ছোটবেলায় দেখতাম অনেক বড় মানুষের ইদ নিয়ে কোন আগ্রহ নাই। ওদের যেন কোন কিছুই যায় আসে না ইদ আসল না গেল। বড় অদ্ভুত লাগত সে সময়। বাপরে! ইদ নিয়ে কোন আগ্রহ নাই? খুব ভাব নিছে! এমন নানা চিন্তা করতাম। এখন, এই সময়ে এসে দেখি আমি সেই অদ্ভুত মানুষটা হয়ে বসে আছি! ইদ নিয়ে এখন আর প্রবল উত্তেজনা কাজ করে না। এখন যখন অনেক কিছুকেই প্রশ্ন করা শিখেছি তখন মনে হয় ইদের মত উৎসব এক অর্থে আমাদের ভিতরে শ্রেণি বৈষম্যকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই তেমন একটা করে না!
এখন মনে হয় এই উৎসব গুলো আসলে মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত শ্রেণি বহু কষ্ট করে যে একটা পর্দা টেনে রাখে সমাজের চোখে নিজেদের অসহায়ত্বকে আড়াল করার জন্য সেই পর্দা ছিঁড়ে যায় প্রথম চোটেই। অন্যদিকে দিকে আরেক শ্রেণির শুরু হয় কুৎসিত বিত্ত বিভব প্রদর্শনীর অসুস্থ প্রতিযোগিতা। ইদের দিন কোন পর্দা থাকে না আর। এক নজর তাকিয়েই বলে দেওয়া যায় কার অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন! নতুন জামা কিন্তু দেখে কী বুঝা যায় না এইটা সস্তা গজ কাপড় দিয়ে বানানো জামা? আরে সস্তা মেকআপ! জুতার এই অবস্থা! এদিকে দেখ, আপাদমস্তক কত নিখুঁত! এমন নিখুঁত সজ্জা আরও কয়েক সেট আছে। সকাল, দুপুর আর রাত, প্রতি বেলায় একেকটা! পরের দিনের প্ল্যান আবার সম্পূর্ণ নতুন!
এই জিনিস বুঝার পরে আমার কাছে কেমন জানি লাগে এই উৎসব গুলোকে। এত নগ্ন হয়ে যায় সব কিছু অথচ এইটা এতদিন কেন মাথায় আসল না? ইদকে ঘিরে চলে কত হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য অথচ এর পুরোটাই লোক দেখানো কেন্দ্রিক! আমি পরব তোমরা দেখবা। তোমরা কত দামি পরতে পারছ আর দেখ আমরা কী করছি! আমি উৎসবের বিপক্ষে না, উৎসবের দরকার আছে। কিন্তু যদি শুধু এই অসুস্থ প্রতিযোগিতাটা বন্ধ হত! কেন ইলিয়নের একটা পাঞ্জাবির দাম হবে বিশ হাজার টাকা! কেন তা পরবে মানুষ? দেড় দুই লাখ টাকার লেহেঙ্গা! এইটা কোন লেবেলের অসভ্যতা? জাতি যখন নিশ্চিত একটা ক্রান্তিকালীন সময় পার করছে তখন সবাই ঝাঁপিয়ে পরে কাপড় কিনছে! এইটা একটু ভাবলেও তো কেমন লাগে না?
শিশুকাল থেকেই এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তখন থেকেই শিখে যাচ্ছে না এই বৈষম্যের বিষয়টা? আমি আবারও বলছি, উৎসব, নতুন জামায় আসলে সমস্যা না, সমস্যা হচ্ছে অসুস্থ প্রতিযোগিতায়। এইটা আমাদেরকে কোন উপকার তো করবেই না বরং আমাদের নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে বারংবার।
আচ্ছা, এগুলা কিন্তু আমার ক্ষেত্রে হয়েছে বলেই বলছি আমি। এমন না যে আমি অন্যদের কথা ভেবে বলছি। এই উপলব্ধি আমার জীবন থেকেই নেওয়া। লম্বা একটা সময় ইদ গেছে আমারা ভাই বোনেরা ইদে কিছুই নতুন কিনতে পারিনি। একটা ইদের কথা মনে আছে আমার, আমি ইদের আগের রাতে সজাগ হয়ে বসে আছি, বাড়ির সর্বশেষ ব্যাক্তি, আমার বড় ভাই কখন বাড়ি ফিরবে তার জন্য। একটা সময় সে আসল এবং তার হাতও খালি! আমি প্রবল ভাবে আশা করছিলাম যে সে হয়ত আমার জন্য কিছু একটা নিয়ে আসবে। কিন্তু সে হয়ত এগুলা চিন্তা করেও বাহিরে ছিল না, তার হয়ত অন্য কাজ ছিল। আমি দরজায় নক করা শুনে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে দিয়েছিলাম। এবং বুঝে গেলাম এবারের ইদও আমার নতুন পোশাক ছাড়াই যাবে। আমি কান্না করা শুরু করেছিলাম। বড় এই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। পাশের ঘরে আম্মা আব্বার তখন কত খারাপ লাগছিল? এখন চিন্তা করলে আমার হাত পা হিম হয়ে আসে! কী একটা অত্যাচারের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলাম আমি!
তো এইটাই বলছিলাম যে আমি জানি ইদের নতুন পোশাক একটা পর্দা কেটে দেয়। সেদিন আর আমাদের অবস্থা লুকিয়ে রাখা যায় না। অপরিচিত লোকজনও বুঝে যায় আমরা ঠিক ভারসাম্য রাখতে পারছি না সমাজের সাথে। এখন বুঝি, এখন জানি যে কে কী ভাবল আমাকে নিয়ে তা দিয়ে আমার কিছুই যায় আসে না। কিন্তু তখন? তখন তো আমি শিশু ছিলাম, তখন তো আমি অপ্রস্তুত হতাম। এবং আমি না শুধু, ইদের ছুটির পরে দেখতাম ক্লাসের অর্ধেরও বেশি ছাত্রদেরই আমার মত অবস্থা। কেউ একটা শার্ট পাইছে শুধু, কেউ প্যান্ট! সেই সময় টপ টু বটম নতুন নিয়ে হয়ত কম শিশু কিশোরই ইদ করতে পারত। এখন অবস্থা বদলে গেছে। কিন্তু বৈষম্য তো আছেই!
ইদের মধ্যে যা কিছু ভালো লাগার তা হচ্ছে এর একটা অসাম্প্রদায়িক চেহারা আছে। যা আবার কুরবানির ইদে হারিয়ে যায়। রোজার ইদে হিন্দু মুসলিম বিষয়টাই থাকে না বলতে গেলে। এখনও প্রতিবেশীর বাড়িতে ইফতার যায়, সে হিন্দু না মুসলিম তা কেউ মাথা ঘামায় না। আমাদের অনেক বন্ধু আছে, কোন অজ্ঞাত কারণে ২৭ রোজার রোজাটা রাখে! প্রশ্ন করি নাই কোনদিন। মনে আছে শুধু ওদের জন্য ২৭ রোজার ইফতার বাহিরে করতাম। বন্ধুদের একটা ইফতারিও হয়ে গেল আবার অন্য ধর্মের একজন রোজা রাখায় ওকেও একা ইফতার করতে হল না। এমন কত কত ছোট ছোট বিষয় যে ছড়িয়ে আছে আমাদের আশেপাশে, এগুলাই পরম পাওয়া। খাসারির ডাল দিয়ে এক ধরণের জেলাপির মত বানায় আমাদের এদিকে। আমরা বলি ডাইলের আমিত্তি। এই জিনিস ছাড়া ইফতারই কেমন যেন অসম্পূর্ণ লাগে এখনও। এই জিনিস বানায় কারা? ঘোষ পট্টির লোকেরা। কাদেরটা দুর্দান্ত? দুর্গা চরনেরটা! তাই ইফতারির আগে আমরা সবাই দুর্গা চরণে!
ধর্ম না দেখে আমি দেখি আমাদের বাড়ি থেকে ফেতরার টাকা চলে যাচ্ছে আমাদের মহল্লায়, আমাদের গলিতে যে একমাত্র হিন্দু পরিবারটা আছে তাদের দুই একজনের কাছে। তারা এখন ঠিক সুবিধার অবস্থায় নাই। ওই বাড়ির বয়স্ক মহিলাকে ছোট বেলায় নানী ডাকতাম আমি। থুরথুরে বুড়ি আমাদের পুকুরে গোসল করতে আসত। আমাকে দিত নানা ধরণের পূজার প্রসাদ! প্রসাদ যদি খেতে না করে বাড়ি থেকে? তাই আমি টুপ করে খেয়ে নিতাম, নানী বুঝত পুরো বিষয়টা!
কই জানি পড়েছিলাম, যেহেতু অনেক দেবতায় বিশ্বাস রাখে হিন্দুরা তাই তারা সহজাতভাবেই একটু অসাম্প্রদায়িক হয়। এত গুলা দেবতায় বিশ্বাস রাখছি আরেকটা হলেই সমস্যায় কী? তাই অন্য ধর্মের ঈশ্বরকেও মেনে নেয় সহজেই। একেশ্বরবাদীদের এই সুযোগ নাই, তাই এরা কট্টর হয়! ( এইটা নিয়া নিঃসন্দেহে তর্ক আছে কিন্তু আমার আলোচনা তা নিয়ে না, তাই ওই আলাপ বাদ থাকল এখানে!? তাই সম্প্রীতির হাত বাড়িয়ে দেওয়ার দিক থেকে এই দেশে হিন্দুদেরই বেশ ভালো অবদান আছে। একটু সয়ে যাওয়া, একটু কাটছাঁট করে হলেও সম্প্রীতি দেখানোর চেষ্টা তারা করে। মুসলিমদের মাঝে যে নাই তা না, আছে, তবে আগ্রগামি যেন তারাই। কোন মন্দির থেকে কোনদিন বলে না বছরে একবার আমাদের পূজা আসছে তোমরাই নামাজটা একটু কষ্ট করে পড়ে নাও, আমাদের বাজনা বন্ধ হবে না! সবার সমান অধিকার প্রশ্নে এইটা তারা বলতেই পারত। কিন্তু আমরা সব সময় দেখছি তারাই একটু নিজেকে সংযত করে সম্প্রীতি রক্ষা করে সব সময়। কিংবা এইটাই সংখ্যাগুরুর অধিকার। হয়ত উল্টোটা পাশের দেশেই হয়! হয়ত না, তাই হয় আসলে। গত বছর আমার নাম না জানা এক পূজায় রাতের বেলা এমন বাজনা বাজানো শুরু করে ছিল কলকাতার এক মহল্লায় যে আমি চমকে আকাশ থেকে পড়েছিলাম। এত রাতে এমন করে বাজনা? এইটা কোন কথা? কিন্তু ওই যে সংখ্যাগুরু আর সংখ্যালঘুর যে ব্যাপারটা! এইটা আমাকে তাৎক্ষনিক মনে করিয়ে দিয়েছিল মেনে যাও, ঘুমায় যাও এমনেই!
যাই হোক, সম্প্রীতির এই সমাজটাও আমরা হারিয়ে ফেলতে বসেছি। এত সুন্দর সমাজে থেকে আমরা হারলাম কই? কবে? জানি না আমি। একটা মাস না খেয়ে নে খেয়ে থাকার কষ্ট বুঝার কথা আমাদের। রমজানের উদ্দেশ তো তাই না? সেই উদ্দেশকে এমন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমরা যে প্রতিযোগিতায় নেমেছি তা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? এইটাও আমার জানা নাই।
আমাদের এসএসসি ব্যাচের বেশ কয়েকজন মিলে একটা উদ্যোগ নেওয়া হয় করোনার সময়। মানুষকে খাওয়ানো। অল্প কর শুরু করে এখন দৈনিক ৬০/৭০ জন মানুষ দুপুর বেলা এখানে খায়। রোজায় দৈনিক ইফতারি করে গড়ে ১৫০ জন! এখন এইটা একটা ফাউন্ডেশনে রূপান্তর করা হয়েছে। আমরা এখন এক বেলা খাওয়ানো থেকে আরও একটু এগিয়েছি। মানুষজনকে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেই প্রচেষ্টায় কাওকে সেলাই মেশিন, কাওকে গরু কিনে দেয়া, কাওকে হয়ত ব্যবসার জন্য মূলধন। সাধ্যমত যতখানি সম্ভব তাই করে যাচ্ছে নৃ ফাউন্ডেশন। সামনে বৃদ্ধাশ্রম করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এইটা একটা বড় কাজ হবে আমাদের বিশ্বাস। এই গল্প এখানে কেন বললাম? বললামকারণ এগুলা আমাকে আশা দেয়। সমাজ, রাষ্ট্রের প্রতি আমার কী করার আছে? আমাকেই ঠিকঠাক করে নেওয়া হচ্ছে আমার কাজ। অন্য কী করল না করল তা আমার দেখার দরকার নাই। আমি বদলে গেলেই সমাজ বদলে যাবে। আমি দেখি আমি, আমার বন্ধুরা সবাই সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছে এখানে। সব কিছু থেকে যখন হতাশ হয়ে যাই তখন আমি নৃ ফাউন্ডেশনের দিকে তাকাই। এইটা আমাকে আশা দেয়। নিশ্চয়ই আমাদের মত আরও অনেকেই ভাবছে এমন করে? তাহলে আর সমস্যা কী? ঘুরে দাঁড়াব না আমারা? সেই আশাবাদ নিয়ে সবাইকে জানাই ইদ মুবারক।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।