এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বেআইনি

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ৪১ বার পঠিত
  • আলোকবরণ চৌধুরী বিল্ডিং-এর পনেরতলার ছাদে উঠে চারিদিক দেখতে লাগলেন। অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। যেন সবুজ রঙের আলোয়ানে জড়ানো তলাটা। সবুজের ফাঁকে ফাঁকে নানারঙা নুড়ি পাথরের মতো উঁকি মারছে ঘরবাড়ি। আলোকবরণের বয়স এখন ছেচল্লিশ। রবসন কেমিক্যালস-এর সিইও। তিনদিন আগে জুরিখ থেকে ফিরেছে। এখানে ঝাড়খণ্ডের এই প্রোজেক্টটা সুপারভাইজ করতে আসতে হল। এসে এই পনেরতলা চারতারা হোটেলে উঠেছেন।

    স্যুট বুট ছাড়া হয় নি। ছাদের আলসে ধরে দাঁড়িয়ে দূরের নীলাভ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। শীতকাল, ভর দুপুরবেলা। বিশাল ছাদ, প্রায় ফুটবল মাঠ। অবারিত নির্মল আকাশ থেকে শীতের নরম রোদ্দুর ঝরে পড়ছে। ছাদে এখন কেউ নেই। আলোকবরণ একাই।
    পাশের থেকে কে যেন বলল, ' কি অপূর্ব জায়গা না ? '
    আলোকবরণ বাঁ পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল প্রায় তারই বয়সী একজন দাঁড়িয়ে আছে। শ্যামবর্ণ লম্বা চেহারা। গালে পাতলা দাড়ি। মেরুন রঙের পাঞ্জাবী আর ঘি রঙের পাজামা।
    আলোকবরণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। মুখটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে।
    ভদ্রলোক হেসে বলেন, ' আমি এখানেই থাকি। ঘটনাক্রমে এই হোটেলের চিফ ম্যানেজার ... '
    আলোকবরণ বললেন, ' ও আচ্ছা আচ্ছা ... নমস্কার '। ভদ্রলোক কিন্তু প্রতি নমস্কার করলেন না। বললেন, ' আমার ডান হাত আর ডান পা দুটোই প্রসথেটিক ... বুঝলেন তো ... তিনতলার বারান্দার রেলিংয়ের ওপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে নীচে পড়ে যাওয়াটা তো আশ্চর্যের ব্যাপার কিছু নয় এবং মরে যাওয়াটাই স্বাভাবিক, তাই না ? কিন্তু হাসপাতালের ডাক্তারবাবুরা আমাকে বাঁচিয়ে দিলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, আমার মাথায় কোন চোট লাগল না, রাখে হরি মারে কে, এই আর কি ... '
    আলোকবরণ অবাক হয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
    --- ' কিন্তু স্যার ... '
    --- ' আমাকে স্যার ট্যার বলবেন না। তবে হতে পারতাম হয়ত ... আপনারা চাইলেন না তাই হল না। তবে বেঁচে তো গেলাম ... তারপর পঙ্গু শরীর নিয়ে শুরু হল মরণপণ সংগ্রাম। বাবা গ্রামের সামান্য ছুতোর মিস্ত্রি। আমাকে তিনি আর কতদিন খাওয়াবেন ... বেচারা মা বাবা তো আমার মুখের দিকে তাকিয়েই বসেছিল। তবে আমার ব্রেনটা বেঁচে যাওয়ার ফলে আমি মোটামুটি একটা লড়াই দিতে পারলাম অন্য ফ্যাকাল্টিতে শিফট করে ... তবেই না আমি আপনার মতো উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। আপনি এখানে আসবেন আমি জানতাম। এখানে আপনার কোম্পানির ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট তৈরি হচ্ছে ... খবর রাখি আমি ... '
    ভদ্রলোক দম নেওয়ার জন্য একটু থামলেন। সেই ফাঁকে বিস্মিত আলোকবরণ বললেন, ' আপনি আমাকে চেনেন ? '
    --- ' বিলক্ষণ ... '
    --- ' মানে ... কিভাবে ? আমি তো কোনো সেলিব্রিটি নই। আমার সঙ্গে আপনার কি কোথাও দেখা হয়েছে আগে? তাছাড়া এরকমভাবে আপনি পড়ে গেলেনই বা কিভাবে? '
    ভদ্রলোক দ্বিতীয় প্রশ্নটার উত্তর আগে দিলেন।
    --- ' আর বলেন কেন ... মাঝরাতে তিনতলার রেলিংয়ের ওপর দিয়ে হাঁটতে গেলে পা ফস্কে পড়ে না গিয়েই বা উপায় কি? কজন আর আপনার মতো ব্যালান্স মেনটেন করতে পারে বলুন? পুলিশ থেকে আরম্ভ করে রাজনীতি ও প্রশাসনের সঙ্গে এই ব্যালান্সের খেলাটা বুদ্ধি করে খেলে আপনি বেরিয়ে গেলেন ... '
    --- ' মানে? '
    --- ' না ... সাতাশ বছর আগের এসব ছোটখাট কথা আপনার মতো ব্যস্ত লোকের মনে না থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু যার যায় তার যায়। কিংবা বলতে পারেন, কেউ ভোলে না ... কেউ ভোলে। যেমন আপনি আমার চেয়ে দু বছরের সিনিয়র দাদা ছিলেন কলেজ হোস্টেলে সেই সাতাশ বছর আগে। আর ওই মাঝরাতের দুঃস্বপ্ন আমি আজও ভুলতে পারিনি। আমি জানতাম আপনি একদিন আমার খাঁচায় ঢুকবেনই ঢুকবেন ... '
    আলোকবরণ কেমন যেন কেঁপে গেলেন। দুবার ঢোক গিললেন।
    --- ' আপনি কে ... কে বলুন তো ? নাম কি ? '
    --- ' শুভময় সাঁপুই, গোসাবা নিবাসী ... ভাল করে দেখুন তো ... '
    আলোকবরণ একদৃষ্টে উদভ্রান্ত চোখে শুভময়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এক লহমায় তার সবকিছু মনে পড়ে গেল। কেমন একটা আতঙ্কে তার গা সিরসির করতে লাগল।
    শুভময় বলল, ' এটা কলেজ ক্যাম্পাস নয় .... বলতে পারেন আমার ক্যাম্পাস। এখানে সবাই আমার সুহৃদ, আপনজন। এখানে কোন রাজনীতি নেই, পুলিশের চালাকিও নেই। '
    --- ' তো ? '
    --- ' কিছুই না মিস্টার আলোকবরণ চৌধুরী ... আপনাকে এখানে পনেরতলার ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে এদিক থেকে ওদিকে যেতে হবে। করে যদি ফিরে আসতে পারেন, তা হলে বেঁচে গেলেন ....আর নইলে তো ... নীচে একবার তাকিয়ে দেখুন .... ছাদ থেকে আপনি পালাতে পারবেন না ... ছাদের দরজা ভিতর থেকে লক করা আছে ... আর আমার সঙ্গে ধস্তাধস্তি করার চেষ্টা করবেন না ... আমি বললে আমার লোকেরা আপনাকে দলা পাকিয়ে দেবে '।
    নীরব নির্জন ছাদের ওপর থেকে নীচের দিকে তাকিয়ে মাথায় পাক খেয়ে গেল আলোকবরণের।
    শুভময় আদেশ দিল, ' নিন ... উঠে পড়ুন ... দেরি করবেন না ... '

    দুপুরবেলায় খবর ছড়িয়ে পড়ল, ' রবসন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির সিইও আলোকবরণ চৌধুরী ঝাড়খণ্ডের ম্যাজেস্টিক হোটেলের পনেরতলার ছাদের ওপর থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

    *************************
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ripon | 45.126.***.*** | ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:২৯737743
  • একটু বেশি পরিচিত রিভেঞ্জ প্লট , তাও ভালই লাগল 
  • Anjan Banerjee | ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:৪১737746
  • হমম্...   ঠিক ঠিক 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন