এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • শমিত অনুপ আর রিখি

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ৫৪ বার পঠিত
  • আগুনের বলের মতো উলের গোলা গড়িয়ে যাচ্ছে রিখির কোল বেয়ে। হাউসকোটে ঢাকা দুরন্ত মনোরম শরীর। মসৃন ছিমছাম পায়ের পাতা। পেডিকিওর করা পায়ের নখ। সাজানো অশোক ফুলের মতো। রিখির গায়ে কেমন যেন মেঘ কিংবা কুয়াশার গন্ধ।

    কার্পেটের ওপর রিখির পায়ের কাছে বসে আছে শমিত আর অনুপ। রিখি যদিও সোয়েটার বুনে চলেছে একমনে, তবু এটা কিন্তু শীতকাল নয়। ভরা গ্রীষ্ম। বৈশাখ মাস। ঘরের ভিতরে এয়ারকন্ডিশানার আর বাইরে ঝুরু ঝুরু ফুরু ফুরু বাতাস। শমিত এবং অনুপ এরা কেউই কিন্তু রিখির সৌন্দর্যরসে আকৃষ্ট হয়ে এখানে আসেনি। কিংবা প্রেম নিবেদনের উদ্দেশ্যে তার পদতলে বসে নেই। তারা দুজনেই অত্যন্ত বাস্তব একটি চাহিদা নিয়ে রিখির কৃপাপ্রার্থী হয়েছে। রিখির স্বামী এক মস্ত কোম্পানীর মস্ত এক্সিকিউটিভ। রিখি হল শমিত আর অনুপের কলেজের প্রাক্তন সহপাঠিনী। তারা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর বেকারত্বের জ্বালা সহ্য করার পর এবারে দ্বিধা দ্বন্দ্ব ঝেডে ফেলে দিয়ে, সমস্ত সংকোচ বিসর্জন দিয়ে রিখির কাছে হাজির হয়েছে তার স্বামীকে বলে একটা চাকরি করে দেবার প্রার্থনা নিয়ে।

    কলেজে পড়ার সময় শমিত এবং অনুপের সঙ্গে রিখির খুব যে একটা ঘনিষ্ঠতা ছিল তা নয়। রিখি কলেজ জীবনে তার বহু সহপাঠিকেই প্রেম বিতরণ করেছে। তারা প্রত্যেকেই তুখোড় এবং ঝকঝকে ছিল। অনুপ এবং শমিতের মতো মুখচোরা এবং লাজুক ধরণের ছেলেরা কখনও তার ঘনিষ্ঠ হতে পারেনি। তুখোড় পুরুষদের বশ করতে তার চিরকালই আনন্দ। উত্তেজনা ও রোমাঞ্চের পিছনে বেলাগাম ছুটতে গিয়ে অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকবার। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল— রিখির একজন ঘনিষ্ঠ বয়ফ্রেন্ড তার ফেক ন্যুড ছবি আপলোড করে দেয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেই নিয়ে হই হই কান্ড। থানা, পুলিশ, কোর্ট, কাছারি, সে অনেক কান্ড। সেই বয়ফ্রেন্ডের ছ’ মাসের হাজতবাস হয়েছিল। ছেলেটার নাম ছিল অস্মিত। সাধারণত এ ধরণের ঘটনা ঘটলে মেয়েটার জীবন যন্ত্রনাদায়ক এবং গ্লানিময় হয়ে ওঠে। কিন্তু রিখি ধারণাটাকে ভুল প্রমাণ করে দেয়। বরং অস্মিতের সম্বন্ধে নানারকম সত্য এবং অসত্য অপরাধমূলক কাহিনী বাজারে চাউর করে শুধু অস্মিতের নয়, তার গোটা পরিবারের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। এই সময়ে শুধু অস্মিতের বাবা মা নয়, তার বোন, যার বিয়ের দেখা শোনা চলছিল, সেও লজ্জায় রাস্তায় বেরোতে পারত না। শেষ পর্যন্ত অস্মিতের বাবা মা রিখির বাড়িতে গিয়ে প্রায় হাতে পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়। রিখির এক জ্যাঠা তারপর কি সব কলকাঠি নেড়ে কেসটা ধামাচাপা দেয়। নইলে, কালো দাগ পড়ে যেত অস্মিতের জীবনের খাতায়।

    এই যে দুজন যুবক কার্পেটের ওপর তার পায়ের কাছে বসে আছে এতে রিখির বিন্দুমাত্র সংকোচ নেই। এই দুজনকে দেখে সে চট করে চিনতেও পারেনি। খানিক চিন্তা করার পর সামান্য স্মরণে এল এবং এদের দিয়ে স্যাডিস্ট খেয়াল চরিতার্থ করার বাসনা জেগে ওঠে হঠাৎ।
    রিখি উল প্যাঁচানো কাঁটা চালাতে চালাতেই ইন্টারভিউ নেবার ভঙ্গীতে বলে, ‘অনুপ তোমার বাড়িতে কে কে আছে ?’
    অনুপ কৃতার্থ ভঙ্গীতে প্রত্যাশাভরা গলায় জবাব দেয় — ‘ আজ্ঞে, মা বাবা আর দুই অবিবাহিত বোন আছে। বাবা খুব অসুস্থ — প্রত্যেকদিন তিনশো টাকার ইঞ্জেকশান লাগে। বোন দুটো .....’
    - ‘আ:’, রিখি বিরক্তি প্রকাশ করে, ‘ যা জিজ্ঞেস করছি তার আনসার দাও। বাজে কথা বোল না।’
    অনুপ যে রিখিকে ‘আজ্ঞে’ সম্বোধন করল এ ব্যাপারটা নিয়ে তিনজনের কেউই কুন্ঠিত হল না।
    এবার শমিতের পালা। তার দিকে না তাকিয়েই রিখি প্রশ্ন করল, ‘এর আগে কোথাও চাকরি করেছ?’
    - ‘ আজ্ঞে না ম্যাডাম। অনেক জায়গায় ঘুরেছি.... বি. কম. পাশ করার পর মা মারা গেলেন....’
    - ‘ আ:হা, তোমাদের দুজনেরই দেখছি একই নেচার। ভেরি ব্যাড হ্যাবিট। ট্রাই টু আনসার টু দি পয়েন্ট। শুধু যেটা জিজ্ঞেস করছি সেটারই জবাব দাও। আসলে তোমাদের দ্বারা কিছু হবে না। একটা হেলদি ইয়াং ম্যান কি করে যে এতদিন পর্যন্ত আনএমপ্লয়েড হয়ে বসে থাকে আমি বুঝতে পারি না ...... ’

    ফর্সা ছিমছাম পায়ের গোছে রিখির হাউসকোটের লেস সুখে ঘুমোচ্ছে। শমিত আর অনুপ দুরু দুরু বুকে ভীত উদ্বেগভরা চোখে রিখির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। রিখির চোখে মুখে ভঙ্গীতে চরম অবজ্ঞা ও অবহেলা। লেডি অফ শ্যালট-এর মতো সে বুনেই চলেছে, বুনেই চলেছে। ঘরে নিথর নীরবতা।

    রিনরিনে কিন্তু নির্মম কন্ঠে রিখিই নীরবতা ভাঙল।একবার শমিত, একবার অনুপের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ বাস্তব বড় কঠিন, বুঝলে সোনামনিরা, রিয়্যালিটি ইজ সো রুড, সো ক্রুয়েল, ইউ নো.... অ্যান্ড ইউ টু গেট ইয়োরসেলভস প্রিপেয়ার্ড ফর ইট।’

    কোন সুদূর শূন্য থেকে ভেসে আসা অপ্রতিরোধ্য এবং অপরিবর্তনীয় দৈববাণীর মতো শোনায় রিখির কথাগুলো। শমিত এবং অনুপ ভয়ার্ত এবং সম্মোহিত দৃষ্টিতে রিখির দিকে তাকিয়ে রইল পরবর্তী প্রত্যাদেশ শোনার অপেক্ষায়।

    এই সময়ে রিখির মোবাইল বেজে উঠল। রিখি নির্বিকার। টুংটাং টুংটাং জলতরঙ্গের বাজনায় মোবাইলের রিং টোন বেজেই যেতে লাগল। বেজে বেজে থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ। তারপর আবার বাজতে লাগল টুংটাং টুংটাং......। পেছনের দেয়ালে একটা পেন্টিং লাগানো। গোধূলির ম্লান কমলা আলো মাখা নির্জন গ্রামের পথ। একটা গরুর গাড়ি যাচ্ছে। গলুইয়ের সামনে চালক বসে আছে উবু হয়ে। গরুর গাড়িটি আধো আঁধারে ঢাকা। অনুপ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়ল। মরা আলোয় ঢেকে আছে চারিধার....। রিখি একই রকম নির্বিকার। মোবাইল বেজে যাচ্ছে। হয়ত কারো কিছু জরুরী কথা আছে। রিখির মা, বাবা, কোন বন্ধু বা স্বামীও হতে পারে। রিখি এবারেও ফোন তুলল না। বেজে বেজে নি:শব্দ হয়ে গেল মোবাইল।

    হঠাৎ রিখি দাঁড়িয়ে উঠল আগুনরঙা উলের গুছি, সজারুর কাঁটার মতো মসৃন কাঁটা দুটো ফেলে দিয়ে। তারপর একে একে পোশাক খুলে ফেলতে থাকে তার শরীর থেকে। সম্পূর্ণ অনাবৃত হয়ে যায় সে। প্রখর নগ্ন দেহ।.... নিপুণ ছাঁদে গড়া, মোলায়েম, সুগন্ধি, তীক্ষ্ণ রমণীয় ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে রইল রিখি। তার পায়ের কাছে এখনও প্রায় হাঁটু গেড়ে বসে আছে তার কৃপাপ্রার্থী দুজন প্রাক্তন কলেজ সহপাঠী। হতবাক বিমোহিত কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ অবস্থায় স্থির হয়ে আছে তারা।

    প্রত্যাদেশ আবার ফিরে এল কোন অমোঘ বিধানের মতো— ‘ তোমাদের দুজনের একজন মাত্র সফল হবে ’। দুই যুবক পুরুষের সামনে লীলায়িত ছন্দে দাঁড়িয়ে রিখি তার আদেশ বাণী শুনিয়ে যাচ্ছিল, ‘ প্রাচীন রোমে যেভাবে গ্ল্যাডিয়েটররা অ্যাম্ফিথিয়েটারে লড়াই করত, সেইভাবে তোমরাও লড়বে পরস্পরের সঙ্গে যতক্ষণ না একজনের মৃত্যু হয়। শুধু একজনই জিতবে। অনলি ওয়ান উইল কাম আউট উইনার। যে জিতবে সে শুধু চাকরিই পাবে না, চব্বিশ ঘন্টার জন্য পাবে আমাকেও — হ্যাঁ আমাকে। এ শুধু চাকরির লড়াই নয়। আমার আদেশ, আমাকে একদিনের জন্য পাওয়ার জন্যও তোমাদের ডুয়েল লড়তে হবে, যাতে শুধু একজনই জিতবে। এই নাও, ওই বাগানে চলে যাও নীচে এবং শুরু কর....।’

    এই বলে রিখি হেঁটে গিয়ে আলমারি খুলে একটা ভোজালি আর একটা মাংস কাটার চপারের মতো অস্ত্র বার করে দুজনের দিকে এগিয়ে দিল — ‘ উঠে দাঁড়াও বীরের মতো, এই নাও, ধর তোমাদের অস্ত্র। নীচে ওই বাগানে গিয়ে লড়াই শুরু কর। আমি এই জানলা দিয়ে দেখব। চারদিকে ত্রিসীমানায় কেউ নেই।যাও, দেরী কোর না.....।’

    শমিত এবং অনুপ নীচে বাগানে নেমে গেল যে যার অস্ত্র হাতে নিয়ে। মাঝখানে কিছুটা দূরত্ব রেখে পরস্পরের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শমিত আর অনুপ দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিদ্বেষ, ক্রোধ, ঘৃণা, প্রতিহিংসার জ্বালা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করতে লাগল নিজেদের মধ্যে। রিখি ওপর থেকে দেখছে খোলা জানলা দিয়ে।

    দুজনের হাতে দুটো পানীয়ের পাত্র দিয়েছিল রিখি। তারা ওই উত্তেজক পানীয় ঢকঢক করে গলায় ঢেলে দিল। এবার পৈশাচিক হুঙ্কার ছেড়ে শমিত আর অনুপ একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পরস্পরকে নিষ্ঠুর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে।দেহে অস্ত্রের আঘাত পড়তে ওদের কোষে কোষে পাশবিক প্রতিহিংসার দাবানল জ্বলে উঠল। রক্তে লাল হয়ে যেতে লাগল বাগানের ঘাস মাটি লতাপাতা। ভয়ানক অস্ত্রের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে, অবিশ্রান্ত রক্তপাতে ক্রমশ দুর্বল ও মুমূর্ষু হয়ে শমিত আর অনুপ দুজনেই লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। নিষ্কম্প অম্লান মুচকি হেসে জানলা থেকে সরে গেল রিখির মুখ।

    এই সময়ে আচমকা গুরুগুরু শব্দে আকাশ ডেকে উঠল। পৃথিবী প্রায় অন্ধকার হয়ে গেছে। বেশ কয়েকবার তীব্রভাবে বিদ্যুৎ ঝলসালো। তুমুল শব্দে কোথায় যেন বাজ পড়ল। জোলো হাওয়া বইছে হু হু করে। বড় বড় ফোঁটা ঝরছে। মিনিট খানেক। এরপরে আকাশ তার ঝরণা খুলে দিল। দিগন্ত চরাচর ভাসানো দুরন্ত বৃষ্টি। অঝোর ধারায় পড়তে লাগল বাগানের কোমল ঘাসে পড়ে থাকা দুটি নিষ্পন্দ দেহের ওপর। প্লাবিত হয়ে যেতে লাগল শমিত আর অনুপের ক্ষতবিক্ষত শরীর দুটো।

    দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। বেলা প্রায় পাঁচটা বাজে। অনুপের মা ঘুমন্ত ছেলেকে ধাক্কা দিয়ে বললেন, ‘ আরে ওঠ ওঠ, সন্ধে হয়ে এল যে। অবেলায় এত ঘুম.... সারাদিন শুধু পড়ে পড়ে ঘুমোনো..... ভগবান, কবে যে একটা কাজকম্ম কিছু জুটবে....।’ অনুপ ঘুমচোখে উঠে বসে ভ্যাবলার মতো বসে থাকে যেন কিসের ঘোরে।

    ওদিকে শমিতের বৌদি এসে ঠেলা মারে তাকে। ‘ ঠাকুরপো ওঠ ওঠ, চা হয়ে গেছে। ও: ঘুমোতেও পার বটে তুমি। আর সে কি নাক ডাকার ঘটা। কি করে যে তুমি চাকরি বাকরি করবে ভগবানই জানেন। চা-টা খেয়ে একটু বেরিয়ে দেখতো কিছু খবর টবর পাওয়া যায় কিনা।’
    শমিত ঘুমের আবেশ জড়ানো গলায় শুধোল, ‘ কেন, কি হয়েছে ?’
    - ‘ আরে জান না ! ধর্মতলায় আজ বেকারদের চাকরির দাবীতে কাদের যেন মিটিং ছিল। বিরাট গন্ডগোল হয়েছে। পুলিশের গুলিতে নাকি দুজন মারা গেছে। লক্ষ্মীটি যাও, একটু এগিয়ে দেখ না ভাইটি... তোমার দাদা এখনও অফিস থেকে ফিরল না। আমার এত চিন্তা হচ্ছে না....। প্লিজ দেখ একটু ’।

    ******* ******* ********

    বেলা প্রায় বারোটা। রোদ ঝলমল করছে। লিন্ডসে স্ট্রীটে হগ মার্কেটের বাইরে পেভমেন্টে দাঁড়িয়ে ছিল শমিত। অনুপের জন্য অপেক্ষা করছিল। তাদের একসঙ্গে ক্যামাক স্ট্রীটে যাবার কথা কোন এক স্টার্ট আপ কোম্পানিতে। বোধহয় মার্কেটিং অ্যানালিস্ট ধরণের কোন চাকরির খোঁজে। সফটওয়্যার সংক্রান্ত কাজে দুজনেরই একটা সহজাত পারদর্শীতা আছে।
    ‘ আরে অনুপ না ! ’, হঠাৎ কে যেন বলে উঠল।
    অনুপ মুখ তুলে দেখে সামনে রিখি দাঁড়িয়ে। দেখে চমকে গেল অনুপ। এর মাঝে দশটা গ্রীষ্ম চলে গেছে। রিখির সে লাবণ্য এখন ছায়া ঢাকা। কাঁধে একটা ঢাউস সাইড ব্যাগ। অনুপ বলে ওঠে, ‘ আরে তুই ....কতদিন পরে দেখা ! কোথায় থাকিস এখন ? ’
    ‘ ও-ই বিডন স্ট্রীটে মা-র কাছে থাকি। হাসব্যান্ড মারা গেছে ক্যানসারে বিয়ের দুবছরের মাথায়। এক দেওর এবং দুই ননদ ষোলশ স্কোয়্যার ফুটের ফ্ল্যাটটা দখল করবার জন্য নানারকম নোংরামি শুরু করল। আমাকে রেপ করাবার চেষ্টাও করেছিল। অচেনা কারা যেন খুনের হুমকি দিত মাঝরাতে। ফ্ল্যাটের মধ্যে একা একা ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতাম আমি। তবু দখল ছাড়তে চাইনি আমি। শেষ পর্যন্ত আর থাকতে পারলাম না। বাধ্য হয়ে মা-র কাছে চলে এলাম। বাবা মারা যাবার পর মা-ও তো এখন একা। আমার ভাই সম্বিৎ, আই আই টি-র ইঞ্জিনীয়ার, তোরা তো চিনতিস ওকে.... এখন জার্মানীতে থাকে। আমাদের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই এখন। পরে খবর পেয়েছি, আমার শ্বশুরবাড়ির লোকেদের সঙ্গে ও-ও হাত মিলিয়েছিল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে .... ’

    রিখি একনাগাড়ে বলে যেতে থাকে উদভ্রান্তের মতো। মনেই হচ্ছে না অনুপের সঙ্গে দশ বছর পর দেখা হয়েছে তার।
    অনুপ, রিখির কথার সামান্য বিরতির ফাঁকে প্রশ্ন গুঁজে দেয়, ‘ শুধু একটা ফ্ল্যাটের জন্য এত কান্ড ? ’
    এসব বৈষয়িক দড়ি টানাটানির জগৎ তার চিন্তাবৃত্তের অনেক দূরের ব্যাপার।
    — ‘ আরে কি বলিস ! ওই লোকেশানে ওই ফ্ল্যাটটার দামই দুকোটি টাকা। তাছাড়া রাজারহাটে জমি আছে প্রায় দশ কাঠা। আইনত তাতেও তো আমার শেয়ার আছে।কিন্তু প্রাণভয়ে সেসব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে চলে এসেছি.... ’
    রিখিকে খুব ক্লান্ত লাগে।
    — ‘ বলতো ...মা চলে গেলে আমি থাকব কার কাছে ? মার ভীষণ হাঁফানি.... কবে কি হয় .....’

    একটু থামে রিখি। দূরের ময়দানের দিকে তাকিয়ে থাকে খানিকক্ষণ। তারপর সলজ্জভাবে বলে, ‘ আমি নিজেই শুধু বকবক করে চলেছি তখন থেকে। বল তোর খবর কি, কি করছিস এখন ? ’
    — ‘ না তেমন কিছুই না। একটা পারমানেন্ট চাকরি বাকরি খুঁজছি আর কি .... এই তো এখনই যাওয়ার কথা এক জায়গায় দেখা করতে। শমিতও যাবে আমার সঙ্গে। শমিতকে মনে আছে তোর...... ওরও তো এখনও তেমন কিছু হল না.....।’

    রিখির মুখ হাসিতে ভরে ওঠে। বলে, ‘ আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে থাকবে না কেন? শমিত আর তুই দুজনেই ছিলি কম্পিউটার এক্সপার্ট। সেই অস্মিতের কেসটা তো তোরাই সলভ করলি ফেক ইমেজ ডিলিট করে....ফেক অ্যাকাউন্ট ব্লক করে। আই উইল রিমেন এভার গ্রেটফুল টু ইউ বোথ।’

    অনুপ সংকোচ বোধ করে।
    - ‘ আরে না না ... ওটা কি এমন কাজ, সিম্পল ব্যাপার।’
    - ‘ এখন হয়ত সিম্পল। দশ বছর আগে সিম্পল ছিল না।’
    - ‘ অস্মিত বোধ হয় এখন বিদেশে।’
    - ‘ কে জানে ! খবর রাখি না।বাসটার্ড একটা .....’
    - ‘ ওই তো শমিত আসছে ... ‘
    অনুপ হাত তুলে ডানদিকে দেখাল। রিখি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।

    ‘ আয় না আমরা তিনজনে মিলে একটা কিছু স্টার্ট করি। স্টার্ট আপ বিজনেসের ট্রেড লাইসেন্স করা আছে আমার।তোরা দুজন কম্পিউটার এক্সপার্ট আছিস। নেটওয়ার্কটা দেখবি। মার্কেটিং আমরা তিনজন মিলে সামলাব। ইনিশিয়াল ক্যাপিটালটা আমি ম্যানেজ করে নিতে পারব। পরে দরকার হলে লোন নেব। লোন নেওয়ার অনেক জায়গা আছে। চল না শুরু করি আমরা। আমরা নিশ্চয়ই সাকসেসফুল হব দেখিস ...... ’, রিখি বলে চলে।

    প্রবল আবেগে অনুপ আর শমিতের গলা আটকে গেল। তারা দুজন মনে মনে নতজানু হয়ে বসে পড়ে রিখির সামনে। না, গ্ল্যাডিয়েটর ক্রীতদাসের মতো নয়। একমুঠো স্নেহভিক্ষু কাঙালের মতো।

    বৈশাখী রোদ্দুরে তখন চৌচির চঞ্চল লিন্ডসে স্ট্রীট।

    ******* ******* ********
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Manali Moulik | ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:৪৪737720
  • বাহ্ ! শেষের দিকটা পড়ে মনটা ভরে গেলো।
  • . | ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:৫৯737721
  • টু গুড। কোনও কথা হবে না। শর্ট ফিল্ম হোক এটার। রিখির রোলে দেবলীনা দত্ত।
  • Anjan Banerjee | ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৫২737727
  • তা বেশ 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট প্রতিক্রিয়া দিন