এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • শাওয়ালের চাঁদ ও ভোরের স্বপ্ন।

    Somnath mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ২০ মার্চ ২০২৬ | ১৮ বার পঠিত
  • শাওয়ালের চাঁদ ও ভোরের স্বপ্ন।
     
    আসমানের দিকে একঠারে তাকিয়ে ছিল আলেয়া।তার নানী ফতিমা বলেছে – আসমানে কাস্তের মতো একফালি চাঁদের দেখা মিললেই রোজার শেষে খুশির পরবের আলো এসে আছড়ে পড়বে তাদের ছোট্ট এক ফালি আঙিনায়। এই দিনটির জন্য বছরভর অপেক্ষায় থাকে সবাই।
     
    এই মহল্লার ঘরে ঘরে আজ বুঝি তার‌ই তোড়জোড় চলছে জোরকদমে। গরীবগুর্বো মানুষের জীবন কঠিন তারে বাঁধা। সেই কবে আম্মি আর আব্বুকে শেষ বারের জন্য দেখেছে তা আর মনে করতে পারেনা আলেয়া। এই দুনিয়ায় নানী ছাড়া আর কোনো নিকটজন নেই তার। ঐ নানীকে ঘিরেই তার জীবনের রোজনামচা। আলেয়াকে নানী ফতিমর জিম্মায় রেখে আব্বু আর আম্মি গিয়েছিল সেই দূরের ভিন্ রাজ্যে বাড়তি কিছু রোজগারের আশায়।বলেছিল কিছুদিন বাদে ফিরে এসে নানী আর আলেয়াকে নিয়ে যাবে সেই সব খোয়াব মেটানোর দেশে। কিন্তু সেই কিছুদিন আর ফিরে আসেনি ছোট্ট আলেয়ার জীবনে। এই মহল্লার অনেকেই গিয়েছিল সেই সব খোয়াব পূরণ করার দেশে। তাদের কাছেই ফতিমা আর আলেয়া শুনেছে আব্বু আর আম্মি সাগর পাড়ি দিয়ে আর‌ও দূরের দেশে গিয়েছে। সেই দেশ কোথায় আলেয়া তা জানেনা, এক গভীর শূন্যতা নিয়েই আলেয়ার বড়ো হয়ে ওঠা।
     
    প্রথম প্রথম মায়ের অভাবটা আলেয়া সেভাবে বুঝতে পারতো না। নানীর সাথে সাথে মহল্লার আরও অনেকেই তাকে ভালোবেসে আগলে আগলে রাখতো সব সময়। মসজিদের মৌলভী চাচা আর চাচী কোলে পিঠে বড় করেছে তাকে। মৌলভী চাচার মেয়ে আরফিন প্রায় তার‌ই সমবয়সী। মৌলভী চাচী বলে – “খোদা আমাদের দুটি বাঁদী উপহার দিয়েছে। আমাদের আবার ভাবনা কিসের?” আরফিনের স্কুলে যাবার বয়স হতেই তাকে পাশের গ্রামের স্কুলে ভর্তি করার তোড়জোড় শুরু হলো।সে কথা টের পেতেই আলেয়াও বায়না ধরে বসলো – “চাচী! আমারেও ইস্কুলে ভর্তি করে দাও। আরফিন দিদির সঙ্গে আমিও পিঠে ঝোলা নিয়ে ইস্কুলে যাবো।” 
     
    হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে কথাটা একসময় নানী ফতিমার কানে এসে পৌঁছায়। কুড়িয়ে আনা কাঠ কুটো দিয়ে হেঁসেলে রান্না করতে করতে ফতিমা জিজ্ঞেস করল – “হ্যাঁরে,আলো ,তুই নাকি ঐ মৌলভী সাহেবের মেয়ে আরফিনের সঙ্গে পাঠশালে যাবার বায়না ধরেছিস? নেকা পড়ার খচ্চা নেই বুঝি? আমি এতো সব সামলাতে পারি কখনো? ওই সব বায়না ছাড়। ওসবের জন্য আলাদা নসিব লাগে?” ওদিক থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে বুড়ি চুলায় একটা কাঠ গুঁজে দিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে আলেয়া সেখানে নেই। সে বুঝতে পারে এসব কথা একদম পছন্দ নয় আলেয়ার। বাপ মা হারা মেয়েটা যে বড্ড অভিমানী। তার সাধ্য কি এই কন্যেকে সামলানোর।
     
    স্কুলে ভর্তি হয়ে এক নতুন জীবনের স্বাদ পায় আলেয়া। নানী ঠিক‌ই বলে – যার কেউ নেই তার খোদা আছেন। তিনিই সব ঠিকঠাক করে দেবেন। ইস্কুলে পড়াশোনা করলে আজকাল অনেক সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায়, তার ভরসাতেই ফতিমা শেষ পর্যন্ত মৌলভী ব‌উয়ের প্রস্তাব মেনে নেয়। নাতনির উৎসাহ দেখে মনে মনে খুশিও হয়েছে ফতিমা। আলেয়ার চোখ দিয়ে আগামীর নতুন স্বপ্ন দেখে সে। মাঝে মাঝে মেয়ে আর জামাইয়ের কথা মনে করে ভীষণ ভাবে ভেঙে পড়ে। কোথায় যে হারিয়ে গেল তারা? বেঁচে আছে কি নেই তাও অজানা। এসব ভাবতে ভাবতে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। এই দুই অসম বয়সি নারীর লড়াইয়ের কি পরিণতি হবে তা জানা নেই ফতিমার। 
     
    রমজান মাস অত্যন্ত পবিত্র মাস ফতিমাদের কাছে। ফতিমা জানে রোজা রাখার উদ্দেশ্য হলো নিজেকে শুদ্ধ করা, পবিত্র করা। আত্মশুদ্ধি ছাড়া মানুষের জীবন বদ্ধ জলার মতো হয়ে যায়। নাতনি আলেয়াকেও একথা বোঝানোর চেষ্টা করে ফতিমা। ছোটো বলে সবকথা হয়তো ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারে না, তবে এ নিয়ে কোনো ক্ষোভ নেই আলেয়ার মধ্যে। সেও নানীর কথা চুপ করে মন দিয়ে শোনে।
     
    স্কুলের লাবণ্য দিদিকে ভারি পছন্দ আলেয়ার। স্কুলের বড়দিও খুব নরম ধাঁচের মানুষ। মেয়েদের কেনো লেখাপড়া শেখা উচিত তা খুব সহজ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন মেয়েদের। আলাদা করে আলেয়াকে ডেকে নিয়ে বলেছেন- “ভয় পাবেনা, নিজের ওপর বিশ্বাস হারাবে না। মন শান্ত রাখবে। নতুন নতুন স্বপ্ন দেখবে, আর তাকে সফল করতে একমনে কাজ করে যাবে। কোনো প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবেন।” পৃথিবীর এমন চেহারাই যে সকলের মঙ্গল করে।
     
    একটু রাত হতেই গোটা এলাকা জুড়ে এক আশ্চর্য নীরবতা নেমে আসে এই মহল্লার ঘরে ঘরে। নানীকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে আলেয়া। কতো দিনের অভ্যাস। ফতিমা আলেয়ার মাথায় আলতো ছোঁয়ায় হাত বুলিয়ে দেন। সারাদিনের ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসে দুজনের। বাইরের নিকষ অন্ধকার। বাঁশ ঝাড়ের ফাঁক ফোকরে জোনাকিরা আলো জ্বেলে উড়ে বেড়ায়। রাত গভীর হয়। 
    আলেয়া স্বপ্ন দেখে – তার আব্বু আর আম্মি এক মুখ হাসি নিয়ে সামনে এগিয়ে আসছে। তারা দুজনে হাত ভর্তি করে উপহার নিয়ে এসেছে আলেয়া আর ফাতিমার জন্য। নতুন নতুন পোশাক, খেলনা সব মেলে ধরে আলেয়ার চোখের সামনে।আজ কি সুন্দর লাগছে আম্মিকে ! ঠিক যেন বেহেস্তের পরী! হাত নেড়ে আলেয়াকে কাছে ডাকে দুজনে। আলেয়াকে জড়িয়ে ধরে তারা। আলেয়া আনন্দে আত্মহারা হয়ে চিৎকার করে ওঠে– আ..ব…বু ,আ ..ম… মিঃ !
     
    পাশে শুয়ে থাকা ফতিমা কিছু বুঝতে না পেরে বিছানায় উঠে বসে। উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করে – কিরে আলো! তোর কি হলো মা?” “নানী , আব্বু আর আম্মি এসেছে, চলো দরজা খুলে দেখি।”-- ঘুমের জড়তা জড়িয়ে আলেয়া উত্তর দেয়। “ধুর! পাগলী , তুই স্বপ্ন দেখেছিস্ । তোর্ আব্বু আর আম্মি কোথা থেকে আসবে?” “আচ্ছা নানী, তুমি যে বলো ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়। আমার এই স্বপ্নটা কি সত্যি হবে?” – আলেয়ার কন্ঠে উত্তেজনা ঝরে পড়ে। ফতিমা আঁচলের খুঁটে চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন – “শুয়ে পড় মা।আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। ভোর হতে আরও খানিকটা সময় বাকি আছে।” 
    একটা নতুন ভোরের স্বপ্নকে বুকের গভীরে চেপে ধরে দুই অসমবয়সী নারী রাতের অবশিষ্ট অন্ধকার কাটিয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখে। বাঁশ বাগানের মাথার ওপর দিয়ে রাতের ঠান্ডা বাতাস শিরশির শব্দ তুলে বয়ে যায়।
     
     
     
     
     
     
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন