাস-কাশী-কাঞ্চী নয়।
পাহাড়ে চড়তে, সমুদ্রে নাইতে, নদীতে নৌকো বাইতে কী উৎসাহ! যেন এককুড়ি বয়েস কমে গেছে।
রাজস্থানে বেড়াতে গিয়ে উটে চড়লেন, মাকেও চড়াতে চাইলেন। মা রাজি হন নি।
উটের ওই সামনে পেছনে গা মোড়ামুড়ি দিয়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ানো মায়ের যা তা লেগেছিল।
আমার বাবা ছিলেন নাস্তিক। শুধু নাস্তিক বললে ঠিক বোঝানো যাবে না। উনি ঈশ্বরের বিষয়ে উদাসীন।
আসলে অতিপ্রাকৃত কোন কিছুতে বিশ্বাস করতেন না। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বাইরে আরেকটা দুনিয়া থাকতেও পারে — এটা উনি মানতেন না।
যা দেখা যায় না, শোনা যায় না, ছোঁয়া যায় না — তার অস্তিত্ব উনি মানতে নারাজ। অল্পবয়সে কত তর্ক করেছি।
-- আচ্ছা বাবা, হাওয়াকে কি দেখা যায়? না ছোঁয়া যায়? ঝড়ের সময় শোঁ শোঁ শোনা যায় বটে, কিন্তু অন্য সময়?
বাবা মুচকি হাসতেন।
ভাবলাম জিতে গেছি।
বুক ফুলিয়ে বলি — তাহলে? হাওয়া আছে কি নেই? আচ্ছা, নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসকেও মানতে চাও না?
বাপ্পা বরাবরই একটু বেশি প্রশ্রয় পেয়ে এসেছে। ও গম্ভীর মুখে শেক্সপিয়রের ডায়লগ ঝাড়ে --
There are more things in heaven and earth, Horatio, than are dreamt of in your philosophy.
বাবা হা হা করে হেসে উঠলেন। আমরা অবাক।
উনি চোখের থেকে চশমা নামিয়ে তার কাঁচের উপর নিঃশ্বাস ছাড়লেন। কাঁচ ঝাপসা হয়ে গেল। ওনার মুখের হাসিতে কি সামান্য ব্যঙ্গের ভাব?
এবার উনি বেড়াতে যাবার রবারের বালিশটার ক্যাপ খুলে চাপ দিয়ে হাওয়া বের করে দিলেন। বেশ শব্দ হোল।
তারপর ওই চুপসে যাওয়া বালিশটাকে ফুঁ দিয়ে ফোলাতে লাগলেন যতক্ষণ না পুরোটা ফুলে যায়।
-- বেশ, এবার হাওয়ার অস্তিত্ব দেখতে শুনতে এবং ছুঁতে পেলে?
কী বিচ্ছিরি লাগল, যেন কেউ লুডো খেলায় পাকা ঘুঁটি হঠাৎ মেরে দিয়েছে।
কিন্তু সেসব অনেক পুরনো কথা। এখন বাবা অনেক বদলে গেছে। সেই মায়ের হঠাৎ চলে যাওয়ার পর থেকে।
বাপ্পা এখন স্টেটসের নাগরিক। ও সি আই কার্ড আছে বটে, কিন্তু খুব ব্যস্ত। কালেভদ্রে আসে। ফ্যামিলি গ্রুপে ওর বৌ বাচ্চার ছবি পাঠায়।
রইলাম আমি। থাকি ইওরোপে, কিন্তু প্রতি বছর ক্রিসমাসের সময় নিয়ম করে কোলকাতায় এসে দিন পনেরো থাকি।
বাবাকে সঙ্গ দিই। মানুষটা বড় একা হয়ে গেছে।
এক হিসেবে আমিও একা। বিয়ে করি নি। ক্যারিয়ার গোছাতে ব্যস্ত ছিলাম। এখন আর অভ্যস্ত জীবনের গণ্ডী পেরোতে ইচ্ছে করে না।
বাবা কিছু করে না।
নিউ টাউনের ফাঁকা এলাকায় দুই দশক আগে তৈরি একতলা বাড়িটা থেকে নড়তে চায় না।
বাড়িতে রয়েছে সহদেব, বাবার ম্যান ফ্রাইডে। জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ সবই করে।
পেনশনের টাকায় বাঁধা গতে জীবন চলে।
শীতের সময় বাবা সামনের বাগানে রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে বসে থাকে। চা খায়, খবরের কাগজ পড়ে। বই পড়ে। পুরনো হলদে হয়ে যাওয়া বই।
কখনও এভাবেই আরাম কেদারায় ঘুমিয়ে পড়ে। সহদেব দ্বিতীয়বার চা নিয়ে এলে জেগে ওঠে। টিভি দেখে পুরনো অভ্যাসে।
খবর শেষ হয়ে বিজ্ঞাপন চলছে, বাবা চ্যানেল বদলায় না। খেলা দেখে। শেষ হয়ে গেলে বোদ্ধাদের হিলিবিলি কথাবার্তা চলে।
বাবা বন্ধ করে না। যেন অন্য কোন দুনিয়ায় আছে সারাদিন।
মানুষটা একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। মায়ের দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর থেকে পরিবর্তনটা দ্রুত চোখে পড়ছে।
হ্যাঁ, বয়সের ছাপ বহিরঙ্গে তো পড়বেই। মাথাজোড়া টাক, চোখের পাশের চামড়ায় আঁকিবুকি কাটাকুটি। শিরাওঠা হাত-পায়ে চিমড়ে ভাব। জামাকাপড় ঢলঢলে।
চাউনিতে কেমন ছন্নছাড়া ভাব। ভেতরে ভেতরেও বদলে গেছে কি?
আমি বাবাকে চাঙ্গা করতে বলি — চল চমৎকার ফ্লাওয়ার শো আছে, বেশি দূরে না, নিউ টাউনেই।
চল নান্দীকারের নতুন নাটক দেখে আসি।
বাবা হাসে, হ্যাঁ না কিছুই বলে না। বুঝতে পারি, যাবে না।
হাসাতে চেষ্টা করি। বাবার প্রিয় লেখক পরশুরাম থেকে কোট করিঃ
ভূত ইকোয়াল টু? বাবা যন্ত্রের মত উত্তর দেয় — জিরো!
ভগবান ইকোয়াল টু? স্কোয়ার রুট অফ জিরো
বাবা যেন হঠাৎ জেগে উঠল। কিন্তু খুকু, প্রায় সাড়ে চারশ’ বছর আগে শেক্সপিয়র কী যেন বলেছিলেন? বাপ্পা খুব শোনাত?
-- হ্যাঁ, ওহে হোরেশিও, তোমার জানার বাইরেও একটা জগত আছে। হঠাৎ এই কথা?
-- না, কিছুদিন ধরে ভাবছি। যদি সত্যিই একটা অজানা জগত থেকে থাকে? তাকে না জেনে চলে যাব?
-- বালাই ষাট! এখনই চলে যাবার কথা ভাবছ কেন?
-- না, তোর মা একটা গান খুব গুনগুন করত, মান্না দে’র গান। “ও দুনিয়া মোর বাবুলকে ঘর, এ দুনিয়া শ্বশুরাল”!
আর কী জানিস খুকু, হাসপাতালে অজ্ঞান অবস্থাতেও ওই দুটো লাইন বিড়বিড় করত।
হয়ত ওই অজানা দুনিয়ার ডাক এসেছিল। সাড়া দিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেল।
-- এসব কথা থাক। আমার ছুটি ফুরিয়ে এসেছে। পরশুদিন প্লেনে চড়ছি। তোমাকে ছাড়তে যেতে হবে না। সহদেব গাড়ি চালিয়ে দমদম ছেড়ে আসবে।
বাবা চমকে উঠল। এত তাড়াতাড়ি! আর ক’টা দিন থাকলে হত না?
আমার বুকে ধাক্কা লাগল। আগে কখনও এরকম বলে নি? তবে কি বাবার কাছেও রাজার নেমন্তন্নের চিঠি এসেছে?
মনে মনে কিছু যোগবিয়োগ করে বলি – আচ্ছা, দশটা দিন, তার বেশি নয়। কিন্তু আমারও একটা শর্ত আছে। তোমাকে রোজ বাগানে বসে চায়ের টেবিলে একটা করে গল্প শোনাতে হবে।
-- গল্প শোনাব? কীসের গল্প? আমার জীবন তো সাদামাটা। সেই “মুখস্থে প্রথম কভু হইনি কেলাসে, কবিতা লিখিনি কভু সাধু আদিরসে” টাইপ।
আমি হেসে ফেলি। এ তো সেই ভিন্টাজ বাবা, অন্ততঃ তার খানিক টাচ্!
-- না না, তুমি শোনাবে ছত্তিশগড়ে চাকরি সূত্রে বনেজঙ্গলে ঘোরাঘুরি করে কিছু অদ্ভূত ঘটনার, যাতে অন্য এক অজানা জগতের সন্ধান পাওয়া যায়।
তোমার বা চেনা জানা কারও হাতে গরম অভিজ্ঞতার গল্প। যদি রাজি হও আমি আমার টিকিট এক্সটেন্ড করে নিচ্ছি। অন্ততঃ দশটা গল্প।
টেপ রেকর্ডার চালু ছিল। আমস্টার্ডাম ফিরে গিয়ে সেগুলো লিপিবদ্ধ করলাম।
উত্তম পুরুষের বয়ান, সামান্য নুন ছিটিয়েছি। নইলে আপনাদের আলুনি লাগতে পারে।
১ শ্বেতবসনা শুভ্রকেশী
কয়েক দশক আগের কথা।
আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা পেরিয়ে মধ্য ভারতের এক গ্রামীণ ব্যাংকে যোগ দিয়েছি। তখন কাজ শেখার সময়। ভাল করে রগড়ানি হচ্ছে।
প্রথম পোস্টিং হোল রায়গড় নামের জেলা সদরে। ছোট্ট শহর, চারপাশে ঘন জঙ্গল, ছোটনাগপুর অঞ্চলের শেষ সীমা বলা যায়।
ভেবেচিন্তে একটা দু’কামরার ঘরভাড়া নিলাম, সঙ্গে আমার ব্যাংকেরই এক সহকর্মী।
সে ও সদ্য চাকরিতে ঢুকেছে এবং অবিবাহিত জীবনের আনন্দ চাখছে, যাকে বলে ফুল মস্তি!
বাড়িটি বেশ বড়, দোতলা। লাগোয়া চমৎকার বাগান।
বাড়িওলা ধীরাজ সিং নীচের তলায় থাকে। বৌ এবং বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে ছোট্ট সংসার। আমাদের থেকে বছর দশ বড় মানুষটি বেশ অমায়িক ও মিশুকে।
দোতলায় কিছু অংশে তালা দেয়া। তবে আমাদের ভাগে দুটো কামরা এবং বেশ বড়সড় খোলা ছাদ।
ভাড়াটা আমাদের পকেটের হিসেবে বেশি নয়। নতুন ভাড়াবাড়িতে উঠে এলাম আমরা দুজন — রণবীর ও বিজন, মানে আমি।
মে মাসের মাঝামাঝি। প্রচন্ড গরম। সারাদিন গরম বাতাস — স্থানীয় ভাষায় ‘লু’-- বইতে থাকে। একেবারে আগুনের হলকা।
নতুন চাকরি, এসি বা কুলার কেনার প্রশ্ন নেই। সিলিং ফ্যানের হাওয়া বন্ধ ঘরকে ফার্নেস বানিয়ে দেয়।
রাতের খাওয়ার পাট চুকলে বিছানা গুটিয়ে খোলা ছাতে নিয়ে গিয়ে পেতে ফেলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে হল।
ছাতটা বেশ পরিষ্কার এবং নিয়মিত ঝাঁট পড়ে। পাঁচিল ঘেঁষে একটা চিলেকোঠা, তাতে শেকল লাগিয়ে তালা দেয়া।
আমরা দুটো মাদুর আর বালিশ বগলদাবা করে ছাতে উঠলাম।
কৃষ্ণপক্ষের নিকষকালো রাত। তারায় ভরা আকাশ। লু বন্ধ হয়েছে। এখন যে মৃদুমন্দ মলয়সমীর বইছে তাতে প্রাণ জুড়িয়ে গেল।
আমরা পাশাপাশি মাদুরে শুয়ে গল্প করছি।
অফিসের গসিপ, মেয়ে সহকর্মীদের নিয়ে টক-ঝাল-নোনতা মন্তব্যের পর নিজেদের পারিবারিক গল্প শুরু হল।
খানিকক্ষণ কাটল, ঘড়ি দেখিনি কিন্তু দুজনেই গুড নাইট বলে গায়ে একটা হালকা চাদর টেনে নিয়ে পাশ ফিরে শুলাম।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না।
রণবীরের হাতের ঠেলায় ঘুমটা ভেঙে গেল। ওর চাপা আতংকে মেশা স্বরঃ
ওটা কী! ওটা কী! দ্যাখ বিজন, ওটা নড়ছে।
এক ঝটকায় উঠে বসেছি। গাঢ় অন্ধকার। কাছাকাছি কোন বাড়ি থেকে আলোর ছিঁটেফোঁটাও আসছে না। তবু তারার আলোয় একরকম দেখা যাচ্ছে।
চোখ কচলাতে কচলাতে দেখতে পেলাম — হ্যাঁ, কেউ একজন আমাদের ছাদের পাঁচিল বেয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
ক্রমশঃ ছায়ামূর্তির অবয়ব স্পষ্ট হল। মাথাভর্তি ধবধবে সাদাচুলের এক নারী। পরনে সাদা খোলের থান।
ও পাঁচিল বেয়ে উঠে ছাদে নেমে পড়েছে। এখন আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে।
ভয়ে গলা শুকিয়ে গেছে। প্রাণপণে মনে সাহস এনে বললাম — কে? কে তুমি?
উত্তর নেই।
ছায়াশরীর কয়েক মুহুর্ত আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল। সেই মুখে অনন্ত বিষাদ ছেয়ে আছে।
তারপর সে আমাদের উপস্থিতিকে অগ্রাহ্য করে চিলেকোঠার দিকে এগিয়ে গেল।
আমরা বোধশক্তিহীন। যা দেখলাম তার কোন মাথামুণ্ডু নেই। ও এল কোত্থেকে! পাশের বাড়ির ছাদের সঙ্গে আমাদের ছাদের ফারাক প্রায় দশফুট।
কিন্তু মহিলাটি অনায়াসে ছাদের পাঁচিল বেয়ে উঠল যে! দোতলার ছাদে ওঠা? কোন মইয়ের সাহায্য ছাড়া?
কোন অশরীরী! নাঃ যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না।
আমি তো আজকালকার বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদী -- যে দেহের অতীত কোন আত্মার অস্তিত্ব মানে না। ভূত ও ভগবান নিয়ে মাথা ঘামায় না।
কিন্তু নিজের চোখে যা দেখছি তাকে অবিশ্বাস ! আর আমি একা নই, রণবীরও দেখছে। কাজেই চোখের ভুল বলে উড়িয়ে দেব কী করে ?
এখন সেই ছায়াশরীর চিলেকোঠার দেয়াল বেয়ে ছাদে উঠছে।
রণবীর পাক্কা জাঠ, একটা খিস্তি করে সোজা চিলেকোঠার দিকে ধাওয়া করেছে। আমি হাঁচোড় পাঁচোড় করে দৌড়ে গিয়ে ওকে প্রাণপণে জাপটে ধরি।
-- শোন ভাই, গোঁয়ার্তুমি করিস নে। চিলেকোঠার ছাদের ওপারে কিছু নেই, মহাশূন্য। সোজা দোতলা থেকে ফুটপাত্থে আছড়ে পড়া।
ইতিমধ্যে সেই নারী চিলেকোঠার ছাদে উঠে কোথাও গায়েব হয়ে গেছে। এক ঘন্টা কেটে গেল। আমাদের চোখে ঘুম নেই।
হঠাৎ একটা আর্ত চিৎকার, ছোট বাচ্চার কান্নার আওয়াজ। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না, আবার চিৎকারে ফেটে পড়ছে।
শব্দটা আসছে নীচের তলা থেকে।
কেউ বোধহয় ও বাড়িতে অসুস্থ, ধীরাজ সিংয়ের ছোট বাচ্চাটি কি? গিয়ে দেখব?
নাঃ, এত রাতে গিয়ে দরজায় কড়ানাড়া ঠিক হবে না। তাছাড়া বাচ্চাটার বাবা-মা তো রয়েছেই।
কান্নাটা হঠাৎ থেমে গেল, বোধহয় আধঘন্টা পরে। আমরাও মানসিক ভাবে শ্রান্ত; ঘুমে ঢলে পড়লাম।
সকাল হল। ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হয়েছে। কাজেই আমরা দু’জন চটপট স্নান সেরে চা ও পাঁউরুটি চিবিয়ে সোজা ব্যাংকে হাজির, একেবারে ঠিক সময়ে ।
প্রোবেশনে আছি যে! রেকর্ড ঠিক রাখতে হবে।
সন্ধ্যেবেলা গেলাম বাড়িওলার ঘরে। এক কাপ চায়ের সঙ্গে কিছু খেজুরে কথাবার্তা। তারপর আমরা কাল মাঝরাতে বাচ্চার কান্নার কথাটা তুললাম।
ধীরাজ সিং চমকে উঠলেন। একটু যেন লজ্জা পেলেন। শেষে স্বীকার করলেন যে কান্নার আওয়াজ ওনার শোবার ঘর থেকেই আসছিল।
বললেন বাচ্চাটার জন্ম থেকেই কিছু স্নায়ুঘটিত সমস্যা আছে। বড় নিউরো সার্জন দেখছেন। বলেছেন – জেনেটিক গণ্ডগোল, সময় লাগবে।
ওর অ্যাটাক রাত্তিরে আসে। তখন একটা মাইল্ড সেডেটিভ দিয়ে ঘুম পাড়াতে হয়। চিন্তার কিছু নেই। আপনারা একটু ক্ষমাঘেন্না করে নেবেন।
পরের রাতটা।
আমরা তাড়াহুড়ো করে খাওয়াদাওয়া সেরে ছাতে গিয়ে বিছানা পেতে জেগে আছি। যদি সেই শ্বেতকেশী শ্বেতবসনাকে আবার দেখা যায়!
ছায়াশরীর হোক নারী তো বটে। কিন্তু অপেক্ষাই সার। রাত দেড়টা বেজে গেছে।
সন্দেহ হল — সত্যিই গত রাতে কিছু দেখেছিলাম কি? নাকি মনের ভুল? অথবা হ্যালুসিনেশন? বিদেশ বিভুঁইয়ে কত কী ঘটতে পারে।
তবে একটা কথাঃ দুটো মানুষ একই জায়গায় একই সময়ে একই জিনিস দেখল, সেটাকে কি চোখের বিভ্রম বলে উড়িয়ে দেয়া যায়?
ঝিমুনি এসে গেল। গতরাতে ঠিকমত ঘুম না হবার ফল। শেষে আমরা ধুস্ শালা বলে একে অপরকে গুড নাইট করে গায়ে চাদর টেনে নিলাম।
আর তক্ষুণি ব্যাপারটা ঘটল। যেন একটা সিনেমা দ্বিতীয়বার দেখছি।
এবার আমিই প্রথমে দেখতে পেলাম। সাদা কাপড়ে ঢাকা এক নারীর ছায়াশরীর পাঁচিল বেয়ে উঠল, চিলেকোঠার দিকে এগিয়ে গেল—তারপর ভ্যানিশ!
না, আমাদের ধাওয়া করার সাহস হয় নি, আমরা পাথর।
পরের দিন রোববার।
সকালে বাজার যাওয়ার সময় দেখলাম পাশের বাড়ির দেয়ালে ছাদের কাছে লেখা — ‘মুখার্জি ভিলা’। বাঙালি!
রণবীর বলল—চল, আলাপ করে আসি-- পড়শি বলে কথা। আর বাঙালিদের বাড়ির ফ্লেভার চা! যদি কপাল ভাল থাকে।
আমি ভাবলাম পরিচয় হলে ধীরে ধীরে এই বাড়িটির অপ্রাকৃত ব্যাপার স্যাপার নিয়ে একটু কথা বলা যাবে।
চাই কি, অন্য পাড়ায় একটা ভাল বাড়ির খোঁজও পেতে পারি।
কিন্তু গেট খুলে ঢুকতে গিয়ে বাধা পড়ল, একটা তালা ঝুলছে। তবে বাগানটা একটু অগোছালো হলেও সাফসুতরো, মানে মুখুজ্জে পরিবার এখানে বাস করেন।
হয়ত কোন কাজে বাইরে গেছেন। বাজারে গিয়ে দেখি গুলমোহর বলে একটা সিনেমা হল। পোস্টার দেখে মনে হোল রেখার “উমরাও জান” চলছে। আরিব্বাস্!
নাইট শো যাব, নাকি ইভনিং শো? ভিড় নেই, টিকিট পাওয়া যাচ্ছে। নতুন শহর, রাস্তাঘাট ভাল চিনি নে। ইভনিং শো গেলেই ভাল।
মে মাসের গরম। ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটা হলেও সূর্য ডোবে নি। খানিকটা হেঁটে বড় রাস্তা থেকে সাইকেল রিকশা নেব। কিন্তু পাশের মুখুজ্জে বাড়ির ভদ্রলোক যে গেটে দাঁড়িয়ে। চোখে চোখ পড়তেই হাসিমুখে হাত নেড়ে ডাকলেন।
-- আপনারাই ধীরাজ সিংয়ের নতুন ভাড়াটে? আসুন, একটু মেল-মিলাপ হয়ে যাক।
আমরা ইতস্ততঃ করি, বলি আরেক দিন। কিন্তু ওনার গলায় বেশ কর্তৃত্বের সুর।
-- আরে সিনেমা হল তো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। আগামী সপ্তাহে নতুন সিনেমা আসবে, তখন যাবেন’খন। আসুন, একটু চা খেয়ে যান।
কিন্তু আমরা কোথায় যাচ্ছি উনি জানলেন কী করে?
উনি যেন আমার চিন্তাটা ধরে ফেলেছেন।
-- দুই ইয়ং ব্যাচেলর, শহরে নতুন, রোববারের বিকেলে গুটিগুটি আর কোথায় যেতে পারে?বাজার টাজার তো সকালে হয়ে গেছে।
অবাক হবেন না, আমি কোন ম্যাজিক জানি না। যখন আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন আমি তখন ছাদে ফুলের টবে জল দিচ্ছিলাম।
তখনই আপনাদের থলে হাতে যেতে দেখেছি।
-- কিন্তু গেটে তালা?
-- আজ রোববারের দিন একটু আলসেমি, আর আজ নৌকরাণীর ছুটি।
বুঝলাম, এঁদের এখনও 'কাজের মাসি' বলা অভ্যেস হয় নি।
আড্ডা জমে উঠল, সঙ্গে ফ্লেভার চা এবং পাঁপড় ভাজা। মিসেস মুখার্জিও হাসিমুখে যোগ দিয়েছেন। তবে কথাবার্তা সবই হিন্দিতে চলছিল।
ওঁরা জানতে চাইলেন এই গরমে শরীর ঠিক আছে কিনা, সারাদিনে যথেষ্ট জল খাচ্ছি কিনা; আর বললেন কোন অসুবিধা হলে নিঃসংকোচে ওঁদের দরজায় কড়া নাড়তে।
না, বাড়িতে কলিংবেল নেই।
একথা সেকথার পর মাঝারাতে বাচ্চাটার অস্বাভাবিক কান্না এবং ছোট্ট শিশুটির জেনেটিক নিউরো প্রবলেমের কথা তুললাম।
আশ্চর্য! ওঁদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। মুখুজ্জে মশায়ের মুখে একটা কালো ছায়ার পর্দা নেমে এল।
উনি জবাব না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করলেন — বাচ্চার কান্না ছাড়া আর কোন অস্বাভাবিক কিছু? মানে রাত্তিরে শোয়ার সময়?
খানিকক্ষণ ইতস্ততঃ করে একটু একটু করে সব বলে ফেলি, যেন পাদ্রীবাবার কাছে পাপ স্বীকার করে হালকা হচ্ছি।
উনি গম্ভীর মুখ করে সবটা শুনলেন। বৌদি হঠাৎ এঁটো বাসনকোসন তুলে রান্নাঘরে কিছু পুড়ে যাচ্ছে বলে তড়িঘড়ি কেটে পড়লেন।
-- বলতে খারাপ লাগছে, আপনাদের এই বাড়িটা ছেড়ে দেয়া উচিত। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
সেকী! ফের বাড়ি খোঁজার হাঙ্গামা? এই গরমের মধ্যে অজানা শহরে! কিন্তু কেন?
রণবীর প্রতিবাদ করে।
-- কী বলছেন? মাত্র ভাড়া নিয়েছি, সাতদিনও হয় নি। এখন ছেড়ে দিলে একমাসের অ্যাডভান্স ডুবে যাবে।
তাছাড়া ধীরাজ সিং আমাদের কী ভাববেন? চ্যাংড়া ফালতু ছোকরার দল?
-- ধীরাজের কথা ছাড়ুন; ও এসব কিছুই ভাববে না। ওর বাড়িতে অস্বাভাবিক যা যা ঘটে সব ওর জানা।
তার মানে? এসবের মাথামুন্ডূ কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না।
মুখার্জি সিগ্রেট ধরালেন। অন্যমনস্ক ভাবে রিং ছাড়তে লাগলেন — একের পর এক। যেন অন্য কোন ভাবনায় ডুবে গেছেন।
তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে শোনালেন এক আশ্চর্য কাহিনী।
“চলুন, ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে দিই। কম-সে-কম এক দশক আগে।
ধীরাজ সিং এর বড়সড় দোতলা বাড়িটা তখন একটা সাধারণ একতলা, তাতে ধীরাজ তার বৌকে নিয়ে থাকত।
ঠিক গায়ে লাগা একটুকরো জমিতে একটা খাপরার চালাঘরে এক গরীব বিধবা তার বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে থাকত।
বাচ্চাটা স্বাভাবিক ছিল না, ও ছিল অটিজমের শিকার। অটিজম বোঝেন তো?
ছেলেটা স্কুলের পড়া পুরো হওয়ার আগে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হোল। বিধবার সংসার কায়ক্লেশে চলত।
একদিন ধীরাজ মহিলাটির ঘরে গিয়ে একটা প্রস্তাব দিল।
বিধবা মহিলা যদি ওই জমিটুকু ধীরাজকে লিখাপড়ি করে দেয়, তাহলে ও সারাজীবন মা ও ছেলের ভরণপোষণের ভার নেবে।
মহিলাটি আমায় জিজ্ঞেস করল। আমার মনে হোল এ তো উত্তম প্রস্তাব। আইনি লেখাপড়া হল, তাতে আমি ছিলাম অন্যতম সাক্ষী।
ধীরাজ তার কথা রেখেছিল, অন্ততঃ প্রথম কয় বছর। এখন যে দোতলা বড় বাড়িটা দেখছেন সেটা দুজনের জমি মিলিয়ে নিয়ে তার উপর দাঁড়িয়ে।
মা ও ছেলেকে দোতলার যে অংশে আপনারা ভাড়ায় আছেন, সেখানে থাকতে দেয়া হোল।
ওদের খাওয়াদাওয়া জামাকাপড় সব ধীরাজ জোগাতো, ভাল ব্যবহার করত। মহিলাটি সুখী হয়েছিলেন।
এদিকে ধীরাজের ব্যবসা ভালই চলছিল। ওদের একটি মেয়ে হল। ধীরাজের বিশ্বাস – মালক্ষ্মীর কৃপায় সব হচ্ছে।
বাচ্চার দেখাশোনার ভার মহিলার। উনি হাসিমুখে সেটা করতেন। বাচ্চা মেয়েটাও ওর কোল ছাড়তে চাইত না।
ওর ছেলেকে ধীরাজ নিজের দোকানে বসাতে শুরু করল।
দুটো বছর এভাবে কেটে গেল। তারপর ধীরাজের সংসারে শনি ঢুকল।
আমি সবটা জানি না। কিন্তু কিছু একটা হয়েছিল — ধীরাজ বদলে যাচ্ছিল।
ওর ব্যবহার আগের মত ছিল না। এমনকি আমার সঙ্গেও ---। থাক, সেকথা।
ছেলেটা ততদিনে গায়ে গতরে বেড়ে বেশ জোয়ান হয়েছে, আগের অসুখও প্রায় সেরে গেছে। শুধু জিভ একটু আড়ষ্ট।
ছেলেটাকে ধীরাজ কোথাও দূরে পাঠিয়ে দিল। ওর মাকে বলল ফারুকাবাদে ধীরাজের ভাইয়ের ফ্যাক্টরিতে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে।
মাসে মাসে মাকে মনিঅর্ডার করে টাকা পাঠাবে।
প্রতি মাসে ধীরাজ মহিলাকে গুণে গুণে কিছু নগদ টাকা দিত, বলত ছেলে পাঠিয়েছে। কবে আসবে? দীপাবলীর ছুটিতে, বোনাসের টাকা নিয়ে।
মা ছিল নিরক্ষর, তাই ছেলে মাকে চিঠি না লিখে ধীরাজকে লিখত।
যাই হোক, দীপাবলীতে ছেলে এল না, তবে বোনাসের টাকা এল।
ধীরাজ বোঝাল, নতুন চাকরি, অনেক দায়িত্ব, কাজের চাপ। আগামী বছর নিশ্চয়ই আসবে।
এইভাবে তিনটে দীপাবলী পেরিয়ে গেলে মহিলার মন কুডাক ডাকতে লাগল। একদিন আমার বাড়িতে এসে কেঁদে পড়ল।
--- দোহাই বাঙালি বাবু, কিছু কর। ওর চাকরি চুলোয় যাক, টাকা পয়সা চাই না। আমার ছেলেকে ফিরিয়ে আন। আমার একটাই ছেলে, ওকে ছাড়া বাঁচব না।
গেলাম ধীরাজের কাছে, কথা বললাম। হিতে বিপরীত হল। ও মহিলার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করল না।
এমনকি ওকে বারণ করল যেন বাচ্চাটার ঘরে কখনও না ঢোকে। বাচ্চাটা ওকে দাদি ডাকত।
অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম। রণবীর বলল — সেই মহিলা কোথায় গেল?
-- জানি না।
-- আর ওই ছেলেটি, যে ফারুকাবাদে কাজ করতে গেছল?
-- জানি না। তবে আপনাদের আগে যারা ভাড়ায় এসেছিল, তারাও কিছু দেখেছিল এবং চটপট অন্য কোথাও উঠে গেছল।
তাই এ ঘরের ভাড়া এত কম। বাড়িটায় অশুভ কালো ছায়া আছে। আপনারাও চলে যান, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
আপনারা রাজি হলে আমি ভাল পাড়ায় কম ভাড়ায় ঘরের খোঁজ দেব’খন।
সিনেমা দেখা মাথায় উঠল। রাত্তিরটা কোনরকমে কাটালাম। না, সে রাত্তিরে কিছু দেখি নি।
পরের দিন সকাল বেলা দুজনে গেলাম ধীরাজ সিং এর ঘরে।
বললাম আগাম নোটিস দিচ্ছি, এ মাসের মধ্যে কোন ভাড়াবাড়ির খোঁজ পেলে আপনার ঘর খালি করে দেব। এ মাসের ভাড়া তো দেওয়াই আছে।
শুধু একমাসের সিকিউরিটির টাকাটা ফেরত দিয়ে দেবেন।
-- কেন? আমার বাড়িতে থাকতে আপনাদের কোন সমস্যা হচ্ছে?
-- না, মানে এমনই।
-- এমনি এমনি কিছু হয় না বাবু। খুলে বলুন, কে আমাদের ব্যাপারে উলটো পালটা গল্প ছড়াচ্ছে?
-- কেউ বলেনি, আমরা দেখেছি।
-- কী দেখেছেন, খোলাখুলি বলুন।
ধীরে ধীরে সবটা খুলে বলি।
ও হাসে, বলে – প্রথম প্রথম নতুন জায়গায় নানারকম ভুলভ্রান্তি হয়। ও কিছু না, আপনারা এখানেই থাকবেন।
আমি দেখব যাতে আপনাদের কোন অসুবিধে না হয়।
রণবীরের জাঠ রক্ত মাথায় ওঠে।
-- শুনিয়ে ঠাকুর সাহাব! আমরা কোথায় থাকব বা থাকব না – সে আমাদের মর্জি।
আপনি চাইলে আমাদের সিকিউরিটির টাকা আটকে রাখতে পারেন, কিন্তু আমাদের আটকাতে পারেন না।
ধীরাজের চোখের দৃষ্টি খর।
-- আমার দুটো কথা বলার আছে।
এক, এই শহরে আমি না চাইলে কেউ আপনাদের ভাড়ায় ঘর দেবে না। কোশিস করকে দেখ লীজিয়ে!
তাই যতদিন না আপনাদের ট্রান্সফার হচ্ছে ততদিন এখানেই থাকবেন।
দুই, আপনাদের ছাদে ওঠা বারণ করে দিলাম। রাত্তিরে ঘরের ভেতর শোবেন।
আমি উইন্ডো কুলার লাগিয়ে দিচ্ছি, এক্সট্রা ভাড়া লাগবে না। ব্যস্ টান্টা খতম।
আমি মরিয়া হয়ে বলি — কিন্তু মুখার্জি যে বললেন —
-- কে মুখার্জি?
-- সেকী! আপনার পাশের বাড়ি?
-- দশ বছর আগে ঝগড়া করতে এসেছিল। বুড়িটাকে সঙ্গে নিয়ে। তারপর থেকে তাকে এ তল্লাটে দেখা যায় নি।
-- আপ ঝুঠ বোল রহে!
রণবীর চেঁচিয়ে ওঠে। আমরা তো ওনার বাড়ি গিয়ে চা খেয়ে এসেছি।
ধীরাজ খেপচুরিয়াস।
-- চলিয়ে, দোনো চলতে উনকে ঘর। দুধ কা দুধ, পানি কী পানি হো জায়ে।
আমাদের একরকম টানতে টানতে রাস্তায় নিয়ে গেল। দু’পা হাঁটলেই মুখার্জি ভিলা।
বাড়িটার দরজা জানলা বন্ধ; গেটে একটা বড়সড় লোহার তালা, মর্চে ধরে গেছে। আঙিনায় আগাছার জঙ্গল।
[ এই গল্পটির মূল কাহিনীর জন্য আমি অগ্রজপ্রতিম ডঃ বিপ্লব দাশগুপ্তের কাছে ঋণী ]
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।